#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_৩
রাতে শহরটা যেন এক অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের টিমটিম আলোতে যেন শহরটা এক নিছক আলোকরেখায় ভরে যায়।
দিনের সেই ব্যস্ততা, শব্দ, ভিড়, সব ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। চারপাশে আলো থাকে, কিন্তু শব্দ কমে যায়। আর সেই নীরবতার ভেতরেই কিছু কিছু জিনিস বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ফারিবা বাসায় ফিরেছে অনেকক্ষণ হলো। ছোট একটা ফ্ল্যাট তার। খুব সাদামাটা, দেয়ালে কোনো সাজসজ্জা নেই, শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস। ঘরের ভেতরে হালকা ওষুধের গন্ধ।
তার বাবা বিছানায় শুয়ে আছেন। শরীরটা আর আগের মতো নেই, চোখে ক্লান্তি। বাম পায়ে এখনো প্লাস্টার করা। ডাক্তার তাকে এক বছর জুড়ে বিশ্রাম করতে বলেছে।
ফারিবা চুপচাপ গিয়ে তার বাবার পাশে বসে নরম কণ্ঠে বলে,
“কেমন আছেন আব্বু?”
লোকটা তাকাল তার মেয়ের দিকে, হালকা হাসল, এরপর ছোট করে উত্তর দিল,
“ভালো।”
তবে এই ‘ভালো’টা যে আসলে কতটা ভালো তা দুজনেরই জানা। ফারিবা আর কিছু বলে না। অফিস থেকে ফেরার পথে বাবার শেষ হয়ে যাওয়া ওষুধগুলো এনেছিল, সেগুলো পাশের টেবিলে রেখে দেয়।
ফারিবা সব কাজ খুব পরিপাটি করে করতে পছন্দ করে। সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মে করে, একদম অফিসের মতো; পরিমিত, নিয়ন্ত্রিত, নির্ভুল।
বাবার পাশে আরও কিছুক্ষণ বসে, তারপর সোজা চলে যায় রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করতে।
রান্নাঘরে গিয়ে সে চুপচাপ রান্না করতে শুরু করে। আজ সে-ই রান্না করবে। তার মা অনেকবার বাধা দিয়েছে মেয়েকে, কিন্তু মেয়ে কোনো কথা শোনেনি।
“মা-রে, তুই তো সারাদিন অফিসে কত কাজ করিস, বাড়ির কাজগুলো অন্তত আমাকে করতে দে।”
“মা, আপনিও তো বাড়িতে কত কাজ করেন, এরপর আব্বুর দেখাশোনা করেন। একটা দিন অন্তত আমাকে একটু রান্না করতে দিন।”
ফারিবার মা আর কোনো প্রতিবাদ করে না। জানে, এই মুহূর্তে মেয়ের সাথে পেরে উঠবেন না।
ফারিবা চুপচাপ নিজের কাজ করে যাচ্ছেকোনো শব্দ না করে। শুধু চুলার আগুনের শব্দ, হালকা কড়াইয়ের শব্দ।
পুরো ঘরে আর কোনো আওয়াজ নেই।
রান্না শেষে খাবার সাজিয়ে সে বাবা, মা আর ছোট ভাইয়ের সামনে বসে। সবাইকে খাবার পরিবেশন করে দেয়, এবং নিজেও খায়, চোখ নিচু করে। কেউ কোনো বাড়তি কথা বলে না।
তবুও এই নীরবতার ভেতরে একটা অভ্যাস আছে।
খাওয়া শেষে বাবাকে ওষুধ এগিয়ে দেয়, পানি দেয়। সব কাজ শেষ করে, সব গুছিয়ে রাখে। এরপর ছোট ভাইকে পড়ায়, সাথে নিজের অফিসের কাজগুলো শেষ করে।
তারপর ফারিবা নিজের ঘরে ঢোকে। ঘরটা ছোট, খুব সাধারণ আহামরি কিছুই নেই, একটা ছোট খাট, পাশে একটা টেবিল। সেই টেবিলের উপর তার সব ফাইল রাখা। একটা নোটবুক, যেখানে সে তার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিদিনের কথাগুলো লিখে।
আর দেয়ালের এক কোণায় ছোট একটা কাগজে কিছু লেখা,
“ফারিবা, তুমি পারবে। হার মানো না। হার মেনে নিলেই তুমি দুর্বল হয়ে যাবে।”
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে লেখাটার দিকে। কিছু বলে না।
শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, সাথে দু’ফোঁটা জল।
তারপর নিজের বোরকাটা গুছিয়ে রাখে।
আয়নার সামনে দাঁড়ায়, কিন্তু আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকায় না, বা তাকালেও যেন দেখে না।
আবারও একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস। তারপর আবার সবকিছু গুছিয়ে রাখে। যেন কিছুই বদলায়নি, সবকিছু ঠিকঠাক।
ওদিকে...
শহরের অন্য প্রান্তে—একটা বড় বাড়ি। চারপাশ একদম নীরব। বাড়ির গ্যারেজে কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটা পার্ক করে দরজা খুলে, শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে বেরিয়ে এলেন শেখ আদিল আয়মান।
বাড়ির বাগানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।
এই বাগানটা তার মায়ের অনেক শখের। প্রতিটা গাছ তার মা নিজের হাতে লাগিয়ে গেছেন।
আদিলের মন যখন খুব খারাপ বা খুব ভালো থাকে, তখন সে এই বাগানের পাশে এসে দাঁড়ায়, নিজের মনকে শান্ত করতে। তবে আজ তার মনের অবস্থা সে বুঝতে পরলো না, তাই তার মা-য়ের ছোঁয়া পেতেই এখানে আসা। কারণ এখানে এলে তার মনে হয়, তার মা এখনো তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন।
অনেকটা সময় পর সে নিজের রুমে চলে যায়।
রুমে আসার আগে রহিমা খালাকে বলে এসেছে তার খাবারটা যেন ঘরে দিয়ে যায়।
রহিমা বেগম এই বাড়িতে কাজ করে যখন আদিল অনেক ছোট ছিল, সে ছেলেটাকে ছোট থেকেই আগলে রেখেছে। আদিলকে ছোট থেকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করেছেন। আদিলও তার মায়ের অবর্তমানে তাকে পেয়েছে।
তাই উনি ছাড়া ছেলেটার জীবনে আর কেউ নেই। এত বড় একটা বাড়ি, কিন্তু মানুষ মাত্র দুজন।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ ও নিস্তেজ।
আদিল সোজা চলে গেল ফ্রেশ হতে।
লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হলো সে।
পরনে কালো রঙের ওভারসাইজ টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার।
তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছে, বিছানায় ভেজা তোয়ালেটা ছুড়ে মারল।
এরপর নিজের হাত দিয়ে চুলগুলো ঝেড়ে নিল।
একবার আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে দেখে নিল।
রাতের আদিল আর দিনের আদিলের মধ্যে পার্থক্য খুঁজতে শুরু করল।
হয়তো খুঁজে পেয়েও গেল।
দিনের আদিল—গম্ভীর, কঠিন।
আর রাতের আদিল—তার বিপরীত, ক্লান্ত।
নিজের রুম থেকে বের হয়ে সে স্টাডি রুমের দিকে অগ্রসর হলো।
টেবিলে বসে ফাইলগুলো খুলে বাকি কাজ দেখতে থাকে।ল্যাপটপ অন করে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিচ্ছে।
তবুও তার কাজে যেন মন বসছে না।
তার সামনে রাখা ফোনটা কয়েক সেকেন্ড পরপর জ্বলে উঠছে। একই নাম্বার কয়েকবার কল আসে।
সে তাকায় কিন্তু রিসিভ করে না।
কিছুক্ষণ পর সে ফোনটা হাতে তুলে নেয়, ডায়াল করে।
একবার, দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হয়।
“জ্বি, স্যার।”
আদিল কিছুক্ষণ চুপ থাকে।
তারপর ধীরে বলে—
“বারবার কল করছো যে… কিছু ঘটেছে?”
ওপাশ থেকে উত্তর আসে—
“জি, স্যার।”
এরপর ওপাশে থাকা লোকটা কিছু একটা বলল।
কথাগুলো শুনে আদিলের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না।
সে আগের মতোই চুপ করে রইল। তার চোখ কিছুটা স্থির হয়ে গেল। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কলটা কেটে দিল।
ঘরের ভেতরে আবার নীরবতা।
আদিল কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে।
তারপর উঠে দাঁড়ায়।
বড় জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে।
লাইটার দিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটে স্পর্শ করে।
একটা লম্বা টান, আর ধোঁয়ার সাথে সাথে
তার ভেতরের ভাবনাগুলো যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে।
জানালার বাইরে শহর, আলো আর ছায়ার অদ্ভুত খেলা।
ঠিক তখন—
কোথা থেকে যেন ভেসে আসে একটা সুর…
মৃদু, অস্পষ্ট—
“হারিয়ে গিয়েছি…”
“এই তো জরুরি খবর…”
শব্দগুলো পরিষ্কার না,
তবুও অদ্ভুতভাবে কানে লেগে থাকে।
“অবাক দুই চোখে
ছায়া কাঁপে ভয় অভিমানে
হারিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই এখানে
হারাবো বলে, পা টিপে এগুতে গেলেই
গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক
পায়ে পায়ে হারাবার জায়গা খুঁজে মরি...”
সুরটা যেন তার ভেতরের অগোছালো ভাবনার সাথে মিশে যায়। হারিয়ে যাওয়ার মতো একটা অনুভূতি যেটা সে স্বীকার করে না, তবুও অস্বীকারও করতে পারে না।
এই গানের প্রতিটা লাইন যেন তার জীবনের অংশ গুলোর সাথে মিশে যাচ্ছে। আদিল নিজের হাতের মুঠি শক্ত করে দাড়িয়ে রইল এবং তার ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা রেখা ফুটে ওঠে। সেই চিরচেনা রেখা যা দেখে বুঝার উপায় নেই সে হাসছে, না কিছু একটা ভাবছে।
এরপর সে আবার টেবিলে ফিরে আসে।
আজকের মিটিংয়ের ফাইলটা খুলে দেখে।
ফারিবার নামের উপর আঙুল দিয়ে ধীরে ছুঁয়ে যায় একবার, আরেকবার।
তার চোখে এখন আর শুধু আগ্রহ নেই সাথে কিছুটা হিসেবও আছে।
ওদিকে…
ফারিবা বিছানায় শুয়ে আছে। ঘরটা অন্ধকার। শুধু জানালা দিয়ে আসা হালকা আলো ঘড়টা আলোকিত করছে। তার চোখ দুটো বন্ধ। তবুও আজ ঘুম আসছে না।
কারণটা সে নিজেও জানে না।
হঠাৎ তার ফোনে একটা অজানা নাম্বার থেকে মিসড কল আসে একবার। সে চোখ খোলে।
ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
তারপর ফোনটা উল্টে রেখে দেয়, রিসিভ করে না।
কিন্তু তার আঙুল কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে ছিল স্ক্রিনের ওপর। বেশ কিছুদিন ধরে এই নাম্বার থেকে একই সময়ে মিসড কল আসছে। তবে সে কল ব্যাক করলে কেউ রিসিভ করে না। তাই এখন আর সে পাত্তা দেয় না।
রাত আরও গভীর হতে থাকে, দুইটা আলাদা জায়গা—
দুইটা আলাদা মানুষ একই সময় জেগে আছে।
একজন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
আরেকজন কোনো কিছুর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না।
সকালে সবকিছু আবার আগের মতোই শুরু হবে।
অফিস, রুটিন, নীরবতা।
তবে... তবে হয়তো আজকের রাতের পর
কিছু একটা পরিবর্তন ঘটবে দুজনের জীবনে।
চলবে…
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আর গল্প টা কেমন লাগলো যানাবেন, ধন্যাবাদ ]