ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

৮৫তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

৮৫.

রাত অনেক গড়িয়ে গেছে। মেঘের চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে সে একই জায়গায় বসে আছে। সামনে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ডকুমেন্ট, প্রিন্ট করা রিপোর্ট, হাতে আঁকা টাইমলাইন। তবে এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি আপতত বন্ধ। প্রীয়তার সেফটি সবার আগে। হুট করেই মেঘের নজর গেল চন্দ্রমহল থেকে নিয়ে আসা সেই কাগজের দিকে। কাজটা ওর টেবিলের এক কোনে অসহায়ের মত পড়ে আছে। এত সব কাজের চাপে সে তো ভুলেই বসেছিল এটার কথা। সে আসলে কোনটা সমাধান করবে? 
ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা রহস্য ছাড়া আর কি আছে? একটার পর একটা রহস্যে আটকে পড়ছে সে। এখন অব্দি কোন একটা রহস্যের পরিষ্কার সমাধান নেই। একটা রহস্য সমাধান করতে গেলেই আরেকটা রহস্য এসে সামনে দাঁড়ায়। 
কাগজটা সে ইতোমধ্যেই অন্তত পঞ্চাশবার দেখেছে। তবুও আবার তুলে নিল।
টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় কাগজটা আবারো উল্টেপাল্টে দেখল। আঙুল বুলিয়ে দেখল। কোথাও কোনো লেখা নেই। কোনো চিহ্ন নেই। যেন নিছক একটা পুরোনো ফাঁকা কাগজের টুকরো। চন্দ্রমহলে এত গোপনে লুকিয়ে রাখা জিনিস এত সাধারণ তো হতে পারে না! সব গুলোর রহস্য ভেদ করলেও এটাই পড়ে আছে তার রহস্য নিয়ে। 
ঘরের একমাত্র শব্দ ল্যাপটপের কুলিং ফ্যানের মৃদু গুঞ্জন। অরুপ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে যেন নিজের বাড়ি ছেড়ে মেঘের কাছে ঘুমাতেই এসেছে। মেঘ তার ছয় নম্বর কফির মগটা হাতে নিল। কিন্তু তার চোখ সোজা রুশার কক্ষের লাইভ ফিডে। আশ্চর্যজনক ভাবে এই দুদিনের মাঝে তাকে কেউ কোন ওষুধ কিংবা ইনজেকশন দিতে আসে নি। কারন কি? ড্রাগ গুলো তবে রুশার শরীরে প্রবেশ করছিল কিভাবে! 
মেঘের চোখ স্ক্রিনে আটকানো। ঘড়িতে রাত তিনটা বেজে আট মিনিট। রুশার ঘুম আজ হয়তো ভালো হচ্ছে না। সে শুধু পাশ ফিরে চলছে। আদিবা পাশের সোফায় কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে। সবকিছু স্বাভাবিক। একেবারে স্বাভাবিক। মেঘের মস্তিষ্কে প্রীয়তাকে নিয়েও নানা আশংকা চলছে। নিজের অবচেতনেই মেঘের হাতের ধাক্কা খেল কফির মগটা। ছলকে পড়া গরম কফি সোজা গিয়ে পড়ল চন্দ্রমহল থেকে আনা কাগজটার উপর। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ল্যাপটপ সরিয়ে ফেলল। কাগজটা তুলে পরিষ্কার করতে গিয়েই থমকে গেল। তার হাত মাঝ আকাশে স্থির হয়ে রইল।
কফি পড়া জায়গাটায়… কিছু একটা ফুটে উঠছে। কফির রঙটা অদ্ভুত আঁকিবুঁকি করে তুলেছে কাগজটায়। কেমন এক অদৃশ্য কালিতে আঁকা রেখাগুলো অদ্ভুত কোন দৃশ্য ইঙ্গিত করছে। মেঘ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। 
“অরূপ!” বলেই চিৎকার করে উঠল সে। অরূপ ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠল, “কি হয়েছে?”
“এদিকে আয়!”
অরুপ বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠে আসলো। দুজনেই কাগজটার দিকে ঝুঁকল। মেঘ কাগজটা টেবিলে রেখে কফি মগে থাকা বাকি কফি টুকুও ফেলে দিল। ধীরে ধীরে আরও রেখা ফুটে উঠলো। এঁকেবেঁকে যাওয়া পথ। কিছু চিহ্ন। কিছু বৃত্ত। কিছু ক্রস মার্ক। কিছু সংখ্যা। আর তারপর, একটা স্থাপনার নকশা। মেঘের চোখ বড় হয়ে গেল। সে কাগজটা দুই হাতে ধরে নিয়ে আলোয় তুলে ফিসফিস করে বলল, “এটা...”
অরূপও বাকরুদ্ধ। ঘরটা নিস্তব্ধ। শুধু টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় ভিজে থাকা কাগজটার উপর ঝুঁকে রইল দুইটা মানুষ। মেঘ আর অরূপ। দুজনের চোখেই একই বিস্ময়। কফির দাগ শুকাতে শুরু করেছে। আর তার সাথে সাথে অদৃশ্য কালিতে আঁকা রেখাগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কেউ কথা বলল না, নড়লোও না। যেন সামান্য শব্দ করলেই কেউ জেনে যাবে। মেঘ ধীরে কাগজটা ঘুরিয়ে দেখল।
একবার উল্টো। একবার সোজা। তারপর আবার উল্টো। কোথাও কিছু মিলছে না। এঁকেবেঁকে যাওয়া অদ্ভুত রেখা। দেখলে মনে হয় একটা মানচিত্র। আবার পরের মুহূর্তেই মনে হয় এলোমেলো আঁকিবুঁকি। ঠিক মিলেও মিলছে না। 
অরূপ ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেউ ইচ্ছে করে এমনভাবে আঁকলে বুঝা অসম্ভব। এই জিনিসটা আসলে কি!”
মেঘ উত্তর দিল না। তার চোখ স্থির হয়ে রইল কাগজটার উপর। একটা কিছু মিলছে না। একটা কিছু ভুল আছে। ভীষণ ভুল। যেন কেউ ইচ্ছে করেই এটাকে অসম্পূর্ণ বানিয়ে রেখেছে।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টা তারা শুধু কাগজটা নিয়েই বসে থাকল। মোবাইলে ছবি তুলল। জুম করল। নেগেটিভ ফিল্টার দিল। আলাদা আলো ফেলল। কাগজের নিচে টর্চ ধরল সব করল। কিন্তু ফলাফল শূন্য। রাত আরও গভীর হতেই অরূপ ক্লান্ত হয়ে সোফায় হেলান দিল, “আমি হাল ছেড়ে দিলাম। কচুর মাথা এঁকে রেখেছে। বেকার খাটুনি!”
মেঘ তাও কিছু বলল না। সে হঠাৎ একটা সাদা খাতা টেনে নিল সামনে। কলম হাতে তুলে একে একে পুরো নকশাটা কপি করতে শুরু করল। প্রতিটা রেখা, বৃত্ত, সংখ্যা, ক্রস চিহ্ন একটাও বাদ দিল না।
অরূপ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল, “এখন আবার কি করছিস?”
“দেখছি।”
“কি?”
“ভুলটা কোথায়।”
অরুপ মাথা চাপড়ালো, “তুই এটা দেখ আমি ল্যাপটপে লাইভ ফিডে নজর রাখছি।”
মেঘ কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের কাজ করতে লাগলো। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর পুরো নকশাটা খাতায় তুলে ফেলল মেঘ। এরপর কয়েক সেকেন্ড খাতার দিকে আর কাগজটার দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে নিলো। একবারে হুবাহু করতে পারে নি। তবে এটা হয়েছে অনেকটাই একই।
মেঘ এবার কাগজটাকে আলোতে উঠিয়ে বেশ লম্বা সময় ভাবতে লাগলো। হঠাৎ তার চোখ সরু হয়ে গেল। সে যেন কিছু একটা পেয়ে গেছে। একেবারে হুট করেই। মেঘ ফিসফিস করে বলল, “এটা সম্পূর্ণ না। উল্টো।”
“মানে?”
মুহূর্তেই মেঘ কাগজটা খুব সতর্কভাবে টেবিলের উপর বিছিয়ে দিল। তারপর খাতায় আঁকা কপিটার মাঝ বরাবর একটা রেখা টেনে পাতাটা ছিঁড়ে ফেলল।
অরূপ চমকে উঠল, “পাগল হয়েছিস?”
মেঘ উত্তর দিল না। সে ছেঁড়া দুই অংশ আলাদা করল। তারপর অদ্ভুতভাবে একটার উপর আরেকটা সরিয়ে আনল। ডান পাশ বাম পাশে। বাম পাশ ডান পাশে। তারপর দুটো অংশ একসাথে তুলে আলোয় ধরল।
মুহূর্তের মধ্যে এলোমেলো রেখাগুলো একে অপরের সাথে মিলে গেল। অসম্পূর্ণ বৃত্তগুলো পূর্ণ হলো। কাটা পথগুলো যুক্ত হয়ে গেল। ক্রস চিহ্নগুলো নির্দিষ্ট অবস্থানে দাঁড়াল। আর সম্পূর্ণ একটা নকশা ফুটে উঠল পরিপূর্ণ।
অরূপের মুখ হাঁ হয়ে গেল। মেঘে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল, “আমি জানতাম... আমি জানতাম কিছু একটা লুকানো আছে।”
এটা কোনো সাধারণ মানচিত্র নয়। এটা একটা স্থাপনার গোপন নকশা। একটা ভূগর্ভস্থ নকশা। একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কমপ্লেক্স। অসংখ্য সরু পথ। গোপন কক্ষ। বন্ধ টানেল। চিহ্নিত প্রবেশদ্বার। আর মাঝখানে লাল কালি দিয়ে আঁকা একটা বিশেষ বৃত্ত। যেন কেউ ইচ্ছে করে ওই স্থানটাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে।
মেঘ ফিসফিস করে বলল, “এটা চন্দ্রমহল...”
অরূপ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। মেঘের চোখ স্থির হয়ে রইল লাল চিহ্নিত বৃত্তটার উপর। তারপর খুব ধীরে বলল, “না... শুধু চন্দ্রমহল না...এটা চন্দ্রমহলের নিচে লুকিয়ে থাকা একটা অন্য পৃথিবীর মানচিত্র। আন্ডারগ্রাউন্ডের গুপ্ত মহল।”
অরুপ বোকার মত তাকিয়ে থাকলো। তারা কি তবে আবারো একটা গুপ্তধন অনুসন্ধান করে নিয়েছে?
রাত যত গভীর হতে লাগল, রুপমহল তত নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। বাইরে অবিরাম বৃষ্টির শব্দ। জানালার কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের রেখাগুলো যেন অন্ধকারকে আরও ভারী করে তুলছে।
রুশার চোখে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুম নামল না। বারবার তার চোখে ভাসছে প্রীয়তার মুখটা। সকালে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে আর একবারও সে এসে দাঁড়ায়নি তার সামনে। এমনটা কখনও হয় না। প্রীয়তা যত ব্যস্তই থাকুক, দিনের কোনো না কোনো সময় এসে তাকে দেখে যায়। আজ পুরো দিন কেটে গেছে। তার উপর এখন প্রীয়তা অসুস্থ। এ বাড়িতে কে আছে প্রীয়তার?
এসব ভেবে রুশা অস্থির হয়ে বারবার পাশ ফিরতে লাগলো। আদিবা কয়েকবার বলেছে, "আপনি ঘুমানোর চেষ্টা করুন।"
কিন্তু ঘুম কি ইচ্ছা করলেই আসে? রুশা খুব নিচু স্বরে বলল, "আমার মনে হচ্ছে কিছু একটা ভয়ংকর হয়েছে..."
আদিবা চুপ করে গেল। তারও অদ্ভুত অস্বস্তি হচ্ছে।
ওদিকে শেহতাজ নিজের কক্ষে নিঃশব্দে বসে আছে। ঘরের আলো ম্লান। বিছানায় অচেতন প্রীয়তা। স্যালাইনের ফোঁটা ধীরে ধীরে পড়ছে। প্রতিটি ফোঁটার শব্দ যেন নিস্তব্ধতার মাঝেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শেহতাজ দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে প্রীয়তার দিকে। এই মেয়েটাকে সে এতদিন দেখেছে, কখনও তর্ক করতে, কখনও প্রতিবাদ করতে, কখনও ভয়ে কুঁকড়ে যেতে, কখনও আবার অসম্ভব সাহসী হয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু আজ এই নিসাড় পরিস্থিতি খুব দমবন্ধ কর লাগছে। সে চাইছে মেয়েটা উঠে বসুক, অহেতুক ভুলভাল কথা বলুক। তাও সুস্থ থাকুক।
শেহতাজ ঠায় বসা প্রীয়তার পাশে। এই প্রথম কি সে এত কাছ থেকে মেয়েটাকে দেখলো? প্রীয়তা অসম্ভব সুন্দরী। নাকি ওর চোখেই সুন্দর লাগছে? শেহতাজ আরেকবার কপাল ছুঁলো। সে কি শুধু জ্বর দেখছে এত বারবার পরীক্ষা করে? নাকি মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেখার বাহানা এটা? সে কি করছে এসব! শেহতাজ সঙ্গে সঙ্গে নিজের উপরই বিরক্ত হয়ে উঠল। এ কেমন দুর্বলতা! কেন?
সে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। প্রচন্ড। ঠিক তখনই শেহতাজের ফোনে একটা মেসেজ এলো। শেহতাজ শুধু দেখলো। তেমন কোন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করলো না। তার মস্তিষ্ক বিরক্ত। আর কিছুই নতুন করে দেখতে চাইলো না যেন। 
রাত ভোরের দিকে গড়াল। কখন যে শেহতাজ প্রীয়তার পাশে চেয়ারে বসেই আধঘুমে ঢলে পড়ল, সে নিজেও জানে না। ভোরের ম্লান আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকতেই শেহতাজের চোখ খুলে গেল। প্রথমেই সে নিজের অবস্থান দেখে থমকে গেল। চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। অনিচ্ছাকৃতভাবে তার হাতে প্রীয়তার হাতটা ধরা। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে রইল। এভাবে কখনো মেয়েটাকে সে ছোঁয় নি। শেহতাজ সোজা হয়ে বসল। চোখ পড়ল প্রীয়তার মুখের দিকে। জ্বরের কারণে মুখটা এখনো ফ্যাকাশে। কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাস আগের চেয়ে স্বাভাবিক। শেহতাজ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।  
মেয়েটা গভীর ঘুমে। শেহতাজ হাতটা ওভাবে ধরেই কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর অভ্যাসবশত হাত বাড়িয়ে খুব আলতো করে কপালে হাত রাখল। জ্বর অনেকটাই নেমে গেছে। সে আবার গলার পাশে হাত রাখল। শরীর এখনও দুর্বল, কিন্তু আগের মতো আগুনের মতো জ্বলছে না। নিজের অজান্তেই যেন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক থেকে।
সে আলমারি থেকে পোশাক নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। প্রায় বিশ মিনিট পর শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয়ে বেরিয়ে এল শেহতাজ। কক্ষ থেকে বেরিয়েই একজন সাহায্যকারীকে ডেকে সংক্ষিপ্ত গলায় বলল, "প্রীয়তার কাছ থেকে এক মুহুর্তের জন্যও সরবে না। জ্ঞান ফিরলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানাবে।"
"জি ছোট সাহেব।"
"ওর ঘুম ভাঙলেই ওষুধ সময়মতো খাওয়াবে। কোনো সমস্যা হলেই সবার আগে আমাকে জানাবে।”
"জি।"
আর কোনো কথা না বলে শেহতাজ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
সকালের নাস্তার টেবিলে রোজকার মত সকলেই উপস্থিত। দীর্ঘ টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন শাহরিয়ার শেখ। তার ডান পাশে রুপমনি বেগম। অন্য পাশে আনজুম আরা বেগম। পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য নীরবে খাবার খাচ্ছেন। শেহতাজ এসে নিজের চেয়ারে বসতেই কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে ঘুরে গেল। কেউ কিছু বলল না। শেষ পর্যন্ত শাহরিয়ার শেখই নীরবতা ভাঙলেন। তার গলা ঠান্ডা, "গতকাল কী হয়েছিল?"
শেহতাজ চায়ের কাপ তুলে এক চুমুক দিল, "কিছু না।"
"কিছু না?"
"প্রীয়তা বৃষ্টিতে ভিজে সামান্য ঠান্ডা লেগেছিল।"
শাহরিয়ার শেখ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, "আর তাই রাতে ডাক্তার আনতে হলো!"
"প্রয়োজন ছিল।"
শাহরিয়ার শেখ এবার মূল বক্তব্যে এলেন, "মেয়েটা আর কতদিন থাকবে‌ এ বাড়িতে?"
“যতদিন আমি চাই।”
“তোমার বউ নীলিমা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। এ সমস্যা তুমি সমাধান না করলে আমি কিন্তু সমাধান টানতে বাধ্য হবো।”
শেহতাজ তাচ্ছিল্যের হাসলো, “আগে আপনি আপনার ছড়ানো ময়লা গুলো পরিষ্কার করুন। আমার কি করতে হবে আমি দেখে নেবো।”
শাহরিয়ার শেখ কোন প্রতি উত্তর করলেন না। শুধু ক্ষিপ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এই আলোচনার শেষ এখানেই। শাহরিয়ার শেখ এই সূক্ষ্ম খোঁচা ঠিকই বুঝে গেলেন। বাবা ছেলে আবার একই নিয়মে বেরিয়ে পড়লো তাদের কাজে। এসব নতুন নয়। তাদের ব্যক্তিগত জীবন যতটাই জঘন্য হোক অফিশিয়াল জীবন একেবারে অন্য। এই মহলের বাইরে বাবা ছেলের মত দারুন ব্যবসায়ীক জুটি আর দুটো হয় না। 
এদিকে রুশা কোন ভাবেই স্থির থাকতে পারছে না। রাতে তার ঘুমও হয় নি ঠিকঠাক। মেয়েটার এই হাতে গোনা কয়েকটা আপন মানুষ ছাড়া কে-ই বা আছে! সে বারবার দরজার দিকে তাকাতে লাগলো। সকাল থেকে এ নিয়ে হাজার বার আবদার করে বসেছে আদিবার কাছে একটা বার প্রীয়তাকে দেখার। তাকে বারবার পাঠিয়েছে। তবে সে একবারও দেখতে পারে নি। ঘরের দরজা বন্ধ। বেলা একটু বাড়তেই রুশা আবার বলল, "আদিবা! একটা বার দেখে এসো না প্লিজ। এখন তো বেলা বেড়েছে। ওর উঠে পড়ার কথা। শেহতাজেরও চলে যাবার কথা। প্লিজ বোন।"
আদিবা দীর্ঘশ্বাস টানলো। ও এ বাড়িতে খুব সামান্য সময় এসেছে। তবে একটা জিনিস পরিষ্কার বুঝেছে। প্রীয়তা আর রুশার সম্পর্কটা সবথেকে আলাদা। এরা ঠিক শুধু বন্ধু না। তার থেকেও বেশি। হয়তো এটাকে আত্মার সম্পর্ক বলে। এরা দুজন হয়তো দুজনকে নিজের পরিবার বানিয়ে নিয়েছে। আদিবা গিয়ে দেখলো। এখনো প্রীয়তা ঘুমে। তার পাশে একজন সাহায্যকারী বসে আছে। আদিবা জিজ্ঞেস করলো, “জ্বর কি কমেছে?”
“এখনো আছে।”
আদিবা নিজ হাতে একবার চেক করলো। হ্যাঁ জ্বর আছে তবে এতো বেশি না। সে এখানে না থেকে আবার ফিরে গেল রুশার কক্ষে। 
আদিবা বেরিয়ে যাবার কিছু সময়ের মাঝেই প্রীয়তার ঘুম ভাঙলো। তার মাথাটা খুব ভার, গলা শুকিয়ে কাঠ, শরীরটা অবশ। সে ধীরে চোখ খুলল। সাদা ছাদ। নরম গদির বিছানায় শুয়ে আছে সে। এরপর হঠাৎই গত কালের সবকিছু বজ্রপাতের মতো ফিরে এল। প্রীয়তা এক ঝটকায় উঠে বসতে গিয়েই কেঁপে উঠল। মাথাটা ঘুরে গেল তার। 
মাথায় হাত দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো, "আহ..." 
ঠিক তখনই পাশে থাকা সাহায্যকারী দ্রুত এগিয়ে এল, "ম্যাডাম... ধীরে।"
প্রীয়তা চারদিকে তাকাল, "...আমি এখানে?"
"জি। আপনি গতরাত থেকেই খুব অসুস্থ ম্যাডাম।"
প্রীয়তা এত দিন এ বাড়িতে আছে। তবে এ বিছানায় ও কখনো শোয় নি। অন্য দিন হলে ব্যপারটা হয়তো অন্য ভাবে গ্রহন করতো। তবে আজ ওর ঘৃণা হচ্ছে। একবার নিজের দিকে তাকাতেই দেখলো। গতকালের শাড়িটা শরীরে নেই। আর না শরীরে ওই বিশ্রী অ্যালকোহলের গন্ধ আছে। মুহুর্তে এক অজানা ভয়ে ঘাবড়ে জিজ্ঞেস করলো, “গত রাতে কি হয়েছিল? আমার পোশাক কে পাল্টিয়েছে?”
সাহায্যকারী স্বাভাবিক ভাবেই বলল, “গত রাতে কি হয়েছিল সব তো জানি না। তবে যখন ছোট সাহেব আপনাকে এনেছিল, তখন আপনি বেহুঁশ ছিলেন, ভিজে একেবারে চুপচুপে। শরীর দিয়ে মদের গন্ধও আসছিল। ছোট সাহেব বলেছিল আপনাকে যেন গোসল করে পরিষ্কার কাপড় পড়িয়ে দেই। আমি আর বিনুর মা দুজনেই করেছি সব‌। এরপর তো ডাক্তার এলো। সারারাত জ্বর কমেই নি।”
প্রীয়তা কোন কথা বলল না। সাহায্যকারী একটু হেসে বলল, "আপনি খুব লাকি ম্যাডাম।"
প্রীয়তা ভ্রু কুঁচকাল, "কেন?"
"ছোট সাহেব আপনাকে খুব ভালোবাসেন। এমন শক্ত পোক্ত মানুষকে এমন নরম হতে জীবনে প্রথম দেখেছি। আপনার অসুস্থতার জন্য একদম পাগল হয়ে উঠেছিলেন। সারারাত আপনার পাশ থেকে একবারও ওঠেননি। আমাকে গিন্নি মা রাতে থাকতেও বলেছিলেন, ছোট সাহেব রাখেন নি। তিনিই সব করেছেন। "
প্রীয়তা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। হাসিটা ব্যঙ্গের। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “অভিনয়। জাত শয়তান একটা। নিজেই আঘাত দিয়ে র/ক্তা/ক্ত করে আবার মলমপট্টি করে ভালো সাজলেন। সফল ভাবে হিরোও হয়ে গেলেন। 
…ভালোবাসা?? আমি জুতোই পিষে চলি এমন নরপিশাচের দয়ার উপর।”
ওদিকে আদিবা কক্ষে পৌঁছাতেই রুশাকে বলল জ্ঞান ফেরেনি তবে শেহতাজ নেই। এটুকু শুনতেই রুশার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "আমি যাব।"
"অসম্ভব।"
"কেন?"
"ওনার সঙ্গে সাহায্যকারী আছে। ঘরে ক্যামেরা লাগানো।"
রুশা কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর হঠাৎ বলল, "তোমার পোশাক দাও আমাকে।"
আদিবা হতভম্ব। রুশা আবার বলল, "হ্যাঁ। তোমার এই নার্সের ড্রেসটা দাও। না কেউ চিনতে পারবে। আর না ক্যামেরাতে ধরা পড়বে।"
"আপনি কি পাগল হয়েছেন?"
"আমি সত্যিই আদিবা সেজে যাব, কেউ বুঝবে না। আমি শুধু এক নজর প্রীয়তাকে দেখেই চলে আসবো। প্লিজ আদিবা।"
আদিবা সরাসরি বলল, "না! মেঘ স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি কোন সাহায্য করবো না এসব বিষয়ে‌।"
রুশা একটু নাকে কেঁদে বলল, "প্লিজ আদিবা। মাত্র ৫ মিনিট। ওকে শুধু এক নজর দেখবো। তুমি আমি সেজে বিছানায় শুয়ে থাকবে। আমি গিয়ে একটু দেখেই চলে আসবো। মেঘও বুঝবে না।"
"তবুও না।"
রুশা দুই হাত জোড় করল, "একবার… শুধু একবার ওকে দেখে আসি। প্লিজ…"
চলবে…? 
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই} ♥️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন