ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেয়সীর অভিমান

৩য় পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রিয়সীর_অভিমান

#পর্ব_৩
#জান্নাত
সবাই মিলে বারবার আদ্রিজাকে ডাকতে লাগল, কিন্তু তার কাছ থেকে কোনো সাড়া মিলল না। নিথর হয়ে পড়ে আছে সে। ওদের সবার কণ্ঠে তখন স্পষ্ট আতঙ্ক।
আদ্রিজা! মা, চোখ খোল!
এলিজার বুকটা ধক করে উঠল। আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সে দ্রুত তাদের ফ্যামিলি ডক্টরকে ফোন করল।
কিছুক্ষণ পরই ডাক্তার এসে উপস্থিত হলেন। দ্রুত আদ্রিজার কাছে গিয়ে তিনি তার পালস, রক্তচাপসহ শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর পরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মনে হচ্ছে অতিরিক্ত গরমের কারণে ওর শরীরে পানি আর লবণের ঘাটতি হয়েছে। সম্ভবত অনেকক্ষণ প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। এই গরমে শরীর অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে যাওয়ায় ও হিট এক্সহস্টশনে ভুগে জ্ঞান হারিয়েছে।
ডাক্তারের কথা শুনে সবাই কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও এলিজার মুখের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি কাটল না।সে তার এই বোনটাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে।
সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,ও ঠিক হয়ে যাবে তো, ডাক্তার?”
ডাক্তার আশ্বস্ত করে মাথা নাড়লেন।
অবশ্যই। আপাতত ওকে স্যালাইন দিতে হবে। শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। আর সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে আসবে।
ডাক্তারের কথায় ঘরের ভারী পরিবেশটা যেন একটু হালকা হলো।
এলিজা ধীরে ধীরে আদ্রিজার পাশে বসে তার কপালে হাত রাখল। গরমে ঘেমে ভেজা মুখটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল তার।
আমার মিষ্টি পাখি,কেন এমন করিস বলতো?
কিন্তু আদ্রিজা তখনও নিশ্চুপ।
চোখ দুটো বন্ধ। চারপাশের কোনো শব্দই যেন তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। শুধু স্যালাইনের ফোঁটা ফোঁটা পানি তার শরীরে ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায়।
____
আদিত্য ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরতেই আচমকা বেজে উঠল তার ফোন। ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই সেখানে ঝলমল করে ভেসে উঠল একটি নাম জান।
নামটা দেখামাত্রই অজান্তেই আদিত্যের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মিষ্টি এক হাসি। মুহূর্তের মধ্যেই তার গম্ভীর মুখটা যেন বদলে গেল। ফোনটা রিসিভ করে কোনো কথা না বলেই সে ধীর পায়ে বারান্দায় চলে গেল।
আদিত্য টানা আট বছর লন্ডনে ছিল। এক মাসেরও বেশি সময় হলো দেশে ফিরেছে। দেশে ফিরেই কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছে। শিক্ষকতা করা ছিল তার দীর্ঘদিনের শখ। তবে তার পাশাপাশি বাবার ব্যবসার দায়িত্বও সামলায় সে।
অথচ আট বছর আগে কেউই চায়নি আদিত্য দেশ ছেড়ে চলে যাক। কিন্তু সেই আট বছর আগের একটি ঘটনা তার জীবনটাকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল যে, অনেকটা জোর করেই তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।
দীর্ঘ আট বছর পর আবার নিজের দেশে ফিরেছে আদিত্য। ফিরে এসেছে পুরোনো মানুষ, পুরোনো স্মৃতি আর অতীতের কিছু না-বলা গল্পের কাছে।
ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কাঁদো কাঁদো এক কণ্ঠ
জান, তুমি আমাকে এখানে একা রেখে চলে গেছো। আমি তোমাকে খুব মিস করি, জান।
কণ্ঠটা শুনে আদিত্যের মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। বুকের ভেতরটাও কেমন ভারী হয়ে উঠল। নরম স্বরে সে বলল,
আমিও তোমাকে খুব মিস করছি, আমার জান।
তাহলে আমাকে এখানে একা রেখে এসেছো কেন?
ওপাশের অভিমানী কণ্ঠ শুনে আদিত্য কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে শান্ত করতে লাগল।
এভাবেই দুজনের কথোপকথন চলতে থাকে। 
______
অন্যদিকে...
আদ্রিজা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। চোখের পাতাগুলো তখনো ভারী। ঝাপসা দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকানোর পর বুঝতে পারল সে তার নিজের রুমে শুয়ে আছে।
পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেল, এলিজা বিছানার পাশে বসে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আদ্রিজার চোখ খুলতে দেখেই এলিজা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
এখন কেমন লাগছে মিষ্টি? কোথাও কষ্ট হচ্ছে না তো? মাথা ঘুরছে? শরীর খারাপ লাগছে না তো, মিষ্টি পাখি?
বোনের এমন অস্থিরতা দেখে আদ্রিজার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ক্লান্ত গলায় সে বলল,
আরে আপাই, আমি একদম ঠিক আছি। তুমি এতটা অস্থির হয়ো না তো।
কথাটা বললেও এলিজার চোখের দুশ্চিন্তা যেন কিছুতেই কমল না। সে আবারও আদ্রিজার কপালে হাত রেখে মমতাভরা চোখে তাকিয়ে রইল।
_______
আদ্রিজা নিঃশব্দে শুয়ে ছিল বিছানায়। রুমের হালকা আলোয় তার ফ্যাকাশে মুখটা আরও মলিন দেখাচ্ছে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো থামার নামই নিচ্ছে না।
জ্ঞান ফেরার পর সবাই একবার করে এসে তাকে দেখে গেছে। 
কিন্তু যার অপেক্ষায় আদ্রিজার মনটা বারবার দরজার দিকে ছুটে গেছে, সে একবারও আসেনি।
আদিত্য।
রাত গড়িয়ে এখন নয়টা বাজে। অথচ এতক্ষণে একবারের জন্যও আদ্রিজার কোনো খবর নেয়নি সে।
আদ্রিজা চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
সে জানে, তার ভুল হয়েছে। একজন ছাত্রী হয়ে নিজের টিচারকে সেভাবে কথা বলা মোটেও ঠিক হয়নি। আদিত্য তাকে শাস্তিও দিয়েছে কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে যতটুকু শাস্তি দেওয়ার দরকার, ততটুকুই।
কিন্তু তাই বলে কি সব শেষ?
কলেজে সে তার টিচার হতে পারে, কিন্তু কলেজের বাইরে তো সে তার আপন কাজিন। সেই সম্পর্কের খাতিরে অন্তত একবার এসে জিজ্ঞেস করতে পারত, কেমন আছিস?
কিন্তু আদিত্য এল না।একবারও না।
অবশেষে জমে থাকা অভিমানটা আর ধরে রাখতে পারল না আদ্রিজা। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,
তুমি আমাকে এতটাই ঘৃণা করো, আদিত্য ভাইয়া?
কথাটা বলতেই গলাটা কেঁপে উঠল তার।
তুমি তো আগে এমন ছিলে না। আমায় কত আদর করতে... কত ভালোবাসতে। আমি একটু কিছু করলেই তুমি আমার পক্ষ নিতে। তাহলে এখন তুমি কেন এভাবে বদলে গেলে?
চোখের পানি মুছে আবারও ফিসফিস করে উঠল সে,
আট বছর আগের ওই ঘটনায় তো আমার কোনো দোষ ছিল না, আদিত্য ভাইয়া। তাহলে কেন এখনও আমাকেই দোষী ভেবে আসছো? কেন?
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে এলো।
এক মুহূর্ত থেমে নিঃশব্দে কেঁদে উঠল আদ্রিজা।
আর কত দূরে ঠেলে দেবে আমাকে? আমি কি সত্যিই তোমার কাছে এতটাই খারাপ হয়ে গেছি?
রুমটা একেবারে নিস্তব্ধ,শুধু আদ্রিজার চাপা কান্নার শব্দটুকু সেই নীরবতা ভেঙে বারবার ফিরে আসতে লাগল।
____
মিসেস রুজিনা বেগম ধীর পায়ে ছেলের রুমে প্রবেশ করলেন। দরজা খোলার শব্দে আদিত্য চোখ তুলে তাকাল। মাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
 মা, তুমি? কিছু বলবে?
রুজিনা বেগম আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলেন না। ছেলের সামনে এসে কষ্টভরা কণ্ঠে বললেন,
 মিষ্টি মায়ের সাথে তুমি কী করেছো, আদিত্য? আমি জানি, এর পেছনে তুমিই আছো। কেন তুমি মিষ্টির সাথে এমন আচরণ করো? মেয়েটাকে তুমি একটুও সহ্য করতে পারো না, সেটা বুঝি। কিন্তু তাই বলে ওর সাথে এতটা কঠোর হওয়ার কী দরকার?
মায়ের কথা শুনে আদিত্যের মুখটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
তা তোমরা খুব ভালো করেই জানো, মা।
কণ্ঠে এবার জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
 ওকে দেখলেই আমার আপেলির কথা মনে পড়ে যায়! তোমরা হয়তো আপেলিকে ভুলে যেতে পেরেছো, কিন্তু আমি... আমি এখনো আমার আপেলিকে ভুলতে পারিনি, মা।
এক মুহূর্তের জন্য আদিত্যের চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠল। বুকের ভেতর চাপা পড়ে থাকা পুরোনো যন্ত্রণাটা যেন আবারও জেগে উঠেছে।
 আজ শুধু ওই মেয়েটার জন্যই আপেলি আমাদের সাথে নেই। ও একটা খুনি!
কথাটা বলেই আদিত্য থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর ভারী কণ্ঠে আবার বলল,
 ওকে দেখলেই আমার রাগ উঠে যায়। ওকে আমার সহ্য হয় না, মা। যতবার ওকে সামনে দেখি, ততবার মনে হয়... আমার আপেলিকে হারানোর জন্য ও-ই দায়ী।
রুজিনা বেগম ছেলের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু আদিত্যের রাগ তখনও কমেনি।
 আর আজ কলেজে ও অন্যায় করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি ওকে শাস্তি দিয়েছি। এতে আমার কোনো দোষ নেই।
আদিত্য এবার মায়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
 তাই ওর হয়ে আমার কাছে সাফাই গাইবে না, মা। প্লিজ।
কথাগুলো বলে আদিত্য মুখ ফিরিয়ে নিল।
আর রুজিনা বেগম নিঃশব্দে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। 
চলবে,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন