#ডুবেছি_তোমার_মায়ায়
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ৩১
পাক্কা এক ঘন্টা পর জিনির জ্ঞান ফিরে এসেছে ৷ কিছুক্ষণ আগেই রিফাত চলে গেছে ৷ ওর ভাষ্যমতে শহর থেকে দূরে একটা ধু ধু প্রান্তরের পাশে উৎসাহের জিপটা পাওয়া গেছে ৷ পুরো জিপটা পু'ড়ে গিয়ে একাকার হয়ে গেছে ৷ জিপের ভিতরে উৎসাহের বিভিন্ন জিনিসের সন্ধান পাওয়া গেছে তাই ম'র্মান্তিক হলেও এটাই সত্যি যে উৎসাহ আর বেঁচে নেই!
জিনি নির্জীব মুখে রিফাতের সমস্ত কথা শুনেছে কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ৷ অন্যদিকে বাকি সবাই কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ প্রায় ৷ জিনির মতো উৎকর্ষও ভাবলেশহীন ভাবে মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে স্থির চোখে একদিকে তাকিয়ে আছে ৷ উষা কাঁদতে কাঁদতে একবার জিনির দিকে তাকাচ্ছে তো একবার উৎকর্ষের দিকে তাকাচ্ছে ৷ ও এসব স'হ্য করতে পারছে না , একে উৎসাহের এমন খবর তার উপর জিনি আর উৎকর্ষের এই নির্লিপ্ততা ৷
উষা জিনিকে ঝাঁকিয়ে ক্রন্দনরত কন্ঠে বলতে লাগল,,, কথা বল জিনি ,কথা বল ৷ কান্না করে নিজের ভিতরের সবকিছু বের করে দে ৷ এভাবে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকিস না ৷ তোর এখন চিৎকার করে কাঁদা উচিত ৷ ভাইয়া আর নেই, বুঝতে পারছিস?
তবুও জিনি আগের মতোই প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে বসে আছে ৷ উমায়েত ফারুকী জোরে কেঁদে উঠে বললেন,,,,
তোমাকে বলেছিলাম উৎসাহ নিজেকে রক্ষা করো , তোমার জন্য যেন আমাদের সন্তানহারা হতে না হয় কিন্তু তুমি আমার কথা রাখলে না! একদম ঠিক করোনি তুমি আমাদের সাথে!
জিনি বিছানা থেকে উঠে ধীর পায়ে টেবিলে রাখা উৎসাহের হাস্যজ্জ্বল ছবির দিকে যেতে লাগল ৷ সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে ৷ জিনি ওর ছবিটা নিয়ে সেখানে হাত বুলাতে লাগল ৷ তারপর ছবিটা নিজের বুকের সাথে জরিয়ে নিচে চলে গেল ৷ ওর পিছু পিছু বাকিরাও চলে গেল ৷
খবর পেয়েই জিহান মুক্তাদীর রা চলে এসেছেন ৷ এসে নিজের মেয়েকে নির্জীব মুখে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এলেমেলো শাড়িতে বসে থাকতে দেখে রাহেলা ওয়াসীম ডুকরে কেঁদে উঠলেন ৷ তারপর ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে মেয়েকে নিজের বুকের সাথে জরিয়ে নিলেন ৷ জিহান মুক্তাদীর মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,,,
জিনাত মামুনি নিজেকে সামলাও ৷ এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না ৷
জিনি এখনও স্থির চোখে একদিকে তাকিয়ে আছে ৷ বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের দিকে জিহান মুক্তাদীর চোখ বুলিয়ে নিলেন ৷ সবাই কেমন মৃ*তের মতো বসে আছে আর কাঁদতেছে ৷
জীবন গুটিগুটি পায়ে জিনির শাড়ির আঁচল টেনে ধরে বলল,, আপু ডিছুম ডিছুম বাইয়া কোথায়?সারা বাড়ি খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না ৷ আজকেও কি সেদিনের মতো জরুরি কাজে গেছে? তাহলে ফোন করে তাড়াতাড়ি আসতে বলো ৷
এবার জিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না ৷ গগনবি'দারী চিৎ'কার করে কেঁদে উঠে বলল,,,
এসিপি সাহেব! আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না!
হঠাৎ ওর এমন চিৎ'কারে জীবন কেঁপে উঠল ৷ জিহান মুক্তাদীর ছেলেকে আগলে নিলেন ৷ সবাই জিনির আ'র্তনাদ দেখে নিজেরাও জোরে জোরে কাঁদতে লাগল ৷ উৎকর্ষ অবিচল দৃষ্টিতে এলেমেলো পায়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামছে ৷ ওর দিকে চোখ পড়তেই জিনি দৌঁড়ে ওর সামনে গিয়ে বলল,,,,
ভাইয়া আমার এসিপি সাহেবকে এনে দিন ভাইয়া ৷ উনাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না! উনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনুন ভাইয়া ৷ আমার সন্তানের বাবাকে আমার কাছে এনে দিন ৷
সবাই চকিতে জিনির দিকে তাকাল ৷ উষার সবেমাত্র কথাটা মনে পড়ল, এতো ক'ষ্টের মাঝে এই কথাটা ওর মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল ৷ এবার ও আরো জোরে কাঁদতে লাগল ৷ জিনির এমন আ'হাজারি স'হ্য করতে না পেরে উর্মিলা আর মিতা ইয়াসমিন সেখান থেকে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন ৷
উৎকর্ষ জিনিকে ধরে জিহান মুক্তাদীরের কাছে রেখে লম্বা লম্বা পা ফেলে ছাদে চলে গেল ৷ ছাদে গিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল ৷ তারপর ঝরঝর করে কেঁদে উঠে বলল,,,,
ভাই আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গেলি? যে তোকে ছাড়া আমার এক সেকেন্ড চলে না সে আমি বাকি জীবন কিভাবে কাটাব? এভাবে জীবনের মাঝপথে আমাকে কিভাবে রেখে যেতে পারলি? তোর অপরিচিতা যে তোকে ছাড়া বাঁচবে না রে ভাই! তুই না বলেছিলি আমার আর উষার বিয়ে তুই নিজ হাতে দিবি, কেউ আপত্তি করলে তাদেরকে মানিয়ে নিবি তাহলে চলে গেলি কেন? আমার অনাগত ভাতিজা/ভাতিজি কে অনাথ করতে পারিস না তুই! ফিরে আয় ভাই, ফিরে আয় ভাই ৷ তুই এই পরিবারের প্রাণ , তোকে ছাড়া পুরো পরিবারটা ছাড়'খার হয়ে যাবে! দয়া করে ফিরে আয় ৷ আমাদের তোকে প্রয়োজন, খুব করে প্রয়োজন ৷
বলে উৎকর্ষ ডুকরে কেঁদে উঠল ৷ ওর কান্নার আওয়াজ আকাশ বাতাস ভারী করে তুলেছে ৷ ড্রয়িংরুমে জিনির কান্না আর ছাদে উৎকর্ষের কান্না যেন উষাকে ভিতর থেকে পু'ড়িয়ে দিচ্ছে, অসহ্য য'ন্ত্রণা হচ্ছে বুকে!
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সবাই নিস্তেজ হয়ে ড্রয়িংরুমে বসে আছে ৷ জিনি জিহান মুক্তাদীরের কাঁধে মাথা রেখে ক'ঙ্কালসার মুখে বসে থেকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে ৷ উমা ভুলবশত টিভি অন করতেই সেখানে নুরুল আমিনকে নিয়ে সাংবাদিক কিছু কথা বলছিল ৷ সবাই টিভির দিকে চোখ নিবদ্ধ করল ৷ সাংবাদিকটা বলতে লাগল,,,
গতকাল রাত ১২ টা নাগাদ এয়ারপোর্টে যাওয়ার প্রাক্কালে ডিসিপি নুরুল আমিনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৷ এসিপি উৎসাহ ইনায়েত ফারুকীর দেওয়া প্রমাণের সাপেক্ষে উনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ৷ উনি ই সেই বিখ্যাত ঘোস্ট মাস্টার খ্যাত ড্রা'গস ডিলার ৷ এসিপি উৎসাহ ইনায়েত ফারুকী বিচক্ষণতার সাথে এই চক্রকে সবার সামনে উন্মুক্ত করতে কার্যকরী ভূমিকা রেখেছেন কিন্তু দুঃখের সহিত বলতে হচ্ছে যে উনি আর আমাদের মাঝে উপস্থিত নেই ৷ দেশ থেকে অপরাধ দূর করার বিনিময়ে উনাকে নিজের জীবন হারাতে হয়েছে ৷ আমরা খুবই ম'র্মাহত ৷ ডিসিপি উনার জবানিতে বলেছেন, উনি এসিপিকে প্রথমে ছু'ড়ি দিয়ে আ'ঘাত করেছেন তারপর দুটো গার্ডের মাধ্যমে এসিপিকে জিপের সাথে বেধে পু'ড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যদিও গার্ড দুটোর সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি ৷
জিনির চোখে আগুন জ্বলজ্বল করে উঠল ৷ কন্ঠে তেজ নিয়ে উৎকর্ষকে উদ্দেশ্য করে বলল,,,
ভাইয়া আমি উনার সাথে দেখা করতে চাই ৷ আমাকে থানায় নিয়ে চলুন ৷
জিহান মুক্তাদীর বললেন,,, কিন্তু মামুনি তুমি এ অবস্থায়...
জিনি হাত উচিয়ে বলল,, আব্বু আমি ঠিক আছি ৷ উনার সাথে আমার কিছু বোঝাপড়া বাকি আছে ৷
বলেই জিনি পাথরের মূর্তির ন্যায় উঠে দাঁড়াল ৷ উৎকর্ষও কোনোরুপ আপত্তি না করে গাড়ি বের করল ৷ দুজনেই থানার উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷ বাড়ির সবাই একদৃষ্টিতে ওদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
নুরুল আমিনকে কোর্টে চালান করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৷ তাই থানা থেকে উৎকর্ষ আর জিনি সোজা কোর্টের উদ্দেশ্যে চলে গেল ৷
দুজন পুলিশ অফিসার নুরুল আমিনকে হাতকড়া পড়িয়ে পুলিশ ভ্যান থেকে নামাল ৷ জিনি দ্রুতপদে গাড়ি থেকে নেমে দৌঁড়ে ক্ষু'ব্ধ চাহনিতে নুরুল আমিনের দিকে তেড়ে গেল ৷ উৎকর্ষ ব্যস্ত পায়ে জিনির পিছু ছুটতে লাগল ৷ ওকে তেড়ে আসতে দেখে পুলিশগুলো ওকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই রিফাত ওদেরকে থামিয়ে দিল ৷ ফলশ্রুতিতে জিনি গিয়ে নুরুল আমিনের কলার চেপে ধরে গ'র্জন করে বলতে লাগল,,,,
নি'ষ্ঠুর! অ'মানবিক! পা'ষাণ! আপনি না উনাকে ছেলে ছেলে বলতেন? এই আপনার ছেলের প্রতি ভালোবাসা? আপনি উনার কাছে পিতৃতুল্য ছিলেন তার মূল্য এভাবে দিলেন? ছিহ! আপনার নিজের প্রতি ঘৃ'ণা হওয়া উচিত!
নুরুল আমিন ভাবলেশহীন ভাবে মাথা নিচু করে আছেন ৷ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না ৷ চুপচাপ জিনির কথাগুলো শুনতে লাগলেন ৷ জিনি আ'র্তনাদ করে বলল,
সেদিন না আমার মাথায় হাত রেখে আমাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য দোয়া করে দিলেন তাহলে আপনি নিজেই কেন আমার স্বামীকে আমার থেকে কেড়ে নিলেন? কেন আমাকে বিধবা বানিয়ে দিলেন? কেন আমার জীবন থেকে সমস্ত রঙ কেড়ে নিয়ে জীবনটা রঙহীন বানিয়ে দিলেন?
বলতে বলতে জিনি ডুকরে কেঁদে উঠল ৷ তারপর নিজের পেটে হাত রেখে করুন কন্ঠে বলল,,, আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে কেন অনাথ করে দিলেন?
এতোক্ষণে নুরুল আমিন জিনির দিকে ভালোমতো তাকালেন ৷ জিনি কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে গেল ৷ উৎকর্ষ এসে ওকে ধরে ধরে তুলে বলল,,,
পিচ্চি ভাবী শান্ত হও ৷ অন্তত আমার ভাতিজা/ভাতিজির জন্য হলেও শান্ত হও ৷
জিনি ক্রন্দনরত চোখ দুটো তুলে উৎকর্ষের দিকে তাকিয়ে দুর্বল কন্ঠে বলল,,,
উনাকে এনে দিন না ভাইয়া!
উৎকর্ষ ওর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে কেঁদে ফেলল ৷ জিনি এবার আদালতের বাইরে দাঁড়ানো সবার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,,,,
আপনাদের বাঁচানোর জন্য আমার স্বামী কতকিছু করল , তার বিনিময়ে এখন আপনারা আমার স্বামীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন ৷ আমার এসিপি সাহেবকে আমার কাছে নিয়ে আসুন ৷
সবাই জিনির আহাজারিগুলো অসহায়ভাবে শুনতে লাগল ৷ উৎকর্ষ জিনিকে ধরে ধরে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসাল ৷ নুরুল আমিন সেদিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চোখ ঘোরাতেই নিজের সামনে নিলা সরদারকে ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শীতল গলায় বললেন,,,
আমাকে মাফ করে দাও নিলা ৷
নিলা সরদার দুর্বল কন্ঠে বলল,,, আপনি আবারও আমাকে অনাথ করে দিলেন! আপনি কেন আমার মতো একজন অনাথকে বিয়ে করে নিয়ে এসে এতো সুখ দিয়েছিলেন যাতে একদিন এভাবে ধো'কা দিতে পারেন সে জন্য?
না নিলা ভুল বুঝছো ৷ আমি পা'পে ডুবে থাকলেও তোমাকে কখনো ধো'কা দেওয়ার কথা ভাবিনি ৷
চুপ করুন ৷ আপনার সাথে দেখা হওয়ার পর একটা দুঃখ ছাড়া আমার জীবনে আর কোনো দুঃখ ছিল না ৷ সেই দুঃখ টা ছিল একটা সন্তানের অভাব যেটাও আপনি পূরণ করে দিয়েছিলেন উৎসাহকে আমার কাছে এনে দিয়ে ৷ ওকে পাওয়ার পর থেকে আমি সন্তানের অভাব ভুলে গিয়েছিলাম ৷ দুনিয়ার সমস্ত সুখ আমার কাছে এসে ধরা দিয়েছিল ৷ কিন্তু সেই আপনি আজ আমার কাছ থেকে আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নিলেন! আপনাকে আমি মাফ করব না! আপনার আর আমার পথ আজ থেকে আলাদা ৷ জীবনে কখনো যেন আপনার এই মুখটা আমি না দেখতে পারি!
নুরুল আমিন অসহায় ভাবে বললেন,,, নিলা এতো নি'ষ্ঠুর কথা বলোনা ৷ টাকার নেশায় অন্ধ হয়ে আমি আমার ছেলেটাকে মে'রে ফেলেছি, মাফ করে দাও আমাকে ৷জানি এ পাপ মাফ হবার নয় তবুও এভাবে আমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিও না!
নিলা সরদার হাত উচিয়ে বললেন,,, আজ থেকে আমি আবারও অনাথ হয়ে গেলাম ৷ এই দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আমার আপন রইল না! আপনি আমাকে হারিয়ে ফেলেছেন ৷
নুরুল আমিন কান্নারত কন্ঠে বললেন,,, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না!
নিলা সরদার চিৎকার করে বললেন,,, তাহলে ম'রে যান! এখনও কেন বেঁচে আছেন? উৎসাহকে মে'রে আপনি এখনও কেন শ্বাস নিচ্ছেন? দ্রুত ম'রে যান! আমি আপনাকে ঘৃ'ণা করি!
বলেই নিলা সরদার উল্টো দিকে হাঁটা ধরলেন ৷ নুরুল আমিন পানিতে টইটম্বুর চোখ নিয়ে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের পকেট থেকে গু'লি বের করে নিজের মাথায় শুট করে দিলেন ৷ আচমকা এমন হওয়ায় সবাই চ'মকে উঠল ৷ নিলা সরদারের কদম থামল কিন্তু উনি মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালেন না ৷ নুরুল আমিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে পর্যন্ত নিলা সরদারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিন্তু উনি একটাবারের জন্যেও মাথা ঘুরাননি ৷ নিলা সরদার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানিটুকু মুছে নিয়ে আবারও সামনের দিকে পা বাড়ালেন ৷ শেষবারের জন্যও নিজের প্রিয়তম স্বামীর দিকে তাকালেন না উনি ৷ প্রকৃতির রহস্যময় জগতে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন উনি ৷
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
উৎসাহের মৃ'ত্যুর চারদিন পেরিয়ে গেছে ৷ ঘটনাটার পরদিনই উদিতা ফারুকীরা লন্ডন থেকে চলে এসেছিল ৷ উৎসাহের অক্ষত বডি না পাওয়ায় ওর শেষবারের মতো ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো দিয়ে মাটি খুড়ে ক'বর দেওয়া হয়েছে ৷
উর্মিলা আর মিতা ইয়াসমিন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ৷ জিনি কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেছে , কারো সাথে কথা বলে না ৷ সবসময় উৎসাহের ছবি বুকে গুজে বসে থাকে আর রাত হলেই গলা ফাটিয়ে কান্না করতে শুরু করে দেয় ৷ তারপর কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়ে ৷ ওর পড়নে এখনও সেই লাল শাড়িটা রয়েছে ৷ নিজের অনাগত বাচ্চার কথা ভেবে কিছুটা খাবার খেলেও বাকি কোনো কিছুর প্রতি ওর নজর নেই ৷
জিনি জানালায় হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থেকে নিজের পেটে হাত রেখে বলল,,,
মাম্মা তোমাকে অনেক ক'ষ্ট দিচ্ছে তাই না সোনা? দয়া করে মাফ করে দাও সোনা ৷ সবাই বলছে তোমার বাবা আর বেঁচে নেই কিন্তু আমার বিশ্বাস তোমার বাবা ফিরে আসবে ৷ তুমি দেখে নিও সোনা তোমার বাবা খুব দ্রুত আমাদের কাছে চলে আসবে ৷
উষা পিছনে দাঁড়িয়ে ওর কথা শুনে নিশ্চুপ কাঁদতে লাগল ৷ এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল ৷ জীবন গুটিগুটি পায়ে গিয়ে নিজের ছোট ছোট হাতে দরজা খুলে দিয়ে হা হয়ে সামনে তাকিয়ে থাকল তারপর অস্ফুট স্বরে বলল,,,
ডিছুম ডিছুম বাইয়া!
ওর কথাটা কর্ণগোচর হতেই জিনি চকিতে সদর দরজার দিকে তাকাল ৷ উৎসাহ সারা শরীরে ব্যান্ডেজ সমেত ওর দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে ৷ জিনি শাড়ির আঁচল উরিয়ে দৌঁড়ে গিয়ে উৎসাহকে গিয়ে জরিয়ে ধরে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল ৷ উৎসাহ শীতল গলায় বলল,,,
বিবিজান তোমাকে না বলেছিলাম আমার বিবিজানকে সামলে নিও, আমার বিবিজানের মুখ থেকে হাসি হারিয়ে যেতে দিও না কিন্তু তুমি আমার কথা রাখলে না কেন? চারদিনে নিজের এ কি হাল করেছো? আমার বাচ্চাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?
জিনি কোনো উত্তর না দিয়ে এখনও ওকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে কাঁদতেছে ৷ সবাই সদর দরজার সামনে এসে অবাক নয়নে উৎসাহের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ হঠাৎ উৎসাহের পিছন থেকে দুজন সুদর্শন যুবক এগিয়ে এসে বলল,,,
আসসালামু আলাইকুম ৷ আমরা উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলাম কিন্তু পরিচয় না জানায় আপনাদের কাছে খবর পাঠাতে পারিনি ৷
চলবে,,,,