#প্রেয়সীর_অভিমান
#পর্ব_৪
#জান্নাত
পরদিন সকালটা ছিল বেশ শান্ত। গতকালের অসুস্থতার ছাপটুকুও আর আদ্রিজার মুখে নেই। এখন সে পুরোপুরি সুস্থ। ড্রয়িংরুমের সোফায় চুপচাপ বসে ছিল আদ্রিজা। অকারণেই যেন তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল দরজার দিকে।
ঠিক তখনই বাইরের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল আদিত্য।
আদ্রিজার দৃষ্টি মুহূর্তেই গিয়ে আটকালো আদিত্যের ওপর। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই আদিত্যও এক পলকের জন্য তাকাল তার দিকে।
দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।
কিন্তু পরমুহূর্তেই আদ্রিজার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
আদিত্যের চোখ দুটো কেমন লাল হয়ে আছে! চোখের নিচেও ক্লান্তির স্পষ্ট ছাপ। মনে হচ্ছে যেন বহুক্ষণ ঘুমায়নি।
আদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
লোকটা কি সারারাত ঘুমায়নি? চোখ দুটো এমন লাল হয়ে আছে কেন?
মুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে নিল আদিত্য একবারও কিছু না বলে, এমনকি কোনো কথা বলার প্রয়োজনও বোধ না করে সোজা নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
আদ্রিজা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার পথে।
আদিত্য যেভাবে তাকে এড়িয়ে গেল, তাতে মনে হলো আদ্রিজা যেন কোনো ভয়ংকর অপরাধ করেছে সে তার দিকে তাকিয়ে। যেন তার দিকে তাকানোও আদিত্যের কাছে বিরক্তিকর।
আদ্রিজার তো কোনো দূষ ছিলোনা,সেও আপেলিকে ভীষন ভালোবাসতো।
তবুও কেন এই অবহেলা?কেন এই নির্লিপ্ততা?
কেন আদিত্যের চোখে এতটা রাগ, এতটা অভিমান?
প্রশ্নগুলো একের পর এক এসে তার বুকের ভেতরটাকে ভারী করে তুলল।
আদ্রিজা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
অদ্ভুত ব্যাপার, একটা মানুষের সামান্য অবহেলাও কখনো কখনো কতটা গভীরভাবে আঘাত করতে পারে!
আদিত্যের সেই উপেক্ষা আদ্রিজাকে বাইরে থেকে যতটা নির্বিকার দেখাচ্ছিল, ভেতর থেকে ঠিক ততটাই ভেঙে দিচ্ছিল।
এই মানুষটার অবহেলা যে তার সহ্য হচ্ছে না।
_________
ক্লাসরুমের একপাশে বসে আরাবি আর বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলছিল আদ্রিজা। তবে কথা বলছিল মূলত ওরাই দুজন। আদ্রিজা বরাবরের মতোই চুপচাপ, নীরবে বসে ওদের কথাগুলো শুনছিল।
হঠাৎ করেই ক্লাসরুমের দরজা দিয়ে আদিত্যের প্রবেশ।
মুহূর্তেই যেন পুরো ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেল। হাসি-ঠাট্টা, ফিসফাস সবকিছু থেমে গেল এক নিমিষে। সবাই যার যার জায়গায় সোজা হয়ে বসে পড়ল।
আজ আদিত্যকে যেন অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।
গায়ে পরিপাটি কালো শার্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, গম্ভীর মুখে সেই চিরচেনা কঠিন ভাব। কালো পোশাকটা যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। চুলগুলো সামান্য এলোমেলো, কপালের ওপর দু-একটি চুল এসে পড়েছে। তীক্ষ্ণ চোখদুটো পুরো ক্লাসরুম একবার পরখ করে নিতেই যেন সবাই আরও চুপ হয়ে গেল।
বৃষ্টি হঠাৎ আদ্রিজার বাহুতে আলতো করে ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
উফ! স্যারকে আজ কী সুন্দর লাগছে রে! অবশ্য প্রতিদিনই লাগে, কিন্তু আজ যেন একটু বেশিই সুন্দর লাগছে। একদম মাখনের মতো! মন চাইছে একদম খেয়ে ফেলি।
বৃষ্টির কথা শুনে আদ্রিজার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে অন্য কেউ এমন কথা বলবে, আর সেটা চুপচাপ সহ্য করবে এতটা উদারতা আদ্রিজার নেই!
ও বৃষ্টির দিকে কটমট করে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলল,
চুপ করবি তুই! নাকি মুখে স্ট্যাপলারের পিন মেরে দেবো? বেয়াদব কোথাকার!
কথাটা একটু জোরেই বেরিয়ে গেল।
মুহূর্তেই পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ।
আরাবি থেমে গেল। বৃষ্টি চোখ বড় বড় করে আদ্রিজার দিকে তাকিয়ে রইল। ক্লাসের প্রায় সবাই এবার একসঙ্গে আদ্রিজার দিকে তাকাল।
আদ্রিজার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে কী বলে ফেলেছে!
ধীরে ধীরে ভয়ে ভয়ে সামনে তাকাতেই তার চোখ আটকে গেল আদিত্যের চোখে।
আদিত্য রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
ভীষণ গম্ভীর, তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টি যেন মুহূর্তেই আদ্রিজার সমস্ত সাহস কেড়ে নিল।
আদ্রিজা ঢোক গিলে মাথাটা নিচু করে ফেলল।
মনে মনে শুধু একটাই কথা ঘুরপাক খেতে লাগল
শেষ! আজকে মনে হয় সত্যিই আমার কপালে বিপদ আছে!
আদিত্য ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। মুখটা বরাবরের মতোই গম্ভীর, চোখে কঠিন দৃষ্টি। পুরো ক্লাসরুম মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আদিত্য কড়া কণ্ঠে বলে উঠল,
এই মেয়ে, দাঁড়াও।
আদ্রিজার বুকটা ধক করে উঠল। ভয়ে ভয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল সে।
আদিত্য ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
এটা কী আড্ডা দেওয়ার জায়গা?
আদ্রিজা ভয়ে মাথা নাড়ল। তারপর নিচু কণ্ঠে বলল,
না স্যার... সরি স্যার। আর এমন হবে না।
কিন্তু আদ্রিজার ক্ষমা চাওয়ায় যেন তার কোনো ভ্রুক্ষেপই হলো না। বরং আরও কঠিন গলায় বলে উঠল,
হাত বাড়াও।
আদ্রিজা বিস্মিত চোখে তাকাল আদিত্যের দিকে।
স্যার...
কী হলো? হাত বাড়াও!
আদিত্যের ধমকে আদ্রিজা কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে নিজের হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল।
বৃষ্টি আর চুপ থাকতে না পেরে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আদিত্য কঠিন চোখে তাকিয়ে বলল,
তোমাকে এখানে কথা বলতে বলিনি।
এক মুহূর্তেই বৃষ্টি চুপ হয়ে গেল।
আদিত্য পাশের একজন ছাত্রের কাছ থেকে একটা স্কেল নিল। তারপর কোনো রকম দ্বিধা না করে আদ্রিজার বাড়িয়ে দেওয়া হাতে পরপর পাঁচটি আঘাত করল।
প্রতিটি আঘাতে আদ্রিজার শরীর কেঁপে উঠছিল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথাটা সহ্য করছিল সে। চোখের কোণে পানি জমে উঠেছে, কিন্তু সবার সামনে কাঁদতে চাইছে না।
কিছুক্ষণ পর আদিত্য থামল।
আদ্রিজার হাতের তালুতে আঘাতের দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যথায় হাতটা অবশের মতো লাগছে।
আদিত্য ঠান্ডা অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে বলল,
আর যেন আমার ক্লাসে তোমাকে কথা বলতে না দেখি। পরেরবার এর চেয়ে ভয়ানক কিছু হবে।
কথাটা বলে স্কেলটা টেবিলের ওপর রেখে দিল সে।
আদ্রিজা কোনো কথা বলল না।
শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা যেন কান্নায় ফেটে যাচ্ছে। এতগুলো মানুষের সামনে অপমান আর ব্যথা সবকিছু মিলিয়ে চোখের পানি আর কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারছে না সে।
আরাবির আদিত্যের প্রতি তার রাগে শরীর জ্বলে উঠছে।
একজন মানুষ কীভাবে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে?
আদ্রিজা ভুল করেছে, কথা বলেছে তার জন্য বকা দিতে পারত। অন্যভাবে শাস্তি দিতে পারত। কিন্তু এভাবে?
আরাবি দাঁতে দাঁত চেপে আদিত্যের দিকে তাকিয়ে রইল।
পুরো ক্লাসরুম তখন পিনপতন নীরবতা।
আজ যেন সবাই তাদের চেনা আদিত্য স্যারের অন্য একটা রূপ দেখল।
তারা জানত, আদিত্য রাগী। ভীষণ রাগী। তার ক্লাসে কেউ নিয়ম ভাঙার সাহস পায় না। কিন্তু আজকের মতো এতটা কঠোর তাকে তারা আগে কখনো দেখেনি।
তবে এই দৃশ্য দেখে সবার মতো মন খারাপ হয়নি একজনের।
সে হলো ইলমা।
ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি নিয়ে বসে ছিল সে।
আদ্রিজাকে সে কোনোদিনই সহ্য করতে পারে না। কারণ ক্লাসের পড়াশোনা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আদ্রিজা সবার আগে। শিক্ষকদের প্রিয়, পরীক্ষায় সেরা সবকিছুতেই যেন আদ্রিজার আলাদা একটা জায়গা।
আর এই বিষয়টাই ইলমার ভেতরে তীব্র হিংসার জন্ম দিয়েছে।
আজ প্রথমবার আদ্রিজাকে সবার সামনে এভাবে অপমানিত হতে দেখে তার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ হলো।
মনে মনে সে বলল,
বেশ হয়েছে।
অন্যদিকে আদ্রিজা তখনও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুগুলো একসময় নীরবে গড়িয়ে পড়ল।
________
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আদ্রিজার শরীরটা যেন আরও কাঁপতে শুরু করল। হাতের তীব্র ব্যথার সঙ্গে এবার জ্বরও উঠেছে। শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসতেই এলিজা আর সাহারা বেগমের বুকটা দুশ্চিন্তায় কেঁপে উঠল।
ডাক্তার এসে আদ্রিজাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে গেছেন। প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেছেন, সঙ্গে দিয়েছেন কিছু নির্দেশনাও।
এলিজা তখনও বোনের মাথার পাশে বসে আছে। এক হাতে ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড়, অন্য হাতে আদ্রিজার কপালে আলতো করে জলপট্টি দিচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই করতেই আদ্রিজার জ্বরটা কিছুটা কমে এলো। শরীরের কাঁপুনিটাও ধীরে ধীরে থেমে গেল।
এলিজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বোনের দিকে তাকাল। চোখেমুখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
আমি আজ তোর কাছেই থাকব।
আদ্রিজা দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল।
না আপাই… তুমি যাও। তোমারও তো বিশ্রাম দরকার। আমার কিছু হবে না।
কিন্তু
সত্যি বলছি আপাই। এখন জ্বরটাও কমেছে। তুমি যাও।
বোনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল এলিজা। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল।
কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকবি।
আদ্রিজা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
এলিজা ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল।
এরপর ধীরে ধীরে রাত আরও গভীর হলো।
চারপাশ নিস্তব্ধ। পুরো বাড়িটা যেন ঘুমের রাজ্যে ডুবে আছে।
______
রাত তখন প্রায় দুটো।
হঠাৎ আদ্রিজার ঘরের বেলকনির দরজা দিয়ে নিঃশব্দে একজন ভেতরে প্রবেশ করল।
অন্ধকারে তার অবয়বটা স্পষ্ট বোঝা গেল না। পায়ের শব্দ পর্যন্ত যেন সে নিজের মধ্যে আটকে রেখেছে।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে আদ্রিজার বিছানার পাশে দাঁড়াল।
ঢিম লাইটের আলোয় আদ্রিজার মলিন মুখটা চোখে পড়তেই আগন্তুকের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
এই সেই মুখ, যেটা দেখলেই তার পৃথিবীটা বদলে যায়।
কিন্তু আজ সেই মুখে নেই কোনো প্রাণবন্ততা। নেই কোনো হাসি। কপালে জ্বরের ছাপ, মুখে অসহ্য কষ্টের ছায়া।
আগন্তুকের বুকটা ভারী হয়ে এলো।সে আরও কাছে এগিয়ে গেল।
খুব সাবধানে আদ্রিজার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। ব্যথায় কুঁকড়ে থাকা হাত দুটো দেখে তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল সে।
তার চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল পানি।
মনে মনে বলে
কতটা নিষ্ঠুর হলে একজন মানুষ এমন আচরণ করতে পারে?
কতটা পাষাণ হলে এই কোমল মানুষটার চোখে পানি আনতে পারে?
পরক্ষণেই তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল।
মায়ার জায়গা দখল করল তীব্র ক্রোধ।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফিসফিস করে বলল
এর শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে, আদিত্য চৌধুরী।
কণ্ঠে তখন চাপা আগুন।
আমার জানপাখিকে দেওয়া প্রতিটা আঘাতের মূল্য তোমাকে দিতে হবে। প্রতিটা অশ্রুর হিসাব দিতে হবে তোমাকে।
কথাগুলো বলেই সে আবার আদ্রিজার দিকে তাকাল।
রাগে তার চোখ জ্বলছে, অথচ সেই চোখেই নিজের অজান্তে জমে আছে ভালোবাসা আর মায়া।
আদ্রিজা কিছুই জানল না।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে শুধু অনুভব করল কেউ একজন খুব যত্ন করে তার ব্যথায় ভরা হাত দুটো ধরে আছে।
আর সেই অচেনা রাতের নীরবতায়, কারও চোখের জল নিঃশব্দে ঝরে পড়ল তার হাতের ওপর।
চলবে,,,,