ফন্ট সাইজ:
থিম:
the Killing love

৫ম পর্ব

লেখক: Aysha Siddiqui
গল্প: #The_Killing_Love
লেখিকা: #নূরাইশা_চন্দ্রা_নূর
পর্ব: ০৫
🚫 (সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার | ডার্ক রোমান্স | অবসেসিভ রোমান্স | গ্যাংস্টার আন্ডারটোন)
​[ অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ ]
​স্কুলের নিস্তব্ধ, ছমছমে পেছনের গলি ছাড়িয়ে জাইয়ানের কালো রঙের ধাঁচের গাড়িটি ঝড়ো গতিতে এসে থামল চৌধুরী মেনশনে রাজকীয় গেটের সামনে। গাড়ির দরজা খোলার আগেই জাইয়ান নিজের বুকের জ্যাকেটের ভেতর পরম শক্তিতে লুকিয়ে রাখল নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা নূরকে। নূরের ফর্সা কপাল বেয়ে ঠান্ডা ঘাম ঝরছিল, আর চোখ দুটো আধবোজা হয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছিল।
​জাইয়ান ধীর, শক্ত ও ভারী পদক্ষেপে নূরকে কোলে তুলে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করল। তার চেহারায় এক পৈশাচিক শান্তভাব, অথচ চোখের মণি রক্তবর্ণ ধারণ করে যেন ফুটন্ত লাভার মতো জ্বলছে।
​ড্রয়িংরুমে অস্থির হয়ে পায়চারি করছিলেন রাবেয়া। হঠাৎ জাইয়ানের কোলে নিজের নিষ্পাপ, নিস্তেজ নূরকে দেখতেই তাঁর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল! তিনি একছুটে জাইয়ানের দিকে ধেয়ে এলেন। তাঁর গলা দিয়ে ডুকরে ওঠা কান্না বের হলো—
​"জাইয়ান! কী হয়েছে আমার নূরের? ও এভাবে নিস্তেজ হয়ে আছে কেন? ওর কী হলো জাইয়ান, বলো আমাকে! স্কুলেই তো ভালো ছিল, হঠাৎ কী হলো ওর?"
​রাবেয়ার আকুল আকুতি আর অস্থিরতা যেন জাইয়ানের কানেই পৌঁছাল না। জাইয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি বরফের মতো শীতল। একটা শব্দও উচ্চারণ না করে সে সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল এবং নূরের রুমে গিয়ে তাকে যত্ন করে তুলতুলে বিছানায় শুইয়ে দিল।
​রাবেয়া ব্যাকুল হয়ে নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিছানার পাশে বসে পড়লেন। জাইয়ান নূরের চেহারার দিকে শেষ একবার পৈশাচিক আধিপত্যের দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে উল্টো পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা তিনতলার অন্ধকার করিডোরের দিকে এগোতে লাগল।
​সেখানে করিডোরের দেয়ালে হেলান দিয়ে কুটিল সন্তুষ্টির হাসি হাসছিল সায়েরা। সে ভাবছিল তার নিখুঁত ছক সফল হয়েছে, অনাথ মেয়েটা হয়তো আজ চরমভাবে শিক্ষা পেয়েছে। কিন্তু সে টের পায়নি যে মৃত্যুর কালো ছায়া কত দ্রুত তার দিকে ধেয়ে আসছে!
​ঝড়ের বেগে সায়েরার সামনে এসে দাঁড়াল জাইয়ান। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই, সায়েরার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরল সে! আর পর মুহূর্তেই চৌধুরী বাড়ির করিডোর কাঁপিয়ে সজোরে ঠাস ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল সায়েরার গালে!
​"চড়ড়ড়!"
​চড়ের চোটে সায়েরা আছড়ে গিয়ে পড়ল মার্বেলের শক্ত দেয়ালের ওপর! ঠোঁট ফেটে তাজা ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল তার। গালে যেন আগুনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। আতঙ্কে চোখ দুটো থরথর করে কেঁপে উঠল সায়েরার।
​জাইয়ান এবার এক হাঁটু গেড়ে সায়েরার সামনে নিচু হলো। সায়েরার থুতনিটা নিজের শক্ত, রগ ফোলা আঙুলে বিঁধিয়ে বরফশীতল হিংস্র কণ্ঠে ফিসফিস করে উঠল—
​"তোকে শেষ সতর্কবার্তা দিচ্ছি, সায়েরা... নেক্সট টাইম যদি ওই বেবি চাঁদের আশেপাশেও তোকে এক ইঞ্চি ছায়ার মতো দেখতে পাই, তবে তোর এমন অবস্থা আমি করব যে তুই নিজের চেহারা আয়নায় দেখে নিজেকেই চিনতে পারবি না! তিলে তিলে চামড়া ছাড়িয়ে তোকে জাহান্নামের রাস্তা দেখাব। আব্রাম জাইয়ান চৌধুরীর শিকারে হাত দেওয়ার পরিণাম মৃত্যু ছাড়া আর কিছু হয় না!"
​কথাটি শেষ হতেই সায়েরাকে এক ঝটকায় ফ্লোরে ফেলে দিয়ে জাইয়ান নিজের অন্ধকারের আর্ট রুমের দিকে হেঁটে চলে গেল।
​সায়েরা দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে গালে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল, কিন্তু বুকের ভেতরে জমে উঠতে লাগল এক চরম বিষাক্ত ঘৃণা! জাইয়ানের প্রতিটা চড় আর হুমকি নূরাইশার প্রতি সায়েরার হিংসার আগুনকে আরও এক হাজার গুণ বাড়িয়ে দিল। সে রক্তভেজা ঠোঁট মুছে বিড়বিড় করে ফুঁসে উঠল—
"এই চড়ের হিসাব তোকে দিতেই হবে নূর... আর অনাথ কুড়িয়ে আনা নূর তোকে আমি বাঁচতে দেব না! তোকে এই বাড়ি আর এই পৃথিবী থেকেই চিরতরে শেষ করে ছাড়ব আমি!"
​ততক্ষণে চৌধুরী বাড়িতে ডেকে আনা হলো পারিবারিক চিকিৎসক ডা. সাজিদ সাহেবকে। রুমের পরিবেশ থমথমে। জুবায়ের চৌধুরী আর রাবেয়া আশঙ্কাজনক চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছেন।
​নূরাইশাকে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, একটা কড়া স্যাডেটিভ ও ইনজেকশন পুশ করে ডাক্তার সাজিদ সাহেব গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন—
​"নূরাইশার অবস্থা খুব একটা ভালো নয়, জুবায়ের সাহেব। ভয়ংকর কোনো অন্ধকার  বা আতঙ্কের মুখোমুখি হয়ে শিশুটির আবারও তীব্র প্যানিক অ্যাটাক (Panic Attack) হয়েছে। ওর মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বড্ড ভঙ্গুর। আগের ট্রমা কাটার আগেই যদি ও বারবার এমন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, তবে ওর মস্তিষ্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে। ওকে সবসময় ভালোবাসায় আগলে রাখুন, কোনোভাবেই যেন ও একা বা অন্ধকারে না থাকে।"
​ডাক্তারের কথা শুনে রাবেয়া অঝোরে কেঁদে ফেললেন। জুবায়ের চৌধুরী অপরাধবোধে মাথা নিচু করে নূরের কপালে হাত রাখলেন।
​রুমের দরজার বাইরে আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল আব্রাম জাইয়ান চৌধুরী। তার রক্তবর্ণ চোখ দুটি জ্বলছিল অন্ধ অবসেসনে। সে মনে মনে মাতাল গলায় ফিসফিসিয়ে বলল—
​"প্যানিক অ্যাটাক? অন্ধকারকে ভয় পাস? তোর ভয়, তোর প্যানিক, তোর নিঃশ্বাস আর তোর জীবনের ওপর একমাত্র অধিকার শুধুই আমার, বেবি চাঁদ। পুরো দুনিয়া তোকে আগলে রাখুক, কিন্তু দিনশেষে তুই আমার এই অন্ধকারের ছায়াতেই বন্দী থাকবি... চিরকালের জন্য!"
​জাইয়ানের পাতলা ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক তাচ্ছিল্যের  হাসি। পকেট থেকে নিজের সিগনেচার মেটাল লাইটারটি বের করে সশব্দে আগুন জ্বালালো সে। আগুনের নীলচে শিখার দিকে চেয়ে তার রক্তবর্ণ চোখ দুটো এক অদ্ভুত আবেশে চকচক করে উঠল। বিড়বিড় করে সে নিজেকেই শোনালো—
"তোকে ভয় দেখানোর অধিকার শুধু এই জাইয়ানের, বেবি চাঁদ। অন্য কেউ তোকে ছুঁয়ে তোর চোখে ভয় আনবে—তা আমি সহ্য করব না। তোকে শাসন করব আমি, তোকে আগলে রাখব আমি, আর তোকে অন্ধকারের নেশায় বুঁদ করে রাখব আমিই!"
​লাইটারের ঢাকনাটা সশব্দে বন্ধ করতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো করিডোরে। জাইয়ান ধীর  পায়ে নিজের অন্ধকার আর্ট রুমের দিকে হেঁটে চলে গেল।
​এদিকে  আলো-ঝলমলে রুমটায় রাবেয়া বেগম মেয়ের বিছানার পাশে বসে অঝোরে কেঁদে চলেছেন। জুবায়ের চৌধুরী কাছে এসে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখতেই রাবেয়া ডুকরে উঠলেন—
"আমি আর নূরকে স্কুলে পাঠাব না! প্রথম দিনেই আমার মেয়েটার এই অবস্থা হলো? কোনো এক অদৃশ্য শত্রু আমার অবুঝ বাচ্চাটার পিছু নিয়েছে। আমি ওর কিছু হতে দেব না, জুবায়ের সাহেব! কিছু হতে দেব না!"
​জুবায়ের চৌধুরী শক্ত মুখে রাবেয়াকে আশ্বাস দিলেন—
"শান্ত হও রাবেয়া। প্রিন্সিপালের সাথে আমার কথা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হচ্ছে। যে-ই আমার নূরাইশার সাথে এই কাজ করে থাকুক, চৌধুরী পরিবারের ক্ষমতার হাত থেকে সে পার পাবে না। নূরে উজ্জ্বল ভবিষ্যতে জন্য স্কুলে যেতে হবে এছাড়া নূর এবার থেকে বাড়িতেই টিউটরের কাছে পড়াশোনা করবে।"
​পাশের রুমে সায়েরা তখন রাগে-ক্ষোভে নিজের রুমের জিনিসপত্র ছারখার করছিল। গালে জাইয়ানের হাতের পাঁচ আঙুলের রক্তাক্ত ও শক্ত ছাপ এখনো দাউদাউ করে জ্বলছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের রক্তভেজা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল সে—
"একটা অনাথ কুড়িয়ে আনা মেয়ের জন্য আমাকে থাপ্পড় মারলি জাইয়ান? তোর এই অহংকার আর ওই মেয়ের রূপ—দুটোই আমি এক সাথে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব! তুই ভাবছিস তুই একাই সাইকো? এবার দেখ সায়েরা কী করতে পারে!"
​সায়েরার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল তীব্র বিষাক্ত আক্রোশের জল। নূরাইশার প্রতি তার ঘৃণা এবার রূপ নিল এক প্রাণঘাতী চক্রান্তে।
​রাত ঘড়ির কাঁটায় তখন এগারো টা বাজে। ডাইনিং টেবিলের সবাই খাবার খাচ্ছে। 
​ রুমের দরজাটা কোনো শব্দ ছাড়াই ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে গেল। রুমের মৃদু নাইট ল্যাম্পের আলোয় প্রবেশ করল এক গাঢ় বিশালাকৃতির ছায়া—আব্রাম জাইয়ান চৌধুরী।
​তার পরনে সম্পূর্ণ কালো পোশাক, এলোমেলো চুল কপালে ঝুলে আছে। ধীর ও নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে সে এসে দাঁড়াল নূরের নরম বিছানার একদম পাশে। স্যাডেটিভের কড়া ওষুধের প্রভাবে ঘুমিয়ে থাকা নূরাইশার মুখে তখনো ট্রমার ছায়া, কপালটা সামান্য ঘামে ভেজা।
​জাইয়ান হাঁটু গেড়ে নূরের বিছানার পাশে বসল। তার রক্তবর্ণ চোখে তখন হিংস্রতার বদলে এক আকুলতা আর অন্ধ আধিপত্য। ধীর হাতে সে নিজের ব্যান্ডেজ করা রক্তাক্ত আঙুলটি বাড়িয়ে দিল নূরের ফর্সা, কোমল গালের ওপর। আলতো করে নূরের গাল স্পর্শ করতেই জাইয়ানের বুকের ভেতর অচেনা এক তোলপাড় শুরু হয়ে গেল!
​নূর ঘুমের ঘরেই একটু ছটফট করে উঠে জাইয়ানের সেই কড়া, সুবাসিত হাতটি নিজের ছোট দুটি মিষ্টি হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। অবুঝ শিশুটি ঘুমের ঘোরেই ফিসফিস করে উঠল—
"ভয় করছে... বাবাই... অন্ধকার..."
​নূরের কোমল হাতের স্পর্শ লাগতেই জাইয়ান ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হৃদস্পন্দন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে গেল! কিন্তু পর মুহূর্তেই তার ভেতরের উম্মাদ দানবটা আবার জেগে উঠল।
​জাইয়ান নূরের ঘুমন্ত মুখের একদম কাছে নিজের মুখটা নিয়ে এলো। নূরের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে বরফশীতল ও পরম মাতাল কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—
​"ভয় পাস না, আমার রক্ত চেরি... তোকে গিলে খাওয়ার অন্ধকার বাইরের দুনিয়ায় আছে, কিন্তু আমার এই খাঁচায় তুই সম্পূর্ণ নিরাপদ। তোকে এই দুনিয়ার সব বিপদ থেকে আগলে রাখব, কিন্তু বিনিময়ে তোকে শুধুই আমার হয়ে থাকতে হবে। তোর প্রতিটা নিঃশ্বাস, তোর প্রতিটা অনুভূতি আর তোর পুরো অস্তিত্বের মালিক কেবল আব্রাম জাইয়ান চৌধুরী!"
​কথাটি বলে জাইয়ান পকেট থেকে একটি ছোট, রক্তে আঁকা সুতো বের করল। নূরের ধবধবে ফর্সা ছোট্ট কবজিতে সেই গাঢ় লাল সুতোটি শক্ত করে বেঁধে দিল সে—ঠিক যেন এক চিরন্তন আধিপত্যের প্রতীক, এক অদৃশ্য শেকল!
​জাইয়ান বাঁকা হেসে বিড়বিড় করল—
"এখন থেকে তুই আর মুক্ত নোস, রক্ত চেরি। তোর গায়ে আমার সিল লেগে গেল!"
​দরজার আড়ালে লুকিয়ে এই অদ্ভুত কান্ড দূর থেকে দেখছিল ছোট পিউলি। জাইয়ান ভাইয়ার এই অস্বাভাবিক ও ভয়ংকর রূপ দেখে ভয়ে তার হাত থেকে ছোট্ট খেলনাটা পড়ে যেতে যেতেও কোনোমতে বেঁচে গেল। পিউলির অবুঝ মন বুঝে উঠতে পারল না, জাইয়ান ভাইয়া নূরকে বাঁচাতে চায় নাকি অন্য কিছু চায়। সে ভয়ে সেখানে থেকে চলে গেলো।
​নূরের ধবধবে ফর্সা কবজিতে লাল সুতোর সেই অদৃশ্য শেকল বাঁধার পরও জাইয়ানের ভেতরের আকুলতা আর আদিম অবসেসন যেন এক ফোঁটাও শান্ত হচ্ছিল না! তার রক্তবর্ণ চোখ দুটিতে তখন ফুটে উঠেছে চরম এক উন্মাদনা। সে নূরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার সেই রহস্যময়, বাঁকা হাসিতে ভেঙে পড়ল।
​পকেট থেকে সন্তর্পণে বের করল একটা ধারালো, চকচকে ছোট ক্যাটগার নান্দনিক কাঁচি আর একটা নিখুঁত নেলকাটার।
​জাইয়ান একদম নূরের গায়ের কাছে ঝুঁকে এলো। নূরের রেশমের মতো লম্বা কুচকুচে কালো নরম চুলের গুচ্ছের ভেতর নিজের রগ-ফোলা আঙুলগুলো প্রবেশ করাল সে। চুলগুলোর ঘ্রাণ টেনে নিল বুক ভরে—এক অদ্ভুত, মাতাল করা সুবাস! তারপর কাঁচি দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নূরের মাথা থেকে একগাছা কুচকুচে কালো রেশমি চুল কেটে নিল।
​এরপর নূরের নরম, পুতুলের মতো ছোট হাত দুটি নিজের তালুর ওপর তুলে নিল সে। স্যাডেটিভের কড়া প্রভাবে নূর তখনও গভীর ঘুমে অচেতন, কপালে হালকা ঘামের বিন্দু। জাইয়ান স্থিরতায় নূরের ডান হাতের তিনটে ধবধবে সাদা নখ অতি সাবধানে কেটে নিজের কাছে রেখে দিল।
​শেষে তার দৃষ্টি গেল নূরের গায়ের পরা সেই গোলাপি রঙের সুতির ফ্রকটার দিকে—যেটিতে নূরের গায়ের নিজস্ব নিষ্পাপ ঘ্রাণ লেগে আছে। কাঁচির ধারালো ডগা দিয়ে নূরের ফ্রকের নিচের ঝুল থেকে এক টুকরো সুতি কাপড় কেটে নিল সে।
​সবকিছু একটা ছোট কালো রেশমি থলিতে পুরে জাইয়ান উঠে দাঁড়াল। নূরের নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের ওপর শেষবার তাকিয়ে  ধীর, নিঃশব্দ পায়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে।
​সোজা এসে ঢুকল নিজের সেই অন্ধকারের রাজত্ব— আর্ট রুমে।
​রুমের দরজা ভেতর থেকে সশব্দে লক করে দিল সে। মেঝেতে ধুলোর ওপর কোনো আলো নেই, শুধুই গা ছমছমে আঁধার। জাইয়ান দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে রুমের ঠিক মাঝখানে গোল করে সাজানো সাতটি লাল মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল।
​লাল মোমবাতির ভীতিপ্রদ আলোয় রুমের চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন রক্তে ভেসে উঠল। মোমবাতির সেই বৃত্তাকার চক্রের ঠিক মাঝখানে জাইয়ান বসাল তার রক্ত দিয়ে আঁকা নূরের সেই  ক্যানভাসটি—যেখানে নূরের চোখ দুটো আঁকা হয়েছিল গাঢ় লাল রঙে!
​জাইয়ান হাঁটু গেড়ে বসল ক্যানভাসের সামনে। ক্যানভাসের নিচে রাখা একটা তামার থালায় সে এক এক করে রাখল নূরের মাথা থেকে কাটা সেই একগাছা লম্বা  রেশমি চুল, ছোট নখগুলো এবং নূরের গায়ের পরা কাপড়ের টুকরোটি।
​পকেট থেকে নিজের স্পেশাল পেন্সিল কাটার বের করে এক টানে নিজের বাঁ হাতের তালু চিড়ে ফেলল জাইয়ান! তাজা লাল রক্ত ফিনকি দিয়ে গড়িয়ে পড়ল তামার থালায় থাকা নূরের চুল, নখ আর কাপড়ের ওপর। রক্তে ভিজে একাকার হয়ে গেল নূরের জিনিসগুলো।
​জাইয়ানের চোখে তখন আর কোনো মানুষের অস্তিত্ব নেই—সে যেন এক জাগ্রত ডার্ক সাইকোপ্যাথ, কালো জাদুতে বুঁদ হওয়া এক অন্ধ প্রেমিক!
​থালায় নিজের রক্ত ঢালতে ঢালতেই ক্যানভাসের লাল চোখে চোখ রেখে পরম তৃপ্তিতে, অদ্ভুত এক গম্ভীর ও বিকৃত ছন্দে মন্ত্রের মতো বিড়বিড় করতে শুরু করল জাইয়ান—
​"রক্তে বাঁধলাম তোকে, তোকে বাঁধলাম আমার আত্মায়...
তোর চুল, তোর নখ, তোর গায়ের সুবাস—সব এখন আমার মন্ত্রে বন্দী!
যেদিন তুই এই জাইয়ানকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাববি, তোর পুরো অস্তিত্ব আগুনে জ্বলবে!
তুই শুধুই আমার... শুধুই আমার রক্ত চেরি! মৃত্যুও তোকে আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না...!"
​জাইয়ানের সেই গভীর, হাড়হিম করা মন্ত্রোচ্চারণ আর ভীতিপ্রদ বিড়বিড়ানি মোমবাতির লাল আলোয় দেওয়াল থেকে দেওয়ালে প্রতিধ্বনি হতে লাগল। রক্তের ঘ্রাণ আর মোমবাতির তীব্র ধোঁয়ায় আর্ট রুমটি যেন এক চরম অভিশপ্ত রুমে পরিণত হলো।
​ক্যানভাসের ওপর হাত রেখে জাইয়ান আবার সেই বিকট, উন্মাদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তার এই কালো জাদু আর রক্তে বাঁধা শেকলের ছায়ায় নূরাইশার অবুঝ জীবনটা এবার চিরতরে কোন অন্ধকারে তাকে বেঁধে ফেলল।
​(চলবে...)
[ নতুন লিখতেছি গল্পটা কেমন লাগল। শব্দ গুলো এলোমেলো হয়েছে। ভুল হলে কমেন্ট করবেন।আশা করি বেশি করে শেয়ার করবেন সাথে লাইক কমেন্ট করতে ভুলবেন না]
‎

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন