#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_২৩ (প্রথমাংশ)
সোমবার সকাল।
মাঝে কেটে গেছে দুটো দিন।
এই দুটো দিন প্রেজেন্টেশন ডিপার্টমেন্টের সবার ছুটি থাকলেও আদিলের ব্যস্ততার কোনো শেষ ছিল না।
অফিসের বিভিন্ন কাজ সামলাতে প্রতিদিনই সময়মতো অফিসে আসতে হয়েছে তাকে।
কাজের চাপের কারণে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেও মাঝে মাঝেই অজান্তে তার দৃষ্টি চলে যেত কাঁচের দেয়ালের ওপাশে।
সেখানে ফারিবার ডেস্কটা এখনো আগের মতোই সাজানো আছে। শুধু মানুষটা নেই।
আর প্রতিবার সেই ফাঁকা ডেস্কটার দিকে তাকালে আদিলের বুকের বাঁ পাশে অদ্ভুত একটা শূন্যতা অনুভব হতো।
সে নিজেও বুঝতে পারছিল না, মাত্র দুটো দিনের অনুপস্থিতি কেন এভাবে তাকে অস্থির করে তুলছে।
আজও ফারিবার ডেস্কটা ফাঁকা। আগামীকাল থেকে তাদের ডিপার্টমেন্ট আবারো জয়েন করবে। হয়তো আগামীকাল থেকে আদিলের এই অস্থিরতার অবসান হবে।
আদিল নিজের চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করল। সামনে থাকা ফাইলটা হাতে নিয়ে আবার কাজে মন দিল।
আজ অফিসে অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি ব্যস্ততা। সন্ধ্যায় কোম্পানির সাকসেস পার্টি। তাই সকাল থেকেই বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত।
কেউ অতিথিদের তালিকা মিলিয়ে দেখছে, কেউ অনুষ্ঠানসূচি নিয়ে আলোচনা করছে, আবার কেউ ভেন্যুর সাজসজ্জার খোঁজখবর নিচ্ছে।
আদিলও কিছুক্ষণ নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনটা আজ বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই তার কেবিনের দরজায় নক করার শব্দ হলে সে ভেতরে আসার অনুমতি দিল,
“কাম ইন।”
অনুমতি পেয়ে ভেতরে ঢুকল মেহজাবিন। মুখে সেই চিরচেনা উজ্জ্বল হাসি। ভেতরে ঢুকেই সে চেয়ারে বসে একটা ফাইল দেখিয়ে বলল,
“স্যার এই ফাইলটা একটু দেখুন তো।”
আদিল ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়ে হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিয়ে দেখল, এরপর ফাইলটা দিয়ে বলল সব ঠিক আছে।
এরপর মেহজাবিন ফাইলটা হাতে চলে যাওয়ার সময় আদিল তাকে আটকিয়ে বলে,
“মেহু তুই আজকে তাড়াতাড়ি চলে যাস, গিয়ে তৈরি হয়ে সোজা ভেন্যুতে চলে আসিস।”
মেহজাবিন কথাটা শুনে খুশি হয়ে যায়, এরপর আবারও নিজের কাজে চলে যায়।
আদিল আবারও নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো, কিন্তু কাজের ফাকে ফাকে বারবার ফারিবার চিন্তা মাথায় চলে আসে।
এদিকে...
ফারিবা সকাল থেকেই ঘরের নানা কাজে ব্যস্ত। অফিসের কাজের চাপের কারণে সাধারণত বাসার কাজগুলোতে খুব বেশি সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না তার।
তাই ছুটির দিনগুলো পেলেই সে চেষ্টা করে ঘরের ছোটখাটো সব দায়িত্ব নিজের হাতে সামলে নিতে।
কখনো রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছে, কখনো ঘর গুছিয়ে রাখছে, আবার কখনো ফাইয়াজের পড়াশোনার খোঁজ নিচ্ছে।
কাজের ভিড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলেও মনটা যেন আজও পুরোপুরি শান্ত হতে চাইছে না।
বারবার কোনো না কোনো অজুহাতে তার চিন্তাগুলো অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে। নিজের এই অস্থিরতার কারণটা সে ভালো করেই বুঝতে পারছে, কিন্তু মেনে নিতে চাইছে না।
তাই প্রতিবারই সেই চিন্তাগুলোকে জোর করে সরিয়ে দিয়ে আবার কাজে মন দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল।
ফারিবা হাতের কাজ থামিয়ে ফোনটার দিকে তাকায়। ফোনটা হাতে নিতেই দেখে ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার সাবরিনা শান্তার কল।
ফারিবা ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে শান্ত বলে,
“হ্যালো ফারিবা তুমি পার্টির জন্য বের হবে কখন।”
“আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কখন বের হলে ভালো হয়।”
“আচ্ছা তাহলে এক কাজ করো, তুমি সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে রেড়ি হয়ে থেকো আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব।”
“আপনার কষ্ট করতে হবে না আমি একাই যেতে পারবো।”
কিন্তু সাবরিনা শান্তা ফারিবার কথায় রাজি হয় না, তাই সে নিয়ে যাবে বলে ফোন রেখে দেয়।
কল কাটার পর ফারিবা ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে প্রায় দুপুর দুইটা বেজে যাচ্ছে। পুনরায় ফোন টেবিলে রেখে হাতের কাজ শেষ করে আলমারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে ফারিবা।
বারবার আলমারি ঘটাঘাটি করেও কোন বোরকা পরবে বুঝতে পারে না সে। মুখে স্পষ্ট বিরোক্তির ছাপ। তখন তার ঘরের দরজায় টোকা পরতেই সে পাশে তাকিয়ে দেখে ফারদিনের মা এসে দাঁড়িয়ে আছে।
ফারদিনের মা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দেখে ফারিবা কিছু খুজছে মনোযোগ দিয়ে, তিনি আগ্রহ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি খুজচ্ছিস এইভাবে।”
ফারিবা আলমারির এইটা পাল্লা বন্ধ করে গম্ভীর মুখে বলে,
“আজকে একটা পার্টি আছে অফিসে বললাম না সেদিন।”
“হুম।”
“এখন পার্টিতে কি পরে যাব বুঝতে পারছি না, একটা বোরকার মানানসই লাগছে না।”
ফারিবার কথা শুনে ফারদিনের মা কিছুক্ষন চিন্তা করে, এরপর মুচকি হেসে বলে,
“তুই তোর গাউন গুলো কেনো দেখছিস না, ওখান থেকে কিছু পছন্দ হয় কি না দেখ একবার।”
“কিন্তু মা আমি তো এখন মুখ ঢেকে যাই সব জায়গায়, ওটা পরলে বেমানান লাগবেনা তো।”
ফারদিনের মা ফারিবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“তুই গাউনকে বোরকার মতো ব্যবহার করলি, হিজাব আর নিকাব পরে।”
ফারিবা কিছুক্ষন তাকিয়ে ভাবে, এরপর মুচকি হেসে মায়ের গাল টেনে বলে,
“আপনাকে অনেক ধন্যাবাদ মা এতো সুন্দর একটা বুদ্ধি দেয়ার জন্য।”
এরপর ফারিবা তার আলমারির ওপার থেকে লাগেজ নামাতে যাবে তখন মা তাকে বাধা দেয়,
“এতো ভারি জিনিস তুই একা টানতে পারবিনা, তোর না ভারি জিনিস টানা নিষেধ ভুলে যাস কেনো।”
কথাটা শুনা মাত্রই ফারিবার মন খারাপ হয়ে যায়, এরপর কিছু একটা চিন্তা করে সাথে সাথে চোখের কোনে জল চলে আসে কিন্তু সে মায়ের অগোচরে চোখ মুছে নেয়।
এরপর মা ফাইয়াজ কে ডাক দেয় ফারিবাকে সাহায্য করতে। ফাইয়াজ ডাক শুনে ফারিবার ঘরে এসে মায়ের কথা মতো লাগেজটা নামিয়ে চলে যায়।
এরপর ফারিবা মেঝেতে বসে লাগেজ খুলে, এই লাগেজ ভরা সব ফারদিনের স্মৃতি। ফারিবা শাড়ি পরতে খুব পছন্দ করতো, তাই ফারদিন সবসময় তাকে শাড়ি উপহার দিত। আজ যেনো প্রতিটা শাড়ি ভাজে শুধুই ফারদিনের স্মৃতি।
ফারিবা শাড়িগুলো সব নেরে দেখছিল, তখনি তার চোখে তাদের বিয়ের লাল শাড়িটা পরে। ফারিবা শাড়িটা হাতে নিয়ে নাকের কাছে ধরে। এই শাড়িতে এখনো যেনো ফারদিনের সুবাস ছড়িয়ে আছে। ফারিবার চোখ গড়িয়ে পানি পরে গেলো কিন্তু এইবার আর সেই পানি ফারিবা লুকায়নি।
ফারদিনের মা সবটাই খেয়েল করলো, সে যানে মেয়েটা তার ছেলেকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসে, সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য, লাগেজের ভেতর থেকে প্যাস্টেল পিংক রঙের একটা গাউন বের করে।
গাউনটা ফারিবাকে দেখিয়ে বলে,
“এইটা পরে যা তোকে অনেক মানায় এই রঙে।”
ফারিবা কিছুক্ষন গাউনটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে রইলো। এই গাউনটা ফারদিন তার জন্মদিন উপলক্ষে দিয়েছিল। সেদিনই তাকে প্রপোস করেছিল বিয়ের জন্য। আবার সেই জজন্মদিনটায় ফারদিন তাকে ছেরে চলে গেছে না ফেরার দেশে। এই সব জামা শাড়ি সবকিছুতেই যোনো ফারদিনের ছোয়া।
এক একটা জিনিস খুব শখ করে এনে সাজিয়ে রেখেছিল মেয়েটার জন্য। ফারদিনের ইচ্ছে ছিল সবগুলো জামা শাড়িতে দেখবে সে তার বউকে, কিন্তু ভাগ্য তার সাথে নির্মম পরিহাস করে গেছে, সেই সময়টাও সে পায়নি।
ফারিবা শাড়িটা রেখে গাউনটা হাতে নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখে। সে জানে এই লাগেজটা খুললেই তার সব স্মৃতি চোখে ভাসতে শুরু করে, তাই সহজে খুলে দেখেনা। আজও দেখতো না শুধু আফিসের পার্টিটার জন্যই দেখা।
ফারদিনের মা মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা আলমারির দিকে চলে যায়। আলমারি খুলে একই রঙের হিজাব খুজে। এরপর হিজাব আর নিকাব নিয়ে মেয়েটার সামনে গিয়ে বলে,
“বাদ দে মা, পুরোনো স্মৃতি নিয়ে যতো বসে থাকবি সেই স্মৃতি গুলো তোকে ততই পেয়ে বসবে। তুই এইভাবে মনমরা হয়ে থাকলে বুঝি ফারদিন খুব খুশি হবে। থাক মা আর মন খারাপ করিস না ভাগ্যে যা ছিল তাই হয়েছে। এইবার সব গুছিয়ে নে এরপর তোকে তৈরিও হতে হবে।”
মায়ের এমন মমতা মাখা কথা শুনে ফারিবা নিজেকে আটকে রাখতে পারে না, অঝোরে কান্না করতে থাকে। ফারিবাকে এইভাবে কাঁদতে দেখে সে অস্থির হয়ে ওঠে। ফারিবাকে জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে থাকে। নানান কথা বলে মেয়েটার চোখের পানি মুছে দেয়, অনেক আদর করে নিজের মমতার চাদরে জড়িয়ে নেয় মেয়েটাকে।
অন্যদিকে...
বন্ধের এই কটা দিন একবারের জন্যও নিজেকে শান্ত রাখতে পারেনি তন্ময়। বারবার তার মাথায় শুধু আদিল আর ফারিবার কথাই ঘুরপাক খেয়েছে।
একটা কথাই যেন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে তার মনে।
সে কি খুব দেরি করে ফেলেছে?
কোনোভাবেই নিজেকে এই ভাবনা থেকে দূরে রাখতে পারেনি সে।
তার শুধু একটাই ভয় সে ফারিবাকে হারিয়ে ফেলবে না তো। অনেক দেরি হয়ে যায়নি তো।
এতদিন ধরে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা কথাগুলো যদি আর কখনো বলার সুযোগই না পায়।
যে করেই হোক, এবার তাকে নিজের মনের কথাগুলো ফারিবাকে বলতেই হবে। না হলে ফারিবা কখনোই জানতে পারবে না, তন্ময় তার জন্য ঠিক কতটা অনুভব করে।
এতদিন ধরে নিঃশব্দে ফারিবাকে পছন্দ করে গেছে, কিন্তু কখনো প্রকাশ করেনি।
তন্ময় ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তারপর নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে মনে মনে বলল,
“আজ আর পিছিয়ে যাব না, যা হওয়ার হবে। কিন্তু এবার ফারিবাকে মনের কথা বলতেই হব।”
কথাটা বললেও বুকের ভেতরের অস্থিরতা একটুও কমল না।
কারণ সে জানে না, এই অনুভূতির উত্তর ঠিক কী অপেক্ষা করছে তার জন্য।
তন্ময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশে চোখ বুলিয়ে নিল। আকাশে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে।
দূরে কোথাও পাখির ডাক ভেসে আসছে, কিন্তু কোনো কিছুই যেন তার অস্থির মনটাকে শান্ত করতে পারছে না।
ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে তার মায়ের ডাক ভেসে এলো।
“তন্ময়।”
তন্ময় ঘুরে তাকাতেই দেখল তার মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
“কি হয়েছে মা, কিছু বলবে?”
মা ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়ালেন। ছেলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন,
“কয়েকদিন ধরে তোকে খুব চিন্তিত লাগছে। কোনো সমস্যা হয়েছে বাবা।”
তন্ময় জোর করে ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“না মা, তেমন কিছু হয়নি।”
“আমাকে বলতে হবে না। আমি তোকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। তোর চোখ দেখলেই বুঝতে পারি কখন তোর মনে কি চলে।”
তন্ময় কিছু বলল না। তার মা মৃদু হেসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
“তুই কি কিছু জিনিস নিয়ে চিন্তিত।”
তন্ময় তরপরও কিছু বলে না চুপ করে থাকে, ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে মা একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলে,
“বাবারে জীবনে কিছু কিছু কথা সময় থাকতে বলে ফেলতে হয়। বেশি দেরি করলে অনেক সময় আফসোস ছাড়া আর কিছুই থাকে না। তাই তোর মনে যা আছে বলে ফেল, কি হবে কিভাবে হবে এইসব না ভেবে মনের কথা বলে দিবি, যদি রিজেক্টও হয়ে যাস সমস্যা কি আফসোস তো আর থাকবে না।”
কথাটা শুনে তন্ময়ের বুকটা কেঁপে উঠল। তার মা কিভাবে তার মনের গভীরের কথা বুঝে যায়, সেইগুলো তার মাথায় আসে না।
সে কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মায়ের দিকে, কারণ এই একই কথাটাই গত দুদিন ধরে সে নিজেকে বলে আসছে।
সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে ফেলল।
তার মা আর কিছু না বলে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আর তন্ময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মায়ের চলে যাওয়া পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই সে তার নিজের মনকে শক্ত করলো, কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে থেকে সে খুব আস্তে বলল,
“আজ আর পিছিয়ে যাব না, আজ যেই ভাবেই হোক তোমাকে সব বলবো।”
তন্ময় আবারও বাহিরের দিকে তাকালো, এরপর মুচকি হেসে ঘরের ভেতরে চলে গেলো ।
এদিকে...
মেহজাবিন আদিলের কথা মতো বিকেলের মধ্যেই অফিসের কাজ শেষ করে বাড়িতে পৌঁছে গেছে পার্টির জন্য তৈরি হতে। আজ সে পরবে আদিলের কিনে দেওয়া সেই ড্রেসটা, যেটা দুই দিন আগে আদিল তাকে নিয়ে শপিং মলে গিয়ে কিনে দিয়েছিল।
মেহজাবিন বাড়ি থেকে মূল পরিকল্পনা করেই গিয়েছিল, পার্টির জন্য একটা সুন্দর বডিকন ড্রেস কিনবে। তাই শপিং মলে ঢুকেই সে একের পর এক নামী ব্র্যান্ডের শোরুম ঘুরতে শুরু করেছিল।
কয়েকটা ড্রেস ট্রাইও করেছিল সে। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে কোনোটাকেই ঠিক মন থেকে পছন্দ করতে পারেনি সে। ঠিক তখনই একটা শোরুমের ডিসপ্লেতে রাখা পোশাকের দিকে তার চোখ আটকে গিয়েছিল। একটা ওয়েস্টার্ন স্টাইলের শাড়ি।
হালকা ঝিলমিলে কাজ করা কাপড়, আধুনিক ড্রেপিং স্টাইল আর অভিজাত ডিজাইন প্রথম দেখাতেই পোশাকটা তার নজর কেড়ে নিয়েছিল।
মেহজাবিন কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শাড়িটার দিকে তাকিয়েছিল।
সে কখনো পার্টিতে শাড়ি পরার কথা ভাবেনি। কিন্তু সেদিন তার কাছে অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল, এই পোশাকটাই যেন তার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল সে। বডিকন ড্রেস কেনার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই ওয়েস্টার্ন শাড়িটাই কিনে নিয়েছিল।
শাড়িটা হাতে নিয়ে সেদিনের কথা ভেবে তার ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। কারণ আজকের পার্টিতে সে একটু অন্যরকমভাবেই উপস্থিত হতে চেয়েছিল, আর হয়তো সেই ইচ্ছেটা তার পূরণ হবে।
সব ভাবনা বাদ দিয়ে শাড়িটা পরে নিল, সাথে স্লিভলেস ব্লাউজ। এমেরাল্ড গ্রিন কালারে মেয়েটাকে বেশ মানিয়েছে।
মেহজাবিন চুলগুলো হালকা কার্ল করে নিল। একদম ন্যাচারাল মেকআপ, কানে ডায়মন্ড ইয়াররিং, হাতে হালকা ব্রেসলেট, সব মিলিয়ে খুব সুন্দর মানিয়েছে তাকে।
তৈরি হয়ে সে চোখে চশমা পরে নিল, কিন্তু তার কাছে এইভাবে নিজেকে খুব বেমানান লাগছিল।
তাই সে নিজের লেন্সের ব্যাগ থেকে শাড়ির রঙের সাথে মানাবে এমন একটা লেন্স খুঁজতে লাগল। খুঁজতে খুঁজতে গ্রে রঙের লেন্স পেয়ে গেল। এরপর সেটাই চোখে পরে নিল। তার লেন্সে পাওয়ার যোগ করা ছিল, তাই কোনো সমস্যা হলো না।
সব শেষে মেহজাবিন নিজেকে একবার ভালো করে আয়নায় দেখে নিল।
এমেরাল্ড গ্রিন ওয়েস্টার্ন শাড়ি, স্লিভলেস ব্লাউজ, হালকা ডায়মন্ড জুয়েলারি, চোখে গ্রে লেন্স আর কার্ল করা খোলা চুল। একদম পারফেক্ট লাগছিল তাকে।
সে তৈরি হয়ে আদিলকে কল করে তাকে ভেন্যুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু আদিল ফোন রিসিভ করে না হয়তো ব্যাস্ত তাই। মেহজাবিন আর কল দিয়ে বিরক্ত করে না।
ফোনটা পাশে রেখে, পোশাকের সাথে মিলিয়ে ব্যাগ খুজতে শুরু করে। আদিল মেহজাবিনের কোনো শখ অপূর্ণ রাখে না, বরং চাওয়ার আগে সব তার সামনে এনে হাজির করে।
মেহজাবিন ব্যাগ অনেক পছন্দ করে তাই তার কালেকশনে সব ধরনের ব্যাগ রাখা আছে। মেয়েটা কিছুক্ষন ভাবে কি রঙের ব্যাগ নিলে আজকের সাজটা শোভা পাবে। বেশ কিছুক্ষন চিন্তা করার পর তার চোখ পরে সিলভার স্টোন ওয়ার্ক করা ছোট ক্লাচ ব্যাগের দিকে।
ব্যাগটা নিয়ে তার প্রয়োজনিয় সব জিনিস গুছিয়ে নেয়। আদিল কে আরো একবার ফোন করে কিন্তু রিসিভ করে না। এরপর মেহজাবিন ভাবে কিভাবে যাবে, হয়তো একটা গাড়ি বুক করতে হবে।
ঠিক সেই সময় তার ফোন বেজে ওঠে, তাকিয়ে দেখে আদিলের ফোন, সে রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আদিল বলে,
“সরি মেহু আমার ফোন সাইলেন্ট করা ছিল তাই তোর কল খেয়াল করিনি, এখন বল কেনো কল করেছিলি।”
মেহজাবিন চোখ দুটো ছোটো করে রাগি স্বরে বলে,
“ভাই আমি কি করে আসবো ভেন্যুতে, গাড়ি পাঠাবে না।”
ওপাশ থেকে আদিলের চিন্তিত স্বর ভেসে এলো,
“একদম ভুলে গিয়েছিলাম তোকে যে আনতে হবে, আমি তো ড্রাইভারদের পাঠিয়েছি ক্লাইন্ডদের আনার জন্য। আচ্ছা তুই একটু অপেক্ষা কর আমি একটা ব্যাবস্থা করছি।”
বলেই ফোন কেটে দিল। বেশ অনেকটা সময় পর ফোন করে বলল, সাবরিনা শান্তা ফারিবাকে আনতে যাবে, এরপর তাকে নিতে গেলে দেরি হয়ে যাবে, তাই তাকে নিতে তামান্না আসবে। তামান্না কল করলে যেনো সে বেরিয়ে যায়, আর সাবধানে যেতে বলে ফোন রেখে দেয়।
মেহজাবিনও বাধ্য বোনের মতো ভাইয়ের সব কথা মেনে নিয়ে তামান্নার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।
ওদিকে......
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা ছুইছুই, ফারিবা হাতে ড্রেসটা নিয়ে বসে আছে। কোনো ভাবে নিজেকে সামলে নিতে পারছে না।
বেশ অনেকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার পর অবশেষে তৈরি হতে শুরু করল ফারিবা।
প্যাস্টেল পিংক রঙের গাউনটা খুব যত্ন করে পরে নিল সে। গাউনজুড়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ করা, যা পোশাকটাকে এক ধরনের কোমল সৌন্দর্য এনে দিয়েছে।
একই রঙের হিজাব আর নিকাব পরতেই তাকে আরও বেশি স্নিগ্ধ আর মার্জিত লাগছিল।
ফারদিনের দেওয়া গাউনটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল সে। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই আবারও মোচড় দিয়ে উঠল। এই গাউনটার সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য না বলা অনুভূতি।
সে ধীরে হাত বুলিয়ে দিল পোশাকটার ওপর। মনে হলো যেন সময়টা কয়েক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গেছে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল ফারিবা। আজ আর অতীতের স্মৃতির কাছে হার মানতে চায় না সে।
হাতে একটা রোজ গোল্ড ঘড়ি পরে নিল। কব্জিতে পাতলা একটা ব্রেসলেট। প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রাখার জন্য সঙ্গে নিল ছোট্ট একটা অফহোয়াইট ব্যাগ।
চোখে শুধু হালকা কাজল। অন্য কোনো সাজগোজ করেনি সে। তবুও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে আজ অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।
কোনো জাঁকজমকপূর্ণ সৌন্দর্য নয়, বরং এক ধরনের শান্ত, স্নিগ্ধ আর মায়াবী সৌন্দর্য। কয়েক মুহূর্ত নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রইল ফারিবা। তারপর খুব আস্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে ফারদিনের মায়ের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“মা, তৈরি হয়েছিস?”
ফারিবা দরজার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ মা, হয়ে গেছে।”
এরপর ব্যাগটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে।
কিন্তু সে জানত না, আজকের এই পার্টি শুধু একটা অফিস পার্টি হয়ে থাকবে না। অজান্তেই তার জীবনের কিছু অনুভূতি হয়তো আজ নতুন করে মোড় নিতে শুরু করবে। হয়তো তার জীবনে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা হবে আজ, কিন্তু সবটাই তার আজানা......
চলবে.....
[গল্পে রেসপন্স নেই লিখার আগ্রহ শেষ হয়ে যাচ্ছে]