#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_২
অফিসের দিনগুলো খুব বেশি আলাদা হয় না। সেই একই রাস্তা, ব্যস্ত জনতা, জ্যাম, ভিড়, নানান লোকের তাড়াহুড়ো। একই সময়ে অফিসে ঢোকা, আবার একই সময়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়া।
একই করিডোর, একই মুখগুলো, প্রতিদিনের মতো একই অভিব্যক্তি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
ফারিবার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।
সে প্রতিদিন সময়মতো আসে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার আগে এক সেকেন্ড বিরতি নেয়।
খুব ছোট্ট একটা বিরতি।
কিন্তু সেই সামান্য মুহূর্তই যেন বাইরের আর ভেতরের জগতকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়।
যেমন বাইরে খোলা বাতাস,
আর ভেতরে চাপা ব্যস্ততা।
সে যেন নিজেকে এই পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা সময় নেয়।
তারপর ধীরে ভেতরে ঢোকে।
প্রতিদিনের মতো চোখ নিচু, চলাফেরা তার মাপা।
কারও সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না। যতটুকু দরকার, ঠিক ততটুকুই বলে। তার বেশি কিছু না।
এরপর নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে। ফাইল খুলে কাজ শুরু করে। চারপাশ থেকে শব্দ আসে কীবোর্ডের টিকটিক, ফোনের রিং, মানুষের কথাবার্তা।
তবুও এইসব যেন তার কাছে দূরের আওয়াজ হয়ে থাকে।
কোনো কিছুর তোয়াক্কা সে করে না। সে শুধু কাজ করে।
তার দায়িত্ব পালন করে।
তাকে যে কাজটুকু দেওয়া হয়, সেটার মধ্যেই মগ্ন থাকে।
তবে মাঝে মাঝে তার হাত থেমে যায়।
কলম হাতে নিয়ে স্থির হয়ে বসে থাকে, হয়তো কিছু একটা ভাবছে। সে আযথা সময় নষ্ট করে না, এমন কি কাজের সময় মোবাইলও হাতে নেয় না।
শুধু এক সেকেন্ড চুপ থাকে। একটা অদ্ভুত নীরবতা।
তারপর আবার কাজ শুরু।
যেন সে নিজেকে কখনো দুর্বল হতে দেয় না, সব পরিস্থিতিতে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করে। অফিসের মানুষজন তাকে লক্ষ্য করে। নতুন বলে তার প্রতি কৌতূহল থাকে। কিন্তু কেউ তাকে চেনে না।
কেউ কখনো তার মুখমণ্ডল দেখার সুযোগ পায়নি।
কেউ তার ভেতরে ঢোকার কিংবা গভীর আলাপে যাওয়ার সুযোগ পায় না।
ফারিবা শুধু নিজের কাজেই মনোযোগী থাকে। আশেপাশে কী ঘটে সেসবের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই।
কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে মি. শেখ সবটাই লক্ষ্য করে।
শেখ আদিল আয়মান।
তার দিনও গুলোর মধ্যেও আলাদা কিছু নেই ফাইল, মিটিং, নানান ধরনের সিদ্ধান্ত। সবকিছুই যেন তার নিয়ন্ত্রণে। সবকিছুই তার হিসেবের মধ্যে।
তবুও ইদানীং তার মধ্যে একটা জিনিস বদলেছে।
নতুন এক অভ্যাস ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে।
খুব সূক্ষ্মভাবে, সবার নজরের আড়ালে, সে মাঝে মাঝে ফারিবার দিকে তাকায়। নির্দিষ্ট করে নয়, ইচ্ছে করেও নয়। তবুও তার চোখ গিয়ে থামে একটা নির্দিষ্ট জায়গায়।
সেই বোরকা পরা মেয়েটির ডেস্কে।
সে খেয়াল করে মেয়েটা কখনো তাড়াহুড়ো করে না।
তার কাজের ভেতরে কোনো তাড়া নেই, শুধু ধীরতা কোনো অলসতা নেই।
তার লেখার গতি কেমন, কাজের প্রতি মনোযোগ কতটা, সবকিছু কতটা দায়িত্ব নিয়ে করে, এমনকি প্রতিদিন কেমন রঙের বোরকা পরে, প্রতিদিন একই নীল কলম ব্যবহার করে। এই ছোট ছোট বিষয়গুলোও অদ্ভুতভাবে তার চোখে পড়ে।
ফারিবার প্রতি তার এই আগ্রহের কারণ, এই খুঁটিনাটি লক্ষ্য করার কারণ, হয়তো তার নিজেরও জানা নেই।
অথবা, সবটাই তার জানা।
লাঞ্চ ব্রেকে অফিসের সব স্টাফ দিয়ে ক্যান্টিন ভরে যায়।
হাসাহাসি, গল্প, খাওয়া, সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল প্রাণচাঞ্চল্য পরিবেশে দেখা দেয়।
আর সেই ভিড়ের বাইরে, এক কোণায় বসে থাকে ফারিবা। একাই ভাবে চোখ নিচু করে নিজের খাওয়ায় মগ্ন থাকে।
চারপাশে কী হচ্ছে সে খেয়াল করে না, অথবা করলেও বোঝায় না।
লাঞ্চ ব্রেক শেষ হতেই ফারিবা আবার কাজে ফিরে আসে।
আদিল তখনও তাকিয়ে আছে। বারবার ভাবছে এই মেয়ের মধ্যে এমন কী আছে, যা তাকে এভাবে আকর্ষণ করে?
হঠাৎ সে খেয়াল করল, ফারিবা বাম হাতে লিখছে। খুব ছোট একটা বিষয়। তবুও তার দৃষ্টি সেখানেই থেমে রইল।
“ফারিবা নূর ইসলাম…”
সে নামটা আবার মনে মনে বলল।
একবার না, কয়েকবার।
অদ্ভুত, সে খুব কম মানুষের নাম মনে রাখে। প্রয়োজন ছাড়া কিছু মনে রাখার অভ্যাস তার নেই। তবুও এই নামটা যেনো তার মনে থেকেই যাচ্ছে কোনো কারণ ছাড়াই।
বিকেলের দিকে একটা ফাইল এসে রাখা হলো তার টেবিলে। উপরে ছোট করে লেখা,
“ফারিবা নূর ইসলাম”
আদিল ফাইলটা খুলল। ভিতরের কাজটা সাধারণ।
কিন্তু, প্রেজেন্টেশন পরিষ্কার। কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই। যতটুকু দরকার শুধু ততটুকুই। না কোনো বাড়তি কিছু, না কোনো কাজে কমতি।
সে মুচকি হেসে ফাইলটা বন্ধ করল। কিছু বলল না, কোনো মন্তব্য করল না। তবে ছোট করে বলল,
"পারফেক্ট।"
ফাইলটা টেবিলের একপাশে আলাদা করে রেখে দিল।
একটু পরেই এই ফাইলটার প্রয়োজন হবে একটা বড় ডিল সাইন হবে আজ।
সে ফারিবার কাজের মান যাচাই করার জন্যই আজকের মিটিং এর ফাইল টা তাকে রেডি করতে দেয় এবং মেয়েটা তার প্রত্যাশা অনুযায়ী বেশ ভালোই কাজ করেছে।
কিছুক্ষণ পর মিটিং রুম থেকে করতালির শব্দ ভেসে এলো।
মি. শেখ আদিল আয়মান, খান ইন্ডাস্ট্রিজ-এর মালিক মি. ফয়সাল খানের সাথে হাত মিলিয়ে পার্টনারশিপের যাত্রা শুরু করল।
মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে সাবরিনা শান্তা সোজা ফারিবার কাছে এসে তাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরল।
ফারিবা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কারণ জানতে চাইলে
শান্তা বলল,
“ফারিবা, তুমি তো আজকে চমক লাগিয়ে দিলে!”
ফারিবা চুপচাপ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না তবে তার চোখে অনেক প্রশ্ন জমে আছে। সাবরিনা শান্ত তার চোখের ভাষা বুঝতে পেরে বলে,
“আজকের মিটিংয়ের জন্য যে প্রেজেন্টেশন ফাইলটা তুমি বানিয়েছিলে, তার জন্যই আমরা এত বড় প্রজেক্টটা পেয়েছি।”
ফারিবা অবিশ্বাসের সুরে বলল,
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি। সবকিছু তোমার জন্য সম্ভব হয়েছে। আর স্যার তোমার কাজে খুব ইমপ্রেসড। তিনি আরো বলেছেন ভবিষ্যতে ও তোমার থেকে এমন কাজের আশা করেন।”
কথা গুলো শুনে ফারিবার আঁখি জোড়া টলমল করছে, তার হরিণী টানা টানা আঁখি যুগল মুক্তোর মত চকচক করতে শুরু করে, আজও সে হাসল, তার চোখ দেখেই সেটা বোঝা যায়।
সন্ধ্যার পর অফিস ছুটির সময়, সবাই যার যার মতো গুছিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। ফারিবাও তার ডেস্ক গুছিয়ে বেরিয়ে গেল। বের হওয়ার সময় সে একবারও পিছনে তাকাল না। যেন এই জায়গাটায় তাকে ধরে রাখার মতো, তাকে পিছু টানার মতো কিছুই নেই।
কিন্তু তার বের হয়ে যাওয়ার পরও, আদিলের চোখ কয়েক সেকেন্ড দরজার দিকেই রইল। এ যেনো এক অপ্রয়োজনীয় কাজ, তবুও সে তাকিয়ে রইল। এরপর ধীরে সে উঠে দাঁড়াল। কাঁচের দেয়ালের কাছে গিয়ে থামল। করিডোরটা পুরো ফাঁকা।
তবুও সে তাকিয়ে রইল। যেন কিছু একটা মিস করে যাচ্ছে সে। এ যেন একটা অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হতে শুরু করেছে তার মধ্যে, যার ব্যাখ্যা সে নিজেও জানে না। তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই অদৃশ্য রেখা দেখা যায়। হাসি না ভিন্ন কিছু।
আদিল কাচের দেয়ালে এক হাত আর তার প্যান্টের পকেটে এক হাত রেখে ছোট করে বলল,
“রুটিন…”
তারপর একটু থামল এবং বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।
“ইন্টারেস্টিং।”
সে আবার ডেস্কে ফিরে এল। ফাইল খুলে কাজ শুরু করল। সবকিছু আগের মতো।
তবুও এখন তার দিনের ভেতরে একটা নতুন অভ্যাস ঢুকে গেছে, চোখ তুলে একবার দেখা। কিছু না বলেও সব লক্ষ্য করা। আর নীরবে মনে রাখা।
বেশ কিছুক্ষণ পর তার ফোন বেজে উঠল।
সে ফোনটা হাতে নিয়ে নাম্বারের দিকে তাকাল, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
চশমা খুলে কল রিসিভ করল।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ঠিকমতো পৌঁছে গেছে?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“জি, স্যার।”
আদিল মুচকি হেসে বলল,
“ঠিক আছে, তোমার কাজ শেষ। তুমিও এইবার যেতে পারো।”
ওপাশ থেকে, "ওকে স্যার"
কলটা কেটে আদিল যেনো এক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে, আর চেয়ারে হেলান দিয়ে বিরবির করে কিছু একটা বলে, তারপর আবার সেই বাঁকা হাসে।
চলবে…
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আর গল্প টা কেমন লাগলো জানাবেন, সবার সুন্দর মতামতের অপেক্ষায় রইলাম, ধন্যাবাদ ]