#সুইটবার্ড
#কলমে_মায়াবিনী_ঐন্দিলা
#পর্ব_৭(২)
আবিরা দ্রুত পেছনে ফিরে তাকাতেই তীব্র আলোর এক আলোকচ্ছটা তার চোখে এসে পড়ে। গাড়ির হেডলাইটের সেই অতিরিক্ত আলোর তেজ সহ্য করতে না পেরে সে চোখ দুটো একদম বন্ধ করে ফেলে।
হাত দিয়ে নিজের মুখ ও চোখ ঢেকে ফেলার চেষ্টা করে সে। হাত সামান্য সরিয়ে পিটপিট করে দেখার চেষ্টা করতেই দৃশ্যমান হয় এক মায়াবী কিন্তু রহস্যময় অবয়ব।
গাড়ির ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক সুদীর্ঘ, কৃষ্ণবর্ণের কালচে ছায়াময় মানব। যার দীর্ঘ দেহাবয়বের ছায়াটি আবিরার নিজ ছায়ার চেয়েও অন্তত দ্বিগুণ লম্বা দেখাচ্ছে।
ভয়ে ও আতঙ্কে আবিরার হৃদপিণ্ড যেন এক অনিয়ন্ত্রিত ঘোড়ার মতো দ্রুত গতিতে ছুটতে শুরু করল। তাকে সমস্ত ভাবনায় ফেলে দিয়ে কালো পোশাকাবৃত লোকটি খুব ধীর আর নিশ্চিত পদক্ষেপে আবিরার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আবিরা আর কোনো উপায় না পেয়ে দু'চোখ শক্ত করে বন্ধ করে মনে মনে আগের মতোই সূরা তিলওয়াত করতে থাকে।
লোকটি এসে দাঁড়ায় আবিরার ঠিক মুখোমুখি, একদমই সন্নিকটে। তার সেই সুগঠিত ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সে আবিরার উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একনজর পর্যবেক্ষণ করল। এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল সে যে, আবিরার ভয়ার্ত মুখ থেকে বিড়বিড় করে ভেসে আসা দোয়ার আওয়াজ স্পষ্ট পৌঁছাচ্ছিল তার কানে।
আবিরার এমন ভয়ার্ত ও নিষ্পাপ অবস্থা দেখে লোকটির ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাসত্ত্বেও একচিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তবে মুখে মাস্ক পরিহিত থাকায় আবিরা লোকটির সেই প্রচ্ছন্ন হাসিটুকু দেখতে পেল না।
লোকটি হাত বাড়িয়ে পকেট থেকে একটা রিমোট বের করে বোতাম টিপতেই গাড়ির সেই তীক্ষ্ণ আলো এক নিমেষে নিভে গেল। চারপাশে নেমে এলো রাতের স্বাভাবিক নীরব অন্ধকার। আলোর তীব্রতা কমতেই আবিরা এক দীর্ঘ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পিটপিট করে চোখ দুটি খুলল।
চোখ খুলেই আবিরা দেখতে পেল—তার ঠিক সামনেই কালো পোশাকে নিজেকে মুড়ে রাখা একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে, যার কেবল দুটো চোখ খোলা। আর সেই চোখে চোখ পড়তেই ১৮ বছরের যুবতী আবিরা যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল! নিজের পুরো জীবনে সে কখনো এত অদ্ভুত, সম্মোহনী আর প্রখর দৃষ্টির মুখোমুখি হয়নি।
লোকটির দুই চোখে এক অপরূপ মেলবন্ধন—একই সাথে গাঢ় সবুজ আর বাদামী রঙের এক অপূর্ব মিশ্রণ! সেই চোখের গভীরতার দিকে তাকালে মনে হয়, কোনো এক গভীর, আদিম ও রহস্যময় বনভূমির প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে সেখানে। আবিরা একদম নিস্পন্দ হয়ে হেবলার মতো সেই চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুত এক নেশা যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
ঞনিজের দিকে এমন অবাক ও নির্নিমেষ চাহনি দেখে লোকটি গম্ভীর অথচ সাবলীল কণ্ঠে বলে উঠল, “মিস, আমি কি আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারি?”
হঠাৎ লোকটির পুরুষালী কণ্ঠস্বরে আবিরার মোহাচ্ছন্ন ধ্যান ভাঙল। নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল এবং মুখে এক চিলতে প্রাতিষ্ঠানিক হাসি এনে বলল, “না, ধন্যবাদ। আমার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই।”
লোকটি তার সেই মাদকীয় চোখ দুটো দিয়ে আবিরার চোখের গভীরে স্থির দৃষ্টি রেখে ঈষৎ হেসে বলল, “*Are you sure?* এই নির্জন ও নিস্তব্ধ
পাহাড়ি রাস্তায় আপনি কোনো গাড়ি পাবেন না, Sweetbird।”
'Sweetbird' শব্দটা যেন এক তীব্র তীরের মতো এসে বিঁধল আবিরার বুকে! মুহূর্তের মধ্যে তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় আর অস্থিরতা শুরু হয়ে গেল। জীবনে অনেক ছেলের সাথেই সে কথা বলেছে; গল্প, আড্ডা কিংবা মজার ছলে অনেক বন্ধুর সাথে মিশেছে। কিন্তু এই অচেনা লোকটির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে তার কেন যেন ভীষণ সংকোচ আর দ্বিধা হচ্ছে। কারণটা তার নিজের কাছেও অজানা।
তবে আপাতদৃষ্টিতে লোকটিকে খুব একটা খারাপ বলে মনে হলো না। যেহেতু সে সত্যিই এক ভীষণ বিপদে পড়েছে আর লোকটি নিজে থেকেই তাকে সাহায্য করতে চাইছে, তাই এই মুহূর্তে প্রস্তাবটা না করাও তার জন্য কঠিন।
সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আবিরা চট করে বলে উঠল, “আপনি আমাকে সাহায্য করতে পারবেন? মানে... আপনার কোনো সমস্যা হবে না তো?”
নলোকটি আগের মতোই স্থির ও গাঢ় চোখে আবিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “নাহ্... আমার কোনো সমস্যা হবে না। আমি আপনাকে আপনার বাসায় পৌঁছে দিতে পারব। এই নির্জন এলাকায় মেয়েমানুষের একা হাঁটা মোটেও নিরাপদ নয়। আপনি আমার সাথে আসুন।”
কথা শেষ করতেই সে হাতের সুন্দর ইশারায় গাড়িটি দেখিয়ে দিল। আবিরাও কোনো দ্বিমত না করে লোকটির পিছু পিছু গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
গাড়িটি কাছ থেকে দেখতেই বোঝা যাচ্ছে এর মালিক অগাধ ক্ষমতার অধিকারী। চমৎকার চকচকে 'BMW X5' গাড়িটি এক নজর দেখেই যে কারো মন কেড়ে নেওয়ার মতো।
আবিরা গাড়ির দরজা খুলে নিসংকোচে সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে গিয়ে বসল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখতেই তার চোখ কপালে উঠল—রাত আটটা বেজে গেছে!
মনে মনে এক গভীর দুশ্চিন্তা ছেয়ে গেল তার। বাসায় চাচা নেই, অসুস্থ চাচি একা আছেন, নিশ্চয়ই সে এতক্ষণ ফিরেনি বলে চিন্তা করছেন!
আবিরা মুখ ঘুরিয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে বিনীত হাসিতে বলল, “ভাইয়া, একটু তাড়াতাড়ি চালালে ভালো হয়। বাসায় আমার জন্য চাচী অপেক্ষা করছেন।”
'ভাইয়া' শব্দটা শোনামাত্রই গাড়ির ভেতরের আবহাওয়া যেন এক মুহূর্তে বদলে গেল। লোকটির কপালে এক সূক্ষ্ম বিরক্তির ভাজ ফুটে উঠল। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এক ঝটকায় গাড়ির গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। এত দ্রুত গতিতে পাহাড়ি বাঁকে গাড়ি চলতে দেখে আবিরার
বুকের ভেতর আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো!
সিলেটের পাহাড়ি রাস্তার সুনসান নীরবতা আর রাতের নিস্তব্ধতার বুক চিরে হু হু করে ছুটে চলেছে সেই বিলাসবহুল কালো 'BMW'। গাড়ির ভেতরে থাকা যুবক ও যুবতীর মধ্যকার পিনপতন নীরবতা এতটাই ভারী ছিল যে, তাদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
পুরো পথে কারো মুখেই কোনো শব্দ নেই। আবিরা শুধু ক্ষণে ক্ষণে মোবাইলের স্ক্রিনে সময় দেখছিল আর আড়চোখে পাশের মানুষটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল।
লোকটিকে কোনোভাবেই এই দেশের সাধারণ নাগরিক বলে মনে হচ্ছে না। তার অস্বাভাবিক উচ্চতা, সুগঠিত সুঠাম শরীর, ভাঙা ভাঙা আভিজাত্যপূর্ণ বাংলায় কথা বলা এবং এভাবে রহস্যময়ভাবে পুরো শরীর কালো পোশাকে ঢেকে রাখা—সবকিছুতেই এক অদ্ভুত রাজকীয় ভাব।
মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই গাড়িটি এসে থামল আবিরার বাসার ঠিক গেটের সামনে। গাড়ি থামিয়ে লোকটি আবিরার দিকে ঘুরতেই তার কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল।
আবিরা প্যাসেঞ্জার সিটে মাথা হেলিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে!
বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সাথে আসা ঠান্ডা বাতাস গাড়ির খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে এসে আবিরার এলোমেলো চুলগুলোকে তার মুখের ওপর উড়িয়ে আনছিল। বাহিরের আবছা আলোয় আবিরার গাঢ় রেশমি চুল আর তার বাঁ গালের সেই গভীর তিলটি লোকটির চোখে এক অনন্য, অপার্থিব সৌন্দর্যের মতো ঠেকলো।
মনে হচ্ছে, স্রষ্টা যেন নিজ হাতে খুব সযত্নে ফুটিয়ে তুলেছেন এই অপূর্ব মূর্তিটিকে।
টানা ১০-১৫ মিনিট ধরে লোকটি অপলক দৃষ্টিতে ঘুমন্ত আবিরার স্নিগ্ধ মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করল। রাতের শীতল বাতাসে আবিরার মুখের ওপর বারবার আছড়ে পড়া রেশমি চুলগুলো সে নিজ চোখে দেখছিল। মেয়েটি ঠাণ্ডা এড়াতে যেন নিজের অবয়বকে আরও গুটিয়ে নিয়ে প্যাসেঞ্জার সিটেই নিজেকে ছোট্ট একটি পুতুলের মতো সাজিয়ে রেখেছে।
সময় ধীরে ধীরে গড়িয়ে যেতে লাগল। নিজের দুই নয়নে আবিরাকে ধারণ করার পর, মনের তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে তার সেই সবুজ-বাদামী মিশ্রিত বিষণ্ণ ও মাদকীয় চোখ দুটো সরিয়ে নিল।
ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে লোকটি গাড়ির পেছনের ডিক্কি খুলে একটি পানির বোতল বের করল। বোতলের মুখ খুলে হাতে অল্প কিছু পানি নিয়ে খুব আলতো করে আবিরার মুখের ওপর ছিটিয়ে দিল সে।
পানি মুখে লাগতেই আবিরা ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠল! আর আচমকা এভাবে উঠতে গিয়ে নিজের শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পেরে গাড়ির ওপরের শক্ত চালের সাথে মাথায় বেশ জোরে এক আঘাত পেল সে।
“উফ!”—চোখ-মুখ কুঁচকে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে পিটপিট করে তাকাল আবিরা। আকস্মিক ঘুমে ঢলে পড়া এবং এভাবে চমকে ওঠার কারণে চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে তার কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
সে তো ঠিকানাই বলেনি! তাহলে এই লোক কীভাবে তাকে তার বাসার সামনে নিয়ে এলো? ভাবতেই বিস্ময়ে ও অবাক দৃষ্টিতে আবিরার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে লোকটির দিকে তাকিয়ে একরাশ কৃতজ্ঞতা ভরা মিষ্টি হাসিতে আবিরা বলল, “অনেক ধন্যবাদ, ভাইয়া! আর সত্যিই সরি, কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টেরই পাইনি...”
লোকটি কোনো কথা বলল না। সে গাড়ি থেকে নেমে সোজা আবিরার সিটের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল এবং তাকে বের হওয়ার জন্য ইশারা করল। আবিরা ইশারা পেয়ে নিজের ব্যাগ ও মোবাইল হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো।
নামার পর আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সে একপ্রকার দৌড়েই বাসার গেটের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর কি যেন ভেবে আবার থমকে দাঁড়াল সে।
পুনরায় লোকটির সামনে ফিরে এসে বেশ কৌতুহলী আর চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা ভাইয়া... আপনার নামটা তো জানা হলো না? আপনার নাম কী?”
লোকটি আবিরার দিকে তার সেই রহস্যময়, সবুজ ও বাদামী রঙের চোখ দুটো স্থির করল। তারপর এক অত্যন্ত গম্ভীর, ভারী ও পুরুষালী কণ্ঠে বলে উঠল—
“ঋত্বিক।”
চলবে........