ফন্ট সাইজ:
থিম:
যদি বলতে ইচ্ছে হয়

৭ম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#যদি_বলতে_ইচ্ছে_হয়

#মোনালিসা_মেহরোজ 
#পার্ট_৭
ছাদ থেকে নেমে আসতেই বুঝলাম বাড়িটা আজ আরও বেশি সরগরম হয়ে উঠেছে। আত্মীয়স্বজন, ডেকোরেটরের লোক, হাসাহাসি, গল্পগুজব—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। যেনো কারো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আর কারো জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়ের শেষ। আমি মৃদু হেসে নিজের ঘরে ঢুকলাম। কাপড় পরিবর্তন করে এসে বসলাম বিছানায়। 
ব্যাগটা আগেই গুছানো ছিলো। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কিছু জামাকাপড়, সার্টিফিকেটসহ সবকিছু এক জায়গায় রাখা। খুব ধীরে ডিভোর্স পেপারটা হাতে নিলাম আমি। অদ্ভুত ব্যাপার, বুকের ভেতর কোনো কষ্ট নেই। হয়তো কষ্টেরও একটা সীমা থাকে। সীমা পেরিয়ে গেলে মানুষ শুধু শান্ত হয়ে যায়। ঠিক যেমন এখন আমি। 
আমি ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে নিচে নেমে এলাম।
বসার ঘরে তখন বেশ কয়েকজন আত্মীয় বসে গল্প করছে। শাশুড়ীমা তাদের মাঝখানে বসে ব্যস্তভাবে বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছেন। আমাকে দেখে কয়েকজন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকালো। আমি কাউকে কিছু বললাম না। সোজা এগিয়ে গেলাম নিলয়ের দিকে। সে দাঁড়িয়ে ছিলো বারান্দার কাছে। আমাকে দেখে খানিকটা অবাক হলো।
—কিছু বলবে?
আমি উত্তর দিলাম না। চুপচাপ তার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিলাম। নিলয় ভ্রু কুঁচকে খামটা খুললো। পরের মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে গেলো। হাত কেঁপে উঠলো কেনো যেনো। চোখ স্থির হয়ে রইলো কাগজটার উপর। সে দেখলো আমাদের ডিভোর্স পেপারখানা। যেখানে আমার সই জ্বলজ্বল করছে। চারপাশের হাসাহাসি ধীরে ধীরে থেমে গেলো নিলয়ের রিয়াকশনে।কেউ একজন বলে উঠলো----
—আরে! ওটা কি?
নিলয় কোনো উত্তর দিতে পারলো না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কাগজটার দিকে। আমি শান্ত গলায় বললাম----
—তোমার কাজটা সহজ করে দিলাম। মুক্তি দিলাম তোমায়। এই ভাঙা সম্পর্ক বয়ে বেড়াতে 
আর হবে না। 
নিলয় ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো আমায় পানে। তার চোখদুটো লাল হয়ে এসেছে। 
অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে চোখদুটো। বুঝলাম না, সে কি কষ্ট পাচ্ছে? দুঃখ হচ্ছে কাগজটা দেখে? তাহলে আমায় ছাড়লো কেনো? কেনো এভাবে সৌমিকে আপন করলো? 
নাহ্, তার ভালোবাসা ফুরিয়ে গেছে। এখন হয়তো অদৃশ্য এক টান তাকে বাঁধা দিচ্ছে। এর বাহিরে কিচ্ছু থাকতে পারে না। কিচ্ছু না। যদি কিছু থাকতো তাহলে অন্য কারো নামে কবুল বলে আমাকে এভাবে অপমান করতো না। কখনোই না। 
আমি তাচ্ছিল্য হাসলাম কথাগুলো ভেবে। নিলয় কাঁপা গলায় বললো----
—মৃণা...! 
আমি থামিয়ে দিলাম তাকে। শীতল গলায় বললাম----
—সই করে দিও। যত দ্রুত হবে ততই ভালো।
—তুমি... তুমি সত্যিই চলে যাচ্ছো?
আমি মৃদু হাসলাম।
—থাকার হলে নিশ্চয়ই এই কাগজটা তোমার হাতে ধরিয়ে দিতাম না।
নিলয়ের বুকটা দৃশ্যমানভাবে ওঠানামা করছে।
যেনো শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। আমি দেখলাম তা। তবে আজ আমার মনটা কেনো যেনো পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে গেলো। কোন অনুভূতি জন্মালো না নিলয়ের জন্য। কোন খারাপ লাগা বা দুঃখ কাজ করলো না। শুধু মনে হতে লাগলো, আমি বোধহয় আজ মুক্তি পেতে চলেছি। আজ নিলয় নামক কাপুরুষের থেকে আলাদা হতে চলেছি। যাকে ভালোবাসতাম সে তো ম*রে গেছে। তাহলে কার জন্য কষ্ট পাবো আমি? কার জন্য থাকবো এখানে? 
ভাবনার মাঝেই সাহেলা মামি পাশ থেকে বলে উঠলেন----
—বাহ্! মেয়েটা তো নিজের রাস্তা নিজেই বেছে নিলো। মুক্তি দিলো আমাদের নিলয়কে। 
আরেকজন হেসে বললো-----
—এটাই ভালো। অপয়া মেয়েটাকে আর কতদিন এই সংসারে রাখবে? ও থাকলে সংসারের বরকত হবে কি? কখনোই না। 
কথাগুলো শুনে নিলয়ের মুখ আরও শক্ত হয়ে গেলো। হাতের কাগজটা প্রায় মুচড়ে ফেলছিলো সে। আমি দেখলাম। তবুও কিছু বললাম না।
কারণ আজ তার ব্যথার দায়িত্ব আমার না।
পাঁচ বছর আমি তার সুখ-দুঃখের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আজ থেকে আর না। সৌমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার চোখেমুখে বিজয়ের ছাপ।
আমি তাকিয়েও চোখ সরিয়ে নিলাম। কারণ যুদ্ধটা আমি হেরে যাইনি। আমি শুধু যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমি ধীর পায়ে শাশুড়ীড সামনে এসে দাঁড়ালাম। হেঁসে বললাম----
—যাচ্ছি, ভালো থাকবেন আপনার সংসার নিয়ে৷ আমি আর কখনো ফিরবো না।
তিনি তাচ্ছিল্যতাসমেত চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম কেবল। নিলয় হঠাৎ এক পা এগিয়ে এলো আমার পানে। 
—থামো।
আমি থামলাম। তার পানে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুধালাম----
—কি?
তার ঠোঁট কাঁপছে। চোখদুটো অদ্ভুত অসহায়।
—যেও না।
চারপাশ মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম। তারপর খুব ধীরে বললাম----
—এই কথাটা বলার সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, নিলয়।
সে নির্বাক হয়ে গেলো। আমি আর অপেক্ষা করলাম না। মায়ের শেখানো মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়ালাম। বাবার শেখানো মতো বুক ভরে শ্বাস নিলাম। অতঃপর কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পিছনে কেউ ডাকলো কি-না আমি জানি না।জানার চেষ্টাও করলাম না। কারণ কিছু বিদায় আছে, যেগুলো পিছনে ফিরে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আমি সেগুলোর মধ্যে একটা হতে চাইনি। বাহিরে তখনো ঝিরঝির বৃষ্টি। আমি দরজা পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম। মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এলো বুকের ভেতর। আজ আমার কিছু নেই। তবুও মনে হচ্ছে—আজই প্রথম আমি সবকিছু ফিরে পেয়েছি।
-------------------------
পরদিন সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত নীরবতায়। আমি এখন মায়ের বাড়িতে। প্রথমে মা সবকিছু শুনে ভেঙে পরলেও অনেক বোঝানোর পর শেষমেশ শান্ত হয়েছে৷ ওবাড়ি যেতে চেয়েছিলো নিলয়কে কিছু কথা শোনানোর জন্য,তবে আমি বাঁধা দিলাম। ওবাড়ির পাট চুকিয়ে এসেছি আমি—তাই সেখানে যাওয়ার কোন মানেই হয়না আর। 
ছোট্ট একটা ঘর, জানালার পাশে কাঠের টেবিল, আর বুকভরা নতুন জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে নতুনভাবে শুরু করলাম আমি। তবুও আজ মনটা আগের চেয়ে অনেক হালকা লাগছে।
কারণ আমি জানি, গতকাল কোনো সম্পর্ক হারিয়ে আসিনি আমি—বরং নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাটাকে ফিরে পেয়েছি।
সকালবেলা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। আজ জয়েনিংয়ের দিন। 'আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'-এর গেটের সামনে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করলো আমার। এই স্কুলেই আমার বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আজ থেকে এখানেই আমার নতুন পথচলা শুরু হলো।
দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে ভেতরে পা রাখতেই পরিচিত একটা কণ্ঠ কানে এলো আমার-----
—আমি ভাবছিলাম আজ হয়তো আসবেন না।
আমি ঘুরে তাকালাম। কন্ঠটা সুলেমানের। হাতে কয়েকটা খাতা, পরনে হালকা নীল শার্ট।
ঠোঁটের কোণে সেই চেনা মৃদু হাসি। আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম----
—কেন?
—জানি না। গত কয়েকদিন আপনাকে দেখে মনে হয়েছে আপনি যখন-তখন উধাও হয়ে যেতে পারেন।
ঠোঁটের কোণায় ক্ষীণ হাসি ফুটলো আমার। বললাম----
—আমি এতোটা দায়িত্বজ্ঞানহীন নই।
—ভালো কথা।
—আপনি কি সবসময় মানুষকে এভাবে পর্যবেক্ষণ করেন?
—না।
—তাহলে?
—যাদের খেয়াল রাখতে ইচ্ছে করে, শুধু তাদের।
কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলাম আমি। কি বলবো তার ভাষা খুঁজে পেলাম না। এতো শক্ত কথা কি করে এই লোকটা অকপটে বলে ফেলে তা মাথায় ঢুকলো না। আমি দ্রুত প্রসঙ্গ বদলে ফেললাম----
—হেড স্যার আছেন?
সুলেমান হেঁসে ফেললো আমার কথায়। আমি কপাল কুঁচকে নিলাম। 
—আছেন। তবে আজ আর পালাতে পারবেন না। 
স্টাফরুম পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।
—আমি পথ চিনি।
—জানি। তবুও আজকে নতুন শিক্ষক হিসেবে আপনার অফিসিয়াল গাইড আমি।
আর তর্ক করলাম না আমি। মাথা নাড়িয়ে তার সাথে হাঁটতে লাগলাম। 
অতঃপর সারাদিন কেটে গেলো ব্যস্ততায়।
ছাত্রছাত্রীদের সাথে পরিচয়, কাগজপত্রের কাজ, সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ সবমিলিয়ে দীর্ঘদিন পর নিজেকে খুব প্রয়োজনীয় মনে হলো আমার।
কেউ আমাকে বোঝা ভাবছে না। কেউ কিছু বলছে না। কেউ অস্তিত্ব নিয়ে বিরক্ত নয়। সবমিলিয়ে অদ্ভুত প্রশান্তি পেলাম। 
বিকেলের দিকে স্কুল ছুটি হয়ে গেলো। এক এক করে সবাই চলে যেতে লাগলো। আমিও ব্যাগ কাঁধে নিয়ে গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিন্তু আজ সমস্যাটা অন্য। আকাশটা আজও বড্ড মেঘলা। গ্রামের এই রাস্তায় বিকেলের পর রিকশা খুব একটা পাওয়া যায় না। দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো রিকশার দেখা মিললো না।
আমি প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক কণ্ঠ-----
—আবার রিকশা সংকট?
আচমকা তার কন্ঠে ঘুরে তাকালাম আমি।
সুলেমান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললাম----
—মনে হচ্ছে।
—হুম।
—হুম মানে?
—মানে আপনার জন্য একটা রিকশা খুঁজতে হবে।
—প্রয়োজন নেই।
—এই কথাটা আগেও শুনেছি।
—তাহলে এবার বিশ্বাস করুন।
—দুঃখিত। বিশ্বাস করতে পারছি না।
বিরক্ত হলাম আমি। লোকটা কি অদ্ভুত! অথচ আমি বিরক্ত হলেও পুরুষটি নির্বিকার। মোবাইল বের করে কোথায় যেন ফোন দিলো। দুই মিনিট পর রাস্তার মোড় থেকে একটা রিকশা চলে এলো। সুলেমান এগিয়ে গিয়ে রিকশাওয়ালার সাথে কথা বললো। আমি তাকিয়ে রইলাম কপাল কুঁচকে। তিনি ফিরে এসে বললেন----
—চলুন।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমি। বুঝলাম। লোকটা ফোন দিয়ে হয়তো রিকশার খোঁজ'ই নিচ্ছিলেন। তবে বেশ অস্বস্তি হলো আমার। লোকটা বারবার কেনো সাহায্য করছে আমায়? কেনো এভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে আমার সাথে? আমার বুকটা হুট করেই কাঁপতে লাগলো। প্রশ্ন করলাম তাকে----
—এতো কষ্ট করেন কেন আমার জন্য? 
সুলেমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো।অতঃপর খুব স্বাভাবিক স্বরে বললো----
—সব কষ্ট কষ্ট লাগে না,ম্যাম! 
বুকটা আমার কেমন যেনো করে উঠলো। কথাটার উত্তর খুঁজে পেলাম না আমি। তাই চুপচাপ রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশা চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে। কয়েক গজ যাওয়ার পর অদ্ভুত এক অনুভূতিতে পিছনে তাকালাম। 
দেখলাম—সুলেমান এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার চলে যাওয়ার পথে। আর সন্ধ্যার নরম আলোয় মানুষটাকে হঠাৎ করেই ভীষণ একা লাগলো আমার কাছে। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। তবে কেনো তা বুঝলাম না। সত্যি বলতে বুঝতে চাইলাম না।
চলবে.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন