#প্রেমের_শেষ_পঙক্তি_তুমি
#মোনালিসা_মেহরোজ
#পার্ট_২
সারাটাদিন নানান ব্যাস্ততায় কেটেছে ইরার। অসুস্থ শরীরটা আরো অসুস্থ হয়ে পরেছে। সেই সকাল থেকে বাড়ির সব কাজ একা হাতে করতে করতে ভেঙে পরেছে মেইলি দেহখানা৷ ক্লান্ত হয়ে কাজ থামিয়ে এক'মিনিট দাঁড়িয়ে আবারো শুরু করতে হয়েছে। এতো বড় বাড়ি ঝাড়ু দেওয়া থেকে শুরু করে মোছা, সকলের কাপড় কাঁচা, সাথে রান্নাবান্নার কাজ তো আছেই। শরীরের অসহ্য ব্যাথাকে লুকিয়ে এতো এতো দ্বায়িত্ব পালন করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে প্রায়। তার ওপর পেটে তেমন ভারি খাবার না পরাই শরীরটা নুইয়ে পরেছে। চোখমুখ ফ্যাকাশে বর্ণ ধারন করেছে।
সকালে মেডিসিন নিলেও শরীরের ব্যাথা কমে নি একফোঁটাও। মনের ব্যাথার কথা না-হয় বাদ'ই। কালকের ঘটনা মস্তিষ্ক থেকে বিতাড়িত করার তীব্র প্রচেষ্টায় ব্যাকুল ইরা। শরীরের আঘাত ছাপিয়ে মনের দুঃখে মুখে কিছু তুলতেও পারছে না। সকালে খাবার টেবিলে যে যার মতো খেয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলো। দুপুরেরও একই অবস্থা, রাতের খাবারও সকলের শেষ। এতোক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে সবাই।
আর ইরা?
সে তো রোজকার রুটিন অনুযায়ী আজ-ও কারো অপেক্ষা রাত্রি যাপন করছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমানোর উদ্দেশ্য ঘরে যেতে যেতে অনামিকা বেগম কঠোর আদেশ দিয়ে গেছেন ইরাকে। যাতে সে নিজের ঘরে গিয়ে নাক ডেকে না ঘুমায়। কেননা তার আদরের ছেলেটা যে ঘরে ফেরে নি। কখন ফিরবে তার-ও ঠিক নেই। বাড়ি ফিরলে তাকে খাবার বেড়ে দেওয়ার জন্য তো কাউকে থাকতে হবে! আর বাড়িতে ফ্রী ফ্রী কাজের লোক থাকতে সে কেনো রাত্রি যাপন করবে? তাই তো কোনরূপ মাতৃত্বের দ্বায়িত্ব পালন না করে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে রাতজাগা পাখির ন্যায় বসার ঘরে বসিয়ে দিয়ে গেছেন ক্লান্ত ইরাকে।
ইরা চেয়ারে বসে টেবিলের কোণায় মাথা এলিয়ে বসে আছে। তার চোখ বেঁয়ে গড়িয়ে পরছে অভিমানী অশ্রুরা। খোদার প্রতি তার হৃদয়ে যে অভিমান জন্মেছে তার হিসেব-নিকেশ করতে ব্যাস্ত সে। এই মুহূর্তে ইয়াশ নামক সেই পুরুষটার মুখোমুখি কিভাবে হবে তা বুঝতে পারছে না ইরা। ওই পাষান জানোয়ারটার মুখ দেখলেও যে তার ঘৃণায় কলিজা ছিঁড়ে যাবে, তার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা কি ইরার আছে? বড় মাকে তো অসুস্থতার দোহাই দিয়েও লাভ হলো না। তাহলে এখন কি করবে সে?
এতোকিছু ভাবনার মাঝেই কলিং বেলটা উচ্চ স্বরে বেজে উঠল। ইরা ভাবনার জগৎ থেকে ছিঁটকে বেড়িয়ে এলো। তার বুক কেঁপে উঠল। নিশ্বাস অস্বাভাবিক হয়ে এলো, হাত-পা মৃগী রোগীর ন্যায় কাঁপতে লাগলো। ইরা সামনে পা বাড়াতে পারলো না। ওই পুরুষটার চোখে কি করে চোখ রাখবে সে? নিজের ধর্ষনকারীর প্লেটে কি করে খাবার বাড়বে?
ইরা সেখানেই থমকে গেলো। এর মাঝেই আরো বেশ কয়েকবার কলিং বেলটা বেজে উঠল। ইরা দেরি করলো না। এভাবে কলিংবেলের আওয়াজ হলে বাড়ির সবাই জেগে যাবে। তখন আবার সকলকে জবাবদিহি করতে হবে, দু'একটা চর থাপ্পড়ও জুটতে পারে।
ইরা কাঁপা কাঁপা শরীরে পা বাড়িয়ে দরজার কাছে দাঁড়ালো। অতঃপর ধীর হস্তে ছিটকিনিটা খুলে মাথা নিচু করে নিলো। ইয়াশ ভেতরে প্রবেশ করেই কোনকথা না বলেই সপাটে একটা থাপ্পড় মেরে বসলো ইরার গাল বরাবর। আচমকা এমন আক্রমণে নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে মেঝেতে আছড়ে পরলো ইরা।
বলিষ্ঠ হাতের এমন আঘাতে ইরার মাথা দুলে উঠলো। তার চোখের সামনে সবকিছু কেমন অন্ধকার হয়ে এলো। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে মাথা তুলে তাকালো ইয়াশের কঠিন মুখশ্রীপানে।তার চোখে টলমল করছে ব্যাথাতুর অশ্রুরা।
ইয়াশ এগিয়ে এসে এক ঝটকায় ইরার চুলের মুঠি টেনে ধরে তুলে দাঁড় করালো তাকে। তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকিয়ে উঠলো ইরা। দাঁত মুখ খিঁচে কেঁদে উঠলো। ইয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে বললো---
—এই ফকিন্নির বাচ্চা, এক দরজা খুলতে কত সময় লাগে হ্যাঁ? কানে শুনতে পাসনি কলিং বেলের আওয়াজ? নাকি হাত-পা নেই তোর দরজা খেলার জন্য?
ইরা ইয়াশের হাত চুলের গোছা হতে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললো---
—ভু....ভুল হয়ে গেছে আমার। ছেড়ে দিন প্লিজ, খুব লাগছে।
—লাগুক, লাগার জন্যই তো ধরেছি। আজকে এমন শিক্ষা দেবো যাতে দ্বিতীয়বার এমন ভুল না হয়।
ইয়াশ টেনে হিঁচড়ে ইরাকে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে গেলো। ইরা হাত জোড় করে মাফ চাইতে লাগলো। সে জানে এখন কি হবে, এর আগেও তো একই শাস্তি বারবার পেয়েছে।
—ছেড়ে দিন না দয়া করে...।
ইরা ঠুকরে কেঁদে উঠলো। কন্ঠ স্বর রোধ হয়ে এলো তার। ইয়াশের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলো। এর মাঝখানে'ই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসলেন ইরার বাবা নিহান কায়সার। হাতে পানির বোতল, হয়তো পানি ভরতেই নিচে আসছেন! তবে নিচে ইয়াশ ও ইরাকে ওভাবে দেখে পা থামিয়ে নেন তিনি। কপাল কুঁচকে বলেন---
—কি হচ্ছে এখানে? ইয়াশ, বাবা কি করছিস?
ইয়াশ মেঝো চাচার পানে তাকিয়ে বললো---
—কিছু না চাচ্চু, ওকে একটু শিক্ষা দিচ্ছিলাম।
ইরা দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে নিহান কায়সারের উদ্দেশ্য বললে---
—বা...বাবা, বাবা বাঁচাও আমাকে। ওনাকে ছেড়ে দিতে বলো দয়া করে। আমি মরে যাবো বাবা।
ইয়াশ ইরার চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে সামনে দাঁড় করিয়ে বললো---
—বাবা বাবা বললেই সব অপরাধ মাফ? তোকে তো আজকে...!
—ইয়াশ, অনেক রাত হয়েছে। যা করার কাল করো। এখন ঘরে যাও।
অতঃপর তিনি একবার তাকালেন ইরার পানে। শক্ত কন্ঠে বললেন---
—তোমার ওই মুখ থেকে যেনো দ্বিতীয়বার বাবা ডাকটা শুনতে না পাই। মনে রেখো, তুমি আমার কাছে মৃত। তাই বাবা ডেকে নিজেকে আমার মেয়ে বলে পরিচয় দিতে যেও না। আর হ্যাঁ, এটাও ভেবো না তোমাকে ভালেবেসে ইয়াশের হাত থেকে বাঁচাচ্ছি, রাত হয়েছে। কোনরূপ অশান্তি চাই না বিধায় মাফ পেলে। না হলে অন্যায়ের শাস্তিটা এখনি পেতে।
নিহান কায়সার শক্ত দৃষ্টিতে একপলক ইরার পানে তাকিয়ে বোতলে পানি নিয়ে উপরে চলে গেলেন। ইয়াশ ইরাকে নিজের থেকে ছিটকে ফেললো। ইরা আবারো আছড়ে পরলো শক্ত মেঝেতে। তবে কোনরূপ আর্তনাদ তার কন্ঠ হতে বের হলো না। সে শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তার বাবা নামক মানুষটার চলে যাওয়া দেখলো। নিজের মেয়ের প্রতি এতো ঘৃণা কোথা থেকে আসে তার? ভেবে পেলো না ইরা। মুখ ফুটে কিছু বলার মতো শক্তি বা ভাষা, কোনটাই নেই তার।
ইয়াশ এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে ইরার মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসে পরলো। মুখে বাঁকা হাসির রেখা টেনে পরখ করলো ইরার মুখশ্রী। গলার কাছের সেই কালচে দাগ নজর এড়ালো না তার। হাত উঠিয়ে স্পর্শ করতে গেলেই ইরা ছিটকে দূরে সরে গেলো। তীব্র ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। ইয়াশ কিছুই বললে না। তার মুখের কোন পরিবর্তন লক্ষ করা গেলো না। ইয়াশ বসা হতে উঠে পা বাড়ালো উপরের দিকে।
— আমার সাথে এটা কেনো করলেন, ইয়াশ ভাইয়া? কি অন্যায় করেছিলাম আমি? কেনো এতো বড় শাস্তি দিলেন আমায়?
ইরার কথায় থমকে গেলো ইয়াশের পা। পিছনে না তাকিয়ে'ই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পকেটে হাত গুঁজে নিলো। কাঠকাঠ গলায় বললো---
—আমি ইচ্ছে করে কিছু করি নি, ড্রাংক ছিলাম। সামলাতে পারি নি নিজেকে। তবে হ্যাঁ, এটাও ঠিক যে, কালকের ঘটনার জন্য আমি মোটেও অনুতপ্ত নই। কজ আই হেইট ইউ। আই হেইট ইউ সো ম্যাচ।
ইরা হাসলো। সে জানে, এ বাড়ির কেউ তাকে ভালো চোখে দেখে না। সকলের ঘৃণার পাত্রী সে। ছোট্ট বেলা থেকে এটাই হয়ে এসেছে। তাই নতুন করে ইয়াশের মুখ থেকে এমন বাণীতে খুব একটা অবাক হলল না ইরা, না তো কষ্ট পেলো। ক্লান্ত শরীর টেনে তুলে দাঁড়িয়ে পরলো। ভাঙা গলায় বললো---
—এই ঘৃণাটা সারাজীবন আগলে রাখবেন, ইয়াশ ভাই। বলা তো যায় না, কখন একেবারে সব ছেড়ে চলে যাই। তখন অন্তত মায়া হবে না, কষ্ট হবে না। এই ঘৃণাটা আপনাকে সেই সুযোগ দেবে'ই না।
ইয়াশ তার কথায় খানিকক্ষণ চুপ থাকলো। কোন উত্তর করলো না। বড়বড় পা ফেলে ত্যাগ করলো ড্রয়িংরুম। ইরা তার যাওয়া পানে তাকিয়ে মাথায় হাত রাখলো। কেমন জানি ঘুড়ছে মাথাটা! মনে হচ্ছে এখনি সেন্স হারাবে। ইরা আর দাঁড়ায় না। টেবিলে রাখা ভাতের থালাটা স্বযত্নে ঢেকে রেখে পা বাড়ায় নিজের জন্য বরাদ্দকৃত সেই ছোট্ট ঘরটায়। ঘরে প্রবেশ করেই ক্লান্ত দেহটাকে বিছানায় এলিয়ে দিলো ইরা। তবে নড়াচড়া করতে পারলো না, পিঠের ঘা এখনো তাজা। বিছানার চাদরের সাথে সংঘর্ষে তা যেনো জ্বলে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। ইরা হাসলো, ঠোঁটের কোণায় তাচ্ছিল্য হাসিসমেত চোখের কোনায় চকচকে জল নিয়ে চোখ বুঁজে নিলো।
----------------
সকাল সকাল কায়সার বাড়িটা আনন্দে মেতে উঠেছে। রান্না ঘরে হরেক রকমের খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। সকলের মুখেই হাসির ঝলক। আজ এ বাড়ির বড় মেয়ে পিহু আসছে, সাথে তার স্বামী ইউভান। অনেকদিন বাদে চাকরি থেকে কয়েকদিনের জন্য ছুটি পেয়েছে ইউভান। এ খবর জানতে পেরেই প্রয়তমা স্ত্রী পিহু আবদার করে বসে বাপের বাড়ি আসার। তাই ইউভানও না করে নি। স্ত্রীকে সঙ্গে কথা নিয়ে বেড়িয়ে পরছে শশুর বাড়ির উদ্দেশ্য। কায়সায় বাড়িতে পৌঁছবে কিছুসময়ের মধ্যেই।
আর তাদের আগমনী বার্তা কানে পৌঁছাতেই কায়সার বাড়িতে তোরজোর শুরু হয়ে গেছে মেয়ে জামাইকে আপ্যায়ন করতে। ইরার পাশাপাশি আজ অনামিকা বেগমও রান্নার কাজে হাত রেখেছেন। সাথে মিতালি বেগমও টুকটাক সাহায্য করছে।
ইরা বড় আপার আসার কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলো। এই একটা মানুষের কাছেই সে একটু শান্তি পায়। পিহু নামক মেয়েটার কাছেই তো ইরার একটু হলেও দাম আছে। ছোট্ট বেলা থেকে সে যথেষ্ট স্নেহ করেছে ইরাকে। আর ইউভান? সে তো ইরাকে নিজের ছোট বোনের ন্যায় দেখে। মাথায় হাত রেখে স্নেহের সহীহ হাত বুলিয়ে খোঁজ নেয় তার।
তাই তো তাদের আসার খবরে বেশ উচ্ছাসিত সে। তবে তা মনের ভেতরেই চেপে রাখলো, তার যে সুখ-দুঃখ প্রকাশ করার অনুমতি নেই। এ বাড়িতে সে স্রেফ একটা ছায়া। যে হাসবে না, কাজ বাদে এক সেকেন্ডও বসবে না। প্রয়োজনের বাহিরে কথা বলা তো দূর, নিশ্বাসও নিবে না। আর ইরা তা মেনে নিয়েছে। তাই তো এতোকিছুর পরও সে চুপচাপ, একদম রোবটের ন্যায় আচরন তার।
বেশকিছু সময় পর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল। অনামিকা বেগম হাত মুছে ছুটলেন দরজার পানে। আজ বাড়ির সকলে উপস্থিত। কর্তারা সোফায় বসে খবরের কাগজে ডুবে আছেন। তবে কলিং বেলের আওয়াজে সকলে সেই দিকে তাকালো। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো পিহু ও ইউভান। ইউভানের হাতে কয়েকটা প্যাকেট। সে তা নিচে নামিয়ে রেখে সকলের উদ্দেশ্য সালাম দিলো। উপস্থিত সবাই তার উত্তর করে জামাইকে পাশে বসালেন।
পিহু ভিতরে প্রবেশ করেই মাকে জড়িয়ে ধরলো। অনামিকা বেগমও আনন্দে আত্মাহারা হয়ে মেয়েকে কাছে টেনে কপালে চুম্বন করলেন। বললেন---
—কেমন আছিস মা?
—ভালো, তুমি?
অনামিকা বেগম মাথা নাড়ালেন। পিহু এগিয়ে এসে বাবা-চাচাকে সালাম করলো। অতঃপর সোফায় বসে কুশল বিনিময়ে ব্যাস্ত হয়ে পরলো। এভাবেই অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। এখানে সকলে উপস্থিত থাকলেও ইরাকে না দেখতে পের ভ্রু কুঁচকে নিলো পিহু। পাশে বসা কোয়েলকে বললো---
—হ্যাঁ রে, ইরা কই? দেখছি না যে?"
কোয়েল ফোন স্ক্রল করতে করতে বললো---
—রান্না ঘরে।"
পিহু উঠে এক ছুটে রান্নাঘরে প্রবেশ করলো। রান্নায় মনোযোগী ইরাকে পিছন থেকে জাপ্টে ধরলো। ইরা চমকে পিছন ফিরে পিহুর মুখশ্রী দেখে হেঁসে দিলো। অতঃপর সামনে ফিরে নিজেও বোনকে জড়িয়ে ধরে বললো---
—কেমন আছো, আপি?"
—হুম ভালো, তোর কি খবর?"
ইরা হাসলো। পিহুর হাত ধরে বললো---
—সারাজীবন যেমন থাকি!"
পিহুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। ইরার কোমল মুখশ্রী পানে এক নজরে তাকয়ে রইলো খানিকক্ষণ। তবে হঠাৎ করেই নজর গেলো গলায় নিচে কালচে দাগগুলোর উপর। পিহু একমিনিট চুপ থাকলো, অতঃপর একটানে ইরাকে পিছন ঘুড়িয়ে গলা হতে ওড়না খুলে নজর দিলো পিঠের দিকে। জামাটা আলগা করে ফেললো, ইরা বাঁধা দিলে চোখ গরম করে তাকালো পিহু। ইরা চুপ মেরে গেলো।
—এসব কি করে হলো?কে মেরেছে এভাবে?"
—ভাগ্য।"
ইরা অনুভূতিহীন কন্ঠে কথাটা বলে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো পিহুর পানে। পিহু হঠাৎ করেই ঠুকরে কেঁদে উঠলো। ইরাকে বুকের মাঝে জাপ্টে ধরে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। ছোট্ট বেলা থেকে দেখে আসছে এসব। যখন তখন যার তার হাতে আঘাত পেতে পেতে শরীরের নানান জায়গায় ক্ষতের দাগ পরে গেছে ইরার। পিঠের এক পাশটায় এখনো অনামিকা বেগমের দেওয়া আঘাতের জায়গাটা কালচে দাগ হয়ে আছে। তবে কালকে ইয়াশের করা ঘটনাটা সে বুঝতে পারলো না, কেননা তার শরীরে এমনিতে'ই অসংখ্য দাগে ভরে গেছে। তাই ইয়াশের করা শারীরিক অত্যাচারের দাগ গুলো আলাদা করে স্পষ্ট নয়।
পিহু হাজারবার সকলের হাত থেকে ইরাকে বাঁচাতে চেয়েও পারে নি। উল্টো নিজের চোখের সামনে দেখে যেতে হয়েছে সবকিছু। পিহুকে এভাবে কাঁদতে দেখে ইরা হেঁসে মুখটা টেনে তুললো পিহুর৷ গালে হাত রেখে বললো---
—এখন কি কাঁদবে না-কি জিজুর সাথে দেখা করাবে?"
পিহু চোখমুছে মাথা নাড়ালো। ইরার হাত ধরে বসার ঘরে নিয়ে এলো। ইউভান ইরাকে দেখেই হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো। ইরা ইউভানকে সালাম দিলে ইউভান হাসিমুখে তা গ্রহন করে। অতঃপর হেঁসে বলে---
—কেমন আছো, ইরাবতী?"
ইউভানের এমন সম্মোধনে হেঁসে দিলো পিহু। ইরা বললো---
—আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?"
—আলহামদুলিল্লাহ, একদম ঝাক্কাস।"
তাদের কথার মাঝখানে ইরার চোখ গেলো অনামিকা বেগমের পানে। যে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার পানে।ইরা শুকনো ঢোক গিলে মাথা নুইয়ে নিলো। সে বেশ বুঝলো তার এখানে আসাটা মোটেও পছন্দ হয় নি তার। ইরা দ্রুত পায়ে রান্না ঘরে যেতে যেতে বললো---
—আবার পরে কথা হবে। রান্না চাপিয়েছি, পুড়ে যাবে।"
চলবে.....
(রেসপন্স করবেন প্লিজ। আর কেমন লাগলো জানাবেন)