দীর্ঘ তিন বছরের বিরতির পর আবারও লিখালিখি শুরু করলাম, আশা করি সবাই আমাকে সাপোর্ট করবেন এবং আমার লিখা গল্প পরে মতামত দিবেন। অনেক দিন পর লিখছি তাই হয়তো একটু এলোমেলো হতে পারে, তবে পরবর্তী থেকে আরো সুন্দর করে লিখার চেষ্টা করবো, ধন্যাবাদ🌸
#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_১
আজ সকালটা খুব সাধারণ বলেই মনে হচ্ছে ফারিবার কাছে। তবুও কিছু সকাল থাকে, যেগুলো নিজের মতো করে আলাদা হয়ে যায়, কোনো প্রকার ঘোষণা ছাড়াই অসাধারণ কিছু ঘটে যায়। আজ তার কাছে ঠিক এমনটাই মনে হচ্ছে।
ঢাকার ব্যস্ত রাস্তা ঠেলে সে দাঁড়িয়ে আছে তার অফিসের বাইরে। অফিস বিল্ডিংটার সামনে দাঁড়িয়ে ফারিবা এক মুহূর্ত থামল।
উঁচু কাঁচের দেয়াল, চকচকে দরজা সে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একনজর ভালো করে দেখে নিল।
এই চাকরিটা পাওয়ার জন্য তাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তার সব ডকুমেন্ট খুব ভালো, তবুও আজকাল চাকরিতে যে পরিমাণ চাহিদা আর কম্পেটিশন, ফারিবা ভেবেছিল হয়তো সে চাকরিটা পাবেই না।
তবে তাকে ভুল প্রমাণ করে গতকাল অফিস থেকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়, তার চাকরিটা হয়ে গেছে। আগামীকাল থেকে—অর্থাৎ আজ থেকেই জয়েন করতে হবে।
ফারিবা খুব খুশি। কেননা এই চাকরিটা তার খুব প্রয়োজন ছিল। তার ছোট পরিবারটি এখন তার দায়িত্বে। বেশ কয়েক মাস ধরে তার বাবা অসুস্থতার কারণে একদম ঘরে বসা—সে কোনো কাজ করতে পারে না। এমন অবস্থায় ফারিবা ছাড়া আর কেউ ছিল না সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার।
এইসব কিছু চিন্তা করে ফারিবা এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে এই কাঁচের দালানের ভেতরে প্রবেশ করল।
অফিসটা ভেতর থেকে যতটা ব্যস্ত, বাইরে থেকে ঠিক ততটাই নীরব।
সে পুনরায় হালকা করে নিঃশ্বাস নিল।
তারপর ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
কালো বোরকায় তাকে পুরো ঢেকে রেখেছে, মুখ ঢাকা শুধু তার চোখ দুটো দেখা যায়। চোখ দুটো নিচু করে আছে। খুব সাদাসিধে একটা মেয়ে, তার হাঁটার ভঙ্গি শান্ত।
না খুব ধীরে, না তাড়াহুড়ো—যেন প্রতিটা পদক্ষেপ সে মেপে ফেলছে।
এমনটা নয় যে সে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চায়।
বরং সে জানে, নিজেকে কোথায় থামিয়ে রাখতে হয়, কিভাবে নিয়োজিত রাখতে হয়।
রিসেপশনের সামনে গিয়ে থামতেই সেখানে থাকা মেয়েটা তার দিকে তাকাল।
একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“How can I help you?”
ফারিবা কিছু বলল না, চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। মেয়েটা পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
“New joiner?”
এইবার ফারিবা খুব আস্তে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল।
রিসেপশনে থাকা মেয়েটা একটা ফাইল নিয়ে বলল,
“আপনার পুরো নামটা জানতে পারি?”
সে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল,
“জি, আমি ফারিবা নূর ইসলাম।”
তার কণ্ঠে নমনীয়তা, কিন্তু স্পষ্টতা আছে।
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“HR-এর সাথে দেখা করুন, উনি আপনাকে সব বুঝিয়ে দেবেন।”
ফারিবা দ্বিধা কাটিয়ে বলল,
“উনাকে কোথায় পাবো?”
“সোজা গিয়ে বাম পাশে।”
ফারিবা ধীরে মাথা নাড়ল। মেয়েটি মুচকি হেসে প্রথম দিনের জন্য শুভেচ্ছা জানাল। কথাটা শুনে ফারিবার মুখে হাসি ফুটল—যদিও মুখ ঢাকা থাকায় তা দেখা গেল না, তবে তার চোখে সেই হাসি স্পষ্ট ছিল।
এরপর ফারিবা পেছনে ঘুরে HR-এর রুমের দিকে অগ্রসর হলো। ঠিক তখন পেছন থেকে কয়েকটা দৃষ্টি পড়ল তার দিকে।
কেউ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ অবাক হয়ে, কেউ নিছক নতুন কাউকে দেখছে, আবার কেউ তার পর্দা করা নিয়ে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
কিন্তু ফারিবা কারও দিকে তাকাল না। কারও দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে, চোখ নিচু রেখেই হাঁটতে শুরু করল।
তার চলার মাঝে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে, যেন সে এই ভিড়ের অংশ হয়েও পুরোপুরি আলাদা এবং আত্মবিশ্বাসী।
ফারিবা HR-এর রুমের কাছে গিয়ে অনুমতি নিল, তারপর পরিচয় দিতেই তিনি তাকে কাজ বুঝিয়ে দিলেন। এরপর ফারিবার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারকে ডেকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে যেন ডেস্ক দেখিয়ে কাজগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
ফারিবা তার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজারের পিছনে অগ্রসর হলো। তখন ম্যানেজার বললেন,
“ফারিবা নূর ইসলাম, রাইট?”
ফারিবা ছোট করে বলল, “হুম।”
“আমি সাবরিনা শান্তা। তুমি আমাকে চাইলে ম্যাম বলতে পারো, আবার শান্তা আপু বলেও ডাকতে পারো। আমিও তোমার বয়সে এই কোম্পানিতে জয়েন করেছিলাম। প্রায় দশ-বারো বছর ধরে এখানে আছি। আশা করি তুমিও দীর্ঘ সময় থাকতে পারবে। তবে একটা সমস্যা আছে।”
কথাটা বলে তিনি থেমে গেলেন। ফারিবা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
“কি সমস্যা, ম্যাম?”
শান্তা মুচকি হাসলেন। তারপর একটু ঝুঁকে, চোখ ছোট করে বললেন,
“সমস্যাটা বড় নয়। তবে এর আগেও তোমার মতো অনেকেই ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু কেউ... কখনো সিলেক্ট হয়নি।”
কথাগুলো বলে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
“তোমাকে কি মনে করে জবটা দিল—কে জানে! যাই হোক, আমাদের কোম্পানিতে স্বাগতম। আর আমার জুনিয়র হওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
মহিলার কথা শুনে ফারিবা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কী প্রতিক্রিয়া দেবে বুঝতে পারল না। সে সাধারণত মানুষের সাথে খুব বেশি মিশে না। পরিবার ছাড়া কারও সাথে তেমন যোগাযোগও নেই।
এত বড় একটা কোম্পানির এত মানুষের মাঝে নিজেকে কিভাবে সামলাবে, সে জানে না। তবে পরিবারের দায়িত্ব যখন নিয়েছে, তখন সেটা ভালোভাবে পালন করতেই হবে। ফারিবা তার ডেস্কে বসে, তাকে দেওয়া কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে করতে লাগল।
ফারিবা যে কোম্পানিতে কাজ করছে তার নাম “আয়মান হোল্ডিংস অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার”। এখানে মূলত কর্পোরেট ফার্ম, রিয়েল এস্টেট, কনস্ট্রাকশন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট—এসব নিয়ে কাজ হয়।
পুরো অফিসটা কাঁচের দেয়ালে ঘেরা। বাইরে থেকে যতটা শান্ত, ভেতরে ততটাই ব্যস্ততা—কাজের চাপ আর কম্পিউটারের টাইপিংয়ের শব্দে ভরা।
ফারিবা বসে ফাইলগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।
আর তাকে গভীরভাবে লক্ষ্য করছে কেউ একজন।
অফিসের সবচেয়ে বড় কেবিনটা কাঁচের দেয়ালে ঘেরা। বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভেতরে কী হচ্ছে। কিন্তু ভেতরে বসে সেখান থেকে সবকিছু নজরে রাখে এই কোম্পানির CEO—শেখ আদিল আয়মান।
সবাই তাকে ডাকে—
“মি. শেখ” অথবা “স্যার”।
তার উপস্থিতি আলাদা করে বোঝাতে হয় না। তাকে দেখলেই বোঝা যায়, এখানে সিদ্ধান্ত নেয় কে।
সর্বদা গম্ভীর থাকার কারণে অফিসে সবাই তাকে ভয় পায়। আদিল যতটা গম্ভীর, দেখতে ততটাই সুদর্শন এবং আকর্ষণীয়। এমন কোনো মেয়ে নেই, যে একবার তার দিকে তাকালে দ্বিতীয়বার তাকায়নি।
আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
লম্বা, উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রং, মাথা ভর্তি ঢেউ খেলানো চুল—এক পাশে সুন্দর করে সেট করা। গায়ে গাঢ় নীল শার্ট, যেন রংটা তার জন্যই বানানো। হাতা হালকা গুটানো, ঘড়ির ধাতব ফ্রেমে আলো পড়ছে।
তার চোখ গভীর, স্থির, হিসেবি।
সে খুব কম কথা বলে।
আর যখন বলে—কেউ দ্বিতীয়বার প্রশ্ন করার সাহস পায় না।
টেবিলের উপর ঝুঁকে ছিল সে। এক হাত দিয়ে ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছে, অন্য হাত দিয়ে কলমের ডগা দিয়ে টেবিলে ধীরে টোকা দিচ্ছে।
হঠাৎ করে ইন্টারকমে কল এলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল,
“স্যার, সে পৌঁছে গেছে।”
কথাটা শুনে আদিলের চোখে মুখে হালকা পরিবর্তন দেখা গেল তবে বোঝা গেল না সে হাসছে কি না।
সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আমি যেখানে বসাতে বলেছি, সেখানে বসিয়েছে তো?”
“জ্বি, স্যার।”
“Good job.”
ফোন রেখে কোনো কারণ ছাড়াই কাঁচের দেয়ালের ওপারে তাকাল সে।
হঠাৎ তার মনে হলো—করিডোর দিয়ে একটা কালো ছায়া হেঁটে যাচ্ছে।
মাথা নিচু, চোখ নিচু—একবারও চারপাশে তাকাচ্ছে না।
তবুও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস আছে। আর সেই বিষয়টা আদিলের চোখ এড়িয়ে গেল না।
তার দৃষ্টি থেমে গেল।
সে খেয়াল করল মেয়েটা কাউকে অ্যাটেনশন দিচ্ছে না, কিংবা কারও অ্যাটেনশনের পরোয়াও করছে না। যেন সে নিজেকে এমন জায়গায় রেখেছে, যেখানে কেউ পৌঁছাতে পারবে না।
একনজরে যেন সব বুঝে গেল সে।
এইবার হালকা করে মুচকি হেসে আদিল চেয়ারে হেলান দিল। তার চোখ সরলো না এখনও একইভাবে ফারিবার দিকে তাকিয়ে রইল।
ফারিবা সামনে দিয়ে চলে গেল, কিন্তু একবারও এদিক-সেদিক তাকাল না।
সে নিজের ডেস্কে বসে কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
আর আদিল এখনও তাকিয়ে রইল, যেন এখন চোখ সরালেই কিছু মিস করে ফেলবে।
তার ঠোঁটের কোণে আবারও হালকা একটা রেখা উঠল।
তবে এবার আর হাসল না।
কিছুটা আগ্রহ, কিছুটা হিসেব নিয়ে সে ফারিবার ফাইলটা হাতে নিল।
“ফারিবা নূর ইসলাম…”
নামটা সে ধীরে ধীরে কয়েকবার উচ্চারণ করল।
তারপর ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
কোনো আবেগ থেকে নয়, শুধু নতুন এক আগ্রহের শুরু হয়েছে বলে।
আর শেখ আদিল আয়মান খুব কম জিনিসেই আগ্রহ খুঁজে পায়।
চলবে…..
[ ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এবং গল্প টা কেমন লাগলো জানাবেন ]