ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেয়সীর অভিমান

১২তম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেয়সীর _অভিমান

#পর্ব_১২

#জান্নাত

আদিত্যর হাতটা ততক্ষণে একেবারে লাল হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও যেন চামড়া খসে পড়েছে। তবুও সেই ব্যথার দিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। বুকের ভেতর যে অস্থিরতার আগুন জ্বলছে, তার কাছে হাতের এই যন্ত্রণা যেন কিছুই নয়।

কিছুতেই কমছে না তার অস্থিরতা। বারবার মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে তার শুধু একজনের সান্নিধ্য চাই। একজনের কণ্ঠ শুনতে চায়, একজনের মুখ দেখতে চায়, একজনের কাছে গিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকতে চায়।

তার জানপাখি...তার আদ্রিজা।কিন্তু চাইলেই কি সবকিছু পাওয়া যায়?

তার ভালোবাসার মানুষটির কাছেই তো যেতে পারছে না সে। নিষিদ্ধ এক বেড়াজালে বন্দী হয়ে আছে তার ভালোবাসা। নিজের অনুভূতিগুলোকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করতে হচ্ছে তাকে।

হ্যাঁ, আদ্রিজার সেই অচেনা প্রেমিক পুরুষ আর কেউ নয় সে হলো আদিত্য চৌধুরী।

যার পরিচয় আড়ালে রেখেই এতদিন আদ্রিজার হৃদয়ে ভালোবাসার ঝড় তুলতে চাইছে যে। যে মানুষটা কখনো কঠিন হয়ে আদ্রিজাকে দূরে ঠেলে দেয়, আবার সেই মানুষটাই রাতের আঁধারে সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে ছুটে যায় তার জানপাখির কাছে।

তবে এই লুকোচুরির পেছনে রয়েছে গভীর এক কারণ। যা প্রকাশ্যে এলে হয়তো তাদের ভালোবাসার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাবে। তাই তো আদিত্যকে প্রতিনিয়ত নিজের ভালোবাসার বিপরীতে দাঁড়াতে হয়।

আদ্রিজাকে কষ্ট দেয় সে।ইচ্ছে করে নয়, বাধ্য হয়ে।

কিন্তু প্রেমিক পুরুষটা যখন একা হয়, তখন সেই কষ্টের প্রতিটি আঘাত ফিরে এসে হাজার গুণ হয়ে তার নিজের বুকেই বিঁধে।

আদ্রিজার চোখের এক ফোঁটা অশ্রু যেখানে তার হৃদয় ছিন্নভিন্ন করে দেয়, সেখানে সেই অশ্রুর কারণ নিজে হওয়ার যন্ত্রণা কী করে সহ্য করে সে?

তাই তো রাত গভীর হলে, চারপাশের পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন কঠিন আদিত্য চৌধুরীর সমস্ত অহংকার, রাগ আর নিষ্ঠুরতার মুখোশ খুলে যায়।

সে শুধু একজন প্রেমিক হয়ে ওঠে।তার জানপাখির প্রেমিক।

আর তখন সমস্ত পথ, সমস্ত নিষেধ, সমস্ত দূরত্ব পেরিয়ে সে ছুটে যায় একটা ঠিকানায়

তার আদ্রিজার কাছে।

কারণ আদ্রিজাকে যতটা কষ্ট সে দেয়, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি কষ্ট প্রতিটি মুহূর্তে সে নিজেকে দেয়।

ভালোবাসার মানুষটাকে কাছে পেয়েও কাছে যেতে না পারার যন্ত্রণা যে বড় ভয়ংকর...

______

অন্যদিকে আদিত্যের মা ইশিতাকে অনেকক্ষণ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। অবশেষে খালামনির কথায় ইশিতা কিছুটা শান্ত হলেও, আদ্রিজার মুখের কোণে তখন মিটিমিটি হাসি।

মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,

একদম ঠিক হয়েছে! এখন আরো বেশি বেশি করে মৌমাছির মতো ঘুরঘুর কর গিয়ে। শেওড়া গাছের পেত্নি হুম!

আদ্রিজা যে একা একা দাঁড়িয়ে এসব বিড়বিড় করছে, সেটা খেয়াল করতেই ওর মামাতো ভাই রিশাব কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে আসে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলে,

কীরে আদু ভাই, একা একা কী বিড়বিড় করছিস?

আদু ভাই ডাকটা কানে যেতেই আদ্রিজা চোখ বড় বড় করে রিশাবের দিকে তাকায়। তারপর রাগী গলায় বলে,

রিশাবের বাচ্চা! আমার এত সুন্দর একটা নাম রেখে তুই আমাকে আদু ভাই ডাকছিস কেন? আমাকে কোন অ্যাঙ্গেল থেকে আদু ভাই লাগে?

রিশাব সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেলে।

আমি এখনো বিয়েই করলাম না, আমার বাচ্চা আসলো কোথা থেকে?

আদ্রিজা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেংচি কাটে। রিশাব এবার নিচু গলায় বলে

এই আদু, বিয়েতে তো অনেক মেয়ে আসবে। তাদের মধ্যে একটা মেয়ের সঙ্গে আমার লাইন লাগিয়ে দিবি।

আদ্রিজা চোখ পাকিয়ে বলে,

যেই না চেহারা, নাম রাখছে পেয়ারা! যা, তুই আমার সামনে থেকে দূর হ। নয়তো এক ঘুষি দিয়ে উগান্ডা পাঠিয়ে দেবো, বদ ছেলে!

রিশাব নিজের বুক ফুলিয়ে, চুলে হাত বুলিয়ে বেশ নায়কসুলভ ভঙ্গিতে বলে,

তুই কী বলতে চাইছিস আমি সুন্দর নই? হায়রে আদু ভাই, তুই আমাকে চিনলিই না! জানিস তো, আমি একদিন নায়ক হবো। সুন্দরী সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে ফিল্ম করবো।

রিশাবের কথা শুনে আদ্রিজা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এসে খুব গম্ভীর মুখে বলে

শুন, আমাদের এখানে অনেকগুলো রুম আছে। আর প্রতিটা রুমেই আরামদায়ক বিছানা করা আছে। তুই বরং সেখানে গিয়ে শুয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখ গে একদিন তুই নায়ক হবি!

একটু থেমে মুখ বাঁকিয়ে বলে,

ইডিয়েট পোলা!

কথাটা বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না আদ্রিজা। হনহন করে সেখান থেকে চলে যায়।

রিশাব বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ দুটো তখনও আদ্রিজার চলে যাওয়ার পথের দিকে স্থির।

মনে মনে ভাবতে থাকে,

এটা কী হলো? আদ্রিজা কি আমাকে ইনসাল্ট করে গেল?’

কয়েক মুহূর্ত পর নিজের মাথাটা ঝাঁকিয়ে আবারও বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায় সে।

যাই করুক! আমি তো একদিন নায়ক হবোই হবো। তখন দেখবো, এই আদু ভাইয়ের রিয়েকশন কেমন হয়।

নিজের কথাতেই নিজে মুচকি হেসে সেও অন্যদিকে হাঁটা দেয়।

_____

রাত তখন ঠিক আটটা।

চৌধুরী বাড়ির চারপাশে নেমে এসেছে রাতের নীরবতা। বাড়ির সবাই যখন যার যার কাজে ব্যস্ত, ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে একে একে বেরিয়ে এলো তিনটি ছায়ামূর্তি আদ্রিজা, আরিশা আর আদ্রিজার মামাতো বোন ইতি।

তিনজনই এমনভাবে পা টিপে টিপে হাঁটছে, যেন কোনো গোপন মিশনে বেরিয়েছে।

হঠাৎ আরিশা ফিসফিস করে বলল,

মিষ্টিপু, যদি ওই টাকলা বেটা আমাদের দেখে ফেলে, কী হবে একবার ভেবে দেখেছো?

আদ্রিজা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

চুপ! দেখবে না, হয়তো ওই টাকলা বেটা ভুঁড়িওয়ালা পেট নিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

ইতি মুখ চেপে হাসতে হাসতে বলল,

তুমি না ,আম চুরির অপরাধে না আমাদের তিনজনকেই জেলে যেতে হয়।

জেলে গেলেও আম নিয়ে যাব,আর জেলের ভেতরে বসেই আম খাবো।

আদ্রিজার কথায় আরিশা চোখ বড় বড় করে তাকাল।

তুমি আসলেই পাগল!

তিনজন চাপা হাসি হাসতে হাসতে এগিয়ে গেল।

চৌধুরী বাড়ি থেকে মাত্র দুই মিনিটের পথ জব্বার মিয়ার বাড়ি। আর জব্বার মিয়া? এলাকার সবচেয়ে কিপ্টে মানুষ হিসেবে যার বেশ নামডাক আছে। নিজের গাছের একটা আমও কাউকে ছুঁতে দেন না।

আজ জব্বার মিয়ার আমগাছ একেবারে খালি করে দেওয়ার পণ করেছে সে।

কিছুক্ষণ পর তিনজন গিয়ে দাঁড়াল বিশাল আমগাছটার নিচে।

আদ্রিজা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর কোনো কথা না বলে ওড়নাটা কোমরে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।

আরিশা অবাক হয়ে বলল,

এই! তুমি সত্যিই গাছে উঠবে?

আম চুরি করতে এসেছি, গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দোয়া পড়তে আসিনি।

বলেই আদ্রিজা মুহূর্তের মধ্যে গাছে উঠে পড়ে।

আদ্রিজা একের পর এক পাকা আম পেড়ে নিচে ফেলতে লাগল। আর নিচে দাঁড়িয়ে আরিশা আর ইতি দ্রুত ব্যাগে আম ভরতে লাগল।

ইতি ফিসফিস করে বলল,

মিষ্টিপু, আর কত নেবে?

উপর থেকে আদ্রিজার উত্তর এলো,

যতক্ষণ গাছে আম আছে, ততক্ষণ আমাদের ব্যাগে জায়গা আছে!

আরিশা মাথায় হাত দিয়ে বলল,

আল্লাহ! আজকে আমাদের কপালে কী আছে কে জানে!

ঠিক তখনই

এই কেরে! আমার আমগাছে কে?

তিনজনের হাত-পা যেন মুহূর্তেই অবশ হয়ে গেল।

জব্বার মিয়ার গলা!

আবার শোনা গেল তাঁর বজ্রকণ্ঠ,

কইগো রহিমের মা! আমার লাঠিটা আনতো! চোর ধরছি আজ!

আরিশার মুখ শুকিয়ে গেল।

সে উপরের দিকে তাকিয়ে গাছের ওপর থাকা আদ্রিজাকে ফিসফিস করে বলল,

খাইছে! মিষ্টিপু, টাকলা বেটা আইসা গেছে! পালাতে হবে! তাড়াতাড়ি নামো!

আদ্রিজাও আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। তাড়াহুড়ো করে গাছ থেকে নামতে গিয়ে পা পিছলে গেল।

ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল তার। কিন্তু থামার সময় নেই।

মিষ্টিপু, ব্যথা পাইছো?

পরে ব্যথা দেখব! আগে আম বাঁচা!

তিনজন ব্যাগ হাতে নিয়ে ছুট লাগাল।পেছন থেকে জব্বার মিয়ার চিৎকার,

ওই দাঁড়া! চোরের দল! আমার আম নিয়ে কোথায় যাস!

কিন্তু তিনজনের তখন পেছনে তাকানোর সময় নেই।

তাদের একটাই লক্ষ্য—যেভাবেই হোক নিজেদের বাঁচাতে হবে নয়তো মানসম্মান থাকবেনা।

দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে তিনজন বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।

কিন্তু বাড়িতে ঢুকেইতিনজনের পা যেন মাটিতে গেঁথে গেল।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে একজন।গম্ভীর মুখ। কঠিন চাহনি। চোখে যেন আগুন।

তিনজন একসঙ্গে থমকে দাঁড়াল।আরিশা প্রায় কেঁদেই দিচ্ছে।

মিষ্টিপু...

ইতি ইতোমধ্যেই পালানোর পথ খুঁজছে। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো মানুষটার চাহনি দেখে তার মনে হচ্ছে, এখান থেকে পালানোর কোনো রাস্তা নেই।

আদ্রিজাও ধীরে ধীরে মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকাল।

একবার আরিশার দিকে তাকাল।তারপর ইতির দিকে।

তিনজনের চোখাচোখি হলো।কেউ কোনো কথা বলল না।

আর তাদের ব্যাগের ভেতরের আমগুলো ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে।

একটা আম গড়িয়ে গিয়ে ঠিক লোকটার পায়ের কাছে থামল।

তিনজনের চোখ সেই আমের দিকে।

তারপর ধীরে ধীরে লোকটার মুখের দিকে।

আদ্রিজা মনে মনে বলল,

আজকে বোধহয় আমের সাথে সাথে আমাদের জীবনটাও গেল!

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন