#আবরণ
#সাহারা_জান্নাত_মুমু
#পর্ব_২৪
তন্ময় সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর ফারিবা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। কেন জানি তার মনে হচ্ছিল, তন্ময় কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারেনি। লোকটার চোখের সেই অদ্ভুত অস্থিরতা বারবার তার মনে পড়ছিল।
কিন্তু বিষয়টা নিয়ে আর বেশি ভাবার সুযোগ পেল না সে।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল আদিল।
ফারিবা কিছুটা চমকে মাথা তুলে তাকাল। আদিলকে দেখে তার মনের মধ্যে এক শীতল বাতাস বয়ে গেলো। সে আদিলের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
আদিল মৃদু হেসে ফারিবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“এখানে একা একা বসে আছো কেন?”
ফারিবা নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,
“এমনি সবাই ব্যস্ত, তাই একটু চুপচাপ বসে চারপাশে সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছি।”
আদিল তার বিপরীতের চেয়ারটায় বসার আগে অনুমতি নিল,
“কিছু মনে না করলে আমি কি এখানে বসতে পারি।”
ফারিবা আদিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সে কি আপনার অনুমতি নিতে হবে না বসুন।”
ফারিবার কথা শুনে আদিল চেয়ার টা টেনে বসে পরে, তারপর চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“পার্টি কি খুব বোরিং লাগছে।”
“না স্যার, তেমন কিছু না।”
“তাহলে আমার মনে হচ্ছে তুমি এখনো অফিস মোড থেকে বের হতে পারোনি তাই তো পার্টি এনজয় না করে চুপচাপ বসে আছো।”
কথাটা শুনে ফারিবা হয়তো হালকা করে হাসলো, তার হাসি নেকাবের আড়ালে দেখা না গেলেও আদিল মেয়েটার চোখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলো।
ফারিবার সেই ছোট্ট হাসিটা আদিলের চোখে আর মনে মৃদু প্রশান্তি ফুটে উঠল। অজান্তে আদিলের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে ওঠে।
দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল মেহজাবিন। তার ঠোঁটের কোণেও ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।
কেন জানি এই দুজনকে পাশাপাশি দেখতে তার খুব ভালো লাগে।
মেহজাবিন খুব ভালো করেই বুঝতে পারে ফারিবার আশেপাশে থাকলে তার ভাই অনেক আনন্দে থাকে কিন্তু মানুষ টা তার অনুভূতি গুলো ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারেনা।
হলরুমের আরেক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তন্ময়। সবার সাথে কথা বলছিল, কিন্তু তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না। সে সবার সাথে কথা বললেও তার নজর ছিল ফারিবার দিকে।
কথার মাঝে একটু অন্যমনস্ক হয়ে সে তাকিয়ে ছিল ফারিবা আর আদিলের দিকে। দুজনকে একসাথে কথা বলতে দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল তার।
অনুভূতিটা সুখকর ছিল না, তার ভেতরের লুকোনো আর্তনাদ সে ছাড়া আর কেউ জানতে পারলো না।
হঠাৎ করে মিউজিক বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর ডিজের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
“লেডিস এন্ড জেন্টলমেন, মে আই হেভ অ্যাটেনশন প্লিজ, আমার মনে হচ্ছে অনেক কথা হয়েছে এতক্ষন জমিয়ে আড্ডাও হয়েছে। তো এখন একটু পার্টিটা জমিয়ে দেয়া যাক। আমি সবাইকে রিকোয়েস্ট করছি ড্রান্স ফ্লোরে আসুন একটু কাপল ডান্স হয়ে যাক।”
মুহূর্তেই চারপাশে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। অনেকেই হাততালি দিয়ে উঠল। কেউ নিজের পার্টনারকে খুঁজছে, কেউ হাসতে হাসতে ডান্স ফ্লোরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
হালকা আলোতে আর কাপলদের জন্য ডান্স ফ্লোরটা আরও সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে।
আদিল আর ফারিবা সবার নাচ দেখছিল, দুজেনর মধ্যেই নিরবতা। কেউ একটা কথাও বলছে না কারো সাথে কিন্তু দুজনের নজর আটকে আছে ডান্স ফ্লোরের সবার দিকে।
আদিল একবার আর চোখে ফারিবার দিকে তাকায়, এরপর কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে ধীরে ধীরে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিল ফারিবার দিকে।
আদিলের হাত তার দিকে আগিয়ে আসতে দেখে ফারিবা ভ্রু কুঁচকে তাকায়, এরপর আদিল খুব নরম ও কোমল কন্ঠে বলে,
“মে আই।”
ফারিবা কিছু মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। চারপাশে একবার তাকাল সে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সে দ্বিধায় পড়ে গেছে। ফারিবার মাথায় ঘুরতে থাকে যদি কেউ খারাপ কিছু ভাবে। ফারিবার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে আদিল মন খারাপ করে হাত সরিয়ে নেয়।
কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন হাজির হলো মেহজাবিন। মেয়টা এসে ফারিবাকে অনেক রিকোয়েস্ট করতে থাকে। তবে ফারিবাও নাছোড়বান্দা সেও রাজি হতে চায় না।
একপর্যায় মেহজাবিন অনেকটা জোর করেই বলে,
“আপু, প্লিজ না করবেন না, শুধু একটা ডান্সই তো কোনো সমস্যা হবে না।”
ফারিবা ভয় ও সংকোচে বলে
“মেহজাবিন আমি পারবো না যদি কেউ কিছু মনে করে।”
মেহজাবিন তার কথায় কপালে হাত দিয়ে হাসে এরপর আদিলের দিকে একবার তাকিয়ে আবার ফারিবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আরে আপু কেউ কিছুই মনে করবে না, এখানে সবাই তো ডান্স করছে, কেউই কারো আসল কাপল না, তাই চিন্তার কোনো কারণ নেই, তুমি যাও প্লিজ আপু।”
মেহজাবিন এমন ভাবে রিকোয়েস্ট করছিল যে সে কি করবে বুঝতে পারছে না, পাশে ফিরে আদিলের দিকে তাকিয়ে দেখে সে মন খারাপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। কেনো জানি লোকটার মন খারাপ দেখে ফারিবা নিজের বুকে একটু ব্যাথা অনুভব করলো।
আদিলের মন খারাপ দেখতে তার কাছে ভালো লাগছিল না, এইতো একটু আগেও লোকটা আজ মন খুলে হাসছিল, আর এখন তার কারণে মন খারাপ করে আছে। সে চাইছে না আদিলের মন খারাপের কারণ হতে।
তাই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই ধীরে ধীরে নিজের হাতটা এগিয়ে দিল সে। ফারিবাকে হাত এগোতে দেখে সাথে সাথে তার হাত ধরে ফেলে আদিল। ফারিবার হাত নিজের হাতে পেতেই আদিলের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পরতে শুরু করে।
কিন্তু বাইরে থেকে তাকে আগের মতোই শান্ত দেখাচ্ছিল। তার ভেতরে যতোই খুশির জোয়ার বয়ে যাক না কেনো, সে বাহির থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না, আগের মতোই স্বাভাবিক থাকে, শুধু মাত্র একটু মৃদু হাসি ফুটিয়ে রাখে।
এরপর দুজন ধীরে ধীরে ডান্স ফ্লোরের দিকে এগিয়ে গেল। মেহজাবিন খুব খুশি হলো তার ভাইয়ের জন্য। দূর থেকে তন্ময় আদিল আর ফারিবার ডান্স করার দৃশ্য দেখতে লাগলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থেকে সে চোখ ফিরিয়ে নিল। তার খারাপ লাগছে খুব, তার পছন্দের মানুষটাকে অন্য একজনের সাথে দেখতে। তবে সে আপাতত নিরুপায়, কারণ সে তার মনের কথা ফারিবাকে জানাতে পারেনি।
সে মনমরা হয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে একদম চুপচাপ, আর একটা বারের জন্যও সেই দিকে তাকায়নি।
তাকে চুপচাপ থাকতে দেখে তার সামনে এসে দাঁড়াল মেহজাবিন মুখে সেই চিরচেনা হাসি।
তন্ময় খেয়াল করল, কেউ একজন এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। পাশ ফিরে তাকাতেই মেহজাবিনকে দেখতে পেল সে।
এমেরাল্ড গ্রিন শাড়িতে আজ মেয়েটাকে সত্যিই অন্যরকম লাগছে। সাধারণত চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো আজ খোলা। আর সেই চোখেই যেন অদ্ভুত এক মায়া লুকিয়ে আছে।
কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে রইল মেহজাবিনের দিকে। তারপর হঠাৎ করেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে মনে মনে বলল,
<আমি এসব কি ভাবছি?>
মনে মনে নিজেকেই ধমক দিল সে। এমনিতেই মাথার ভেতর হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, তার মাঝে নতুন করে আর কোনো ভাবনার জায়গা নেই।
নিস্তব্ধ কাটিয়ে মেহজাবিন তন্ময় কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এইয়ে পেঁচামুখো, কি হয়েছে আপনার বলুন তো, মুখটাকে এমন বাংলা পাঁচ করে রেখেছেন কেনো।”
কথাটা বলেই মেহজাবিন মুখ চেপে হাসতে থাকে, তন্ময় প্যান্টর পকেটে একহাত রেখে অন্য হাত দিয়ে চুল ঠিক করতে করতে বলে,
“কিছু হয়নি আমি ঠিক আছি।”
“আপনি ঠিক আছেন বলে তো মনে হচ্ছে না, এমনি তো সবসময় আমাকে অনেক বিরক্ত করেন, রাগিয়ে দেন কিন্তু আজকে আপনি একদম চুপচাপ কেনো বলুন তো।”
মেহজাবিনের কথা শুনে তন্ময় আবারও তার দিকে তাকায় কিছুক্ষন পর চোখ সরিয়ে বলে,
“আসলে বেশ কিছুদিন বাসায় কাটিয়েছিতো তাই হয়তো, কিন্তু আমি ঠিক আছি কিছু হয়নি।”
তন্ময়ের কথাগুলো কেমন অগোছালো মনে হলো মেহজাবিনের কাছে কিন্তু সে কিছু মনে করলো না। হঠাৎ করে সে নিজের হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“তাহলে চলুন আমরাও সবার মতো একটু তাল মিলিয়ে নেচে উঠি, আমার মনে হচ্ছে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।”
তন্ময় মেহজাবিনের এহন প্রস্তাবে অবাক হলো, তার মন কিছুতেই রাজি হচ্ছে না, সে তো ফারিবার সাথে গানের তালে নাচতে চেয়েছিল। তন্ময় চুপ করে রইলো প্রথমে কিছু বলল না। তবে একবার দূর থেকে আদিল আর ফারিবার দিকে তাকাল।
তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে আবারও মেহজাবিনের দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখে তখন একরাশ প্রত্যাশা। তন্ময় মৃদু হেসে বলল,
“ঠিক আছে চলুন ম্যাডাম।”
এরপর তার হাতটা ধরে ডান্স ফ্লোরের দিকে এগিয়ে গেল।
নরম সুরের একটা গান ভেসে চলেছে চারপাশে। আদিল আর ফারিবা ধীরে তালে তাল মিলিয়ে চলছিল।
ফারিবা বেশিরভাগ সময় নিচের দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু মাঝেমধ্যে অজান্তেই তার চোখ চলে যাচ্ছে আদিলের দিকে। আর প্রতিবারই চোখাচোখি হতেই ফারিবার বুক কেঁপে উঠছে তাই সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
কিন্তু আদিল কেমন একঘোরে তাকিয়ে ছিল ফারিবার দিকে। যেন চারপাশের সবকিছু ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেছে তার কাছে। সেই মুহূর্তে তার সমস্ত মনোযোগ আটকে ছিল শুধু একজন মানুষের উপর। এমনভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন এই ছোট্ট মুহূর্তটুকু নিজের স্মৃতিতে যত্ন করে ধরে রাখতে চায় সে।
অন্যদিকে...
মেহজাবিন আর তন্ময়ও গানের তালে নিজেদের মিলিয়ে নিয়েছে, মেয়েটা নাচের তালে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল তন্ময়ের দিকে।
কিন্তু তন্ময়ের দৃষ্টি বারবার হারিয়ে যাচ্ছিল অন্য কোথাও। তার কোনো খেয়াল ছিলনা সামনে থাকা মেয়েটার দিকে, তার দৃষ্টি আটকে ছিল ফারিবার দিকে। ফারিবাকে এত সুন্দর ভাবে আদিলের সাথে কমফোর্ট দেখতে তার খারাপ লাগছিল।
মেহজাবিন বিষয় টা লক্ষ্য করে যে তন্ময় এর মন অন্য কোথাও আটকে আছে। কথাটা ভাবতেই মেয়েটার বুক কেঁপে ওঠে, নিজেকে স্বাভাবিক রেখে সেই তন্ময়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই দেখল, তন্ময়ের চোখ থেমে আছে আদিল আর ফারিবার ওপর।
এক মুহূর্তের জন্য তার আত্মা কেঁপে উঠল। সে এতদিন শুধু সন্দেহ করেছিল তবে আজ কি তার সন্দেহ সত্যি তে পরিনত হবে। কথাটা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা হালকা ব্যথা অনুভব করলো।
তবুও পরের মুহূর্তেই সে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে আবার তন্ময়ের দিকে তাকাল। যেন কিছুই হয়নি।
আর হলরুমের আরেক পাশে আবির আর তামান্নাও নিজেদের মতো করে মুহূর্তটা উপভোগ করছিল। তামান্নার দিকে তাকিয়ে আবির মুচকি হেসে কানের কাছে কিছু বলতেই তামান্না হেসে ফেলল।
চারপাশে আলো, সুর আর হাসির ভিড়। কিন্তু একই ডান্স ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি হৃদয়ের অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কেউ ভালোবাসার কাছে হার মানছিল। কেউ ভালোবাসা হারানোর ভয় পাচ্ছিল। কেউ আবার ভালোবাসতে শুরু করেছিল। আর কেউ এখনো বুঝতেই পারেনি, সে ধীরে ধীরে কারো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠছে।
-----------------------------
রাত অনেকটা গভীর হতে শুরু করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পার্টির আমেজটাও যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে হাসি, আড্ডা আর মিউজিকের শব্দে পুরো হলরুম মুখরিত ছিল, এখন সেখানে বিদায়ের ব্যস্ততা দেখা দিয়েছে।
একে একে সবাই নিজেদের গন্তব্যে ফিরতে প্রস্তুত হচ্ছে। কেউ শেষবারের মতো বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, কেউ স্মৃতির জন্য কয়েকটা ছবি তুলে রাখছে। আর এই সবকিছুর মাঝেই অজান্তে শেষ হয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার সবচেয়ে সুন্দর কিছু মুহূর্ত।
ফারিবা আর মেহজাবিন একসাথে দাঁড়িয়ে অতিথিদের বিদায় জানাচ্ছে। তবে কাজের মাঝেও বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে মেহজাবিন। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল তন্ময়ের সেই দৃষ্টি, যে দৃষ্টিতে সে পুরো সন্ধ্যা জুড়ে একমনে শুধু ফারিবাকেই দেখেছে।
এতদিন ধরে মনে লুকিয়ে রাখা সন্দেহটা আজ যেন পুরোপুরি সত্যি হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল তার।
মেহজাবিন একবার পাশ ফিরে ফারিবার দিকে তাকাল। মেয়েটা সবার সঙ্গে খুব মিষ্টি করে কথা বলছে, বিদায় জানাচ্ছে। অজান্তেই তার ঠোঁটে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠল।
সত্যি বলতে, ফারিবার মাঝে এমন এক মায়া আছে, যা সহজে উপেক্ষা করা যায় না। কখনো কখনো সে নিজেও মেয়েটার ব্যক্তিত্ব আর কোমল ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে যায়। তাহলে তন্ময় কেন হবে না?
তন্ময় যে ফারিবাকে পছন্দ করে, সেটা এখন আর বুঝতে বাকি নেই তার। আশ্চর্যের বিষয়, এই সত্যিটা জানার পরও ফারিবার প্রতি তার কোনো রাগ জন্মায়নি। কারণ এখানে ফারিবার কোনো দোষ নেই।
বরং সমস্ত অভিমান যেন জমে আছে নিজের প্রতি। সে একমনে নিজেকেই প্রশ্ন করছে।
কেন সে এমন একজন মানুষকে ভালোবেসে ফেলল, যার চোখে অন্য কারও জন্য এতটা মুগ্ধতা লুকিয়ে আছে?
কেন সে নিজের মনকে সামলাতে পারল না, যখন শুরু থেকেই কোথাও না কোথাও সত্যিটা বুঝতে পেরে সন্দেহ করেছিল?
উত্তরগুলো তার জানা নেই।
শুধু এটুকু জানে, বুকের ভেতরটা আজ অদ্ভুত রকমের কষ্টে ভরে উঠছে। আর সেই কষ্টটা কাউকে দেখানোর মতো সাহসও তার নেই।
মেহজাবিনের এই মুহূর্তে বুক ফেঁটে কান্না পাচ্ছে কিন্তু তার এই আর্তনাদ চাপা কান্না সব কিছু বুকের গভীরে চাপা পরে রইল। খুব কষ্ট করে মুখে হাসি ফুটিয়ে সবার সাথে কথা বলে বিদায় জানায়।
প্রায় সব অতিথিই বিদায় নিয়ে চলে গেছে। বিশাল হলরুমে এখন আর আগের মতো কোলাহল নেই। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ শুধু বাকি রয়েছে, তারাও একে একে নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছে।
একপাশে ফারিবা, মেহজাবিন, তামান্না, আবির আর সাবরিনা শান্তা একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল। সন্ধ্যার দীর্ঘ আয়োজনের পর সবাই যেন একটু ক্লান্ত, একটু নীরব।
আর তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল তন্ময় আর আদিল। দুজনের মাঝেও কোনো কথা নেই। চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। এই নিরবতা কাটিয়ে মেহজাবিন আদিল কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ভাই এখনতো সবাই চলে গেছে, আর কোনো কাজও বাকি নেই। আমি কি এখন চলে যেতে পারি, আমার অনেক ক্লান্ত লাগছে, আর মাথাটাও ধরেছে বেশ।”
আদিল চিন্তিত মুখে মেহজাবিন এর দিকে এগিয়ে আসে, পরম যত্নে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
“তোর কি শরীর খুব খারাপ লাগছে, ডক্টরের কাছে নিতে হবে।”
মেহজাবিন আদিলকে চিন্তিত দেখে নিজের স্বাভাবিক রেখে বলে,
“না ভাই তুমি অযথা চিন্তা করো না তো। তুমি তো জানো আমার মাথা ব্যাথার সমস্যা আছে, তার মধ্যে চশমা পরিনি তো আজকে। আর বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিলেই আমি ঠিক হয়ে যাব।”
“সিওর।”
“একদম সিওর।”
কথাটা বলে মেহজাবিন মুচকি হাসে, বোনের হাসি দেখে আদিলের মুখেও হাসি ফুটে ওঠে। আদিল যেই কিছু বলতে যাবে তার আগে মেহজাবিন সাবরিনা শান্তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“শান্ত আপু তোমার বাড়ি তো আমার হোস্টেলের পাশেই তুমি আমাকে ড্রপ করতে পারবে।”
“হ্যা অবশ্যই পারবো।”
আদিল মেহজাবিনের কথা শুনে বলে,
“হোস্টেলে যেতে হবে কেনো আমার সাথে বাড়িতে চল, আর এমনিতেও অনেক রাত হয়ে গেছে, হস্টেলের গেইট তো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।”
মেহজাবিন কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে,
“না ভাই সমস্যা নেই আমি আসার আগে গার্ড আঙ্কেল কে বলে এসেছি আমার আসতে দেরি হবে। উনি বলেছে সমস্যা নেই।”
আদিল ভ্রু কুঁচকে বলে,
“একদিন হোস্টেলে না গেলে কি হবে, তুই আমার সাথে চল মামোনি তোর যত্ন করলে তুই ঠিক হয়ে যাবি।”
মেহজাবিন এখন এই মুহূর্তে আদিলের সাথে যেতে চাইছে না কারণ তার মনের অবস্থা ভালো নেই, সে কিভাবে তার ভাইয়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার নাটক করবে। একটা সময় ধরা পরেই যাবে তাই আজ রাতটা অন্তত নিজের মতো একা কাটাতে চায় সে।
আদিলের কথা শেষ হতেই মেহজাবিন নাটকিয় ভঙ্গিতে বলল,
“আহা ভাই আমি তো কালকের প্রজেক্টের ইমপোর্টেন্ট ফাইল গুলো সব হোস্টেলে রেখেছি, ওইগুলো তো কালকেই লাগবে। আমার যেতেই হবে তুমি না করো না, আর শান্ত আপুর বাসাও ওইদিকে, আমি আপুর সাথেই চলে যাচ্ছি।”
মেহজাবিন এমন ভাবে বলল যে আদিল তার কথার পৃষ্ঠে আর কিছু বলতে পারলো না। শুধু ছোট করে বলল সাবধানে যেতে আর পৌঁছে কল করে জানাতে। মেহজাবিন মুচকি হেসে সম্মতি দিল।
শান্তা ফারিবাকেও সাথে নিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু মেহজাবিন বাঁধা দিল, বললো ফারিবার বাড়ি উল্টো দিকে তাই সে সাথে গেলে তাদের দেরি হয়ে যাবে। ফারিবাও কিছু মনে করলো না তাদের চলে যেতে বলে।
শান্ত আর মেহজাবিন বেড়িয়ে যাওয়ার পরপরই তন্ময় ফারিবার সামনে এসে বলে,
“মিস. ফারিবা আপনি না হয় আমাদের সাথে চলুন আমরা আপনাকে পৌঁছে দিব।”
ফারিবা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আদিল তাদের সামনে এসে বলে,
“তন্ময় সাহেব আপনাদের কষ্ট করতে হবে না, আপনারা সবাই অনেক ক্লান্ত আর কাল থেকে অফিসও জয়েন করতে হবে, তাই আমার মনে হয় আপনাদের বাড়ি গিয়ে রেস্ট করা উচিত।”
তন্ময় মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলে,
“আমাদের নিয়ে চিন্তা করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আমাদের মতো মিস. ফারিবারও রেস্ট করার অধিকার আছে তাই আমরা উনাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চাই।”
তন্ময় এর কথা শুনে আদিল একভ্রু উঁচু করে বলে,
“অবশ্যই নিয়ে যেতেই পারেন তবে আমার উনার সাথে প্রজেক্ট নিয়ে একটা ইম্পরট্যান্ট কথা আছে আর আমি চাচ্ছি যেতে যেতে আমরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। তাই আপনারা চলে যান আমি মিস. ফারিবাকে সেফলি পৌঁছে দিব।”
তন্ময় আদিলের কথার পাল্টা উওর দিতে যাবে ঠিক সেই সময় আবির পাশ থেকে বলে,
“ঠিক আছে স্যার আপনি মিস. ফারিবাকে পৌঁছে দিন, আমরা তিনজন একসাথে চলে যাচ্ছি। তন্ময় সাহেব চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আবিরের কথায় তন্ময়ের প্রচন্ড রাগ হলো কিন্তু প্রকাশ করলো না, তন্ময় চোয়াল শক্ত করে আদিলের দিকে তাকিয়ে রইলো। আর আদিলের ঠোঁটের কোণে হালকা এক বিজয়ী হাসি ফুটে উঠল। তাদের দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফারিবা সবটাই পর্যবেক্ষণ করলো।
তন্ময় শেষবারের মতো একবার ফারিবার দিকে তাকাল। তার চোখে যেন হাজারটা না বলা কথা জমে আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে কিছুই বলল না। ধীরে ধীরে আবির আর তামান্নার সঙ্গে সেখান থেকে চলে গেল।
ফারিবা কয়েক মুহূর্ত তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কেন জানি আজ তন্ময়ের আচরণ বারবার তার মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না, কিন্তু মনে হচ্ছে লোকটা তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল।
আর আদিল নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল।
তন্ময়ের চলে যাওয়া দেখে অজান্তেই তার ভেতরের চাপা অস্বস্তিটা কিছুটা হলেও কমে গেছে।
তবে সেই স্বস্তির কারণটা সে নিজেও খুঁজে পেল না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল ফারিবার ওপর। মেয়েটা এখনও চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
চারপাশের সবকিছুর মাঝেও যেন নিজের ভাবনার জগতেই হারিয়ে গেছে মেয়েটা। আদিল কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। অদ্ভুত ভাবে এই অনুভূতিটা দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। অথচ সে নিজেও জানে না, ঠিক কোথায় গিয়ে থামবে তার এই অনুভূতি।
আর ফারিবা তার বুকের ভেতর অজানা এক অস্থিরতা জমতে শুরু করেছে। ঠিক কী হচ্ছে, সে বুঝতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝতে পারছে, সামনে তার জন্য সহজ কোনো মুহূর্ত অপেক্ষা করছে না।
চলবে.....
[ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন, গল্প টা কেমন লাগলো মতামত দিবেন, ধন্যাবাদ]