ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেয়সীর অভিমান

১১তম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেয়সীর_অভিমান

#পর্ব_১১
#জান্নাত
এলিজার বিয়ের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই যেন বাড়িটা মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠছে। একে একে মেহমান আসতে শুরু করেছে। অবশ্য মেহমান বলতে আদ্রিজা আর আদিত্যের মামা, খালা, ফুপু আর কাজিনরাই সব মিলিয়ে আপনজনেরাই ভরে উঠছে পুরো বাড়ি।
এরই মাঝে আদিত্যের বড় খালামনিও এসে পৌঁছেছেন। সঙ্গে তার দুই ছেলে-মেয়ে আশিক আর ইশিতা।
বিদেশ থেকে ফিরে আসার পর এই প্রথম ইশিতার সঙ্গে দেখা হলো আদিত্যের। আর প্রথম দেখাতেই মেয়েটার যেন চোখ আটকে গেল আদিত্যের ওপর।
আদিত্যকে দেখেই ইশিতা একেবারে কুপোকাত!
কী এক অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে বারবার আদিত্যের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে সে। কখনো অকারণে পাশ দিয়ে যাচ্ছে, কখনো দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাচ্ছে। চোখে-মুখে স্পষ্ট মহাশয়ের প্রতি তার বেশ ভালোই আগ্রহ জন্মেছে।
কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, সেই আদিত্যর সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।
সে বরাবরের মতোই নিজের জগতে ব্যস্ত। কারো দিকে বিশেষ নজর নেই, কারো সঙ্গে বাড়তি কথা বলারও আগ্রহ নেই। চারপাশে এত মানুষ, এত কোলাহল তবুও আদিত্য যেন সবার মাঝেও নিজের মতো একা।
আর ইশিতা?
সে তো মনে মনে এরই মধ্যে কত কী ভেবে ফেলেছে!
আদিত্যর এক ঝলক দেখলেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে মুচকি হাসি। অথচ আদিত্য মহাশয় সেসবের কিছুই টের পাচ্ছেন না।
কিন্তু কে জানে, এই মুগ্ধতা ভবিষ্যতে কোন গল্পের জন্ম দেয়!
_____
অন্যদিকে ইশিতার কান্ডকারখানা দেখে আদ্রিজা রাগে ফুঁসতে লাগল। ইচ্ছে করছে, মেয়েটাকে একেবারে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে!
যতই হোক, আদ্রিজা আদিত্যকে ভালোবাসে। আর ভালোবাসা কি এত সহজেই ভুলে যাওয়া যায়? এতদিন ধরে যে মানুষটাকে নিজের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ভালোবেসেছে, তার আশেপাশে অন্য কোনো মেয়েকে ঘুরঘুর করতে দেখলে কীভাবে সহ্য করবে সে?আর ইশিতাই বা কখন থেকে এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল আদিত্যের সঙ্গে?
আদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে পুড়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো বারবার চলে যাচ্ছে ইশিতার দিকে। মেয়েটার হাসি, কথা বলার ভঙ্গি সবকিছুই যেন আদ্রিজার চোখে বিষ হয়ে বিঁধছে।
ভালোবাসার মানুষটির পাশে অন্য কোনো নারীকে কে-ই বা সহ্য করতে পারে?আসলে নারীর ভালোবাসা বড্ড অদ্ভুত।
তারা ভালোবাসলে শুধু মানুষটাকে ভালোবাসে না, তার চারপাশটাকেও নিজের করে নিতে চায়। তার হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে পায়, তার বিষণ্ণতায় নিজের চোখ ভিজিয়ে ফেলে। আর যখন সেই প্রিয় মানুষটার পাশে অন্য কাউকে দেখে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে।অধিকার না থাকলেও অধিকার ফলাতে ইচ্ছে করে।
অভিমান করার অধিকার না থাকলেও অভিমান জমে পাহাড় হয়।আদ্রিজাও ঠিক তেমনই।
আদিত্য তাকে ভালোবাসে না এই সত্যিটা সে জানে। তবুও মন তো আর যুক্তির কথা শোনে না। মন শুধু জানে, এই মানুষটাকে সে ভালোবাসে। ভীষণ ভালোবাসে।আর সেই ভালোবাসার মানুষটির দিকে অন্য কোনো নারী একটুখানি মায়াভরা চোখে তাকালেও আদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।
চোখের কোণে জমে ওঠা জলটা আড়ালে মুছে ফেলে আদ্রিজা।
মনে মনে শুধু একটাই কথা বলে
আপনি আমার না হলেও, আপনাকে অন্য কারো হতে দেখার সাহস আমার নেই, আদিত্য ভাইয়া।
_____
মিসেস রুজিনা আজ ভীষণ খুশি। বহুদিন পর নিজের বোন আর বোনের ছেলে-মেয়েকে কাছে পেয়ে তার ভেতরটা যেন আনন্দে ভরে উঠেছে। সারাদিন ব্যস্ততার মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক চিলতে হাসি। তবে এই হাসির আড়ালে আজ আরেকটি গোপন আনন্দও লুকিয়ে আছে মনে মনে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন, যার কথা এখনো কাউকে জানাননি।
অন্যদিকে সাহারা বেগমও ব্যস্ত বাড়ির অতিথি আপ্যায়নে। পুরো বাড়িজুড়ে মানুষের আনাগোনা, হাসি-ঠাট্টা, কথাবার্তা সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ।
শুধু একজনের কাছে এই উৎসবের কোনো মূল্য নেই।
আদিত্য।
চারপাশের কোলাহল তার কাছে যেন অসহ্য শব্দের মতো লাগছে। যত মানুষ, তত বিরক্তি। মুখটা শক্ত করে এক কোণে বসে আছে সে। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। অথচ কেউ তার সেই বিরক্তির কারণ জিজ্ঞেস করার সাহস করছে না।
আদিত্য এমনই।
তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো সে নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে না, বরং সেগুলোকে বরফের মতো জমিয়ে রাখে। রাগ হলে তার কণ্ঠস্বর নিচু হয়, চোখ দুটো আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আর কেউ তার ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করলে, সেই মানুষটি কে তা দেখার সময়ও সে নেয় না।
ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন ছুটে এলো ইশিতা।
কোনো কিছু না ভেবেই আদিত্যের হাতটা জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,
আদিত্য ভাইয়া, চলো না! আমরা একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
মুহূর্তেই আদিত্যের পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল।
যেন সেই স্পর্শ তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
পরের মুহূর্তেই সে ঝটকা দিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।
এই ইডিয়েট গার্ল! তোর সাহস কী করে হয় আমাকে স্পর্শ করার?
আদিত্যের গর্জন যেন পুরো বাড়িটাকে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।
চারপাশের হাসি-ঠাট্টা থেমে গেল।এক এক করে সবাই ছুটে এলো।ইশিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা অপমানে লাল হয়ে গেছে। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু আর ধরে রাখতে পারল না। টুপ করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।মেয়েটার এমন অসহায় মুখ দেখে মিসেস রুজিনা দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে নিজের বুকের সঙ্গে আগলে নিলেন।
তারপর আদিত্যের দিকে তাকিয়ে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন,
আদিত্য, এ কেমন ব্যবহার তোমার? তুমি ইশিতাকে এভাবে ধমকাচ্ছ কেন?
আদিত্য একবারও ইশিতার দিকে তাকাল না।
তার চোয়াল শক্ত। চোখে এমন এক শীতলতা, যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো তার কাছে কেবলই অপ্রয়োজনীয়।
গম্ভীর, কঠিন কণ্ঠে বলল,
এই মেয়েকে আমার থেকে দূরে থাকতে বলবে।
এক মুহূর্ত থেমে তার চোখ দুটো আরও ধারালো হয়ে উঠল।
নয়তো পরেরবার আমি কী করব, সেটা তোমাদের ধারণারও বাইরে থাকবে।
কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না আদিত্য।
সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন তার ভেতরের অস্থিরতাকেও আটকে দিল।হাতে থাকা মোবাইল টা বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলল সে।তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলে ছুড়ে ফেলল মেঝেতে। যেন শরীরের ওপর লেগে থাকা অস্বস্তিটুকুও সে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে।
পরক্ষণেই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গেল।
বরফশীতল পানি মাথা বেয়ে নেমে আসছে। অথচ তার ভেতরের আগুন নিভছে না।
বারবার নিজের হাতের দিকে তাকাচ্ছে আদিত্য।
যে হাতটা কয়েক মুহূর্ত আগেও ইশিতা ধরেছিল।
হঠাৎ তার মুখটা আরও শক্ত হয়ে গেল।সে নিজের হাতটা এমনভাবে ঘষতে শুরু করল, যেন কোনো নোংরা স্পর্শ তার চামড়ায় লেগে আছে এবং সেই স্পর্শটাকে যতক্ষণ না মুছে ফেলতে পারছে, ততক্ষণ তার শান্তি নেই।ঘষতে ঘষতে হাতের চামড়া লাল হয়ে উঠল।
কিন্তু আদিত্য থামে না।
অন্য কেউ কেন তাকে করবে,এটা ভাবতেই তার অসহ্য আর রাগ লাগছে।
তাকে তার ব্যক্তিগত নারী শুধু স্পর্শ করবে।
তাকে স্পর্শ করার অধিকার যেন পৃথিবীর আর কোনো নারীর নেই। তার কাছে স্পর্শ মানেই শুধু একজন তার ব্যক্তিগত নারী। অন্য কোনো নারীর অনিচ্ছাকৃত ছোঁয়াও তার ভেতরে অদ্ভুত এক বিরক্তি তৈরি করে, যেন সেই স্পর্শ তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। অথচ সেই একজনের স্পর্শের জন্যই এই কঠোর মানুষটা ভেতরে ভেতরে কাতর হয়ে থাকে।
সে চায় শুধু তার আঙুলের ছোঁয়া, তার হাতের উষ্ণতা, তার কাছাকাছি থাকার অনুভূতি। অন্য কারও সান্নিধ্য যেখানে তাকে নির্লিপ্ত রাখে, সেখানে সেই নারীটা কাছে এলেই তার সমস্ত কঠোরতা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। চোখের দৃষ্টিতে জমে থাকা রাগ নরম হয়ে আসে, কণ্ঠের দৃঢ়তা থেমে যায়, আর বুকের ভেতরটা অকারণে অস্থির হয়ে ওঠে।
এই মানুষটা পৃথিবীর কাছে যতই কঠিন হোক, তার কাছে এসে সে যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ। তার একটুখানি অভিমান তাকে অস্থির করে, একটুখানি দূরত্ব তাকে নিঃশব্দে পোড়ায়। সে হয়তো মুখে কখনো স্বীকার করবে না, কিন্তু সত্যিটা খুব গভীরে গেঁথে আছে সে তার মায়ায় আটকে গেছে।
অন্য নারীর স্পর্শ তার কাছে শুধুই অস্বস্তি, অথচ তার স্পর্শে আছে এক অদ্ভুত শান্তি। সেই স্পর্শে যেন তার সমস্ত ক্লান্তি থেমে যায়, অহংকার ভেঙে পড়ে, কঠিন হৃদয়টা নরম হয়ে আসে।
কারণ সে শুধু তাকে ভালোবাসে না তার স্পর্শের অভ্যাসে, তার সান্নিধ্যের মায়ায়, তার উপস্থিতির নেশায় এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তাকে ছাড়া অন্য কারও কাছে নিজেকে স্বস্তিতে খুঁজে পায় না।
সে চায় না সবাই তাকে ছুঁকু। সে চায় শুধু সেই নারীই তার কাছে আসুক যার একটুখানি স্পর্শে এই দুর্বার, কঠোর মানুষটাও মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়ে।
শাওয়ারের পানি তার মুখ বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
বাইরের পৃথিবীর কাছে সে রাগী, কঠিন, নির্দয় এক মানুষ।
কিন্তু নিজের কাছে?
নিজের কাছে সে আজও এমন এক অনুভূতির কাছে বন্দি, যেটাকে সে যতবার অস্বীকার করতে চায়, ততবারই সেই অনুভূতি আরও গভীর হয়ে তাকে গ্রাস করে।
চলবে,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন