#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব: ১০
রিধি দৌড়ে হৃদের কাছে গিয়ে বললো-" একি আপনার হাতে কি হয়েছে?"
হৃদ কিছু না বলে রিধিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। রিধি হতবম্ভ হয়ে দাড়িয়ে রইল। কি থেকে কি হলো বুঝতে পারলো না রিধি। হৃদ কে ছাড়িয়ে হৃদের ঘরে নিয়ে গেল। হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল।তারপর খাবার হৃদের ঘরে দিয়ে চলে গেল।
...............
রাত বারো টা। কেন যেন ঘুম আসছে না রিধির। হৃদ কে ওভাবে কাঁদতে দেখে মনটা কেমন যেন করছে। তাই উঠে ঠিক করল হৃদের ঘরে একবার উঁকি দিয়ে হৃদকে দেখে চলে আসবে। রিধি উঠে এসে হৃদের ঘরের সামনে দাড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো হৃদ কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাই হালকা পায়ে এগিয়ে গেল ঘরের ভিতরে।ঘরে ভিতরে গিয়ে দেখে হৃদ কেমন করে যেন শুয়ে আছে। তাই মাথায় হাত দিতেই বুঝলো হৃদের জ্বর এসেছে। কি করবে বুঝতে পারলো না রিধি। বড় মাকে কি ভাবে ডাকবে সে তো রাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ঘুমায়। মায়ের রাত জাগলে প্রেশারে প্রবলেম হয়। তাই রিধি নিজেই একটা বাটিতে কাপড় ভিজিয়ে হৃদের কপালে দিতে লাগলো। তারপর হৃদকে ডেকে উঠিয়ে ঔষুধ খাইয়ে দিল। হৃদ বেহুশের মতো শুয়ে আছে। তারপর হাত পা মুছিয়ে দিল।এভাবেই রাতটা কাটলো রিধির।
চারিদিকে দিনের আলো ফুটে গেছে। হৃদ একটু একটু করে তাকিয়ে দেখলো রিধি মেঝেতে বসে বিছানার উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। জ্বরটা এখন একটু কমেছে। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওয়া দরকার তাই রিধিকে ডাকলো হৃদ। এক ডাক দিতেই রিধি দড়ফড় করে উঠে বসলো। তারপর বললো-" আপনি ঠিক আছেন। কিছু কি দরকার।"
-" হ্যাঁ। আমি এখন ঠিক আছি। তুই ঘরে গিয়ে শুয়ে পর।"
রিধি মাথা দুলিয়ে চলে যাবে এমন সময় পিছনে ফিরে হৃদকে বললো-" সারা রাত জেগে সেবা করলাম। একটা থ্যাংকসও তো দিতে পারেন।"
হৃদ গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো-" তুই আমার বউ। সো এটা তোর দায়িত্ব। থ্যাংকস দিব কেন?"
রিধি অবাক হওয়ার স্বরে বললো-" কিসের বউ।"
-" কেন ভুলে গেছিস নাকি।"
-"সেটা ছয় মাস পর ঠিক হবে,বউ কি না।"
-" রিশাদ চৌধুরী হৃদের মাথায় যদি কিছু ডুকে যায়। তখন সে কারো কথা শুনে না।"
রিধি বুঝতে না পেরে বললো-" মানে।"
-"সেটা তোকে বুঝতে হবে না। ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পর।"
রিধিও হৃদের কথা মতো তাই করলো।
দুপুর বেলা..........
হৃদ তার মাকে ঘর থেকে ডেকে বললো-"মা আমার খাবার টা ঘরে দিয়ে যাও। আমি নিচে যেতে পারবো না।"
ইরিনা চৌধুরী গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো-" আমি পারবো না। তোমার বউ কে বলো।সে তার অসুস্থ স্বামী কে না খাইয়ে নিজে খেতে বসে গেছে।"
রিধি এতে একটু লজ্জা পেল। সত্যিই তো। হৃদ এখন অসুস্থ। মানুক বা নামানুক হৃদ তো তার স্বামী ।তাকে খাবার না দিয়ে নিজে খেতে বসে গেছে।এটা একদমই ঠিক হয়নি।
তাই নিজের খাবার শেষ করে হৃদের জন্য খাবার নিয়ে ঘরে গেল রিধি।
হৃদ বিছানায় শুয়ে আছে। রিধির ডাকে মুখ তুলে রিধির দিকে তাকালো হৃদ। রিধি তখন হৃদ কে বললো-" খাবার টা খেয়ে নিন। তারপর ঔষুধ খেতে হবে।"
হৃদ অন্য দিকে মুখ করে শুয়ে বললো-" মাকে আসতে বল। আমার হাতের ব্যথা বেড়েছে।হাত নড়াতে পারছি না মাকে খাইয়ে দিতে বল।"
-" বড় মা আসতে পারবে না বলে দিয়েছে। সে নাকি আপনার কোনো কাজ করে দিতে পারবে না।"
-" তাহলে তুই খাইয়ে দে। তোর জন্যই তো মা আমার কোনো কাজ করে দিচ্ছে না।"
রিধি মুখ বাকিয়ে বললো
-"আমি কেন খাইয়ে দিব।"
-" কারণ তুই আমার বউ,বোন দুটোই।তাই তোর আমার প্রতি দ্বিগুন দায়িত্ব পালন করা উচিত।"
আবির তখন হৃদের ঘর ওভার টেক করে যাচ্ছিলো। হৃদের এমন কথা শুনে শব্দ করে হেসে বললো--" ভাইয়া তোমার আর কোন বোন নেই।না মানে রিশা আপু বাদে।"
হৃদ তখন প্রশ্নতোক চোখে তাকিয়ে বললো-"কেন?"
-" না মানে আমিও তাকে বিয়ে করে বউ বোন দুটোই বানিয়ে দ্বিগুণ সেবা নিতাম।"
হৃদ তখন আবিরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাঁসি দিয়ে বললো-" আমার আরেকটা বোন লাগবে কেন। মেডিকেল কলেজে যে অরিন নামের মায়ের পিছে ঘুরিস তা কি আমি জানিনা ভেবেছিস।"
আবির তখন কথা না বাড়িয়ে মুখে মিথ্যে হাসি ফুটিয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। সে জানে এখানে থাকলে আরও অনেক কিছু ফাঁস করে দেবে তার বড় ভাই।তাই আপাতত কেটে পড়াই উত্তম।
................
রিধি আর হৃদের বিয়ের পর কেটে গেছে তিন মাস। এখন আর রিধির সাথে তেমন ঝগড়া করে না হৃদ। তবে নিজের সব কাজ রিধিকে দিয়ে করায়। রিধি না করতে চাইল জোড় করে করায়। রাত বিরাতে হুট করে ডেকে কফি বানিয়ে আনতে বলে। প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও এখন আর বিরক্ত হয় না রিধি। বরং মনের মধ্যে ভালোলাগা কাজ করে তার।
...........
ভার্সিটিতে এসেছে রিধি। হৃদই তাকে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিতে এসেছে। রিধি চলে যাবে এমন সময় হৃদ রিধি কে ডাকলো।
রিধি পিছনে তাকিয়ে বললো-"কি।"
-'" আশিকের সাথে বেশি কথা বলবি না। দরকার ছাড়া তো না ই।"
-" কেন।"
-" আমি বলছি তাই।"
-" আপনি বললেই আমাকে শুনতে হবে নাকি। আশিক আমার বেস্টফ্রেন্ড। ছোট বেলা থেকেই একসাথে পড়াশোনা করেছি আমরা। ওর সাথে কথা বলা বাদ দিতে পারবো না আমি।"
হৃদ সামনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললো-" আমার কথার যেন কোনো নড়চড় না হয়। তাহলে খারাপ হবে।"
কথাটা বলেই হৃদ গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।
................
ভার্সিটিতে সব গুলো ক্লাস হয়নি আজকে। আশিক ও আজ আসে নি। সব কিছু বোরিং লাগছিল রিধির। তাই ভার্সিটির পিছনের রাস্তা নিয়ে ভার্সিটির লেকে দিকে যাচ্ছিলো রিধি।এমন সময় কোথা থেকে একটা গাড়ি এসে হুট করে রিধিকে গাড়িতে উঠিয়ে চোখে কালো কাপড় বেধে দিল।
আধা ঘন্টা পর ঙ্গান আসলো রিধি। চারিদিকে অন্ধকার। কোথাও মানুষের অস্তিত্ব মাত্র নেই। রিধি চিৎকার করে বললো-" কেউ আছেন।"
না কোনো জবাব এলো না।
হঠাৎ করেই একটা লাইট এসে চোখে পড়লো রিধির। কেউ একজন এগিয়ে আসছে তার দিকেই। লোকটির মুখ ডাকা। রিধি কিছু বলবে তার আগেই রিধিকে লোকটা একটা ভিডিও দেখালো। আর কিছু ডকুমেন্টস দেখালো। তারপর বললো আমাদের কথা মতো কাজ না করলে সব ভাইরাল করে দেব।
রিধি উচু স্বরে বললো-" এসব করে আপনাদের কি লাভ?"
-" আমাদের কি লাভ তা আপনাকে ভাবতে হবে না। যা যা বলছি তাই করুন।"
....................
খোলা রাস্তায় এলোমেলো পায়ে হাটছে রিধি। সব কি কেমন উল্টো পাল্টা লাগছে। কি করবে কিচ্ছু বুঝতে পারবে না রিধি। বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল।
হৃদ রিধিকে নিতে ভার্সিটিতে গেছিলো। কিন্তু ভার্সিটিতে কোথাও রিধিকে না পেয়ে রেগে গেল হৃদ। ক্ষিপ্ত গতিতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরলো। তার মনে একটা কথায় বাজছে-" রিধিকে না করার পরেও রিধি কেন অন্য গাড়িতে করে একাই বাড়ি এলো।"
বাড়িতে ডুকেই ইরিনা চৌধুরীকে বললো-" মা রিধি কোথায়?"
ইরিনা চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখলো হৃদের চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। তাই হৃদের কাছে গিয়ে বললো-" কি হয়েছে হৃদ? রিধি তো ঘরে।"
হৃদ উত্তর না দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে উপরে উঠে এলো। রিধির ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বললো-" রিধি দরজা খোল কথা আছে।"
ওপার থেকে কোনো আওয়াজ না পেয়ে হৃদ আবার বললো-" রিধি দরজা খুলতে বলছি।"
তখনই দরজা খুলে গেল। রিধির চুল গুলো কেমন এলোমেলো অগোছালো হয়ে আছে। চোখ দুটো ফুলে আছে। মুখ টা লাল হয়ে আছে।
হৃদ এক পলক রিধির দিকে তাকিয়ে বললো-" তোকে না বলছিলাম।ভার্সিটি ছুটি হওয়ার পর দাড়াতে।"
রিধি উত্তর দিল না
হৃদ আবার বললো-" কি হলো কথা বলছিস না কেন।"
রিধি তখন নিচের দিকে তাকিয়ে বললো-" আমরা এখন কথা বলতে ভালো লাগছে না।"
কথাটা বলেই ঘরের দরজা আবার লক করে দিল রিধি।
এমনটা করাতে হৃদের রাগ আরও বেড়ে গেল। আরও কিছুক্ষণ রিধির দরজার সামনে দাড়িয়ে থেকে চলে গেল।
...................
এরপর কেটে গেছে আরও তিন দিন। রিধি হৃদের সাথে তেমন কথা বলে না। ফরেনসিক বা অফিসে গেলে অন্য সবার সাথে কথা বললেও হৃদের সাথে কথা বলে না। ঝগড়াও করেনা। চুপচাপ নিজের কাজ সেরে চলে আসে। ভার্সিটিতেও নিজে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। হৃদ কোনো কাজ করে দিতে বললে বলে-"পারবো না।"
এ নিয়ে হৃদের রাগ দিন কে দিন আকাশ সমান হচ্ছে।তাই ফরেনসিক থেকে বাড়িতে এসেই রিধিকে বললো-" রিধি আমার ঘরে আয় কথা আছে।"
রিধি কোনো জবাব দিল না।
হৃদ আবার বললো-" ঠিক দশ মিনিট পরে যেন তোকে আমার ঘরে দেখি তা না হলে খারাপ হবে।"
ঘরে এসে ফ্রেস হয়ে নিলো হৃদ। দশ মিনিটের বদলে আধা ঘন্টা হয়ে গেল রিধি এলো না। হৃদ আর পারলো নিজের রাগটা সামলে রাখতে। ধুপধাপ পা ফেলে রিধির ঘরের দিকে গেল। রিধির ঘরে গিয়ে দেখলো রিধি চোখ বুজে কানে ইয়ারফোন দিয়ে গান শুনছে।তা দেখে হৃদ যেন আরও জ্বলতে লাগলো। ঘরের দরজা লক করে ফুলদানিটা মেঝেতে ছুড়ে ফেললো। রিধি চোখ খুলে দেখে হৃদ তার সামনে দাড়িয়ে। হৃদের চোখ মুখে রাগ স্পষ্ট। হৃদ রিধির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মেঝে ছুড়ে ফেললো। ফোন ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। রিধি তখন হৃদের দিকে তাকিয়ে বললো-'" ফোনটা ভাঙ্গলেন কেন।"
-" আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই ভেঙ্গেছি।'"
-" আমার ফোন আপনি নিজের ইচ্ছেতে ভাঙ্গবেন কেন?"
হৃদ তখন রিধির হাত মুচড়িয়ে ধরে বললো-"তোর ভাগ্য ভালো যে তোকে এই ভাবে আছাড় দেই নি।"
রিধির চোখ থেকে টুপ করে এক ফোটা পানি পড়লো।
-" হাত ছাড়ুন আমার ব্যথা পাচ্ছি।"
-" ছাড়বো না হাত। ঘরে যেতে বলেছিলাম না তোকে যাস নি কেন।"
-" আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই যাইনি।"
হৃদ তখন আরেক হাতে রিধির মুখে চাপ দিয়ে ধরে বললো-" বেশি বড় বড় কথা বলছিস। আমার মুখের উপর কথা বলছিস। তোর সাহস দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছি না।"
হৃদ আর কিছু বলবে তখনই তার বাবা ইশতিয়াক চৌধুরী ডেকে উঠলেন তাকে। হৃদ রিধিকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। তাল সামলাতে না পেরে রিধি টেবিলের উপর গিয়ে পড়লো। যার ফলে টেবিলের কোণে লেগে রক্ত বের হয়ে গেল। রিধি সোজা হয়ে দাড়িয়ে বিছানায় বসে কাঁদতে লাগলো।
................
কেটে গেছে আরও দুই দিন। এই দুই দিন রিধি হৃদ কেউই কারো সামনে আসেনি। শাওয়ার নিয়ে কেবলই ঘরে এসেছে হৃদ তখনই রিধি দরজার বাইরে দাড়িয়ে বললো-" আসবো।"
হৃদ নিজের কাজ করতে করতে বললো-"হুম।"
মেঝের দিকে তাকিয়ে রিধি বললো-" একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"
হৃদ কাবার্ড থেকে টি- শার্ট নিয়ে পড়তে পড়তে বললো-" হুম বল।"
ঈ
রিধি তখন হৃদের দিকে তাকিয়া বললো-"আমার ডিভোর্স চাই।"
#চলবে