ফন্ট সাইজ:
থিম:
যদি বলতে ইচ্ছে হয়

৮ম পর্ব

লেখক: মোনালিসা মেহরোজ

#যদি_বলতে_ইচ্ছে_হয়

#মোনালিসা_মেহরোজ
#পার্ট_৮
কেটে গেছে কয়েকটা দিন। 
সকালবেলা রিকশা থেকে নেমে স্কুলের গেটের দিকে এগোতেই আচমকা থমকে গেলাম আমি।গেটের সামানেই দাঁড়িয়ে আছে নিলয়। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। পুরুষটাকে কেমন যেনো অপরিচিত লাগছে আজ। কয়েকদিনের মধ্যেই ওজন কমে গেছে। দাড়িগুলো এলোমেলো হয়ে উঠেছে। চোখের নিচে কালি স্পষ্ট। পরনের শার্টটাও কুঁচকে আছে।আমাকে দেখেই সে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলাম।
—তুমি এখানে?
নিলয় শুকনো হাসলো। বিরস মুখে চেয়ে বললো---
—তোমার সাথে কথা ছিলো।
—আমার কিন্তু নেই।
কথাটা বলেই পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে নিলাম। সে ডাকলো আমায়---
—মৃণা।
তার ডাকে থেমে গেলাম আমি। কণ্ঠটা কেমন অদ্ভুত শোনালো। ক্লান্ত আর ভাঙা। আমি ঘুরে তাকালাম না।
—কি বলবে?
—দুই মিনিট সময় হবে?
—স্কুলে ঢুকছি। দেরি হয়ে যাবে।
—আমি অপেক্ষা করবো।
আমি উত্তর না দিয়েই ভেতরে চলে গেলাম। আর সে তাকিয়ে রইলো বিরস মুখে। আমার তার দিকে তাকাতে ইচ্ছে হলো না। মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, আমি কি কঠিন হয়ে গেছি? বড্ড পাষান বুঝি? কিন্তু আমাকে তো এরকম ওরাই বানিয়েছে। তাহলে আজ কেনো আপসোস করবো আমি?দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাচ্ছিল্য হাসলাম আমি৷ সাথে ভাবলাম, সে কি সত্যিই অপেক্ষা করবে আমার জন্য? 
---------------------
সারাদিন ব্যস্ততার মাঝেও কথাটা মাথায় ঘুরলো।
নিলয় কেন এসেছে? ডিভোর্স পেপারে তো সই করার কথা। তাহলে? স্কুল ছুটির পর গেটের দিকে আসতেই দেখি সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
একই জায়গায়। আমার বুকের ভেতর কেমন যেনো করে উঠলো।তবুও মুখ শক্ত রাখলাম।
—এখন বলো।
নিলয় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো----
—তুমি কেমন আছো?
আমি হাসলাম তার কথায়।
—এই প্রশ্নটা করার জন্য এসেছো?
—না।
—তাহলে?
নিলয় আমার দিকে তাকালো। দীর্ঘক্ষণ চুপ রইলো। অতঃপর বললো----
—আমার কেমন জানি সব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। 
আমি ভ্রু কুঁচকে নিলাম। প্রশ্ন করলাম---
—কেনো? 
সে দীর্ঘক্ষন চুপ রইলো। অতঃপর ফিসফিস করে বললো----
—মনে হচ্ছে কিছু হারিয়ে ফেলছি। 
আমি বুঝলাম তার কথার মানেটা। হুট করেই বড্ড হাসি পেলো আমার। 
—কেনো? সৌমি তো আছে। 
সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললো----
—সে যেনো থেকেও নেই। 
—থাকার জন্যই তো এসেছে, তাহলে শূন্যতা অনুভব করাচ্ছে কেনো? আর তুমিও বা শূন্য অনুভব করছো কেনো, নিলয়? 
তার চোখটা হুট করেই ভরে উঠলো। যা আমি দেখলাম। সে হাসির মাঝে আড়াল করলো অশ্রুকণাটা। 
—আমি কি ভুল করলাম?
—তা আমার জানার বিষয় বলে মনে হয় তোমার? 
সে ক্লান্ত হাসলো। অতঃপর খুব নিচু স্বরে বললো----
—তুমি সুখে আছো আমায় ছাড়া? ভালো আছো? 
—তা জানার আগ্রহ এতো বেশি কেন? 
—ফিরে যাওয়া যায় না? 
মুহূর্তেই জমে গেলো চারপাশ। আমি ভেবেছিলাম ভুল শুনেছি। তাই অবিশ্বাস নিয়ে তাকালাম তার দিকে।
—কি বললে?
—শুনেছো তো! 
আমার হাসি পেয়ে গেলো। সত্যিই হাসি পেলো। সে কোন মুখে আমাকে কথাটা বললো? তার কি লজ্জা লাগলো না? বিবেকে বাঁধলো না? অবশ্য বিবেক থাকলে বোধহয় এই কথাটা বলতে পারতো না। সত্যিই পারতো না। 
—তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী আছে।
—জানি।
—ডিভোর্স পেপার তোমার হাতে।
—জানি।
—তাহলে?
নিলয় চোখ নামিয়ে ফেললো। তারপর ফিসফিস করে বললো----
—তোমাকে ছাড়া ওই বাড়িটা বাড়ি লাগছে না।
আমি স্থির হয়ে গেলাম। নিলয় ধীরে ধীরে বললো----
—তুমি চলে যাওয়ার পর বুঝেছি, সংসার আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। একটা ঘরে মানুষ থাকতে পারে, তবুও সেটা সংসার হয় না।
আমি চুপ করে শুনতে লাগলাম। সে পুনরায় বললো----
—মা-বাবা আছে। সৌমি আছে। আত্মীয় আছে। সব আছে। তবুও কিছু নেই। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। আমি জমে গিয়ে শুনতে লাগলাম সবকিছু। 
—আমি হয়তো ভুল করেছি, মৃণা।
আমি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।
অতঃপর খুব শান্ত স্বরে বললাম----
—এই কথাটা বলার জন্য একটু বেশি দেরি করে ফেলোনি?
নিলয় কোনো উত্তর দিতে পারলো না। আমি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম। বললাম----
—তুমি আমাকে চেনো, নিলয়। আমি কেমন তা তোমার অজানা নয়। 
সে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। আমি হাসলাম। এই পুরুষটিকে আমি হারে হারে চিনি। হুট করেই আমার চলে আসা মেনে নিতে পারে নি। তাই আবেগের বশে চলে এসেছে কথাগুলো বলতে। তবে আমি যদি গলে যাই, আবারো তার কথা শুনি—কয়েকদিন পর এই আবেগ আবারো ফুরিয়ে যাবে। বাস্তবতা কি তখন আমাকে আবারো সে বুঝিয়ে দিবে। ক্ষত স্থানে পুনরায় ক্ষত হতে আমি দিতে পারি না। ভালোবাসি তো নিজেকে। তাহলে কেনো আমি গলে গিয়ে ব্যথা পাবো। 
—ফিরে যাও। আর হ্যাঁ, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে আঘাত করতে এসো না। নইলে সেই আঘাত আমি চারগুণ ফিরিয়ে দিবো। এই আবেগের বশে যেই কষ্টটা অনুভব করছো—এটা তার ফল, যেই শাস্তি আর অপামন তুমি আমায় দিয়েছিলে। 
কথাটা বলে আমি আর অপেক্ষা করলাম না। চুপচাপ হাঁটা ধরলাম সামনের দিকে। তবে কয়েকপা এগিয়ে যেতেই সামনের ঠং দোকানের সামনে সুলেমানকে নজরে পরলো। আমার পা আপনাআপনিই ধীর হয়ে এলো। সে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মৃদু হেঁসে বললো-----
—বাহ্, নিজেকে তাহলে ভালোবাসতে শিখেছেন! 
বলেই সে পুনরায় চায়ের কাপে চুমুক বসালো। আমি পিছু ফিরে তাকালাম। যেখানে নিলয় দাঁড়িয়ে আছে। তার নজর আমার পানে। আমি শীতল গলায় সুলেমাকে উদ্দেশ্য করে বললাম----
—নিজেকে না ভালোবাসতে পারলে তো আত্নহ*ত্যা করতে হতো। তাই বাসতে শিখলাম। কেননা এ জীবন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা বা অধিকার—কোনটায় আমার নেই, এটা খোদা দেখে নিবেন। 
------------------------------
বাড়িতে ফিরে মায়ের অসুস্থ শরীরখানা দেখেই চুপসে গেলাম আমি। মা তখন বিছানায় পরে আছে৷ হাতের ব্যাগখানা রেখে এগিয়ে গেলাম মায়ের পানে। কপালে হাত ছুঁইয়ে দেখলাম জ্বরে গা'টা পুড়ে যাচ্ছে। আমি বিরস মুখে মা'কে কয়েকবার ডাক দিলাম। জ্বরের ঘোরে মা কেবল গুঙিয়ে যাচ্ছে। বুকটা আমার ধক করে উঠলো। মা ছাড়া এই পৃথিবীতে আছে'ই বা কে আমার? মায়ের অসুস্থ শরীর দেখলে যে বড্ড কষ্ট হয়। 
আমি দ্রুত পায়ে উঠে দাঁড়ালাম। ছোট্ট একটা বাটিতে পানি নিয়ে মাথায় জলপট্টি দিতে লাগলাম। মা তখন আধো আধো চোখ খুলে চাইলো আমার পানে। আমি খুব ধীরে জিজ্ঞেস করলাম----
—মা! কিছু খেয়েছো দুপুরে? 
মা আমার মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বললো। আমি আর দেরি করলাম না। ডক্টরের দেওয়া ঔষধ গুলো সেবন করালাম। গত কয়েকদিন ধরেই মায়ের শরীর খারাপ। তাই ডক্টরের কাছে নিয়ে গেছিলাম। সেখান থেকেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ আনা হয়েছিলো। আমি মা'কে ঔষধ খাইয়ে শুয়ে দিলাম। অতঃপর পুনরায় মাথায় জলপট্টি দিতে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। সাথে ভাবতে লাগলাম নিলয়ের কথা। 
জানি, নিলয় আজকে যা বললো তা সব আবেগের বশে। এর আগে কতই না কষ্টে কেটেছে আমার দিন। কই? একটা দিনও তো খোঁজ নিতো না আমার! এমনটা নয় যে সৌমিকে ঝোঁকের বশে বিয়ে করেছে, সৌমির সাথে অনেক দিনের সম্পর্কে তার। আর যখন জানতে পারলো আমি মা হতে পারবো না তখন সেই অজুহাতে সৌমিকে বিয়ে করতে ঘরে তুললো। তাহলে এটাকে আবেগ বলবো না-তো কি বলবো? আমি হাসলাম কেবল। 
চলবে........
(এটার আর দু'টো পর্ব আসবে হয়তো। ছোট্ট করে দেওয়ার জন্য সরি।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন