ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৪৮তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৪৭

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে অফিসের বাসটি তার নির্ধারিত স্থানে এসে পৌঁছেছে। বাসটা রিসোর্টের প্রধান ফটকের সামনে এসে থামল।

একটানা এতক্ষণ ভ্রমণের পর বাস থেকে নেমেই যেন সবার ক্লান্তি মুহূর্তেই কোথায় মিলিয়ে গেল। চারপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ চোখে পড়তেই প্রত্যেকের মুখে ফুটে উঠল স্বতঃস্ফূর্ত হাসি।

চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। সারি সারি পাহাড় যেন একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা কুয়াশার পাতলা চাদর এখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।

হালকা শীতল বাতাস গাছের পাতাগুলোকে দোলাচ্ছে, দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক ভেসে আসছে। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরের এই নিরিবিলি পরিবেশ যেন এক নিমিষেই সবার মনকে প্রশান্ত করে দিল।

রিসোর্টটিও ছিল দৃষ্টিনন্দন। কাঠ আর পাথরের নান্দনিক নকশায় তৈরি ভবনগুলো পাহাড়ি প্রকৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে, যেন সবকিছু একই ছবির অংশ। চারপাশে রঙিন ফুলের বাগান, ছোট ছোট পাথরের পথ, আর মাঝখানে পরিচ্ছন্ন সবুজ লন পুরো পরিবেশটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বাস থেকে নেমেই কেউ চারপাশের সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল, কেউ আবার গভীর শ্বাস নিয়ে পাহাড়ি নির্মল বাতাস বুকভরে টেনে নিল। দীর্ঘ কর্মব্যস্ত জীবনের পর এমন পরিবেশে এসে সবার মনেই যেন নতুন এক উচ্ছ্বাস জন্ম নিল।

তামান্না চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল,

“জায়গাটা ছবির থেকেও বেশি সুন্দর।”

আবির ছোট্ট করে মাথা নাড়ল। তার চোখও ঘুরে বেড়াচ্ছে চারপাশে সৌন্দর্যে। তন্ময় চারদিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“এখানে এসে মনে হচ্ছে অফিসের সব চাপ গুলো যেনো নিমেষেই গায়েব হয়ে গেছে।”

তার কথা শুনে আশপাশে কয়েকজন হেসে উঠল। মেহজাবিনও চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগল। এরপর ফোনের দিকে তাকি ফিসফিস করে বলল,

“কি ব্যাপার ভাই আর ফারিবা আপু এখনো এসে পৌঁছালো না।”

ঠিক তখনই রিসোর্টের একজন কর্মী এগিয়ে এসে সবাইকে স্বাগত জানাল। অফিসের পক্ষ থেকে আগেই সব ব্যবস্থা করা ছিল। তাই একে একে সবার লাগেজ নামানো হলো, আর রিসেপশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার প্রস্তুতি শুরু হলো।

এদিকে ঠিক সেই সময় রিসোর্টের মূল ফটক দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল পরিচিত কালো গাড়িটি। গাড়িটা ধীরে ধীরে এসে রিসোর্টের সামনে থামতেই সবার দৃষ্টি অজান্তেই সেদিকে চলে গেল।

প্রথমে নেমে এলো আদিল, গাড়ির চাবিটা পকেটে রেখে সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই গাড়ির অন্য পাশ ঘুরে দাঁড়াল। তারপর দরজা খুলে দাঁড়াতেই ধীরে ধীরে নিচে নামল ফারিবা।

চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। পাহাড়ঘেরা শান্ত পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই তার মন ছুঁয়ে গেল। গাড়ি থেকে নেমেই সুন্দর মনমুগ্ধকর পরিবেশ দেখে যেনো তার চোখ জুড়িয়ে গেলো।

দূর থেকে আদিল আর ফারিবাকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটা দেখেই মেহজাবিনের মুখে চাপা এক হাসি ফুটে উঠল। তামান্না মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“কী ব্যাপার মেহজাবিন এত হাসছো কেন?”

মেহজাবিন দ্রুত মুখটা স্বাভাবিক করে নিয়ে বলল,

“কিছু না এমনি।”

কিন্তু তার চোখের দুষ্টু ঝিলিকটা কোনো ভাবেই লুকানো গেল না। দূর থেকে তন্ময় ও ফারিবা আর আদিল কে পাশাপাশি দেখে মৃদু হাসলো, তার মনে কষ্ট হলেও সে সেটা প্রকাশ করলো না কেনোনা সব কিছুই সে মেনে নিয়েছে। আর তন্ময় চায় যার সাথেই হোখ ফারিবা অন্তত খুশি থাকুকে সুখে থাকুক।

এদিকে আদিল গাড়ির ডিকি খুলে ফারিবার ট্রাভেল ব্যাগটা নামিয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“চলো, ভেতরে গিয়ে রেস্ট করবে।”

ফারিবা মাথা নেড়ে ব্যাগটা হাতে নিল। দু'জনে পাশাপাশি হেঁটে রিসেপশনের দিকে এগিয়ে যেতেই অফিসের কয়েকজন সহকর্মী তাদের দেখে সালাম জানাল। আদিলও স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে সবার সালামের উত্তর দিল।

রিসেপশনে পৌঁছাতেই রিসোর্টের একজন কর্মী বুকিং তালিকা হাতে এগিয়ে এল।

আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করা থাকায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রুমের চাবিগুলো সবার হাতে তুলে দেওয়া হলো।

ছেলেদের জন্য আলাদা কটেজ, আর মেয়েদের জন্য আলাদা কটেজ বরাদ্দ ছিল। ফলে সবাই নিজেদের লাগেজ নিয়ে নির্ধারিত কক্ষের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর পুরো রিসোর্ট জুড়ে যেন এক ধরনের নীরবতা নেমে এলো।

দীর্ঘ পথের ক্লান্তি নিয়ে সবাই নিজ নিজ রুমে চলে গেছে। কেউ ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে, কেউ আবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহাড়ি প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে। খাবার খাওয়ার আগে কয়েক ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে সবাইকে।

ফারিবাও নিজের রুমে ফিরে দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। ট্রাভেল ব্যাগটা এক পাশে রেখে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। মুখে ঠান্ডা পানির ছোঁয়া লাগতেই দীর্ঘ পথের ক্লান্তিটা যেন অনেকটাই কমে গেল।

ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেহজাবিনকে দেখে ফারিবার মুখে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। মেহজাবিন কে দেখে ভেতরে আসতে বলল। মেহজাবিনও ঢুকেই বিছানার ওপর বসে, ফারিবাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“উফ আপু জানো না কী জার্নি টাই না হয়েছে! বাসে তো একদম হইচই লেগেই ছিল। তন্ময় সাহেব আর আবির সাহেব মিলে এমন কাণ্ড করেছে যে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেছে। অনেক মজা করেছি আমরা, দীর্ঘ একটা পথ যে পাড়ি দিয়ে এলাম মনেই হয়নি।”

ফারিবা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,

“তোমরা তো তাহলে অনেক মজা করেছ?”

“হ্যা আপু অনেক, তবে সত্যি কথা বলতে মাঝেমধ্যে তোমার কথা মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম তুমি থাকলে আরও ভালো লাগত। খুব মিস করেছি তোমাকে।”

কথাটা বলেই মেহজাবিন কৌতূহলী চোখে ফারিবার দিকে তাকাল আবারও বলতে শুরু করে,

“আচ্ছা বলো তো, তোমাদের জার্নি কেমন হলো?”

প্রশ্নটা শুনে ফারিবা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“ভালোই ছিল।”

“শুধু ভালোই ছিল?”

মেহজাবিন ঠোঁট টিপে হাসে বলল,

“ভাই নিশ্চয়ই পুরো রাস্তা সিরিয়াস মুখ করে গাড়ি চালিয়েছে? একটু কথা বলেনি ণাই না। আমার ভাইটা না কেমন জানি একদম একরোখা।”

ফারিবা অজান্তেই হালকা হেসে বলল,

“মোটেও না, বরং উনি আজ অনেক কথা বলেছেন, গল্প করেছেন এরপর মাঝপথে একটু বিরতি নিয়েছিলাম। তারপর নাস্তা করে আবার চলে এসেছি।”

“ওহ, তাই নাকি। তহলে তো ভাই কে সব জায়গায় তোমাকে সাথে করেই পাঠাতে হবে কি বল।”

মেহজিবিনের কথা শুনে ফারিবা চুপ করে রাইলো, এরপর মেহজাবিনের চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে উঠলেও সে আর কিছু বলল না। শুধু মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার ছোট্ট পরিকল্পনাটা অন্তত বৃথা যায়নি।

আর ফারিবা সে অজান্তেই আসার পথের কথাগুলো মনে করে মুচকি হাসে। এরপর মেহজাবিনের সাথে অনেক গল্প করে। আর সে এখনো বাসে ঘটে যাওয়া ছোট ছোট মজার ঘটনাগুলো বলেই চলেছে, আর ফারিবা মাঝে মাঝে হাসিমুখে সেগুলো শুনছে।

রুমের জানালার বাইরে পাহাড়ি বাতাস নরম পর্দাগুলো দুলিয়ে দিচ্ছে। সেই শান্ত পরিবেশে দু'জনের গল্পও ধীরে ধীরে জমে উঠল।

------

এদিকে নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল আদিল।

কাঁধের ব্যাগটা সোফার ওপর রেখে কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। দীর্ঘ পথের ড্রাইভিংয়ের ফলে শরীরে ক্লান্তি থাকলেও আজ তার মনটা অদ্ভুত রকমের হালকা লাগছে।

ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বারান্দার কাঁচের দরজাটা খুলে দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি শীতল বাতাস এসে মুখে লাগল। দূরে সারি সারি সবুজ পাহাড়, তাদের গা বেয়ে নেমে আসা সাদা মেঘের আস্তরণ আর চারপাশের নিস্তব্ধতা মুহূর্তেই মনটা শান্ত করে দিল।

দুই হাত রেলিংয়ে রেখে কিছুক্ষণ নীরবে সেই দৃশ্য দেখল আদিল। হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল গাড়ির সেই মুহূর্তগুলো। ফারিবার অবাক চোখে উপহারের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে থাকা, নিতে না চাওয়া, তারপর শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে হাতে তুলে নেওয়া। নাস্তা করা, পুরো রাস্তা জুড়ে নানান বিষয় নিয়ে গল্প করে, প্রতিটা দৃশ্য যেন এখনও স্পষ্ট ভেসে আছে তার চোখে।

অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মনে মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, যে ফারিবা কি গিফট টা খুলে দেখেছে কি না।

পরক্ষণেই নিজেই মাথা নেড়ে হালকা হেসে ফেলল। মনে মনে ভাবলো হয়তো এখনি খুলবে না, হয়তো নিযবে সবার আড়ালে বসে খুলে দেখবে। ফারিবার স্বভাবটা সে এখন কিছুটা হলেও বুঝে গেছে। একবার কোনো কথা দিলে মেয়েটা সেটা রাখার চেষ্টা করে।

এই ভেবেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করল আদিল। কয়েক মুহূর্ত পর ফোনটা হাতে নিয়ে অফিসের গ্রুপে একটা ছোট্ট মেসেজ পাঠাল,

"সবাই নিরাপদে রুমে পৌঁছে গিয়েছেন তো? আসতে আসতে দুপুরটা পার হয়ে গেছে, তাই লাঞ্চটা বিকেলে করা হবে। সবাই একটু রেস্ট নিয়ে বিকেলে লবিতে চলে আসবেন। তারপর আমরা একসাথে সূর্যা ডুবার আগেই পাহাড়ের ওপরে গিয়ে সূর্যাস্তের সুন্দর মুহূর্তটা উপভোগ করবো।"

মেসেজটা পাঠিয়েই ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে দিল সে। তারপর আবার একবার বারান্দা থেকে দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকাল।

আজকের আকাশটা যেন অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে তার কাছে। হয়তো প্রকৃতি একই আছে, বদলে গেছে শুধু তার মনের অনুভূতিগুলো।

------

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। নির্ধারিত সময় হতেই একে একে সবাই নিজেদের রুম থেকে বেরিয়ে লবিতে জড়ো হতে শুরু করল।

দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেছে সবার। ফ্রেশ হয়ে নতুন উদ্যমে সবাই যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কেউ ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছে, কেউ সোফায় বসে গল্প করছে, আবার কেউ রিসোর্টের চারপাশটা ঘুরে দেখছে।

কিছুক্ষণ পর আদিলও নিজের রুম থেকে বেরিয়ে লবিতে এসে দাঁড়াল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল সবাই এসেছে কি না। এমন সময় মেহজাবিন আর ফারিবা পাশাপাশি হেঁটে লবিতে এসে পৌঁছাল।

তন্ময় মুচকি হেসে বলল,

“মনে হচ্ছে সবাই ভালোই বিশ্রাম নিয়েছেন। এখন কিন্তু আমি বেশ ক্ষুধার্ত, আর সহ্য করতে পারছি না।”

আবির সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,

“শুধু আপনি না তন্ময় সাহেব, আমারও একই অবস্থা।”

তামান্না হালকা হেসে বলল,

“তাহলে আর দেরি কেন? চলুন, আগে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই, তারপর আদিল স্যারের বলা অনুযায়ী ঘুরে বেড়াব।”

আদিল শান্ত গলায় বলল,

“তাহলে চলুন সবাই।”

তার কথা শেষ হতেই পুরো টিম একসঙ্গে ডাইনিং হলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

ডাইনিং হলটা ছিল বেশ প্রশস্ত। এক পাশজুড়ে বড় বড় কাঁচের জানালা, সেখান থেকে দূরের সবুজ পাহাড় আর নীল আকাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মাঝখানে সুন্দর করে সাজানো বুফে কাউন্টারে নানা রকম খাবার রাখা।

সবাই নিজেদের পছন্দমতো খাবার নিয়ে টেবিলে বসতে শুরু করল। অফিসের গম্ভীর পরিবেশের বদলে আজ সবাই অনেকটাই নির্ভার। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে হাসির শব্দ ভেসে আসছে, সবার মধ্যেই এক আলাদা প্রশান্তি কাজ করছে। নিত্যদিনের ব্যস্ততা থেকে বেশিয়ে এ যেনো এক স্বস্তি এবং আনন্দের মুহূর্ত।

ফারিবা নীরবে নিজের জন্য খাবার নিয়ে বসে পড়ল। তার ঠিক বিপরীত পাশেই বসেছে মেহজাবিন। কিছুক্ষণ পর আদিলও এসে একই টেবিলের একপাশে চেয়ার টেনে বসে চুপচাপ খাবার খেতে থাকে।

এক মুহূর্তের জন্য ফারিবার চোখ আদিলের দিকে গেল। আদিলও তাকিয়েছিল, তবে পরক্ষণেই দু'জনেই স্বাভাবিকভাবে নিজেদের খাবারের দিকে মন দিল।

কথাবার্তা চলতে লাগল সবার সঙ্গে, আর সেই প্রাণবন্ত পরিবেশের মধ্যেই শুরু হলো তাদের ট্যুরের প্রথম একসঙ্গে খাবার খাওয়ার মুহূর্ত।

------

খাওয়া শেষ করে সবাই কিছুক্ষণ লবিতে অপেক্ষা করল। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে আরও কোমল হয়ে এসেছে। রিসোর্টের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো সোনালি রোদে যেন নতুন এক রূপ ধারণ করেছে।

সবাই একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল রিসোর্টের আশপাশ ঘুরে দেখার জন্য।

রিসোর্ট থেকে বের হতেই সামনে দেখা মিললো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। পথের দু'পাশ জুড়ে সারি সারি উঁচু-নিচু সবুজ পাহাড়, ঘন বাঁশঝাড় আর নাম না জানা বুনো গাছপালা। কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসেছে লতাপাতা, কোথাও আবার রঙিন বুনো ফুলে ভরে আছে ছোট ছোট ঢাল।

বিকেলের নরম শেষ রোদ গাছের পাতার ফাঁক গলে মাটিতে ছায়া-আলোর অপূর্ব নকশা এঁকে দিয়েছে। পাহাড়ি বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে বনজ গাছের সতেজ সুবাস। শহরের ধুলোবালি আর কোলাহল থেকে বহু দূরে এই পরিবেশ যেন এক অন্য পৃথিবী।

দূরে দিগন্তজোড়া পাহাড়গুলো একটার পর একটা স্তরে সাজানো। শেষ বিকেলের আলোয় সেগুলোর রঙ কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো নীলচে, আবার কোথাও সোনালি আভায় ঝলমল করছে। পাহাড়ের বুক ছুঁয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে সাদা তুলোর মতো মেঘ।

চারপাশে ভেসে আসছে অচেনা পাখির ডাক। কোথাও আবার বাতাসে দুলে ওঠা বাঁশপাতার মৃদু সোঁ সোঁ আওয়াজ। সেই শব্দগুলো যেন প্রকৃতির নিজের সুর হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

তামান্না মোবাইল বের করে একের পর এক ছবি তুলতে শুরু করল। আবির কখনো পাহাড়ের ছবি তুলছে, কখনো পুরো টিমের। তন্ময় আর মেহজাবিনের খুনসুটি যেনো থামার নামই নিচ্ছে না। তাদের দেখে আশপাশের সবাই হাসিতে মেতে উঠেছে।

ফারিবা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে একটু সামনে চলে এলো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাহাড়ের সারি আর নিচের সবুজ উপত্যকার দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। শীতল বাতাস বারবার তার হিজাবের আঁচল উড়িয়ে দিচ্ছে। শেষ বিকেলের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখে, আর সেই আলোয় তার শান্ত মুখটা যেন আরও কোমল হয়ে উঠেছে।

এমন সময় আদিলও ধীর পায়ে তার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দু'জনের কেউই কিছু বলল না। একই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল তারা।

কারণ কখনও কখনও নীরবতাও অনেক কথা বলে দেয়। আর পাহাড়ের বুকজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সেই বিকেল যেনো ঠিক তেমনই এক নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।

------

হাঁটতে হাঁটতে সবাই পাহাড়ের একেবারে উঁচু ভিউ পয়েন্টে এসে দাঁড়াল। সামনে বিস্তীর্ণ দিগন্ত, নিচে অসংখ্য সবুজ পাহাড়ের সারি, আর তারও ওপারে ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে দিনের শেষ আলো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে উঠল।

পশ্চিম আকাশে সূর্যটা আস্তে আস্তে পাহাড়ের আড়ালে নামতে শুরু করেছে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে কমলা, সোনালি, গোলাপি আর হালকা বেগুনি রঙের অপূর্ব মিশেল। মনে হচ্ছিল, কেউ যেনো বিশাল আকাশটাকে রঙতুলি দিয়ে যত্ন করে এঁকে দিয়েছে।

দূরের পাহাড়গুলো একটার পর একটা ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে। কোথাও হালকা কুয়াশার আস্তরণ, কোথাও সাদা মেঘ পাহাড়ের গা ছুঁয়ে ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। শেষ বিকেলের আলো সেই মেঘগুলোকেও সোনালি আভায় রাঙিয়ে তুলেছে।

পাহাড়ি বাতাস আগের চেয়ে আরও ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। বাতাসের প্রতিটি স্পর্শে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পরেছে। দূরে অচেনা পাখির দলেরা নিজেদের বাসায় ফিরতে ব্যস্ত। তাদের ডানার শব্দ আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা ডাক মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা যেনো আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

কিছুক্ষণ আগেও যে টিমটা হাসি-আড্ডায় মেতে ছিল, তারাও অজান্তেই চুপ হয়ে গেল। এত সুন্দর দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে যেনো কারও মুখে কোনো কথা আসছিল না।

আবির মোবাইলটা উঁচু করে ভিডিও করতে করতে বলল,

“জীবনে অনেক সূর্যাস্ত দেখেছি কিন্তু প্রকৃতির এমন সুন্দর মিলন এর আগে কখনো দেখিনি।”

তামান্না মুগ্ধ চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে সত্যিই সবকিছু হার মেনে যায়।”

তন্ময় চারপাশে তাকিয়ে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“এই কয়েকটা সুন্দর মুহূর্তের জন্যই হয়তো মানুষ এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসে।”

মেহজাবিন ইতোমধ্যেই একের পর এক ছবি তুলছে। কখনও পাহাড়, কখনও আকাশ, কখনও পুরো টিমকে এক ফ্রেমে বন্দি করছে। মাঝেমধ্যে সবাইকে ডেকে নতুন নতুন ভঙ্গিতে দাঁড় করিয়ে ছবিও তুলছে।

ফারিবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিশ্চুপ চোখে সূর্যাস্তটা দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, দিনের শেষ আলোটা যেন ধীরে ধীরে পুরো পাহাড়কে বিদায় জানিয়ে চলে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই আদিল ধীর পায়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। কোনো কথা বলল না এমনকি কোনো প্রশ্ন ও করলো না। দু'জনই চুপচাপ প্রকৃতির সুন্দর্য দেখতে ব্যস্ত।

ডুবে যাওয়া সূর্যের শেষ সোনালি আলো এসে পড়েছে তাদের মুখে। পাহাড়ি বাতাস নীরবে বয়ে যাচ্ছে, আর চারপাশের সেই নিস্তব্ধতা যেন সময়কেও কয়েক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিয়েছে।

শেষ আলোটুকু পাহাড়ের আড়ালে মিলিয়ে যেতেই আকাশ ধীরে ধীরে গাঢ় নীল রঙে রূপ নিতে শুরু করল। একে একে জ্বলে উঠতে লাগল দূরের পাহাড়ি জনপদের ছোট ছোট আলোগুলো। সন্ধ্যার আগমনী আবহ চারপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে।

কিছুক্ষণ নীরবে সেই দৃশ্য উপভোগ করার পর আদিল সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

“চলুন সবাই, অন্ধকার হওয়ার আগেই রিসোর্টে ফিরে যাই।”

তার কথা শুনে সবাই শেষবারের মতো পাহাড় আর আকাশের দিকে তাকাল। তারপর অসংখ্য সুন্দর মুহূর্ত আর ক্যামেরাবন্দি স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে রিসোর্টের পথ ধরল।

------

রিসোর্টে ফিরে আসতেই সবার মাঝে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো। কেউ লনের দিকে চলে গেল সন্ধ্যার চা হাতে আড্ডা দিতে, কেউ ক্যামেরা নিয়ে রিসোর্টের চারপাশে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কয়েকজন আবার সুইমিং পুলের পাশে বসে গল্পে মেতে উঠল।

দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি থাকলেও নতুন জায়গার উচ্ছ্বাস যেন কাউকেই স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। হাসি, গল্প আর আনন্দে পুরো রিসোর্টটা মুখর হয়ে উঠেছিল।

অন্যদিকে ফারিবা চুপচাপ নিজের রুমের দিকে হাঁটল। রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। বড় কাঁচের জানালার ওপারে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের কালচে অবয়ব। সন্ধ্যার নরম আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় নেমে আসছে নীরবতা।

সে ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল। দীর্ঘ পথের ক্লান্তি যেন কিছুটা কেটে গেল। এরপর হালকা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বিছানার কিনারায় বসতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর রাখা ছোট্ট শপিং ব্যাগটার দিকে।

মুহূর্তেই সকালের কথা মনে পড়ে গেল। অজান্তেই ফারিবার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।

ধীরে ধীরে সে ব্যাগটা নিজের কাছে টেনে নিল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কৌতূহল কাজ করছে। খুব যত্ন করে ব্যাগ থেকে মোড়ানো প্যাকেটটা বের করল। কিছুক্ষণ প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে মোড়ক খুলতে লাগল।

মোড়ক সরাতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

ভেতরে ভাঁজ করে রাখা আছে অপূর্ব সুন্দর একটি আবায়া।

গাঢ় কালো রঙের, একদম মার্জিত ডিজাইন। হাতার প্রান্ত আর সামনের অংশে খুব সূক্ষ্ম কালো পাথরের কাজ করা। বাড়াবাড়ি কোনো চাকচিক্য নেই, অথচ দেখলেই বোঝা যায় অসাধারণ রুচি দিয়ে বেছে নেওয়া।

আবায়ার সঙ্গে সুন্দর করে ভাঁজ করা রাখা ছিল একটি নরম সিল্কের হিজাব। হালকা ধূসর আর কালোর মিশেলে তৈরি সেই হিজাবটি আবায়ার সঙ্গে যেন একদম মানিয়ে যায়।

ফারিবা নিঃশব্দে আবায়ার কাপড়ে হাত বুলিয়ে দিল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। কত সুন্দর কিন্তু তার থেকেও বেশি অবাক লাগছিল একটা বিষয় ভেবে। লোকটা কীভাবে বুঝল, ঠিক এমন ধরনের আবায়াই তার সবচেয়ে বেশি পছন্দ?

ঠিক তখনই প্যাকেটের ভেতর থেকে ছোট্ট একটা ভাঁজ করা কাগজ নিচে পড়ে গেল। ফারিবা নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে কাগজটা খুলতেই ভেতরে ছোট্ট, পরিপাটি হাতের লেখায় লেখা ছিল,

"জানি, উপহার নিয়ে তোমার মনে একটু দ্বিধা থাকতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে আমি যখন এই আবায়াটা দেখি আমার তোমার কথা মনে পরে গিয়েছিলো। তোমার রুচি আর তোমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এটা কতটা মানাবে, সেটা ভেবেই নেওয়া। যদি কখনো তোমার ভালো লাগে, নিজের ইচ্ছায় এটা পরে একদিন আমার সামনে এসো। কোনো চাপ নেই, কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই শুধু একটা ছোট্ট অনুরোধ। আমি শুধু দেখতে চাই আমি এই আবায়া দেখে যেমনটা কল্পনা করেছিলাম তোমাকে ঠিক তেমনটাই লাগে কি না। তুই যদি এইটা পরো তাহলে খুব খুশি হব।

— আদিল"

চিঠিটার শেষ লাইনটা পড়ে ফারিবা অনেকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অচেনা এক অনুভূতিতে ভরে উঠছে।

অজান্তেই তার আঙুলগুলো আবার আবায়ার নরম কাপড় ছুঁয়ে গেল।

মুখের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক টুকরো লাজুক হাসি। জানালার বাইরে তখন পাহাড়ি রাত নেমে এসেছে। আর রুমের ভেতরে, নীরবতার মাঝেই কারও অপ্রকাশিত অনুভূতি প্রথমবারের মতো নিঃশব্দে ছুঁয়ে গেল ফারিবার হৃদয়।

ফারিবা ধীরে ধীরে চিরকুটটা আবার ভাঁজ করে আগের মতোই আবায়ার ওপর রেখে দিল।

কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ বসে রইল সে। বুকের ভেতরটা আজ অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে গেছে। অনুভূতিটা ঠিক কী, তার উত্তর সে নিজেও জানে না। শুধু মনে হচ্ছে, অনেকদিন পর কেউ তার ছোট ছোট পছন্দগুলো এতটা নিঃশব্দে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

সে আবার একবার আবায়াটার দিকে তাকাল। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে কাপড়টা ছুঁয়ে দিয়ে নিজের অজান্তেই মৃদু হেসে ফেলল। তারপর খুব যত্ন করে আবায়া, হিজাব আর চিরকুটটা আবার ভাঁজ করে ব্যাগের ভেতর রেখে দিল।

বাইরে তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামার প্রস্তুতি চলছে। আর পাহাড়ের বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ছোট ছোট আলোর বিন্দু। দূর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর শীতল পাহাড়ি বাতাস জানালার পর্দাটাকে আস্তে আস্তে দুলিয়ে দিচ্ছে।

ফারিবা ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দূরের অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, এই সফরটা হয়তো শুধু কয়েকটা দিনের ভ্রমণ নয়, হয়তো এই যাত্রাই অজান্তে বদলে দিতে চলেছে তার জীবনের কিছু অনুভূতির ঠিকানা।

সেই ভাবনার মাঝেই তার ঠোঁটের কোণে আবারও ফুটে উঠল এক টুকরো অচেনা, লাজুক হাসি।

আর পাহাড়ি রাত নীরবে সাক্ষী হয়ে রইল দুটি হৃদয়ের ধীরে ধীরে কাছে আসার গল্পের...

চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন