লেবু পানি দিতে এসে যে চাচাতো ভাইয়ের হাতে নির্মমভাবে ধ*র্ষিত হতে হবে তা ইহকালেও ভাবতে পারেনি ইরা। কাল রাতে নেশা করে বাড়ি ফিরেছিলো কায়সার বাড়ির বড় ছেলে ইয়াশ কায়সার। আর তাকেই স্বাভাবিক করতে ইরা লেবু পানি এনেছিলো ঘরে। তবে তার বদলে যে ইয়াশ তার সাথে এতোটা নির্মম আচরণ করবে তা তার ধারণাতেও ছিলো না। অতিরিক্ত নেশা করায় ইরার সাথে যখন ইয়াশ জোরজবরদস্তি করছিলো তখন ইরা তাকে বাঁধা দিচ্ছিলো নিজের সর্বশক্তি দিয়ে। একপর্যায়ে ইয়াশ ক্রুদ্ধ হয়ে পরণের বেল্ট তুলে আঘাত করতে থাকে ইরাকে। ইরা যখন বেল্টের আঘাত সইতে না পেরে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পরে ঠিক তখনি ইয়াশ নিজেকে সামলাতে না পেরে ইরার দেহে হামলে পরে। আর ঘটে এমন স্পর্শকাতর এক নির্মম ঘটনা।
১ম পর্ব
পরেরদিন সকালে।
নিকষ কালো অন্ধকার কাটিয়ে সূচনা হয়ছে নতুন দিনের৷ পাখিদের কিচিরমিচিরে মুখরিত প্রকৃতি। ফজরের আযান কানে ভেসে আসতেই টনক নড়ে ইরার। পিটপিট করে চোখ মেলে খানিকসময় চুপ থাকে সে। তার শরীর অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। নড়তে পারছে না বিন্দু পরিমাণও। তবে বুঝতে পারলো না কিছুই। ঘুম থকে জাগ্রত হওয়ার পর মাঝেমধ্যেই এমন হয় তার। এভাবেই প্রায় একমিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর হঠাৎ করেই মস্তিষ্কে ধাক্কা খেলো কাল রাতের ঘটনা।
তীব্র বেগে শোয়া হতে উঠে বসলো রমনী। তবে তাতেও ঘটলো বিপত্তি। শরীরের ব্যাথায় নিজেকে সামলাতে না পেরে চোখমুখ কুঁচকে ব্যাথাতুর আওয়াজ বেড়িয়ে গেলো কন্ঠ হতে। দু'হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে ঠুকরে কেঁদে উঠলো ইরা।জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিয়ে গলা হালকা করার চেষ্টা চালালো। নিজের শরীরের দিকে একবার তাকিয়ে'ই শক্ত করে চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। সাড়া শরীরে আঘাতের দাগ কালচে হয়ে ফুটে উঠেছে সাদা চামড়ায়। কোন কোন জায়গা থেকে রক্ত বেড়িয়ে জমাট বেঁধে গেছে। বেল্ট দিয়ে আঘাত করা স্থান গুলোর অবস্থাও বেশ করুণ।
ইরা ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা ইয়াশের পানে। কাল রাতে তার সাথে পশুর ন্যায় আচরণ করে এখন সেই মানুষটা কি নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে! দেখে মনে হচ্ছে সদ্য জন্ম নেওয়া কোন পবিত্র ফুল। অথচ এই সুন্দর রূপের আড়ালে বাস করছে এক অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ। যার দ্বারা কাল রাতে নিজের সবটুকু বিসর্জন দিয়েছে ইরা। ইরা বেশিক্ষণ ইয়াশের পানে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে আবারো ঠুকরে কেঁদে উঠলো।
অসহ্য যন্ত্রণাকে দূরে ঠেলে ধীরে ধীরে পা রাখলো মেঝেতে। মেঝেতে পা পরার সাথে সাথেই কেঁপে উঠল ইরার সাড়া শরীর। অসহ্য ব্যাথায় নীল হয়ে এলো মুখশ্রী। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা সহ্য করার পায়তারা করতে করতে হাত উঁচিয়ে মেঝে হতে নিজের পরনের কাপর তুলে গায়ে জড়িয়ে নিলো। অতঃপর হেলেদুলে পা বাড়ালো ঘরের বাহিরে। এখানে থাকাটা ভালো হবে না। ইয়াশ যদি ঘুম ভাঙার পর তাকে এখানে দেখে তাহলে এই ক্ষতবিক্ষত শরীরে আরো আঘাত বাড়িয়ে দিতে বিন্দু পরিমাণও আপসোস করবে না। তারওপর বাড়ির সকলে সবটা জানলে এ বাড়িতে আর থাকা হবে না তার। ইয়াশ যতই অপরাধী হোক না কেনো,দোষটা তো তার ঘাড়েই চাপবে।
ইরা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ছোট্ট ঘরে প্রবেশ করে। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে রেখেছে যাতে কান্না না বের হয়। নিজের ভাগ্যকে নিয়ে বলার মতো কিছুই যে তার কাছে নেয়। অভিযোগ করার'ই বা কে আছে? সে তো একা, এই বিশাল ধরনীতে লক্ষ-কোটি মানুষের ভিড়েও সে একা। যার মা নেই তার আছেই বা কি?
ইরা ক্লান্ত হাসলো। আলমারি হতে একটা সালোয়ার কামিজ নিয়ে প্রবেশ করলো ওয়াশরুমে গোসল করতে। যত তারাতাড়ি সম্ভব গোসল করে নিচে যেতে হবে। বড়মা, ছোট্ট চাচির আগে রান্নাঘরে ঢুকে সকলের জন্য সকলের খাবার তৈরি করতে না পারলে যে আরো একবার রামধোলাই খেতে হবে। কিন্তু এই ক্ষতবিক্ষত শরীর কি আর সেই ব্যাথার ভাড় সইতে পারবে?
ইরা দ্রুত হাতে পানি ছেড়ে তার নিচে দাঁড়ালো। তবে দাঁড়ানো মাত্র'ই তার শরীর তীব্র ব্যাথায় ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে ঠান্ডা পানির ছোঁয়া বিষের ন্যায় অনুভূত হলো তার কাছে। বেল্টের দেওয়া সেই আঘাতগুলো যেনো হা করে আছে। জলের স্পর্শে তা জ্বলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কাঁটা জায়গায় নুন-ঝালের গুঁড়ো একসঙ্গে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইরা চোখজোড়া বন্ধ করে আবারো কেঁদে উঠলো। নিজের মেইলি দেহের পানে তাকানোর ক্ষমতা হারিয়েছে সে। তার মন পুড়ছে, হৃদয় জ্বলে যাচ্ছে কালকের কথা মাথায় আসতেই। তবে ইরা নিরুপায়। এই নির্মম ঘটনার পর'ও সে কিছুই বলতে পারবে না। কেউ তার কথা বিশ্বাস করা তো দূর, উল্টো আঘাত করতেও পিছুপা হবে না।
ইরা আর ভাবলো না। নিজের সকল কষ্টকে দূরে ঠেলে গোসল শেষ করে বেড়িয়ে এলো। ভেজা চুল মুছে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে নিলো। গলা ভালো করে আড়াল করে নিলো ওড়নার আড়ালে। যাতে কোনরূপ চিহ্ন কারো নজরে না আসে। ইরার আবার চিন্তা হলো, ঠোঁটের সেই ফোঁলা ভাব নিয়ে। কেউ যদি প্রশ্ন করে কিভাবে ঠোঁট কাটলো তাহলে? তখনি মনে পরলো, তার আঘাতে কার কি এসে যায়? কে এমন আছে যে তার শরীর নিয়ে কথা বলবে? ভাববে একবার?
ইরা তারাতাড়ি একটা ব্যাথানাষক ঔষধ খেয়ে নিচের দিকে পা বাড়ালো। আজ আর নামাজ পড়া ভাগ্যে নেই তার। সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামার সময় অনুভূত হলো তার পা'দুটো বোধহয় তীব্র ব্যাথায় শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে। প্রত্যেকটা ধাপ যেনো কাঁটার মতো সরাসরি তার হৃদয়ে বিঁধছে।
ইরা রান্নাঘরে পা রেখেই খুব সন্তর্পণে চারিদিকটায় নজর বুলালো। নাহ, কেউ নেই। ইরা বুকে হাত দিয়ে ধীরে একটা নিশ্বাস ছাড়লো। ক্লান্ত শরীর নিয়ে হাত রাখলো কাজে। চুলায় চায়ের জন্য গরম পানি দিয়ে রুটি ও তরকারি বানানোর প্রস্তুতি নিলো। যেই ভাবনা সেই কাজ, ইরা নিপুণ হাতে একে একে সকল কাজ করতে থাকলো। এভাবেই পেড়িয়ে গেলো অনেকটা সময়। প্রায় সাত'টার দিকে সেখানে উপস্থিত হলো বাড়ির দুই কর্তী। ইয়াশের মা অনামিকা ও চাচি মিতালি । দু'জনেই অতি দাম্ভিকতার সাথে রান্না ঘরের দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করে নজর আকর্ষণ করলো ইরার। ইরা দ্রুত সেদিকে তাকাতেই ভেসে এলো অনামিকা বেগমের কর্কশ ধ্বনি। তিনি বেশ উঁচু গলায় বললেন---
—কি রে নবাবজাদি, হলো তোর? আর কত সময় লাগবে?
ইরা দ্রুত মাথা নাড়িয়ে মিনমিন করে বললো----
—চা তো অনেক আগেই চড়িয়েছি, বড়মা। তবে কেউ ছিলো না দেখে দেয় নি। আমি এখুনি চা দিচ্ছি। পাঁচ'মিনিট অপেক্ষা করুন তরকারিটা হলেই খেতে দিবো।
মিতালি বেগম একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন---
—আরো পাঁচ মিনিট? সকাল সকাল উঠতে পারিস না? বাড়ির কর্তারা যে কাজে যাবে সে খেয়াল কি ছিলো না?
ইরা মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে। ধীর কন্ঠে বলে---
—শরীরটা একটু খারাপ ছিলো তাই....।
—এই রাখ তো তো শরীর। সারাদিন পায়ের উপর পা তুলে খায় তার আবার শরীর! যতসব ন্যাকামো।
অনামিকা বেগম ও মিতালি বেগম মুখ ঝামটা দিয়ে সেখান থেকে চলে যান। ইরা উপরে সিলিং এর পানে একবার তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠলো নোনা জল। তবে ইরা তা গড়াতে দিলো না। বরং ধীরে ধীরে তা মুছে চায়ের ট্রে হাতে ছুট লাগালো বসার ঘরের দিকে। তার পা অস্বাভাবিক কাঁপছিলো।
ইরা সবাইকে চা দিয়ে আবারো রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ালো। খানিকবাদে সকালের খাবার একে একে টেবিলে রাখলো। সকলে নিজ নিজ চেয়ারে বসে পরলো শুধু ইয়াশ বাদে। সে এখনো নিচে আসে নি। এ বাড়ির বড় কর্তা ইসহাক কায়সার, মেঝো কর্তা নিহান কায়সার যিনি সম্পর্কে ইরার বাবা। আর সকলের ছোট্ট মুহিন কায়সার মিলে ব্যাবসা নিয়ে আলোচনা করতে করতে খাবার মুখে পুড়তে লাগলেন।
ইসহাক কায়সার ও মুহিন কায়সারের স্ত্রী-রাও বসে পরেছেন। তাদের পাশেই বসেছে বর্তমান এ বাড়ির একমাত্র মেয়ে কোয়েল। হ্যাঁ, সে একমাত্র মেয়েই। কেননা ইরা তো তাদের কেউ না। তারা কি তাকে এ বাড়ির মেয়ে বলে মানে নাকি? কোনদিন মেনেছে? এ বাড়ির সবচেয়ে বড় মেয়ে পিহুর বিয়ে হয়েছে পাঁচ বছর আগে। আর বর্তমান বাড়িতে দু'টো মেয়ে কোয়েল ও ইরা থাকলেও সকলের চোখে কোয়েল নামক মানবীটিকে দেখা যায়। ইরা তো শুধু এক অন্ধকার ছায়া। যার খবর কারো কাছে থাকে না।
ইরা একবার তাকালো বাবার মুখশ্রী পানে। যিনি নিজের সংসারের সকল সদস্যদের পাশে নিয়ে ভোজনে ব্যাস্ত। অথচ তার নিজের মেয়ে অনাহারে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। আচ্ছা, তার কি এক বারও মনে হয়েছে ইরার কথা? একবারও মনে পরে যে, তারও একটা মেয়ে আছে? যে সকলের চোখে কেবল অদৃশ্য হয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। সকলে তাকে দেখেও দেখে না!
ইরা বাবার পানে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না। কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো। পিছন ঘুড়ে ধীর পায়ে হাঁটা ধরলো রান্নাঘরের দিকে। কেউ একবার সেদিকে তাকালো না অবদি।
ইরা চলে যেতেই সেখানে উপস্থিত হয় ইয়াশ। তার চোখমুখ একদম স্বাভাবিক। মুখে কোনরূপ অস্বাভাবিকতার ছাপ নেই। বরং দেখে মনে হলো, সবকিছু আগের মতোই ঠিক। কাল রাতের ঘটনাও ইয়াশের হৃদয়ে এতোটুকু অনুতাপের সৃষ্টি করলো না। একটিবার মনেও হলে না ইরার কথা। ইয়াশ চেয়ারে বসে নিজের খাবার শেষ করে গাড়ির চাবি নিয়ে বেড়িয়ে গেলো বাড়ি থেকে। কেউ একবার জিজ্ঞেসও করলো না যে সে কোথায় যাচ্ছে?
-----------------
ইয়াশ নিজের জীপগাড়ি নিয়ে এসে উপস্থিত হলো বন্ধুমহলে। যেখানে উপস্থিত আরো তিনবন্ধু। রনি, সাহেদ ও নিলয়। ইয়াশকে দেখেই হাত মিলিয়ে কুশল বিনিময় করলো সকলে। সকলের মুখে হাসির ঝলক খেলা করছে। ইয়াশ এসে মাঝখানে বসতেই সেখানে উপস্থিত হয় শর্ট ড্রেস আপে মুড়িয়ে রাখা এক মানবী। মুখে হাসি, মাথার কার্ল করা চুলগুলো আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে এগিয়ে এসে ইয়াশের গায়ের সাথে গা মিলিয়ে বসলো। অতঃপর ইয়াশের কাঁধে হাত বুলিয়ে বললো---
— ইয়াশ বেবি, তুমি এতো দেরি করলে কেনো? তোমার জন্য সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি, তুমি জানো তা?
টিনা নামক মেয়েটির ন্যাকামো স্বরে কথা বলায় হাসলো ইয়াশ। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রল করতে করতে বললো----
—এসেছি তো।
—হ ভাই। তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে মেয়েটার হাড়-মাংস সব শুকিয়ে একাকার। আর তুই এতো নিষ্ঠুর যে এতোটা লেট করে এলি?
কপাল কুঁচকে নিলো ইয়াশ। রনি যে মজা লুটছে তা বুঝতে দেরি হলো না। বসা হতে উঠতে উঠতে বললো----
—চল, রাইডে যাবো।
সকলে শায় জানালো তার কথায়। একে একে সকলে উঠে পিছু নিলো ইয়াশের।
চলবে......
#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি
#মোনালিসা_মেহরোজ ( R.V Aru)
#পার্ট_1
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান