ফন্ট সাইজ:
থিম:
রুশ রহস্য (দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ)

১০২তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তিন্তি

১০২. শেষ পর্ব (প্রথম অংশ & শেষ অংশ)

শেহতাজ শান্ত নজরে তাকিয়ে রইলো শুধু। ঠিক সে সময়ে এক সাথে একাধিক পায়ের শব্দ ছুটে এলো। উপস্থিত সকলেই দরজার দিকে মনোযোগী হতেই। একে একে কালো পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীরা বন্দুক হাতে কক্ষে প্রবেশ করলো। শক্ত বুটের শব্দে ভূগর্ভস্থ কক্ষের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। বন্দুকধারীরা চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল তাদের। সকলেই শেহতাজের দিকে অবিশ্বাসের নজরে তাকালো। সে যেন বিশ্বাসের মুখোশে নিজের কার্যসিদ্ধি করে নিয়েছে।
শেহতাজ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। সাথে সাথে তাদের পেছন থেকে আনজুম আরা বেগম বেরিয়ে এলেন। উপস্থিত সকলেই এবার বাকরুদ্ধ। 
শেহতাজ নিজেও স্তব্ধ। সে যাকে আশা করেছিল তিনি কোথায়? তবে এসেছেন তার মা? তবে এবার সে কি আরেকবার হেরে গেল? সে সব রকম সর্তকতা অবলম্বন করে আজকের খেলা সাজিয়েছে। তবে খবর এই অব্দি পৌঁছালো কি করে? কে এমন আছে যে বারবার সব গোপনীয়তা ভাঙছে সকলের সামনে? 
উপস্থিত সকলের চোখে শেহতাজকে নিয়ে সংশয় ভাঙলো। নিরাপত্তা কর্মীরা একে একে আটকে ধরলো সবাইকে। বন্দুকের নিশানা থেকে শেহতাজও বাদ রইলো না। সে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “এসব কি হচ্ছে মা?”
খুব নাটকিয় উত্তর করলেন আনজুম আরা বেগম, “কোথায় বাবা কিছু হচ্ছে না তো।”
“আপনি করতে কি চাইছেন?”
“কিচ্ছু করতে চাই না। আমি শুধু চাই তোমরা আমাকে ছেড়ে কোথাও না যাও। এই মহলেই থেকে যাও।”
“মানে?”
“চন্দ্রমহল। আমি যখন নতুন বিয়ে হয়ে আসি আমার খুব শখ ছিল এই মহল দেখার। আমাকে এর ধারে কাছেও আসতে দিতেন না আমার স্বামী আর শ্বশুরমশাই। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই মহল আমার শেষ ঠিকানা হবে স্থায়ী ঠিকানা।”
সকলের কাছেই আনজুম আরা বেগমের কথাগুলো বড্ড অগোছালো, অযৌক্তিক মনে হল। উনার ব্যবহার আচমকা অন্যরকম। না হিংস্র আর না কোমল। শেহতাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো, “আপনি এখানের খোঁজ জানলেন কি করে?”
“ওহ হো শেহতাজ। বড্ড প্রশ্ন করো তুমি। আমি তোমার মা। তুমি বেশি চঞ্চল তাই তোমার মাথায় বন্দুক রাখতে হয়েছে।”
শেহতাজ শক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। বারবার সে কেন তার আপন মানুষদের সাথে পেরে উঠবে না? তার মা এসবে? শেহতাজ প্রশ্ন ছুঁড়ল, “কেন মা? এসব কেন? আপনিও কি শেখদের মত লোভী?”
“লোভ? সে কি জিনিস? আমি শুধু প্রতিশোধ চিনি। ঠিক যেভাবে আমার বাবাকে নিঃস্ব করা হয়েছে। যেভাবে, আমার সঙ্গে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা হয়েছে। আমি শুধু তার প্রতিশোধ চাই। আর কি করতাম? আমি যা করছি সব জায়েজ।”
“আপনি বলতে চান আপনার এই কাজ জায়েজ?”
“হ্যাঁ জায়েজ। আমি তিনটে খু নে র প্রতিশোধ নিতে পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছে শেহতাজ। আজ শুধু আমার সেই দিন।”
“কার খু ন? কিসের প্রতিশোধ?”
আনজুম আরা বেগম বললেন, “হাজি মনসুর পাটোয়ারীর নাম কি শুনেছো? আমি তার মেয়ে।”
মেঘ, ইমরান আর অরূপ তিনজনই যেন আকাশ থেকে পড়ল। হাজী সাহেবের মেয়ে আনজুম আরা বেগম? মানে যাকে বাঁচাতে হাজী সাহেব সব অন্যায় অবিচার চুপ করে মেনে নিয়েছিলেন? কিন্তু এটা কি করে সম্ভব? 
ইমরান বলে উঠলো, “আপনি হাজী সাহেবের মেয়ে?”
আনজুম আরা বেগম হেসে বললেন, “তুমি আমার বাবাকে চেনো। একই শহরে থাকার পরেও বছর কি বছর আমি আমার বাবাকে দেখিনি। আর দেখাও হবে না।”
শেহতাজ ঠিক কি প্রশ্ন করবে বুঝে উঠলো না। আনজুম আরা বেগম বললেন, “আমি তবে কাহিনীর সমাপ্তি করি? আমি হাজী মনসুর পাটোয়ারীর মেয়ে। যখন আমি খুব ছোট তখনই আমার বাবা আমাকে আমার মামা রাজন খন্দকারকে দিয়ে দেন। আমার মামাই আমাকে এই রূপমহলে দিয়ে দেন। আমি প্রতিশোধের স্পিহা নিয়ে এই মহলে ঢুকিনি। একটা ছোট্ট ১৬ বছরের মেয়ে সংসার করতে এসেছিল। আর তারপর তার সাথে একের পর এক অন্যায় অবিচার…
এই মহল আমায় তৈরি করেছে। আমার বাবাকে নিঃস্ব কেন করা হয়েছিল জানো? কারণ আমার বাবা সৎ ছিলেন। তার সততার বলি চড়ে আমার ভাই। আমার ভাইকে খু ন কথা হয়। একটা ছোট্ট নিষ্পাপ বাচ্চা। মাত্র ১০ বছরের ছিল। আমার মা এই ট্রমা না নিতে পেরে মা রা যান। রাতারাতি আমাদের সংসারটা ধ্বংস হয়ে যায়। আমার বাবা আমাকে আমার মামাকে দিয়ে দেন। নিজের সব থাকতেও আমি আশ্রিতার মত বড় হই। ভাগ্যের পরিহাস নাকি অন্য কিছু জানিনা। মামা আমাকে বিয়ে দেন রুপমহলে। প্রতিদিন নতুন নতুন রকমের অত্যাচার। আমার গর্ভে সন্তান আসতেই অত্যাচার কমে যায়। শশুর শাশুড়ি যত্ন নিতে শুরু করেন। ‌আর তারপর পরম যত্নে আমার সন্তানকে খু ন করা হয়। অন্যের সন্তানকে আমার কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমার সন্তান নাকি বদ্ধ পাগল। তাই তাকে মেরে দেওয়া হয়। আমার ছোট্ট বাচ্চাটার কি দোষ ছিল? একবার বললে আমি ওকে নিয়ে অনেক দূর চলে যেতাম। কিন্তু না তাতে তো রূপ মহলের মান মরিয়া তার ধসে পড়তো। আমার ভেতরে যে প্রতিশোধের বীজ এ মহল পুতেছে তারই বীজ আজ বটগাছ হয়েছে।”
আনজুম আরা বেগমের চোখে পানি। মুহূর্তেই চোখের পানি মুছে বললেন, “আমি শেখদের নির্বংশ করে দেব। এই বংশে কোন সন্তান আমি বাঁচতে দেব না।”
সকলের ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেবে তা সব সব যেন ভুলে বসলো। শেহতাজ এবার ঠান্ডা গলায় বলল, “শাহরিয়ার শেখের নাম নিয়ে সকল অপকর্ম আপনার তাহলে?”
“না সব আমার কেন হবে? তবে এর সিংহভাগ আমার। আমি রুপমহলকে নির্বংশ দেখতে চাই। এ বংশে শুধু ধ্বংস জন্মায়। তোমাদের কি মনে হয় আমি এখানে এসব স্বর্ণালংকারের লোভে এসেছি? লোভে তো আসছে শাহরিয়ার শেখ। আমি আমার খেলা সাজিয়ে দিয়েছি। একে একে রুপমহলের প্রত্যেকটা বংশধর চন্দ্রমহলে এসে আটকাবে। আর আমি মহলটাকে ধ্বংস করে দেব।”
আনজুম আরা বেগম এবার মেঘের দিকে এগিয়ে তার মুখে হাত রেখে বললেন, “আমি জানি তোমরা নির্দোষ। বিশ্বাস করো আমিও নির্দোষ। তাও আমাকে সবকিছু কুরবান করতে হয়েছে এই মহলের নামে। আজ এই মহলে আমারও আত্ম আহুতি যাবে।” 
এটুকু বলেই উনি ইশারা করলেন পেছনের লোকদের। “নিয়ে চলো সবাইকে। এসব রিদা চৌধুরির থাক। এগুলো আর কারো প্রয়োজন নেই।”
সাথে সাথেই আরও অসংখ্য পায়ের জুতোর শব্দ ভেসে এলো দরজার বাইরে থেকে। একই পোশাক ধারী আরো নিরাপত্তা কর্মী। সেই সাথে এলেন শাহরিয়ার শেখ। তার প্রথম নজর গেল স্বর্ণ অলংকার আর মনি-মুক্তার দিকে। এগিয়ে এসে এত ধন সম্পদ দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলেন, “সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ। এসব স্বপ্ন!! শেহতাজ তুই আমার মন খুশি করে দিয়েছিস।” 
এরপর আনজুম আরা বেগমের দিকে তাকালে। তিনি যে পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন তা স্পষ্ট, “স্বাগতম আনজুম। ওয়েল প্লেইড। তুমি ছাড়া অনেক কাজই আমার কাছে সহজ হতো না। তুমি ছিলে বলে সবকিছু এত সহজ। ধন্যবাদ তোমাকে। কি খুব অবাক হচ্ছ? আমার সব সময় অন্যের গেমে এ ঢুকে তাকে কিস্তি দিতে খুব ভালো লাগে। নিজেকে ক্ষমতাবান মনে হয়।”
সাথে সাথে শাহরিয়ার শেখের সঙ্গে আসা লোক গুলো আনজুম আরা বেগমকে আটকে ফেলল। শাহরিয়ার শেখ হেসে বললেন, “এই মহলের এক টুকরো বাতাস ও আমার নিয়ন্ত্রণে। আর তুমি সেখানে খেলতে এসেছো? এই যে লোক গুলো তোমার পোষা কুকুর। এগুলোর সংসার চলে আমার টাকায়।”
আনজুম আরা বেগম একদম স্থির নজরে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে জানেন। তিনি এটাও জানেন তিনি যতই খেলুক কখনোই শাহরিয়ার শেখের ঊর্ধ্বে যেতে পারবেন না। তাই তিনি খেলাটাকে নিজের মতো সাজিয়েছেন। মুহূর্তেই কালো পোশাক ধারী লোক গুলো আনজুম আরা বেগমকে ছেড়ে শাহরিয়ার শেখের মাথায় বন্দুক ঠেকালেন। আনজুম আরা বেগম হেসে বললেন, “আমার তিরিশ বছর ধরে তিলে তিলে সাজানো খেলায় এত সহজে আমাকে হারিয়ে দেবেন? নারী যখন নিজের প্রতিশোধের পরিকল্পনা করে, শয়তান তখন নিজেও নত
মাথায় থাকে।"
শাহরিয়ার শেখ একেবারে রাগে গর্জে উঠলেন। তার নিজের আনা প্রত্যেকটা সদস্য তার বিরুদ্ধে চাল চালছে। ইমরান আর অরুপ বার বার ছোটার চেষ্টা করলেও মেঘ একেবারে শান্ত। সে জানে সে জোর করে এদের থেকে ছুটতে পারবে না। শেহতাজ হতাশ হেসে বলল, “তারমানে সব খেলা আপনার ছিল। আর বাকি সবাই ছিলাম আপনার গুটি?”
আনজুম আরা বেগম বললেন, “আমি কাউকে গুটি হতে বলিনি। তুমি স্বইচ্ছায় হয়েছো। আর তোমার বাবা নিজের চালে ফেসেছে।”
শেহতাজ কড়া গলায় বলল, “আমার জন্মের পাপ। ছেড়ে দিন ওদের। ওরা আপনার প্রতিশোধের অংশ নয়। আপনার সঙ্গে শুধু শেখরা অন্যায় করেছে বাকিদের ছেড়ে দিন।”
“কাউকে ছাড়বো না। জীবনে একটা জিনিস আমি শিখেছি সেটা হচ্ছে প্রমাণ রাখতে নেই। আমি গল্পের কোন অধ্যায় বাকি রাখতে চাই না।”
আনজুম আরা বেগম শাহরিয়ার শেখের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “তোমাকে এই অবস্থায় দেখেছি যে কি শান্তি লাগছে! মৃ ত্যু র খেলা তোমার খুব পছন্দের তাই না? আজ আমি খেলব তোমার সাথে। বিশ্বাসঘাতক।”
শাহরিয়ার শেখ ছোটার চেষ্টা করে বললেন, “আমি তোমার সাথে কোন বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। যা করেছি তোমাকে জানিয়ে করেছি। কোন একটা জিনিস তুমি জানতে না? আমি আর যত জঘন্যই হই বিশ্বাস ঘাতক নই।”
শেহতাজ হেসে বলল, “হ্যাঁ উনি বিশ্বাসঘাতক নন। শুধু সম্পত্তির জন্য একটু আকটু এখানে সেখানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ওতে আর কি? সম্পত্তির জন্যে নিজের ভাইয়ের মৃ ত্যু অবধারিত জেনেও বসে বসে মৃ ত্যু র আয়োজন দেখেছেন। নিন এবার ভাইয়ের সব সম্পদ আরেকজন নিয়ে টানছে।”
উপস্থিত সবাই থমকে গেল। এসব তথ্য নতুন একেবারে নতুন। শাহরিয়ার শেখ চেঁচিয়ে বললেন, “আমি আমার ভাইকে মারি নি। জবান সামলে শেহতাজ।”
শেহতাজ হেসে বলল, “না মারেন নি। বাঁচানোর চেষ্টা ও করেন নি। আপনি সব জানতেন। আপনি জানতেন শশী রহমান, মিকাইল কি খেলা খেলছিল। কিন্তু আপনি চুপ করে বসে ছিলেন। ছোট্ট আব্বু যখন আপনার আসল রুপ জেনে যায় তখনই নীলিমার সুরক্ষার জন্য এই সব পাজল সাজিয়ে যায়। তিনি খুব ভালো করে জানতেন, আপন মানুষ যখন বিশ্বাসঘাতক হয় তখন মৃ ত্যু সহজ। শুধু এই কারণে আমি নীলিমাকে বিয়ে করিনি।”
শাহরিয়ার শেখ চেঁচিয়ে বললেন, “আমি কিচ্ছু জানতাম না। আনজুম আমাকে কিছু জানতেই দেয়নি। ওর মুখোশ তো খুব সদ্য খুলেছে। না হয় সেদিনই আমি আমার ভাইয়ের কবরে ওকেও দাফন করে দিতাম। ওর জন্য আমি আমার ভাইকে বাঁচাতে পারিনি।”
আনজুম আরা বেগম চেঁচিয়ে উঠে বললেন, “আহ্। কে কবে মরে ভূত হয়ে গেছে! বাপ ছেলের এই ড্রামা আমার ভালো লাগছে না। হ্যাঁ আমি জানাইনি। আমি চেয়েছি মরুক। একটা একটা করে সবার কপালে মৃ ত্যু ছিল। ভালো মানুষটা আগে মরেছে। ক্ষতি কি হয়েছে তাতে? আমার ভাই এতক্ষণে তোমার বউকেও হাজির করে ফেলেছে শেহতাজ। ভেবোনা তোমার মৃ ত্যু র পর তোমার বউয়ের কি হবে। আমি তোমাদের একই কবরে দাফন করব।”
শেহতাজ রাগে চেঁচিয়ে বলল, “আমার ওয়াইফ কোথায়?”
“এখনো জীবিত।”
আনজুম আরা বেগমের ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো। তার হাসিতে কোনো মায়ের স্নেহ নেই, নেই কোনো অনুশোচনা। আছে শুধু ক্ষমতার অহংকার আর নিজের জয়ের উন্মাদনা। শেহতাজ কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলো। তার নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার সাথে শেষ কিস্তি দিয়ে বসে আছে। 
আনজুম আরা বেগম হাতের ইশারায় নিরাপত্তাকর্মীদের নির্দেশ দিলেন, “সবাইকে নিয়ে চলো।”
মেঘ, অরূপ, ইমরান, আরফি কেউ কোনো প্রতিরোধ করলো না। শেহতাজকে একজন ছুঁতে এলেই সে গর্জে উঠলো। নিজ থেকেই এগিয়ে চলল সে।
বাহিরে সকাল কেটে গেছে বহু আগে। সূর্য মাথার উপরে। চন্দ্রমহলের বিশাল হলঘর আগের মতোই রাজকীয়। ঝাড়বাতির আলো, দেয়ালের পুরোনো চিত্রকর্ম, মেঝের সাদা পাথর সবকিছু আগের মতো সুন্দর। অথচ আজ সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে মৃ ত্যু র গন্ধ।
হল ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রীয়তা। তার হাত বাঁধা। দুজন লোক দুপাশে ধরে রেখেছে তাকে। এই দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই শেহতাজের চোখের দৃষ্টি বদলে গেল। রাগ হিংস্রতায় নামলো। সে কোন কথা না বলে এক হাতে প্রীয়তাকে টেনে ধরে লাথি বসালো তাকে ধরে রাখা এক লোককে। তার চোখ লাল হয়ে উঠলো, “ওকে স্পর্শ করার সাহস কি করে হলো?” কণ্ঠটা এত হিংস্র ছিল যে আশেপাশের লোকজনও এক মুহূর্ত থেমে গেল। অপর লোকটা ভয়ে দু’কদম সরে গেল।  
আনজুম আরা বেগম এগিয়ে এলেন। মুখে সেই একই নির্মম হাসি, “এত ভালোবাসা?”
শেহতাজ তাকালো না। তার চোখ শুধু প্রীয়তার দিকে। প্রীয়তার চোখে এখন আর কোন আতঙ্ক নেই। সে শেহতাজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আনজুম আরা বেগম মৃদু হাসলেন, “শেষবারের মতো তোমার বউকে দেখে নাও, শেহতাজ।”
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বাকি সবাইকে নিয়ে হাজির হলো লোকগুলো। প্রীয়তা ওদের দেখে আঁতকে উঠলো। ওকে আর বিশেষ কিছু বোঝাতে হলো না। শেহতাজের চোখে আগুন জ্বলছে, “আপনি ভুলে যাচ্ছেন, আমি খেলা শুরু করলে সব ধ্বংস করতে এক মুহুর্ত ভাববো না।”
আনজুম আরা ঠান্ডা গলায় বললেন, “তোমার ধ্বংসের শিক্ষাটাও আমার। তুমি সম্পূর্ণ শাহরিয়ার শেখের ছায়া শেহতাজ। তোমাকে যে আমেরিকায় ওই বার্ডেন হাউসে পাঠানো হয়েছে সেটাও আমার পরিকল্পনা ছিল। তাইতো তুমি এত সক্ষম হয়েছো। তবে তোমার সক্ষমতা এত দুর্বল কেন? এত কার প্রতি তোমার অন্ধ বিশ্বাস যে তুমি তোমার একটা লোকবল নিয়ে চন্দ্রমহলে আসোনি?”
শেহতাজ প্রীয়তাকে শক্ত করে ধরে বলল, “আমি আছি। ভয় পেয় না।”
আনজুম আরা বেগম সাথে সাথে চোখের ইশারা দিতেই কয়েকজন লোক এগিয়ে প্রীয়তাকে ছাড়িয়ে নিল শেহতাজের থেকে। আর পাঁচ ছয়জন মিলে শেহতাজকে জোর জবরদস্তি করে দরি দিয়ে বেঁধে ফেলল। আনজুম আরা বেগম বললেন, “কিছু সময়ের জন্য তোমাকে বাঁধা থাকা প্রয়োজন।”
এরপর তিনি সোজা মেঘের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, “অসংখ্য ধন্যবাদ মেঘ। তোমার জন্য বারবার সব রহস্য সমাধান সম্ভব হয়েছে। তোমাকে ছাড়া না রুশ পাওয়া হত, আর না চৌধুরীদের গুপ্তধন। আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। বিশ্বাস করো আমার তোমাকে প্রয়োজন। কিন্তু ঝামেলাটা এখানেই, আমি আজ সব ধ্বংস করে দেবো। কোন পিছুটান কিংবা একটা সামান্য ছুটও রাখবো না। আমার বছরের পর বছর ধরে সাধনার দিন আজকে।”
মেঘের চোখে সামান্যতম ভয় নেই। সে আনজুম আরা বেগমের চোখে চোখ রেখে বলল, “আমি নারীদের মায়ের চোখে দেখি। কিন্তু আপনাকে কোন চোখে দেখবো বুঝতে পারছি না। এত হিংস্র কোন নারী হতে পারে তা আমার জানা ছিল না।”
“আমাকে হিংস্র তৈরি করা হয়েছে। আমি হই নি।”
মেঘ চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইল শুধু আনজুম আরার দিকে। তিনি অবশ্য বেশ অবাক হলেন মেঘের এই নজরে। “তোমার মৃ ত্যু র ভয় নেই? এত দৃঢ়তা?”
“আমার মৃ ত্যু যদি আজ এখানে লেখা থাকে আমি মরবোই। তা বলে আপনার মত গিরগিটিকে ভয় পেয়ে নিজের অসম্মান করতে নারাজ আমি।”
কথাটা যেন আনজুম আরার খুব লাগলো। উনি পেছনের লোকটাকে ইশারা করতেই লোকটা সজরে মেঘকে আঘাত করল। মেঘ হাঁটু ভেঙ্গে মাটিতে বসে পড়ল। ইমরান গর্জে উঠলো, “কি মনে করছেন আমাদের মেরে ফেলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে? এত কাঁচা খেলারি মনে করেছেন আমাদের?” 
আনজুম আরা এবার ইমরানের দিকে তাকিয়ে ওর গালে হাত দিয়ে বললেন, “বোকা ছেলে। কত বড় সুযোগ দিয়েছিল শাহরিয়ার তোমায় বলো? বোকার মত বন্ধু বন্ধু করে আজ আমার সামনে গিরগিরাচ্ছ।”
“ওই সুযোগ আমি জুতোয় পিষে দেই।”
আনজুম আরা বেগম বন্দুক তাক করলেন সোজা মেঘের মাথায়। প্রীয়তা সমগ্র ঘটনার বিস্তারিত জানেনা। তাই সে ধরে নিয়েছে মেঘ আর রুশার বিয়ের জন্যই এতসব ঘটনা ঘটছে এখানে।
প্রীয়তা কেঁদে উঠলো, “প্লিজ আপনি ওদের মারবেন না। এসব যা কিছু হয়েছে সব আমার কারণে হয়েছে। ওদের কোন দোষ নেই। আমি শেহতাজকে জোর করে ছিলাম। আমি আমি বলেছিলাম আমি ওর কাছে আজীবন বন্দি থাকতে প্রস্তুত। শুধু রুশা আর মেঘের বিয়ে দিয়ে দিক। আমি দোষী। আপনি আমাকে মেরে ফেলুন, ওদেরকে ছেড়ে দিন।”
আনজুম আরা বেগম ওদিকে ফিরেও তাকালেন না। কিন্তু উপস্থিত বাকি মানুষদের সামনে একটা চরম সত্য প্রকাশ পেয়ে গেল। মেঘ, ইমরান আর অরুপ একে অপরের মুখে একবার চেয়ে নিলো। আনজুম আরা বেগম ঘড়ির দিকে তাকাতে লাগলেন। 
ঠিক তখনই হলঘরের বাইরে আরও কয়েকটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল। একসাথে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। নতুন করে আরও লোক ঢুকলো। এরা আগের নিরাপত্তাকর্মী নয়। এদের চোখে অন্যরকম নিষ্ঠুরতা। আনজুম আরা বললেন, “এবার শেষ কাজটা হয়ে যাক।”
এটুকু বলতেই লোক গুলো আজ্ঞা পালনকারী মানুষের মত ওদের টেনে নিতে লাগলো। শেহতাজের মুখের রঙ বদলে গেল, “আপনি ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
আনজুম আরা বেগম কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু হাসলেন। এরপর নিরাপত্তা কর্মীকে বললেন, “শেহতাজকেও নিয়ে চলো। যা হোক ওর চোখের সামনে হোক। আমার সব জায়গায় গোপনীয়তা পছন্দ নয়।”
একে একে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো চন্দ্রমহলের পশ্চিম পাশের পুরোনো অংশে। যে অংশ বহু বছর ধরে বন্ধ। দেয়ালে শ্যাওলা, মেঝেতে জমে থাকা ধুলো, বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। এটা কাল কুঠুরি। কালকুঠুরির দরজা খুলতেই একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো। মৃ ত্যু র মতো ঠান্ডা। আনজুম আরা বেগম বললেন, “আমি তোমাদের মৃ ত্যু দেয়ার মত নিষ্ঠুর নই। ভেতরে তোমাদের জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা আছে। আরামে উপারে চলে যাবে।”
ঠিক তখনই একজন নার্স ওদের সামনে পড়ে যেতে আঁতকে উঠলো। শাহরিয়ার শেখ অব্দি তাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। মহলের এমন জনমানবহীন পেছনের কাল কুঠুরিতে নার্স? একজন লোক তাকে টেনে ধরলো। সন্দেহ সকলের হলো তবে ব্যখ্যা নেই। আনজুম আরা এগিয়ে এসে তাকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তার মাথায় বন্দুকের ঠান্ডা স্পর্শ পড়লো। উপস্থিত সবাই অবাক চোখে থাকে বলল। রুবাই বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে তার মায়ের পিছে। তার হাত কাঁপছে। তাও গলায় কঠোরতা, “আমার বাবা, ভাই আর বন্ধুদেরকে ছেড়ে দিন। অনেক খেলেছেন আর কত?”
আনজুম আরা বেগম ইশারায় কিছু বলার আগেই রুবাই আরো ঠেসে ধরলো বন্দুকটা। “আমি কিন্তু স্যুট করে দেবো। আপনি জানেন শেখরা হিংস্র। আমি আমার হিংস্রতা দেখাতে আপনাকে দুই মিনিট ভাববো না।”
আনজুম আরা বেগম হাত উঁচু করে তুলে ধরে বললেন, “আমার খুব ভালো লাগছে তোমাকে এখানে দেখে রুবাই। শেখ বাড়ির ইঁদুরের চিকচিক আনএক্সপেক্টেড।”
“ইঁদুরের কামড়ও কিন্তু বিষাক্ত হয়। আর কত খেলবেন আপনি?” 
রুবাই আজ নিজের সব ভয় অক্ষমতা জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে। আনজুম আরা বেগম বললেন, “ঘটনার এই অংশে তোমার এখানে উপস্থিতি জরুরি ছিল। কিন্তু বন্দুকসহ আশা করিনি।”
“আপনি তো আরো কত কিছুই আশা করেননি। এখনো বলছি ছেড়ে দিন সবাইকে আপনার লোকদেরকে পিছু হাটতে বলুন নাহলে কিন্তু আমি সত্যি আপনাকে গুলি করে দেবো।”
আনজুম আরা বেগম সামান্য হেসে পিছু ফিরেই রুবাইয়ের নরম হাতটা ঠিক সে ধরলেন। “আমি তোমায় জন্ম না দিতে পারি বড় করেছি। আমি জানিনা তোমার সক্ষমতার অক্ষমতা কতটুকু? এই নরম হাতে বন্দুক ধরেছো? আমি তোমায় হাওয়ায় মিঠাই বানিয়েছি এসব তোমার কর্ম নয়।”
এটুকু বলেই রুবাইয়ের হাত থেকে বন্দুকটা ছিনিয়ে নিয়ে ঠাসিয়ে একটা থাপ্পর লাগালেন রুবাইয়ের মুখে। রুবাই বেগ সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে গেল। আনজুম আরা বেগম হেসে বললেন, “খুব লেগেছে তাই না? আমি আজ মৃ ত্যু র ফরমান নিয়ে এসেছি। আর তোমাকে তোমার মৃ ত্যু এখানে নিয়ে এসেছে রুবাই।”
রুবাই উঠে দাঁড়ানোর আগেই এক বন্দুকধারী তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ধরলো। আনজুম আরা বেগম বললেন, “তোমার মত ইঁদুরের বাচ্চা, বুঝলো কিভাবে এত ঘটনা? একটু ঝেড়ে কাশো তো। তোমার দায়িত্ব নিজের মৃ ত্যু র আগে নিজের সমস্ত রহস্য ভেঙে যাওয়া।”
রুবাই বলল, “জানিনা মৃ ত্যু আজ কার কপালে লেখা আছে। তবে সারা জীবন আপনি আমাকে যেই বুলি মুখস্থ করিয়েছেন। আমার বাবা, আমার ভাই সবাই খারাপ হিংস্র, সেই বুলি থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি। আমার বাবা যখন আমাকে কাল কুঠুরিতে বন্ধ করে দেয়, সেদিন রাতেই আবার তিনি নিজ হাতে কাল কুঠুরির দরজা খুলে দেন। কোথায় মা? একটাবার গিয়ে তো খোঁজ নেননি আমার। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়েছি। যেখানে আমি রুশাকে একটা ওষুধের চার ভাগের এক ভাগও শুধু দেইনি, সেখানে কি করে একটা মেয়ে লাগাতার এত অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল? বারবার ওষুধের ডোজ গুলো আপনি বাড়াচ্ছিলেন তাই না মা? আপনি রুশার শরীরে এমন বি ষ ক্রি য়া তৈরি করতে চাচ্ছিলেন, যাতে রুশা এই ওষুধের ডোজে মারা যায়। আর সব দায় আমার। একটা একটা করে সব পথের কাঁটা সরাচ্ছিলেন আপনি। সেদিন রুশার বিয়ের দিন আমি যখন রুশাকে রূপ মহল থেকে বাইরে বেরিয়ে যায়। আপনি তো ছিলেন যে সবকিছু জানান সবাইকে? ইমরানের গাড়ি কোথায় গিয়েছিল সেই ট্রেসিং মেশিন তো আপনি লাগিয়ে ছিলেন? আর সেটাই তো স্টাফ দিয়ে জানিয়েছিলেন বাবাকে। এসব খণ্ড ঘটনা বাকি সবাই এড়ালেও আমি কিন্তু এড়াইনি।”
নাটকীয় অবস্থা আরো চলল। আনজুম আরা বেগম বললেন, “রুপ মহলের ইঁদুর তবে বেড়ালের খোঁজ জানতো। আরে বন্দুকটা কোথায় পেলে। নিশ্চিত শেহতাজের স্টাডি রুম থেকে চুরি করেছো?”
“এসব চুরি করা আপনার কাজ। আমি আমার ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়েছি।”
“তবে তোমাকে এই বন্দুক দিয়েই মারা হোক।” এটুকু বলেই আনজুম আরা বেগম রুবাইয়ের দিকে বন্দুক তাক করলেন।
পরিস্থিতি ঠিক এমন ভাবে এসে দাঁড়ালো যে কোনোভাবেই কোন কিছু টলানো যাবে না আর। আনজুম আরা বেগমের আকর্ষণ নিজের দিকে টেনে নিতে মেঘ উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে পড়লো। মেঘের হাত বাঁধা, মাথায় বন্দুক তাক করা। তাতেও তার হেলদোল নেই। সে হেসেই গেলো। কিছু সময় পর বলল, “মিসেস আনজুম আরা বেগম, আমি আশিয়ান আহমেদ মেঘ। এই কালকেউটের গুহায় এসেছি কোন রকম প্রটেকশন ছাড়া? এত বোকামি কি আমার সাথে যায়?” মেঘ আকাশের দিকে ইশারা করে বলল, “উপরে দেখুন।” 
আকাশে তিন চারটে ড্রোন উড়ছে। এখানে যা কিছু হচ্ছে তা যে পরিষ্কার লাইভ রেকোর্ড হচ্ছে তা স্পষ্ট বোঝা গেল। সাথে সাথেই উপরে হেলিকাপ্টার এসে চক্কর দিল একটা। একই সময় সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো একেরপর এক পুলিশের গাড়ি। আনজুম আরা বেগম থেমে গেলেন। তার লোকজন একে অপরের দিকে তাকালো। সাথে সাথেই চেঁচিয়ে উঠলো একবার অফিসার, “কেউ নড়বেন না!”
“পুলিশ!”
চন্দ্রমহলের চারপাশ মুহূর্তের মধ্যে পুলিশে ঘিরে গেল। বন্দুক তাক করা অফিসাররা একে একে ভেতরে ঢুকতে লাগলো। সবার সামনে পারভেজ সওদাগর। শাহরিয়ার শেখের মুখে ফুটে উঠলো। 
“পারভেজ?”
পারভেজ সওদাগর হাতকড়া ঝুলিয়ে আনজুম আরা বেগমকে বললেন, “আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে আনজুম আরা বেগম।”
ছড়িয়ে গেল পুলিশ, দড়ি খুলে দিল উপস্থিত সকলের। তল্লাশি চলল চন্দ্রমহল জুড়ে। অসংখ্য অস্ত্র, গোপন কক্ষ, বন্দি মানুষ আরো মিলল অসংখ্য কিছু। প্রীয়তা ছুটে তার বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। রুবাইকে জড়িয়ে ধরলেন শাহরিয়ার শেখ। 
ঘটনার শুরুটা আসলে অন্য জায়গায়। অরূপ কোনোদিন পুরোপুরি শেহতাজকে বিশ্বাস করতে পারেনি। শেহতাজ কি সত্যিই নিজের বাবার বিরুদ্ধে যাবে? নাকি এটা আরও বড় কোনো খেলা? সেই সন্দেহ থেকেই সে মেঘকে ধরে বেঁধে নিয়ে গোপনে পারভেজ সওদাগরের সাথে দেখা করেছিল। সবকিছু খুলে বলেছিল। চন্দ্রমহল, রুশের রহস্য, শেহতাজের পরিকল্পনা। প্রথমে পারভেজও দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু এত বড় সুযোগ মিস তো করা যায় না। ড্রোন ক্যামেরায় সমগ্র পরিস্থিতি দেখেই তিনি ভেতরে এসে হাজির হন।
আনজুম আরা বেগম চেঁচিয়ে উঠলেন, “মাত্র ৫ মিনিট লাগবে আমার ওই জেল থেকে বের হতে। আমার সাথে শত্রুতা পোষাবে না আপনার।”
শাহরিয়ার শেখ রুক্ষ গলায় বললেন, “তোমাকে কি করে ফাঁসির দড়ি অব্দি নিতে হয় সেটাও আমি দেখে নেব।”
সাথে সাথে একজন অফিসার ছুটে এসে বললেন, “স্যার নিচের ওই কক্ষে কেউ একজন আছেন। একটু আসুন।”
শাহরিয়ার শেখ অস্থির হয়ে বললেন, “কেউ নেই ওখানে। কেউ না।”
উপস্থিত সকলের কৌতুহল এবার আকাশ ছুঁলো। সকলেই এগিয়ে গেল। ভাঙাচোরা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেরিয়েই পুরোনো মহল। এটা বোধহয় জমিদারদের কোন বিশ্রামাগার কিংবা অন্য কোন কাজে ব্যবহার হতো। পুরোনো দরজা সরতেই ভেতরে চকচকে কক্ষ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কক্ষ। রাজকিয় বিছানায় শুয়ে আছে পঞ্চাশোর্ধ একজন নারী। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে দুজন নার্স। এখানের খেলাটাই যেন সকলের কল্পনার বাহিরে। এত সুরক্ষিত যত্নে এই নারীকে রাখা হয়েছে। পুলিশদের ঠেলে শেহতাজ এগোতেই থমকে গেল। সে একপ্রকার ছুটে গেল, “মম… আর ইউ এলাইভ!!!”
এই একটা বাক্য পুরো পরিস্থিতি বদলে দিলো। মেঘ, অরুপ, ইমরান একে অপরের মুখে তাকালো। “ইলিয়ানা ডিসুজা?”
সকলেই এগিয়ে গেল। ভাঙাচোরা স্যাঁতস্যাঁতে জায়গা পেরিয়েই পুরোনো মহল। এটা বোধহয় জমিদারদের কোন বিশ্রামাগার কিংবা অন্য কোন কাজে ব্যবহার হতো। পুরোনো দরজা সরতেই ভেতরে চকচকে কক্ষ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। রাজকিয় বিছানায় শুয়ে আছেন পঞ্চাশোর্ধ একজন নারী। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে দুজন নার্স। এখানের খেলাটাই যেন সকলের কল্পনার বাহিরে। খুব সুরক্ষিত যত্নে এই নারীকে রাখা হয়েছে। পুলিশদের ঠেলে শেহতাজ এগোতেই থমকে গেল। সে একপ্রকার ছুটে গেল, “মম… আর ইউ এলাইভ!!!”
এই একটা বাক্য পুরো পরিস্থিতি বদলে দিলো। মেঘ, অরুপ, ইমরান একে অপরের মুখে তাকালো। “ইলিয়ানা ডিসুজা?”
রুবাই আর আনজুম আরা বেগমের মুখের রং ও বদলে গেল। শাহরিয়ার শেখ ঠান্ডা স্বরে বললেন, “আমাকে যেখানে ইচ্ছে নিয়ে চলো। ওকে কেউ বিরক্ত করবে না।”
নার্স ভিত গলায় বলল, “অনুগ্রহ পূর্বক আপনারা এখানে ভীড় করবেন না। রোগির সমস্যা হবে।”
আনজুম আরা বেগম ঘৃণার দৃষ্টি ফেলে বললেন, “এই তোমার সাত রাজার ধন! যার জন্য এত সিকিউরিটি এই মহলে?”
শাহরিয়ার শেখ চেঁচিয়ে বললেন, “বেরিয়ে যাও এখান থেকে।”
অফিসাররা আনজুম আরা বেগমকে নিয়ে একে একে সকলেই বেরিয়ে পড়লো। শেহতাজ নিজের মায়ের কপালে একটা চুমু খেলো। সে ঠিক কত যুগ পর এই মুখটা দেখছে তার জানা নেই। এই মানুষটাকে বছরের পর বছর সে মৃ ত জেনে এসেছে। সকলে বেরিয়ে যেতে শেহতাজও বেরিয়ে এলো। সে এগিয়ে তার বাবার কলার চেপে ধরে বলল, “এত জঘন্য আপনি? আমার মম এখানে কি করছে মিস্টার শাহরিয়ার শেখ?”
শাহরিয়ার শেখ নিজের কলার থেকে শেহতাজের হাত সরিয়ে চেঁচিয়ে বললেন,‌ “আমার সাথে গলা নামিয়ে শেহতাজ।”
“আমার মম এখানে কি করছেন? আর কত মিথ্যে বলবেন আপনি? আর কাকে কাকে বলবেন?”
শাহরিয়ার শেখ চোখে চোখ রেখে বললেন, “তোমার মম এখানে ভালো আছে।”
অফিসার পারভেজ সওদাগর এগিয়ে এসে বললেন, “এবার বিস্তারিত বলেই ফেলুন। আর কত?”
শাহরিয়ার শেখ শরীর ছেড়ে বসে পড়লেন মহলের সিঁড়িতে। এরপর ধীর গলায় শুরু করলেন, “আমি ইলিয়ানাকে ভালোবাসি। ও এখানে বন্দি নয়। এটাই আমাদের সংসার…
কলেজের সবথেকে সুন্দর নীল চোখের মেয়ে। সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে ভালোবেসে ছিলাম আমরা। আব্বা মানেন নি। কোন ব্রিটিশ, খ্রিস্টান মেয়ে অন্তত শেখ বংশের বউ হতে পারে না। একই সাথে ইলিয়ানার বাবাও মানলেন না। জোরজবরদস্তি করে নিয়ে গেলেন ইলিয়ানাকে ইউকে তে। বাবা নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে আনজুমের সাথে বিয়ে দিলেন। সংসারের বদলে ছন্নছাড়া হলাম। এরপর আনজুম অন্তঃসত্ত্বা হল। পরীক্ষা নিরীক্ষায় ধরা পড়লো সন্তান অস্বাভাবিক। যাকে বলে এবনর্মাল। আব্বা পাগল হয়ে উঠলেন। শেখদের ঘরে পাগল ছেলে জন্মাবে। অসম্ভব। ডাক্তার কবিরাজ সব করা হলো তবে লাভ নেই। ডাক্তারি রিপোর্ট বদলালো না। আব্বা উঠে পড়ে লাগলেন বাচ্চা নষ্ট করতে। কিন্তু আনজুমের বয়স কম। এটা করা অসম্ভব। এরপর ধুপ করে আব্বা শান্ত হয়ে গেলেন। আমি ভাবলাম আব্বা মেনে নিয়েছেন। আমি তখন যা কিছু হয়, সব সই। বি ষা ক্ত জীবন চলছে। 
সন্তান জন্মের পর আনজুম মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি হারালো। এত অসুস্থতায় ৩ দিনের মাথায় আব্বা আনজুমকে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। আমি ভেবেছিলাম হয়তো আনজুমের সাথে বাচ্চার চিকিৎসাও করাতে চান। আমার এতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু ওখানে গিয়ে আমি থমকে যাই। আব্বা সব জানতেন। ইলিয়ানা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। সে যে একটা সন্তান জন্ম দিয়েছে এসব আব্বা লুকিয়ে গেছেন। কি দারুন প্লানিং করে একই নামে আকিকা দেন আনজুমের সন্তানেরও। একটা নাম দুটো বাচ্চা। 
আমি কিছুই জানতাম না। আব্বা ইলিয়ানার বাবার থেকে শেহতাজকে নিয়ে আসে। তখন ও মাত্র নয় মাসের একটা ছোট বাচ্চা। আমার কোলে আসতেই আমি থমকে যাই। ইলিয়ানার এক টুকরো অংশ। সব খেলা আব্বা খেলেছেন। তিনি আগে থেকেই শেহতাজকে আনবেন বলেই আনজুমের ছেলের নামও একই নামে রাখেন। জন্মনিবন্ধন থেকে সব বিস্তারিত এক। 
ইউকেতেই বাচ্চা বদল হয়। আনজুমের ছেলেকে বদলে শেহতাজকে দেশে আনা হয়। আনজুমের ছেলের নামকরন শেহরাজ করা হয়। শেহরাজকে পাঠানো হয় নীলসনে। ওটা ইউকের একটা চিকিৎসা কেন্দ্র। যেখানে অস্বাভাবিক বাচ্চাদের চিকিৎসা করে সুস্থ করা হয়। কিন্তু সকল পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা যায় রাজ একেবারে সুস্থ। কিন্তু ততদিনে জল অনেক দূরে গড়িয়ে গেছে। তাই রাজকে বোর্ডিং এ পাঠাই। ও আমার সন্তান আমি ওকে ফেলতে পারি না।
আনজুম সামান্য সুস্থ হলেই পাগল হয়ে ওঠে। ওকে জানানো হয় ওর সন্তান মারা গেছে। তা ছাড়া আর কোন উপায় তো ছিল না। বাইরের মানুষেরা যাতে না জানে তাই একটা অন্য বাচ্চাকে তার কোলে দেওয়া হয়েছে। আমিও অবশ্য পরে সকল শেহতাজের সকল পরিচয় আনজুমের কাছে স্বীকার করে নেই। তবে এতে আনজুম ভাবে রাজকে আমরা মেরে ফেলেছি। আব্বা ব্যপারটা অদ্ভুত ভাবে সামলে নেন অবশ্য। 
ঠিক ১ বছর পর। আমরা দেশে ফিরি। ইউকেতেই এক বছর আমি অনেক চেষ্টা করেছি ইলিয়ানাকে একটা বার দেখার। কিন্তু নিয়তি…”
পারভেজ সওদাগর প্রশ্ন ছুঁড়লেন। “কেউ সন্দেহ করেনি? বয়সের তুলনায় বড় বাচ্চা ছোট বাচ্চার সাথে কিভাবে?”
“সন্দেহ করবে কে? মহলের থেকে শেহতাজকে বের করাই হত না। আর মাত্র ৯ মাসের ভেদাভেদ কেউ সেভাবে খুঁটিয়ে দেখেই নি। এরপর হামজা বিয়ে করে শিশিরকে আনলো। তার কাছেই থাকত শেহতাজ। শিশির ওকে মায়ের মত যত্ন করতো। যত অবহেলা আনজুম করত তার থেকে হাজার গুণ বেশি ভালোবাসত হামজা আর শিশির। আমিও খুশি, শেহতাজও খুশি। আমিও চাইতাম সেটা শিশিরের কাছেই থাকুক। ছোট মা, ছোট মা বলে সারাদিন ওরা চলে খেলে বেড়াতো।”
শাহরিয়ার শেখ একটু থামলেন তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, “অনেকদিন পর জানতে পারি ইলিয়ানার বাবা ওকে জোর করে অন্যত্র বিয়ে দিয়েছে। অনেক গুলো বছর চলে যায়। এভাবেই। এরপর অনেক গুলো ঘটনা। আব্বা মা রা যান, হামজা আর শিশির খু ন হয়। এরপরেই আমি শেহতাজকে আমিরিকায় পাঠিয়ে দেয়। আমি চেয়েছি ও যেন ঠিক ততোটা সক্ষম হয় যে ওকে কেউ না ভাঙতে পারে। ও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিক সব। আমি শেহতাজকে ধ্বংস বানাতে চেয়েছি।
কিন্তু সেখানেই আবার ইলিয়ানা ফেরত আসে আমার জীবনে। ইলিয়ানা রোজ শেহতাজের সাথে দেখা করতে আসতো ওর বোর্ড হাউজে। সেখান থেকেই আবার আমাদের পথচলা। আমরা বিয়ে করি। ওকে আমি চন্দ্রমহলে আনি। কিন্তু বেশিদিন সে সব চলেনি। ব্রেন স্ট্রোক। ফুল প্যারালাইজড হয়ে যায় ইলিয়ানা।”
শেহতাজ এবার প্রশ্ন ছুঁড়ল, “তবে আমাকে কেন বলেছিলেন মম মারা গেছেন?”
“তোর পিছুটান কাটতে। আমি তোকে হিংস্র করতে চেয়েছি। রুক্ষতার বীজ তোর ভেতরে দিতে চেয়েছি। আমি তোকে হামজার মত হারাতে চাই নি শেহতাজ। আমি তাই ততটুকু যন্ত্রণা দিতে চেয়েছি যতটা দিলে তুই পাথর হয়ে যাবি।”
মেঘ এই প্রথমবার মুখ খুলল, “কি দরকার ছিল এসব? আপনার বাবা তো ছিলেনই না। এত পরিচয়ের গোপনীয়তা না রেখে বিস্তারিত প্রকাশ বেশি পরিপাটি করতো সব।”
“সব যদি গল্পের মত গোছানো হত, তবে তো এত রহস্য তৈরি করার দরকারই হতো না।‌ আমি নিরুপায় ছিলাম। আনজুম সব জানত। আম্মাও সব জানেন। কিন্তু তিনি কখনোই চাননি রুপমহলের নিয়ম কখনো ভাঙ্গুক। ইলিয়ানা গোপনেই থাক। সবাই সবকিছু জানলেও শুধু কেউ জানত না, ইলিয়ানা কোথায় থাকে।”
“রাজ এখন কোথায় আছে?”
“এখানেই।”
মেঘ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। শাহরিয়ার শেখ বললেন, “আরফি। অরফে শেহরাজ শেখ। আমার আর আনজুমের সন্তান।”
উপস্থিত সকলেই অপ্রত্যাশিত নজরে আরফির দিকে তাকালো। শেহতাজ স্তব্ধ। তার চোখে অবিশ্বাস। এবার যেন সব হিসেব মিলল তার, যে ঠিক কিভাবে তার সব গোপনীয়তা একে একে ফাঁস হতো সবার সামনে। ইমরান অবাক হয়ে বলল, “আরফি? কিন্তু ও তো সম্পূর্ণ সুস্থ!”
“এটাই তো ভাগ্যের সব থেকে বড় খেলা।”
আনজুম আরা বেগম এসব শুনে দু’কদম এগিয়ে এলেন, “ও… ও আমার সন্তান? আমার ছেলে? আমার…?”
আরফি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আনজুম আরা বেগম জড়িয়ে ধরলো আরফিকে। কিন্তু আসি কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ‌ সে কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে? 
মেঘ বলল, “মানে লিগ্যালি শেহরাজের কোন অস্তিত্ব নেই। শেহতাজ দুটো অস্তিত্ব নিয়ে বসে আছে।”
ইমরান এবার প্রশ্ন ছুঁড়ল, “তাহলে রুবাই কে?”
শেহতাজ অবাক চোখে তাকালো। রুবাইয়ের চোখেও অদ্ভুত প্রশ্ন। শাহরিয়ার শেখ বললেন, “রুবাই আমার আর ইলিয়ানার মেয়ে। রুবাইয়ের জন্মের পর পরই ইলিয়ানা ব্রেন স্ট্রোক করে। তখন আমি রুবাইকে রুপমহলে নিয়ে এসে আম্মার কাছে সপে দেই‌। আম্মাই সব সামলান। রুবাই আনজুমকে মা জেনেই বড় হয়। এটা একটা গোপন খোলা সত্যের মত ছিল। জানতেন অনেকেই কিন্তু প্রকাশ করেন নি কেউ।”
উপস্থিত সকলেই স্তব্ধ। রহস্যেরা সবাই মুক্তি নিয়েছে। শেহতাজ শান্ত। আরফি মাথা নিচু করে আছে। এই সমস্ত খেলায় সবথেকে অসহায় চরিত্র কে আরফি নাকি শেহতাজ তা অবশ্য বলা কঠিন। দুজনেই যেন অদ্ভুত যুদ্ধ ক্ষেত্রে বড় হয়েছে। পরিবার থাকতেও না থাকার মতোই তাদের বেড়ে উঠা।
মেঘ এবার প্রশ্ন ছুঁড়ল, “রুশাকে অসুস্থ করে কেন রাখছিলেন? আপনার ভাইয়ের প্রতি যদি আপনার এতই ভালোবাসা থাকে, তবে তার মেয়েকে শুধু সম্পত্তির জন্য ব্যবহার কেন?”
“আমি ওকে সম্পত্তির জন্য ব্যবহার করিনি কখনোই। আমি শুধু চেয়েছি নীলিমা কোনদিনও রূপমহল থেকে না যাক। আমি আমার ভাইয়ের শেষ ওয়াদা পালন করতে চেয়েছি। আমি যে কোন হালে নীলিমার সাথে শেহতাজের বিয়ে দিতে চেয়েছি। আমি চাইনি নীলিমা বিদ্রোহ করুক। আমি ওকে মারতে কিংবা কষ্ট দিতে কিছু করিনি। ওকে যে ঔষধগুলো দেওয়া হচ্ছিল সেগুলো খুব সাময়িক প্রভাবের। আমার ধারনার বাইরে ছিল যে ঔষধ গুলো আনজুম বদলে দিয়েছে।”
মেঘ আর কোন প্রশ্ন করল না। তার জানার মতো অনেক কিছু থাকলেও সে আর কিছুই জানতে চায় না। সে ঠান্ডা গলায় বলল, “মেনে নিন এবার। ধরে নিন না একটা ওয়াদা নাই পূরণ হলো। বিশ্বাস করুন রুশা ভালো আছে, ভালো থাকবে।”
শাহরিয়ার শেখ আর কোন উত্তর করলেন না। পারফেজ সওদাগর শাহরিয়ার শেখের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “চন্দ্রমহলে অবৈধ অ স্ত্র, নকল হীরে সহ আরো অনেক কিছু পাওয়া গেছে। আপনাকেও থানায় যেতে হবে মিস্টার শেখ। এগুলোর ক্লারিফিকেশন দিতে হবে আপনাকে।” 
শাহরিয়ার শেখ কোন রকম বাদ সাধলেন না। বললেন, “চলুন। আমি প্রস্তুত আছি যেতে।”
অফিসাররা শাহরিয়ার শেখ এবং আনজুম আরা বেগমকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। পারভেজ সওদাগর প্রীয়তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “চলো প্রীয়। পাপের খাঁচা ভেঙ্গে গেছে। বাড়ি চলো।”
প্রীয়তা শেহতাজের মুখের দিকে তাকালো। শেহতাজ কোন কথা না বলেই ভেতরে চলে গেল তার মায়ের কাছে। 
আরফি এগিয়ে এসে বলল, “আমি জানি তোমরা আজকের পর থেকে আমাকে আর বিশ্বাস করবে না। পরিচয় পেয়ে আমি আমার বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছি, বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। তবে প্রীয়তা তাজ আজ যেমন ওকে ঠিক তেমন তৈরি করা হয়েছে। আমি তো ছোট থেকে বড় হয়েছি হোস্টেলে। যেখানে হাজারটা বাচ্চা বড় হয়। পড়াশোনা হয়, খেলাধুলা হয়। জীবনটা পরিবার ছাড়াও সুন্দর হয়। তবে তাজ বড় হয়েছে মাফিয়াদের কাছে। অ স্ত্র আর খু নে র সাথে। ওর হাতে কলমের আগে ব ন্দু ক তুলে দেয়া হয়েছে। বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। স্বপ্ন দেখাতেন একদিন বাড়ি ফিরবো আমি। তবে শেহতাজ জানতো ওকে ওই অ স্ত্রে র সাথেই থাকতে হবে। বাড়িতে গেলে ওর মা অপেক্ষা করছে না। ওকে কেউ আদর করার মত নেই আর। ওকে সবাই হিংস্র হতে ফেলে গেছে। ওর যখন ১১ কিংবা ১২ বছর বয়স, তখন থেকেই তাজ জানতো ওর মা অন্য কেউ। যিনি মারা গেছেন। 
অনুরোধ করছি। প্রীয়তা আজ অন্ততঃ যেও না। এত গুলো বিশ্বাসঘাতকতা একসাথে নিতে পারবে না তাজ।”
মেঘ আরফিকে দেখলো। এই মানুষটার চোখে শেহতাজের জন্য ভালোবাসা। সত্য মিথ্যা সব যেন একই দাগে এসে থেমেছে। এখানে সব সম্ভব। তবে প্রীয়তার চোখে টানাপোড়েন। শুধুই কি টানাপোড়েন নাকি সদ্য জন্মানো নামহীন অনুভূতি? মায়া নাকি অভ্যাস? প্রীয়তা মৃদু স্বরে তার বাবাকে বলল, “আব্বু কাল বাড়ি ফিরি। আজ আরেকটা দিন বন্দিই থাকি। হুট করে স্বাধীনতা ঠিক হজম হবে না। মাফ করে দাও।” এটুকু বলেই প্রীয়তা এগিয়ে গেল ঘরটার ভেতরে। আর কাউকে কিছু বলতে দিলনা যেন ইচ্ছে করেই।
অরুপ আটকাতে গেলেই মেঘ বাঁধা দিয়ে বলল, “ফিরে চল। তিন কবুলের অনেক শক্তি অরুপ। এখানে তোর কিছু নেই। কেউ নেই।”
অরুপ থেমে গেলে। সামান্য মৃদু হেসে বলল, “সত্যিই কেউ নেই।”
চন্দ্রমহল এখন অদ্ভুত নীরব। এই ভঙ্গুর দেয়ালেই এত বছর ধরে লুকিয়ে ছিল অসংখ্য মিথ্যা, পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়েছিল কতগুলো জীবন, সেই ঘরেই আজ প্রথমবার কোনো মুখোশ নেই। শুধু একজন ছেলে তার মায়ের পাশে বসে আছে তাকে শক্ত করে ধরে। 
শেহতাজের চোখে কোনো রাগ নেই, নেই সেই কঠিন শীতলতা। যেন বছরের পর বছর জমে থাকা অভিমান, প্রশ্ন আর যন্ত্রণার পাহাড়টা হঠাৎ করে ভেঙে পড়েছে। সে ছোটবেলায় কতবার ভেবেছে, তার মা তাকে কেন ফেলে চলে গেল? কেন পৃথিবীর সবাই তাকে ছেড়ে গেল? আজ সব প্রশ্নের উত্তর সামনে। কিন্তু উত্তরগুলো প্রচন্ড রুক্ষ।
ঠিক তখন দরজার কাছে কারো উপস্থিতি টের পেল শেহতাজ। কিন্তু সে ফিরে তাকালো না। প্রীয়তা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শেহতাজের কাঁধে হাত রাখলো। শেহতাজ আচমকা স্থির হয়ে ফিরে তাকালো। এই প্রথম। এই প্রথম প্রীয়তা নিজের ইচ্ছায় তাকে ছুঁলো। কিছুক্ষণ দুজনের চোখে চোখ আটকে রইলো। কেউ কোনো কথা বলল না।‌ নিরবতা শেহতাজ ভাঙ্গলো, “তুমি যাওনি?”
“আপনি কি যেতে বলেছেন?”
শেহতাজ চুপ করে তাকিয়ে রইলো। ঠিক বোঝার চেষ্টা করলো মেয়েটাকে। তারপর বলল, “তুমি চাইলেই যেতে পারো।”
“উড়তে ভুলে গিয়েছি বোধহয়। তাই আরেকটু বন্দি থাকতে চাইছি‌।”
“আজ থেকে গেলে আর যাওয়া হবে না তোমার প্রিয়। এখনো সময় আছে।”
প্রীয়তা অবাক চোখে দেখলো শেহতাজের চোখ। রহস্যময় চোখে এ‌ কি আবেগ? সে হাত সরিয়ে বলল, “আপনার কাছে বন্দী থাকার চুক্তি করেছিলাম। আমি বিশ্বাসঘাতক নই। বিশ্বাস করতেই পারেন। ভাববেন না। জোর করে থাকতে আসি নি। আপনি বললেই চলে যাবো তবে আজ নয়।”
“যদি কখনো যেতে না বলি?”
“থেকেও যেতে পারি আবার না-ও। ঠিক বলা যাচ্ছে না এখনই।”
শেহতাজ দীর্ঘ সময় পর বিষন্ন হাসলো। 
ওদিকে রুবাই সরাসরি মেঘের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোর করে বলল, “আমাকে মাফ করে দাও। আমি জানি তোমাকে আর বিশ্বাস করাতে পারবো না। কিন্তু আমি কখনো রুশার ক্ষতি চাই নি। আমি মুক্তির লোভে পড়ে গিয়েছিলাম। স্বার্থপর হয়ে উঠেছিলাম। হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়েছিল। আমি জানি না এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত ঠিক কিভাবে হবে। তবে তুমি আমাকে মাফ করে দাও।”
ইমরান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “কি সুন্দর পার্থক্য তোমার আর প্রীয়তার মাঝে দেখেছো? প্রীয়তা নিজেকে বন্দি করে রুশাকে মুক্তি দিয়েছে। আর তুমি নিজের মুক্তির লোভে রুশাকে বন্দি করতে চেয়েছো।”
মেঘ ইমরানকে থামিয়ে বলল, “তোরা পাগল? যা হয়ে গেছে চলে গেছে। পরিস্থিতি আমাদেরকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়। রুবাই ক্ষতি চায় নি। হয়তো সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে পারে নি। তাছাড়া ওর কাছে করারই বা কি ছিল? তাছাড়া দিন শেষে ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার থেকে বড় আর কিছুই নেই। কিছু মানুষ তো ভুলের পর ভুল করেও তা অনুভব অব্দি করতে পারে না।”
রুবাই নিজের চোখের পানি মুছে বলল, “আমি জানি ভুল হয়েছে। করেছি। এটা ঠিক ভুল নয় পাপ। তবে আমি স্বজ্ঞানে কিছু করি নি। আর কারো ক্ষতির উদ্দেশ্যে।”
অরুপ এগিয়ে এসে বলল, “রুবাই কাদিস না। আমারও কান্না পেয়ে যাবে। সদ্য আরেকবার ক্ষতবিক্ষত আমি। কান্নার বাহানা চাইছি। তুই অন্তত দিস না।”
রুবাই চোখের পানি দুহাতে মুছে বলল, “অরুপ, আমি এখন বিশ্বাস করি, এক জীবনে সবকিছু পেতে নেই। জীবনে কিছু আফসোস জমিয়ে রাখতে হয়।”
অরুপ হেসে বলল, “কিসের আফসোস? না পাওয়ার? রুবাই আমি প্রীয়তাকে ঠিক এতটা ভালোবাসি, যতটা তোর ভাই এই সমগ্র জীবন দিয়েও পারবে না। আমার ভালোবাসা কোন প্রাপ্তির মোহরা নয়। পেয়ে গেলে হয়তো জীবনটা অন্যরকম হত। এখন অন্যরকম হবে। তবে ব্যক্তিগত নারীর জায়গা বদলাবে না।”
রুবাইয়ের চোখের রঙ বদলালো এবার। অরুপের এই সামান্য শব্দচয়ন যেন উপস্থিত সব গুলো মানুষের পরিনত ভাবনায় এক তীক্ষ্ণ প্রভাব ফেলল। রুবাই মৃদু হাসি মুখে লেপ্টে নিয়ে বলল, “এক পৃথিবী সুখ তোমার হোক।”
এটুকু বলেই রুবাই পিছু হাঁটল। ইমরানের চোখে একবারও চোখ রাখলো না। তার এই সাহস নেই। কয়েক কদম সরে যেতেই ইমরান চেঁচিয়ে বলল, “স্বার্থপর মানুষ। চোখ মেলানোর সাহস নেই তবে এত সাহসের কাজ করো কিভাবে?”
রুবাই থেমে গেলো। ইমরান আবার বলল, “আমাকে ভালোবেসে পাপ পুণ্য বেচে খেলে। এখন আমার সাথেই কথা নাই?”
মেঘ ইমরানকে থামাতে চাইলে ইমরান মেঘকে থামিয়ে আবার বলল, “আমার সাথে রাস্তায় থাকতে পারবে? যদি পারো তবে চলো। আর না পারলে এটাই শেষ দেখা।”
রুবাই এক ঝটকায় ফিরে তাকালো। মেঘ আর অরুপ একে অপরের দিকে তাকালো। ইমরানের এটা হটকারী সিদ্ধান্ত। তবুও তাদের কোন শব্দ নেই। ইমরান বলে চলল, “যদি আজ আমার সাথে যাও তবে এক কাপড়ে যাবে। এই মহলের অভিজাত, স্বার্থপরতা, অর্থ, আরাম আয়েশ সব এখানেই ফেলে।”
রুবাই বাচ্চাদের মতো চোখ মুখ ভেটকিয়ে কেঁদে উঠলো। ইমরান হাসি আটকে বলল, “প্লিজ কেঁদো না। তুমি কাঁদলে আশেপাশের মানুষ ভয় পেয়ে যাবে।”
রুবাই সাথে সাথে কান্না থামিয়ে বলল, “আমি তোমার সাথে রাস্তায় কেন শুধু? খাল, বিল, পুকুর, ঝর্না সব কিছুতে থাকতে রাজি আছি।”
“আহা। মন খুশি করে দিলে। চলে এসো। চলো যাই। আর এখানে থেকে কাজ নেই।”
“কোথায় যাবো?”
“এখন মেঘের বিয়েতে। তারপর আমাদের বিয়েটা সেট করতে। চলো।”
রুবাই আজ কারো অনুমতি নিল না। কোন বাধা কিংবা জানানো নয়। এগিয়ে চলল শুধু ইমরানের হাতটা ধরে। ওরা সকলেই পৌঁছালো বাগান বাড়িতে। বিয়ের আয়োজন পরিপূর্ণ চলছে। মেঘের অনুপস্থিতি সামলাতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা রৌদ্দুর আর রাফির। মেঘ কোন রকম পরিস্থিতিকে সামলে তৈরি হয়ে নিল। দিনের রহস্য, হাজারটা ঘটনা সব ফেলে আজ শুধু পূর্ণতা। রুশা তার সামনে এসে দাঁড়ালো টকটকে লাল ভারি শাড়িতে। পরিপূর্ণ নবনধূ। গা ভত্তি গহনা। মুখে সাজের পরোত পড়েছে তবে তাতে বাড়াবাড়ি নেই। মুখে নরম লাজুক হাসি। রুশার চোখে চোখ পরতেই মেঘ বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে নাটকিয় ভঙ্গিতে হেলে পড়লো। ইমরান আর অরুপ সামলে ধরলো তাকে। এই মিষ্টি নাটকিয়তায় সকলেই হেসে উঠলো। রুশা লজ্জায় আরো লাল হয়ে উঠলো। আজ তাদের অপেক্ষার কিছু নেই। কোন ভয় কিংবা লোক দেখানো কিছু নেই। তাদের প্রেম শুধু পূর্ণতায় দাঁড়ানো। এত রহস্য, মৃত্যু, প্রতারণার পরেও তারা জিতে গেছে। রুশা মেঘের চোখে চোখ রেখে মৃদু আওয়াজে বলল, “তোমার ভালোবাসা জিতে গেছে। আমি হেরে গেছি তোমার চাহিদার সামনে।”
মেঘ একটু ঝুঁকে বলল, “কিন্তু আমি তোমার কাছে বার বার হারতে প্রস্তুত মহারানী।”
রুশা ভেজা চোখে হাসলো। সে জীবনে সব কিছু হেরে বেলা শেষে জিতেই গেছে। তার কি এই ছেলেটা ছারা আর কিছু দোয়াতে ছিলো? না তো। আরো একবার সম্পূর্ণ নিয়ম মেনে বিয়ে হলো তাদের। প্রতিটা নিয়ম-নীতি, আয়োজন কোন কমতি হলো না। মেঘ রুশার কানে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি আমার শত যুদ্ধে জেতা এক টুকরো জান্নাত।”
রুশা সুখেই মিলিয়ে উঠলো। বিয়ের আয়োজন শেষে সকলের সামনেই ইমরান তার বাবাকে গিয়ে বলল, “রুবাই সব ছেড়ে এসেছে বাবা। তুমি কি ওকে মেনে নেবে?”
আমিনুল হক একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তবে তাও এবার আর ফেরালেন না। গম্ভীরতা ছেড়ে বললেন, “বিয়েটা কিন্তু আমি আয়োজন ছাড়া দেবো না। একটা মাত্র ছেলে তুমি আমার।”
শাফিন আহমেদ এগিয়ে এসে বললেন, “আমিনুল ভাই আপনি রাজি থাকলে এই আয়োজনে কাবিনটা করিয়েই ফেলুন। পরে আবার অনুষ্ঠান হবে ক্ষন।”
কাঁকন সুলতানাও সায় টেনে বললেন, “সেটাই তো। একসাথে দুই ছেলের বউ বরন করবো।”
আমিনুল হক আজ অদ্ভুত ভাবে সব মেনে নিলেন যেন। একই আয়োজনে ইমরান আর রুবাইয়ের বিয়েটাও পড়ানো হলো খুবই সাদামাটা করে। ভাগ্য যেন অদ্ভুত জাদুকরের মত মুহুর্তে বদলে দিল অনেকগুলো জীবন। 
সন্ধ্যার শেষ প্রহরেই শেহতাজ তার মা'কে রুপমহলে এনে হাজির করল। শাহরিয়ার শেখ সকল ক্লিয়ারিফিকেশন দিয়ে থানার অধ্যায় শেষ করে ফিরলেন। 
রাত গভীর হলো। রুপমহলের পিনপতন নীরবতা ভেদ করে শেহতাজের স্টাডি রুমে যেন এক টুকরো আয়োজন জমে উঠলো। এই আয়োজনে শুধু মাত্র দুজন মানুষ। অন্ধকারময় ঘর। টেবিলের উপর দামি মদের গ্লাস। হালকা আলোয় বসে আছে সে। তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত হাসি। তার সামনে ছড়ানো কিছু কাগজ। বিদেশি চুক্তিপত্র। আর পাশে রাখা একটা ছোট বাক্স। ভেতরে, কালো হীরের টুকরো। শেহতাজ গ্লাসে চুমুক দিয়ে জানালার বাইরে তাকালো, “বিশ্বাস আর বিশ্বাস ঘাতকতার মাঝখানে পার্থক্য কতটা জানিস?”
ওপাশ থেকে স্পষ্ট আওয়াজ, “না।”
“শুধু মাত্র ঘাতকতা। এই ঘাতক মস্তিষ্ক না থাকলে সব এক।”
আরফি গ্লাসে আরেকটু ওয়াইন ঢেলে বলল, “নেক্সট প্লান কি তাজ?”
“নেক্সট বলতে আর কিছু নেই। This kingdom is mine now.”
এই কাহিনীর শেকড় আরো অনেক বছর আগের। 
শেহতাজ আজ যে সব সত্য তার বাবার মুখে শুনেছে এসব নতুন নয়। সে তা জানে আরো অনেক গুলো বছর আগে। এই মহলে তার গোপনে যা কিছু হচ্ছিল সে সব তার নির্দেশেই। এই সমগ্র খেলায় শুধু তার অজানা নতুন অধ্যায় তার মায়ের বেঁচে থাকা। তাছাড়া তার জন্য গোপন কি? শেহতাজ কি সত্যিই এত বোকা যে কোন রকম লোকবল ছাড়া শত্রু পক্ষকে আহ্বান জানাবে? নাকি অক্ষম যে সে বন্দুকের নলের সামনে চুপ করে থাকবে? শেহতাজের একটা ইশারাই যথেষ্ট ছিল আনজুম আরার সকল লোকদের ওই মহলে দাফন করতে। তবে শেহতাজ আজ শুধু নিজের খেলার এক শান্ত চরিত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। 
শাহরিয়ার শেখের সাথে ইলিয়ানা ডিসুজার সুখের সংসার ছিল এসব সত্য। তবে সম্মতির সংসার নয়। ঘটনা যা আজ শাহরিয়ার শেখ জানিয়েছেন তার ৮০ ভাগই ভুল,‌ মিথ্যা আর এক পাক্ষিক। সত্য শুধু এটুকু যে শাহরিয়ার শেখ অসম্ভব ভালোবাসতেন ইলিয়ানা ডিসুজাকে। আর এই ভালোবাসার কাছে সব মিথ্যে মাফ।
ইলিয়ানা ডিসুজার বাবা শেহতাজকে শেখদের দিয়ে মেয়ের অনত্র বিয়ে দিয়ে সব ঠিক করতে চেয়েছিলেন। বাহিরের লোকজন যাতে কখনোই না জানতে পারে যে ইলিয়ানা অন্তঃসত্ত্বা তাই মেয়েকে ইউকে থেকে শ্রীলঙ্কা রেখেছিলেন দীর্ঘদিন। তবে ইলিয়ানা কখনোই চায়নি তার সন্তানকে ছাড়তে। ইলিয়ানার বাবা জোর জবরদস্তি করে তার অনত্র বিয়ে দিলেও ইলিয়ানা নিজের ছেলেকে পেতে সব রকম চেষ্টা করে। অবশেষে জানতে পারে শেহতাজ আমিরিকায়। তখন তিনি সব ছেড়ে সেখানে ছুটে যান। তার সন্তান মাফিয়াদের ওই পরিবেশে বড় হচ্ছে দেখে সহ্য করতে পারেন নি তিনি। ইলিয়ানা আর তার স্বামী খুব চেষ্টা করেছিলেন শেহতাজকে ওই পরিবেশ থেকে নিয়ে যেতে। ওই সয়য়টায়ই শেহতাজ জেনে যায় সব। তবে শাহরিয়ার শেখ যখন জানেন ইলিয়ানা রোজ শেহতাজের সাথে দেখা করছে আর তাকে ফেরত নেবার চেষ্টা করছে তখন তিনি আমিরিকা যান। শেহতাজের মুক্তির ফর্মান জারি করার চেষ্টায় মারা পরেন ইলিয়ানার স্বামী। শাহরিয়ার শেখ এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই ইলিয়ানাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। শেহতাজকে জানানো হয় ইলিয়ানা ডিসুজা আর তার স্বামী একটা এক্সিডেন্টে মারা গেছে। শাহরিয়ার শেখ ইলিয়ানাকে এক প্রকার জোর জবরদস্তি করেই বিয়ে করেন। এরপর চন্দ্রমহলে বন্দি করে রাখেন। তার প্রেম পাগলামি এত প্রখর ছিল ইলিয়ানার প্রতি, সব যেন কল্পনার বাইরে। শাহরিয়ার শেখ আনজুম আরা বেগমকে জুতোর তলায় পিষ্ট করে রাখলেও ইলিয়ানাকে মাথার তাজের মত রাখতেন। ইলিয়ানাও একটা সময় সব মেনে নেয়। ভালোই সংসার চলতে থাকে তাদের। তবে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ইলিয়ানা ব্রেন স্ট্রোক করে সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে যায়। এর সঠিক কারণ অবশ্য জানা যায়নি। তবে শাহরিয়ার শেখ একটা নরম ফুলের মতোই যত্ন করে রাখেন তাকে। শেহতাজ এসব জানে। তবে তার মায়ের এখন আব্দি বেঁচে থাকাটা সে জানত না। সে শুধু জানত ব্রেন স্ট্রোকে মারা যান তিনি।
আরফি প্রসঙ্গ সে জানতে পারে আরো পাঁচ কিংবা ছয় বছর আগে। যখন প্রথম আরফি তার জীবনে আসে। তাদের বন্ধুত্ব কোন মিথ্যে দিয়ে নয় বরং সত্যে শুরু হয়েছে। 
আরফি তার শরীরের একই র ক্তে র মানুষ হলেও তার মত হিংস্রতা পায় নি। এই মহলে চলমান সকল ঘটনার পেছনেই এই দুটো মানুষের নিরব উপস্থিতি। শেহতাজ সকল সত্য পরিপূর্ণ জানতে চেয়েছে। তাই তো সুতোয় এত ছাড় দেয়া। খেলা তারই চলছিল তবে অন্যান্য নামে। সে ভালো মানুষ তো নয়। তার যে সব চাই। সব মানে সব। তার কাছে এখন সব আছে। 
শেহতাজ শেষ গ্লাসটা শেষ করে উঠে গিয়ে বলল, “ভোর সাড়ে চারটার ফ্লাইট ওকে।”
আরফি শুধু মাথা নাড়লো। বস্তুগত রহস্য প্রকাশ হলেও মানুষের রহস্য ঠিক কতটা ভেদ‌ হয়? এই দুটো মানুষের রহস্য ঠিক কতটা ভাঙলো? একটুও না। দৃশ্যমান সত্যে শুধু তারা তাদের পক্ষ রাখলো, সমগ্র অংশ নয়।
শেষ রাতের দিকে মেঘের কাছে একটা ফোন কল এলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে স্পষ্ট আওয়াজ এলো, “চন্দ্রমহলে হামলা হয়েছে।”
মেঘের ভ্রু কুঁচকে গেল, “কি?”
“বোম ব্লাস্ট হয়েছে। পুরো মহল ধুলোয় মিলিয়ে গেছে।”
মেঘ একেবারে শান্ত হয়ে রইলো। ওপাশ থেকে আরো ভেসে এল, “কেউ ইচ্ছে করেই প্রমাণ লুট করতে চাইছে। গুপ্তধন, হীরেসহ সব। সবই সরিয়ে নিয়ে ফাঁকা মহলটা উড়িয়ে দিয়েছে। আপনি ঠিক ছিলেন, চন্দ্রমহলে এই বোম ব্লাস্ট করার সম্পূর্ণ‌ প্লানিং আনজুম আরা বেগমের ছিল। তিনি এমন আত্মঘাতী বোমা সেট করেছিলেন নিজে সহ সবাইকে নিয়ে মরার আশায়। তবে তিনি তার খেলার সুতোটা ঠিক মত ধরতে পারে নি বলেই ছুটে গেছে। আনজুম আরা বেগমের সাজানো খেলায় কিস্তি টেনেছে অন্যকেউ।”
মেঘ ফোনটা রেখে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। আকাশের লালিমা অন্ধকার ছুইছে। মেঘ এসব জানে। শেষ দানে কিস্তি কে দিয়েছে, তাও তার জানা। আনজুম আরা বেগম যে ঘটনার এক ভিলেন চরিত্র এসবও সে জানতো। সে তো এটাও জানতো, এই খেলাটার প্রধান দান সব সময় শেহতাজের হাতেই ছিল। রুশের বিভিন্ন চুক্তিতে শেহতাজ ফেসে আছে, এসব নতুন তথ্য নয়। শেহতাজ তো এসব নিতেই এবার দেশে এসেছে। মেঘ রহস্যময় হাসলো। শেহতাজের এই খেলার একটা বড় মোহরা যে বরাবরই মেঘের হাতেই ছিল! মেঘ তার পকেট থেকে একটা চেন সহ লকেট বের করে নিজের সামনে তুলে ধরলো। এটাই কিং কোবরার সেই সব নথিপত্র যা আবিদ সওদাগর চুরি করে এনেছিলেন। 
মেঘ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, “The ball is now in my court.”
#রুশ_রহস্য_দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ 
#রুশ_রহস্য (#রুশ_এবং_রহস্য )
#সাদিয়া_তিন্তি 
বিঃদ্রঃ অনুগ্রহ পূর্বক কার্টেসি ছাড়া কপি করবেন না। 
{ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আর নিজেদের মন্তব্য রেখে যাবেন অবশ্যই} 
📌 তৃতীয় পরিচ্ছেদ পড়ার আমন্ত্রণ রইল। খুব শ্রীঘ্রই আসবে ইনশাআল্লাহ। নতুন রহস্য আর নতুন ধারাবাহিকতায়। ততদিনের জন্য আপনাদের প্রিয় #রুশ_রহস্য থমকে থাক।
__________________________
গল্পে আমার কখনোই সমাপ্ত লেখা পছন্দ নয়। গল্প আবার কখনো শেষ হয় নাকি? এই গল্পের শেষ পর্বটা ঠিক কত শত বার কেটে লিখেছি তার কোন ঠিক নেই‌। আমি জানি না এটার শেষ কেন জানি আমি নিজেই মানতে পারছি না। এখানের সব গুলো চরিত্র আমার খুব প্রিয়। ঘরের চরিত্র আমার। আমি জানি না আর কখনো ওদের নিয়ে কিছু লেখা হবে কিনা। তবে আমি সত্যি বলছি আমি লিখতে চাই। আমি অনেক লিখতে চাই। লেখার একটা শান্তির জায়গা থাকে না? এই গল্পটা আমার সেই শান্তির জায়গা। ভালোবাসা নেবেন সবাই। এত লম্বা সফরে সঙ্গ দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা। 
আমি আপনাদের রিভিউয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভালোলাগলে গল্পটা নিজের বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করতে পারেন। যাতে আরো মানুষ অব্দি পৌঁছাতে পারি। 
_________________________________
#রুশ_রহস্য_প্রথম_পরিচ্ছেদ 
https://www.facebook.com/share/p/1HiT3G1EYG/
📚 আমার লেখা অন্যান্য গল্প পড়ার আমন্ত্রণ রইলো- https://www.facebook.com/share/p/12JtWpMZZVK/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন