#ব্লাডিং_হার্ট
#স্বপ্নীল_সৃজনী
পর্ব:৩১
হৃদ বিছানা থেকে উঠে তাড়াতাড়ি রেডি হতে লাগলো। হৃদের তাড়াহুড়োর মধ্যে হঠাৎ করে রিধির ঘুম ভেঙ্গে গেল। ঘুম থেকে উঠেই রিধি হৃদকে তাড়াতাড়ি করে ঘর থেকে বের হতে দেখলো। রিধি পেছন থেকে ডেকে উঠলো হৃদকে। জ্বর এখন আর নেই রিধির শরীরে। তবে শরীরটা একটু একটু দুর্বল লাগছে।
রিধির ডাক শুনে পেছন ফিরে তাকালো হৃদ। রিধি নিজেকে সামলে হৃদের কাছে গিয়ে বললো
-" কোথায় যাচ্ছেন?
হৃদ রিধির গালে হাত দিয়ে ব্যস্ত স্বরে বললো
-" ইমারজেন্সি আছে একটু যেতে হবে। তুমি নিজের খেয়ার রেখো।"
রিধি সরু চোখে তাকিয়ে বললো-" কোন প্রবলেম কী? বেশ কিছু দিন বাসায় ছিলেন না। এখন আবার তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। কোন সিরিয়াস কিছু?"
হৃদ শান্ত গলায় মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বললো-" না তেমন সিরিয়াস কিছু না।"
রিধি খানিকটা সন্দেহ নিয়ে বললো-" তবুও আমার কেন যেন টেনশন হচ্ছে। আসবো আমি সাথে?"
শেষের কথাটা অভ্যাসবসত বলে ফেললো রিধি। তবে যখন বুঝতে পারলো কি বলেছে হৃদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো
-"সাবধানে যাবেন আর নিজের খেয়াল রাখবে।"
হৃদ বোধহয় একটু হতাশ হলো তবুও সেদিকে পাত্তা দিলো না রিধি। চঞ্চলতা পায়ে হাত কচলাতে কচলাতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল রিধি। আর হৃদ ব্যতিব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল মিশনের জন্য।
....................
দুপুরে তপ্ত রোদের ঘনঘটা শেষ হয়ে চারিদিকে আকাশময় দেখা দিল কুচকুচে কালো মেঘের আনাগোনা। আশপাশের পরিবেশ হঠাৎ করেই কেমন অন্ধকারে ছেয়ে গেল। নিকষ কালোর মাঝে হঠাৎ হঠাৎই বজ্রপাতে বিক্ষোভ চলছে। তবে বৃষ্টির দেখা নেই। শুকনো পরিবেশে এমন বজ্রপাতের মিছিল রিধির মনেও উথাল-পাথাল সৃষ্টি করছে। কোনো কিছুতেই মনোযোগ নেই তার। মনটা কেমন খচখচ করছে। ভয়ে যেন ছিটিয়ে যাচ্ছে তার মানব মস্তিষ্ক। অবচেতন মন বরংবার বলে দিচ্ছে ভয়ংকর কিছু ঘটতে চলেছে।
হৃদ চলে যাওয়ার পর ফ্রেস হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে সেই যে উপরে এসেছে রিধি। আর নিচে নামেনি। আজকাল হৃদ কাছে না থাকলেই কেমন যেন মন খারাপেরা এসে ভীর জমায়। কিছু করারও নেই এখন। তাই রিধি ভাবলো সময় নষ্ট না করে একটু পড়াশোনা করা যাক। কিন্তু টেবিলে বসে রিধি শুধু বসেই আছে, মন তার বিক্ষিপ্ত। নানান ভাবনায় ক্ষণেক্ষণে ডুব দিচ্ছি রিধি। আর হৃদপিন্ড ধকধক করে উঠছে।
ফোনের রিংটোনে ঘোর থেকে ফিরলো রিধি। বিছানায় তার ফোনটা অবিরাম ক্লান্তহীন ভাবে বেজেই চলেছে। রিধি হালকা পায়ে বিছানার কাছে এসে দাড়ালো। ফোন স্ক্রিনে ইশতিয়াক চৌধুরীর ম্যানেজারের নাম্বার ভেসে উঠতে দেখেই ভ্রু কুচকে গেল রিধির। ইশতিয়াক চৌধুরী ম্যানেজার কে সে চিনে ঠিকই। কিন্তু ফোনে কথা বলার মতো দরকার নেই তাদের।
"চৌধুরী গ্রুপ অফ কম্পানির"বর্তমান মালিক মূলত ইশতিয়াক চৌধুরী । এটা তাদের দাদাজান ইরহাম চৌধুরীর। তিনি একটু একটু করে গড়ে তুলেছেন এটা। অয়ন চৌধুরীর ব্যবসা - বাণিজ্য তেমন পছন্দ না বিদায় তাদের দাদাজান মারা যাবার পর তার বড় আব্বু ইশতিয়াক চৌধুরীই সব সামলে আসছে। দেশের টপ দশটা বিজনেস গ্রুপের একটা এটি। আর" নিলিমা ফ্যাসন হাউজের" মালিক নিলিমা চৌধুরী। চৌধুরী গ্রুপ অফ কম্পানির একটি ছোট্ট শাখা হচ্ছে নিলিমা ফ্যাশন হাউজ। যা নিলিমা চৌধুরী শখ করে করেছেন। নিলিমা চৌধুরী বরাবরই তার অন্যান্য ভাইজিদের থেকে রিধিকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। আর রিধিও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে নিলিমা চৌধুরীকে প্ল্যান দিয়ে এবং আরোও অনেক ভাবে সাহায্য করতো নিজের সিআইডির কাজ সামলে। তাই নিলিমা ফ্যাশন হাউজের তার যাতায়াত ভালোই ছিল আর সেখান কার অনেকের সাথেই তার ভালো চেনা জানা।
প্রয়োজনের তাগিদে মাঝে- মাঝে চৌধুরী গ্রুপ অফ কম্পনিতে সে এসেছে ঠিকই। তবে সেরকম কারো সাথে কথা হতো না। ইশতিয়াক চৌধুরী একবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সবার সাথে তখন শুধু একটু কথা বলেছিল।
রিধির ভাবনার মাঝে ফোনটা বেজে বেজে কেটে গেল। রিধি কল ব্যাক করার জন্য অবার ফোন করলে তখনই আবার রিধির ফোনটা বেজে উঠলো। এবার আর সময় নষ্ট করলো না রিধি। তৎক্ষণাৎ ফোন রিসিভ করে কানে ধরলো। স্বাভাবিক কন্ঠে ভদ্রতার সহিত
বললো-" আসসালামুয়ালাইকুম আঙ্কেল। বলুন কেন ফোন কেছেনে।'
ওপাশ ভেসে এলো ভয়ার্থ মিশ্রিত কন্ঠস্বর
-" ওয়ালাইকুমাসালাম রিধি। আমাকে চিনতে পেরেছো কি। আমি তোমার বড় আব্বু ইশতিয়াক চৌধুরীর ম্যানেজার বলছি। আসলে তোমাদের বাড়ির মধ্যে শুধু তোমার আর হৃদের নাম্বারই আছে আমার কাছে। হৃদকে কল করেছিলাম কিন্তু হৃদের নাম্বার বন্ধ বলছে। তাই তোমাকে কল করলাম।"
-" ইতস্তত করছেন কেন আঙ্কেল। বলুন,কি জন্য ফোন করেছেন?"
-" আসলে রিধি স্যার হার্ট অ্যাটাক করেছে। "
রিধি বিস্ফোরির কন্ঠে বললো-" এসব কি বলছেন আঙ্কেন। কখন, কীভাবে?"
-"সে সব কথা পরে শুনো রিধি। তুমি তাড়াতাড়ি সিটি হসপিটাল চলে এসো। আমরা অফিসের কর্মচারিরা মিলে স্যার কে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি। স্যারের অবস্থা তেমন ভালো না।"
অজানা ভয় ডানা বেধে গেল রিধির মনে। দমবন্ধকর এক পরিস্থিতি। কাঁপা কাঁপা স্বরে রিধি বলে উঠলো
-" আআআ মি এ ক্ষু ণি আসছি আঙ্কেল।"
ফোনের কানেকশন কেটে বিছানা থেকে উড়না নিয়ে গলায় জড়িয়ে নিলো রিধি। হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে মা, বড় মা বলে চিৎকার করে ডাকলো রিধি। নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে রিধি। কিন্তু পারছে না। কথা বলতে গেলেই গলাটা কেমন ধরে আসছে, চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে আসছে। অয়না চৌধুরী, ইরিনা চৌধুরী বসে গল্প করছিলেন একসাথে। আকম্মিক রিধির ডাক শুনে তৎক্ষণাৎ ঘর থেকে বের হয়ে নিচে এলেন তারা। অয়না চৌধুরী, ইরিনা চৌধুরীকে আসতে দেখে উল্টো দিকে ঘুরে চোখ মুছে নিলো রিধি।
তারপর অয়না চৌধুরী আর ইরিনা চৌধুরীর হাত ধরে সদর দরজার দিকে দৃষ্টি রেখে ধরা গলায় আস্তে করে রিধি বললো-" চলো আমার সাথে।"
অয়না চৌধুরী আর ইরিনা চৌধুরী কিছুই বুঝতে পারছে না। রিধি তাদের নিয়ে হনহনিয়ে গাড়িতে উঠে বসালো। অয়না চৌধুরী আর ইরিনা চৌধুরী রিধি কে বারবার প্রশ্ন করছে "তাদের নিয়ে কোথায় যাচ্ছে। কেন যাচ্ছে।"
রিধি ড্রাইভিং সিটে বসে সিট বেল্ট লাগিয়ে তাদের আড়ালে আবারও চোখের পানি মুছে আস্তে করে বললো
-" দরকার আছে। যেতে হবে।"
এরপর অয়না চৌধুরী আর ইরিনা চৌধুরী অনেক প্রশ্নই জিঙ্গেস করেছে কিন্তু কোন প্রশ্নেরই জবাব দেয়নি রিধি। চুপচাপ গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছে। রিধির কাছ থেকে কোন জবাব না পেয়ে শেষে অয়না চৌধুরী ইরিনা চৌধুরী আর কোন প্রশ্ন করেনি। ব্যর্থ হয়ে চুপচাপ বসে থাকে ব্যাক সিটে।
গাড়ি এসে থামলো সিটি হসপিটালের সামনে। রিধি গাড়ি থেকে নেমে ছুটে চলে গেল হসপিটালের ভিতরে। ভয় ঢুকে গেল অয়না চৌধুরী আর ইরিনা চৌধুরী মনে। তারাও রিধিকে অনুসরণ করে হসপিটাল ঢুকে গেল।
রিধি হসপিটালের ভিতরে এসেই ইশতিয়াক চৌধুরীর ম্যানেজারের কাছে এসে বললো
-" আঙ্কেল বড় আব্বু কেমন আছে এখন?
ম্যানেজার নিচের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত কন্ঠে বললো
-" স্যারের অবস্থা তেমন ভালো না। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্যারকে এখানে নিয়ে এসেছি। অপারেশনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্যারকে।"
পেছন থেকে সব শুনে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো ইরিনা চৌধুরী। অয়না চৌধুরী তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। নানান কথা বলে শান্ত হতে বলছেন কিন্তু তিনি থামতে নারাজ। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেল ইরিনা চৌধুরী। অয়না চৌধুরী তাকে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসে বাতাস করতে লাগলেন। আর নিজের চোখের পানি মুছে ইরিনা চৌধুরীকে শান্ত হতে বলছেন। অয়না চৌধুরীর আপন কোনো ভাই বোন নেই। তবে ইশতিয়াক চৌধুরীর তাকে ছোট্ট বোনের মতো ভালোবাসতেন।স্নেহ করতেন।নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না অয়না চৌধুরী। অয়না চৌধুরীও ইরিনা চৌধুরীর সাথে কেঁদে দিলেন। রিধি নিজের চোখের পানি মুছে মাকে শান্ত হতে বলছে আর বড় মাকে সামলাতে বলছে।
রিধির কাছ থেকে সব শুনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিশাতকে নিয়ে হসপিটালে এসেছে রিশা। মাকে পাগলের মতো কান্না করতে দেখে রিশার কান্নার গতিও বেড়ে গেল। ভয় ঢুকে গেল মনে। রিধি নিশাতের কাছে গিয়ে রিশাকে সামলাতে বলে আপারেশন থিয়েটার থেকে একটু দূরে করিডোরের দিকে গিয়ে হৃদকে কল করতে থাকে আর চোখের পানি মুছতে থাকে। হৃদ কল ধরছে না। ফোন বারবার রিং হয়ে কেটে যাচ্ছে।তবুও রিধি বারবার কল করতেই লাগলো। বহু বার চেষ্টার পর ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল-
-" কি হয়েছে রিধি বারবার কল করছো কেন। আমি একটা অপারেশনে আছি।"
রিধির কান্নার গতি যেন বেড়ে গেল। শুকনো ঢোক গিলে রিধি বললো
-" বড় আব্বুর অবস্থা ভালো না। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সিটি হসপিটালে চলে আসুন ইমিডিয়েটলি।"
হৃদ ছোট্ট করে আসছি বলে ফোন কেটে দিল।
..................
হসপিটাল আসতে আসতে দশটা বেজে গৃল হৃদের। রিসেপশনে গিয়ে খোজ নিয়ে নির্ধারিত কেবিনের সামনে এলো হৃদ। না কেউ তো নেই। সব কিছু কেমন শান্ত নিরিবিলি।
#চলবে...........