ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৭ম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৭

গত রাতটা পুরোপুরি ঘুমিয়ে কাটেনি ফারিবার। ঘুম এসেছিল কিন্তু বারবার ভেঙে গেছে। তার মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক করেছিল।

কখনো কোনো কারণ ছাড়াই ঘুম ভেঙেছিল। কখনো হঠাৎ করেই ঘুমের ঘোরে কারো স্মৃতি ভেসে আসার কারনে।

সকালে উঠে সবকিছু আগের মতোই করেছে সে। একই রুটিন, একইভাবে, একই ছন্দে।

তবুও আজ তার ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত অস্বস্তি রয়ে গেছে।

অফিসে ঢোকার আগে সে আজ একটু বেশি সময় নিয়ে থামল।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা সময় নিরবতায় কাটায়, তারপর ধীরে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরের পরিবেশটা ঠিক প্রতিদিনের মতোই। কীবোর্ডের শব্দ, ফোনের রিং, মানুষের কথাবার্তা, কাজের ব্যাস্ততা, সব চলছে নিজের মতো, একই গতিতে ।

কিন্তু ফারিবার কাছে আজ সবকিছু কেমন যেনো অন্যরকম লাগছে।

সে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ল।

ফাইল খুলে কাজ শুরু করল।

কিছুক্ষণ সব ঠিকঠাক চলল।

তারপর তার হাত থেমে গেল।

হঠাৎ করে মনে হলো কেউ তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফারিবা অবাক হলো এতদিন তার এমন কোনো অনুভূতি হয়নি, তবে হঠাৎ করেই কাল রাত থেকে এমন কেনো মনে হচ্ছে। তবুও সে চোখ তুলে তাকাল না।

শুধু এক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল।

তারপর আবার কাজ শুরু করল।

কাঁচের দেয়ালের ওপাশে আদিল আগেই এসে বসে আছে, আজ সকালে মিটিং থাকায় একটু আগেই পৌঁছে গেছে অফিসে।

আজ তার চোখে ক্লান্তি নেই।

বরং অস্বাভাবিক রকমের স্থিরতা।

সে একবার তাকাল ফারিবার দিকে, দৃষ্টি সরাল না।

ঠিক তখন কেউ একজন ফারিবার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ায়। সে ব্যক্তি কে দেখে আদিলের মুখের ভঙ্গি পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো।

“গুড মর্নিং, ফারিবা।”

তন্ময়ের মায়া ভরা কণ্ঠ ফারিবার কানে ভেসে এলো। হঠাৎ করে তার হাত আবার থেমে গেল। সে ধীরে তাকাল। দেখতে পেলো তন্ময় দাঁড়িয়ে আছে। আজও সেই হাসি।

তন্ময় মুচকি হেসে বলে,

“কাল... একটু বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল বাড়ি পৌঁছাতে, তাই না?”

প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এই সাধারণ প্রশ্নের মাঝে ফারিবার প্রতি চিন্তা আর যত্ন ফুটে উঠল। ফারিবা কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো, তারপর ছোট করে বলল,

“হ্যাঁ... একটু।”

তন্ময় মাথা নাড়িয়ে ফারিবার ডেস্কে হেলান দিয়ে এক হাতে গালে রেখে বাচ্চাদের মতো মুখ পাউট করে বলে,

“হুম, আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্য, কিন্তু আপনি তো থেকে গেলেন।”

এইবার ফারিবা একটু আওয়াজ করে হেসে ফেলে, তার কাছে তন্ময় কে এখন কোনো বাচ্চার চাইতে কম মনে হচ্ছে না। তন্ময় এর বাচ্চামি ভঙ্গি দেখে ফারিবা হাসলো।

তন্ময় ফারিবার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার কাছে এই মুহূর্তে ফারিবাকে কোনো অপ্সরী বলে মনে হচ্ছে। ফারিবাকে পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দরী নারী মনে হচ্ছে।

যদিও তন্ময় ফারিবাকে দেখেনি তবুও তার বিশ্বাস মেয়েটা অনেক রূপসী, তাই তো সে তার এই সুন্দর রূপ টাকে আড়াল করে রাখতে এইভাবে আসে।

তন্ময় এর বিশ্বাস যেই মেয়ের চোখ সুন্দর, হাসি সুন্দর, যে হাসলে তার চোখও সমান তালে হাসে, সেই মেয়ে আসলেই একটা অপ্সরী। তন্ময় এখনো অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ফারিবার দিকে, আর তার মনের ভেতর ঝড়ো হাওয়া সব কিছুই উথাল পাথাল করে দিচ্ছে, সব এলোমেলো করে দিচ্ছে।

তন্ময় তার বুকের বাঁ পাশটায় চিনচিন ব্যথা অনুভব করলো। সে বুকে হাত দিয়ে রাখলো। তার মনের ভেতর অনেক আজানা কথা সুর সাজাতে শুরু করলো, নানান কাব্য সাজাতে শুরু করলো। অনমনে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,

“তুমি আমার হয়ে যাও হে অপ্সরী,

তোমাকে আমার বুকের ঘরে রেখে দিব যত্ন করি।

ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিব তোমায়,

কোন কষ্ট ছুতে দেবনা তোমায়।

সযত্নে আমার মনের গহীনে সাজিয়ে রাখবো,

বলনা হে অপ্সরী তুমি কি আমার হবে।

বলনা হে আপ্সরী,

তুমি কি আমায় ভালোবাসবে। ”

তন্ময় এর কথা গুলো শুনে ফারিবা জমে গেলো, সে কি বলবে বুঝতে পারছে না। তন্ময়ের হুস ফিরতেই সে কথা ঘুরিয়ে বলতে শুরু করে,

‌“কবিতা টা কেমন লাগলো। ”

ফারিবা অবাক হয়ে,

“মানে।”

তন্ময় পুনরায় মুখে সুন্দর হাসি ফুটিয়ে বলে,

“আমার টুকটাক লিকালিখির অভ্যেস আছে, ওই আপনার হাসি দেখে ইন্সপিরেশন নিয়ে এই লাইন গুলো সাজিয়ে ফেললাম, নিন বলুন তো ম্যাডাম কেমন হলো লাইন গুলো।”

ফারিবা বেশ ভালো করেই বুঝতে পেরেছে সবটা তারপরও না বুঝার ভান করেই ছোট করে বলল,

“সুন্দর হয়েছে অনেক।”

“ধন্যাবাদ ম্যাডাম, আবার শুনতে ইচ্ছে করলে বলবেন আমার স্টকে এমন অনেক কবিতা আছে।”

“হুম বলব।”

এরপর আরো কিছুক্ষন কথা বলে তন্ময় চলে যায় নিজের ডেস্কে, কিন্তু ফারিবা এখনো তন্ময় এর বলা প্রতিটা কথা ভাবছে। কিন্তু কেনো ভাবছে কি দরকার এইসব ভাবার।

সে এখানে শুধু কাজের জন্য এসেছে এর বাহিরে আর কোনো কিছুর জায়গা নেই। তার জীবনে এইসব এর জায়গা তো আরো নেই। সে মনে মনে ভেবে নিল তার এখন থেকে তন্ময়কে একটু এড়িয়ে চলতে হবে।

সে তার কাজে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত একটু চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে পুনরায় কাজে মন দিল।

তন্ময় এর কান্ড এতোক্ষন সবটাই দেখেছে আদিল, রাগে তার হাত থেমে গেছে। তার চোখ এখন পুরোপুরি স্থির।

তন্ময়, ফারিবা একই ফ্রেমে এইসব তার সহ্য হয় না। ফারিবার পাশে কাওকে সে সহ্য করতে পারেনা। রাগে ক্ষোভে নিজেই নিজের চুল ধরে টানতে থাকে। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকে, রাগে তার পুরো শরীর কাপছে। আনমনে ফিসফিস করে বলতে থাকে,

“কোনো ফারিবা, কোনো, তোমাকে যতটা সবার থেকে দূরে রাখতে চাই, ততটাই কেন তুমি সবার সাথে মিশে যাও, কেনো।”

চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস টেনে নিজের রাগ দমন করার চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো উপায় হয় না। চোখটা খুলে আদিল ধীরে কলমটা টেবিলে রাখল। তারপর ইন্টারকমটা তুলে ডায়েল করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে রিসিভ হয়, আর সে ধমকের সুরে বলে।

“মিস. ফারিবাকে এখনই, এইমুহূর্তে আমার কেবিনে পাঠাও।”

সে আর ওইপাশ থেকে উত্তরের অপেক্ষা করলো না ফোন টা রেখে দিল, আবারও চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়ে বসে রইলো।

একজন পিওন কে দিয়ে ফারিবার কাছে খবর পাঠানো হলো, আদিল স্যার ফারিবাকে তার কেবিনে ডাকছে। হঠাৎ ফারিবার মনের ভেতর ভয় কাজ করতে শুরু হল, তার দ্বারা কোনো ভুল হলো না তো, কালকে রেডি করা ফাইলটাতে কোনো ভুল হলো না তো। না হলে কেনোই বা এত জরুরী তলবে ডাকবেন আদিল তাকে। এইসব বিষয় ফারিবার মাথায় ঘুরতে থাকে।

ফারিবা তার ভাবনা বাদ দিয়ে কেবিনের দিকে এগোল, কেবিনের সামনে এসে থামল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক সেকেন্ড শ্বাস নিল।

তারপর—

হালকা নক করল।

“মে আই কাম ইন, স্যার?”

“কাম ইন.”

ভেতরে ঢুকতেই প্রতিবার ফারিবার কাছে ঠাণ্ডা ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ বলে মনে হয়। তবে আজ সবকিছু ঠিকঠাক, সবকিছু নিজের জায়গা মতো গোছানো থাকলেও তার কাছে পরিবেশটা আজ একটু ভারী বলে মনে হচ্ছে ।

আজ আদিল বসে নেই, সে দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে পেছন ফিরে।

ফারিবা ভেতরে ঢুকে দরজাটা ধীরে বন্ধ করল।

“স্যার, আপনি আমাকে ডাকছিলেন?”

কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর নেই।

তারপর আদিল ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

তার চোখ সরাসরি ফারিবার উপর এসে থামল, এরপর একটু সময় নিয়ে বলল,

“হুম,বসো কথা আছে।”

কণ্ঠ শান্ত। ফারিবা ধীরে সামনে গিয়ে বসে পড়ল। টেবিলের উপর একটা ফাইল রাখা।

আদিল ধীরে সামনে আসে কিন্তু বসল না দাঁড়িয়েই রইল। কিছুক্ষন ফাইলের দিকে তাকিয়ে ফারিবা কে জিজ্ঞেস করল,

“আজকের কাজটা শুরু করেছো?”

“জ্বি, স্যার।”

“কতদূর?”

ফারিবা এক সেকেন্ড ভেবে বলল,

“প্রথম অংশটা প্রায় শেষ।”

আদিল মাথা নাড়ল।

তারপর ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল। ফাইলটা হাতে নিল খুলল না।

শুধু আঙুল দিয়ে ফাইলটার উপর হালকা চাপ দিল। এরপর ধীরে বলল,

“তোমার কাজ খুর নিট এন্ড ক্লিন, আমি আগেও বলেছি তোমার কাজে আমি মুগ্ধ।”

ফারিবামাথা নিচু করেই বলল

“ধন্যবাদ, স্যার।”

এরপর কিছু সাময়িক সময়ের নিরবতা, কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না।

তারপর আদিল হালকা এগিয়ে এল।

“তুমি কাল দেরি করে বাড়ি ফিরেছিল কোনো অসুবিধা হয়নি তো।”

প্রশ্ন টা হঠাৎ করে করার ফলে ফারিবা অবাক হয়ে গেল, এরপর ছোট করে বলল,

“জ্বি না, স্যার।”

আদিল তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন, তারপর আবারও বলল,

“হুম, ঠিক আছে। তবে কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে।”

ফারিবা স্বাভাবিক ভাবেই বলল,

“সমস্যা নেই স্যার আমি ম্যানেজ করে নিতে পারবো।”

এইবার আদিল একটু রেগে আধিকারের সুরে বলল,

“সেটা আমি জানি যে তুমি ম্যানেজ করে নিতে পারবে, তোমার দেরি হচ্ছে বাড়ি যেতে তা তো আফিসের কাজের জন্যই তাই না।”

আদিলের রাগান্বিত কন্ঠ শুনে সে একটু চমকে গেল, তাই মুখে কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। এইবার আদিল একটু শান্ত হয়ে কোমল কন্ঠে বলে,

“তাই যেইদিন দেড়ি হবে ওভারটাইম কাজ করবে সেইদিন অফিসের একটা গাড়ি ঠিক করা থাকবে ওটায় করে বাড়ি যাবে কেমন।”

ফারিবা অবাক হলো আদিলের কোমলতায়, আদিল কে তার কাছে এখন একটা নারিকেলের মতো লাগছে। একটা নারিকেল বাহির দিয়ে যতটা শক্ত ভেতর থেকে ততটাই নরম হয়। আদিলকে ও তার কাছে তাই মনে হয়। ফারিবা বারবার ভাবে আদিল কি আসলেই এমন, নাকি পরিস্থিতি বুঝে সে তার প্রতিক্রিয়া দেখায়।

ফারিবা কথা না বাড়িয়ে সম্মতি জানালো। আদিল মনে মনে খুশি হল বহিঃপ্রকাশ করলো না। তবে তার চোখে একটা খুশির চমক দেখা গেলো। এরপর সে ফারিবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আজ থেকে তুমি সরাসরি আমার সাথে কাজ করবে, কাল তো বলেছিলাম শুধু ওই প্রজেক্টের জন্য আমার আন্ডারে কাজ করবে। কিন্তু তোমার কাজের ধরন ভালো খুব অল্প সময়ে সব শিখে নাও, আর আমারও এমন একজনকে প্রয়োজন ছিল, তাই ভাবলাম তোমাকেই হাইয়ার করে নেই।”

ফারিবা আদিলে এই কথা শুনে একটু থামে বলল,

“কিন্ত স্যার, আমি তো ইতিমধ্যে তন...”

আদিল ফারিবাকে থামিয়ে দিল পুরো কথা বলতে দিল না, কারণ তার জানা মেয়েটা এখন তন্ময় এর নাম নিবে, আর এইটা সে সহ্য করতে পারবে না। আদিল আগের মতোই কন্ঠে কোমলতা মিশিয়ে বলল,

“হ্যা আমি জানি তুমি তন্ময় সাহেবের আন্ডারে কাজ করছো, আমি যেহেতু এই কম্পানির সিইও আমার মনে হয় না তন্ময় সাহেবের কোন আপত্তি থাকবে।”

কিছুক্ষন নিরবতা টানলেন আদিল এরপর চোয়াল শক্ত করে বললেন,

“এখন থেকে অন্য কেউ তোমাকে কোনো কাজ দেবে না, তাই তুমি নিশ্চিন্তে আমার দেয়া কাজ করতে পারো।”

ফারিবার চোখ সামান্য উঠল, সে এক সেকেন্ড তাকাল আদিলের দিকে। তারপর আবার চোখ নামিয়ে নিল,

“জ্বি, স্যার।”

আদিল এবার ধীরে চেয়ারে বসল।

“এখন তুমি যেতে পারো।”

ফারিবা উঠে দাঁড়াল, দরজার দিকে এগোল।

দরজা খুলে বের হওয়ার আগে এক সেকেন্ড থামল। ফারিবা কে থামতে দেখে আদিল প্রশ্ন করলো,

“কিছু বলবে কি?”

ফারিবা ছোট করে বলল,

“না স্যার।”

এরপর সে বেরিয়ে গেল, দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ হল। ঘরের ভেতরে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ টা অনেক টা সময় পর্যন্ত প্রতিধ্বনি হল।

আদিল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“তোমার জন্য শুধু একজনই যথেষ্ট।”

তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত রেখা, এ যেনো এক প্রশান্তির রেখা।

ওদিকে...

ফারিবা বাইরে এসে নিজের ডেস্ক থেকে তন্ময় এর দেয়া ফাইটা হাতে নিয়ে তার ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার সাবরিনা শান্তার কাছে যায়। গিয়ে দেখে তন্ময় আর সাথে তাদের ডিপার্টমেন্টের আরো দুটো ছেলে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে। ফারিবাকে দেখে সবাই চুপ হয়ে ওর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

ফারিবাকে দেখে শান্তা জিজ্ঞেস করে,

“কি ব্যাপার ফারিবা তুমি হঠাৎ আমাদের কাছে, কিছু হয়েছে।”

ফারিবা কিছু না বলে ফাইলটা শান্তার দিকে এগিয়ে দিল, শান্ত পুনরায় প্রশ্ন করলে এটা কি। এরপর ফারিবা স্বাভাবিক ভাবে বলল,

“এই ফাইলটা গতকাল তন্ময় স্যার আমাকে দিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন আমি উনার আন্ডারে এই প্রজেক্ট টা নিয়ে কাজ করবো, এটা সেই ফাইল।”

ফারিবা সাধারণও একসাথে এতো কথা বলে না, আজ তাকে কথা বলতে দেখে ওখানে উপস্থিত সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শান্ত ফাইলটা হাতে নিয়ে বলে,

“তুমি কি কাজটা এত জলদি শেষ করে দিয়েছো।”

“জ্বি না ম্যাম, আমি আর এই প্রজেক্টে কাজ করতে পারবো না।”

ফারিবার মুখে এমন কথা শুনে শান্তা কিছু বলার আগে তন্ময় বরে উঠলো,

“কিন্তু কেনো”

মেয়েটা আবারও স্বাভাবিক ভাবেই বলল,

“আসলে মি. শেখ বলেছেন আজ থেকে আমি সরাসরি উনার আন্ডারে কাজ করবো, তাই অন্য কারো কাজ যেনো আমি না করি। দয়াকরে আমাকে কেউ ভুল বুঝবেন না, এটা তার ডিসিশন।”

মেয়েটার কথা শুনে কেউ আর কিছু বলল না, কারণ কারো এখানে বলার মতো কিছু নেই, যেখানে শেখ আদিল আয়মান কিছু বলে ফেলে, সেখানে অন্য আর কারো কিছু বলার থাকে না।

ফারিবা চলে যেতেই তার পিছু নিল তন্ময়, সে ফারিবাকে ডেকে বলে,

“এক প্রজেক্টে কাজ না করতে পারি, একসাথে লাঞ্চ তো করতেই পারেন তাই না।”

ফারিবা কি বলবে তার জানা নেই, তবে তন্ময় যেদিকের ইঙ্গিত করছে সেটা তো কোন ভাবেই তার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই তন্ময় কে প্রশ্রয় দাওয়ার থেকে ইগনোর করাই ভালো বলে সে মনে করে,

“না মানে কাজের চাপটা একটু... ”

“আচ্ছা আমি বুঝতে পেরেছি, ঠিক আছে অন্য কোনো দিন।”

তন্ময় নিজের কাজে ফিরে গেলো, আর ফারিবাও সবকিছু একপাশে রেখে তার কাজে মন দিল, তার সেই পুরোনো রুটিন, কাজের গতি, সব কিছু আগের মত শুরু করে দিল।

অফিসের দুপুরটা সবসময়ই একটু আলাদা। না খুব ব্যস্ত, না পুরোপুরি শান্ত। একটা মাঝামাঝি নীরবতা যেটা ভেতরে ভেতরে অদ্ভুতভাবে চাপ তৈরি করে।

ফারিবা নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছে। ফাইল, কীবোর্ড, নোট সব ঠিক আগের মতোই।

তার চারপাশে মানুষ আছে, কথা আছে, হাসি আছে তবুও সে যেন আলাদা একটা জগতে। তার অন্য কিছুতেই মন নেই, সে পুরো মন তার কাজকেই দিচ্ছে।

হঠাৎ একটা ছায়া এসে থামল তার সামনে।

“লাঞ্চে যাবে না ফারিবা আপু?”

একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে আসে তার কানে।

ফারিবা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে মেহজাবিন, তারই ডিপার্টমেন্টের কলিগ। মেয়েটা তার ছোট কিন্তু কাজের দিকে সিনিয়র। খুব মায়াবী এবং ভালো মনের একটা মেয়ে অফিসে যদি শান্তার পর কারো সাথে একটু বেশি আলাপ হয় তাহলে এই মেয়েটার সাথেই হয়। মেহজাবিন বয়সে তার থেকে ছেট হলে কি হবে সব দিকে যেনো তার নজর থাকে। সে ভেবে নেয় ফারিবা কাজের জন্য দুপুরে খাওয়ার কথা ভুলে যাবে, তাই সে এখানে মেয়েটাকে ডাকতে এসেছে।

ফারিবা ছোট করে বলল,

“না, কাজ আছে তুমি খেয়ে নাও।”

মেহজাবিন একটু থামল, তারপর হালকা হাসল।

“তুমি কি সবসময় এমনই ব্যস্ত থাকবে?”

“জ্বি।”

মেহজাবিন মুখ ফুলিয়ে ফারিবার ফাইল বন্ধ করে দিল, এরপর তার হাত টেনে বলে,

“সব সময় এমন করলে হবে না আপু, নিজেকে একটু সময় দাও, একটু নিজের যত্ন নাও, চল আমি কিছু শুনবো না তোমাকে খেতে যেতেই হবে।”

ফারিবা আর নিষেধ করতে পারেনি মেহজাবিনের সাথে চলে যায়। এইসব কিছুই আদিল নিজের কেবিন থেকে পর্যবেক্ষণ করে নিল। এরপর মুচকি হাসি দিয়ে কিছুক্ষন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা চিন্তা করলো।

......Flash Back......

ফারিবা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে, এদিকে লাঞ্চ ব্রেক টাইম শুরু হয়ে গেছে কিন্তু মেয়েটার কোনো খেয়াল নেই। সবাই নিজের মতো করে লাঞ্চ করতে ব্যাস্ত ফারিবার কথা যেনো কারো কখনো মনেই থাকে না। এইসব কিছু আদিল লক্ষ্য করলো এরপর ইন্টারকমে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট মেহজাবিনকে বলল সে যেন ফারিবা কে নিয়ে লাঞ্চ করতে যায়। আর মেহজাবিনও আদিলের কথা মত সেই কাজটাই করে

.....Flash Back End....

আদিল আগের মতোই স্থির তার মুখে হাসি ফুলে আছে। হঠাৎ তার একটা কথা মনে পরলো সে সাথে সাথে এইচ-আর কে ফোন করে বলে,

“ফারিবার কাজের রিপোর্ট পাঠাও।”

ইন্টারকমে উত্তর এল—

“জি স্যার এখনি পাঠাচ্ছি।”

কয়েক মিনিট পর ফাইল এলো।

সে খুলল না। শুধু উপরে লেখা নামটা দেখল,

“ফারিবা নূর ইসলাম।”

তার আঙুল হালকা করে নামের উপর রাখল।

ফাইলটা ওপেন করে দেখলো এক সেকেন্ড থেমে ফাইলটা বন্ধ করল।

“ফারিবাকে জানিয়ে দিবেন আজকে তার ওভারটাইম করতে হবে।”

শান্ত কণ্ঠে বলল, কিন্তু এর মানে খুব পরিষ্কার, আজকেও সে ফারিবাকে কাজের উসিলায় আটকে রাখবে।

ওদিকে...

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। অফিস ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে। মানুষ বেরিয়ে যাচ্ছে। ফারিবা এখনো কাজ করছে। তার পাশে এসে দাঁড়াল অফিস একজন স্টাফ, তাকে প্রশ্ন করল,

“আপনি এখনো যাননি?”

“এইটা শেষ করে যাবো।”

“আফিস আওয়ার তো শেষ রেখে দিন কাল এসে করবেন, গতকাল ও দেখলাম আপনি ওভারটাইম করলেন, আজও করবেন নাকি। আরে কাজকে এতটা পাত্তা দিবেন না ম্যাডাম, নয়তো কাজ আপনাকে পেয়ে বসবে।”

ফারিবা কিছু বলল না চুপ করে কাজ করল। সে আবার টাইপ করতে লাগল। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে। সবাই চলে গেছে।

অফিস প্রায় ফাঁকা। কিছুক্ষন পর ফারিবা ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল।

ঠিক তখন লিফটের সামনে গিয়ে থামল।

পাশ থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—

“আমি নামিয়ে দিই?”

ফারিবা তাকিয়ে দেখে তন্ময়, সে মাথা নাড়ল,

“না, ধন্যবাদ আমি যেতে পারবো।”

তন্ময় একটু থেমে রইল। তারপর বলল,

“অনেক রাত হয়ে গেছে, এই রাতে একা যাবেন না।”

এই লাইনটা বারবার প্রতিধ্বনি হল।

ফারিবা কিছু বলল না। শুধু লিফটের বোতাম চাপল।

লিফটের দরজা খুলে গেল।

আর ঠিক তখনই পিছন থেকে এইচ-আর বলল

“মিস. ফারিবা।”

ফারিবা পেছনে তাকাতেই তিনি বললেন,

“আপনি কালকের মিটিং এর ফাইল টা এখনই আপডেট করেন নি কেনো।”

ফারিবা একটু থেমে গেল, এরপর কপালে হাত চেপে বলে,

“আমি দুখিত স্যার, একদম ভুলে গিয়েছিলাম। এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি স্যার।”

“আচ্ছা তারাতারি করুন, মি. শেখ অপেক্ষা করছেন।”

তন্ময় ফারিবার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

সে বুঝতে পারল না পুরো বিষয় টা, সে ফারিবাকে জিজ্ঞেস করল,

“আমি কি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো, যদি আপনি চান।”

ফারিবা তার দিকে তাকালো কিছুক্ষন এরপর বলল,

“আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, আমার হয়তো দেরিও হতে পারে। আপনি চলে যান সমস্যা নেই।”

"কিন্তু আপনার কাজ শেষ হতে তো রাত হয়ে যাবে, এত রাত করে একা কিভাবে যাবেন।”

“সমস্যা নেই আদিল স্যার বলেছেন অফিসের গাড়ি পৌঁছে দিবে।”

“আর ইউ সিওর।”

ফারিবা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তন্ময় না চাওয়ার শর্তেও চলে গেলো। ফারিবা আবার ডেস্কে দিকে চলে গেল, এরপর সব ফাইল নিয়ে আদিল এর কেবিনে চলে গেলো, গিয়ে দেখে আদিল চেয়াবে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে চেয়ার ঘোরাচ্ছে। ফারিবা আসতেই চোখ খুলে তাকায়। এরপর ফারিবাকে বসতে বলে, আর ফারিবা সব কাজ গুলো দেখাতে থাকে।

আদিল ফারিবার দিকে তাকিয়ে আছে তার ঠোঁটের কোনো বাঁকা হাসি, আর মনে মনে বলে,

“আজও তোমাকে না আটকালে তুমি ঠিকই তন্ময় এর সাথে চলে যেতে।”

ফারিবা তার কাজ দেখাচ্ছে আর আদিল মনোযোগ দিয়ে সবটা দেখে নিচ্ছে। আর এদিকে যেনো অফিসের ভেতর একটা অদৃশ্য লাইন তৈরি হয়ে গেল।

যেটা এখন থেকে আর আগের মতো থাকবে না।

চলবে…

[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্প টা কেমন লাগলো সুন্দর মতামত দিবেন ধন্যাবাদ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন