স্বামীর সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর নিজের দেবরের সাথে বিয়ে হয় মিরার। কেননা তখন তার কোলে ছিলো সাত মাসের শিশু সন্তান আয়ান। শশুর-শাশুড়ী তাকে মেয়ের মতো আদর করতেন। তারা কখনোই চাননি তাদের ছেলের সাথে মিরার সম্পর্কটা ছিন্ন হোক। তবে মিরার স্বামী আরহাম ততদিনে পরকীয়ায় লিপ্ত হয় অন্য নারীর সাথে। একাধিক নারী সঙ্গ তার স্ত্রী-সন্তানের প্রতি তীব্র অনিহা সৃষ্টি করেছিলো। তাই বাবা-মা'র সকল ইচ্ছে, নিজের সন্তান ও মিরার কথা না ভেবেই নিজ সিদ্ধান্তেই একপ্রকার জোর করেই ডিভোর্স দিয়ে দেয় মিরাকে।
তবে মিরার শশুর-শাশুড়ি কখনো চাচনি তাদের বংশের প্রথম সন্তান অন্য কারো হাতে যাক। তারা মিরাকে কাছ ছাড়া করতে চাননি। মেয়ে ছিলো না বলে মিরাকে তারা মেয়ের স্থান দিয়েছিলেন। ফলে মিরার বাবা-মার সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা ও নিজেদের ছোট ছেলে, যে কি-না পেশায় একজন নেভির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মিস্টার তূর্য চৌধুরী'র সাথে একপ্রকার কথা-কাটাকাটির পর এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। এতে আরহাম কোনপ্রকার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পায়নি।
তূর্য কাজের সূত্রে বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকে। যেদিন বিয়ে হয়েছিলো সেদিন মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য এসেছিলো সে। বিয়ে সম্পুর্ন হলে ফের ঢাকার উদ্দেশ্য বেড়িয়ে পরে। এরপর কেটে গেছে একটা সপ্তাহ। আর আজ মিরা নিজের গোছাগাছ করতে ব্যাস্ত। কাল রাতেই ঠিক হয়েছে মিরা ঢাকায় তূর্যের কাছে যাচ্ছে, সেখানেই থাকবে নিজের স্বামীর সাথে। এটা মূলত মিরার শশুর-শাশুড়ী আমিনুল চৌধুরী ও সুমি চৌধুরীর সিদ্ধান্ত। মিরা বাঁধা দেওয়ার সুযোগ পায়নি। আর না সে বাঁধা দিতে চায়। বাড়িতে আরহাম আছে, যার মুখোমুখি সে হতে চায়না। ডিভোর্সের পর সে বাবার বাড়িতে ছিলো। তূর্যের সাথে বিয়ে হওয়া সূত্রে ফের এখানে থাকা পরেছে। এখন এখানে থাকলে প্রতি মিনিটে তার মুখ দর্শন করতে হবে তাকে। তাই মিরাও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন কাপুরুষের মুখ দেখার চেয়ে ঢাকা চলে যাওয়া অধিকতর শ্রেয়।
বিয়ের পর পর তূর্যকে দু'একবার দেখেছিলো রমণী। কথা হয়েছে হাতে গোনা ক'বার। এবাড়িতে আসার দু'টি বছর কাটলেও তূর্যের সাথে তেমন একটা সুসম্পর্ক ছিলো না তার। কেননা প্রথম থেকেই তূর্য কাজের সূত্রে বাড়ির বাহিরে থাকতে। বছরে দু'একবার আসতো বোধহয়।
দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করে রমণী। তাকায় বিছানার উপর ঘুমে কাঁদা হয়ে শুয়ে থাকা নিজের সন্তানের পানে। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মৃদু হেঁসে ধীর হস্তে নিজের কাপর-চোপর গুছিয়ে ব্যাগে রাখে। তূর্যের বেস্টফ্রেন্ড তন্ময় তাকে নিতে এসেছে। নিচে সকলের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে সে। মিরাকে বলে দিয়েছে তারাতাড়ি রেডি হতে। এই ছেলেটাকে বেশ কয়েকবার দেখেছে মিরা। বড়ই চঞ্চল সে। মিরা ভেবে পায়না, তূর্যের ন্যায় এতো রগচটা গম্ভীর এক পুরুষের বেস্ট ফ্রেন্ড তন্ময়ের মতো একজন মানুষ কি করে হতে পারে! এ পরিবারের সাথেও তন্ময়ের বেশ সুসম্পর্ক রয়েছে। মাঝেমধ্যে তূর্যকে না জানিয়ে এ'বাড়িও চলে আসে সে। এতিম কি-না! নিজের পরিবার নেই বলেই হয়তো এই পরিবারটাকে এতো ভালোবাসে।
মৃদু হাসে রমণী। ব্যাগপত্র গুছিয়ে রেডি করতেই শাশুড়ী সুমি চৌধুরী এসে হাজির। মিরাকে দেখেই আলতো হাতে জড়িয়ে ধরেন তিনি। শাশুড়ি মায়ের স্পর্শে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে মিরার। এই মানুষটার কাছ থেকে এতদিন যে মায়াটা পেয়েছে, সেটা কোনোদিনও অস্বীকার করার মতো নয়। মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে সুমি চৌধুরী বললেন---
—সবকিছু গুছিয়েছিস তো, মা?
—হ্যাঁ, আম্মু। প্রায় সবই হয়ে গেছে।
সুমি চৌধুরী একবার তাকালেন বিছানার দিকে। যেখানে নিজের নাতি শুয়ে আছে। মৃদু হাসেন তিনি। ফের মিরাকে বলেন----
—কিছু বাদ পড়লো না তো? ওখানে গিয়ে যেন আবার বলিস না, এটা আনিনি, ওটা আনিনি।
মিরা হেসে মাথা নাড়ে। শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে বলে----
—না আম্মু। প্রয়োজনীয় সবই নিয়েছি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুমি চৌধুরী মিরার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি। তারপর মিরার গালে হাত রেখে বলেন---
—তুই আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিস না, মা। এটা তোর নিজের বাড়ি ছিল, আছে, আর থাকবে। শুধু জায়গাটা বদলাচ্ছে।
মিরার বুকটা ভার হয়ে আসে। ধীরে ধীরে শাশুড়ীর হাতের ওপর নিজের হাত রাখে সে।
—আমি জানি আম্মু।
—আর তূর্য...
কথাটা বলেই থেমে যান সুমি চৌধুরী। মিরা চোখ তুলে তাকায়।
—তূর্য একটু অন্যরকম ছেলে। ছোটবেলা থেকেই নিজের মতো থাকে। কথাবার্তা কম, রাগটা আবার একটু বেশি। কিন্তু মনটা খারাপ নয়। অতন্ত্য দ্বায়িত্বশীল সে। তবুও তোকে কষ্ট দেওয়ার মতো কিছু করলে আমাকে সঙ্গে সঙ্গে জানাবি। নিজের ভেতর জমিয়ে রাখবি না।
মিরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নাড়ে। আনমনে বলে ওঠে----
—আম্মু, আমি ওনার কাছে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে যাচ্ছি না। শুধু... আমাকে যেন নিজের মতো থাকতে দেন। আমিও ওনাকে বিরক্ত করবো না।
সুমি চৌধুরী মৃদু হাসলেন।
—সংসার এভাবে হয় না মা। দুজন মানুষ পাশাপাশি থাকলে কিছুটা জায়গা দিতে হয়, আবার কিছুটা জায়গা নিতেও হয়। তুই সময় নিস। তূর্যকেও সময় দিস।
মিরা আর কিছু বলে না। সুমি চৌধুরী এবার তার কপালে চুমু দেন।
—নিজের যত্ন নিবি। আর আমার নাতির খেয়াল রাখবি।
মিরার চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। সে মুখটা ঘুরিয়ে নেয়।
—আপনি কাঁদবেন না আম্মু। আমি তো একেবারে যাচ্ছি না... মাঝেমধ্যে আসবো।
সুমি চৌধুরী অশ্রুসিক্ত নয়নে মিরার গালে হাত রাখেন। বড় ছেলেটা হিরে চিনতে পারেনি। নিজে পছন্দ করে আরহামের জন্য মিরাকে বউ করে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। আরহাম নিজেও মিরার জন্য পাগল ছিলো। তা রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতো। অথচ কোথা থেকে কি হলো কে জানে! একাধিক নারী সঙ্গ তাকে নিজের সংসার হতে দূরে ঠেলে দিলো। সুমি চৌধুরীর বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
—তুই ভালো থাকবি। দেখে নিস।
মিরা এবার শাশুড়ীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ঠিক তখনি দরজার বাইরে থেকে তন্ময়ের গলা ভেসে আসে---
—আন্টি! আমি আর দশ মিনিট অপেক্ষা করবো। এরপর না এলে মিরা ভাবিকে তুলে নিয়ে যাবো কিন্তু!
মিরা চোখ মুছে হেসে ফেলে। সুমি চৌধুরীও হাসেন।
—এই ছেলেটার মুখ বন্ধ করার সাধ্য কারো নেই।
বলতে বলতে বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা আয়ানকে কোলে তুলে নিলেন তিনি। মিরা সেদিকে তাকিয়ে ব্যাগটা হাতে নেয়। ছোট্ট আয়ানকে নিয়ে ওখানে গিয়ে থাকাটা প্রথম দিকে অস্বস্তিকর মনে হলেও শাশুড়ীর কথার উপর ভরসা করেই মিরা পা বাড়িয়েছে। সুমি চৌধুরী চেয়েছিলেন যাতে মিরা তূর্যের আশেপাশে থাকে, তাদের সম্পর্কটা যাতে একটু উন্নতি হয়। ছোট্ট আয়ান যেনো একজন বাবা পায়। আর তাই জন্যই সবকিছু পায়ে ঠেলে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মিরা-আয়ানকে তূর্যের কাছে পাঠাবেন। তূর্য এতে বাঁধা দেয়নি। বরং অদ্ভুত নিরব থেকেছে।
সুমি চৌধুরী নাতিকে বুকে আগলে মিরার পানে তাকালেন। মিরা মিষ্টি হাসলো।
—চলুন আম্মু।
ঘর থেকে বের হতেই নিচে তন্ময়কে দেখা যায়। সোফায় বসে আমিনুল চৌধুরীর সঙ্গে বেশ জমিয়ে গল্প করছে। মিরাকে দেখেই উঠে দাঁড়ায় সে।
—অবশেষে ম্যাডাম এলেন! আমি তো ভাবছিলাম আজকে ঢাকা যাওয়া বাদ দিয়ে এখানেই রাত কাটাতে হবে।
বলতে বলতে তন্ময় গিয়ে আয়ানকে পরখ করলো। বাচ্চাটা ঘুমিয়ে গেছে দেখে আর জাগালো না। মিরা মৃদু হাসলো।
—একটু সময় লেগে গেল, ভাইয়া।
—একটু? আপনি জানেন কতক্ষণ ধরে আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছি?
সুমি চৌধুরী তন্ময়ের হাতে মিরার ব্যাগ তুলে দিয়ে বলেন----
—তুই ওকে ভালোভাবে নিয়ে যাবি, বাবা। রাস্তায় যেন কোনো অসুবিধা না হয়। আর আয়ানের একটু খেয়াল রাখবি।
—আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আন্টি। মিরা ভাবীকে নিজের বোনের মতো, আর কুচুপুকে নিজের জানের মতো করেই নিয়ে যাবো।
পাশ থেকে আমিনুল চৌধুরী চশমা ঠিক করলেন। গম্ভীর মুখে বললেন---
—আর তূর্যকে ফোন করে জানিয়ে দিস যে ওরা রওনা দিয়েছে।
—জ্বি আঙ্কেল। ওকে আগেই জানিয়েছি। ও বলেছে রাতে ফিরতে দেরি হবে।
মিরা কথাটা শুনে চুপ করে থাকে। তূর্য ফিরবে রাতে। অদ্ভুত এক অনুভূতি হয় তার। এই মানুষটার সঙ্গে বিয়ের পর কেটে গেছে এক সপ্তাহ। অথচ স্বামী হিসেবে মানুষটাকে ঠিকমতো দেখাই হয়নি তার। আজ প্রথমবারের মতো সত্যিকারের তার কাছে যাচ্ছে সে।তন্ময় মিরার দিকে তাকিয়ে বলে---
—ভাবী, চলেন।
মিরা আর কিছু না বলে সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়। ছেলেকে কোলে নেয় অতি যত্নের সহীত। সুমি চৌধুরী তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আবারও বললেন----
—পৌঁছে আমাকে ফোন করবি।
—করবো আম্মু।
—আর তূর্যকে নিয়ে ভয় পাবি না।
মিরা এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।তারপর মৃদু হেসে বলে---
—ভয় পাচ্ছি না।
গাড়িতে উঠে বসে সে। কিছুক্ষণ পর বাড়িটা পিছনে পড়ে থাকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে মিরা নিঃশব্দে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। এই বাড়িটায় তার দুই বছর কেটেছে। প্রথমে আরহামের স্ত্রী হয়ে। তারপর... তূর্যের স্ত্রী হয়ে। অথচ দ্বিতীয় পরিচয়টার সঙ্গে এখনো তার কোনো স্মৃতিই তৈরি হয়নি।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে যখন গাড়ি ঢাকার ব্যস্ত শহরের ভেতর প্রবেশ করে, তখন রাত নেমে এসেছে। তন্ময় গাড়ি থামিয়ে মিরার দিকে তাকায়।
—পৌঁছে গেছি।
মিরা জানালার বাইরে তাকায়। বড় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন। চারপাশে আলো জ্বলছে। মানুষজনের ব্যস্ততা, গাড়ির শব্দ—সবকিছুই তার পরিচিত বাড়ির পরিবেশ থেকে একেবারেই আলাদা। তন্ময় গাড়ি থেকে নেমে মিরার ব্যাগগুলো বের করে।
—চলুন।
লিফটে উঠে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ায়। আয়ান গাড়িতে ওঠার পর জেগে গেলেও এখন আবার ঘুমে কাঁদা হয়ে লেপ্টে আছে মায়ের কোলে। তন্ময় হঠাৎ বলে----
—ভাবী, একটা কথা বলি?
—হুম?
—তূর্যকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
মিরা অবাক হয়ে তাকায়। ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে অবাক কন্ঠে সুধায়----
—আমি কি ভয় পাচ্ছি?
—আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি এমন একটা মানুষের কাছে যাচ্ছেন, যে আপনাকে খেয়ে ফেলবে।
মিরার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।
—ওনি কি সত্যিই এতটা রাগী?
তন্ময় মাথা দোলায়।
—রাগী তো বটেই। তবে আমাকে যতবার মেরেছে, তার অর্ধেকও আপনাকে মারবে না আশা করি।
মিরা ভ্রু কুঁচকে নিলো। কপালে স্লাইড করতে করতে আওড়ালো----
—আপনাকে মারে কেন?
—কারণ আমি বিরক্ত করি।
—আপনি বিরক্ত করেন বলেই বোধহয় মারে।
—এই যে! আপনি কিন্তু প্রথম দিনেই তূর্যের পক্ষ নিয়ে নিলেন।
লিফটের দরজা খুলে যায়। তন্ময় হেসে বেরিয়ে আসে।
—এই পাশের অ্যাপার্টমেন্টটাই আমার। আর এটা তূর্যের।
মিরা অবাক হয়ে তাকায়।
—আপনারা পাশাপাশি থাকেন?
—হ্যাঁ। অফিসেও পাশাপাশি, বাসাতেও পাশাপাশি। ওকে একা থাকতে দিতে মন চায় না। আসলে আমি কিন্তু আপনার সতীনের মতোই।
টাশকি খায় মিরা। বলে কি লোকটা! সতীন? মিরা হা করে তাকিয়ে থাকে। তন্ময় লাজুক হেঁসে বললো----
—এতো ভাবনাচিন্তা করার দরকার নেই। চাবি তূর্য আমার কাছে রেখে গেছে। আপনি ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিন। বাবুকে বিছানায় শুয়ে দিন। ও আজ রাতে ফিরবে।
রমণী নিজেকে সামলে মাথা নাড়ে। তন্ময় ব্যাগগুলো ভেতরে রেখে দেয়। মিরা ধীরে ধীরে একটা ঘরে প্রবেশ করে। ঘরটা বেশ সুন্দর করে গোছানো। একপাশে আলমারি, সামনে বড় জানালা। বিছানার ওপর পরিষ্কার চাদর পাতা। টেবিলের ওপর কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিসও রাখা। তূর্য নিজে এসব করেছে কি না, নাকি সুমি চৌধুরী আগেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন—মিরা জানে না।
সে ব্যাগটা একপাশে রেখে দেয়। সারাদিনের ধকল, কয়েক ঘণ্টার পথ আর এতসব চিন্তায় শরীরটা যেন আর চলতে চাইছে না। মিরা ধীরে ধীরে বিছানায় বসে। ছেলেকে প্রথমে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তারপর নিজেও গা এলিয়ে দেয় নরম বালিশে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। চোখ নিভে আসছে কেমন!
-----------------------------
—শিউলি ফুল! শিউলি ফুল।
পর পর দু'বার একই ডাক কানে ভেসে আসে রমণীর। ঘুমের মধ্যেও মস্তিষ্ক সচল হয়ে ওঠে। কারো ভারী উত্তপ্ত নিশ্বাস তার মুখে লাগছে। মিরার ছোট্ট মস্তিষ্ক তখন গভীর ভাবনায় মশগুল। কে শিউলি ফুল বলে ডাকছে? কার কন্ঠ এটা?
তখন ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিতেই কেমন ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গিয়েছিলো সে। আয়ানকে জড়িয়ে ওভাবেই ঘুমিয়ে পরেছিলো। তারপর কতক্ষণ কেটেছে জানা নেই। হুট করেই মাঝরাতে এরূপ কোমল আওয়াজে নড়েচড়ে ওঠে মিরা। চোখজোড়া পিটপিট করে তাকাতেই তার শরীর কেঁপে ওঠে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়। স্বপ্ন না-কি বাস্তব তার মধ্যে ঠিক পার্থক্য করে উঠতে পারে না। মিরা শুকনো ঢোক গিলে। তার পানে ঝুঁকে থাকা মানবটি ততক্ষণে জায়গা পরিবর্তন করে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পরেছে। গায়ে কালো রঙা টিশার্ট আর ট্রাউজার। মাথার এলোমেলো চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কপালময়। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোই পুরুষটির ঝাপসা দৃষ্টি সুস্পষ্ট নজর কাড়লো রমনীর। খেই হারালো তৎক্ষনাৎ। তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠযুগল হতে আপনাআপনি নির্গত হলো------
—তূর্য! আপনি?
—খাবার তৈরি, হাতমুখ ধুয়ে খাবারটা খেয়ে তারপর ঘুমিয়ে পরুন।
বলেই গটগট পায়ে ঘরের বাহিরে চলে গেলো পুরুষটি। মিরা হতভম্ব, হতবিহ্বল। কখন এলো সে, কখন খাবার তৈরি করলো অথবা বাহিরে থেকে আনলো কি-না তার কিচ্ছু মিরা জানে না। তবে এই মুহূর্তে পুরুষটির থেকে এরূপ ঠান্ডা আচরণ সে আশা করেনি। আর এই অদ্ভুত নামটা? সেটা কি আশা করেছিলো? মিরা শুকনো ঢোক গিলে ফ্যাল ফ্যাল করে দরজার পানে তাকিয়ে রইলো৷
#তুমি_শিউলি_ফুলের_ঘ্রাণ ( ১)
#মোনালিসা_মেহরোজ