ফন্ট সাইজ:
থিম:
আবরণ

৪৯তম পর্ব

লেখক: সাহারা জান্নাত মুমু

#আবরণ

#সাহারা_জান্নাত_মুমু

#পর্ব_৪৮

পাহাড়ি সকালের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। এখানে সূর্য ওঠার আগেই প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে নতুন দিনের জন্য নিজেকে সাজিয়ে তোলে।

ভোরের নরম কুয়াশা এখনো পাহাড়ের বুক জড়িয়ে আছে। দূরের সবুজ পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে সাদা মেঘের চাদরে মোড়ানো। শীতল বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পুরো ঘরটাকে আরও স্নিগ্ধ করে তুলছে। কোথাও অচেনা পাখির মিষ্টি ডাক, কোথাও গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু টুপটাপ করে পড়ে যাচ্ছে। চারপাশে এমন এক নীরব শান্তি, যেন পৃথিবীটা নতুন করে শ্বাস নিতে শুরু করেছে।

জানালার ফাঁক গলে আসা কোমল সূর্যের আলো এসে পড়ল ফারিবার মুখে। ধীরে ধীরে চোখ খুলতেই কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল নিজের অবস্থানটা মনে করতে। তারপর চারপাশে তাকিয়েই মনে পড়ে গেল সে এখন তার পরিচিত সেই চেনা ঘরের বিছানায় নেই, সে এখন পাহাড়ের বুকে অবস্থান করছে।

বিছানা থেকে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। চারিদিকে কি সুন্দর পরিবেশ, সামনের বিস্তীর্ণ পাহাড়গুলো সকালের আলোয় যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। পাতার ডগায় জমে থাকা শিশির, সূর্যের আলোয় ছোট ছোট মুক্তোর মতো ঝলমল করছে।

অজান্তেই গভীর একটা শ্বাস নিল সে। কিছুক্ষণ সেই দৃশ্য উপভোগ করার পর সে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। বেশ কিছুক্ষন পর বেরিয়ে এসে ট্রাভেল ব্যাগ খুলতেই হঠাৎ তার চোখ পড়ল গত রাতের সেই শপিং ব্যাগটার ওপর।

মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল আদিলের দেওয়া উপহারটার কথা, ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলে আবারও আবায়াটা বের করল। নরম কাপড়ে হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। এরপর চিরকুটের শেষ লাইনটার কথা মনে পরে গেলো, ফারিবা কিছুক্ষন আবায়াটা নাড়ে একটা মৃদু নিঃশ্বাস ফেলল। এরপর নিজের মনে কে বলল,

“আজ নয়, অন্য একদিন।”

ফারিবা আরও একবার আবায়াটার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরবে সেটার নরম কাপড়ে হাত বুলিয়ে দিল সে। তারপর খুব যত্ন করে আবায়া আর হিজাবটা আবার ভাঁজ করে আগের মতোই ব্যাগের ভেতর রেখে দিল।

একবার ভেবেছিলো আদিলের দেয়াটাই পরবে কিন্তু পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিল সে।

এরপর নিজের ট্রাভেল ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটি সুতি কামিজ, রয়্যাল ব্লু রঙের একটি আবায়া আর তার সঙ্গে মানানসই হিজাব বের করে নিল। সবকিছু গুছিয়ে বিছানার ওপর সুন্দর করে রেখে দিল সে। আবায়াটা এক পাশে রেখে কামিজটা হাতে নিয়ে ফারিবা ওয়াশরুমে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পর পোশাক বদলে বেরিয়ে এলো সে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার লম্বা, ঘন চুলগুলো আঁচড়ে সুন্দর করে একটি বেনি করে নিল।

চুল বাঁধা শেষ হলে বিছানার ওপর রাখা রয়্যাল ব্লু আবায়াটা হাতে তুলে নিল। এরপর তার সঙ্গে মিলিয়ে রাখা হিজাবটাও পরিপাটি করে মাথায় জড়িয়ে নিল।

সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরও একবার ভালো করে দেখে নিল ফারিবা। পোশাকের কোথাও কোনো ভাঁজ আছে কি না, হিজাবটা ঠিকঠাক আছে কি না সবকিছু দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে নিকাবটাও পরল।

আয়নায় নিজের সম্পূর্ণ অবয়ব দেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর ছোট্ট একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে গেল ফারিবা।

দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো ফারিবা। করিডোরের বড় জানালাগুলো দিয়ে সকালের উজ্জ্বল আলো ভেতরে এসে পড়েছে। পাহাড়ি বাতাসে চারপাশের পরিবেশটা এখনও বেশ ঠান্ডা ও স্নিগ্ধ।

করিডোরের শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই দেখতে পেল মেহজাবিন দাঁড়িয়ে আছে। ফারিবাকে দেখেই সে মৃদু হেসে এগিয়ে এলো।

“চলো আপু, সবাই নিচে চলে গেছে। নাস্তার জন্য ডাকছে।”

ফারিবা মাথা নেড়ে মেহজাবিনের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। দু'জন পাশাপাশি লবিতে এসে পৌঁছাতেই দেখতে পেল, প্রায় সবাই সেখানে উপস্থিত। কেউ সোফায় বসে গল্প করছে, কেউ আবার সকালের চা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে পাহাড়ের দৃশ্য দেখছে। তামান্না ফারিবাকে দেখেই হাসিমুখে বলল,

“সুপ্রভাত ফারিবা।”

ফারিবাও স্বাভাবিক ভাবে উত্তর দিল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদিলও তখন সবার সঙ্গে কথা বলছিল। ফারিবার কণ্ঠ কানে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই তার দৃষ্টি সেদিকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ থেমে গেল ফারিবার ওপর।

আজ ফারিবার পরনে রয়্যাল ব্লু রঙের আবায়া, সঙ্গে মানানসই হিজাব আর নিকাব। সকালের নরম আলোয় পোশাকের রঙটা আরও গভীর আর সুন্দর লাগছিল। আদিল কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। মুখে কোনো পরিবর্তন নেই, কিন্তু চোখের সেই ক্ষণিকের প্রশান্তি যেন অন্য কিছুই বলছিল। তবে আদিল মনে মনে ভেবেছিলো হয়তো ফারিবা তার দেয়া আবায়াটা পড়বে, তারপর হঠাৎ মনে প্রশ্ন এলো, সে কি উপহার টা খুলে দেখেছে, নাকি এখনো না দেখেই রেখে দিয়েছে। পরক্ষনেই নিজেকে সামলিয়ে নিলো আদিল।

এরপর আদিল সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“চলুন, নাস্তা করে নেওয়া যাক। এরপর আজকে কোথায় কোথায় যাব তা ঠিক করে বের হব।”

সবাই একসঙ্গে ডাইনিং হলের দিকে এগিয়ে গেল।

ডাইনিং হলে সকালের নাস্তায় নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। গরম পরোটা, ডিম, সবজি, ফলমূল, চা-কফি সবকিছুই সুন্দরভাবে সাজানো।

সবাই নিজেদের পছন্দমতো খাবার নিয়ে টেবিলে বসতে শুরু করল। ফারিবা মেহজাবিনের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসল। কিছুক্ষণ পর তামান্না আর আবিরও এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল।

অন্যদিকে আদিল একটু দূরের চেয়ারে বসে নাস্তা করতে শুরু করল। মাঝে মাঝে অফিসের ট্যুরের পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে তন্ময়, আবির আর কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলছিল সে। কথাবার্তার মাঝেও একবার তার দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃতভাবেই চলে গেল ফারিবার দিকে।

ফারিবা তখন নীরবে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। পাহাড়ের সকালের আলোয় তাকে আজ অন্যরকম শান্ত লাগছিল। আদিল কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আবার নিজের কথায় ফিরে গেল।

কেউ কিছু লক্ষ্য না করলেও তন্ময় বিষয় টা খেয়াল করে, এরপর মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বলে,

“যে করেই হোক স্যার আপনাদের দুজন কে আমি মিলিয়ে দিব।”

সকালের নাস্তার টেবিলটা ধীরে ধীরে গল্প আর হাসিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। আর পাহাড়ি সকালের নির্মল আলোয় তাদের ট্যুরের দ্বিতীয় দিনের শুরু হলো নতুন কিছু মুহূর্তের অপেক্ষায়।

নাস্তা শেষ করে সবাই ধীরে ধীরে ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে লবিতে এসে জড়ো হলো। সকালের রোদ ততক্ষণে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে রিসোর্টের চারপাশ আলোকিত করে তুলেছে। রাতের শীতলতা অনেকটাই কেটে গেলেও বাতাসে পাহাড়ি স্নিগ্ধতার ছোঁয়া এখনও রয়ে গেছে।

সবাই নিজেদের মতো করে একটু গুছিয়ে নিচ্ছিল। মেহজাবিন উত্তেজিত মুখে ফারিবার পাশে এসে দাঁড়াল। সে ফারিবা আর তামান্নার আজকের দিনটা কিভাবে কাটাবে তার পরি কল্পনা করছিলো।

এমন সময় আদিল লবির সামনে এসে দাঁড়াল। সবার দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

“সবাই প্রস্তুত তো?”

একসঙ্গে কয়েকজন সম্মতি জানাতেই আদিল বলল,

“তাহলে আজ একটু অন্যরকম জায়গায় যাওয়া যাক। কালকের জায়গাটা সুন্দর ছিল, কিন্তু আজকের জায়গাটা তার থেকেও বেশি সুন্দর, আমার বিশ্বাস আপনাদের সবার পছন্দ হবে।”

কথাটা শুনেই সবার মধ্যে নতুন করে উৎসাহ ছড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে একজন কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল,

“কোথায় যাচ্ছি স্যার?”

আদিলের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে উত্তর দিলো,

“গিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন।”

এর বেশি কিছু বলল না সে। তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে আবিরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“দেখছেন আবির সাহেব, আজকে আমাদের বসও রহস্য তৈরি করে ফেলেছেন।”

আবির হেসে মাথা নাড়ল। বেশ কিছুক্ষণ পর সবাই রিসোর্টের সামনে এসে দাঁড়াল। আজকের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আগেই গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে। একে একে সবাই নিজেদের জায়গা নিয়ে নিল।

ফারিবা গাড়িতে ওঠার আগে একবার পেছন ফিরে রিসোর্টটার দিকে তাকাল। পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর জায়গাটার সঙ্গে এর মধ্যেই যেন কতগুলো স্মৃতি জড়িয়ে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে বসল সে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সব গাড়ি রিসোর্ট ছেড়ে পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। আঁকাবাঁকা রাস্তার দু'পাশে ঘন সবুজ পাহাড়। কোথাও পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট ঘর, কোথাও ঘন জঙ্গল, আবার কোথাও রাস্তার একেবারে পাশে নেমে এসেছে গভীর সবুজের মেলা।

গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে ফারিবা নীরবে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছিল। পাশের সারির সিটে বসে থাকা আদিলও মাঝেমধ্যে আর চোখে ফারিবার দিকে নজর রাখছিল। একবার ফারিবার চোখের সঙ্গে তার চোখ মিলে গেল। দু'জনেই খুব স্বাভাবিকভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়িগুলো ধীরে ধীরে আরও ভেতরের দিকে এগিয়ে চলল। রাস্তার দু'পাশের দৃশ্যও যেন প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। কখনো ঘন সবুজ গাছপালার মাঝ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, আবার কখনো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দূরে হারিয়ে গেছে সরু পথ।

কিছুদূর এগিয়ে হঠাৎ গাড়ির গতি কমে এলো। একসময় গাড়িগুলো রাস্তার পাশে এসে থেমে গেল। ইঞ্জিন বন্ধ করে চালক পিছনে ফিরে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমরা গন্তব্যে চলে এসেছি। গাড়ি আর এর বেশি যাবে না। আপনারা এখান থেকে হেঁটে হেঁটে যেতে পারবেন।”

কথাটা শুনে সবাই একে একে গাড়ি থেকে নামতে শুরু করল। গাড়ি থেকে নেমেই চারপাশের পরিবেশ দেখে সবাই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল। সামনে আর কোনো পাকা রাস্তা নেই। পাহাড়ের বুক চিরে সরু একটি মাটির পথ চলে গেছে ঘন সবুজ গাছপালার ভেতর দিয়ে।

পথের দু'পাশে উঁচু উঁচু গাছ, বাঁশঝাড় আর নানা ধরনের বুনো লতাগুল্ম। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটির ওপর ছোট ছোট আলোর ছোপ তৈরি করেছে। কোথাও শুকনো পাতার স্তর, কোথাও আবার নরম মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথর।

মেহজাবিন চারপাশে তাকিয়ে একটু অবাক হয়ে বলল,

“এখান থেকে আবার হাঁটতে হবে, যদি পরে যাই?”

তন্ময় মজা করে মেহজাবিন কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ম্যাডার পরে যাওয়ার ভয়ে কি হাটবেন না নাকি। আর যদি পরেই যান তাহলে আমি তো আছি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলবেন।”

তন্ময় কথাটা মজা করে বললেও মেহজাবিনের কথাটা শুনার সাথে সাথে বুকের ভেতর মোচার দিয়ে উঠলো। তার হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই বেরে গেলো। কিছুক্ষন তন্ময়ের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইলো। এরপর তামান্নার কথায় মেহজাবিনের হুশ ফিরে এলো।। তামান্না সবার সাথে হেসে কথা বলছিল।

এরপর মেহজাবিন নিজের কণ্ঠস্বর নিচু করে ফিসফিস করে বলল,

“হাঁটতেই তো হবেই, এখন তো মনে হচ্ছে আসল সৌন্দর্যটা গাড়ির রাস্তার শেষেই শুরু হয়েছে।”

আদিল গাড়ির দরজা বন্ধ করে সামনে এগিয়ে এসে পথটার দিকে তাকাল। তারপর সবার দিকে ফিরে শান্ত স্বরে বলল,

“সাবধানে হাঁটবেন। পথটা একটু উঁচুনিচু।”

সবাই সম্মতি জানিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল।

প্রথমে পাশাপাশি হাঁটলেও কিছুদূর যেতেই সবাই নিজেদের মতো করে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ আবার ধীরে ধীরে ছবি তুলতে তুলতে হাঁটছে।

পাহাড়ি পথের প্রতিটি বাঁকা রাস্তা গুলো যেন নতুন কোনো দৃশ্যের দরজা খুলে দিচ্ছে। কখনো গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে, আবার কখনো এত ঘন সবুজ যে সামনে কয়েক হাত দূরের পথটুকুও ছায়ায় ঢেকে গেছে।

হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো পানির মৃদু শব্দ। ফারিবা হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল। সে মনোযোগ দিয়ে শব্দটা শোনার চেষ্টা করল। পাশে থাকা মেহজাবিনও শব্দটা শুনে বলল,

“আপু, মনে হচ্ছে সামনে পানি আছে!”

কথাটা শুনে সবাই একটু দ্রুত পা বাড়াল। পথটা ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে গেছে। আর যতই তারা সামনে এগোতে লাগল, পানির শব্দ ততই স্পষ্ট হতে থাকল। একটা বাঁক ঘুরতেই হঠাৎ গাছপালার ফাঁক দিয়ে সামনে খুলে গেল বিশাল এক দৃশ্য। সবাই একসঙ্গে থেমে গেল।

সামনে পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ঝরনা। ওপর থেকে পাথরের গা বেয়ে পানি নিচে পড়ছে, আর নিচে তৈরি হয়েছে ছোট্ট একটি স্বচ্ছ জলাধার। চারপাশ ঘিরে থাকা সবুজ পাহাড়, বড় বড় পাথর আর ঝরনার অবিরাম শব্দ পুরো জায়গাটাকে যেন প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো কোনো ছবির মতো করে তুলেছে।

মেহজাবিন বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো, তামান্না মুগ্ধ হয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলো। আবির ইতোমধ্যেই মোবাইল বের করে দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি করতে শুরু করেছে। তন্ময় মেহজাবিনের আসে পাশে হাটছে। আর ফারিবা কিছুই বলল না। সে শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে।

পাহাড়ি বাতাসে তার হিজাবের আঁচল আলতো করে দুলছে। চোখের সামনে এমন সৌন্দর্য দেখে তার মনে হলো, এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসাটা সত্যিই সার্থক।

কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদিলও একবার চারপাশে তাকাল। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল ফারিবার ওপর। মেয়েটার চোখে তখন শুধু বিস্ময় আর মুগ্ধতা।

আদিলের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। হয়তো এই জায়গাটা বেছে নেওয়ার পেছনে আজকের দিনের জন্য আরেকটা ছোট্ট কারণ ছিল, কাউকে কিছু না বলেও তার পছন্দের মানুষটার চোখে এমন একটা মুগ্ধতা দেখতে পাওয়া।

আর পাহাড়ের নীরবতা, ঝরনার শব্দ আর সবুজের অসীমতার মাঝে শুরু হলো তাদের ভ্রমণের আরেকটি সুন্দর অধ্যায়।

ঝরনার সামনে পৌঁছানোর পর যেন সবার মধ্যেই নতুন করে প্রাণ ফিরে এলো। দীর্ঘ পথ হেঁটে আসার ক্লান্তিটুকুও মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল সবাই। কেউ ঝরনার কাছাকাছি গিয়ে ঠান্ডা পানির ছিটে হাতে নিয়ে দেখছে, কেউ বড় বড় পাথরের ওপর বসে চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করছে। চারদিকে শুধু হাসি, গল্প আর ছবি তোলার ব্যস্ততা।

মেহজাবিন তো এক মুহূর্তের জন্যও মোবাইলটা হাতছাড়া করছে না। কখনো তামান্নার সঙ্গে ছবি তুলছে, কখনো আবিরকে দিয়ে পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছবি তুলছে।

“আবির সাহেব, এই ছবিটা কিন্তু ভালো হতে হবে। একদম সুন্দর করে তুলবেন, একটা ছবিও আমার মন মতো হচ্ছে না।”

আবির হেসে বলল,

“আপনি আগে সুন্দর করে দাঁড়ান তো ম্যাডাম, ছবি এমনিতেই ভালো আসবে।”

কথাটা শুনে তামান্না হেসে উঠল। অন্যদিকে তন্ময় আর মেহজাবিনের খুনসুটিও থামার নাম নেই। কখনো কে কার ভালো ছবি তুলেছে তা নিয়ে তর্ক, আবার কখনো একে অন্যের ছবি নিয়ে মজা করা, সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটাই যেন তাদের হাসিতে মুখর হয়ে উঠেছে।

ফারিবা একটু দূরে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। সামনে সবুজ পাহাড়ের সারি, তার বুক বেয়ে নেমে আসা ঝরনা আর মাথার ওপর নীল আকাশ সবকিছু মিলিয়ে তার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। হঠাৎ করেই মনে হলো এই পরিবেশের সাথে এক কাপ চা হলে মন্দ হতো না।

কিছুক্ষণ পর মেহজাবিন এসে তার হাত ধরে বলল,

“ফারিবা আপু, চল না। এত সুন্দর জায়গায় শুধু দাঁড়িয়ে থাকলে হবে, স্মৃতি নিয়ে ফিরতে হবে না? এখন চলো তোমারও ছবি তুলে দেই। না হলে বাড়ি ফিরে বাড়ির মানুষ কে কি দেখাবে।”

ফারিবা মৃদু আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত মেহজাবিনের সঙ্গে গিয়ে দাঁড়াল। একের পর এক ছবি তুলতে লাগল তারা। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আদিল সবার আনন্দ দেখছিল। আবার কখনো চারপাশের পাহাড়ের দিকে তাকাচ্ছিল। হঠাৎ মেহজাবিন দূর থেকে চিৎকার করে বলল,

“ভাই তুমিও আসো প্লিজ ছবি তুলি না হলে মামনি আমাকে বকে বলবে শুধু নিজেই ছবি তুলেছি তার ছেলেরটা তুলে দেইনি।”

আদিল অনেক বার নিষেধ করলো, কিন্তু মেহজাবিনের সাথে পেরে ওঠে না, মাথা নেড়ে তার মোবাইলটা বের করে দিল মেহজাবিনের হাতে। এরপর মেহজাবিনের সঙ্গে ফারিবা দাঁড়িয়ে ছিলো তখন আদিলকেও জোর করে দাঁড় করানো হলো। একসাথে কয়েকটা ছবি তুলার পর ফারিবা সরে যেতে চাইছিলো কিন্তু মেহজাবিন নিজে পরে গিয়ে ফারিবাকে আদিলের পাশে দাঁড় করি রাখে।

এরপর মেহজাবিন মৃদু হেসে তন্ময়কে ইশারা করে দুইজনের ছবি তুলে দিতে। তন্ময়ও মেহজাবিনের কথা মতো আদিল আর ফারিবাকে পাশাপাশি সুন্দর মত দাঁড়াতে বলে কয়েকটা ছবি তুলে দেয়। ফারিবার কাছে বিষয় টা অনেক অস্বাভাবিক লাগছিল তাই সে ছবি তুলবে না জানায়, কিন্তু আদিল অসহায় কন্ঠে ফারিবাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আমার সাথে ছবি তুলতে কি তোমার এতোই বিরক্ত লাগছে ফারিবা যে তুমি আমার পাশেও দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছো না।”

কথাটা শুনে ফারিবা সাথে সাথে আদিলের দিকে তাকায়, ফলে তাদের চোখাচোখি হয়। দুজন দুজনের দিয়ে অপলক তাকিয়ে ছিল, সেই সময় মেহজাবিন তন্ময় কে বলে,

“তন্ময় সাহেব পারফেক্ট মোমেন্ট চলছে, প্লিজ এই মুহূর্তের একটা ছবি তুলুন। “

তন্ময়ও সাথে সাথে কয়েকটা ছবি তুলে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,

“একদম রাজযোটক।”

তন্ময়ের কথা শুনে মেহজাবিন তামান্না আর আবিরো হেসে ফেলল। তাদের হাসির আওয়াজে ফারিবা আর আদিলের হুশ ফিরে আসে। ফারিবা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায় আর আদিল নিজের ফোনটা নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি ব্যাপার এইভাবে হাসছেন কেনো আপনারা।”

তামান্না কিছু বলতেই যাচ্ছিল তার আগেই মেহজাবিন বলে উঠলো,

“আমরা শান্তা আপুর কথা ভেবে হাসছিলাম, আবার আপুকে মিসও করছি তাই না, কি বলেন আমি ঠিক বলছি না।”

আবির মাথা নেড়ে বলে,

“জ্বি স্যা, মেহজাবিন ম্যাডাম ঠিক কথাই বলেছে।”

সাথে সাথে বাকি দুইজন সম্মতি দিল, এরপর আদিল বলল,

“আচ্ছা, হ্যা ঠিক বলেছেন মিস. শান্তা থাকলেও অনেক ভালো হতো এমন সময় উনার পারিবারিক অনুষ্ঠান পরে গেলো। আচ্ছা যাই হোক আপনারা এনজয় করুন আমি ওইদিকটায় গেলাম।”

আদিল ফোন নিয়ে চলে যেতেই তন্ময় বড় শ্বাস টেনে বলল,

“বাঁচা গেলো বাবা, না হলে আদিল স্যার জানতে পারলে আমিদের খবর ছিলো।”

কথাটা শুনে সবাই এক সাথে হেসে ফেলল। এরপর সবাই ঝরনার আশপাশটা আরও কিছুক্ষণ ঘুরে দেখল। পাহাড়ি পথ ধরে একটু ওপরে উঠল, কোথাও বসে বিশ্রাম নিল, আবার কোথাও দাঁড়িয়ে প্রকৃতির দৃশ্য দেখল। সময় যে কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, কেউই বুঝতেই পারছিল না।

বেশ আনেকটা সময় ঘোরাঘুরি করার পর একজন এসে আদিল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“স্যার অনেকটা সময় হয়ে গেছে, আর দুপুরের খাওয়ার সময়ও হয়ে গেছে। আমরা কি গাড়ির পাশে গিয়ে বলবো একটা খাবারের হোটেলে নিতে।”

কথাকা শুনে আদিলও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, তাহলে কাছাকাছি কোনো ভালো জায়গায় গিয়ে খেয়ে নেওয়া যাক।”

সবাই তাতেই রাজি হয়ে গেল। কিছুদূর এগিয়ে পাহাড়ি রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি পাহাড়ি হোটেল চোখে পড়ল। কাঠ আর বাঁশের তৈরি ছোট্ট রেস্টুরেন্টটি পাহাড়ের ঢালের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে আছে। সামনে কয়েকটি কাঠের টেবিল, পাশে ছোট্ট বাগান আর তার ওপাশেই দূর পাহাড়ের বিস্তীর্ণ দৃশ্য।

জায়গাটা দেখেই সবার খুব পছন্দ হলো, এমন একটা জায়গায় ঘুরতে এসে যদি লোকাল কোনো হোটেলে না খাওয়া হয় তাহলে কি চলে। সবাই ভেতরে ঢুকে জানালার পাশে কয়েকটি টেবিল জুড়ে বসে পড়ল, তবে সবাইকে জায়গা দিতে পারলো না তাই বাহিরে বসার ব্যবস্থা করে দেয়া হলো।

হোটেলের ভেতরটাও ছিল বেশ সাধারণ, কিন্তু পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। কাঠের দেয়াল, বাঁশের তৈরি সাজসজ্জা আর জানালার ওপারে সবুজ পাহাড় সব মিলিয়ে বেশ সুন্দর একটা আবহ। কিছুক্ষণ পর একে একে খাবার আসতে শুরু করল।

গরম ভাতের সঙ্গে তরকারি, পাহাড়ি শাক, দেশি মুরগির ঝোল, শুটকি ভর্তা আর নানা ধরনের ভর্তা খাবারের গন্ধেই যেন সবার ক্ষুধা আরও বেড়ে গেল। তামান্না আগ্রহ নিয়ে বলল,

“আজ কিন্তু একদম আসল পাহাড়ি খাবার খাওয়া হবে।”

সবাই নিজেদের পছন্দমতো খাবার নিয়ে নিল।

মেহজাবিন প্রথমে একটু একটু করে সবকিছু নিয়ে স্বাদ নিতে শুরু করল। তারপর চোখ বড় বড় করে বলল,

“আরে ভর্তা গুলো তো বেশ মজার!”

তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“দেখেছেন ম্যাডাম আপনাকে একটু আগেই বললাম না পাহাড়ি খাবারের মজাই আলাদা।”

ফারিবাও নীরবে নিজের প্লেটে অল্প অল্প করে খাবার নিল। পাহাড়ি খাবারের স্বাদ তার কাছে নতুন হলেও বেশ ভালো লাগল। সে খেতে খেতেই জানালার বাইরে তাকাল।

রেস্টুরেন্টের কাঠের জানালা দিয়ে দূরের পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছে। মেঘের ছায়া ধীরে ধীরে পাহাড়ের গায়ে সরে যাচ্ছে, আর ঠান্ডা বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পরিবেশটাকে আরও আরামদায়ক করে তুলছে।

আদিল নিজের খাবার খেতে খেতে একবার ফারিবার দিকে তাকাল। দেখতে পেলো ফারিবা এক কোনায় বসে ছোট করে লোকমা নিয়ে তার নিকাবটা হালকা উঠিয়ে তার আড়াল থেকেই খাবার খেয়ে নিচ্ছে। হঠাৎ করেই ফারিবার সাথে ছবি তোলার মুহূর্তটা মনে পরে গেলো। আর অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে।

আজকের দিনটা হয়তো সবার জন্যই আনন্দের, কিন্তু কারও কারও কাছে এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো হয়তো আরও একটু বেশি বিশেষ হয়ে উঠছে। খাওয়া শেষ করে সবাই পাহাড়ি চা অর্ডার করল। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তারা আবার গল্পে মেতে উঠল।

বাইরে তখন পাহাড়ি বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে এসেছে। আর পাহাড়ের বুকের সেই ছোট্ট হোটেলে বসে তাদের হাসি-আড্ডায় দুপুরটা ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে এগিয়ে চলল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই কিছুক্ষণ সেই পাহাড়ি হোটেলের সামনের খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। ঠান্ডা বাতাসে গরম চায়ের শেষ চুমুকটা যেন মুহূর্তটাকে আরও উপভোগ্য করে তুলল।

আদিল চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল,

“চলুন, এখনো অনেকটা সময় আছে। কাছাকাছি আরও দু-একটা জায়গা ঘুরে দেখা যাক। তারপর সূর্যাস্তের সময় আজকেও একটা সুন্দর ভিউ পয়েন্টে যাব।”

সবাই একসঙ্গে রাজি হয়ে গেল। গাড়িগুলো আবার পাহাড়ি পথ ধরে চলতে শুরু করল। কিছুদূর এগিয়ে তারা এমন একটি জায়গায় এসে থামল, যেখান থেকে নিচে পুরো পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল।

গাড়ি থেকে নেমেই সবাই ছড়িয়ে পড়ল। সামনে কোনো বড় স্থাপনা নেই, নেই মানুষের ভিড়। শুধু বিস্তীর্ণ সবুজ পাহাড় আর তার মাঝ দিয়ে সরু নদীর মতো বয়ে যাওয়া একটা জলধারা।

আবির সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল বের করে বলল,

“এই জায়গাটা তো একদম ছবির মতো, যেমনটা থ্রিডি সিনারিও পিকচারে থাকে, একদয তোমন তাই না।”

তামান্না হেসে বলল,

“ঠিক বলেছেন তবে ছবির মতো না, ছবির থেকেও সুন্দর।”

মেহজাবিন আর তন্ময় এক সাথে প্রাকৃতিক এই সুন্দর দৃশ্যগুলো উপভোগ করছে। এখানে আসার পর থেকে যেন তন্ময় আর মেহজাবিনকে এক সাথেই বেশি দেখা যায়। কখনো খুনসুটি করে, কখনো একে অপরের কথায় হাসে, কখনো একে অপরের ছবি তুলে দেয়া আড্ডা দেয়া পাশাপাশি ঘুরে বেরানো। মেহজাবিন যেন প্রতিটা মুহূর্ত খুব সুন্দর ভাবে উপভোগ করছে।

আবারও না চাওয়ার পরেও সে তন্ময়ের প্রতি দূর্বল হয়ে পরছে। তার ভয় হয় সে আবারও কষ্ট পাবে না তো। নাকি এইবার তার ইচ্ছে তার ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে।

ফারিবা আর আদিলও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশ উপভোগ করছে। মাঝে মধ্যে আদিল কিছু কথা বলছে আর ফারিবা তার উত্তর দিচ্ছে। হঠাৎ আদিল ফারিবাকে জিজ্ঞেস করলো,

“ফারিবা তুমি উপহার টা কি খুলে দেখেছো।”

ফারিবা শান্তস্বরে বলল,

“জ্বি, আবায়া টা অনেক সুন্দর ধন্য…”

ফারিবা কথা শেষ করার আগেই আদিল বলতে শুরু করলো,

“তুমি দেখেছো, তোমার পছন্দ হয়েছে এটাই আমার কাছে অনেক। তাই বলে তোমাকে ধন্যবাদ দিতে হবে না। যদি ইচ্ছে হয় একদিনো পরে এসো তাতেই আমার ধন্যাবাদ পাওয়া হয়ে যাবে।”

ফারিবা একবার আদিলের দিকে তাকালো, একটুর জন্য নয় অনেকটা সময় নিয়ে তাকিয়ে দেখলো লোকটাকে। ফারিবা যেন এই মানুষটাকে যত দেখে ততই অবাক হয়। ফারিবা ভেবে পায় না এই মানুষ টা কি সত্যিই এমন নাকি তার সামনে এমন থাকার অভিনয় করে। তবে ফারিবা যে মানুষটার এমন ব্যবহার আচরণ দেখেই তার প্রেমে পরতে বাধ্য হয়েছে।

আরো বেশকিছু সময় কাটানোর পর সবাই আবার গাড়িতে উঠে বসল। কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছে গেল পাহাড়ের আরেকটি নিরিবিলি জায়গায়। সেখানে ছোট্ট একটা কাঠের সেতু পাহাড়ি ঝরনার ওপর দিয়ে চলে গেছে। নিচে স্বচ্ছ পানির ধারা, চারপাশে ঘন সবুজ গাছপালা আর সেতুর দুপাশে কাঠের রেলিং। তন্ময় সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নিচের পানির দিকে তাকিয়ে বলল,

“সত্যি বলতে, শহরে বসে এসব জায়গার কথা কল্পনাও করা যায় না।”

মেহজাবিন পাশে এসে বলল,

“আপনি দেখি এখানে আসার পর থেকে একেবার পাক্কা দার্শনিক হয়ে গেছেন।”

তন্ময় হেসে বলল,

“পাহাড়ে এসে মানুষ একটু দার্শনিক হয়ে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক ম্যাডাম।”

তন্ময়ের কথায় মেহজাবিনও হেসে ফেলল। ফারিবা সেতুর একপাশে দাঁড়িয়ে নিচের স্বচ্ছ পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। বাতাসে তার হিজাবের আঁচল বারবার দুলছিল। আদিল একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। একসময় ফারিবা অসাবধানতাবশত পা বাড়াতেই সামনে থাকা ছোট্ট পাথরটায় পা আটকে গেল। আর আদিল সঙ্গে সঙ্গে এক পা এগিয়ে এসে বলল,

“সাবধানে ফারিবা, একটু দেখে চলবে তো।”

ফারিবা নিজেকে সামলে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“জ্বি এরপরে লক্ষ্য রাখবো।”

এর বেশি কিছু না হলেও, ছোট্ট সেই মুহূর্তটুকুও যেন দুজনের মাঝের নীরবতায় নতুন একটা অর্থ রেখে গেল। কিছুক্ষণ পর সবাই আবার গাড়িতে ফিরে এল। এবার গাড়িগুলো আরও উঁচু পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। রাস্তার এক পাশে পাহাড় উঠে গেছে অনেক ওপরে, অন্য পাশে নিচে নেমে গেছে বিশাল সবুজ উপত্যকা। গাড়ির জানালা দিয়ে তাকালে মনে হচ্ছিল, মেঘগুলো যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে।

ধীরে ধীরে বিকেলের আলো নরম হয়ে আসতে শুরু করল। অবশেষে তারা পৌঁছাল দিনের শেষ গন্তব্যে একটি উঁচু পাহাড়ি ভিউ পয়েন্টে। গাড়ি থেকে নামতেই সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল।

সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। দূরের পাহাড়গুলো বিকেলের আলোয় নীলচে হয়ে আছে। মাঝখান দিয়ে সাদা মেঘের দল ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন ধীরে ধীরে নিচে নামছে।

সবাই নিজেদের মতো করে দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই উপভোগ করছিল সেই মুহূর্ত টাকে। আর ফারিবা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল। তার সামনে বিশাল আকাশ। সূর্যের চারপাশের আলো ধীরে ধীরে সোনালি থেকে কমলা, তারপর লালচে হয়ে উঠছে।

আদিলও কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। একসময় তার দৃষ্টি আবার ফারিবার দিকে চলে গেল।

মেয়েটা নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছে।

আদিলের মনে হলো, আজকের দিনটা যতটা সুন্দর এই মুহূর্তটাও যেন তার চেয়েও বেশি সুন্দর।

মেহজাবিন দূর থেকে দুজনের দিকে তাকিয়ে তন্ময়ের কানে কানে বলল,

“দেখেছেন তন্ময় সাহেব, তার দুজন পাশাপাশি না দাঁড়িয়ে থেকেও পাশাপাশি হয়ে গেছে।”

তন্ময় মুচকি হেসে বলল,

“আমাদের কিছু করার দরকারই পড়ছে না দেখছি।”

মেহজাবিন হাসি চেপে মাথা নাড়ল। এরই মধ্যে সূর্যের শেষ অংশটুকুও পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। আকাশে রয়ে গেল লালচে-কমলা আভা। চারপাশের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যেতে লাগল।

কেউই তাড়াহুড়ো করে ফিরতে চাইছিল না। শেষবারের মতো সবাই সেই অপূর্ব দৃশ্যটা ক্যামেরায় বন্দি করল। তারপর আদিল সবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“চলুন, এবার ফিরি। অন্ধকার হয়ে আসছে। পাহাড়ি রাস্তায় অন্ধকার মানেই ভয়ংকর।”

সবাই ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

ফেরার পথে কেউ দিনের ছবি দেখছে, কেউ সারাদিনের গল্প নিয়ে হাসাহাসি করছে। মেহজাবিন বারবার নিজের তোলা ছবি দেখিয়ে তামান্নাকে জিজ্ঞেস করছে কোনটা সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে। তন্ময় আর আবিরও দিনের মজার ঘটনাগুলো মনে করে হাসছে।

ফারিবা জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে রইল। পাহাড়ের গায়ে তখন একে একে ছোট ছোট আলো জ্বলে উঠেছে। অন্ধকারের ভেতর সেই আলোগুলোকে মনে হচ্ছিল আকাশের নিচে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট তারা।

কিছুক্ষণ পর গাড়িগুলো আবার রিসোর্টের পরিচিত ফটকের সামনে এসে থামল।

সবাই একে একে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে ক্লান্তি থাকলেও প্রত্যেকের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি।

দিনের দীর্ঘ ভ্রমণ শেষ করে সবাই ধীরে ধীরে যার যার রুমের দিকে চলে গেল। আর পাহাড়ি সন্ধ্যার নরম অন্ধকারে রিসোর্টটা আবারও ডুবে গেল শান্ত, নিরিবিলি এক আবহে।

রিসোর্টে ফিরে সবাই যার যার মতো করে সন্ধ্যাটা কাটাতে শুরু করল। কেউ লনের পাশে বসে চা খেতে খেতে সারাদিনের গল্প করছিল, কেউ আবার আজকের তোলা ছবিগুলো একে অন্যকে দেখিয়ে হাসাহাসি করছিল।

মেহজাবিনও তামান্না আর আবিরের সঙ্গে বসে ছবিগুলো দেখছিল। মাঝেমধ্যে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কোনো একটা ছবি দেখে হঠাৎ করে হেসে উঠছিল।

“এই ছবিটা দেখুন, তন্ময় সাহেবের মুখটা দেখেছ?”

তামান্না ছবিটা দেখে হেসে ফেলল।

“আরে সত্যিই তো একদম এমন একটা ভাব করেছে যেন পাহাড়ের সব দায়িত্ব ওনার কাঁদে।”

কথাটা শুনে পাশে বসে থাকা তন্ময় প্রতিবাদ করে বলল,

“আপনারা কিন্তু আমাকে নিয়ে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছেন।”

সঙ্গে সঙ্গে সবাই আবার হেসে উঠল। অন্যদিকে ফারিবা একটু চুপচাপ ছিল। সারাদিনের ঘোরাঘুরি, ঝরনার শব্দ, পাহাড়ি পথ, সেই ছোট্ট হোটেল আর সূর্যাস্ত সবকিছু যেন একসঙ্গে তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল।

সে ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।

দূরের পাহাড়গুলো এখন অন্ধকারে ঢাকা। পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট আলোগুলো জ্বলজ্বল করছে। দিনের কোলাহলের পর রাতের এই নীরবতা যেন তার মনটাকেও শান্ত করে দিল।

ফারিবা আবায়া আর হিজড়া খুলে ওয়াশরুমে যায় ফ্রেশ হতে। ফ্রেশ হয়ে এসে সব কিছু গুছিয়ে রেখে বিছানায় নিজের গা এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে রাখে। চোখ বন্ধ করার পর থেকেই আজকে ঘটে যাওয়া প্রতিটা মুহূর্ত তার চোখে ভাসতে থাকে।

ঠিক তখন দরজায় হালকা টোকা পড়তেই ফারিবা একটু চমকে গেলো। সে বিছানা থেকে নেমে ধীরে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। এ্যপর দরজা খুলতেই মেহজাবিনকে দেখতে পায়। মেহজাবিন মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে,

“আপু, নিচে সবাই গল্প জুড়ে বসেছে। তুমি একা একা রুমে চলে এলে কেন?”

ফারিবা মৃদু হেসে বলল,

“একটু ক্লান্ত লাগছিল। তাই ভাবলাম একটু রেস্ট নিই।”

“চলো না, কিছুক্ষণ বসে আবার চলে আসবে। আর তোমাকে তো আজকের তোলা ছবি গুলোও দেখিনো হয়নি।”

“মেহজাবিন কিছু মনে করো না, আমার খুব খারাপ লাগছে আমি এআটু রেস্ট নেই। আর মাথাটাও ধরেছে, তুমি যাও আমি একটু পর চলে আসছি।”

মেহজাবিন চিন্তিত চোখে ফারিবার দিকে তাকিয়ে বলে,

“আরে আপু এভাবে বলছো কেনো, আচ্ছা তুমি রেস্ট করো আমি তোমার জন্য কড়া করে এক কাপ চা দিতে বলছি তুমি খেয়ে একটু ঘুম দিও কেমন যখন ভালো লাগবে তখন এসো না হলে আমি ডিনারের আগে তোমাঅএ ডেকে দিব কেমন।”

ফারিবা মুচকি হেসে বলল,

“তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মেহজাবিন।”

মেহজাবিন ফারিবাকে বিশ্রাম নিতে বলে চলে গেলো, আর ফারিবাও দরজা বন্ধ অরে বিছানায় কিয়ে আবআরো শুয়ে পরে। এপাশ ওপাশ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে তা সে টেরও পায়নি।

------

মেহজাবিন ফারিবাকে বিশ্রাম নিতে বলে ধীরে ধীরে লবির দিকে চলে এলো। লবিতে এসে দেখল, সবাই আগের মতোই গল্প আর আড্ডায় ব্যস্ত। কেউ আজকের ঘোরাঘুরির ছবি দেখছে, কেউ আবার সারাদিনের মজার ঘটনাগুলো নিয়ে হাসাহাসি করছে।

মেহজাবিন এসে সবার সঙ্গে বসতেই তামান্না স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করল,

“ফারিবা কোথায়?”

মেহজাবিন ফোনটা হাতে নিতে নিতে বলল,

“রুমে আছে একটু ক্লান্ত লাগছে বলল, আর বলল মাথাটাও ধরেছে। তাই একটু রেস্ট করবে।”

“ওহ, তাহলে ওকে রেস্ট করতে দাও।”

তামান্না আবার নিজের কথায় ফিরে গেল। এরপর মেহজাবিনও সবার সঙ্গে আড্ডায় যোগ দিল। কিছুক্ষণ পর আজকের তোলা ছবিগুলো বের করে একে একে সবাইকে দেখাতে শুরু করল। ঝরনার ছবি, পাহাড়ের ছবি, সবাই মিলে তোলা ছবি প্রতিটা ছবি নিয়েই হাসি-ঠাট্টা চলতে লাগল।

একসময় মেহজাবিন আদিলের কাছে তার ফোনটা চাইলো ছবি গুলো দেখার জন্য। আদিল কোনো প্রশ্ন না অরে ফোনটি দিয়ে দিল। মেহজাবিন গ্যালারি থেকে ছবি দেখতে থাকে আর হঠাৎ করে ফারিবা আর আদিলের পাশাপাশি দাঁড়ানো ছবিটাও স্ক্রিনে চলে এলো।

মেহজাবিন ছবিটার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসল, কিন্তু কিছু বলল না। তার পাশে বসে থাকা তন্ময়কেও দেখালো, সে ছবিটা দেখে হালকা হেসে আবার আড্ডায় মন দিল।

সব ছবি নিজের ফোনে নেয়ার পর মেহজাবিন আদিলকে তার ফোন ফেরত দিয়ে দিলো। আদিলও ফোনটা নিয়ে আজকের ছবি গুলো দেখতে থাকে, এক পর্যায়ে ফারিবার সাথের ছবিগুলো ভেপে উঠে, আর সে এক ঝলক ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবেই ফোনটা লক করে রাখে। তবে একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছে যে ফারিবা ঠিক আছে তো, মাথা ব্যাথা টা কমছে তো।

পরক্ষণেই নিজের ভাবনাটা সরিয়ে নিয়ে সে আবার সবার কথায় মন দিল।

-----

রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে এলো। রিসোর্টের চারপাশে নেমে এসেছে নীরবতা, শুধু দূরের পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝেমধ্যে ঠান্ডা বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ডাইনিং হলের আলো জ্বলে উঠতেই একে একে সবাই সেখানে জড়ো হতে শুরু করল। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর সবাই বেশ ক্লান্ত। তবুও একসঙ্গে বসে রাতের খাবার খাওয়ার সময়টুকুতে আবারও টুকটাক গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠল সবাই।

মেহজাবিন ফারিবার কথা মনে পরতেই একবার তার রুমের দিকে গিয়েছিল। দরজায় হালকা করে কয়েকবার টোকা দিয়েও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পায়নি।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে বুঝতে পারে, ফারিবা সম্ভবত গভীর ঘুমে আছে। তাই আর বিরক্ত না করে ফিরে এসেছে।

ডাইনিং হলে ফিরে মেহজাবিন শুধু বলল,

“ফারিবা আপু মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েক বার ডাকলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না। তাই আর ডাকিনি।”

কেউ বিষয়টা নিয়ে আর কিছু বলল না। সারাদিনের ক্লান্তির পর এমন ঘুমিয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

সবাই নিজেদের মতো করে খাবার নিয়ে বসে পড়ল। গরম খাবারের সুবাসে ডাইনিং হলটা ভরে উঠল। খাওয়ার ফাঁকে দিনের নানা ঘটনা নিয়ে আবারও কথা হলো।

আদিলও নীরবে সবার সঙ্গে খাবার খেল। একসময় তার মনে হলো, ফারিবা হয়তো সত্যিই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই ঘুমিয়ে থাকাটাই ভালো। খাওয়া শেষ হতে হতে রাত আরও বেড়ে গেল।

এক এক করে সবাই ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে নিজেদের কটেজের দিকে চলে গেল। সারাদিনের হাঁটাহাঁটি আর ঘোরাঘুরিতে শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই রুমে পৌঁছেই কেউ আর বেশি সময় জেগে থাকার কথা ভাবল না।

মেহজাবিনও নিজের রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তামান্না, আবির, তন্ময় সবাই যার যার রুমে ফিরে গেল।

শেষদিকে আদিলও নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করল। কিছুক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকার পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দিনের ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

ধীরে ধীরে পুরো রিসোর্টটাই নিস্তব্ধ হয়ে গেল। দিনভর মানুষের কোলাহল, হাসি-আড্ডা আর ব্যস্ততায় মুখর হয়ে থাকা জায়গাটা মুহূর্তেই যেন অন্য এক রূপ ধারণ করল। একে একে সব কটেজের আলো নিভে গেল। চারপাশে শুধু মৃদু বাতিগুলোর আলো আর পাহাড়ি রাতের গভীর নীরবতা।

দূরের পাহাড়গুলো অন্ধকারের চাদরে ঢাকা পড়েছে। মাঝে মাঝে পাহাড়ের গা থেকে ভেসে আসছে অচেনা কোনো রাতজাগা পাখির ডাক। শীতল বাতাস গাছের পাতাগুলো ছুঁয়ে যাওয়ার সময় মৃদু সোঁ সোঁ শব্দ তুলছে।

রিসোর্টের প্রতিটি ঘর তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। অথচ সেই নিস্তব্ধ রাতের বুকেই যেন লুকিয়ে আছে আরও কিছু অজানা মুহূর্ত...

চলবে…

[এটকু ব্যস্ততার জন্য ঠিক মতো পোস্ট করতে পারছি না এই জন্য দুঃখিত, তবে তারপরেও আমার পাশে থেকে এই গল্পটা পড়ারা জন্য অপেক্ষা করার জন্য সবাইকে অনেক ধন্যবাদ 🌸]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন