ফন্ট সাইজ:
থিম:
দীঘির জলে কার ছায়া

১২+১৩

লেখক: অবন্তিকা তৃপ্তি

#দীঘির_জলে_কার_ছায়া

#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১২
শেখ বাড়ির মানুষরা খাবার টেবিলে একজোট হয়ে বসেছেন। বিশাল বড় ডাইনিং টেবিলে মেহমানসহ মোট ১২ জন বসা। অনিরূপ গোসল করে নিচে নেমে সোজা হেঁটে গিয়ে আশার পাশের চেয়ারে বসে প্লেট টানল! আশা ভ্রূ কুঁচকে অনিরূপের দিকে চায়, অনিরূপ প্লেট উল্টিয়ে আশার রাগান্বিত চেহারার দিকে চেয়ে মৃদু হাসল! ব্যস, আশার কা/টা গায়ে নুনের ছিটা পড়ল ওই হাসির শব্দে! আশা মুখ ঝামটি দিয়ে মাথা নিচু করে প্লেটের দিকে চেয়ে রইলো! সার্ভেন্ট এগিয়ে এসে সবার প্লেট খাবার তুলে দিল। আশা খাবার প্লেটে নিয়ে খুঁটছে শুধু খাবার। অনিরূপ নিজের মতো করেই খেয়ে উঠে গেলো, তার একটা জরুরি কাজ আছে, বেরুতে হবে এখন! 
আশা খাচ্ছে না দেখে ওয়াহিদা লক্ষ্য করলেন সেটা!
-‘আশা? আশা?’
বারবার ডাকাডাকি শুনে আশা চমকে ওয়াহিদার দিকে তাকাল। ওয়াহিদা প্লেটের দিকে ইশারা করে বললেব-‘খাচ্ছো না কেন? খাবার ঠান্ডা হচ্ছে।’
আশা হালকা হাসার চেষ্টা করে বললো-‘খাচ্ছি।’
ওয়াহিদা মৃদু হেসে বললেন-‘লজ্জা পেও না, যা লাগবে নিয়ে খাও।আজ সার্ভেন্ট খাবার বেড়ে দিচ্ছে, নেক্সট টাইম থেকে আমরাই খাবার বাড়বো, হু?’
আশা শোনে, তারপর হালকা করে মাথা দুলায়! 
নাস্তাটা কোনরকমে শেষ করে আশা চেয়ার থেকে উঠে নিজের রুমে আসে। আশা মূলত আজ সকাল থেকেই ভীষণ চিন্তিত! চিন্তায় খাবারটাও ঠিকমত গিলতে পারেনি। 
কাকে দিয়ে আনবে মেডিসিনগুলো? বাড়ির কারও সঙ্গেই তেমন সখ্যতা হয়ে উঠে নি। নতুন এলো, এসব মেডিসিনের কথা তো খোলাখোলি ভাবে কাউকে বলাও যায়না, নতুন বউ যে! বললে কে কী না মনে করে বসবে! কিন্তু আশার এক্ষুনি মেডিসিনগুলো চাই! আর যাই হোক, আশা কোনোভাবেই চাইবে না, একটা অসুস্থ সম্পর্কে কোনো বাচ্চা আসুক, এসে জানুক তার মা-বাবা ঠিক কতটা অসুখী আছে! আশা হাঁপ ছাড়ে, তারপর নিচে নেমে আসে। মেহমানরা সবাই সোফায় গল্প করছেন! 
আশা এগিয়ে এসে ওয়াহিদার কাছে এলো, 
‘আন্ট- মা?’
ওয়াহিদা তাকালেন, আশা অনেকটা দোনামনা করে বললো-
‘একটু বাইরে যাবো, দরকার ছিল।’
ওয়াহিদা ভ্রূ কুঁচকে ফেলেন, অবাক হয়ে বলেন-‘নতুন বউ তুমি, আজই বাইরে গেলে লোকে কী বলবে! কী লাগবে দারোয়ানকে বলে দাও, উনি নিয়ে আসবে।’
আশা আশাহত চোখে চেয়ে রইলো! ওয়াহিদা কেউ ডাকছে, তাই তিনি আশার মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে চলে গেলেন ওদিকে।
আশা হাঁপ ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। 
‘আশা?’ -অনিরূপের চাচাতো ভাইয়ের বউ এগিয়ে এসে ডাকল। 
আশা তাকাল ওর দিকে, রিতু আশাকে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-‘কী ব্যাপার? টেনশনে আছো মনে হচ্ছে খুব।’
আশা হালকা হাসার চেষ্টা করে বললো-‘না, তেমন কিছু না।’
রিতু হালকা হেসে আশার দিকে চায়! কথা বলার ফাঁকেই তার বিবাহিত সূক্ষ্ম নজর আশার ঘাড়ে যায়! রিতু আশার শাড়ির আঁচল ঘাড় থেকে সরিয়ে দিয়ে সূক্ষ নজরে আশাকে দেখে কৌতুক স্বরে বললো-‘লাল হয়ে গেছে একদম, মলম পাওনি?’
আশা লজ্জায় শেষ হয়ে গেলো একদম! কান দুটো গরম হয়ে গেলো! সঙ্গেসঙ্গে শাড়ির আঁচল ঠিক করে ঘাড় ঢেকে নিলো! এ বাড়ির লোকেরা কী লজ্জা শরমের বালাই খেয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছে?আশাকে অপ্রস্তুত হতে দেখে রিতু হাসতে লাগল, আশা লজ্জায় চুপ করে আছে! তাই হাসি থামিয়ে রিতু বললো-‘আমাকে তোমার শাশুড়ি পাঠালেন, কী লাগবে বলো আমি আনিয়ে দিচ্ছি।’
আশা বলতে চাইলো না প্রথমে, পরে রিতুর জোড়াজোড়িতে বলে ফেলল। রিতু শুনে বললো-‘এটুকুতেই এত লজ্জা? আমার সময় অবশ্য তোমার ভাই এনে দিয়েছিল। অনিরূপও না, একদম ইউজলেস। ডাক্তার হয়েছে, আগে থেকে এগুলো আনিয়ে রাখবে না?’
আশা কী বলবে? লজ্জায় ইতি-অতি চেয়ে দেখে। রিতু হেসে বললো-
‘আমি আনিয়ে দিচ্ছি, তুমি রুমে যাও।’
_____________
অনিরূপ ঘরে ফিরেছে দুপুরে খাবারের সময়। রুমের দরজা লক নয়, এমনিই লাগিয়ে রাখা ছিল! আগে বউ ছিল না, যেভাবেইচ্ছে রুমে ঢুকেছে! সেই পুরনো অভ্যাস থেকে আজকেও তাই সাতপাঁচ না ভেবেই অনিরূপ রূমের দরজা খুকে ঢুকে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে আশা চিৎকার করে উঠে শাড়ি বিছানা থেকে নিয়ে গা ঢাকল। অনিরূপ ভ্যাব্যাচ্যাকা খেয়ে আশার দিকে চেয়ে আছে। আশা কেঁদেই দিবে প্রায়, ও চেঁচিয়ে উঠল-‘রুম থেকে এক্ষুনি বেড়োন।’
অনিরুপ চোখ বড়বড় করে আশাকে দেখছে, রাগে আশার ঠোঁট কাঁপছে! অনিরূপ সেদিকে দেখে ঢোক গিলে। ভেবেছিল ভদ্র লোকের মতো বেরিয়ে যাবে রুম থেকে, কিন্তু নিজের বিয়ে করা বৌয়ের সামনে হুট করে আর ভদ্রতার মুখোশ পরতে ইচ্ছে করলো না।অনিরূপ বাঁকা হেসে দরজার সিটকিনি তুলে দিতেই আশার মুখটা ছোট হয়ে গেলো একদম! 
আশা ভ্রূ কুঁচকে ফেলে, শাড়িটা নিজের সঙ্গে আরও ভালো করে প্যাঁচিয়ে বলে উঠল-‘এই মুহূতে আমাকে ছুঁলে আমি আপনাকে জাস্ট খু/ন করে ফেলব!’
অনিরূপ কাঁধ ঝাঁকাল, ভাব নিয়ে বললো-‘ছুঁবে? কে ছুঁবে তোমাকে? আমি? সরি, আমার মুড নেই। আ’ম ফিলিং ড্যাম স্লিপি!’
কথাটা বলে অনিরূপ বিছানায় জুতো নিয়েই শুয়ে পড়ল! আশা চূড়ান্ত রেগে অনিরূপের দিকে চেয়ে থাকল! রাগে আশার দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে একপ্রকার!ওই লোকটা ঘুমের ড্রামা করছে, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে! সবসময় আশাকে জ্বালানোর ধান্দা! অনিরূপ চোখ বুজে ঘুমানোর অভিনয় করছে! আশা কী করবে আর? অগ্যতা শাড়ি নিয়ে বাথরুমেই ছুটল। 
শাড়ি গায়ে বেরিয়ে এসে দেখে অনিরূপ বিছানায় হেলান দিয়ে ফোনে কথা বলছে। আশা অবাক! এইমাত্র না ঘুমে ম/রে যাচ্ছিল, এক্ষুনি ঘুম নেই? ড্রামাবাজ কোথাকার! আশা বেরিয়ে আসতেই অনিরুপ হাত দিয়ে ইশারা করল ওর পাশে বসতে। আশা মুখ বাঁকালো, অবাধ্য হয়ে বারান্দায় চলে গেলো! অনিরূপ ফোনে কথা বলার মধ্যেই ভ্রু কুঁচকালো, মেয়েটা এতটা নাছোড়বান্দা কেন? 
অনিরূপ ফোন কেটে আশাকে এবার জোরেজোরে ডাকতে লাগল-
‘আশা? আশা? রুমে আসো।’
আশা শোনে; তারপর রুমে এসে অনিরূপের দিকে চেয়ে বলে-
‘বয়রা নাই আমি, শুনতে পাই।এভাবে ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছেন কেন?’
ভীষণ অপমানিত হয়ে অনিরূপ চুপ হয়ে যায়! কিছুক্ষণ আশাকে ভ্রু কুঁচকে দেখে তারপরই চোখ সরিয়ে ফেলে! আশার দিকে আর একবারও তাকায় না, সোজা রুম থেকেই ওয়াহিদার ফোনে কল করে বসে-
‘মা?’
—
‘রুম থেকেই বলছি। আমি আশাদের বাড়ি যাচ্ছি না আজ।’
__
‘নিয়ম সব চুলোয় যাক, আমি যাব না বলেছি মানে যাবোই না। যা মন চায় করো।’
—-
‘তো? আমার কিসের দায়? ও গেলে যাক!’
——
‘নো ওয়ে!’
ওয়াহিদা ওপাশ থেকে কথা বলছিলেন, অনিরূপ তার মাঝেই কল কেটে দিল! আশা হা করে ওদের কথা শুনছিল! অনিরূপ কল কেটে বিছানা থেকে নামল! তারপর কোনোপ্রকার কথা-বার্তা না বলে জুতো পায়েই রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে গেলো! 
আশা ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে মুখ ভেঙায়! যেন আশার খুব ঠেকা তাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার! সে না গেলে আশা আরও বাঁচে! 
আশাও নিচে নামে! নিচে মা-ছেলের মধ্যে কী কথা হচ্ছে শুনতে হবে! 
অনিরুপ ওয়াহিদার সঙ্গে কথা বলছে, ওয়াহিদা অনিরুপের কাঁধে হাত রেখে মানানোর চেষ্টা করছেন। এটুকু দেখে আশা ওয়াহিদার কাছে এসে দাঁড়ায়! আশাকে দেখেই অনিরুপ আশার দিকে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে অন্যদিকে চলে যায়। ওয়াহিদা আশার দিকে চেয়ে আশাহত গলায় বললেন-‘ বিয়ের পরেরদিনই ঝগড়া করলে কেমনে হবে আশা? ছেলেটা বাহির থেকে এসেই এসব ঝামেলা দেখলে বাড়িমুখী হবে আর? শোনো, এভাবে করলে স্বামী হাতে রাখা যায়না, আশা! অনি রুমে গেছে, আমি খাবার প্লেটে দিচ্ছি; দুজন মিলে এক প্লেটে খাবে আজ। মান-অভিমান মিটিয়ে সুখে থাকো, আমার চাওয়া এটুকুই।’
আশা চুপ করে শোনে কথাগুলো! ওয়াহিদাকে কী করে বলবে ও, উনার ছেলে হাতে রাখার কোন ইচ্ছা আশার নেই। হাত ফঁসকে বেরিয়ে গেলেও আশার বিশেষ কিছু যায়-আসবে না।
আশার হাতে ওয়াহিদা খাবারের প্লেট ধরিয়ে দিয়ে উপরে জোর করে পাঠিয়ে দিলেন! আশা রুমে খাবার নিয়ে ঢুকে দেখে অনিরূপের হাতে কতগুলো মেডিসিন! যেগুলো আজ আশা আনিয়েছিল! আশা স্বাভাবিক চোখেই অনিরূপের দিকে চেয়ে আছে! 
অনিরূপ তার শক্ত হাতে মেডিসিনগুলো নাড়তে নাড়তে আশার দিকে চায়! অনিরূপের চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে! ও চোখে আগে আশা প্রশ্রয় দেখতে পেলেও, এখন কেমন যেন অন্যরকম লাগছে অনিরূপকে! একটাসময় অনিরুপ ভয়ানক শান্ত স্বরে প্রশ্ন করে বসে-
‘বার্থ কন্ট্রোল ট্যাবলেট?তুমি আনিয়েছো?’ 
#চলবে
-----
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৩
‘বার্থ কন্ট্রোল ট্যাবলেট? তুমি আনিয়েছো?’
অনিরূপের গলার স্বর গম্ভীর, ডিপ! যখন ও রেগে যায়, এমনটাই হয়ে জয় ওর গলার স্বর! আশা বোঝে, শোনে! অনিরূপের ওমন আগুন দৃষ্টিকে এক বিন্দু পাত্তা না দিয়ে প্লেট নিয়ে ঘরে ঢুকে। খাবারের প্লেটটা অনিরুপের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো- ‘খেয়ে নিন।’ 
অনিরূপ ভ্রূ কুঁচকে ফেলল, আশা অনিরূপকে চুপ দেখে চুপচাপ খাবারের প্লেট টেবিলের উপর রেখে চলে যেতে নিচ্ছিলো! কিন্ত পারলো না, সঙ্গেসঙ্গে অনিরূপ আশার হাত পেছন থেকে ধরে ফেলল। আশা ছলাক করে উঠে রাগান্বিত চোখে ফিরে তাকাল অনিরূপের দিকে। অনিরূপ আবারও বললো-
‘জবাব দিচ্ছো না কেন?কিছু জিজ্ঞেস করছি না আমি?’
আশা এবার সরাসরি অনিরূপের চোখে চোখ রেখে জবাব দিল স্পষ্ট গলায়-‘হ্যাঁ আমিই আনিয়েছি, এখান থেকে একটা ট্যাবলেট খেয়েছিও। তো?’
আশার ‘তো?’ বলাটা অনিরূপ দেখে চোখ বুজে জোরেজোরে শ্বাস ফেলে আবারও তাকায় ওর দিকে! কিছুসময় আশাকে চেয়ে দেখে রাগান্বিত চোখে! তারপও হঠাৎ করে আশাকে অবাক করে দিয়ে মৃদু শব্দে হেসে উঠে! আশা ভ্রূ কুঁচকে চায়। অনিরূপ মেডিসিনগুলো বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়িয়ে আশাকে পেছন থেকে আগলে ধরে, কাঁধে থুতনি রাখে! আশা ছটফটিয়ে উঠে যেমন! কই মাছের ন্যায় নড়ে অনিরূপকে সরাতে চায়, তবে অনিরূপের পুরুষালি ভারি দেহখানা এক ইঞ্চিও সরাতে পারলো না। 
অনিরূপ হালকা স্বরে শোধাল-‘ভালোই করেছ আনিয়ে। আমিও আসার সময় নিয়ে এসেছি! অপেক্ষা করতে পারতে আমার নিয়ে আসার! বড্ড অধৈর্য্য তুমি আশা!’
আশা চোখ বড়বড় করে অনিরূপের দিকে চায়! অনিরূপের বাচ্চা চাই না? অনিরূপ আবারো আশার কাঁধে ছোট করে চুমু খেয়ে বললো-
‘বাচ্চা আমার চাই। তবে বিবাহিত লাইফ ফুল এনজয় করার পর! আপাতত তো না!’
আশা অনিরূপের চুমুতে কাঁধ সংকুচিত করে ফেলে, পুনরায় ছটফটিয়ে উঠে! লোকটা এমন কেন? গিরগিটির মতো রং বদলায়। আশা বিরক্ত হয়ে আবারও অনিরূপকে সরাতে সরাতে বললো-‘তাহলে এতোক্ষণ নাটক কেন করছিলেন? ছাড়ুন।’
অনিরূপ ছাড়ে না, সুন্দর হেসে বলল-‘দেখছিলাম একটা জিনিস। দ্য গ্রেট অনিরূপের ওয়াইফের চোখে নিজের জন্যে ভয় দেখতে চেয়েছিলাম। বাট আফসোস, তুমি তো আমাকে একফোঁটাও ভয় পাওনা আশা। লজ্জা লাগছে আমার।’
বলে মন খারাপের ভান করল অনিরূপ। আশা বিরক্ত হয়ে অনিরূপের ম্যালোড্রামা দেখে, তারপর বললো-‘ম্যালোড্রাম শেষ হলে আমাকে ছাড়ুন, ভাত খান গিয়ে।’
অনিরূপ এবার আর বেশি অবাধ্য হলো না। চুপচাপ আশাকে ছেড়ে দিয়ে ভাতের প্লেট নিয়ে বসলো। আশা এই সময় ওর বাড়ি থেকে ননিয়ে আসা লাগেজ বের করে কাপড়গুলো বের করে করে আলমারিতে রাখছিল! অনিরূপ খেতে খেতে বললো-‘তোমার খাওয়া শেষ?’
আশা অনিরূপের দিকে চেয়ে বললো-‘না।’
অনিরূপ শোনে বললো-‘এখানে এসে বসো, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।’
আশা ডান ভ্রুটা উঁচু করে চায়, তারপর বিদ্রুপ করে হেসে বললো-‘এটুকু দয়া না দেখালেও চলবে। আমার হাত আছে, আমি নিচে গিয়ে খেয়ে নিব।’
অনিরূপ আর জোর করলো না। খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে আবারও ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় বসলো। এরমধ্যে আশার কাপড় গোছানো প্রায় শেষ! অনিরূপ ল্যাপটপে কাজ করার ফাকে ফাঁকে আশাকে দেখছিল আড়চোখে! আশার সেসব মন নেই অবশ্য! আজ আবার বাবার বাড়ি যাবে বলে, সেটারও কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছে। 
এরমধ্যে ওয়াহিদা এসে ওদের দরজায় টোকা দিলেন। আশা গিয়ে দরজা খুলে দিল। ওয়াহিদা মেঝেতে লাগেজ দেখে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন-‘লাগেজ গুছাচ্ছো? অনির জন্যে কী কী নিয়েছো দেখি।’
আশা এবার আর কথা বলে না। সে তো নিজের কাপড় নিয়েছে শুধু। অনিরূপের জন্যে কিছুই নেওয়া হয়নি। ওয়াহিদা আশাকে চুপ থাকতে দেখে বললেন—’লাগেজ খুলো?’
ওয়াহিদা বিরক্ত হচ্ছেন দেখে আশা লাগেজ খুলে দেখালো। লাগেজের অর্ধেক জায়গাই ফাঁকা পড়ে আছে! বাকি অর্ধেকে আশার কাপড়-চোপড়। সেখানে আশার জামাকাপড় থাকলেও অনিরূপের জন্যে কিছুই নেই। ওয়াহিদা বললেন-‘আশা, অনি যাবে তোমার সঙ্গে। তো ও কী সেখানে এক কাপড় পরেই থাকবে? ইউ হ্যাভ নো রেসপনসিবিলিটি, আশা।’
আশা চুপ করে থাকে। ওয়াহিদা এবার নিজেই দেখে দেখে অনিরূপের জন্যে প্রয়োজনীয় কাপড় লাগেজে ঢুকালেন। আশা এসময় ঘরের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখছিল এসব! ওয়াহিদা জিজ্ঞেস করলেন-’টয়লেট্রিজ নিয়েছো?’
আশা বললো-‘আমাদের বাড়িতে আছে।’
‘তোমার জন্যে আছে, অনির লাগবে না? ও ওগুলো ব্যবহার করবে? যাও, ড্রয়ারে ওর ব্যাগ আছে একটা। ওটায় আছে, নিয়ে আসো।—-ওয়াহিদা কাপড় ঢুকাতে ঢুকাতে বললেন! 
অনিরূপ এতোক্ষণ শুধু দেখে যাচ্ছিলো বউ-শাশুড়ির কাজ! আশাকে ওয়াহিদার সামনে ভেজা বেড়াল হয়ে থাকতে দেখে অনিরূপের পেট ফেটে হাসি আসছে! ওর সঙ্গে তো কেমন চটর-পটর কথা বলে। ওয়াহিদা সামনে এলেই নিশ্চুপ! বাহ, অনিরূপ বৌকে বাঘে আনার অ/স্ত্র পেয়ে গেছে! এখন এটাকে কাজে লাগাতে হবে। অনিরূপ এদের কান্ড দেখে ল্যাপটপে চোখ রেখেই হাসতে থাকে আড়ালে! 
একবার আশার চোখ গেলো অনিরূপের হাসির দিকে, আশা রাগ রাগ নিয়ে তাকাল তখন! অনিরূপ সেটা দেখে ডান ভ্রুটা উঁচু করে আশাকে দেখে আলগোছে হাসিহাসি মুখটা ভার করে ল্যাপটপে চোখ রাখল! আশা ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে আবারও ওয়াহিদার কাজ দেখতে লাগল!
দুপুরে খাবার পরেই আশা-অনিরূপ এবং সঙ্গে অরূপ চলল আশাদের বাড়ি ফেরাযাত্রায়! ওদের সঙ্গে ওয়াহিদা মিষ্টি, ফল, পিঠা প্যাক করে দিয়েছেন। অরূপ গাড়ি ড্রাইভ করছে। আশা-অনিরূপ পেছনে বসে আছে! 
অনেক লম্বা পথ! মাত্র খাবার খেয়েই গাড়িতে উঠেছে বলে, আশার শরীর খারাপ লাগছিল ভীষণ! তাই ও জানালার গ্লাসের মধ্যে মাথা রেখে একটাপর্যায়ে শুয়ে পড়ল। অনিরূপ এতোক্ষণ ফোনে কী দেখছিল। আশার দিকে চোখ পড়লে দেখে, আশা জানালার মধ্যে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে, যার দরুণ গাড়ি নড়তেই টোকা খাচ্ছে মাথায়! অনিরূপ ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে আলগোছে আশার মাথাটা নিজের কাঁধে রাখল। আশাও আরাম পেয়ে অনিরূপের কাঁধে মাথা রেখে গভীর ঘুমে চলে গেলো। অনিরূপ আশার ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে হালকা হাসল! কে বলবে এই মেয়েটা ঘুমে এতটা শান্ত-নিশ্চুপ! কে বলবে এই মেয়েটাই একেকটা কথার বানে অনিরূপের বুক ক্ষ/তবিক্ষ/ত করে ফেলে? কেউ না! এই যে ঘুমিয়ে আছে, একদম চুপচাপ! ভালোই তো লাগছে অনিরূপের কাছে! 
_____________
আব্দুর রহমান মেয়ে জামাই আসবে বলে আজ অনেক আয়োজন করেছেন। তার নতুন ফসল হয়েছে, ভালোই বিক্রি হওয়ায় উনার মনটা আজ ভীষণ ফুরফুরে বলা যায়! তাই জামাইর আপ্যায়নে আজ কোনও কমতি রাখেননি। নিধিও ব্যস্ত! রান্নাঘরে বসে পিঠা বানাচ্ছিল! গাড়ির শব্দে আব্দুর রহমান উঠোনে ছুটলেন। নিধিও হাত ধুয়ে উঠোনের দিকে ছুটল! 
আশা গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। আব্দুর রহমানও ছলছল চোখে মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন-‘আসতে কোনো কস্ট হয়নি তো আম্মা?’
আশা সরে দাঁড়িয়ে কাঁদোকাঁদো মুখে মাথা নাড়লো! নিধি এগিয়ে এসে আশাকে আগলে ধরলো! আশার কপালে চুমু বসিয়ে বললো-‘চেহারা এত মলিন কেন? দুপুরে খাস নি?’
আশা অনিরূপের দিকে আড়চোখে চায়, অনিরূপ বরাবরের মতো ডান ভ্রুটা উঁচু করে আশাকে দেখছে! আশা নিধির দিকে চায়, হালকা করে মাথা দুলায়-‘খেয়েছি! টায়ার্ড লাগছে ভীষণ তাই বোধহয়।’
নিধি হালকা হাসে। এবার অনিরূপ-অরূপের দিকে চেয়ে ওদের বেশ খাতিরদারি করে ঘরে নিয়ে আসা হলো! নিধি সবাইকে মিষ্টি, শরবত সার্ভ করে দিচ্ছে! ওর ডান গালে পিঠা বানানোর ময়দা লেগে আছে! অরূপ সেটা লক্ষ্য করে! নিধি অরূপকে মিষ্টি দিতে এলে অরূপ ফিসফিস করে বললো-‘গালে ময়দা।’
নিধি অরূপের দিকে তাকায়, অরূপ ইশারা করে দেখায়! নিধি অপ্রস্তুত হয়ে গাল মুছে ফেলে! অরূপ হেসে বলে-‘এবার ঠিক আছে।’
নিধি হালকা হাসার চেষ্টা করে সবাইকে নাস্ত সার্ভ করে আবারও রান্নাঘরে ছুটে! আশাও নিধির পেছন পেছন ছুটে! দুদিন পর বোনকে কাছে পেল, কতকিছু বলার আছে! অনিরূপের বদনামও তো করতে হবে! 
ওরা দু বোন বেরিয়ে যেতেই ঘর খালি হলো! অরূপ অনিরূপকে জিজ্ঞেস করলো—‘আচ্ছা ভাইয়া? ভাবির বোনের ডিভোর্স কেন হয়েছিল?’
অনিরূপ ভাবুক গলায় বললো-‘তেমন আইডিয়া নেই। শুনেছিলাম- ওর হাসবেন্ড প্রথমে ভালোই ছিল নাকি! পরবর্তীতে হুট করেই একদিন জুয়া খেলা শুরু করে, সেখান থেকে মদ খেয়ে নিধিকে মা/রধর করত! একবার তো বোধহয় হাসপাতালেও ভর্তি ছিল মা/র খেয়ে! সেদিনের পরেই মেইবি ডিভোর্স এর জন্যে অ্যাপ্লাই করে এরা।’
অরূপ শোনে! কেন জানেনা, ওর ভীষণ দুঃখ লাগল এটা শোনে! এত ভালো, ফুটফুটে একটা মেয়েকে অল্প বয়সে কত কিছু সহ্য করতে হলো! অরূপ হঠাৎ কী মনে করে দরজার দিকে চেয়ে দেখে, মেয়েটা আবার খাবার নিয়ে এই আসলো বলে! সবসময় তো দৌড়ের উপরেই তো থাকে! অরূপ যতবার দেখল, ততবার শুধু ছুটছেই।একবার এদিকে, নয়তো ওদিকে। হাসে অরূপ; ছুটন্ত কন্যা! 
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২+১৩ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন