#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_৬
মধ্য রাত, চারিদিক প্রায় জনশূন্য পরিবেশ, রাস্তায় জনগনের আনাগোনা খুব কম বললেই চলে। ফারিবা অফিস থেকে বাইরে পা রাখতেই ঠাণ্ডা রাতের বাতাস মুখে এসে লাগল।
দিনের সেই ভিড় এখন নেই, কোনো শব্দ নেই। শহরটা যেন একটু থমকে গেছে। রাস্তার লাইটগুলো জ্বলছে, হালকা হলুদ আলোয় চারপাশটা কেমন অচেনা লাগছে তার কাছে।
ফারিবা ধীরে হাঁটতে শুরু করল, বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল যদি একটা গাড়ি বা রিক্সা পায় সেই আশায়, কিন্তু কোনো উপায় হলো না।
তার কাঁধে ব্যাগ ঝুলছে, হাতে কোনো ফাইল নেই আজকে, সব গুছিয়ে এসেছে। আজ একটু বেশি দেরি হয়ে গেছে।
রাস্তায় মানুষ কম। কিছু দূরে দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে। কিন্তু তার যাওয়ার মত কোনো গাড়ি চোখে পরলো না। কোথাও কোথাও দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।
তার হাঁটার ভঙ্গি আগের মতোই শান্ত ও নমনিয়।
তবুও আজ একটা অদ্ভুত কিছু অনুভূতি হচ্ছে তার।
যেন কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে থামল না এমনকি পিছনেও তাকাল না।
শুধু এক সেকেন্ডের জন্য তার আঙুল ব্যাগের হাতলটাকে শক্ত করে ধরল। তারপর আবার হাঁটতে লাগল।
রাস্তার একপাশে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, গাড়ির ভেতরে লাইট অফ। ভেতরে কেউ আছে কি না বুঝার উপায় নেই।
ফারিবা সেই গাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেল, একবারও তাকাল না।
গাড়িটার ভেতরে অন্ধকারে বসে আছে একজন, তার দৃষ্টি স্থির। সে কোনো শব্দ করল না। শুধু চোখ দিয়ে অনুসরণ করছে।
গাড়ির ড্যাশবোর্ডে রাখা ফোনটা হালকা আলো জ্বলে উঠল।
একটা মেসেজ স্ক্রিনে ছোট করে ভেসে উঠল,
“উনার দিকে আমি নজর রেখেছি, স্যার।”
সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল না, আগে থেকেই জানে কি ম্যাসেজ আসতে পারে। ধীরে মাথা একটু কাত করল।
তার চোখ এখনো ফারিবার উপর।
“এইভাবেই সবার সাথে দূরত্ব বজায় রেখো।”
কথাটা খুব ধীরে বলল, সাথে ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি ।
ফারিবা এখনো হাঁটছে একইভাবে, একই ছন্দে।
তবুও তার মনে হচ্ছে, আজকের রাতটা অন্যরকম।
হঠাৎ করেই তার ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠে। একটা মিসড কল। সেই অজানা নাম্বার থেকে।
সে থামল না, হাঁটতে হাঁটতেই ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।
সেই একই নাম্বার, তার ভ্রু হালকা কুঁচকে গেল। তারপর সে ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিল। আজ আর কল ব্যাক করল না।
দূর থেকে একটা ছায়া থেমে রইল। গাড়ির ভেতরের মানুষটা এইবার ধীরে চোখ নামাল। তার ঠোঁটের কোণে
সেই অদৃশ্য রেখা ফিরে এল।
“হাহ, এই মেয়েটা দিন দিন আমার অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।”
গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে ধীরে কথাটা বলল।
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট না করে সে এখনো বসে আছে।
দূর থেকে দেখতে পেলো ফারিবা একটা মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতায় কাটিয়ে দিল আদিল। তারপর সে ধীরে ফোনটা হাতে তুলে নিল।
একটা নাম্বার ডায়াল করল।
ওপাশ থেকে সাথে সাথেই রিসিভ করে,
“জ্বি, স্যার।”
সে চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ড।
তারপর বলল,
“না পৌঁছানো পর্যন্ত একবারও চোখ সরাবে না, ওকে নজরে রাখবে, আন্ডারস্ট্যান্ড।”
ওপাশ থেকে,
“ইয়েস স্যার।”
কল কেটে গেল, গাড়ির ভেতরে আবার নীরবতা। সে ধীরে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
ফাঁকা রাস্তা। তার চোখে এখন আর শুধু আগ্রহ নেই। কিছুটা অধিকারও মিশে গেছে।
ফারিবা শেষমেশ বাসার সামনে এসে থামল। চারপাশে নীরবতা।
একটা-দুটো জানালায় এখনো আলো জ্বলছে।
সে একবার চারপাশে তাকাল। খুব স্বাভাবিকভাবেই যেন অভ্যাস বশত। কিছু চোখে পড়ল না।
তবুও তার ভেতরের সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা পুরোপুরি গেল না।
সে ধীরে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের ভেতরে হালকা আলো। পরিচিত ঔষুধের গন্ধ।
সবকিছু আগের মতোই। তার মা রান্নাঘরে।
হালকা শব্দ আসছে।
তার বাবা ঘুমিয়ে আছে ।
হালকা করে শ্বাস টানার শব্দ শুনা গেলো। ফারিবা চুপচাপ জুতা খুলে ভেতরে ঢুকল।
ব্যাগটা টেবিলে রাখল।
কিছু বলল না।
“আজ এত দেরি হলো যে মা?”
মায়ের চিন্তিত কণ্ঠ ভেসে আসলো। ফারিবা মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
“অফিসে একটু কাজ ছিল।”
ছোট, স্বাভাবিক উত্তর।
তার মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর আবার ভয়াত্ব কন্ঠে বলল,
“আমি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানিস মা, আমি তো ভেবেছি তোর ও ফারদিন এর মতো....”
মা-এর পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারিবা হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল, এরপর টলটল চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু বলল না, এরপর ধীরে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
ঘরটা অন্ধকার, সে আর লাইট অন করল না।
জানালা দিয়ে আসা আলোতেই সবকিছু দেখা যাচ্ছে।
সে ধীরে বসে পড়ল বিছানার একপাশে। আজ তার শরীরটা এমনিতেই ক্লান্ত, তার উপর মা-এর হঠাৎ করে ফারদিন এর কথা উঠানোটা যেনো ফারিবা কে আবেগি করে দিয়েছে।
চোখের কোনায় জমে থাকা অস্রু গুলো যেন হঠাৎ করেই ছুটি পেয়ে গেল, পরক্ষনেই মেয়েটার হরিণী টানা চোখ থেকে অঝোরে শ্রাবনের ধারা ঝড়ে যেতে শুরু করে।
তার আঙুল ধীরে ফোনের দিকে এগোল। ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিন অন করল, এরপর গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে দেখতে শুরু করে আর নিরবে অস্রু ঝড়তে থাকে।
ওদিকে...
শহরের অন্য প্রান্তে একটা গাড়ি এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এখনো ইঞ্জিন বন্ধ। হেডলাইট বন্ধ।
ভেতরে আদিল বসে আছে।
তার চোখ সামনে কিন্তু দৃষ্টি অনেক দূর পর্যন্ত আটকিয়ে আছে। ফারিবা এখন আর সামনে নেই।
তবুও তার চোখ যেন এখনো অনুসরণ করছে সেই পথের দিকে।
ফোনটা তার হাতে স্ক্রিনে শেষ কলটা এখনো দেখা যাচ্ছে। সে ধীরে মাথা পেছনে ঠেকাল।
চোখটা বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তার গাড়িতে গান বেজে যাচ্ছে মৃদু শব্দে, সে এখনো হেলান দিয়ে বসে আছে।
চোখটা ধীরে খুলল, আজ রাতের আকাশ টা যেনো একটু বেশি সুন্দর বলে মনে হচ্ছে তার কাছে। সে এইবার সামনের দিকে ঝুকে স্টিয়ারিং হুইলে দুহাত ভাজ করে নিজের থুতনি রাখে, এরপর সুন্দর একটা মুচকি হাসি দিয়ে আকাশের ওই সুন্দর চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর সাথে গাড়িতে বাজতে থাকা সেই গানের সাথে সুর মিলিয়ে গুনগুন করে,
তোমার আকাশ ধরার শখ
আমার সমুদ্দুরে চোখ
আমি কি আর দেবো বলো
তোমার শুধুই ভালো হোক ।
তোমার ভোলা ভালা হাসি
আমার বুকের ভেতর ঝড়
তুমি চলতি ট্রেনের হাওয়া
আমি কাঁপি থরথর ।
তোমার নানান বাহানায়
আমার জায়গা টা কোথায়
আমি কি এক ঘোরে থাকি
ছিলো কত কথা বাকি ।
তোমার গোপন সবই রয়
আমার আপন মনে হয়
আমি ভোরের ঝরা পাতা
আমার ম*রার কিসের ভয়....
আদিলের মধ্যে আজ যেনো কোনো ক্লান্তি নেই, তার কণ্ঠে ক্লান্তি নেই। সে মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে যাচ্ছে, এক মুহূর্তে মুখে হাসির সাথে চোখের এক কোনে মুক্তর মতো কিছু চমকে উঠতে দেখা গেল।
তার মাঝে আজ একটা অদ্ভুত স্থিরতা। সে আবার ফোনটা তুলল।
স্ক্রিনের দিকে অনেকক্ষন তাকাল। একটা নাম্বার খুলল কিন্তু কল করল না শুধু দেখল। তারপর ধীরে স্ক্রিন লক করে দিল, ফিসফিস করে বলল
“এখনো অনেক সময় আছে…”
সে আবারও জানালার বাইরে তাকাল চারপাশ ফাঁকা, ফাঁকা রাস্তা, টিমটিম আলো, স্তব্ধ, নীরবতা। হঠাৎ তার ফোনটা বেজে ওঠে, হাতে ফোনটা নিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে রিসিভ করে,
“হ্যা বলো।”
ওপাশ থেকে,
“স্যার, সে বাড়িতে পৌঁছে গেছে।”
“কোন সমস্যা হয়নিতো।”
“জ্বি না, স্যার।”
“আচ্ছা এইবার তুমিও যেতে পারো।”
বলেই ফেনটা কেটে দিল এরপর আরো কিছুক্ষন একই জায়গায় বসে সুন্দর রাতটাকে উপভোগ করে গাড়ি ঘুড়িয়ে চলে যেতে থাকে।
ওদিকে...
ফারিবা চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে অন্ধকার রুমে শুয়ে আছে, অন্ধকার হলেও জানালা দিয়ে আসা রাস্তার হালকা আলোতে ঘরটা আলোকিত হয়ে যায়। ফারিবা চুপ করে শুয়ে সিলিং এর দিকে এক ঘোরে তাকিয়ে আছে।
তার আজ কিছুই ভালো লাগছে না, মা এসে কয়েকবার খাবার খেতে ডেকে গেছে কিন্তু সে খাবেনা জানিয়ে দেয়, তার শরীর টা ভালো লাগছে না। মা ঠিকই বুঝতে পেরেছে মেয়েটার শরীরটা খারাপ নাকি মনটা, তাই আর জোর করল না চুপ করেই চলে গেলেন।
ফারিবা বারবার এপাশ ওপাশ ফিরছে, কিন্তু আজ ঘুম আসছে না তার চোখ বন্ধ, তবুও ঘুম এখনো আসেনি।
তার মনে হচ্ছে আজকের রাতটা শেষ হবার নয়।
রাতটা গভীর হচ্ছে, চারপাশে আরো নীরবতা নেমে এল, কিন্তু এই নীরবতার মাঝে যেনো অনেক কিছুর পরিবর্তন হতে শুরু হয়ে গেছে।
রাত আরও গভীর হলো। ঘরের ভেতরে সব আলো নিভে গেছে আরো অনেক আগেই। সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন, শুধু ঘুম নেই আজ ফারিবার চোখে। জানালা দিয়ে এখনো ফিকে আলো এসে পরছে ফারিবার ঘরে।
আলো ছায়া আর নীরবতা মিশে আছে পুরো ঘর জুড়ে। ফারিবা এখন জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু একটা ভাবছে সাথে দীর্ঘশ্বাস। হঠাৎ করে তার ফোনটা আবার হালকা কাঁপল।
স্ক্রিনের আলো জ্বলে উঠল অন্ধকারে। একই নাম্বার থেকে কল আসে। এইবার মিসড কল না, এইবার যেনো কলটা একটু বেশি সময় ধরে বাজল। ফারিবার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ধীরে হাত বাড়াল।
ফোনটা হাতে নিল। কিছুক্ষন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার আঙুল এগোল, সাহস নিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। এরপর কয়েকবার,
“হ্যালো, হ্যালো, কে বলছেন”
এরপর কলটা কেটে গেল, ওপাশ থেকে কোনো কথা বলল না, কোনো শব্দ হলো না।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল ফারিবা কয়েক সেকেন্ড ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ধাক্কা লাগল।
এই প্রথম সে একটু দ্বিধায় পড়ল। মনে মনে ভাবলো, নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল,
“কেউ কি ইচ্ছে করে করছে এটা?”
কিন্তু কোনো জবাব মিলল না, তাই সে আর কিছু বলল না।
ধীরে ফোনটা পাশে রেখে দিল।
তবুও আজ সে ফোনটা পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখল না। তার আঙুল কয়েক সেকেন্ড ফোনের পাশেই রয়ে গেল।
ওদিকে...
অন্ধকার একটা ঘর।
হালকা আলো জ্বলছে, শুধু টেবিল ল্যাম্পের হালকা আলো।
টেবিলের উপর একটা ফোন রাখা।
স্ক্রিনে ভেসে আছে,
“কল এন্ডেড”
তার পাশেই আরেকটা ফোন। দুটো আলাদা ডিভাইস।
একটা দিয়ে কল করা হয়েছে।
আরেকটার দিকে শুধু তাকিয়ে আছে।
আলো ছায়ার ভেতরে বসে থাকা মানুষটা ধীরে আঙুল দিয়ে টেবিলে টোকা দিল।তার চোখ স্থির, স্ক্রিনের উপর হাত বুলিয়ে বলে।
“এখনই না, সামনে অনেক সময় পরে আছে।”
সে আস্তে বলল, তার কণ্ঠে কোনো তাড়া নেই। শুধু আছে অপেক্ষা।
সে ধীরে দ্বিতীয় ফোনটা হাতে নিল।
স্ক্রিন অন করল একটা নাম ভেসে আছে।
“ফারিবা” সে কিছু করল না।
আর কল দিল না, কোনো ম্যাসেজ করল না। শুধু নামটার উপর আঙুল বুলিয়ে গেল, ধীরে খুব ধীরে।
তার ঠোঁটের কোণে সেই অদৃশ্য রেখা ফিরে এল। স্ক্রিনের আলো আবার নিভে গেল।
দুইটা আলাদা জায়গা। দুইটা আলাদা নীরবতা।
তবুও একটা অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়ে গেছে। যার কোনো শব্দ নেই।
কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু আছে অপেক্ষা।
চলবে....
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্পটা কেমন লাগলো জানাবেন, সবাই পড়া শেষে সুন্দর সুন্দর মতামত দিবেন আশা করি, ধন্যাবাদ ]