#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_২১
রাত অনেকটা গভীর হয়ে গেছে, আড্ডা আর খুনসুটি তে কখন যে এতটা সময় পার হয়ে গেছে কেউ বুঝতে পারেনি।
ডিনার শেষ করে সবাই রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়, এরপর কে কিভাবে বাসায় যাবে তা নিয়ে বিবেচনা করতে থাকে। এত মানুষের সামনে আদিল ফারিবাকে পৌঁছে দেয়ার কথা বলতে পারছে না।
তবুও সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“অনেক রাত হয়ে গেছে, আপনার সবাই কে কিভাবে বাড়িতে যাবেন।”
সাবরিনা শান্তা বলে,
“স্যার আমার গাড়ি আছে, যেহেতু অনকে রাত হয়ে গেছে, তাহলে আমি তামান্না, ফারিবা, এমি আর মেহু....”
আদিল হাতের ইশারায় শান্তাকে থামিয়ে বলে,
“আচ্ছা আপনি ওদের নিয়ে যান, মেহু আমার সাথে যাবে কেমন। আর হ্যা সাবধানে যাবেন।”
বলেই ফারিবার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। এরপর তন্ময় এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“আপনি কি করে যাবেন, বাইকে করে এসেছেন।”
তন্ময় ইতস্ত বোধ করে বলে,
“না স্যার হাতে ব্যথার জন্য আম্মু বাইক চালাতে নিষেধ করেছে।”
এরপর আদিল বলে,
“তাহলে আপনি আমার গাড়িতে উঠে বসুন, আমি পৌছে দিচ্ছি।”
তন্ময় অনেক বার নিষেধ করে কিন্তু আদিল কোনো কথা শুনে না। অবশেষে তন্ময় আদিল এর কথা মত তার গাড়িতে উঠে বসে। আর বাকিরা সবাই নিজের মত করে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হয়।
সবাই একে একে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। শহরের রাস্তাগুলো এখনো আলোয় ঝলমল করছে, কিন্তু দিনের কোলাহলটা আর নেই। চারপাশে এক ধরনের নরম নিস্তব্ধতা।
ফারিবা গাড়ির জানালার পাশে মাথা ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। বাইরের আলো বারবার তার মুখের ওপর এসে পড়ছে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু তার মাথার ভেতর বারবার ভেসে উঠছে আজকের কিছু মুহূর্ত।
আদিলের সেই শান্ত দৃষ্টি, তার কথা বলার ভঙ্গি, আর রেস্টুরেন্টে হঠাৎ করে নিজের হাত দিয়ে গ্লাস সরিয়ে নেওয়ার মুহূর্তটা।
ফারিবা বিরক্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এরপর মনে মনে বলল,
“কেন বারবার এসব মনে পড়ছে আমার।”
পাশে তামান্না বসে ছিল। ফারিবার দিকে একবার তাকিয়ে দেখে সে চোখ বন্ধ করে কপাল কুঁচকে রেখেছে। তামান্না আস্তে করে ফারিবার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে,
“ফারিবা আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন।”
হঠাৎ কাঁধে হাত রাখতে মেয়েটা একটু চমকে যায় এরপর স্বাভাবিক হয়ে বলে,
“না শুধু মাথাটা একটু ধরেছে।”
“ওহ, আজ অনেক ধকল গিয়েছে আপনাদের উপর, মাথা ধরা স্বাভাবিক, আচ্ছা আমরা প্রায় পৌঁছে গেছি। বাড়ি গিয়ে রেস্ট করবেন ঠিক মত, আর এমনিতেও কালকে ওফডে, তাই ঠিকমত ঘুমাবেন কেমন।”
ফারিবা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। পাশ থেকে শান্তা বলেন,
“শুধু কালকে ওফডে বলে বন্ধ নয়, আমাদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য আদিল স্যার তিন দিন বন্ধ রেখেছে, এরপর সোমবার আমাদের ইভেন্ট আছে।”
তামান্না আর ফারিবা একসাথে বলে উঠে,
“কিসের ইভেন্ট।”
অন্যদিকে....
আদিল গাড়ি চালাচ্ছে, মেহজাবিন তার পাশে বসা, আর তন্ময় পেছনে। মেহজাবিন সামনে বসে নিজের ফোন দেখছে, আর তন্ময় চুপ করে বসে আছে। হঠাৎ আদিল লুকিং গ্লাস দিয়ে তন্ময় এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
“কি ব্যাপার তন্ময় সাহেব, শরীর খারাপ লাগছে আপনার।”
তন্ময় এক ধ্যানে বাহিরের দিকে তাকিয়ে ছিল, আদিলের কথায় সে একটু চমকে যায়। এরপর শান্ত ভঙ্গিতে বলে,
“না স্যার আমি ঠিক আছি।”
আদিল আগের মতোই রাস্তার দিকে চোখ রেখে বলে,
“তাহলে এত চুপচাপ আছেন যে, আপনাকে শান্ত ভাবে দেখলে ভয় হয়, অভ্যাস নেই তো।”
তন্ময় আদিল এর কথায় মুচকি হাসলেন,
“স্যার আজ অনেক কথা বলেছি মজা করেছি তো এনার্জি লেভেল কমে গেছে, একটু চার্জ হচ্ছি।”
তন্ময় এর কথা শুনে আদিল কিছু বলল না আগের মতোই গাড়ি চালাতে ব্যাস্ত হয়ে রইলো। কিন্তু মেহজাবিন বোধহয় তন্ময় এর কথার ধরন বুঝতে পারলো। তাই একবার পেছনে ফিরে তন্ময় এর দিকে তাকিয়ে রইলো, এরপর আবার ফেনের দিকে তাকালো।
বেশ কিছুক্ষন পর তন্ময় এর বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামতেই তন্ময় নেমে যেতে নিলে, আদিল তাকে থামিয়ে বলে,
“তন্ময় সাহেব আজকে এত বড় একটা আসিভমেন্ট এর জন্য আগামীকাল সহ দুইদিন আপনাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য বন্ধ রেখেছি। আপনি এই তিন দিন খুব ভালো মতো রেষ্ট নিয়ে সুস্থ হন। এরপর আজকের এই ডিল টা সাকসেসফুলি সাইন হওয়ার জন্য সোমবার একটা পার্টির ব্যাবস্থা করেছি। তো সেদিন দেখা হবে। আর মঙ্গলবার থেকে আবার অফিস জয়েন করবেন আশা করি।”
তন্ময় মুচকি হেসে সম্মতি দেয়। এরপর মেহজাবিন জিজ্ঞেস করে ইভেন্ট টা কোথায় হবে। আদিল জানায় পরে সব কিছু টেক্সট করে জানিয়ে দেয়া হবে।
সবশেষে তন্ময় তাদের থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে চলে যায়। আর মেহজাবিন তার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। আদিল গাড়ি স্টার্ট দেয়। কিছু দূর যেতেই মেহজাবিন কে বলে,
“আচ্ছা মেহু এতক্ষনে মিস. ফারিবার বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার কথা না।”
মেহজাবিন আদিল এর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হেসে বলে,
“হ্যা ভাই যাওয়ার কথা তো।”
“তাহলে ফোন দিয়ে সিওর হয়ে নে।”
মেহজাবিন আদিল এর ব্যাকুলতা দেখে নিজের হাসি আটকানোর চেষ্টা করে ফারিবাকে ফোন করে।
এদিকে....
সাবরিনা শান্তার গাড়ি এসে থামে ফারিবাদের বাড়ির সামনে। ফারিবা তাদের বিদায় জানিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে আর ঠিক তখনই ফোনটা হালকা কেঁপে উঠল।
ফারিবা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে মেহজাবিনের নাম ভেসে উঠতে দেখে সে কল রিসিভ করে,
“হ্যালো,বাসায় পৌঁছাইছো আপু?”
“হুম, এইমাত্র পৌছালাম আর তুমি?”
“আমিও প্রায় পৌঁছে গেছি বললেই চলে।”
“ওহ আচ্ছা, তুমি কি হোস্টেলে যাচ্ছো।”
“না আপু আদিল ভাইয়ের সাথে বাসায় যাচ্ছি।”
“ওহ আচ্ছা ঠিক আছে সাবধানে যাও।”
এরপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর হঠাৎ মেহজাবিন দুষ্টু গলায় বলল,
“আচ্ছা আপু ফোন রেখো না একটা কথা বলি?”
ফারিবা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি কথা বলো?”
“আজকে কিন্তু তোমাকে আর আদিল ভাইকে একদম, উমম কাপল কাপল লাগছিল।”
মুহূর্তের মধ্যেই ফারিবার চোখ বড় হয়ে গেল।
“মেহজাবিন, কি বলছো এইসব।”
ওপাশ থেকে চাপা হাসির শব্দ ভেসে এলো।
“আরে আপু রাগ করছো কেন? আমি শুধু মজা করে বললাম।”
ফারিবা দ্রুত বলল,
“আজেবাজে কথা বলবা না একদম।”
তারপর কোনো কথা না বলেই কলটা কেটে দিল।
কিন্তু কল কেটে দেওয়ার পরও কেনো জানি বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির লাগতে শুরু করল।
এদিকে....
মেহজাবিন এখোনো ফোন হাতে নিয়ে হাসছে। মেহজাবিন এর হাসি দেখে আদিল এর মুখেও মিষ্টি হাসি লেগে আছে। কিন্তু নিজেকে সামলিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এভাবে হাসছিস কেনো।”
মেহজাবিন হাসি থামিয়ে বলে,
“ফারিবা আপু রাগ করেছে, তোমাদের কাপল লাগছিল বলাতে।”
আদিল একবার মেহজাবিন এর দিকে তাকিয়ে আবারও গাড়ি চালাতে মন দিয়ে বলে,
“তুই এমন কথা বলতেই কেনো গেলি, সে তো জানে তুই আমার সাথে আছিস। তাই হয়তো এম্বেরেস ফিল করেছে।”
মেহজাবিন আদিল এর দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষন, এরপর চশমা ঠিক করে বলে,
“হুম এইভাবেতো ভেবে দেখিনি।”
ওদিকে...
ফারিবা ফোন রাখার পর কলিং বেল দিলে ফারদিনের মা দরজা খুলে দেয়, এরপর মুচকি হাসে। ফারিবা সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকে। উনিও উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“কেমন ছিল আজকের মিটিং।”
ফারিবা টেবিলের উপর ব্যাগ রেখে হিজাব খুলতে খুলতে বলে,
“জ্বি মা মিটিং অনেক ভালো করেই হয়েছে, আর আমরা প্রজেক্টটা পেয়েছি।”
“আলহামদুলিল্লাহ, দোয়া করি এইভাবেই তোদের অফিসের উন্নতি হোক।”
“ইনশাআল্লাহ মা।”
ফারদিনের মা ফারিবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, কিছুক্ষন মেয়েটার মলিন মুখ আর ক্লান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
“অনেক পরিশ্রম করেছিস কতোগুলো দিন ধরে, যা এখন ফ্রেশ হয়ে আয় আমি খাবার দিচ্ছি।”
ফারিবা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
“আমাদের আজকে টিম ডিনার ছিল আমি খেয়ে এসেছি। আমি ফোন করেছিলাম ফাইয়াজ বলেনি আপনাকে।”
“কোথায় বলেনি তো, শুধু বলল আপুর দেরি হবে ফিরতে।”
ফারিবা বিরক্ত হয়ে বলল,
“ও যা হচ্ছে না দিন দিন, মা ওকে একটু শাসন করতেই হবে। আমিও বাড়ি থাকি না ওকে দেখতেও পারি না। আজকে বিকেলে ওর স্কুল থেকে ফোন করেছিল। ওর নাকি নির্বাচনী পরিক্ষায় দুটো বিষয় খারাপ হয়েছে। তাও ফাইয়াজ যে বিষয়ে সব চাইতে ভালো ছিল সেই বিষয়ে। এমন করলে কি করে হবে বলুন তো মা, ওর বোর্ড পরিষ্কার আর মাত্র আছে কয়দিন বাকি। এখন সিরিয়াস না হলে হবে।”
ফারদিনের মা ফারিবার কথা শুনে রেগে গেলেন ছেলের উপর,
“সে কি আমাকে তো কিছুই বলে না, আর আমাদের কথাও শুনতে চায় না। ও একমাত্র তোকেই ভয় পায় তুই কিছু বলিস।”
“বলবো তো অবশ্যই, আমি অনেক রিকোয়েস্ট করে ওর রিটেক এর ব্যাবস্থা করেছি মা, যাক আমার তিনদিন বন্ধ আছে এরপর একটা আফিসের সাকসেসফুল পার্টি আছে তারপর থেকে আবার অফিস। এই তিন দিন যতটা পারবো ওকে নিয়ে বসবো।”
“আচ্ছা, তবে শুধু ওকে নিয়ে ব্যস্ত থাকিস না, নিজেও ভালো মতো রেস্ট করেবি।”
ফারিবা মুচকি হেসে সম্মতি দেয়।
ফারদিনের মা মেয়েটার মাথায় আবারও হাত বুলিয়ে দিতে হাকে এরপর আরো কিছু কথা বলে ফারিবাকে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে যেতে বলে।
ফারিবাও নিজের রুমে এসে বোরকা খুলে বিছানায় রেখে ফ্রেশ হতে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে গামছা দিয়ে মুখ মুছে বারান্দায় গামছা মেলে দিয়ে আসে।
পরে বিছানা থেকে বোরকা নিয়ে গুছিয়ে রাখার সময় আদিল এর মুখটা ভেসে ওঠে আর মেহজাবিন এর বলা কথাটাও মনে পরে যায়। সাথে সাথে ফারিবা নিজের ভাবনাকে থামিয়ে দেয়।
সে আর পারছেনা এইসব নিয়ে ভাবতে, সে যতই আদিল এর কথা চিন্তা করে ততই যেনো আর বুকের ভেতরে ব্যাথা অনুভব হয়। আর কেমন এক আজব অনুভূতি তার মনে ছেয়ে যায়, সে আর কিছু চিন্তা করতে পারছে না।
সে আদিলকে নিয়ে কিছুই ভাবতে চায় না, সে তো তার মনকে ওয়াদা করেছে ফারদিন এর জায়গা কেউ কখনো নিবে না। সে কাওকে নিতেও দিবে না। তবে আদিল কেনো আর চিন্তার মাঝে ভেসে বেরায়। এটাতো অন্যায়, সে কিভাবে আদিলে কে জায়গা দিবে, যেখানে শুধুই তার ফারদিন এর বসবাস।
সে বোরখাটা নিয়ে আলমারি তে রেখে দিল। এরপর খাটের কোণায় বসে বলে,
“না, আমি আর কিছু ভাববোনা। আদিল স্যার শুধু আমার বস এর থেকে বেশি আর কিছুই না। আমার মনে শুধু ফারদিন আছে আর কেউ নেই আর কখনো আসবেও না।”
এতো জোর দিয়ে কি আর মনের বিরুদ্ধে কথা বলা যায়। মন যখন যেটা চায় সে করে নেয়। ফারিবার মন কি তার কথা শুনবে নাকি সে তার কাজ নিরবে করে যাবে। হয়তো ফারদিন তার মনের একপাশে সারাজীবন রয়ে যাবে। তাই বলে কি মন কাওকে নতুন করে আপন করবে না।
অন্যদিকে…
তন্ময় নিজের ঘরে এসে বিছানার ওপর ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল। আজ সে তার মায়ের সাথেও ঠিক মতো কথা বলেনি। তার মা অনেক কিছু জিজ্ঞেস করেছিল কিন্তু শরীর খারাপ লাগছে বলে ঘরে চলে আসে।
তার মুখে আজ আর সেই চিরচেনা হাসিটা নেই। সে ধীরে ধীরে খাটে গিয়ে বসে মাথার ব্যান্ডেজটা খুলে পাশে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বারবার তার চোখের সামনে একটা দৃশ্যই ভেসে উঠছে, রেস্টুরেন্টে ফারিবার হাত ধরা অবস্থায় আদিলের দিকে তাকিয়ে থাকা।
তন্ময় বিরক্ত হয়ে মাথার চুল টেনে ধরে, তার সহ্য হচ্ছেনা কিছু। সে এইটা কেনো দেখলো, কোথায় কারো চোখেতো পরলো না, তার চোখেই কেনো এই দৃশ্য পরতে হল।
হঠাৎ করে মনে হল আজ দুজনের পোশাকের রঙটাও এক, তার রাগ আরো বেরে গেল। সে বিছানায় শুয়ে মাথায় হাত দিয়ে বলে,
“তাদের মধ্যে কিছু চলছে না তো, কে জানে। আমার মাথা কাজ করছে না। আমার সবকিছু বিরক্ত লাগছে। আমার কি হচ্ছে, আমার কেনো সবকিছু এত বিরক্তকর মনে হচ্ছে।”
আজ পর্যন্ত কোনো কিছু নিয়ে সে এতটা ভাবেনি। সবসময় মজা, হাসি আর হালকা মন নিয়েই থেকেছে। কিন্তু আজ কেন জানি বুকের ভেতর কেমন চাপা একটা অস্বস্তি হচ্ছে তার। এক অদ্ভুত অনুভূতি যেটার নাম সে নিজেও জানে না।
তন্ময় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও তার মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো যেন কিছুতেই থামছে না।
বারবার একই দৃশ্য তার সামনে ভেসে উঠছে। আদিলের সেই শান্ত দৃষ্টি, ফারিবার হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, আর দুজনের মাঝের অদ্ভুত বোঝাপড়া। যেটা দেখে তার বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল।
তন্ময় হঠাৎ বিরক্ত হয়ে পাশের বালিশটা তুলে ছুঁড়ে মারল সামনে।
“ধুর, আমার কেন এতো খারাপ লাগছে?”
সে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।
ফারিবা কার সাথে কথা বলবে, কার দিকে তাকাবে, কার সাথে থাকবে এতে তো তার সমস্যা হওয়ার কথা না। কিন্তু তারপরও কেন জানি ভেতরটা অদ্ভুতভাবে জ্বলে পুরে ছাই হয়ে যাচ্ছে ।
মনে হচ্ছে কেউ যেন তার কাছের কোনো জিনিসটা ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে। এই অনুভূতিটা তার কাছে একদম নতুন।
সে কখনো কাউকে নিয়ে এভাবে ভাবেনি। কখনো কারো জন্য বুকের ভেতর এমন অস্থিরতা কাজ করেনি। তন্ময় ধীরে উঠে বসে মাথা নিচু করল। তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কি ফারিবাকে সত্যিই পছন্দ করতে শুরু করেছি, ভালো লাগাটা কি ভালোবাসাতে পরিনত হচ্ছে।”
কথাটা বলেই সে কয়েক সেকেন্ড চুপ হয়ে রইল। নিজের মুখে নিজের অনুভূতির কথা শুনে সে নিজেই যেন অবাক হয়ে গেছে।
হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল ফারিবার হাসি, রাগ করা, তাকে বকা দেওয়া, আর ছোট ছোট বিষয়গুলো তাকে বোঝানোর মুহূর্তগুলো। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই আবার আদিলের কথা মনে হতেই সেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতর আবারও সেই চাপা অস্বস্তি ফিরে এলো।
তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় হেলান দিল। হয়তো এই প্রথমবার সে বুঝতে পারছে, কাউকে হারানোর ভয় ঠিক কতটা অস্থির করে দিতে পারে একটা মানুষকে।
এদিকে…
আদিল নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। রাতের ঠান্ডা বাতাস তার কালো রঙের টি-শার্ট দুলিয়ে দিচ্ছে। আর সমান তালে তার চুল গুলোতে ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
তার হাতে কফির মগ। চোখ স্থির হয়ে দেখছে দূরের শহরের আলো। আজকের পুরো দিনটা বারবার তার মাথায় ঘুরছে।
বিশেষ করে একটা মুহূর্ত বারবার তার চোখে ভাসছে, ধূসর রঙের বোরকায় শান্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিবা।
আদিল ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। খুব আস্তে নিজের মনেই বলল,
“আজকে তোমাকে খুব সুন্দর লাগছিল, ফারিবা। একটা মানুষ কে বোরকাতও যে এতটা সুন্দর লাগতে পারে তা তোমাকে না দেখলে কখনো বুঝতে পারতাম না।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবারও আকাশের দিকে তাকাল।
হয়তো অনেকদিন পর তার জীবনে এমন একজন এসেছে, যাকে ভাবলেই বুকের ভেতর জমে থাকা অন্ধকারগুলো একটু একটু করে সরে যেতে থাকে।
কিন্তু সে খুব ভালো করেই জানে, ফারিবার চারপাশে এখনো অতীতের ছায়া ঘিরে আছে। আর সেই ছায়া সরানো এত সহজ হবে না।
আদিল ধীরে কফির মগটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেল। তেতো কফির উষ্ণতা গলা বেয়ে নেমে গেলেও তার মনটা আজ অদ্ভুত শান্ত ছিল।
অনেকদিন পর এমন একটা অনুভূতি হচ্ছে, যেখানে কোনো অস্থিরতা নেই, নেই ভেতরের সেই পুরোনো শূন্যতা।
সে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আবারও চোখ বন্ধ করল।
হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেল আজ মিটিংয়ের আগে ফারিবার নার্ভাস হয়ে যাওয়া চোখ দুটো। বাইরে যতই নিজেকে শক্ত দেখাক না কেন, মেয়েটার ভেতরে যে কতটা ভয় আর চাপ জমে আছে সেটা হয়তো খুব কম মানুষই বুঝতে পারে।
আদিল ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার খুব ইচ্ছে করছে মেয়েটাকে সব ভয় থেকে আড়াল করে রাখতে। যেন কোনো কষ্ট, কোনো অন্ধকার আর তাকে ছুঁতে না পারে।
কিন্তু সে জানে, এই অনুভূতিগুলো তার একতরফা। ফারিবার মনে এখনো অন্য কারো স্মৃতি বেঁচে আছে। সেখানে নিজের জন্য কোনো জোর করার অধিকার তার নেই।
এই ভেবেই আদিল হালকা তিক্ত হেসে বলল,
“তোমার মনটা এত সহজে আমায় জায়গা দিবে না, তাই না ফারিবা।”
খুব আস্তে বলা কথাগুলো রাতের বাতাসে মিলিয়ে গেল, দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে আকাশের দিকে তাকাল সে।
আজকের আকাশে মেঘ কম। ছোট ছোট তারা জ্বলছে দূরে। আদিল মুচকি হেসে খুব আস্তে বলল,
“হয়তো আল্লাহ অবশেষে আমার জীবনটাকেও, একটু আলো দেখাতে শুরু করেছে।”
তারপর ধীরে কফির মগটা পাশে রেখে ঘরের ভেতরে চলে গেল। বিছানায় কিছু সময় বসে ধীরে সে নরম বিছানায় নিজের গা এলিয়ে দিল। কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহূর্ত তার চোখে বারবার ভেসে উঠছিল ফারিবার স্নিগ্ধ মুখ খানা।
হয়তো এভাবেই অজান্তে তিনটা হৃদয় ধীরে ধীরে জড়িয়ে যেতে শুরু করেছে একই অধ্যায়ে। কিন্তু সেই অধ্যায়ের শেষ কোথায়, সেটা এখনো কারও জানা নেই.....
চলবে.....
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আর গল্প টা কেমন লাগলো মতামত দিবেন, ধন্যাবাদ]