ফন্ট সাইজ:
থিম:
the Killing love

৪র্থ পর্ব

লেখক: Aysha Siddiqui
গল্প: #The_Killing_Love
লেখিকা: #নূরাইশা_চন্দ্রা_নূর
পর্ব: ০৪
🚫 (সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার | ডার্ক রোমান্স | অবসেসিভ রোমান্স | গ্যাংস্টার আন্ডারটোন)
​[ অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ ]
​আর্ট রুমের থমথমে অন্ধকারের মাঝে শুধু জাইয়ানের কড়া তুলির আঁচড়ের শব্দ। এক চুলও নড়ছে না নূর। ভয়ে কাঠ হয়ে টেবিলের সামনে বসে আছে সে। তার ফর্সা, পুতুলের মতো মুখে ফোটা ফোটা ঘাম জমে উঠেছে, আর ছলছলে ডাগর ডাগর চোখ দুটো শুধু জাইয়ানের রক্তবর্ণ চোখের দিকে আতঙ্কে চেয়ে আছে।
​ক্যানভাসের সাদা জমিনে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে পাঁচ বছরের নূরাইশার মুখচ্ছবি। তবে তা সাধারণ কোনো ছবি নয়—ছবিতে নূরের ডাগর চোখ দুটো জাইয়ান এঁকেছে তীব্র লাল রঙে, যেন এক অদৃশ্য শেকল দিয়ে মেয়েটাকে চিরতরে নিজের ক্যানভাসে, নিজের জগতে বন্দী করে ফেলছে।
​তুলির শেষ আঁচড়টি দিয়ে জাইয়ান ধীরপায়ে নূরের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। নূরের কপালে জমে থাকা একফোঁটা ঘাম নিজের আঙুল দিয়ে মুছে নিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে বলল—
"গুড গার্ল! একদম লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসে ছিলি। আমার কথা শুনলে তোকে আমি কোনো কষ্ট দেব না... কিন্তু যদি অবাধ্য হস, তাহলে এর পরিণতি বড্ড ভয়াবহ হবে, বেবি চাঁদ।"
​নূর থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ছোট গলায় বলল, "ছবি আঁকা শেষ ভাইয়া... মানে... তুমি কি আমাকে যেতে দেবে এখন? আমার খুব ভয় করছে..."
​'ভাইয়া' শব্দটা শুনেই জাইয়ানের চোয়াল একমুহূর্তে শক্ত হয়ে গেল। কিন্তু এবার সে চেঁচাল না। নূরের একদম কাছে ঝুঁকে এসে, তার থুতনিটা নিজের শক্ত আঙুলে চেপে ধরে বিড়বিড় করে উঠল—
"বারবার এক ভুল করিস না, চাঁদ। তোকে তো আগেই বললাম, আমি তোর কোনো ছাইপাশ ভাইয়া নই! নিজেকে তোর কী মনে হয়? আমার বোন? হা হা... কখনোই না। তুই শুধুই আমার তৈরি একটা সুন্দর ভুল, যাকে আমি নিজের মতো করে শাসন করব।"
​কথাটা বলেই নূরের হাত ধরে সে এক টানে দাঁড়িয়ে দিল এবং ড্রয়িংরুমের দিকে ঠেলে দিল। নূর আর এক সেকেন্ডও সেখানে না দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে একছুটে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো।
​নিচে তখন রাবেয়া আর জুবায়ের চৌধুরী বেশ চিন্তিত মুখে বসে ছিলেন। নূরকে এভাবে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসতে দেখে রাবেয়া তড়িঘড়ি করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
"কী হয়েছে নূর? কাঁদছিস কেন মা? কোথাও ব্যথা পেয়েছিস?"— আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রাবেয়া।
​নূর ডুকরে কেঁদে উঠে জাইয়ানের রুমের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, "আম্মু... ওই জাইয়ান ভাইয়া বড্ড পচা! খুব ভয়ংকর... আমাকে একটা অন্ধকার রুমে আটকে ধমক দিচ্ছিল! আমি আর কখনো ওর কাছে যাব না!"
​জুবায়ের চৌধুরী এই শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলের মানসিক অস্থিরতা যে দিন দিন কোন পর্যায়ে যাচ্ছে, তা ভেবে তাঁর বুকটা ভারী হয়ে এলো। তিনি নূরের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "ভয় পেয়ো না মা। জাইয়ান ভাইয়া একটু রেগে থাকে, আস্তে আস্তে ও ঠিক হয়ে যাবে। তুমি তোমার আম্মুর সাথে রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও।"
​ঠিক তখনই সিঁড়ির ওপর তলায় এসে দাঁড়াল জাইয়ান। নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে উপেক্ষা করে তার তীক্ষ্ণ, হিংস্র দৃষ্টি গিয়ে পড়ল রাবেয়ার বুকে লুকিয়ে থাকা নূরের ওপর। নূরের কাঁপা কাঁপা হাত দুটো রাবেয়ার শাড়ি শক্ত করে চেপে ধরে আছে।
​জাইয়ানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, আধিপত্যসূচক হাসি। মনে মনে সে ফিসফিসিয়ে বলল—
"আজ আমার কোল থেকে পালিয়ে আম্মুর বুকে লুকিয়ে লাভ নেই, বেবি চাঁদ। পুরো চৌধুরী বাড়িতে তুই যেখানেই যাস না কেন, আমার এই চোখ আর এই পাগলামি সবসময় তোর ওপর নজর রাখবে। তুই আমার রক্তে আঁকা ছবি... তোকে ছাড়ার ক্ষমতা আমার নিজেরও নেই।"
​বিকালে দিকে জায়েদ, আরাভ আর পিউলি আবার নূরের রুমের দরজায় এসে দাঁড়াল। পিউলির হাতে একটা সুন্দর পুতুল, আর জায়েদের হাতে কিছু চকলেট।
জায়েদ দরজায় টোকা দিয়ে মিষ্টি হেসে বলল, "ছোট পরী! আমরা ভেতরে আসতে পারি?"
​নূর প্রথমে একটু ভয় পেয়ে মায়ের পেছনে লুকাল, কিন্তু পিউলির হাতের পুতুলটা দেখে তার চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। আস্তে আস্তে সে সামনে এগিয়ে এলো। পিউলি পুতুলটা নূরের হাতে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, "আজ থেকে আমরা তোমার ফ্রেন্ড, ঠিক আছে? আমরা সবাই একসাথে খেলব!"
​নূরের মুখে ফুটল এক চিলতে নিষ্পাপ হাসি। মুহূর্তে সারা দিনের ভয় আর আতঙ্কের কথা ভুলে গেছে। তারা চারজন মিলে হাসিখুশি গল্পে মেতে উঠল।
​দূর থেকে করিডোর দিয়ে এই দৃশ্য দেখছিল সায়েরা। তার বুকের ভেতর হিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সামান্য এই কুড়িয়ে পাওয়া বাচ্চাটার জন্য বাড়িতে সবাই যেভাবে পাগল হচ্ছে, আর ওদিকে জাইয়ানও কেমন যেন অদ্ভুদ আচরণ করছে—এসব সায়েরা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল—
"তোদের এই হাসি বেশিদিন থাকবে না! এই অনাথ মেয়েটাকে এ বাড়ি থেকে না তাড়ানো পর্যন্ত আমার শান্তি নেই!"
​রাত গভীর হলো। চৌধুরী বাড়ির রাজকীয় নিস্তব্ধতার বুকে আছড়ে পড়ছে নিঝুম অন্ধকার।
নিজের অন্ধকার আর্ট রুমে রক্তে রাঙানো সেই ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জাইয়ান। মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় তার ছায়াটা দেওয়ালে এক দানবের মতো দেখাচ্ছে। নূরের আঁকা ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে পরম মমতায় হাত বুলাচ্ছে, ঠিক যেন কোনো শিকারের ওপর শিকারির প্রথম আধিপত্য।
​জাইয়ানের চোখ দুটি লালচে আলোয় জ্বলছে। সে মোমবাতির ওপর নিজের হাতটা ধরে রাখল—আগুনের উত্তাপ তীব্র হলেও তার মুখে কোনো ব্যথার ছাপ নেই, আছে কেবল এক পৈশাচিক আবেশ।
​ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর, মাতাল গলায় ফিসফিস করে উঠল—
"সবাই তোকে আদর করবে, তোকে ভালোবাসবে... কিন্তু তোর ওপর অধিকার থাকবে শুধু আমার। তোর ভয়, তোর কান্না, তোর নিঃশ্বাস—সবকিছু শুধু আব্রাম জাইয়ান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ঘুমিয়ে পড়, আমার বেবি চাঁদ... কারণ সামনের দিন গুলো  শুরু হবে আমার এই অন্ধকারের ছায়ায়।"
​অন্ধকার রুমে জাইয়ানের সেই গভীর, অবসেসিভ ফিসফিসানি প্রতিধ্বনি হয়ে মিলিয়ে গেল।
আজকের সকালটা অন্য দিনগুলোর চেয়ে একটু হলেও ভিন্ন। কারণ আজ ছোট নূরাইশাকে ঢাকার শহরের এক স্বনামধন্য স্কুলে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
​সকাল থেকেই এই খবর শুনে ছোট নূরের আনন্দের আর সীমা নেই! সারা বাড়ি জুড়ে তার মিষ্টি নূপুরের মতো চঞ্চল দৌড়াদৌড়ি আর হৈচৈ শুরু হয়ে গেছে। পিংক রঙের সুন্দর একটা ফ্রক পরে, ছোট্ট ডাগর চোখ দুটো নাচিয়ে সে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলছে।
​"আম্মু! ও আম্মু! দেখো দেখো, বাবাই আমাকে নতুন ব্যাগ আর রঙিন পেন্সিল কিনে এনে দেবে বলেছে! আমি প্রতিদিন স্কুলে যাব, অনেক অনেক পড়ালেখা করব!"— ডাইনিং রুমের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে হাসিমুখে চেঁচিয়ে বলছে নূর।
​রাবেয়া মেয়ের এই বাঁধভাঙা আনন্দ দেখে মৃদু হেসে বললেন, "আহা সোনা, অত দৌড়াদৌড়ি করিস না! পড়ে যাবি  তো। শান্ত হয়ে এক জায়গায় বোস, নাস্তাটা খেয়ে নে আগে।"
​জায়েদ, আরাভ আর পিউলিও নূরের এই আনন্দ দেখে মুখ টিপে হাসছে। পিউলি দৌড়ে এসে নূরের হাত ধরে বলল, "জানিস নূর, তুই স্কুলে গেলে নতুন নতুন অনেক ফ্রেন্ড পাবি! কত সুন্দর সুন্দর খেলা খেলবি!"
​নূর একগাল হেসে আনন্দে লাফিয়ে উঠে বলল, "হ্যাঁ! আমি নতুন ফ্রেন্ড বানাব, তাদের সাথে টিফিন শেয়ার করব!"
​ ডাইনিং টেবিলের এক কোণে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ ও থমথমে হয়ে বসেছিল —#আব্রাম_জাইয়ান_চৌধুরী।
​জাইয়ানের পরনে গাঢ় কালো রঙের শার্ট, চুলগুলো কপালে সামান্য এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। তার সামনে রাখা ধোঁয়া ওঠা কফির কাপটা শীতল হয়ে আসছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার দুই চোখের মণি হিংস্র শিকারি বাজের মতো স্থির হয়ে আটকে আছে নূরাইশার ওপর।
​নূরের মুখে 'নতুন ফ্রেন্ড' আর 'স্কুলে যাওয়া'র কথাগুলো শোনামাত্রই জাইয়ানের মেজাজ চরমভাবে খিঁচড়ে গেল। তার হাতের ধারালো কাঁচের কাপের ওপর আঙুলের চাপ আরও শক্ত হলো। জাইয়ানের রক্তবর্ণ চোখ দুটো বরফের চেয়েও ঠান্ডা ও কুৎসিত আকার ধারণ করল। সে মনে মনে ফুঁসে উঠে বিড়বিড় করতে লাগল—
​"স্কুল? নতুন ফ্রেন্ড? বাইরের এই নোংরা দুনিয়া তোকে আমার চোখের সামনে থেকে দূরে নিয়ে যাবে, আর তুই সেটা নিয়ে এত আনন্দ পাচ্ছিস, বেবি চাঁদ? তোকে বাইরে পাঠানোর জন্য আমি  বন্দী করিনি!"
​জাইয়ানের গম্ভীর, বরফশীতল চাহনি আর মুখের হিংস্র অভিব্যক্তি এতটাই স্পষ্ট যে দূর থেকে জুবায়ের চৌধুরী তা খেয়াল করলেন। জুবায়েরের বুকের ভেতরটা আচমকা এক অজানা শঙ্কায় কাঁপল। জাইয়ানের এই অস্বাভাবিক নীরবতা আর ডাগর চোখের পৈশাচিক স্থিরতা কোনো ভালো লক্ষণ নয়—তা বহু অভিজ্ঞ জুবায়ের বুঝতে পারছেন।
​ঠিক তখনই নূরাইশা লাফাতে লাফাতে জাইয়ানের টেবিলের বেশ কাছাকাছি চলে এলো। জাইয়ানের ঠিক মুখোমুখি হতেই হঠাৎ তার চোখ গেল জাইয়ানের সেই হিংস্র মণির দিকে। মুহূর্তের মধ্যে নূরের মুখের সেই মিষ্টি হাসিটা মিলিয়ে গেল! ভেতরের অচেনা আতঙ্কে ছোট বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল, পায়ের গতি থমকে গেল তার।
​জাইয়ান ধীরেসুস্থে কফির কাপটা টেবিলে রাখল। তার পাতলা ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক হাড়হিম করা, কুৎসিত বাঁকা হাসি। সে নূরের দিকে একচুলও দৃষ্টি না সরিয়ে ধীর, কিন্তু ভারী গলায় ফিসফিস করে বলল—
​"খুব আনন্দ হচ্ছে, তাই না চাঁদ? চৌধুরী বাড়ির এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বাইরের আলোয় উড়তে চাইছিস? কিন্তু তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস... পাখির খাঁচা যতই রঙিন হোক, শিকলটা কিন্তু আমারই হাতে।"
​জাইয়ানের সেই গম্ভীর শিতল কণ্ঠের  বার্তা বুঝতে না পারলেও, তার চোখ আর হাসির সেই ভয়ংকর রূপ দেখে নূর শিউরে উঠল। প্রচণ্ড ভয়ে পিছিয়ে এসে সে সোজাসুজি গিয়ে রাবেয়ার শাড়ির আঁচল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
​দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছিলেন সালমা চৌধুরী আর সায়েরা। সালমা সায়েরার কানের কাছে এসে বিষ ঢেলে বললেন, "দেখলি সায়েরা? এই কুড়িয়ে আনা অনাথ বাচ্চাটার জন্য চৌধুরী বাড়ির কত আয়োজন! আর ওই পাগলা জাইয়ানটাকেও দেখ, কীভাবে মেয়েটার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে! এ বাড়িতে কোনো বড়সড় অঘটন ঘটতে যাচ্ছে, লিখে রাখিস!"
​সায়েরা হিংসায় জাইয়ান আর নূরের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বিড়বিড় করল—"স্কুলে যাওয়া তো বহু দূরের কথা, তোদের এই আনন্দকে আমি বিষে পরিণত করব!"
​টেবিলে তৈরি হওয়া থমথমে পরিবেশ কাটাতে জুবায়ের চৌধুরী ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু উচ্চস্বরে বললেন, "রাবেয়া, নূরাইশাকে রেডি করে নাও। গাড়ি রেডি আছে, আমরা এখনই স্কুলের উদ্দেশ্যে বের হব। এডমিশন ফর্মটা আজই ফিলাপ করে ফেলতে হবে।"
​জুবায়েরের কথা শেষ হওয়ামাত্রই জাইয়ান ধীরপায়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মেঝের ওপর জুতো লাগার শব্দটা যেন পুরো ডাইনিং রুমে ভারী হয়ে বাজল। সে নূরের দিকে এক পলক তাকাল, তারপর নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
​নিজের অন্ধকারের রাজত্বে ফিরে এসে জাইয়ান সোজা ক্যানভাসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রক্তের গাঢ় কালচে রঙে আঁকা সেই নূরের ছবিটির দিকে তাকিয়ে সে পাগলের মতো হেসে উঠল।
​পকেট থেকে একটি ধারালো ছোট পেন্সিল কাটার বের করে সে ছবির ফ্রেমের ওপর আলতো করে আঁচড় কাটতে কাটতে বলতে লাগল—
"যা... ঘুরে আয় তোর স্বপ্নের স্কুল থেকে, বেবি চাঁদ। কিন্তু মনে রাখিস, আমার ছায়া তোর পিছু ছাড়বে না। যত দূরেই যাস না কেন, শেষ পর্যন্ত তোকে ফিরে আসতেই হবে আমার এই অন্ধকারের সীমানায়... শুধুই আমার হয়ে!"
​জাইয়ানের সেই উন্মাদ হাসি অন্ধকার রুমের দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়াতে লাগল...
​গাড়ির পেছনের সিটে বসে কাঁচের ওপারে তাকিয়ে ছিল ছোট্ট নূরাইশা। পরনে নতুন স্কুলের ইউনিফর্ম, পিঠে গোলাপি রঙের ব্যাগ। নূরের চোখে রঙিন স্বপ্ন—আজ সে নতুন স্কুলে যাবে, নতুন নতুন অনেক ফ্রেন্ড বানাবে! পাশেই রাবেয়া আর জুবায়ের চৌধুরী তাকে পরম স্নেহে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন।
​কিন্তু নূরের অবুঝ মন জানত না, তার এই ছোট্ট রঙিন স্বপ্নের ওপর একটা গাঢ় কালো ছায়া ঝুলছে।
​চৌধুরী ভবনের দুই তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্ল্যাক কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল আব্রাম জাইয়ান চৌধুরী। গাড়িটা গেট পেরিয়ে বাইরে বের হতেই জাইয়ানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাক্ত, শীতল হাসি। পকেট থেকে নিজের স্পেশাল এনক্রিপ্টেড ফোনটা বের করে সাইলেন্ট ভয়েসে কাউকে নির্দেশ দিল—
"ছায়ার মতো পেছনে থাকবি। ও কার সাথে মিশছে, কার সাথে হাসছে—প্রতিটা সেকেন্ডের আপডেট আমার চাই। আর হ্যাঁ... ওর আশেপাশে যেন কোনো ছেলে ভুল করেও ঘেঁষতে না পারে!"
​স্কুলের গেটে পৌঁছাতেই নূরের চোখ আনন্দে বড় বড় হয়ে গেল। চারদিকে সারি সারি রঙিন বেলুন আর কত শত শিশু! জুবায়ের চৌধুরী এডমিশন ফর্মের সব প্রসেসিং শেষ করে রাবেয়াকে নিয়ে ওয়েটিং রুমে বসলেন। নূরের ক্লাস শুরু হলো টিচার সুপ্রিয়া ম্যাডামের হাত ধরে।
​ক্লাসে ঢুকেই নূরের পাশে এসে বসল 'আয়ান' নামের এক দুষ্টু স্বভাবের ছেলে। নূরের গোলাপি রঙের পেন্সিল বক্সটা দেখেই সে এক টানে সেটা কেড়ে নিল!
"এটা এখন থেকে আমার! তুই দিবি না তো?"— ভেংচি কেটে বলল আয়ান।
​নূর ভয়ে কেঁদে ফেলল। তার কান্না দেখে ক্লাসের সবাই তাকিয়ে রইল। সুপ্রিয়া ম্যাডাম এসে আয়ানকে বকা দিয়ে পেন্সিল বক্সটা নূরকে ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তু নূরের মনটা খারাপ হয়ে গেল।
​ঠিক ওই মুহূর্তে স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালের বাইরে, একটা গাঢ় কালো রঙের স্পোর্টস বাইক (BMW S1000RR) এসে থামল। হেলমেট নামাতেই বেরিয়ে এলো জাইয়ানের সেই ক্ষুরধার রক্তবর্ণ চোখ! চোখে সানগ্লাস এটে সে সোজা স্কুলের সিসিটিভি রুমের দিকে হেঁটে গেল। চৌধুরী পরিবারের আভিজাত্য আর ক্ষমতার দাপটে স্কুলের সিকিউরিটি গার্ড তাকে আটকানোর সাহস পেল না।
​সিসিক্যামেরার স্ক্রিনে জাইয়ান স্পষ্ট দেখতে পেল—নূরের কাঁন্নাকাটি আর পাশে বসে থাকা ছেলেটার কাণ্ড!
​মুহূর্তের মধ্যে জাইয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাতের রগগুলো ফুলে উঠে নীল বর্ণ ধারণ করল। জাইয়ানের সীমানায় ঢোকার সাহস একটা বাচ্চা ছেলেও কীভাবে পায়?
​জাইয়ান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠল—"রক্ত চেরি গায়ে হাত দেওয়ার সাহস? তোর শাস্তিটা আজ বড্ড ভয়ংকর হবে, কিড!"
​টিফিন পিরিয়ডে নূরাইশা যখন করিডোরে একা দাঁড়িয়ে কাঁদছিল, ঠিক তখনই সায়েরা চৌধুরীর পাঠানো একজন পিংকি তাকে লোভ দেখিয়ে বলল, "চলো নূর সোনা, তোমার আম্মু তোমাকে স্কুলের পেছনে ডাকছে।"
​নিষ্পাপ নূর সরল বিশ্বাসে পিংকির সাথে স্কুলের পেছনের নির্জন ক্লাসরুমের দিকে গেল। সায়েরার চক্রান্ত কাজ করতে শুরু করেছে—আজই এই অনাথ কুড়িয়ে আনা মেয়েটাকে গায়েব করে চৌধুরী বাড়ির বাইরে বড় কোনো কেলেঙ্কারী তৈরি করাই তার মূল প্ল্যান!
​কক্ষটিতে ঢোকামাত্রই বাইরে থেকে দরজা আটকে দেওয়া হলো! রুমটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। ভীতিপ্রদ অন্ধকার দেখে নূরের বাবার দুর্ঘটনাস্থলের সেই ভয়ংকর রক্তের স্মৃতি মনে পড়ে গেল।
"আম্মু! নতুন বাবাই! দরজা খোলো! রক্ত... অনেক অন্ধকার!"—নূর দরজায় ধাক্কা দিয়ে তীব্র চিৎকারে কেঁদে উঠল। ধীরে ধীরে তার শ্বাস আটকে আসতে লাগল, আতঙ্কে প্যানিক অ্যাটাক শুরু হলো তার।
​ঠিক যখন নূর নিস্তেজ হয়ে মাটিতে ঢলে পড়তে যাবে, তখনই বিকট শব্দে রুমের কাঠের শক্ত দরজাটা সজোরে এক লাথিতে ভেঙে গেল!
​অন্ধকার দরজার ফ্রেমে দাঁড়িয়ে এক বিশালাকৃতির ছায়া—আব্রাম জাইয়ান চৌধুরী!
​জাইয়ানের পরনে গাঢ় কালো জ্যাকেট, চোখে সেই হিংস্র দানবীয় আবেশ। নূরের নিস্তেজ দেহ মাটিতে পড়তে দেখে জাইয়ানের ভেতরের সাইকোপ্যাথিক সত্তাটা এক মুহূর্তে হাহাকার করে উঠল!
​এক লাফে এসে সে নূরকে দুই বাহুতে তুলে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"রক্ত চেরি! ওপেন ইয়োর আইস! তোকে কে সাহস দিল আমার চোখ এড়িয়ে এই অন্ধকারে ঢোকার?"—জাইয়ানের গলায় পাগলাটে ব্যাকুলতা।
​নূর অর্ধচেতন চোখে জাইয়ানকে দেখে ভীতিপ্রদ কণ্ঠে ফিসফিস করল, "ভাইয়া... অন্ধকার... খুব ভয় করছে..."
​জাইয়ান পরম স্নেহে নূরের মাথায় নিজের কপাল ঠেকাল। তার চোখ দুটো হিংস্রতায় জ্বলছে। সে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তার গ্যাংস্টার অনুচরদের দিকে ফিরে বরফশীতল কণ্ঠে আদেশ দিল—
"যে হাত নূরাইশাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে, আর যে দরজা ওকে আটকেছে—দুটোই যেন আজকের সূর্যাস্তের আগে চিরতরে ছাই হয়ে যায়! অ্যান্ড ফাইন্ড আউট সেই মানুষটা আর তার পেছনের নেপথ্য কারিগরকে!"
​নূরকে নিজের জ্যাকেটের ভেতর পরম নিরাপদে লুকিয়ে কোলে তুলে নিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে বেরিয়ে এলো জাইয়ান। নূরের প্রতি এই আদিম, একচ্ছত্র আধিপত্য ও বিষাক্ত ব্যাকুলতাই জানান দিচ্ছে—বাইরের এই রঙিন পৃথিবীটা নূরের জন্য নয়, নূরের আসল ঠিকানা জাইয়ানের এই গাঢ় অন্ধকারে ঘেরা অন্ধ অবসেসনের খাঁচায়!
​চলবে...
[নতুন লিখতেছি গল্পটা কেমন লাগল। শব্দ গুলো এলোমেলো হয়েছে। ভুল হলে কমেন্ট করবেন।আশা করি বেশি করে শেয়ার করবেন সাথে লাইক কমেন্ট করতে ভুলবেন না]
‎

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন