১০১.
চন্দ্রমহলের সকালের নিস্তব্ধতা কাটিয়েই মেঘের গাড়ি এসে ভিড়লো। বিশাল প্রাসাদটা দূর থেকে যেন কোনো পুরোনো রাজ্যের দুর্গ। শেহতাজ মহলের বাহিরেই অপেক্ষায় ছিল। সে মেঘের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, “নাইট শিফটের সুরক্ষা কর্মিদের সময় শেষ তারা বের হচ্ছে। দিনের সুরক্ষা কর্মিরা আসবে ২ ঘন্টা পরে।”
“আমাদের হাতে কি তবে ২ঘন্টা সময়?”
“যত দ্রুত কাজ শেষ করা যায়। সবাই এসেছে?”
মেঘ মাথা নাড়লো, “হ্যাঁ।”
অরুপ প্রশ্ন করলো, “যদি দুঘন্টায় কাজ শেষ না হয় তাহলে?”
“দিনের ওরা আসা অব্দি ক্যামেরাও ততক্ষণ বন্ধ থাকবে। ওরা এলেই ক্যামেরা অন করে ফেলবে। তখন জলঘোলা হবে। আর কিছু নয়।”
মেঘ হাতঘড়ি দেখে বলল, “চলুন। সময় কম।”
চন্দ্রমহলে প্রবেশ সহজ নয়। শেখদের যত হীরের কারবার হয় সব চন্দ্রমহলেই। এখান থেকে সমগ্র দেশে হীরে সাপ্লাই হয়। এমন কি বিদেশেও। যার একটা দানা লাখের ঘর ছেড়ে কোটিতে দাম তোলে, সেখানে সিকিউরিটি তো থাকবেই। শেহতাজ নিজের পরিকল্পিত পথ দিয়েই এগোলো। কোথায় কোন পাহারা, কোন করিডোর ফাঁকা সব তার নখদর্পণে। আজ সে নিজের বাবার দুর্গেই একজন অনুপ্রবেশকারী। এই অনুভূতিটা অদ্ভুত।
প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতেই মেঘের চোখে পড়লো আধুনিক ছোড়ায় মোড়ানো মহল। সে বলল, “না না এ পথ নয়। বেইজমেন্টে যাওয়ার অন্য কোন পথ আছে।”
শেহতাজ পকেট থেকে পুরোনো ম্যাপ বের করলো। মেঘ সাথে সাথেই নতুন তার হাতে আঁকা ম্যাপটা বের করলো। শেহতাজ ভ্রু কুঁচকে তাকালে মেঘ বলল, “এটা ওই ম্যাপটার সমাধান। ওটায় শুধু প্রশ্নের মত পাজল বানানো। সেটাই আমি এখানে সমাধান করেছি।”
শেহতাজ চোখ বুলিয়ে দেখলো। “হ্যাঁ এটা চন্দ্রমহলেরই ম্যাপ। বেইজমেন্টে যেতে হলে হল ঘরের পেছনের রানী মহল দিয়ে যেতে হবে।”
অরুপ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো, “রানী মহল?”
“এখানে মহলের ভেতরেও আলাদা মহল রয়েছে। প্রতিটি মহলের আলাদা নাম। রানী মহল শুধু মহিলাদের ছিল। সেখানে এক মাত্র জমিদার সাহেব ছাড়া কেউ যেতে পারত না। ওটা চন্দ্রমহলের পেছনের অংশে।”
শেহতাজ এগিয়ে চলল, আরফি এসে যুক্ত হলো ওদের সাথে। মেঘ, অরুপ আর ইমরান পিছে চলল। মহলের এই অংশ খুব পুরোনো। ক্ষয়িষ্ণু দেয়াল, বিশাল ঝাড়বাতি, নীরব করিডোর। শত বছরের ইতিহাস যেন নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। দেয়ালে অদ্ভুত সুন্দর চিত্রকর্ম। সব ধুলো জমা। ইমরান প্রথমবার মুখ খুলল, “মহলের সামনের অংশ এত গোছানো আধুনিক করা। তবে এই অংশের জন্য এত অবহেলা কেন?”
“এই দেয়ালের ওপাশেই পদ্মা নদী। আব্বু শুধু মহলের মাঝের অংশটুকুই নিয়েছিলেন। চারপাশের অংশ এভাবেই ফেলে রেখেছিলেন পরে সম্পূর্ণ ভেঙে নতুন করে করার আশায়।”
সকলেই রানী মহলটাকে খুঁটিয়ে দেখলো। ম্যাপ যেখানে বেইজমেন্টে যাবার পথ দেখাচ্ছে সেখানে দেয়াল টানা। কোন যাবার পথ নেই। ওরা সকলেই বার কয়েক দেয়ালটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। তবে লাভ হলো না। শেহতাজ আরেকবার ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে এবার পা দিয়ে মেঝেতে একটা জোরে লাথি মারলো। সাথে সাথেই অদ্ভুত একটা শব্দ হলো। সাধারণ পাথুরে মেঝের মত নয়। সকলেই এগিয়ে এলো। আরফি মেঝের উপরের পুরোনো ধুলোজমা কার্পেট সরাতেই দেখলো ফ্লরের উপর একটা জায়গা একটু অন্য রকম। খালি চোখে একে আলাদা করার ক্ষমতা কারো নেই। মেঘ মেঝেতে ঝুঁকে হাত দিয়ে আঘাত লাগালো। তাতে একটু নড়ে উঠলো। উপরে কিছু একটার প্রলেপ টেনে দরজাটাকে গোপন করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। প্রলেপটা সরতেই একটা লকের অংশ দৃশ্যমান হলো। এটা ঠিক ক্যাবিনেট লকের মত করে বসানো। তবে তারা চাবি কোথায় পাবে? শেহতাজ দ্রুত আরফিকে বলল, “মহলের যে বড় চাবির গোছাটা আছে ওটা নিয়ে আয়।”
আরফি দৌড়ে ছুটে গেল। অরুপ বলল, “আসলেই কি এটা চাবি দিয়ে খুলবে?”
মেঘ বলল, “চাবি ছাড়া খোলা যাবে না। এটা যেভাবে মজবুত করে তৈরি এতে ভাঙতে গেলেও দিন চলে যাবে।”
আরফি কয়েক মিনিটের মাথায় চাবির গোছা এনে হাজির হলো। ইয়া বিশাল একটা লোহার চাবির গোছা। কম করে হলেও এতে ৫০ থেকে ৮০ টা চাবি আছেই। মেঘ কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে গোছাটা হাতে নিয়ে একে একে চেষ্টা করে গেল। পর পর ১৮ টা চাবি দিয়ে বৃথা চেষ্টা চালানোর পর ঝংকার শব্দে তালাটা খুলে গেল। একটা ছোট্ট দরজার মত অংশ উপরে উঠে গেল। নিচে কাঠের সরু সিঁড়ি নিচ অব্দি চলে গেছে। তবে ভেতরে এত অন্ধকার যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না কিছুই। শেহতাজ আগে থেকেই টচ লাইটের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। একে একে সকলেই একবার দেখে নিলো ভেতরের ঘুটঘুটে অন্ধকার।
মেঘ বলল, “অনেক দিন বন্ধ এটা। যে কোন বিপদ থাকতেই পারে। আমি আগে নামছি।”
শেহতাজ বাঁধা দিয়ে বলল, “বিপদের সাথে তোমার কোন চুক্তি আছে?”
মেঘ ভ্রু কুচকে তাকালো। শেহতাজ বলল, “আমি আগে যাচ্ছি।”
মেঘ এবার জবাব ছুঁড়ল, “এ মহলের সব বিপদ গুলোও কি আপনার কন্ট্রোলে?”
ইমরান দুজনের কথোপকথনে এক প্রকার বিরক্ত হয়েই বলল, “আরে আজব সমস্যা! আমি যাচ্ছি। তোরা পেছনে আয়।”
ইমরান কাউকে কোন কথা না বলতে দিয়েই আরফির হাত থেকে টচ নিয়ে নিচে নামতে শুরু করলো। আর কোন যুক্তি তর্ক ছাড়াই একে একে প্রত্যেকে নেমে পড়লো সিঁড়ি বেয়ে।
নিচের বাতাস অসম্ভব রকমের গুমোট। পুরোনো পাথরের গন্ধ। ধুলো জমা সব। আর্দ্র দেয়াল। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। নিস্তব্ধতা এত ভারী যেন শত বছর মানুষের স্পর্শ পায়নি। মাকড়সার জালে আশেপাশে ভরে রয়েছে, অদ্ভুতুড়ে আবহাওয়া। সকলেই একসঙ্গে গুটি পায়ে এগোলো। মেঘ প্রতিটা পদক্ষেপে ম্যাপ মিলিয়ে নিচ্ছে। টচ লাইটের আলো ছড়িয়ে পড়ছে অন্ধকার কক্ষময়। সিঁড়ি ঘরের পথ শেষ হতেই তারা একটা বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজায় মস্ত এক তালা ঝুলছে। তালার চেহারা দেখে অবশ্য বয়স অনুমান করা ভুল হবে। কারন এই জামানায় অন্তত এমন তালার দেখা পাওয়াও দুঃসাধ্য।
আরফি মাথায় হাত চাপড়ে বলল, “চাবি তো উপরেই রেখে এসেছি।”
মেঘ তালাটা ঘুরিয়ে বলল, “চাবি দিয়ে কাজ হবে বলে মনে হয় না। জং পড়ে অবস্থা খারাপ।”
শেহতাজ আসে পাশে তাকালো। কিছু নেই। আরফি বলল, “উপরেই একটা লোহার শাবল আছে। আমি আনছি।”
অরুপ আরফিকে সাহায্য করতে এগোলো। ওরা শাবলটা আনতেই শেহতাজ ওদের হাত থেকে নিয়ে জোরে এক আঘাত বসালো। এত জোরে আঘাতে দরজাটা কেঁপে উঠলেও তালার কিছুই হলো না। সে আবারো সব শক্তি দিয়ে আঘাত বসালো। এবার তীক্ষ্ণ আওয়াজে তালাটা ছুটে মেঝেতে পড়ে গেলো। মেঘ এগিয়ে দরজাটা খুলে দিল। বছরের পর বছর বন্ধ থাকায় শক্ত হয়ে গেছে দরজাটা। তাও তার জোর ধাক্কায় বিকট আওয়াজে খুলল। ধুলো ধুলো অন্ধকার। ভেতরে ঢুকেই সবাই থমকে গেল। একটা বিশাল গোল কক্ষ। আর সেই কক্ষের চারপাশে চৌদ্দটি দরজা।
ইমরান বিস্ময়ে বলল, “এটা কী? এত দরজা?”
উপস্থিত সকলেই অপলক তাকিয়ে রইলো। প্রতিটা দরজা একই রকম। কোনোটার পার্থক্য নেই। ওরা একেকজন একেক দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ইমরান প্রথম দরজা খুললো। ভেতরে আরেকটা কক্ষ। আর সেই কক্ষেও চৌদ্দটা দরজা। একে একে সব গুলো দরজা খুলতেই দেখা গেল একই অবস্থা। প্রতি কক্ষে চৌদ্দটা করে দরজা। আকার, আকৃতি কিংবা ধরন কোন কিছুতেই বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই।
অরুপ অবাক হয়ে বলল, “এসব কি?”
মেঘ বলল, “গোলক ধাঁধা।”
শেহতাজ বলল, “এসব শত্রুদের রহস্য থেকে দূরে রাখার জন্য একটা প্রতিরোধ্য ব্যবস্থা।”
ইমরান বলল, “একটা একটা কক্ষ সমাধান করতে হবে।”
ওরা প্রথমে প্রথম কক্ষে গিয়ে চিরুনি অভিযান চালানো। আর সেখানেই মিলল একটা সূত্র। প্রথম কক্ষের প্রথম দরজার উপরে লাল রঙের লেখা একটা শ্লোক। “মঙ্গলে উষা বুধে পা যথা ইচ্ছে তথা যা।”
শেহতাজ অবাক হয়ে বলল, “এসব কি লেখা?”
মেঘ বলল, “খনার বচন।”
“খনা কে?”
“সেটা থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এখানে খনার বচন কেন লেখা?”
অরুপ এগিয়ে এসে ভালো করে দেখে বলল, “এটা অন্য কিছু বোঝাচ্ছে না তো?”
মেঘ এগিয়ে দ্বিতীয় কক্ষে গেল। একে একে চৌদ্দটা কক্ষেই দেয়ালের এক কোন একটা করে শ্লোক।
ইমরান বলল, “সবগুলো দরজা খুলে দেখবো?”
“দেখ।”
ইমরান একটা দরজা খুলেই বোকা বনে গেল। পুরো কক্ষ জুড়ে আয়না। আর আয়না গুলোও সব দরজার মত, ধাক্কা পড়তেই সরে যায়। আর আয়না ঠেলেও অন্য আরেকটা আয়নার কক্ষে পৌঁছায়। ইমরান আরেকটা দরজা খুলেও দেখে একই অবস্থা। এ যেন এক ভয়ংকর গোলক ধাঁধা বিছিয়েছে কেউ। ইমরান বলল, “আসল দরজা খুঁজে বের করা অসম্ভব। হয়তো এই শ্লোক সমাধান করতে হবে। না হলে পৌঁছানো যাবে না।”
মেঘ গভীর মনোযোগে শ্লোকের দিকে তাকানো, “এই শ্লোকে কিছু একটা আছে। এখানে সমাধান না করে এগোনো যাবে না। এই গোলক ধাঁধায় আটকে যাবো আমরা।”
শেহতাজ ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে ফোন বের করলো কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। সে ফোন উপরে উঁচু করে ধরলো, “এখানে কোন নেটওয়ার্ক নেই কেন।”
সকলেই নিজেদের ফোন বের করে চেক করলো। কারোর ফোনেই নেটওয়ার্ক নেই। অরূপ বলল, “হয়তো বেইজমেন্ট অনেক নিচে এই কারনে নেটওয়ার্ক আসছে না।”
মেঘ কিছু একটা ভেবে বলল, “প্রত্যেকটা কক্ষে যে ধাঁধাগুলো আছে সবগুলো দেখতে হবে। ইমরান ঝটপট নোট নে তো। সবগুলো একসাথে বসিয়ে দেখতে হবে যে সমাধান কি প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা নাকি একসাথে।”
একে একে প্রত্যেকেই একেক কামরায় গিয়ে শ্লোকগুলো আলাদা করে নোট লিখতে শুরু করল। ১৪টা কক্ষে একেবারে আলাদা ১৪ টা শ্লোক। মেঘ ভালো করে অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। তবে সে ঠিক থামলো ৮নম্বর কক্ষের শ্লোকে। সে অবাক চোখে বলল, “এটা তো খনার বচন নয়! সবগুলো কক্ষে খনার বচন ব্যবহার করা হলেও ৮ নম্বর কক্ষের এটা খনার বচন নয়।”
সকলে এগিয়ে মেঘের ফোনে নোট করা প্রত্যেকটা শ্লোক দেখতে লাগতো। প্রথম থেকে শুরু করে সবগুলোই একে একে খনার এক একটা বচন। প্রথম কক্ষে - ‘মঙ্গলে উষা বুধে পা যথা ইচ্ছে তথা যা।’
দ্বিতীয় কক্ষে - ‘চাষী আর চাষা মাটি দুয়ে হয় দেশ খাঁটি।’
এভাবেই তৃতীয় চতুর্থ থেকে চৌদ্দতম কক্ষ অব্দি বিভিন্ন বচন। শুধু আট নম্বর কক্ষে ভিন্ন। সেখানে লেখা- ‘যে দিকে ডোবে দিবাকরের রথ, সেদিকে করিও গমন নিরবধি পথ।
সপ্তকে পূর্ণ মেপে কদম দিও দ্বারের দিকে।
করকমলে স্তব্ধ রুপে, দুইদণ্ড দিও সপে।’
অরুপ দাঁতের দাঁত চেপে বলল, “এদের কি আর কোন কাজ ছিল না? যেখানে মন চায় ইচ্ছা মতো স্লোক, বচন, ধাঁধা সবকিছু ঢুকায় দাও।”
আরফি সায় দিয়ে বলল, “আই এগ্রি।”
ইমরান বিরক্ত মুখে বলল, “তোরা একটু মুখে তালা দে। দিবাকর রথ মানে কি?”
মেঘ চুপচাপ ভাবলো। পেটে আসছে তবে মুখে আসছে না। শেহতাজ বলল, “সূর্য।”
সবাই অবাক হয়ে শেহতাজের মুখের দিকে তাকালো। এই অর্ধেক ইংরেজ বাংলার মানেও জানে? আরফি অবাক হয়ে বলল, “তুই কি করে জানলি।”
“আমার পরিচিত একজন দিবাকর আছে তার নামের অর্থ সূর্য। সেখান থেকে জেনেছি।”
মেঘ ওসবে নজর না দিয়ে ধাঁধাতে মনযোগী হলো, “‘যে দিকে ডোবে দিবাকরের রথ।’ মানে সূর্য যেদিকে ডোবে। মানে পশ্চিম। ‘সেদিকে করিও গমন নিরবধি পথ।’ মানে পশ্চিম দিকে যেতে হবে।”
আরফি চারপাশে তাকিয়ে বলল, “দরজা গুলো সব পশ্চিম দিকেই। তারমানে এদিকেই যেতে হবে।”
সকলে আবারো ধাঁধার দ্বিতীয় লাইনে ব্যস্ত হলো, “সপ্তকে পূর্ণ মেপে কদম দিও দ্বারের দিকে।”
ইমরান বলল, “কারো কাছে দিক নির্দেশনার যন্ত্র হবে?”
আরফি অবাক হয়ে বলল, “কেন?”
“ধাঁধাটা বলছে পশ্চিম দিকে সাতটা কদমে ৭ নম্বর দরজার দিকে যেতে হবে। এভাবে পশ্চিম নির্ধারণ করা যাবে না। যন্ত্র মেপে পশ্চিম টা দেখতে হবে।”
অরূপ সাথে সাথে ফোন বের করে বলল, “আমার কাছে একটা অ্যাপ আছে। দাঁড়া।”
অ্যাপটা অন করতেই সাথে সাথে দিকনির্দেশনা নির্ধারণ হলো। সকলেই এগোলো সপ্তম দরজার দিকে। দরজা পেরিয়ে আয়নার কক্ষ। চারপাশে শুধু আয়না। অসংখ্য আয়না। ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত। নিজেদের অসংখ্য প্রতিচ্ছবি দেখে মুহূর্তের জন্য সবাই বিভ্রান্ত হয়ে গেল। দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক সপ্তম কদমে এসে থামলো ওরা সকলে। মেঘ বলল, “করকমলে স্তব্ধ রুপে, দুইদণ্ড দিও সপে।’ করকমল কি জিনিস?”
প্রত্যেকে প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকালো। কেউ জানে না। মেঘ শান্ত হয়ে কিছু সময় ভাবলো। এরপর নিতের হাতের তালুতে তাকালো। “কর? করকলম মানে হাত নয়তো? আঙ্গুলের দাগ গুলোকেই তো কর বলা হয়।”
শেহতাজ বলল, “হতে পারে। দুইদণ্ড বলতে।”
অরুপ বলল, “প্রায় ৪৮ সেকেন্ড।”
আরফি কিছু না বুঝে বলল, “করতে কি হবে?”
মেঘ কিছু না বলেই নিজের হাতটা কাচের আয়নার উপর রেখে ঘড়ির সময় দেখতে লাগলো। এর আগেও এমন সমাধানে সে অভ্যস্ত। এখানে যা কিছু সম্ভব। প্রযুক্তি কিংবা বুদ্ধিমত্তায় তারা যে খুব এগিয়ে এসব আর নতুন নয়। ঠিক ৪৮ সেকেন্ড শেষ হতেই আয়নাটা দরজার মতো খুলে গেল। আয়নাটা সরতেই পেছনে দেখা গেল সরু একটা পথ। একটা গোপন সুড়ঙ্গ। সকলেই স্তব্ধ। তাও থামলো না। সুড়ঙ্গ ধরে অনেক নিচে নামতে হলো। সিঁড়ি সংখ্যা কত তা ঠিক হিসেব করা দায়। তবে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তারা মাটির খুব গভীরে পৌঁছে গেছে। তারা সকলেই এসে থামলো আরেকটা দরজার সামনে। এই দরজাটা অত্যাধিক রাজকিয় সম্পন্ন লোহার ভারি দরজা। চারপাশে অসংখ্য মশাল পড়ে আছে। দরজা খোলার উপায় কি এটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো সকলে। দরজায় কোন তালা নেই। আর না কোন সিটকেনি। হাতল আছে শুধু।
আরফি হাতল ধরে টান দিতেই দরজা থেকে অসংখ্য সোচালো লোহার অংশ বেরিয়ে এল। আর ওগুলো লাগাতার চলতে লাগলো। তীক্ষ্ণ ধারালো। আরফির হাতের মাংস থেঁতলে বেড়িয়ে গেল। রক্তে মেখে উঠলো তাল সাদা শার্ট। সামান্য এইটুকুতেই যেন শরীর ছেড়ে দিল আরফি। বাকি সকলে কোন রকম সরে বাঁচল। এ যেন এক অসম্ভব নিখুঁত প্রযুক্তি। মুহুর্তে পরিবেশ বদলে গেল। এসব ঠিক কিভাবে হলো? মেঘ, ইমরান সকলেই নিজেদের মুখে তাকিয়ে পড়লো। অরুপ ছুটে গিয়ে আরফিকে সামলালো। আঘাত গভীর নয় তবে র ক্ত ক্ষরণ বেশ হচ্ছে। মেঘ এগিয়ে দরজায় একটু হাত ছোঁয়াতেই ধারালো অংশ গায়েব হয়ে গেল। সে একটু খুঁটিয়ে দেখতে চাইছিল। লোহার অংশটুকুতে অন্য কিছু মেশানো আছে কিনা। তবে ঠিক বুঝলো না। সে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে ভালো করে অনুসন্ধান করতে লাগলো।
দরজা খোলার এমন কোনো নিয়ম আছে যা অনুসরণ না করলেই এভাবে ধারালো চুরির মত অংশ আক্রমন করতে থাকবে। মেঘকে দেখে সকলেই দেয়ালের এদিকে ওদিকে খুঁজতে লাগলো কোথাও কোন সূত্র, ধাঁধা বা অন্য কিছু আছে কিনা। তবে শেহতাজ চুপ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘও শান্ত হলো। কি হিসেব মেলাবে এখানে? মেঘ একবার চোখ বন্ধ করে মাথার মাঝে সব আরেকবার শুরু থেকে সাজালো। ১টা ঘর ১৪ টা দরজা। সেখানে ১৪টা ঘরে আরো ১৪টা দরজা। খনার ১৩টা বচন। ৭ নম্বর কক্ষে ধাঁধা। ১৪ আর ৭ কে এত গুরুত্ব কেন দেয়া হয়েছে? মেঘ দরজার দিকে এগিয়ে খুব ভালো করে দরজাটার দিকে তাকালো, “এই দরজা খুলতে গেলেই দরজার মাঝ থেকে লোহার ধারালো অংশ গুলো আক্রমন করবে। দরজার সামনে এই পাথরের কোন কানেকশন সেট করা।”
ইমরান এগিয়ে এসে মেঘের বলা মত আরো একবার ভালো করে চেক করলো। পাথুরে দেয়াল পাশেই একটা ফাকা অংশ। যেটা দুপাশেই একই রকম। নিচের অংশ একটু আলাদা। ধুলো সরে যাবার দাগ। ইমরান একটু হিসাব মেলালো, “এখানে ভরাট করতে হবে। তাহলে হয়তো দরজার ওগুলো আসবে না।”
অরুপ বোকার মত তাকিয়ে বলল, “কেন আসবে না?”
“ম্যাথ। কিছু একটার কানেকশন আছে। দেখ এই ফাঁকা অংশ থেকে সামান্য অংশের ধুলো সরে গেছে। এর মানে আরফি যখন দরজা টেনে সরিয়েছে তখন এটা সরেই দরজা থেকে ধারারো লোহার অংশ চালান করেছে। এখন এখানে যদি সম ওজনের কিছু থাকে তাহলে এটা সরে গেলেও ওগুলো আসবে না।”
মেঘ ইমরানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “দারুন ধরেছিস।”
ইমরান এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখল পাশেই ছোট ছোট চার কোনা করে পাথরের টুকরো কেটে রাখা সবগুলো টুকরোর আকার আকৃতি একই রকম। সে এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমার মনে হয় এই টুকরোগুলো এগুলোই বসাতে হয় এখানে।”
মেঘ বলল, “দুপাশে ৭টা করে টুকরো বসাতে হবে।”
ইমরান অবাক হয়ে বলল, “তুই কি করে জানলি?”
“জানিনা। তবে সব জায়গায় ১৪ আর সাত কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুপাশে যদি তুই সাতটা করে পাথর বসাস তাহলে ১৪ই হয়। আমার গাট ফিলিং বলছে হয়তোবা সাতটা করেই বসবে।”
সকলে আর কথা না বাড়িয়ে একে একে পাথরগুলো বসাতে লাগলো। এরপর মেঘ এগিয়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “সবাই পিছিয়ে যা। একসাথে সকলে আহত হওয়া যাবে না।”
ইমরান এগিয়ে মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ পেছান আপনারা।”
মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে ইমরানের দিকে তাকিয়ে পড়তেই ইমরান বলল, “লুক দিস না। কাজ খরতে দে।” এটুকু বলেই হাতল ধরে সজরে এক টান দিল। দরজাটা বিকট শব্দে খুলে গেল। আর কোন ধারালো অংশ বেরিয়ে এলো না। দরজা খুলতেই সকলের চোখ ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হলো। বিভিন্ন তীক্ষ্ণ আলো সরা সরি তাদের চোখে এসে আক্রমণ করলো। কক্ষ ভরা স্বর্ণ, রত্ন, মণিমুক্তা। পুরোনো রাজকীয় অলংকার। ঘরজুড়ে সম্পদের পাহাড়। সব যেন ডিপি করে রাখা। সকলের কদম জমে গেল। তারা তাদের সমগ্র জীবনেও এত সম্পদ অন্তত দেখেনি। বিভিন্ন রঙের হীরে ঝলকাচ্ছে। কক্ষের একপাশটা বোঝাই করা শুরু কালো হীরে।
ইমরান ফিসফিস করে বলল, “এসব সত্যি…!”
অরুপ নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো। শেহতাজ চুপ। মেঘ শান্ত। তার চোখে বিস্ময় আছে, কিন্তু লোভ নেই। সকলেই কক্ষে ঢুকে সব অলংকার দামি দামি সব সম্পদ ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। মেঘের চোখে এসব সম্পদ তেমন আশ্চর্য রকমের মনযোগ ধরে রাখতে পারলো না। সে শুধু ছুঁয়ে দেখলো কালো হীরেকে। এগুলো রুশ থেকে আলাদা করা হীরে। কিন্তু এর ফর্মুলা কোথায়। মেঘের চোখ আটকালো একটা ছোট বাক্সে। যেটা কালো হীরের উপরেই রাখা। বাক্সের উপর খোদাই করে আরবিতে লেখা। “রিদা”
মেঘ হাত বাড়িয়ে বাক্সটাকে নিলো। ওটা খুলতেই ভেতরে একটা একটা ছোট কাচের শিশি আর এক টুকরো কাগজ। মেঘ কাগজটা খুলতেই দেখলো কিছু সাংকেতিক চিহ্ন লেখা। সে ফিসফিসিয়ে বলল, “এটা তবে রুশ থেকে হীরে আলাদা করার ফর্মুলা! তবে এ কাগজে উল্লেখ করা কাটা চিহ্ন ম্যাপটাতেও আছে।”
মেঘ ম্যাপটা আরেকবার বের করলো। এই কক্ষের শেষে কাঁটা চিহ্ন। মেঘ সব ছেড়ে দেয়ালের দিকে এগোলো। এ ঘরে অসংখ্য চিত্রকর্ম বোঝাই করা দেয়ালে। তবে আর তো কোন পথ নেই। এবারও কি তবে মেঝে থেকে পথ বের হবে? মেঘ মেঘেতে আঘাত করেও চেষ্টা করলো। তবে লাভ হলো না। সে চারপাশ দেখতে দেখতেই তার চোখ আটকে গেল দেয়ালে টানানো রিদা চৌধুরীর একটা চিত্রকর্মে। এই মানুষটার মুখের আদল প্রায় ৭০ ভাগই রুশা পেয়েছে। একই অলংকারে সাজালে বোধ হয় দুজনকে কেউই আলাদা করতে পারবে না। শেহতাজ ঠিক মেঘের পেছনে এসে দাঁড়ালো। “নিজের বউয়ের চেহারার মিল দেখছো?”
মেঘ হাসলো, “আপনার অবজারভেশন ক্ষমতা খুব দারুণ।”
“আর তোমার বিচক্ষরতা।”
“রহস্য এখনো শেষ হয়নি, মিস্টার শেহতাজ। আরো কিছু বাকি আছে।”
“কি?”
“রিদা চৌধুরীর এই ছবিটা খুব ভালো করে দেখুন এটা এই কক্ষের ছবি। সামনে এইসব ধন রত্ন। কিন্তু পেছনে একটা সুরঙ্গ।”
শেহতাজ আরেকটু এগিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে রিদা চৌধুরীর ছবিটা দেখলো। মেঘ ঠিক বলেছে। এই কক্ষেরই ছবি এটা। তবে পেছনে একটা দরজা।
মেঘ এগিয়ে ছবিটা শক্ত হাতে সরালো। বেশ বড় আর ওজনে ভারি এটা। ছবিটা রেখে দেয়ালের পেছনের অংশটা দেখতেই মেঘের আঙুল থেমে গেল। একটা পাথরে দরজা। সে চাপ দিতেই একটা শব্দ হলো। দেয়ালের অংশটুকু সরে গেল। সামনে অন্ধকার। আরেকটা পথ। আরেকটা সুড়ঙ্গ। এসব দেখে সকলেই এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। সবাই নিঃশব্দ হয়ে গেল।
শেহতাজ বলল, “এত সম্পদের পরেও যদি আরেকটা গোপন পথ থাকে…”
মেঘ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই গুপ্তধন আসল রহস্য না। আসল রহস্য এই গুহা। মানে রুশ।”
সকলে মেঘের দিকে তাকিয়ে পড়লো। মেঘ বলল, “আমার অবজারভেশন যদি ঠিক হয়ে থাকে তাহলে এই সুরঙ্গ দিয়ে সরাসরি রুশের খনি অব্দি যাওয়া যায়। আমরা এখন যে জায়গায় আছি এই জায়গাটা সম্পূর্ণ পদ্মা নদীর নিচে। পদ্মার এই অংশ শাখা নদী। এ হিসেবে এর গভীরতা কখনোই আহমরি বেশি ছিল না। আর পদ্মা নদীর যেই পাড়ে এই চন্দ্রমহল তার ঠিক ওপর পাড়েই সেই লালমাই পাহাড় আর রুয়ানাইদের এলাকা।
যেহেতু রুশ চৌধুরীদের সম্পদ ছিল এই হিসেব মতে এই সুরঙ্গ দিয়েই রুশ তারা ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে যখন তাদের রাজ্য দখল হয় তখন তারা বেইজমেন্টের এই অংশটাকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে ফেলে এবং রুশ কেও অস্বীকার করে গুজব বলে।”
উপস্থিত সকলেই যেন বিশাল এক ধাক্কা খেলো। চুপচাপ মেঘের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সব রহস্য তাদের সামনে সাদা খাতার মত উন্মোচিত। মেঘ এবার শেহতাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই কক্ষে যা সব সম্পত্তি আছে সেসব আপনাদের। হিসেব মতে রুশা কিংবা আপনার। তবে খনির অংশ সরকারের। এবার আপনি যেটা করবেন সেটা আপনার উপর। আমার সাজেশন থাকবে মণী, মুক্তা, ধন, সম্পদ যা আছে রেখে দিন। তবে খনিটাকে সরকারের জন্য ছেড়ে দিন। দেশের সম্পদের সাথে কম্প্রোমাইজ উচিত নয়।”
শেহতাজ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, “তোমার কিছু চাই না?”
“আমার যা চাহিদা ছিল সে আমার বাড়িতে আমার নামে সাজতে ব্যস্ত মিস্টার শেহতাজ। আমি এই রহস্যের অংশ শুধু তার জন্য। যেখানে রানীই আমার বাকি এসব দিয়ে আমি কি করবো?”
শেহতাজ শান্ত নজরে তাকিয়ে রইলো শুধু। ঠিক সে সময়ে এক সাথে একাধিক পায়ের শব্দ ছুটে এলো। উপস্থিত সকলেই দরজার দিকে মনোযোগী হতেই একে একে কালো পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীরা বন্দুক হাতে কক্ষে প্রবেশ করলো। সকলেই শেহতাজের দিকে অবিশ্বাসের নজরে তাকালো। সে যেন বিশ্বাসের মুখোশে নিজের কার্যসিদ্ধি করে নিয়েছে।
চলবে…?
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না।
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই}