#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_২০
ফারিবা নিজের বিছানায় চুপচাপ শুয়ে আছে। রাত অনেক গভীর হয়ে গেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ। পুরো এলাকা যেন ঘুমের চাদরে ঢেকে আছে। শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে থাকা ল্যাম্পপোস্টের হালকা নিয়ন আলো এসে তার ঘরের একপাশে পড়ে আছে।
ফারিবা ডানদিকে কাত হয়ে শুয়ে ছিল। হঠাৎ যেন কিছু একটা মনে পড়তেই পাশে রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিল। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে কল লিস্ট চেক করল। তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“ভালোই হয়েছে, সেই আননোন নাম্বার থেকে কল আসা বন্ধ হয়েছে। নাম্বারটা থেকে কল আসলেই কেমন যেন আত্মা কেঁপে উঠত।”
কথাগুলো বলেই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ফোনটা আবার পাশে রেখে চোখ বন্ধ করল ফারিবা। ঘুমানোর চেষ্টা করলেও ঘুম যেন তার চোখে ধরা দিচ্ছে না। গত কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমই হচ্ছে না তার। মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খায়।
কখনো ফারদিনের স্মৃতি, কখনো অফিসের চাপ, আবার কখনো আদিলের বলা কথাগুলো অদ্ভুতভাবে তার মনে বারবার ফিরে আসে।
বিশেষ করে আজ গাড়ির ভেতরে বলা প্রতিটা কথা আবারও কানে ভেসে উঠতেই, ফারিবার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে ফেলল।
নিজেকেই নিজে বোঝানোর চেষ্টা করল,
“আমি এসব কি ভাবছি, এইসব নিয়ে ভাবা বন্ধ কর ফারিবা।”
কিন্তু তারপরও কেন জানি মানুষটার শান্ত চোখ দুটো বারবার তার মনে পড়ে যাচ্ছে।
ফারিবা ধীরে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। দূরে কোথাও রাতজাগা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে।
আর সেই নীরব রাতের মাঝেই ধীরে ধীরে তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। ফারিবা যেনো আসতে অরে গভীর ঘুমের জগতে হারিয়ে যেতে লাগলো।
এদিকে....
আদিল নিজের শোবার ঘরের বড় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে গভীর রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আজকের আকাশটা কেমন যেন অদ্ভুত নিস্তব্ধ। কোনো তারা দেখা যাচ্ছে না, এমনকি চাঁদটাও মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে।
তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, অন্য হাতে ফোন। মাঝে মাঝে ফোনের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরাচ্ছে অন্ধকার আকাশের দিকে।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর তার ঠোঁটে সেই চিরচেনা অস্পষ্ট হাসিটা ফুটে উঠল। খুব আস্তে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল সে। তারপর গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
সিগারেটের শেষ অংশটুকু অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে রেখে ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল আদিল। আজ অনেকদিন পর তার মনটা অদ্ভুত শান্ত।
বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই চোখ দুটো ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চিন্তে ঘুমের জগতে হারিয়ে গেল সে।
অন্যদিকে....
আজ যেন আরও একজন মানুষের মন জুড়ে প্রশান্তির শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে।
তন্ময়ের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর থেকেই মেহজাবিনের মুখে লুকানো এক অদ্ভুত হাসি লেগে আছে। যেন খুশিতে তার মাটিতে পা-ই পড়ছে না।
নিজের বিছানায় বসে বারবার আজকের কথাগুলোই মনে করছিল সে।
তন্ময়ের বলা ছোট ছোট কথাগুলো, তার দুষ্টুমি, তার সরি বলা, তার খেয়াল রাখা, ছোট বিষয়ে যত্ন নেয়া এই সাধারণ জিনিস কেন জানি বারবার তার মনে বাসা বাধছিল।
মেহজাবিন নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলল। তার ভেতরে আজ অদ্ভুত এক ব্যাকুলতা কাজ করছে। বুকের ভেতর কেমন অচেনা অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। কিন্তু এই অনুভূতির নাম ঠিক কি, সেটা সে নিজেও জানে না।
তবে একটা বিষয় সে বুঝতে পারছে, তন্ময় তাকে ইগনোর করেনি। সবটাই ছিল তাকে রাগানোর জন্য। আর এই ভাবনাটাই অদ্ভুতভাবে তার মনটা ভালো করে দিচ্ছে।
মেহজাবিন ধীরে বালিশটা জড়িয়ে শুয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোণে এখনো ছোট্ট হাসি লেগে আছে।
হয়তো অজান্তেই তন্ময় নামের মানুষটা ধীরে ধীরে তার মনের খুব বিশেষ একটা জায়গা দখল করে নিতে শুরু করেছে।
.............................
সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে আদিলের পুরো ঘরজুড়ে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলো সরাসরি এসে পড়ছে তার মুখে। চোখে আলো লাগতেই সে ভ্রু কুঁচকে অন্য পাশে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ অনুভব করল কেউ যেন ধীরে ধীরে জানালার পর্দাটা টেনে দিচ্ছে। সাথে সাথে ঘরের ভেতরের তীব্র আলোটা অনেকটাই কমে যায়।
এরপর খুব পরিচিত কোমল একটা কণ্ঠ ভেসে এলো তার কান জুরে,
“এইভাবে ঘুমালে হবে? অফিসে যাবেন না, আজ না ইম্পরট্যান্ট মিটিং আছে?”
কন্ঠটা শুনে আদিল ধীরে ধীরে চোখ খুলল। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখতে পেল ফারিবাকে, সে তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
আদিল অবাক হয়ে যায়, একবার চোখ বন্ধ করে আবার খুলে দেখে সত্যি ফারিবা। তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
সকালের আলোয় মেয়েটার মুখটা অদ্ভুত শান্ত লাগছে। সুন্দর একটা শাড়ি পরা মায়াবি মুখ, কোমর ছড়ানো লম্বা চুল। কি স্নিগ্ধ লাগছে তার ফারিবাকে।
ফারিবা ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,
“উঠুন, অনেক বেলা হয়ে গেছে, আর কতো ঘুমাবেন।”
আদিল কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন মুহূর্তটা শেষ না হয়ে যায়, মুহূর্ত টা এখানেই থমকে যাক। তার ফারিবা সারাটা জীবন তার কাছেই রয়ে যাক।
তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“আর একটু থাকো আমার কাছে, কোথাও যেও না।”
ফারিবা কিছু বলার আগেই হঠাৎ করেই আরেকটা গলা ভেসে এলো তার কানে,
“আর কত ঘুমাবে আদিল বাবা? অফিসে যাবে না?”
কণ্ঠটা শুনেই আদিলের চোখ পুরোপুরি খুলে গেল। চোখ ডলতে শুরু করলো। অবাক হয়ে সে দ্রুত উঠে বসে সামনে তাকাল।
ফারিবার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন রহিমা বেগম। হাতে পর্দার একপাশ ধরা। মুখে মৃদু হাসি। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল আদিল। বুঝার চেষ্টা করলো কি হচ্ছে। তারপর চোখ নামিয়ে নিজের কপালে হাত বুলিয়ে হালকা হাসল।
রহিমা বেগম ভ্রু তুলে বললেন,
“কি ব্যাপার? আজকাল ঘুমের মধ্যেও হাসাহাসি হচ্ছে দেখছি।”
আদিল মাথা নিচু করেই বলল,
“কিছু না মামনি, খুব সুন্দর একটা স্বপ্ন দেখছিলাম হয়তো।”
এরপর রহিমা বেগম আদিল এর কাছে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আর ফ্রেশ হয়ে, রেডি হয়ে নাস্তা করতে নিচে যেতে বলে সে চলে যায়।
আদিল এখনো একই ভাবে বসে আছে তার বিছানায়। বারাবর মুচকি হাসছে। তার ঠোটের কোনা থেকে হাসি জেনো নড়ছেই না।
কিছুক্ষন জানালার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বিছানা ছেড়ে উঠে যায়। তার ঘরের একপাশে বড় আলমারি, সে আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে থাকে।
বারবার দেখছে আজ কি পরবে কিন্তু তার আলমারির অর্ধেকাংশ জুরে শুধু মাত্র কালো কাপড় দিয়ে ভরা।
কালো শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, টাউজার, আর কালো কোট। সে তবুও ভাবে কি পরা যায়। কিছুক্ষন ভেবে আজ সে আকাশী রঙের শার্ট টা বেছে নিল।
যেন আজ তার মনটাও আকাশের মতোই নির্মল ও স্বচ্ছ। জীবনের সমস্ত কষ্টের কালো ছায়াগুলোও যেন এই আকাশি রঙের মাঝে মিলিয়ে গিয়ে জানান দিচ্ছে অবশেষে সেই অন্ধকার সময় তার জীবন থেকে বিদায় নিতে শুরু করেছে।
কাপড় গুছিয়ে বিছানায় রেখে আদিল শাওয়ার নিতে চলে যায়। শাওয়ার শেষ করে বের হয়ে সে তোয়ালে হাতে চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করে নেয়।
আকাশী রঙের শার্ট, তার সাথে ধূসর রঙের প্যান্ট আর কোট, সব মিলিয়ে আজ আদিলকে একটু অন্যরকম লাগছে। শীতল, শান্ত আর স্নিগ্ধ একটা আবহ যেন তাকে ঘিরে আছে।
বাঁ হাতে রুপালি ঘড়িটা পরে নেয় সে। এরপর দামী পারফিউমের সুবাসে পুরো ঘরটা ভরে ওঠে। আবারও একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা ঠিক করে নেয়, যেন সবকিছু নিখুঁত হয়।
তারপর নিচে নেমে ডাইনিং টেবিলে বসে মামনির সাথে গল্প করতে করতে সকালের নাস্তা শেষ করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়।
বাইরে এসে নিজের গাড়িতে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, এরপর কিছু একটা ভাবে। হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে ওঠে। এরপর ধীরে ধীরে গুনগুন করতে করতে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
এদিকে…..
সকালের আলো আজ ঠিক আগের দিনের মতো উজ্জ্বল না। জানালার কাঁচ ভেদ করে যে আলোটা ঘরে ঢুকছে, তাতে কোনো উষ্ণতা নেই, শুধু আছে একরকম মলিনতা। যেন আকাশটাও আজ মন খারাপ।
বিছানার এক কোণে বসে আছে ফারিবা। চুল এলোমেলো, চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট তার ভেতরের অস্থিরতা। যেটা বাহির থেকে দেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
গত রাতের পর থেকে তার ভেতরে যেন কিছু একটা আলাদ অনুভূতি হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুভূতির কারণ তার জানা নেই।
বারবার সেই অন্ধকার অফিস রুমটা মনে পড়ছে, আর তার সাথে ভেসে উঠছে একজন মানুষের মুখ, আর সে মুখটা আদিল এর।
তার শান্ত চোখ, সংযত কণ্ঠ, আর সেই অদ্ভুতভাবে স্থির উপস্থিতি। ফারিবা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কেন বারবার শুধু উনাকে নিয়ে ভাবছি।”
নিজের প্রশ্নেতেই যেনো নিজে বিরক্ত হয়ে গেল। মাথা দু’হাতে চেপে ধরল, যেন চিন্তাগুলোকে থামিয়ে দিতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঠিক তখনই হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল ফারদিনের বলা সেই কথাটা,
{“জানো কন্যা, আমাদের মন সবসময় তার দিকেই ঝুঁকে পড়ে, যে অজান্তেই সেখানে জায়গা করে নেয়…”}
কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল ফারিবার।
“না, এটা হতে পারে না।”
নিজের মনকে বলল।
সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
তার ভেতরের কণ্ঠ যেন কঠোরভাবে বলে উঠল,
“ফারদিন ছাড়া আমার জীবনে আর কারো কোনো অস্তিত্ব থাকতে পারে না। আমার মনে শুধুই ফারদিন এর বসবাস আছে আর সারাজীবন থাকবে। ওর জায়গা কাওকেই দাওয়া সম্ভব না।”
ফারদিন ছিল তার স্মৃতি, তার ভরসা, তার একমাত্র আশ্রয়। সেই জায়গা যেনো অন্য কারও জন্য ফাঁকা নয়, ছিল না, আর হয়তো কনো দিন হবেও না।
সে নিজেকে শক্ত করে বোঝানোর চেষ্টা করল। হয়তো গত রাতের ঘটনাটা শুধু একটা দুর্বল মুহূর্ত তৈরি করেছে।
অন্ধকার, ভয়, আর আদিল এর চাপা আতঙ্ক,সব মিলিয়ে সে হয়তো এক অচেনা মায়ার মধ্যে আটকে গেছে।
আর সেই মায়ার কেন্দ্র ছিল আদিল। শুধু সহানুভূতি আর শুধুই দয়া এর বাইরে কিছু না। এটাই সত্যি হতে হবে।
এর বাইরে কিছু ভাবা মানে নিজেরই সাথে অন্যায় করা, ফারদিন এর সাথে অন্যায় করা।
ফারিবা ধীরে চোখ বন্ধ করল। একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। যেন নিজের ভেতরের এই অচেনা ঢেউটাকে শান্ত করতে চাইছে।
কিন্তু যতই সে নিজেকে বোঝাচ্ছে, ততই কোথাও একটা অদৃশ্য টান আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যেন মন তার যুক্তিকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে।
সে ফিসফিস করে বলল,
“না এটা কিছু না শুধু মায়া আর শুধুই সহানুভূতি এর বেশি কিছু না, তুই আর কিছু ভাবিস না ফারিবা।”
কিন্তু জানালার বাইরে মেঘলা আকাশটা আজ কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ফারিবা এর দিকে।
ফারিবা ধীরে বিছানা ছেড়ে অফিসে যাওয়ার জন্য রেডি হতে চলে যায়। আলমারি খুলে দাঁড়িয়ে ভাবে আজ মিটিং আছে আর তার প্রেজেন্টেশন দিতে হবে তাই একটু অন্য রঙের বোরকা পরলে হয়তো ভালো হবে।
ফারিবা কিছু একটা ভেবে, আশেপাশে ফিরে ফোনটা খুঁজে, ফোনটা হাতে নিয়ে একজন কে কল করে। রিং হতেই ওপাশ থেকে রিসিভ করে,
“হ্যালো মেহজাবিন, কেমন আছে।”
“এইতো আপু ভালো তুমি।”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, মেহজাবিন একটা কথা ছিল।”
“কি কথা বলো না আপু।”
“আচ্ছা আজকে তো মিটিং আছে, ভবছি কালো বোরকা ছাড়া কি রঙ পরবো।”
ফারিবার কথা শুনে মেহজাবিন কিছুক্ষন চুপ করে ভাবে এরপর বলে,
“হালকা রঙের কিছু পরো আপু।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি রেডি হয়ে গেছো।”
“হুম আপু প্রায় শেষ কিছুক্ষনের মধ্যেই বেড়িয়ে যাব।”
“আচ্ছা তাহলে ভালো থাকো অফিসে দেখা হচ্ছে।”
মেহজাবিন সম্মতি জানিয়ে ফোন রেখে দেয়। ফোন রেখে ফারিবা আবারও আলমারির দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে কোনটা পরা যায়। বেশ কিছুক্ষন ভাবার পর ধূসর রঙের বোরকা টা হাতে নিয়ে আলমারি বন্ধ করে দেয়।
এরপর বোরকা টা নিয়ে খাটে গুছিয়ে রেখে সে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে তৈরি হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, নিজেকেই নিজে বলে,
“সাহস রাখ নিজের উপর, তুই পারবি ফারিবা, তুই পারবি।”
এরপর নাস্তা করে সবার থেকে বিদায় নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যায়।
----------------------------
সকালটা যেন ধীরে ধীরে অফিসের ওপর নেমে আসা এক ধরনের চাপা উত্তেজনা নিয়ে হাজির হলো।
আজকের দিনটা সাধারণ কোনো দিন নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং, যেটা পুরো প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে।
অফিসের করিডোরে আগের চেয়ে বেশি ব্যস্ততা, সবার হাতে শেষ মুহূর্তের ফাইল চেক, প্রিন্ট আউট, আর ল্যাপটপ নিয়ে ছোটাছুটি।
মিটিং রুমের বড় কাঁচের দরজার ওপারে সাজানো টেবিল, প্রজেক্টরের স্ক্রিন, আর আন্তর্জাতিক অতিথিদের জন্য রেডি করা স্লাইড সবকিছু নিখুঁত করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে ফারিবা তার ডেস্কে বসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত রাতের অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবুও আজকে তাকে পারফর্ম করতেই হবে।
তার পাশে এসে দাঁড়াল মেহজাবিন। হাতে ফাইল, মুখে স্বাভাবিক কিন্তু চোখে একটু চাপা টেনশন।
“ফারিবা আপু, ফাইনাল চেক করেছো, সব ঠিকঠাক আছে তো?”
ফারিবা মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ, কিন্তু কালকের ডাটা ক্রস চেক করছি আবার। কাল অবশ্য আদিল স্যার একবার চেক করেছিল, কিন্তু তবুও ভয় হচ্ছে, তাই বারবার চেক করছি।”
মেহজাবিন হালকা নিশ্বাস ফেলল,
“আজকে কোনো ভুল করা যাবে না। ইন্টারন্যাশনাল ক্লায়েন্ট এরা আপু। একটা মিসটেক মানে পুরো প্রজেক্টে প্রভাব পড়বে, আর এই প্রজেক্টের জন্য আদিল স্যার অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ স্যারের জন্য। আমারো খুব ভয় করছে আপু।”
ফারিবা চুপ করে রইল। তারপর আস্তে বলল,
“আমি চেষ্টা করছি যেনো কোনো ভুল না হয়। আর তুমি যদি এভাবে ভয় পাও তাহলে আমার কি হবে।”
মেহজাবিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নরম গলায় বলল,
“আমি জানি আপু তুমি পারবে। তুমি অনেক স্ট্রং আপু তাই আমার বিশ্বাস তুমি ঠিকই পারবে।”
এই ছোট একটা কথা, ফারিবার বুকের ভেতর অদ্ভুতভাবে সাহস এনে দিল। ঠিক তখনই করিডোরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সবাই একসাথে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। দেখতে পেলো আদিল সবার দিকে এগিয়ে আসছে।
আজ তাকে আগের চেয়ে আলাদা লাগছে। আকাশি রঙের শার্ট, ধূসর প্যান্ট, কোট, গম্ভীর কিন্তু শান্ত উপস্থিতি।
তার হাঁটার মধ্যেও একটা আত্মবিশ্বাস। সে সোজা এসে থামল সবার সামনে।
হঠাৎ করে মেহজাবিন লক্ষ্য করলো আদিল এর পোশাক আর ফারিবার পোশাকের রঙ এক, মেহজাবিন বারবার তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পরে কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসে।
আদিল সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আজকের দিন টা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমার আর আপনাদের সবার জন্য, তো মিটিংয়ের জন্য সবাই রেডি তো?”
সবাই একসাথে মাথা নাড়ল। আদিল একবার ফারিবার দিকে তাকাল। খুব ছোট্ট এক মুহূর্তের জন্য। তারপর অবাক হয়ে গেলো তাদের পোশাকের রঙ দেখে।
সে মনে মনে খুশি হল, কিন্তু প্রকাশ করলো না, কিছুক্ষন তাকিয়ে, তারপর আবার স্বাভাবিক গলায় মেহজাবিন আর ফারিবা কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আজ সবকিছু তোমাদের হাতে, তোমাদের প্রেজেন্টেশনের উপর নির্ভর করে, সো বেস্ট অফ লাক, বোথ অফ ইউ ।”
মেহজাবিন বলল,
“জি স্যার, আমরা রেডি।”
ঠিক তখনই করিডোরের অন্য পাশ থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ওহ হো, সবাই তো সিরিয়াস মোডে চলে গেছেন দেখছি।”
কথাটা শুনে সবাই পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখে তন্ময়। মাথায় হালকা ব্যান্ডেজ, হাতে ফাইল, আর মুখে সেই চিরচেনা নাটকীয় হাসি।
আবির বিরক্ত গলায় বলল,
“আপনি এখানে কেন? আপনাকে তো রেস্টে থাকতে বলা হয়েছিল।”
তন্ময় চোখ ছোট করে বলল,
“রেস্ট? এই গুরুত্বপূর্ণ মিটিং মিস করা মানে অফিসকে বিপদে ফেলে দেওয়া। আমি কি এতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন?”
মেহজাবিন ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এতটা দায়িত্বশীল হইছেন কবে থেকে?”
তন্ময় কাশির ভান করে বলল,
“এই যে আজ থেকে।”
সবাই একসাথে হালকা হাসল। আদিল শান্ত গলায় বলল,
“ভালো হয়েছে আপনি এসেছেন। আজ আপনাকে দরকার হবে, আর মিটিং টা যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ, তাই সবার উপস্থিত থাকা দরকার।”
তন্ময়ের চোখ চকচক করে উঠল।
“ওহহো, স্যার নিজে বললেন দরকার হবে আমাকে? আজ দিনটা ভালোই যাবে মনে হচ্ছে।”
সবাই হাসলেও আদিল কিছু বলল না নিজের কেবিন এর দিকে চলে গেলো। তন্ময় একবার ফারিবার দিকে তাকায়। দেখে ফারিবা মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।
তাই তাকে আর বিরক্ত না করে তন্ময় নিজের ডেস্কের দিকে চলে যায় সব গুছিয়ে নিতে।
কিছুক্ষনের মধ্যেই মিটিং রুমে সবাই ঢুকে পড়ল। বিশাল টেবিলের এক পাশে বসে আছে বিদেশি ক্লায়েন্টরা। তাদের সামনে ল্যাপটপ, নোটবুক আর অনুবাদকারী। অন্য পাশে কোম্পানির টিম।
সবচেয়ে সামনে ফারিবা আর মেহজাবিন। প্রজেক্টরের আলো জ্বলে উঠল।
মেহজাবিন প্রথমে শুরু করল।
তার কণ্ঠ স্থির, আত্মবিশ্বাসী।
“Good morning everyone. Today we are presenting our project overview…”
তার পর স্লাইড একের পর এক চলতে লাগল। ডাটা, গ্রাফ, এনালাইসিস,সব কিছু নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করছে সে। মেহজাবিন নিজের অংশ সুন্দর ভাবে প্রেজেন্ট করে।
ফারিবার প্রথম অংশ প্রেজেন্ট করার কথা থাকলেও সে তার নার্ভাসনেসের জন্য সব গুলিয়ে যায়, তাই মেহজাবিন ওপেনিং প্রেজেন্ট করে।
ফারিবা পাশে বসে স্লাইড পরিবর্তন করছে, মাঝে মাঝে ভেতরে ভেতরে নার্ভাস হলেও বাইরে একদম শান্ত।
এক পর্যায়ে ক্লায়েন্টদের মধ্যে একজন প্রশ্ন করতে শুরু করল।
“Why did you choose this market strategy?”
ফারিবা একটু সামনে ঝুঁকে আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল,
“Because our research shows a long-term sustainability advantage in this region…”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল না। খুব সুন্দর ভাবে উত্তর দিল। মেহজাবিন একবার তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। এরপর ফারিবা তার অংশটুকু খুব সুন্দর করে প্রেজেন্ট করে,
হঠাৎ একজন সিনিয়র ক্লায়েন্ট ইংরেজিতে বলল,
“This data projection looks slightly inconsistent.”
তার কথা শুনে পুরো রুম চুপ হয়ে যায়। ফারিবার হাত হালকা কেঁপে উঠল। ঠিক তখনই আদিল কথা বলল।
“Let me clarify.”
সবাই তার দিকে তাকাল। সে শান্ত গলায় প্রতিটা জিনিস ব্যাখ্যা করতে শুরু করল।
তার কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো চাপ নেই। প্রতিটি পয়েন্ট এমনভাবে ব্যাখ্যা করল যেন কোনো সন্দেহই আর অবশিষ্ট না থাকে। ক্লায়েন্টরা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
তন্ময় পাশ থেকে ফিসফিস করে আবিরকে বলল,
“স্যার এতো সুন্দর করে সবকিছু ব্যাখ্যা করে এরপর তাকে পাল্টা প্রশ্ন করার কারো সাহস হবে না। তার প্রতিটা কাজ খুব নিখুঁত ও পরিষ্কার।”
তন্ময় এর কথা শুনে আবির সম্মতি দিল।
মিটিং শেষের দিকে ক্লায়েন্টরা উঠে দাঁড়াল। তারপর করতালি তে সবাইকে শুভেচ্ছা জানায় হ্যান্ডশেক করে, সবাইকে ধন্যবাদ জানায় এত সুন্দর ভাবে সবকিছু করার জন্য, সন্তুষ্টি দেখালো ফারিবা আর মেহজাবিন এর পরিশ্রমের। এরপর আদিল কে খুব আগ্রহ নিয়ে বলল,
“Excellent presentation, Good Job Mr. Sheikh.”
এই একটা বাক্যেই যেনো পুরো টিমের মুখে স্বস্তি নেমে এলো। ডিল অফিসিয়াল সাইন করা হলো।
মিটিং শেষে সবাই বাইরে বের হয়ে আসছে। ফারিবা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। হঠাৎ পেছন থেকে মেহজাবিন এসে বলল,
“তুমি দারুণ করেছো আপু, শুধু শুধু ভয় পেয়েছিলে।”
ফারিবা হালকা হাসল।
“তুমিও।”
দুজনই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, একটুপর দূরে দাঁড়িয়ে তন্ময় নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“আজকে অফিসে একটা ইতিহাস তৈরি হয়ে গেছে, আর কেউ আমাকে একটা বারের জন্য ধন্যবাদও দিল না।”
আবির হতাশা ভরা নয়নে তাকিয়ে বলল,
“আপনি তো কিছুই করেননি মশাই, এতো অভিনন্দন দিয়ে কি করবেন।”
তন্ময় বুক চেপে ধরল,
“এইটাই তো আমার কষ্ট আবির সাহেব, আপনারা আমার মূল্য টা দিতে পারেন না।”
তন্ময় এর এমন আজব কথা শুনলে সবাই না হেসে থাকতে পারে না। এদিকে সবাই আবার সবার কাজে ব্যাস্ত হয়ে যায়।
কিন্তু একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদিল শুধু ফারিবার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে আর কিছু বলল না। শুধু খুব আস্তে নিজের মনে বলল,
“আজ তুমি অনেক ভালো কাজ করেছো ফারিবা, আইএম প্রাউড অফ ইউ। এইভাবেই কাজের দিকে মনোযোগী থেকো অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে পারবে।”
মিটিং শেষে অফিসটা আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো। সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের কাজে ফিরে যেতে শুরু করল। অফিসের ভেতরের পরিবেশটা শুধু স্বাভাবিকই হয়নি বরং, যেন সবার মুখে অদ্ভুত এক স্বস্তি লেগে আছে। এত বড় একটা মিটিং সফলভাবে শেষ হওয়ার পর চাপা টেনশনটাও ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে।
মেহজাবিন নিজের ডেস্কে বসে ফাইল গুছাচ্ছিল। ঠিক তখনই তন্ময় তার ডেস্কের সামনে এসে নাটকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলে,
“এইযে কাল নাগিনী ম্যাডাম , আজকে আমি অফিসের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে এসেছি। অন্তত একটা ধন্যবাদ তো আমি আপনার থেকে আশা করতেই পারি।”
মেহজাবিন ভ্রু তুলে তাকাল।
“কেনো আপনি কি কোনো যুদ্ধে গিয়েছিলেন নাকি?”
তন্ময় হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এই আহত শরীর নিয়েও অফিসে এসেছি। এই ত্যাগ কেউ বুঝলো না।”
পাশ থেকে আবির বলে উঠল,
“আপনি না আসলেও মিটিং ঠিকই ভালো হতো তন্ময় সাহেব।”
সাথে সাথে তন্ময় বুক চেপে ধরে আহত গলায় বলল,
“আবির সাহেব, আপনার এই তিক্ত কথা গুলো আমার কোমল হৃদয়কে আঘাত করছে।”
তন্ময় এর এইসব কাণ্ড দেখে সবার সাথে ফারিবার মুখেও ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। অনেকদিন পর হয়তো সে এতটা হালকা অনুভব করছে। আর মিটিং টা ভালো ভাবে হওয়াতে তার মনেও প্রশান্তি বয়ে যাচ্ছে।
তন্ময় আরো কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই আদিল নিজের কেবিন থেকে বের হয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়াল।
সবাই স্বাভাবিকভাবেই চুপ হয়ে তার দিকে তাকাল। আদিল একবার চারপাশে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আজকে সবাই খুব ভালো কাজ করেছেন। এই প্রজেক্টটা আমাদের কোম্পানির জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর সেটা সফল করার পিছনে আপনাদের সবার পরিশ্রম আছে।”
তার গলায় সবসময়কার মতোই স্থিরতা ছিল, কিন্তু আজ সেই কথাগুলোর মাঝে আলাদা এক প্রশংসা মিশে ছিল।
আবির হাসিমুখে বলল,
“স্যার আজকে তাহলে আমাদের একটা ট্রিট তো প্রাপ্য।”
সাথে সাথে তন্ময় বুকের ওপর হাত রেখে বলে উঠল,
“হ্যাঁ স্যার, বিশেষ করে আহত কর্মীদের জন্য আলাদা সম্মাননা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।”
আদিল ভ্রু তুলে তার দিকে তাকাল, এরপর শান্ত গলায় বলল,
“কেনো আপনি কি এই মিটিংয়ের জন্য হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছেন নাকি।”
পুরো অফিসে হাসির রোল পড়ে গেল। তন্ময় মুখ গম্ভীর করে বলল,
“স্যার, আমার এতো বড় ত্যাগের কোনো মূল্যই নেই আপনাদের কাছে।”
সবাই আবার হেসে উঠল। আদিল এবার হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে তন্ময় সাহেব চিন্তা করবেন না মূল্য পাবেন, আজ রাতে সবাই রেডি থাকবেন। পুরো টিম একসাথে ডিনারে যাবো।”
কথাটা শুনতেই পুরো অফিসে ছোটখাটো উচ্ছ্বাস পড়ে গেল।মেহজাবিন খুশি হয়ে বলল,
“সত্যি স্যার?”
“হুম। আজকের সাফল্যের সেলিব্রেশন তো করতেই হবে।”
ফারিবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। আশেপাশের সবাই অনেক এক্সসাইটেড হলেও তার চোখ বারবার অজান্তেই আদিলের দিকেই চলে যাচ্ছিল।
সে অবাক হয়ে বারবার তাদের দু’জনের পোশাকের রঙের দিকে তাকাচ্ছিল। কাকতালীয়ভাবে এতটা মিল কীভাবে হতে পারে, সেটাই যেন তার মাথায় আসছিল না। সে সকালেই লক্ষ্য করেছিল কিন্তু তখন এমনিতেই মিটিং নিয়ে সে ভীষণ নার্ভাস ছিল, তার ওপর এই অদ্ভুত মিলটা দেখে সে আরও বেশি অবাক হয়ে গিয়েছিল।
আবারও আদিল এর দিকে তাকিয়ে ভাবে, মানুষটা খুব স্বাভাবিকভাবেই সবার সাথে কথা বলছে, কিন্তু কেন জানি আজ তাকে অন্যরকম লাগছে ফারিবার কাছে।
----------------
রাতের শহরটা আলোয় ঝলমল করছে। অফিসের সবাই একসাথে শহরের পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে।
চারপাশে হাসাহাসি, গল্প, খুনসুটি মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
তন্ময় একের পর এক কথা বলে সবাইকে হাসিয়ে যাচ্ছে। আবির কয়েকবার তাকে থামানোর চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হচ্ছে না।
মেহজাবিন তামান্না আর শান্তাও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে আজ অনেকদিন পর প্রাণ খুলে হাসছে।
ফারিবা চুপচাপ বসে সবাইকে দেখছিল। ঠিক তখনই ওয়েটার খাবার সার্ভ করতে গিয়ে ভুল করে পানি ভর্তি গ্লাসটা কাত করে ফেলতে নেয়।
ফারিবা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদিল দ্রুত তার হাত দিয়ে গ্লাসটা সরিয়ে নেয়। ফলে ঠান্ডা পানিটা টেবিলে পড়লেও ফারিবার গায়ে লাগেনি।
ফারিবা দ্রুত একটা টিস্যু নিয়ে আদিল এর হাত মুছে দিতে নেয়, এর ফলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দুজনের চোখ একসাথে আটকে গেল।
আদিল ধীরে হাত ছেড়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“বি কেয়ারফুল, মিস. ফারিবা।”
ফারিবার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।
আর দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল তন্ময়। মুহূর্তের জন্য তার মুখের হাসিটা থেমে গেল।
বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা চাপা অনুভূতি হলো। কেন হলো সেটা সে নিজেও বুঝতে পারল না।
সে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ ফারিবার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সে স্বাভাবিক হতে পারছে না কোনো ভাবে।
তারপর পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে হালকা হেসে বলল,
“বাহ, আজকাল দেখি মানুষজন ডিনারে এসেও সিনেমাটিক মুহূর্ত তৈরি করছে।”
তার কথায় সবাই আবার হেসে উঠলেও তন্ময়ের হাসিটা পুরোপুরি চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
সবার কাছে বিষয় টা তন্ময় এর জোকস মনে হলেও শুধু মাত্র মেহজাবিনই আসল ব্যাপার টা বুঝতে পারে।
বেশ কিছুক্ষণ পর হাসি, আড্ডা আর খুনসুটিতে তাদের টিম ডিনারটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে লাগল।
কিন্তু এই হাসির আড়ালেই হয়তো নিঃশব্দে বদলে যেতে শুরু করেছে কিছু অনুভূতির অর্থ।
কারো মনের ভেতর নতুন এক অনুভূতির সূচনা হচ্ছে ধীরে ধীরে....
আবার কারো অজান্তেই হয়তো কোনো গল্পের সমাপ্তির দিকে অগ্রসর হচ্ছে.....
চলবে.....
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, আর গল্পটা কেমন লাগছে সুন্দর মতামত দিবেন, ধন্যাবাদ ]