#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব: ২১
নিরবে জঙ্গলের রাস্তা ধরে একটু ভিতরে ঢুকে গেল হৃদ। ভিতরে ঢুকেই তিনটা বড় বড় পরিত্যক্ত বাড়ি দেখতে পেল হৃদ। নিঃসন্দেহে বাড়ি গুলো অনেক পুরানো। চারিদিকে ধুলোবালি জমে গেছে।দেয়ালের গায়ে রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পাশেই কিছু মানুষের ফিসফিসিয়ে কথা শুনে দেয়ালের পিছনে লুকিয়ে গেল হৃদ। লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতে লাগলো অঙ্গাত সেই
কন্ঠস্বর-" বস। এদের কি করবো?
-.................
-" কিন্তু বস মেয়েগুলোকে তো কাল পাচার করার কথা ছিল।
-..................
-" ওকে বস । আপনি যখন বলছেন আমি রাত আটটায় মেয়েগুলোকে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।"
-..............
-" মেয়ে তো সতেরো জন। আপনি আঠারো জনের কথা বলছেন। আরেকটা কোথায়?'
-.................
-" ওকে বস। আপনি তাহলে টাইমলি মেয়েটিকে নিয়ে আসবেন। আমি সব ব্যবস্থা করছি।
-...............
-" ওকে বস রাখছি।
লোকটার কথা গুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো হৃদ। তবে এক আর এক দুই করতে বেশি সময় লাগলো তার।
মনে মনে বিরবির করে বললো-" এতো দেখছি মেঘ না চাইতেই জল। আমি তো ভেবেছিলাম ছেলেটা ধূর্ত। কিন্তু এ তো দেখছি চরম বোকা।আমি পিছনে লেগেছি জেনেও এখানে এলো। আর বড়সর নারী পাচারের পরিকল্পনা ও করা হচ্ছে এখানে। নির্ঘাত কোন মতলব আছে।"
.......................
অন্ধকারময় একটি ঘরে বন্ধি আছে রিধি। ঘরটায় নিকষ কালো অন্ধকার। আলোর কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। মাথাটা এখনো ঘুরছে রিধির। তবে চোখের সেই ঘুম ঘুম ভাবটি এখন আর নেই। বিছানায় সুয়ে ছিলো রিধি। মাথায় হাত দিয়ে বসে পরলো সে। মাথায় কেমন যেন একটা হালকা যন্ত্রণা হচ্ছে তার। কোথায় আছে? এখানে কি করছে? আস্তে আস্তে মনে করার চেষ্টা করলো রিধি সব কিছুই প্রথমে কেমন ঝাপসা হয়ে আসছিল। তারমধ্যে আলো বাতাসহীন ঘরে কেমন যেন হাসফাস লাগছিল রিধির। ফ্যাপসা গরমে শরীরটা গুলিয়ে আসলো তার। তবুও উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলো রিধি। উঠে দাড়াতেই মাথা আবার ঘুরে উঠলো রিধির। আবার বিছানায় বসে পড়লো সে। নিজেকে স্থির করে শান্ত হলো সে। তারপর একের পর এক সব ঘটনা মনে করতে লাগলো। নিজের ফরমাল গেইটআপ দেখে মনে পরলো সে তো ফরেনসিকে যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলো। মাথায় দুই হাত দিয়ে আবার ভাবতে লাগলো তারপর;তারপর কি হয়েছিলো মনে পরছেনা কেন আমার। নিজের পকেট হাতরিয়ে নিজের মোবাইল ফোনটা পেতেই খুশির ঝিলিক দেখা গেল রিধির মুখে। ফোন বের করে ফ্লাস লাইট জ্বালালো। তারপরই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো হৃদের মিসন্ড কল। সময় ব্যয় না করে হৃদকে তৎক্ষণাৎ কল করলো রিধি।
অপরিচিত লোকটার কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো হৃদ। মনে তার নানান ধরনের ছক চলছিল। এমন সয়ম হঠাৎ করে ফোন ভাইব্রেট হতে লাগলো। ভ্রু কুচকে এলো হৃদের এসময় আবার কে ফোন করলো। সচারাচার সে অপারেশনে থাকলে কারো ফোন রিসিভ করে না সবাই জানে তবে এখন কে কল করলো। সেখান থেকে নিরবে একট দূরে সরে এলো হৃদ। ফোন স্ক্রিনে রিধির নামটা দেখেই ব্যস্ত হাতে ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো।
ফোন রিসিভ করেই হৃদ তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো-" রিধি। তুই কোথায় আছিস? ভয় পাস না। আমি আছি তো তোকে বাঁচিয়ে নেব।"
রিধি মাথায় হাত দিয়ে বললো-" বুঝতে পারছি না কোথায় আছি। একটা ঘরে বন্ধি আছি। তাড়াহুড়ো তে ওরা হয়তো আমাকে চেক করেনি। তাই ফোনটা এখনোও আমার কাছে। মাথায় কেমন যন্ত্রণা করছে। মাথা খালি ঘুরে উঠছে।"
হৃদ ফিসফিসিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বললো-" তোর কিচ্ছু হবে না রিধি।আমি আছি তো। তুই শুধু দেখ তুই কেমন ঘরে আছিস। ঘরের কোনো জিনিস দিয়ে শব্দ করে আমাকে অন্তত ইঙ্গিত দে। যাতে আমি বুঝতে পারি তুই কোন দিকে ঘরে আছিস। এখানো তো অনেক গুলো ঘর গোলকধাঁধার মতো। কোন দিকে যাব আমি। একটু ইশারা দেওয়ার চেষ্টা কর।"
-" বুঝতে পারছি না আমি কি করবো? কিছু তো দেখতেও পাচ্ছি না।এ কেমন ঘর এটা। ওফ মাথাটায় যন্ত্রণা করছে খুব। শরীরটাও দূর্বল হয়ে আসছে।"
-" নিজেকে শান্ত রাখ রিধি। ঠান্ডা মাথায় ভাব প্লিজ। এখানে অনেক বড় একটা ডিল সাপ্লাই হচ্ছে। মেয়েদের দেশের বাইরে পাচার করা হচ্ছে। তোকেও পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিছু একটা করে আমাকে ইঙ্গিত দে প্লিজ। তোর নিজের জন্য না হলেও আমার জন্য একটু কষ্ট করে উঠে দাড়া। দেখ ঘর থেকে বের হতে পারিস কিনা কিংবা জানালা আছে কি না ঘরের। জানালা খুলে অন্তত জানান দে তুই কোথায়?"
উঠে দাড়ালো রিধি। ঘরটা বেশ বড়। অন্ধকারের জন্য আরও তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে রিধির।বাম দিকে টেবিলের কাছে একটা বড় জানালা দেখতে পেল রিধি। এগিয়ে খেল সেই দিকে। দুই হাত দিয়ে জানালা খুলার চেষ্টা করছে রিধি। কিন্তু খুলছে না। বহু দিন লক ছিল বিদায় জ্যাম হয়ে গেছে।
এদিকে হৃদ ফোনে অনবরত এটা- ওটি জিঙ্গেস করছে।
-" রিধি পেয়েছিস কিছু?
-" হুম। ঘরের বাম দিকে একটা বড় জানালা আছে। কিন্তু খুলতে পারছি না। মনে হয় জ্যাম হয়ে গেছে।
-" প্লিজ চেষ্টা কর রিধি। তোকে যে করেই হোক জানালাটি খুলতেই হবে।"
-" হুম। বলে পুনরায় চেষ্টা শুরু করতে লাগলো রিধি। প্রায় অনেকক্ষণের প্রচেষ্টার পর জানালাটা খুলতে পারলো রিধি। "
এমন সময় হুট করেই ঘরের দরজা খুলে গেল। একট তীক্ষ্ম আলোক উৎস চোখে এসে লাগলো রিধির। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেললো রিধি। লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে রিধির দিকে তা রিধি বেশ ভালোই বুঝতে পারছে।
কয়ক মিনিট পর আলোটা চোখে সয়ে গেল রিধির। চোখ দুটো খুলে অপরিচিত এক চেহারা দেখতে পেল রিধি। একটু ভেবে চেনার চেষ্টার করতেই রিধি বুঝতে পারলো । এ তো সেই ছেলে যে তাকে তুলে নিয়ে এসেছিল তাদের বাড়ি থেকে। লোকটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে রিধির দিকে।
রিধিও সাবধানে পিছিয়ে যেতে যেতে বললো-" কে আপনি? এখানে কেন নিয়ে এসেছেন আমাকে?
জবাব দিলো না লোকটি বিভৎস হাসিতে মেতে উঠলো। লোকটাকে দেখেই গা গুলিয়ে উঠলো রিধির। চিৎকার করে আবার বললো-" বলুন কে আপনি? এসবের মানে কি? আমাকে কেন এখানে নিয়ে এসেছেন। কী উদ্দেশ্য আপনার?"
লোকটি রিধির দিকে আসতে আসতে বললো-" চাই তো অনেক কিছুই। কিন্তু আপাতত তোমাকে চাই।"
-" মানে?
-" হাহাহাহাহা......। মানে হচ্ছে তোমার সাথে বাসর করতে চাই। শুনেছি তোমার আর হৃদের নাকি বাসর হয়নি। আজ তোমাকে অপবিত্র করে দেব আমি। তোমার সাথে বাসর করবো। নিজের মুখ আয়নায় দেখতেও গা গুলিয়ে উঠবে তোমার সুন্দরী। প্রতিটিদিন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করবে তুমি। "
রিধি কথাটা শুনে রাগে রোহান কে থাপ্পড় মারতে যায়। রোহান রিধির হাত ধরে বললো-" না না। এই হাত তো তো মারার জন্য না সুন্দরী । এই হাত তো আদর করার জন্য।"
রিধি রোহানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে নিতে বললো-" তোর ঐ নোংরা চোখে একদম আমার দিকে তাকাবি না বলে দিচ্ছি; না হলে আজই তোর শেষ দিন হবে।"
মাথা ঘুরে উঠলো রিধির। ধপ করে মেঝেতে বসে পরলো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তার।
রোহান রিধিকে দেখে হো.... হা..... করে হেসে উঠলো। লালসার নজরে তাকিয়ে বললো-" শুধু তাকাবো না। অনেক কিছুই করবো। ঠিক মতো তো দাড়াতে অবধি পারছিস না। অথচ কথার তেজ গেল না। এতো তেজ কই থাকে। আজ তোমার সব তেজ শেষ করে দেব। "
রোহান কথাটা বলেই রিধির দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে গেল। কি করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না রিধি। মাথায় কিছু আসছে না।
তারপর হঠাৎ জানালার দিকে নজর গেল রিধির। দুই ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো তার চোখ থেকে। এ যেন নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে অন্যরকম লড়াই। মানুষ বেঁচে থাকে আত্মসম্মান নিয়ে। কিন্তু সেই আত্মসম্মানে যখন আঘাত আসার সম্ভাবণা থাকে। তখন নিজের জীবণ দিতেও দু বার ভাবে না। গড়িয়ে পড়া অশ্রু ফোটা মুছে ফেললো রিধি। এখন কান্না করার সময় নয় পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দূরে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল রিধি রোহানকে।
গ্রীল বীহিন জানালার কাছে গিয়ে বললো-'" শুনে রাখ জানোয়ার। নারী সম্মান বাঁচাতে জীবন দিতে দুইবার ভয় পায় না। মরে যাব কিন্তু নিজের ইজ্জত দেব না। তোর মতো জানোয়ারের শিকার হবো না। মারা তো একদিন যাবোই। কিন্তু বিধি যদি আমার মরণ এভাবে লিখে থাকে তাহলে আমারও কোনো আফসোস নেই। বেঁচে থাকলে তোর জীবনের ভয়াবহ মৃত্যু নিয়ে আসবো তোর সামনে। মনে রাখিস নারীর শক্তি এতো সহজে হার মানে না। রিভেঞ্জ অফ নেচার বলে একটা কথা আছে মাইন্ড ইট।"
রোহান রিধিকে ধরার জন্য হাত বাড়াতেই ঘরের জানালা থেকে লাফ দেয় রিধি। শেষ বারের মতো হৃদ বলে চিৎকার দেয়।
..........................
রিধির ফোনটা অনেক আগেই কেটে গেছে। হৃদ ছন্নছাড়া পাগলের মতো এদিক সেদিক খুজতে লাগলো রিধি। এমন সময় উত্তর দিকের ঘর থেকে রিধি চিৎকার শুনে দৌড়ে গেল সেদিকে।
জানালার নিচে পরে আছে রিধির দেহখানি। কলকল করে রক্ত বের হচ্ছে হাত-পা থেকে। হৃদ দৌড়ে রিধির কাছে গেল। রিধির মাথাটা নিজের কুলে তুলে নিলো। একটা দিনে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বারবার। তৎক্ষণাৎ নীতির মৃত্যুর কথা মনে পরতেই শিউরে উঠলো হৃদ।
রিধি গলা ধরা কন্ঠে বলে উঠলো-" আজকে আপনার চোখ মুখে ভয় দেখতে পাচ্ছি আমি। হারানোর ভয়। এটাও কি সম্ভব রিশাদ চৌধুরী হৃদের মুখে ভয়ের ছাপ। আমি তো ভাবতাম রিশাদ চৌধুরী হৃদের হৃদয় কংক্রিটের মতো পাথর দিয়ে গড়া। আবেগ-অনুভূতি নেই।"
হৃদ রিধির মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে বললো-" চুপ কর রিধি। চুপ কর প্লিজ। আমিও মানুষ আমারও কষ্ট হয়। বিধাতা আমাকে এতো বড় শাস্তি দিতে পারে না। আমি যে নিজের কাছে প্রতিঙ্গা করেছি। তোর কিচ্ছু হতে দেব না।"
রক্ত- জর্জরিত মলিন হাতে রিধি হৃদের গালে ছুয়ে বললো-" ওরা আমাকে ছুতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তো আপনার বউ তাইনা। তিন কবুল পড়ে আমাদের বিয়ে হয়েছে। আপনি বিনা অন্য কেউ আমাকে ছুবে তা কি করে হতে পারে। আমি কিভাবে তা মেনে নেব বলুন।তাই তো জানালা দিয়ে লাফ দিয়েছি। তবে এইটা আমার শান্তি ভালোবাসে হোক কিংবা পরিস্থিতি র শিকার হয়ে আমি আমার স্বামীর কোলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো এটাই আমার প্রাপ্তি।"
হৃদ পাগলের মতো করতে করতে বললো-" এই রিধি এসব কি বলছিস। এসব বলিস না প্লিজ। আমি থাকতে তোর কিচ্ছু হতে পারে না। তোর সাথে যে আমার নিশ্বাস জড়িয়ে গেছে। তোর কিছু হলে আমিও বাঁচবো না।আর আমি যতক্ষণ নিশ্বাস নেব তোর কিচ্ছু হতে দেব না। তুই শুধু আমাকে একটু সময় দে প্লিজ।প্লিজ হাল ছাড়িস না।"
উত্তর দিল না রিধি। চোখ বুজে ফেললো। সেই সাথে গড়িয়ে পরলো অশ্রু কনা। হয়তো এ অন্যরকম প্রাপ্তি।যা পেতে হলে রিধি বারবার নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
রিধিকে কুলে নিয়ে উঠে দাড়ালো হৃদ। পিছনে ঘুরতেই রোহান তার লোকজন নিয়ে হাজির। হাতের লাঠি দিয়ে হৃদের মাথায় আঘাত করলো রোহান। তাল সামলাতে না পেরে একটু পিছিয়ে গেল হৃদ।
#চলবে