#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_১৯
মেহজাবিন আদিলকে সব জানিয়ে সবার সঙ্গে তন্ময়ের বাড়ির দিকে রওনা দেয়। বাইরে থেকে সে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও, ভেতরে ভেতরে তন্ময়কে একবার দেখার ইচ্ছে তাকে অস্থির করে তুলছিল। কিন্তু সে তা সরাসরি প্রকাশ করতে পারছিল না।
এরপর মেহজাবিন তামান্না আবির সাবরিনা শান্তার সাথে, শান্তার গাড়িতে উঠে বসে, বাকি দুজন একসাথে যাবে বলে জানায়। তরা সবাই একসাথে গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার গাড়ি ছাড়ে।
মেহজাবিন জানালার পাশে বসে বাহিরের দৃশ্য দেখছে, বাহির থেকে আসা হাল্কা বাতাস তার চুল গুলো এলোমেলো করে দিচ্ছে। সে নিজের চোখের চশমা ঠিক করতে করতে কিছুক্ষন আগে ঘটে যাও অফিসের সেই দৃশ্য গুলো মনে করতে থাকে।
----------------
সাবরিনা শান্তা তার হাতের কাজগুলো শেষ করে আবিরকে উদ্দেশ্য বলল,
“আচ্ছা আবির আমাদের তন্ময়কে একবার দেখতে যাওয়া উচিত, কি বলো।”
তখন সাথে আরো কিছু মানুষ ছিল, কথাটা শুনে তাদের মধ্যে কিছু মানুষ রাজি হয় যেতে। এরপর শান্তা আর আবিরের সাথে তামান্না সহ আরো দুজন যাবে বলে ঠিক করে।
মেহজাবিন তখন তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে তাদের কথাগুলো শুনে ফেলে। এরপর কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
“আপনারা কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করছেন।”
তার কথা শুনে তামান্না বলে,
“আমরা সবাই তন্ময় স্যার এর বাড়িতে যাওয়ার প্ল্যান করছি। যতোই হোক উনাকে তো দেখতে যাওয়া উচিৎ তাই না।”
মেহজাবিন নিজের ভেতরের ইচ্ছে লুকিয়ে রেখে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
“হ্যাঁ, যান দেখে আসুন, না হরে অফিসে এসে বলবে কেউ তাকে দেখতে যায়নি।”
ঠিক তখনই পাশ থেকে আবির বলে ওঠে,
“আপনিও আমাদের সাথে চলুন, মেহজাবিন ম্যাডাম।”
প্রথমে একটু অস্বীকার করলেও পরে সে রাজি হয়ে যায়। যদিও তার চোখেমুখে ছিল লুকানো এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। তবে সে নিজেও একবার ভেবেছিল দেখতে যাবে। যদি বাড়াবাড়ি কিছু হয় তাই তার ইচ্ছে সে প্রকাশ করেনি।
--------------------
এতক্ষন গাড়িতে বসে এই সব কথাই ভাবছিল মেহজাবিন। নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। কারণ তার ইচ্ছে সে মুখ ফুটে বলার আগেই পুরোন হয়ে গেলো।
বেশকিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামে তন্ময়দের বাড়ির সামনে। গাড়ি থামতেই সবার ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
তন্ময়ের বাড়ির সামনের পরিবেশটা একটু শান্ত, চারপাশে গাছপালা আর ছোট্ট উঠোন মিলিয়ে ঘরটাকে আরও নিরিবিলি লাগছে।
ড্রাইভার দরজা খুলে দিতেই সবাই একে একে নেমে পড়ে। মেহজাবিন ধীরে ধীরে নেমে দাঁড়ায়, চোখ সামান্য তুলে বাড়িটার দিকে তাকায়। ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করলেও বাইরে সে আগের মতোই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে।
এরপর আবির এগিয়ে গিয়ে কলিং বেল বাজায় আর বাকিরা সবাই চারপাশ টা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। কিছুক্ষন পর তন্ময় এর মা এসে দরজা খুলে সবাইকে দেখে অবাক হয়ে যায়।
আবির তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্র মহিলা কে দেখে বুঝতে পারে উনি তন্ময় এর মা, সাথে সাথে সালাম দেয়,
“আস্সালামু-আলাইকুম আন্টি, তন্ময় সাহেব কি বাড়িতে আছেন?”
“ওয়ালাইকুমুস-সালাম হ্যা বাবা ও ভেতরে, কিন্তু তোমাদের তো চিনলাম না।”
ইতস্ত বোধ করে কথাটা বললেন তিনি। পাশ থেকে সাবরিনা শান্ত বললেন,
“আন্টি আমরা ওর অফিসের কলিগ, ওর এক্সি*ডেন্টের কথা শুনে দেখতে এলাম।”
কলিগ হয় শুনে তিনি দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভেতরে আসতে বললেন। সবাই এক এক করে ভেতরে আসলেন সবার শেষে মেহজাবিন প্রবেশ করে।
একবার ভদ্র মহিলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সালাম দিয়ে কেমন আছে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি মেহজাবিন এর দিকে অপলক তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষন এরপর সালামের উত্তর দিয়ে ভেতরে গিয়ে বসতে বললেন।
তিনি দরজা বন্ধ করে এসে সবাইকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে ভেতরে চলে যায় তন্ময় কে ডেকে দিতে। তন্ময় খবর পেরে বাহিরে এসে দেখে সবাই বসে আছে।
মুহূর্তের মধ্যেই তার নাকট শুরু হয়ে যায়। কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে ওঠে,
“কোনো জন্মে হয়তো পুণ্য করেছিলাম, যার ফলস্বরূপ এমন ভালো কলিগস পেয়েছি। যারা এই অসুস্থ ব্যক্তি টাকে দেখতে চলে এলো।”
তন্ময় এর ন্যাকা কথায় কেউ না হেসে পারে না। তখন সাবরিনা শান্ত গম্ভীর কন্ঠে বলে,
“কি ভাই তন্ময় তোমার অভিনয় কি শেষ হবে না।”
তন্ময় আবিরের পাশে বসে চোখ মুছতে মুছতে বলে,
“আপু ন্যাকামো নয়, আপনাদের দেখে আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে তা বলে বোঝাতে পারবো না।”
আবির তন্ময় এর কাঁধে হাত রেখে বলে,
“আপনি আর ভালো হবেন না, আমার তো মনে হচ্ছে মাথায় চোট পেয়ে, আরো মাথাটা গেছে আপনার।”
“কি যে বলেন আবির সাহেব, মাথা কোথাও যায়নি সে জায়গা মতোই আছে, শুধু আপনাদের দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে গেছি।”
তামান্না পাশ থেকে হাসি মুখে বলে,
“তন্ময় স্যার আপনি আবেগপ্রবণ হয়েই যেভাবে আবল তাবল বকছেন, খুশিতে আত্মহারা হলে যে কি করতেন, আল্লাহ ভালো জানে।”
মুহূর্তের মধ্যেই তন্ময়দের বাড়ির ড্রয়িং রুম একটা কমেডি শো তে পরিনত হয়ে গেলো। সবাই কথা বলছে হাসছে। আবার তন্ময় এর কথা শুনে হাসছে, আবির আর তন্ময় এর খুনসুটি দেখছে। পরিবেশটা সুন্দর উৎসব মুখর হয়ে ওঠে।
এইসব কিছু মেহজাবিন এক কোনায় বসে দেখছে। কিন্তু একটা কথাও সে বলেনি। সে মনে মনে একটু অভিমান করে আছে, তন্ময় সবার সাথে এক এক করে কথা বলল, কোথায় একবারও তো মেহজাবিন কে কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করলো না।
কিছক্ষন পর তন্ময় খেয়াল করলো ফারিবা নেই, সে প্রশ্ন করলো,
“মিস. ফারিবা কোথায় উনি আসেনি।”
সাথে যে আরো দু'জন ছিল তাদের মধ্যে একজন ছেলে বলেন,
“মিস. ফারিবার হাতে আরো কিছু কাজ ছিল তাই সে আসতে পারেনি।”
তন্ময় চিন্তিত মুখ নিয়ে বলে,
“আজকেও ওভার টাইম করবেন তিনি।”
তামান্না শান্ত গলায় বলে,
“আসলে মিস. ফারিবার একটা জায়গায় একটু ভুল হয়েছিল তার জন্য রিপোর্ট টা ভুল আসে আদিল স্যার আজকে মিটি....”
তামান্নার পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে, তন্ময় চোয়াল শক্ত করে বলে,
“এই আদিল স্যারের সমস্যা টা কি সে বস বলে যাকে ইচ্ছে তাকে দিয়ে খাটাবে, আর যখন খুশি তখন ওভার টাইম করাবে।”
মেহজাবিন এতক্ষন নিরব দর্শক হয়ে থাকলেও এখন তার ভাইকে নিয়ে এমন কটু কথা সে শুনতে পারছে না, অনেকটা রাগ অভিমান নিয়ে একটু জোরে বলে ফেলে,
“পুরো কথা না শুনে মানুষ কে দোষ দাওয়ার অভ্যেস আপনার কখনো যাবে না, তাই তো। না জেনে যে আপনি আদিল স্যারের ব্যাপার যা নয় তা বলছেন এটা একদম ঠিক নয়।”
আবির মেহজাবিন কে থামতে বলে কিন্তু মেহজাবিন শান্ত হতে পারে না সে পুনরায় বলে,
“আমি কেনো থামবো বলুন, আমি তো ভুল কিছু বলিনি, উনি সবসময় স্যার কে নিয়ে যা নয় তা বলে, আমরা সবসময় হেসে উড়িয়ে দেই। তবে প্রতিবার তো আর এক কাজ করা যায় না। এন্ড ইওর কাইন্ড ইনফরমেশন মি. তন্ময় ফারিবা আপু আজ নিজ থেকে ওভার টাইম করছে কেউ তাকে করার জন্য ফোর্স করেনি।”
কথাগুলো খুব রাগ নিয়ে বলল মেহজাবিন, সবাই চুপ হয়ে গেলো। সবার মুখের হাসি টা হুট করে গায়েব হয়ে গেলো। উৎসব মুখরিত পরিবেশ নিমেষে কেমন কালো ছায়াতে ঢাকা পরে গেলো। তারপরও তন্ময় মেহজাবিন কে কিছু বলল না।
মেহজাবিন মনে মনে কষ্ট পেলো যেই মানুষটাকে দেখার জন্য তার মনে ছুটে যাচ্ছিল সেই মানুষ টা একবারও তাকে লক্ষ্য করলো না। একবারও কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তার মনে অভিমানের ছায়া ভর করতে লাগলো।
মেহজাবিন নিজের কষ্ট লুকিয়ে চোখের চশমা ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। তাকে এভাবে উঠে যেতে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকায়। সাবরিনা শান্তা জিজ্ঞেস করে,
“কি হলো মেহু তুমি উঠছো কেনো।”
মেহজাবিন অন্য পাশে ঘুরে বলে,
“অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে আমার হোস্টেলের গেট বন্ধ হয়ে যাবে।”
তামান্না ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে,
“এখনো অনেক সময় আছে, আর বন্ধ হয়ে গেলে তুমি আমার সাথে আমার বাড়ি গিয়ে থেকো।”
মেহজাবিন মুখ টা মলিন করে বলে,
“না তামান্না আপু আমি কোথাও গিয়ে থাকলে ভাই রাগ করবে। আমি চাই না আমার জন্য ভাই রাগ করুক বা কষ্ট পাক।”
পরিবেটা অনেক গম্ভীর হয়ে ওঠে, নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাবরিনা শান্তা বলে,
“মেহু তুমি একা গেলে স্যার আমার সাথে রাগ করবে আমি তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আসবো তুমি চিন্তা করো না।”
মেহজাবিন আর কিছু বলল না কিন্তু তার থাকতেও ইচ্ছে করছে না। তার কষ্ট হচ্ছে এতো কিছুর পরও তন্ময় কিছু বলল না। যেই তন্ময় সারা দিন তার পেছনে লেগেই থাকে, উল্টা পাল্টা নামে ডেকে রাগিয়ে দেয় সে আজ কিছু বলছে না।
মেহজাবিন পরে খেয়াল করে তন্ময় ফারিবার কথা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, হয়তো ফারিবা আসেনি বলে তার মন খারাপ। সে মনে মনে হাসলো। সে কতো বোকা যার কছে তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই সে কিনা এমন মানুষের থেকে অনুভূতির আশা করে।
মেহজাবিন এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এরমধ্যে তন্ময় এর মা সবার জন্য চা নাস্তা নিয়ে আসে দেখে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। সে মেহজাবিন কে বসতে বললে মেয়টা জানায় তার দেরির কথা আর হোস্টেলের গেট বন্ধ হওয়ার কথা।
তন্ময় এর মা মেহজাবিন এর সামনে গিয়ে মাথায় হাত রেখে বলে,
“সমস্যা নেই তুমি দরকার হলে আমার কাছে রাত টা থেকো মা। তোমাকে আমার অনেক ভালো লেগেছে। আমরা না হয় সারারাত গল্প করে কাটিয়ে দিব।”
অনেক বছরপর মা-এর মতো কারো কাছে এমন আদর পেয়ে মেহজাবিন নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। তন্ময় এর মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে, সেও মেয়েটাকে পরম যত্ন মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
পাশ থেকে আবির তন্ময় এর কানে ফিস ফিস করে বলে,
“তন্ময় সাহেব আদিল স্যার যদি জানে মেহজাবিন ম্যাডাম আপনর জন্য কেঁদেছে তাহলে আপনার চাকরি নট।”
তন্ময় আবির এর কথায় শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“আমি কি করলাম ভাই।”
কিন্তু তন্ময় এর চোখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ দেখা যাচ্ছ। সে মেহজাবিন এর দিকে অনুসোচনার দৃষ্টিতে তাকায়।
মেহজাবিন এবার চোখের পানি মুখে সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে এমন ব্যবহারের জন্য। এরপর তন্ময়ের মা-এর কথা মতো ফ্রেশ হওয়ার জন্য ভেতরে চলে যায়। একটু পর তন্ময়ও মেহজাবিন এর পেছনে যায়।
ওয়াশরুমের সামনে তাওয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মেহজাবিন বের হওয়ার সাথে সাথে, তাওয়াল এগিয়ে দেয়। মেহজাবিন তাওয়াল নেয়ার সময় তন্ময় এর সাথে চোখাচোখি হয়। সাথে সাথে সে অন্যদিকে ঘুরে তাওয়াল নিয়ে মুখ মুছে। তখন হঠাৎ করে তন্ময় বলে,
“কাল নাগিনী কি আমার কথায় অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছে।”
মেহজাবিন কিছু বলে না চুপ করে থাকে। তন্ময় একবার তাকিয়ে দেখে আবার বলে,
“কাল নাগিনী কি এমনি সরি একসেপ্ট করবে নাকি কনে ধরে উঠা বসা করলে সে মানবে। তবে সে যদি চায় আমি ফ্রিতে তাকে এক সপ্তাহ, না না এক মাস বিনেদোন দিব। আর সে চাইলে অন্য কিছুও করাতে পারে।”
মেহজাবিন তন্ময় এর কথা শুনে না হেসে থাকতে পারে না তবে সে মুখ ঢেকে হাসি আটকে রাখে। এরপর গম্ভীর কন্ঠে বলে,
“যা বলবো তাই করবে।”
“হ্যা যা বলবেন তাই করবো।”
“এক মাস বিনোদন দিবে।”
“একমাস কেনো লাগলে দুইমাস বিনোদন দিব।”
“কান ধরে সরি বলবে।”
“হ্যা কান ধরেই সরি বলবো।”
“যেই কথা বলবো সেই কথাই শুনবে।”
“হ্যা সব কথা শুনবো।”
“দুষ্টামি না করে সব কাজ ঠিক মতো করবে।”
“জ্বি ম্যাডাম সব কাজ করবো।”
“আচ্ছা সে কি মানে সে যে একটা পেঁচামুখো, পঁচা ডিম।”
“হ্যা অবশ্যই মানি আমি যে পেঁচামুখো পঁচা ডি......”
অনবরত মেহজাবিন এর কথার সাথে সম্মতি দিতে দিতে শেষের কথা গুলো বলে দেয়, এরপর যখন খেয়াল করে তখন থেমে গিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখে সে হাসছে। তন্ময় কিছুক্ষন একভাবে তাকিয়ে থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“সবসময় এইভাবেই হাসবেন ম্যাডাম, হাসলেই আপনাকে সুন্দর লাগে। আর কান্না করলে একদম কাল নাগিনী প্রোম্যাক্স লাগে।”
মেহজাবিন তন্ময় এর কথায় রেগে বলে,
“তন্ময় সাহেব আপনি ভালো হবেনা তাই না।”
তন্ময় হেসে দেয় এরপর স্বাভাবিক গলায় বলে,
“সরি মিস. মেহজাবিন আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে চাইনি আপনি আমার কথায় কষ্ট পেলে মাফ করবেন। আপনার সাথে সব সময় মজা করি আজকেও তাই করার জন্য আপনাকে প্রথমে ইগনোর করার ভান করেছি, এই জন্যও যদি কষ্ট পান তার জন্য ও আমি দুঃখিত।”
মেহজাবিন ভাব নিয়ে বলে,
“আপনাকে কে বললো মশাই আমি সে জন্য দুঃখ পেয়েছি, আপনি আমার আদিল ভাইকে নিয়ে বলেছেন বলেই আমি এমন রিয়েক্ট করেছি। আর আপনার মা এত যত্ন করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল যে আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি।”
তন্ময় কিছুক্ষন আবারও মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে আর কিছু বলে না।
এরপর তারা আবারও সবাই আড্ডা জমায় বেশ কিছুক্ষন গল্প গুজব করে বিদায় নেয়, তন্ময় এর মা কাওকেই ছাড়তে চাইছিলেন না। সবাইকে রাতে খাওয়ার কথা বলে কিন্তু কেউ রাজি হয় না। অন্য কোনোদিন আসবে বলে বিদায় নিয়ে চলে যায়।
তন্ময় তাদের বাহির পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। সবাই একে একে গাড়িতে উঠে বসে। যাওয়ার আগে সাবরিনা শান্তা হেসে বলে,
“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে অফিসে ফিরো ভাই, না হলে অফিসের শান্তি কে নষ্ট করবে।”
তন্ময় বুকের উপর হাত রেখে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“দেখেছেন! আমি এত অসুস্থ, তারপরও এরা আমাকে মেন্টালি টর্চার করছে।”
আবির হেসে বলে,
“আপনি সুস্থ থাকলেও একই রকম, অসুস্থ থাকলেও একই রকম।”
সবাই আবারও হেসে ওঠে।
তন্ময় এবার ধীরে মেহজাবিনের সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলল,
“সাবধানে যাবেন আর পৌঁছে আমাকে জানাবেন।”
খুব ছোট্ট দুটো বাক্য।
কিন্তু কথাগুলো শুনে মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
সে কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে গাড়িতে উঠে বসল।
পুরো রাস্তা জুড়ে তার কানে যেন শুধু তন্ময়ের বলা কথাগুলোই বারবার ভেসে আসছিল।
অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।
হয়তো তন্ময় কথাগুলো শুধু দায়িত্ববোধ থেকেই বলেছিল অথবা হয়তো অনুশোচনা থেকে।
কিন্তু মেহজাবিনের মন সেই সাধারণ কথার মাঝেও অন্যরকম একটা অনুভূতি খুঁজে নিচ্ছিল।
---
এদিকে....
আদিল ফারিবাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের ডুপ্লেক্স বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
আজ তার মন আগের তুলনায় অনেকটাই ফুরফুরে। এক হাতে গাড়ির চাবি ঘুরাতে ঘুরাতে অন্য হাত পকেটে রেখে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকল সে।
রহিমা বেগম ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ছিলেন আদিল এর অপেক্ষায় । ছেলে এত রাতে ফিরলেও আজ তার মুখে ক্লান্তির বদলে অদ্ভুত প্রশান্তি দেখে তিনি মুচকি হেসে ফেললেন।
আদিল কোট খুলে সোফার পাশে রাখতেই তিনি বললেন,
“আজকে আমার ছেলের মুড বেশ ভালো মনে হচ্ছে।”
আদিল ভ্রু তুলে তাকাল।
“কই না তো, আমি স্বাভাবিকই তো আছি।”
রহিমা বেগম হালকা হেসে বললেন,
“তোমাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আদিল। তোমার মুখ দেখলেই বুঝি কখন মন খারাপ আর কখন মন ভালো থাকে।”
আদিল কিছু না বলে সামনে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিল। কিন্তু ঠোঁটের কোণে চাপা হাসিটা ঠিকই রয়ে গেল।
রহিমা বেগম এবার একটু আগ্রহ নিয়ে বললেন,
“তা বলো দেখি, আজকে এমন কি ভালো জিনিস হল যার কারনে আমার আদিল বাবা এতটা খুশি?”
আদিল পানি খেতে গিয়েই হালকা কেশে উঠল।
“মামোনি।”
তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে রহিমা বেগম মিটিমিটি হেসে বললেন,
“আচ্ছা আচ্ছা কিছু বলতে হবে না। তবে অনেকদিন পর তোমাকে এত হালকা লাগছে দেখে খুব ভালো লাগলো।”
আদিল এবার শান্ত হয়ে সোফায় হেলান দিল।
তার চোখের সামনে হঠাৎ করেই ভেসে উঠল অন্ধকার অফিস রুমে বসে থাকা ফারিবার মুখটা।
ভয়ার্ত চোখ,কাঁপতে থাকা হাত, আর টর্চের আলোয় স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকা সেই চাহনি।
অদ্ভুতভাবে মেয়েটার প্রতিটা ছোট ছোট অভিব্যক্তি তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে।
রহিমা বেগম কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে বললেন,
“একটা কথা বলি আদিল?”
“হুম?”
“নিজেকে সবসময় এতটা একা করে রেখো না বাবা। জীবনে এমন একজন মানুষ দরকার, যার কাছে মানুষ নিজের ক্লান্তিটুকু নির্ভয়ে রেখে আসতে পারে।”
আদিল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“সব মানুষ কি আর সেই সুযোগ পায় মামোনি?”
রহিমা বেগম শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কেন জানি আজ তার মনে হচ্ছে, ছেলের জীবনে হয়তো সত্যিই কেউ আসতে শুরু করেছে।
আর আদিল, সে নিজের অজান্তেই ধীরে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে এখনো ফারিবার নাম্বারটা ভেসে আছে। কয়েকবার ভেবেছে কল করে একটু খোঁজ নিবে কিন্তু দেয় নি।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি বুঝতেও পারছো না, ধীরে ধীরে কতটা জায়গা তৈরী করে ফেলছো আমার জীবনে, মিস. ফারিবা।”
তার চোখের গভীরে তখন এক অদ্ভুত অনুভূতির ছায়া।
যার অর্থ এখনো কেউ জানে না।
চলবে…
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্প টা কেমন লাগলো সুন্দর মতামত দিবেন]