#সুইটবার্ড
#কলমে_মায়াবিনী_ঐন্দিলা
#পর্ব_৮
সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের নিজস্ব নিয়মে দিন গড়ায়, আর আবহাওয়াও রূপ পরিবর্তন করে। বৃষ্টিমুখর মেঘলা দিনগুলো পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে আরো সাতটি দিন বিদায় নিল।
আবিরার সাথে সেদিনের ঘটনাটির এক সপ্তাহ কেটে গেছে। কিন্তু কিছুতেই সে সেই সাহায্যকারী লোকটির মাদকতাময় চোখ দুটি ভুলতে পারছে না।
সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বাড়ি ফিরে মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেললেও, সেই সুদর্শন পুরুষের চোখ দুটি বারবার তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আজ আবিরার কলেজে প্রথম বর্ষের নবীনবরণ উৎসব।
সকাল থেকেই পূর্ণিমা তাকে ঘনঘন কল দিয়ে যাচ্ছে—অনুষ্ঠানে কী পরবে, কীভাবে সাজবে তা নিয়ে আলোচনার জন্য। আশ্চর্য বিষয় হলো, অনুষ্ঠান হবে শোনার পর থেকেই আবিরা নিজেও আলমারিটা অন্তত ১০০ বার উল্টেপাল্টে দেখেছে। কিন্তু কী ছেড়ে কী পরবে তা ঠিক করতে না পেরে নিজেই দিশেহারা;
তার ওপর মহারানি পূর্ণিমার সকাল-সকাল কল দিয়ে মাথা নষ্ট করা!
অবশেষে সকাল ১০টায় নীল রঙের শাড়ি পরে রেডি হয়ে পূর্ণিমা হাজির হয় আবিরার বাড়িতে, তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রুমে ঢুকেই পূর্ণিমা একদম হতভম্ব! পুরো রুমজুড়ে যেন কাপড়ের স্তূপ—একদম কাপড়ের গোডাউন মনে হচ্ছে! আর সেই স্তূপের ঠিক মাঝখানে গালে হাত দিয়ে বিষণ্ণ মুখে বসে আছে আবিরা।
পূর্ণিমাকে দেখে আবিরা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে, "ওরে পূর্ণি রে! আমি পরার মতো কোনো শাড়িই খুঁজে পাচ্ছি না। এখন আমি কী করব বল তো, বেবি?"
আবিরার কথা শুনে পূর্ণিমা নিজের কপাল চাপড়ায়। মেয়ে বলে কি! পুরো রুমটাকে শাড়ির দোকান বানিয়ে রেখেছে, আর এখন নাকি পরার মতো শাড়ি পাচ্ছে না!
অবশেষে নিজের পছন্দের শাড়ি খুঁজে না পেয়ে আবিরা আশা ছেড়ে দিল। তারপর শুরু হলো পূর্ণিমার শাড়ি খোঁজার অভিযান।
প্রায় ১০ মিনিট পর পূর্ণিমার চোখ আটকালো একটি বিশেষ শাড়িতে। শাড়িটি হাতে তুলে নেয় সে—মেরুন রঙের শাড়ি, তাতে সূক্ষ্ম পাথরের কাজ আর
পাড়ে সোনালি নকশা।
আর দেরি না করে পূর্ণিমা দক্ষ হাতে আবিরাকে শাড়িটি পরিয়ে দেয়। চোখের নিচে কালো কাজল, চিকন করে টানা আইলাইনার, হালকা লিপস্টিক আর মাঝখানে সিঁথি করে চুলগুলো ছেড়ে দিল।
ব্যস! আবিরাকে যেন হুবহু এক হুলপরি লাগছে!
আবিরাকে আপাদমস্তক দেখে পূর্ণিমা রসিকতা করে বলে, "মাশাআল্লাহ! আজ অন্তত একটা ছেলের হার্ট অ্যাটাক নিশ্চিত করার জন্য মিস আবিরা একাই যথেষ্ট!"
কথাটা শুনে আবিরা পূর্ণিমার বাহুতে আলতো এক কিল বসিয়ে বলে, "ধুর যা! তোকেও তো কম সুন্দরী লাগছে না, একদম পারফেক্ট মহিলা!"
পূর্ণিমা চিৎকার করে ওঠে, "কীইই! মহিলাআআ?"
আবিরা হেসে ফেলে বলে, "স্যরি স্যরি বেবি! চল এবার, দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
এরপর দুই বান্ধবী আবিরার আম্মু আরিশা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। শাড়ি পরে স্কুটি চালানো কঠিন হবে ভেবে তারা রিকশা নেয়। কিছু সমস্যার কারণে এবার আবিরাদের কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান একটু দেরিতেই হচ্ছে।
আজ পুরো কলেজ প্রাঙ্গণে নান্দনিক রঙের ছোঁয়া লেগেছে, এক নতুন রূপে সাজানো হয়েছে চারপাশ। সিনিয়র-জুনিয়র সব ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীরা আজ এক ছাদের নিচে একত্রিত হয়ে পরিচিত হচ্ছে। আবিরার মনেও তৈরি হয়েছে অনেক কৌতুহল। নতুন এই পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া তো আর সহজ কথা নয়!
আবিরা ও পূর্ণিমা দুজনই সেমিনার হলে গিয়ে বসেছে। পুরো কলেজজুড়ে এক আনন্দমুখর উৎসবের বাতাস বইছে। সবার মনেই অনাবিল আনন্দ। তবে আজকের তীব্র ভ্যাপসা গরমে সবাই বেশ অতিষ্ঠ। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কষ্টই বেশি হচ্ছে—শাড়ি সামলাতে গিয়ে অনেকেরই নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার জোগাড়!
আবিরা মনে মনে নিজেকেই বকছে, ‘আজ শাড়ি না পরলেই বোধহয় ভালো হতো!’ বিরক্তিভরা মুখে কাজলরাঙা চোখে সে চারপাশে কিছু একটা খুঁজছিল। হঠাৎই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি চোখে পড়তেই পূর্ণিমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। পূর্ণিমা কিছু না বুঝে বলদের মতো আবিরার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে, অন্য হাতে নিজের শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে।
কলেজের গেটের বাইরে একজন লোক আইসক্রিম বিক্রি করছিলেন। আবিরা চট করে দুটো আইসক্রিম কিনে টাকা মিটিয়ে দিল। একটি পূর্ণিমার হাতে ধরিয় দিয়ে অন্যটি নিজে খেতে শুরু করল। গরমে আক্ষরিক অর্থেই আবিরার প্রাণ যায় যায় অবস্থা!
আইসক্রিম খেতে খেতে পূর্ণিমা আশেপাশে তাকাতেই দেখে, কিবরিয়া নামের এক ছেলে কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চাতক পাখির মতো আবিরার দিকে তাকিয়ে আছে আর মিটিমিটি হাসছে।
দৃশ্যটি দেখামাত্রই পূর্ণিমার মাথা গরম হয়ে গেল! সে আবিরার হাত ধরে টেনে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলে, "এই চড়া গরমে বাইরে দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে চল তো!"
আবিরা বিরবির করে, "আহা, যাচ্ছি তো! এক হাতে আইসক্রিম আর অন্য হাতে শাড়ি—দুটো একসাথে সামলাতে দে আগে!"
পূর্ণিমা আবিরাকে টেনে নিয়ে যখনই কলেজে ঢুকতে যাবে, কিবরিয়া তা খেয়াল করে দৌড়ে এসে তাদের দুজনের সামনে দাঁড়ায়।
কিবরিয়া আবিরার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে, "আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছো?"
আবিরা কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ে। চেনা নেই, জানা নেই—হঠাৎ একজন অচেনা ছেলে এসে তাকে সালাম দিচ্ছে!
সে আড়চোখে পূর্ণিমার দিকে তাকায়, ‘ছেলেটি কে’ তা জানার ইশারায়। পূর্ণিমা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "উনি হচ্ছেন আমাদের এলাকার বড় ভাই।"
আবিরা কী যেন একটু ভেবে মুখে মিষ্টি হাসি এনে পূর্ণিমার দিকে ভ্রু নাচায়। কিন্তু পূর্ণিমা আবিরার সেই দুষ্টুমির ইঙ্গিত বুঝতে পেরে তার হাতে সজোরে এক চিমটি কাটে।
তারপর কিবরিয়ার দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্ত সুরে বলে, "ভাইয়া, আমাদের সাথে আপনার কোনো কাজ আছে? না থাকলে দয়া করে রাস্তার সামনে থেকে সরুন।"
কিবরিয়া আমতা আমতা করে বলে, "আরে, তোমার বান্ধবীর সাথে আমাকে একটু ভালোমতো পরিচয় তো করিয়ে দাও!"
আবিরা উৎসুক হয়ে বলে ওঠে, "হ্যাঁ ভাইয়া! আমি আবিরা, আপনার সাথে—"
কথা শেষ করার আগেই পূর্ণিমা আবিরাকে একপ্রকার টেনে-হিঁচড়ে কলেজের ভেতরে নিয়ে চলে যায়। তারা চলে যাওয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে, বুকের বাম পাশে হাত রেখে কিবরিয়া স্বগতস্বরে বলে ওঠে, "হায়রে আমার টুনটুনি পাখি!”
চলবে.......
(এই পর্বটা ছোট করে লিখেছি কারণ পরের পর্বগুলো আরেকটু ইন্টারেস্টিং হবে। তাই গল্পের পরবর্তী পর্বগুলোর নোটিফিকেশন পেতে আমার পেজ ফলো করে রাখো। আর গল্পটা কেমন হচ্ছে প্লিজ কমেন্টে জানাবে 👍)