ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেয়সীর অভিমান

১০ম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেয়সীর_অভিমান

#পর্ব_১০
#জান্নাত
আদ্রিজার সারা শরীর কাঁপছে। বুকের ভেতরটা যেন অকারণে ধকধক করে ছুটে চলেছে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই পরিস্থিতিতে কী করবে, কীভাবে নিজেকে সামলাবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে।
কে এই লোকটা?কেনই বা তার সঙ্গে এভাবে লুকোচুরি খেলছে? আর কেন তাকে এমনভাবে ধরে রেখেছে?প্রশ্নগুলো একের পর এক মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ কোনো প্রশ্নের উত্তরই মিলছে না।
আদ্রিজা ধীরে ধীরে চোখ মেলে সামনে তাকাল। অচেনা মানুষটার উপস্থিতিতে বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই তার ভাবনার মাঝখানে লোকটি আবারও খুব নিচু, ফিসফিসে কণ্ঠে বলে উঠল
আমাকে কেন এভাবে জ্বালিয়ে দিচ্ছো?
কেন তোমার মায়ার আগুনে প্রতিনিয়ত পুড়ছি আমি?কেন তোমার একটুখানি উপস্থিতিতেই
আমার সমস্ত অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে?কেন তোমার প্রতি এই অদৃশ্য আসক্তিআমার সমস্তটুকু গ্রাস করে নিচ্ছে?কেন তোমার মায়াজালে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছি।যেখানে নিজেকে হারিয়েও তোমাকে হারানোর ভয়টাই সবচেয়ে বেশি?
বলতো,কেন তোমার আসক্তিতে আমার সর্বস্বটুকু তোমার হয়ে যাচ্ছে?
আদ্রিজা এবার নিজের সর্বশক্তি দিয়ে লোকটাকে ধাক্কা দিল। কিন্তু আশ্চর্য! লোকটার শরীর যেন পাথরে গড়া এক চুলোও নড়ল না। বরং তার প্রতিরোধে লোকটার মুঠো আরও শক্ত হয়ে উঠল। আরও চেপে ধরল আদ্রিজাকে।
আদ্রিজার সমস্ত সাহস মুহূর্তেই দমে গেল।
লোকটা ঠান্ডা, ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
কী ম্যাডাম? এনার্জি শেষ?
কথাটা বলেই আদ্রিজার মুখের ওপর রাখা হাতটা সরিয়ে নিল সে।
মুক্ত বাতাস পেয়ে আদ্রিজা হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল,
ক,কে আপনি?
লোকটা ধীরে ধীরে তার মুখটা আদ্রিজার কানের কাছে নিয়ে গেল। তারপর এমন এক হিমশীতল স্বরে ফিসফিস করে বলল,
তোমার প্রেমিক পুরুষ।
কথাটা কানে পৌঁছাতেই আদ্রিজার বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে সারা শরীর দিয়ে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এই কণ্ঠস্বর... এই অদ্ভুত পরিচিতি... অথচ মানুষটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না!
আদ্রিজা ভয়ে গিলে নিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল,
আ,আমাকে এখানে কেন এনেছেন?
লোকটার ঠোঁটের কোণে যেন অদৃশ্য এক হাসি ফুটে উঠল।
শাস্তি দিতে।
আদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
শ,শাস্তি? কিসের শাস্তি?
লোকটা এবার ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে এল। আদ্রিজার চোখ ভয়ে বড় হয়ে গেল। পরমুহূর্তেই লোকটার আচমকা করা অপ্রত্যাশিত এক অঙ্গভঙ্গিতে সে আরও আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
আদ্রিজা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকল না। সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। বারবার চেষ্টা করতে লাগল তার শক্ত বাঁধন থেকে মুক্ত হতে।
কয়েক মিনিটের সেই অসহ্য লড়াইয়ের পর অবশেষে লোকটা তাকে ছেড়ে দিল।
আদ্রিজা কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
আর আদ্রিজা?
সে পাথরের মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের সামনে যেন সবকিছু ঝাপসা হয়ে এসেছে। বুকের ভেতরটা তখনও ভয় আর অজানা প্রশ্নে তোলপাড় করছে।
যতক্ষণে তার হুঁশ ফিরল, ততক্ষণে লোকটা অনেক দূরে চলে গেছে।
কিন্তু যাওয়ার আগে তার বলা সেই কথাটা যেন বারবার আদ্রিজার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল
তোমার প্রেমিক পুরুষ।
____
আদ্রিজা কাঁপা হাতে নিজের ঠোঁট দুটো মুছে নিল। চোখেমুখে রাগ, অভিমান আর অপমানে মিশে থাকা অস্থিরতা। দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
লুচ্চা কোথাকার! এসেছে আমার প্রেমিক পুরুষ সাজতে। অসভ্য কোথাকার!
কথাগুলো বলতে বলতেই চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সে তো তার আদিত্য ভাইয়াকে ছাড়া আর কাউকেই চায় না। তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি অনুভূতিতে শুধু একজনেরই অস্তিত্ব আদিত্য।
তবুও…
এই লোকটা যখনই তার কাছে আসে, বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়। মনে হয়, লোকটাকে সে বহুদিন ধরে চেনে। তার বাহুডোরে নিজেকে অকারণেই নিরাপদ মনে হয়। সেই স্পর্শে এমন এক অচেনা অথচ পরিচিত অনুভূতি জেগে ওঠে, যার কোনো ব্যাখ্যা সে নিজেই খুঁজে পায় না।
কিন্তু কেন?কেন এই অচেনা মানুষটার কাছে এলেই তার হৃদয় এমন অদ্ভুত আচরণ করে?
পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেই থমকে গেল আদ্রিজা।
আচ্ছা… এটা আদিত্য ভাইয়া নয় তো?
চোখ দুটো সরু করে কিছুক্ষণ ভাবল সে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে নিজেকেই বলল,
না। এবার থেকে আমাকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। যেই হোক না কেন, লোকটাকে হাতেনাতে ধরতেই হবে।
এই বলে আবার স্টেজের দিকে পা বাড়াতে নিল সে।
কিন্তু ঠিক তখনই
সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল আদিত্য।
আদ্রিজা থমকে গেল।
আদিত্য কয়েক মুহূর্ত নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে ছিল কঠোরতা, বিরক্তি আর অদ্ভুত এক রহস্য। তারপর গম্ভীর, কঠোর কণ্ঠে বলে উঠল,
কী রে? তোকে নিষেধ করেছিলাম না, এভাবে সেজে আসতে? আমার কথা অমান্য করার সাহস কী করে হয় তোর?
আদ্রিজা কিছু বলার আগেই আদিত্য তার হাত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এল। তারপর তাকে গাড়ির দিকে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিল। আচমকা ধাক্কায় আদ্রিজার শরীরে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ল। চোখের কোণে আবারও পানি জমে উঠল।
আদিত্য সেই অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।
এই চোখের পানি দিয়ে তোর প্রেমিক পুরুষকে বশে আনতে পারলেও… এই আদিত্য চৌধুরীকে বশে আনতে পারবি না।
কথাটা শুনেই আদ্রিজা যেন পাথর হয়ে গেল।
প্রেমিক পুরুষ!
আদিত্য ভাইয়া সেই লোকটার কথা জানে কীভাবে?
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।আদিত্য ভাইয়া কীভাবে জানলো?’
আদ্রিজার মুখের পরিবর্তন আদিত্যর চোখ এড়াল না। বরং তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল।সে ধীর কণ্ঠে বলল,
কী মনে করেছিস? তোর সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর রাখি না আমি?
একটু থেমে আদ্রিজার চোখের দিকে তাকিয়ে যোগ করল,
তোর প্রেমিক পুরুষ তো তোর জন্য পুরোপুরি দেওয়ানা হয়ে গেছে।
আদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
তাহলে…
যে মানুষটাকে সে এতক্ষণ অচেনা ভেবে খুঁজে বেড়াচ্ছে… সে আসলে কে?কেন এতো রহস্য?
_____
রাত গভীর হয়েছে। চারপাশ যখন নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে, তখনও আদ্রিজার চোখে ঘুমের কোনো ছোঁয়া নেই। নিজের ঘরের বিছানায় চুপচাপ বসে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে সে।
কে সেই প্রেমিক পুরুষ?
বারবার লোকটার কথা মনে পড়ছে। তার কণ্ঠস্বর, তার আচরণ, তার স্পর্শ সবকিছু কেমন যেন অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হয়। হঠাৎই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে আদ্রিজার।
নাকি... সেই মানুষটা আদিত্য ভাইয়াই?
যদি সত্যিই আদিত্য ভাইয়াই হয়ে থাকে, তাহলে কেন এত লুকোচুরি? কেনই বা নিজের পরিচয় গোপন করে তার সামনে আসছে? কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে?
আদ্রিজা কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারে না।
এরই মাঝে মনে পড়ে যায় কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। আদিত্য নিজেই তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে বেশ কড়া গলায় শাসিয়েও গেছে যেন আদ্রিজা তার কথা অমান্য করার সাহস না পায়।
সেই ঘটনার পর থেকেই নিজের ঘরে আটকে আছে আদ্রিজা। কারো সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছেটুকুও হচ্ছে না তার।
কিন্তু আদ্রিজা জানে না, এই বাড়িরই অন্য এক প্রান্তে কেউ একজন তার আর আদিত্যের এই ঘনিষ্ঠতা সহ্য করতে না পেরে রাগে-ক্ষোভে জ্বলছে।
চোখেমুখে তার তীব্র ক্রোধ।
সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আদিত্য ধীরে ধীরে আদ্রিজার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। যত দিন যাচ্ছে, আদ্রিজার প্রতি তার আচরণে অদৃশ্য এক টান স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
না!
এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না।
আদিত্য যদি সত্যিই আদ্রিজাকে ভালোবেসে ফেলে? যদি একদিন আদ্রিজাকে নিজের জীবনের অংশ করে নেয়?
ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে।
আদিত্য আদ্রিজাকে ভালোবাসুক এটা সে কিছুতেই মেনে নেবে না। আদ্রিজা তার কাছাকাছি থাকুক, সেটাও নয়।
যে করেই হোক, এর আগেই কিছু একটা করতে হবে তাকে।
অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর হঠাৎই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অদ্ভুত হাসি। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দ্রুত একটি নম্বরে কল করল।
ওপাশের মানুষটি ফোন ধরতেই নিচু গলায় কথা বলতে শুরু করল সে।
কয়েক মিনিট ধরে চলল ফিসফিস করে কথোপকথন।
তারপর ফোন কেটে দিলো।
কয়েক মুহূর্ত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ তুলতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক কুটিল হাসি।
সেই হাসির আড়ালে যেন লুকিয়ে আছে আসন্ন কোনো ঝড়ের ইঙ্গিত।
আদ্রিজা কি জানে, তার অজান্তেই তাকে ঘিরে কেউ একজন ভয়ংকর এক খেলা শুরু করে দিয়েছে?
চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন