ফন্ট সাইজ:
থিম:
ব্লাডিং হার্ট

১৭তম পর্ব

লেখক: স্বপ্নীল সৃজনী
#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব: ১৭
বসার ঘরে বসে আছেন চৌধুরী বাড়ির সকলেই। হৃদ ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই হুংকার ছাড়লো ইশতিয়াক চৌধুরীর। হৃদের দিকে আঙ্গুল উচিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলেন-" তুমি কোন সাহসে কাল রিধিকে নিয়ে পালিয়ে গেলে।"
হৃদ পকেটে হাত গুজে সোজা হয়ে দাড়িয়ে বললো-" আব্বু সারারাত অনেক ঘুরেছি শরীরটা অনেক দুর্বল। একটু ঘুমানো দরকার। এ সব নিয়ে পরে কথা বলি।
-" অসভ্য ছেলে। বাবার মুখে উপর কথা ! লজ্জা হওয়া উচিত তোমার। আবার আমার বাড়ির মেয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছ।ভাবতেও অবাক লাগছে আমার।
-" আহ্। বাবা!তুমি এমন ভাবে বলছো যেন আমি কোনো পর-নারীকে নিয়ে পালিয়ে গেছি। আমি তো আমার তিন কবুল পরে হওয়া বউ কে নিয়ে গেছি। আর কি তখন থেকে বলছো পালিয়ে গেছিলাম; পালিয়ে গেছিলাম। নিজের বাড়ি থেকে নিজের বউকে নিয়ে গেছিলাম। এটা কি পালানো হলো নাকি। আর তাছাড়া তোমার বউ মা আবার  অদ্ভুত অদ্ভুত এক্সপেরিয়েন্স করতে ভালোবাসে তাই পাইপ বেয়ে লুকিয়ে গেছিলাম। নাহলে থোরাই আমি গেইট ছেড়ে পাইপ দিয়ে নামি।"
শেষের কথাটা রিধির দিকে তাকিয়ে বললো হৃদ। সবার সামনে এই প্রথম হৃদ তাকে বউ বলেছে। অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে তার মাঝে। কেমন যেন অজানা কারণে মনটা আনন্দে ভরে গেল রিধির। 
ইশতিয়াক চৌধুরী খানিক থেমে মাথা একটু ঠান্ডা করে বললেন-" রিধি তোমার বউ মানলাম। আর আমিও ডিসিশন নিয়ে নিয়েছি যে রিধির বিয়ে দেব। তাই  ঠিক তিন দিন পরে তোমার আর রিধির বিয়ে হবে এই বাড়িতে। কাল আমি বিজনেসের একটা কাজে বিদেশে যাব। সেখান থেকে এসেই তোমাদের বিয়ে। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।"
হৃদ স্বাভাবিক স্বরে বললো-" তো আগে বললেই পারতে এই কথা। এতো কাহিনী করার কি ছিলো। রিধির যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমারও কোনো আপত্তি নেই। একবার তো বিয়ে করেইছি তোমার ইচ্ছেতে না হয়। আবার বিয়ে করলাম।"
কথাটা বলেই নিজের ঘরে চলে গেল হৃদ। এখন সে অনেক ক্লান্ত। হৃদ চলে যেতেই ইশতিয়াক চৌধুরী বেরিয়ে পরলেন অফিস উদ্দেশ্যে। অফিসের কিছু কাজ সেরে তিনি বিকেলে ফ্লাইটে বিদেশে যাবেন বিজনেসের কাজে।
............................
ঘরে এসে চেন্জ করে বিছানায় সুয়ে আছে রিধি। সেই কখন থেকে ঘুমানোর চেষ্টা করছে কিন্তু ঘুম বাবাজি ধরা দেবার নাম নেই। এপাশ ওপাশ করে খানিক সময় পাড় করলো রিধি। মাথায় তার অন্য চিন্তা ঘুরছে। কাল কি হয়েছিল তা জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাকে জিঙ্গেস করবে সেইটাই ভাবছে তখন থেকে। হঠাৎ দরজা সামনে দিয়ে রিশাকে যেতে দেখে দ্রুত উঠে দরজা পেরিয়ে  বাইরে গিয়ে রিশাকে ঘরে নিয়ে এলো। রিধির এমন কাজে রিশা যে  ক্ষাণিক আবাক হয়েছে তা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। রিশা প্রশ্ন বোধক চোখে চেয়ে আছে রিধির দিকে।রিধি তাকে উপেক্ষা করে দরজা লাগিয়ে রিশার সামনে এসে দাড়ালো।
রিশা  দুটো ছোট্ট ছোট্ট চোখে রিধির দিকে তাকিয়ে বললো-" কি হয়েছে?"
-"আপু কাল কি হয়েছিল? বাড়িতে কি অনেক সিনক্রিয়েট হয়েছিল নাকি? তারা কি অনেক খারাপ
বিহেব করেছে?"রিশা কথাটা বললেই  গড়গড় করে বলে ফেললো রিধি। বোঝায় যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে কথা গুলো চপে বসে ছিল রিধি।
রিশা মুচকি হেসে রিধির গালে হাত দিয়ে বললো-" তোকে একটা সিক্রেট বলি শোন।"
-" কি সিক্রেট?"
-" আসলে কাল কোনো এঙ্গেজমেন্ট ছিল না।
-" কি বলছো। তাহলে কাল যে সবাই বললো।
-" আরে সব অভিনয় ছিল। পার্টির আগের দিন ভাইয়া তোকে নিয়ে কফি শপ থেকে বাড়িতে এসে আব্বুর সাথে যখন ঐ ছেলেটাকে নিয়ে কথা বলছিল। তখন আমরাও খানিক অবাক হয়েছিলাম। মানে আব্বু তোর বিয়ে ঠিক করছে। এটা মানা যায় নাকি।আর ভাইয়া তোদের বিয়ে নিয়ে এখন যথেষ্ট কনসার্ন হয়েছে সেটা ভাইয়াকে দেখলেই বোঝা যায়। এই পরিস্থিতিতে আব্বুর এমন ডিসিশনে বাড়ির সবাই তো রেগে গেছিল।  তারপর আব্বু আমাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললো যে সে এই সব কিছুই অভিনয় করছে। কাল আজাদ খানের সাথে একটা বিজনেস ডিল কমপ্লিট হয়েছে তাই আব্বু পার্টির আয়োজন করেছিল মেইনলি। আর আজাদ খানের ছেলে নিবিড় খান কোইনসিডেন্টলি তোকে আগে থেকে চিনতো। তোদের নাকি শপিং মলে দেখা হয়েছিল। তো আব্বু সবার সাথে মিলে এই নাটক টা করে। "
-" তো এতো নাটক করার কারণ।
-" হুম। কারণ টা হলো ভাইয়া। আমরা সবাই জানি ভাইয়া এমনি এমনি কখনোই বলবে না সে তোদের বিয়ে টা মেনে নিয়েছে কি না । এ্যকচুয়ালি ভাইয়াকে তোদের বিয়েটা মেনে নেওয়ানোটাই আব্বুর মেইন মোটিভ ছিল।"
রিধি মাথায় হাত দিয়ে বললো-"কিহ্! লাইক সিরিয়ালি আপু। আমি তো ভাবতেই পারছিনা এসব নাটক ছিল। তোমরা এতো নিখুঁত অভিনয় করছো। আসলেই তোমরা অস্কার পাওয়ার মতো অনিভয় করছো।হাহা......।"
রিশা অসহায়ের মতো মুখ করে বললো- "কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো অস্কার টা পাবো না।"
-"সে যাই বলো আপু বড় আব্বুর মাথায় যে এতো কিছু ঘুরে আগে তো বুঝতেই পারি নি। তাইতো বলি তোমার ভাইয়ের মাথায় এতো শয়তান বুদ্ধি কিলবিল করে কেন।"
রিশা সরু চোখে চেয়ে বললো-" তুইকি আব্বুর প্রশংসা করলি নাকি অপমান করলি?
-" ধুর কি বলো। আমি কেন  বড় আব্বুর অপমান করবো। আসলে বড় আব্বুর মাথার বুদ্ধি গুলো সিআইডি ইন্সপেক্টর রিশাদ চৌধুরী হৃদের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি হিসেবে ট্রান্সলেট হয়েছে গেছে। বুঝোই তো জিনগত ডিএনের ব্যাপার স্যাপার। পরিবর্তন হয়ে গেছে।"
-" সেই শয়তানি বুদ্ধিধর অর্থাৎ আমার ভাই কিন্তু তোরই হাজবেন্ড। হিহিহি.......। তাই বুঝে শুনে কথা বলি। শেষে নিজেই না ফেসে যাস।"
 রিধি  সামনের চুল গুলো পিছনের দিকে দিয়ে স্টাইল নিয়ে দাড়িয়ে বললো-" ইয়েহ। আইছে। অয়নিকা চৌধুরী রিধিমা কখনো ফাঁসে না বুঝছো।"
 
-" হুম। সে না হয় বুঝলাম। এখন বলেন কাল কোথায় কোথায় ঘুরছেন।"
-" সে অনেক জায়গা।বলে শেষ দেওয়া যাবে না। বলতে অনেক সময় লাগবে।"
-" প্রবলেম নেই। আমার কাছে অনেএএএক সময় আছে। তুই শুরু কর।"
- " আপু ঘুম পাচ্ছে পরে বলি।
- " মারবো একদম পাজি মেয়ে। আগে বলবি তারপর ঘুম। না বললে ঘুমাতে দিচ্ছিনা।"
- " শেষে না পেরে রিশাকে সব বললো রিধি।"
সব শুনে রিশা অবাক হয়ে বললো- " কি বলছিল রিধি। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না ভাইয়া তোকে রিং পরিয়ে দিয়েছে। হুম হুম। তারমানে গোপনে গোপনে অনেক কিছুই হয়।"
শেষের কথাটা বাঁকা হেসে রিধিকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো রিশা।
রিধি থতমত খেয়ে বললো-" নাহ, আপু। তেমন কিছুই না।'
-" হাহাহা......। এই টুকুতেই আর লজ্জা পেতে হবে না। শোন আমি আজ চলে যাচ্ছি। নিশাত নিতে এসেছে। "
-" কি বলছো আপু চলে যাবে। সেই কবে থেকে একসাথে আড্ডা দেওয়া হয় না।"
-" আসবো তো দুইদিন পর তখন হবে সব।আজ আসি রে।"
 রিধি মুখটা ছোট করে সায় দিতেই রিশা চলে গেল।
......................
গভীর রাত। মুঘে মগ্ন চৌধুরীর বাড়ির সকলে। কাক পক্ষীদের শব্দেরও কোনো বালাই নেই। কংক্রিটের শহরে পাখপাখালির কলকল ধ্বনি শুনতে পাওয়া নেহাতই ভাগ্যের বিষয়। তবে গভীর রাত কিংবা সারা রাতই যন্ত্রে চালিত কলকারখানা অথরা গাড়ির হর্ন বাজার আওয়াজ টের পাওয়া যাবে তা নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই বললেই চলে।
রাত যখন নিশিথিনির বুকে দোল খাচ্ছে এমন সময় হুট করে ঘুম ভেঙ্গে গেল রিধির। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার। হাত- পা থরথর কাঁপছে তো কাঁপছেই। হার্ট-বিট সাধারণের তুলনায় দ্বিগুন বেড়ে গেছে। মাথা ভন ভন করে ঘরছে।
সারাদিন ঘুমানোর ফলে রাতে ঘুম আসছিল না হৃদের। তাই সেই কখন থেকে ছাদে বসে ছিল সে মাত্রই ছাদের সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই রিধির ঘর থেকে রিধির চিৎকার শুনতে পেল হৃদ। দ্রুত পায়ে রিধির ঘরে ডুকে ঘরের বাতি লাগিয়ে দিল। এসি চলছে তবুও ঘেমে আছে রিধি। রিধির এহেনো অবস্থা দেখে দ্রুত বেড সাইটের টেবিল থেকে পানি নিয়ে রিধিকে খাইয়ে দিলো হৃদ। তারপর সারা মুখে হালকা করে পানি ছিটিয়ে দিয়ে মুখ মুছে দিলো। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। মিনিট পনেরো পর স্থির হলো রিধি। তবে হাত-পা এখনো কাঁপছে। রিধিকে তুলে বালিশ দিয়ে রিধিকে বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসালো হৃদ। 
রিধি দুই গালে হাত দিয়ে বললো-" এখন কেমন লাগছে?
উত্তর দিল না রিধি।
-" কি হয়েছে? এখনো শরীর খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকবো?"
হৃদের কথা শেষ হতেই হৃদকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলো রিধি। রিধির হঠাৎ জড়িয়ে ধরায় খানিক অবাক হয়েছে হৃদ। তারমধ্যে আবার বাচ্চাদের কান্না করছে রিধি।আগে কখনো এভাবে কান্না করেনি রিধি। রিধি তো যথেষ্ট ম্যাচিউর তাহলে কি এমন হয়েছে যে রিধি এমন করে কাঁদছে।
 খানিক সময় নিয়ে রিধির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে হৃদ বললো-"আচ্ছা কি হয়েছে না বললে বুঝবো কিভাবে বলতো। আমি তো আছি তোর সাথে। কি হয়েছে?"
 রিধি কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো-" আমি দেখলাম মা মারা গেছে।
 -" মানে?
 -" স্বপ্নে দেখলাম মা মারা গেছে। আর আমি পাগলের মতো কান্না করছি। আমাদের বাড়ির গার্ডেনে কবর খোরা হচ্ছে মায়ের জন্য। মাকে যখন করব দিতে যাবে তখন আমি মায়ের আগেই কবরে গিয়ে সুয়ে পড়ি আর বলতে থাকি আমি মার সাথে যাব। আমাকে মায়ের সাথে কবর দিয়ে দাও। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনছে না। সবাই আমাকে ধরে জোর করে কোথায় যেনো নিয়ে গেল। আর আমি খনে খনে সেখান কার অন্ধকারের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। সবাই আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ পারছে না।"
 
-" আরে পাগলি। এইটা তো স্বপ্ন। স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না। "
-" তবুও আমার  মনটা কেমন যেনো কু- ডাকছে। আচ্ছা আমাদের পরিবারের ক্ষতি করবে না তো কেউ।"
-" আচ্ছা।আমি আছি তো নাকি। তুই এতো চিন্তা করিছ না।"
- "হুম।"
- " এখন। চুপচাপ লক্ষি মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পর। বেশি কান্না করলে আবার মাথা ব্যথা করবে। চোখ মুখ তো লাল হয়ে গেছে, প্লাস ফুলেও গেছে সে খেয়াল আছে। আমি কিন্তু চোখ ফোলা; মুখ ফোলা মেয়েকে বিয়ে করবো না।"
শেষের কথাটা রিধিকে হাসানোর জন্য বললো হৃদ।রিধি মুচকি হেসে কাঁথার নিচে মুখ লুকিয়ে ফেললো।মেয়েটা ইদানিং একটু বেশিই লজ্জা পায় তা বেশ ভালোই টের পাচ্ছে হৃদ।  বাতি বন্ধ করে ঘর থেকে বের হয়ে এলো সে।
...................
ঘরের বিছানায় সুয়ে পরলো হৃদ। একটি জিনিস নিয়ে হালকা চিন্তিত সে। সব কিছু যেন একটু বেশি স্বাভাবিক হচ্ছে। শত্রুরা যেনো নিজেদের হঠাৎ করেই গুটিয়ে নিয়েছে।
 হৃদ বিরবির করে বললো-" কিছু তো আছে যেটা মিস করে যাচ্ছি। না না চোখ কান খোলা রাখতে হবে। চারিদিকে শত্রুর শেষ নেই। কে যে বন্ধুর আড়ালে মুখোশ পরে আছে জানা নেই। জানা শত্রুর চেয়ে তো বন্ধু নামক শত্রু গুলোই বেশি ভয়ানক।"
....................
সারারাত ঘুম না হলেও শেষ রাতে একটু ঘুম ধরেছিলো হৃদের। সকাল হতে না হতেই ফোন বেজে উঠলো হৃদের। ঘুম ঘুম  হাতে কোনো রকমে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো হৃদ।
-" সিআইডি ইন্সপেক্টর রিশাদ চৌধুরী হৃদ স্পিকিং।
কে বলছেন?"
  অপর পাশ থেকে আতঙ্কিত বিধ্বস্ত এক স্বর ভেসে এলো -" স্যার, স্যার। প্লিজ হেল্প মি। আমি খুব বিপদে পরে আপনাকে ফোন করেছি। প্লিজ আমাকে রেসকিউ করে নিন। না হলেও ওরা আমাকে বাঁচতে  দেবে না।"
  
#চলবে 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন