#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৪
আব্দুর রহমানের বাড়িতে তার মেয়ে জামাই এসেছে, মানুষটা আবার শহরের বড় ডাক্তার! গ্রামে মুহূর্তেই কথাটা পাঁচকান হয়ে গেল। দেখা গেলো অনিরূপ দুপুরের খাবার খেতে উঠতে না উঠতেই উঠোনে কয়েকজন এসে দাঁড়িয়ে আছে। অনিরূপ এত লম্বা লাইন দেখে হতাশ চোখে আশার দিকে তাকাল, আশা মুখ ঝামটি দিয়ে অন্যদিকে তাকাল, অর্থাৎ ‘এখন বুঝো মজা!’
আশার বাবা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে অনিরূপের দিকে তাকালেন। আমতা আমতা করে বললেন-
‘আসলে গ্রামে তো ভালো ডাক্তার নাই, তাই বোধহয়..’
অনিরূপ হাসার চেষ্টা করল। বড্ড টায়ার্ড লাগছে! ভাত খেয়ে সবসময় ঘুমায় ও। আজকে বোধহয় আর ঘুমানো যাবে না। অনিরূপ বললো-
‘ওদের পরে আসতে বলুন। বিকেলের দিকে!’
আব্দুর রহমান ছুটলেন বাইরে। বললেন, বিকেলে আসার কথা, জামাই এখন ক্লান্ত! কিন্ত মানুষ কী এসব বুঝে? তারা তাদের মতো অনুরোধ করতে লাগল। নরম আবদুর রহমান তাদের অনুরোধ ফেলতে না পেরে জামাইর কাছে আবার ছুটলেন।অগ্যতা অনিরূপ শ্বশুরের কথা রাখতে গিয়ে বাইরে বেরোলো। আব্দুর রহমান উঠোনে চেয়ার পাতলেন তিনটা। অনিরূপের ওই দুপুরটা পুরোটাই গেলো রোগী দেখায়।এদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, অনিরূপ হয়তো পুরো গ্রামের মেয়েদেরই জামাই বনে গেছে! ফ্রিতে দেখে দিচ্ছে, কেউ গ্রামের জামাই বলে টাকাও আনেনি। শ্বশুরের সামনে কিছু বলতে পারছে না আর নাইবা পারছে এদের একের পর এক ক্যাচক্যাচানি অনিরূপ সহ্য করতে। দাঁতে দাঁত চেপে অনিরূপ শেষ অব্দি রোগী দেখে গেলো।
আশা ঘরের জানলা দিয়ে অনিরূপের রোগী দেখা দেখছিল। মনেমনে আত্মিক শান্তি অচ্ছে আশা। বুঝুক আরও!
অনিরূপ যখন রুমে আসলো, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আশা রুমেই ছিল। নিধির সঙ্গে আমের ভর্তা খাচ্ছে। অনিরুপ রুমে আসতেই নিধি চুপচাপ বেরিয়ে গেল। আশা কোনদিকে নজর নাই, ও ভর্তা খেতে মশগুল।মহা ক্লান্ত অনিরুপ এসে সোজা জুতো নিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ল। কিছুটা কাদা লেগে গেলো বিছানায়। আশা সেটা দেখে হইহই করে উঠল-
‘নতুন বিছানা নষ্ট করছেন কেন?জুতো খুলে ঘুমানো যায়না?’
অনিরুপ আশার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চূড়ান্ত হতাশ হয়ে বলল-
‘আশা, আমার দিকে একটু নজর দাও। তুমি এখনও বিছানা নিয়ে পড়ে আছো। আমি বেচারা হাত-পা নাড়াতে পারছি না ব্যথায়। নিজেদের হাসপাতালে আমি হায়েস্ট একদিনে ১৫ জন পেশেন্ট দেখেছি। অথচ আজ শ্বশুরবাড়ি ঘুরতে এসে আমাকে দিয়ে তোমরা প্রায় ৩০ জন পেশেন্ট দেখিয়ে ফেললে। তাও কিনা ফ্রি! ভাবো, আমি অনিরূপ ফ্রিতে রোগী দেখছি। আমি তো চিন্তাও করতে পারছি না, ড্যাম!’
আশা অনিরূপের কথার ধরন শুনে মনেমনে হাসি পেলেও, অনিরূপ লাই পাবে দেখে হাসল না। বরং টিটকারি করে বললো-
‘আমাকে কন্ট্রাক্ট করে বিয়ে করার আগে মাথায় রাখা উচিত ছিল, আমি সাধারণ গ্রামের মেয়ে। আর গ্রামে এসব হয়।’
অনিরূপ আশার কোল থেকে বালিশ টেনে নিয়ে সেটা মাথার নিচে দিয়ে বললো-‘যে ফাঁসার সে সবদিকেই ফাঁসে রে বউ! সবই কপাল!’
তারপর সেদিন রাতটুকু কোনরকমে পাড় করে অনিরূপ পরদিন সকালেই ফিরে আসে শহরে। এবং তওবা করে, ইহজনমে সে আর শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে না। আশাকে সহ্য করেই অনিরুপ ইহজনমের চূড়ান্ত সাধনার পরিচয় দিয়ে দিয়েছে, বাকি ষোল আনা শ্বশুরবাড়ি পা রেখে পূরণ করার কোন প্রয়োজন নেই!
___________________
অনিরূপ আজ বেশ দেরি করেই হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। দুপরের খাবার যখন খেলো, তখন প্রায় সন্ধ্যা! আশা রুমে বসে কুরআন পড়ছিল। অনিরূপ রুমে এসে আশাকে জায়নামাজ দেখে আর বিরক্ত করল না। সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় শুলো। আশা কুরআন জায়গায় রেখে জায়নামাজ ভাঁজ করতে করতে বললো-
‘আপনার নামাজ-কালাম লাগে না?’
অনিরুপ মোবাইল দেখতে দেখতে বলল-‘নামাজ? ওহ! না, আমি পড়ি না।’
আশা ভ্রূ কুঁচকে ফেলল-‘কেন? কোনি ভ্যালিড রিজন আছে?’
‘ভ্যালিড রিজন নেই, এমনিই।’ -অনিরূপের অবহেলার উত্তর!
আশা আর কথা বাড়ায় না। যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শয়তানি তাকে আর নামাজের কথা কি-বা বলবে আশা! আশা চুপচাপ একটা বই নিয়ে বিছানায় বসে।দুজনের মধ্যে অনেকখানি দূরত্ব! অনিরুপ হঠাৎ একটা ভিডিও দেখে বাঁকা হেসে আশার দিকে তাকাল। সহসা আশারও তখন চোখ গেলো অনিরুপের মোবাইলের দিকে।
ভিডিওতে দেখাচ্ছে- ‘গার্লফ্রেন্ড এর গায়ে শুধুমাত্র বয়ফ্রেন্ডের একটা সাদা শার্ট, দুজন একে ওপরের সঙ্গে আনন্দ নিয়ে জড়াজড়ি করছে।’
ভিডিওটা পুরোপুরি দেখার আগেই আশা ছিটকে সরে গিয়ে রাগান্বিত গলায় বললো-‘এগুলা কী দেখেন আপনি? অশ্লীল লোক! ছিঃ! এগুলো দেখেই আপনার মাথা ভর্তি অশ্লীল ভাবনা ঢুকে গেছে।’
অনিরুপ ডান ভ্রু উঁচু করে বললো-‘তুমি আমার বউ। গার্লফ্রেন্ড নও, না। তোমার কাছে আশা করতেই পারি এরকম।’
অনিরূপের ঠোঁটকাটা কথা শুনে আশা চট করে বইটা বন্ধ করে উঠে পড়ল বিছানা থেকে। চরম অস্বস্তি নিয়ে বললো-‘খবরদার আমাকে নিয়ে এমন চিন্তা করবেন তো। আমি ওরকম আপডেটেড মেয়ে নই। আর তাছাড়া আপনার-আমার সর্ম্পক এরকম লুতুপুতুও নয়।সাবধান!’
আশা কথাটা বলে দ্রুত পায়ে বই নিয়ে নিচে চলে গেলো। বলা যায় না, কখন আবার অনিরূপ ঝাঁপিয়ে পরে ওর উপর! বলেছে, আর ছুবে না। কিন্ত বলা যায়না, অনিরূপ তো আবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে মাহির।
আশা চলে যেতেই, অনিরূপ মৃদু হেসে ভিডিওটা আবার ওপেন করল। ভালোই লাগছে দেখতে। আশাকে নিশ্চয় অনিরূপের শার্টে দারুণ মানাবে। অনিরূপ আশাকে ওই অবস্থায় কল্পনা করে মনেমনে দারুন মজা পেল। মনেমনে চিন্তাও করে ফেলল কিভাবে কাজ হাসিল করা যায়। কাজের মেয়েকে ডেকে কিছু একটা শিখিয়ে রাখলো! কাজের মেয়েও ভয়েভয়ে অনিরূপ যা বলল, তাই শিখলো! এখন বাকিটা কাজ করলেই চলে!
চলে জেল এক সপ্তাহ। আশা ওদিনের কথা প্রায় ভুলেই বসেছে। হয়তো পোউর আশা বুঝতে পারেনি, তার ভাগ্যে একজন চূড়ান্ত চালাক-বদবুদ্ধির স্বামী জুটেছে। যে এত সহজে আশার সামান্য ‘না’ তেই হাল ছেড়ে দিবে না অবশ্যই!
হঠাৎ সেদিন আশা দুপুরে গোসল করার জন্যে কাপড় নিবে, দেখে আলমারিতে কোনো শাড়িই নেই ওর। আশা অবাক হয়ে গেল একদম, এতগুলো শাড়ি কোথায় উধাও হয়ে গেল? আশা রুমের অন্যান্য ড্রয়ার খুঁজলো, কোথাও নেই কোন জামা বা শাড়ি। হতবম্ব আশা এবার পারুলকে ডাকল।
পারুল রুমে এসে দেখে আসা তন্নতন্ন করে ওর শাড়ি খুঁজছে। পারুলকে দেখে আশা আলমারি খুঁজতে খুঁজতে জিজ্ঞেস করল-
‘পারুল, আমার শাড়িগুলো দেখেছো?’
পারুল অনিরূপের এক সপ্তাহ আগে শিখিয়ে দেওয়া বুলি আউড়ে ভয়েভয়ে মাথা নাড়ল-‘ভাবী, আমি এগুলা মেশিনে দিয়া দিসি।’
আশার হাত থেমে গেল, অবাক হয়ে পারুলের দিকে চেয়ে বললো-‘সব শাড়ি?’
‘হা ভাবী। ময়লা লাগতেসিল সবগুলা, তাই।’
আশা মনেমনে বিরক্ত হলো। কিন্তু পারুলকে বিরক্তি না দেখিয়ে শান্ত গলায় বললো-‘পারুল, আমি প্রতিদিন আমার শাড়ি নিজে ধুয়ে দে। ময়লা কোথা থেকে আসবে? তাও সবগুলো? মেশিনে দেওয়ার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করবে না একবার?’
পারুল এবার কাঁদোকাঁদো গলায় বললো-‘মাফ করেন ভাবী। আমি বুঝি নাই।’
আশা থামে। পারুলের কান্না দেখে ও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। তাই হালকা হাসার চেষ্টা করে বলে-‘কাঁদছো কেন?আচ্ছা, তুমি যাও। আমি দেখছি কী করা যায়।
নিজের এত ভালো অভিনয় দেখে মনেমনে হেসে পারুল বেরিয়ে গেলো।
পারুল যেতেই আশা হতাশ হয়ে বসে থাকলো বিছানায়। এই শাড়িতে আজ মাছ রান্না করছে। গা থেকে মাছের আঁশটে গন্ধ আসছে, ছিঃ! গুলিয়ে আসছে গা আশার। কী করবে?
চিন্তায় আশা ভুলেই গেছে একপ্রকার, এসব কার পরিকল্পনা হতে পারে ভুলেই গেছে, এক সপ্তাহ আগে অনিরূপের সঙ্গে ওর কী বিষয়ে কথা হয়েছিল। আশা মনে করে, অনিরুপ বলে গেছে ও আজ রাতে আসবে। ততক্ষণে আশার কাপড়ও শুকিয়ে যাবে। এতক্ষণ এভাবে ময়লা শাড়িতে বসে না থেকে অনিরুপের কিছু পরে থাকা যাবে।
আশা তাই কিছু চিন্তা না করেই ভেজা শাড়িগুলো মেশিন থেকে বের করে বারান্দায় মেলে দিয়ে আসে। তারপর আলমারি থেকে অনিরূপের একটা ব্লু শার্ট, ট্রাউজার বের করে বাথরুমে চলে গেলো! গোসল করে বেরিয়ে বারান্দায় ভেজা টাওয়াল মেলতে গেলো! ব্যাস, কাজটা তখনই ঘটে গেলো। অনিরূপের মাত্রই রুমে এসে ঢুকল তখন।
—
‘ইউ আর লুকিং অ্যাট্রাকটিভ ইন ম্যাই শার্ট।’
অনিরূপের কণ্ঠস্বর শোনে, আশা চমকে পেছনে তাকালো। বারান্দার দেয়ালের মধ্যে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিরূপ। ঠোঁটে অভদ্র একটা হাসি ঝুলিয়ে রাখা। শকুনি নজরে পরখ করছে আশার পুরো গা। লম্বা শার্টের হাতা ঝুলছে দুপাশে, আশা সেটাকে কোনরকমে ফোল্ড করলেই লাভ কিছু একটা হয়নু। ট্রাউজারটাও ফোল্ড করে রাখা। হাসলো অনিরূপ, পোউর-শর্ট আশার ট্রাউজার অনেকখানিই ফোল্ড করা লেগেছে।
আশা চূড়ান্ত অবাক, দুপুরে আজ আসার কথা ছিলো না অনিরূপের? বাইরে মিটিংয়ে খাওয়ার কথা ছিলো। এখন তাহলে এই সময়ে কেন?আশা থতমত খেয়ে শার্ট এর উপরের দুটো বোতাম লাগাতে লাগাতে অস্বস্তি নিয়ে বললো-
‘শা-শার্টটা- আমার শাড়িগুলো কে ভিজিয়ে ফেলেছে বাথরুমে। গরমে ভারী শাড়ি পড়ব, আপনি অপেক্ষা করুন। আমি শাড়ি রোদে দিয়েছি। শুকিয়ে গেলেই আমি শার্ট দিয়ে দিব আপনাকে।’
আশা তোতলাচ্ছে। মূলত অনিরূপের চোখ দেখে আশা ভয় পাচ্ছে। ওই দু চোখে আশা আবারো সেই রাতের নেশা দেখছে। আশা ভয় পায় ভীষণ এই নেশা, আশার মনে হচ্ছে তার মাথাটা ঘুরছে আবার। অনিরূপ ভ্রু বাঁকালো। এক পা-এক পা করে আশার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। আশা পেছালো সবসময়ের মতো। পিছিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকাতেই, অনিরুপ আশাকে দুহাতে নিজের মধ্যে বন্দি করে ফেললো। আশা ভ্রূ কুঁচকে অনিরূপের নেশালো চোখের দিকে চাইল। মনেমনে ভয়ে সেটিয়ে গেলেও, মুখে রাগ নিয়ে বললো- ‘দেখুন-আমি কিন্তু এসবের মুডে-‘
অনিরূপ হালকা হেসে আশার নাকে আঙুল ছুঁয়ে বললো-‘মুড বানানো লাগে না, মুড এসে যায়, অটো-আপনা আপনি।’
আশার বুক কাপছে! সুখে নয়, ভয়ে! ও অস্থির হাতে জোর করে নাকের উপর থেকে অনিরূপের আঙুল সরিয়ে দিতেই অনিরূপ তার ডানহাতে আশার দুহাত চেপে দেয়ালে ঠেসে ধরলো। অপরহাতে অনিরূপ আশার শার্টের বোতাম হাত ছুঁয়ে বরাবরের মতো অভদ্র সে হাসিখানা ছুঁড়ে ফিসফিস করে বললো-‘তোমার শাড়ি ভিজে নি। আমি-আমি অনিরুপ ইচ্ছে করে সব ভিজিয়ে ফেলেছি।’
আশা ছুটাছুটি করছিল, অনিরূপের কথায় ওর ছটফটানি বন্ধ হয়ে গেলো, জিজ্ঞেস করল হতবম্ব হয়ে -‘কেন?’
অনিরূপের মুখ আশার মুখের সঙ্গে ছুঁইছুঁই! আশার দুহাত অনিরূপের শক্ত হাতে বন্দি। না পারছে নড়তে, না পারছে বাধা দিতে। আশার তেজ আবারো হারিয়ে যাচ্ছে। টলটলে হয়ে গেছে চোখ দু খানা। অনিরুপ শেষবারের ন্যায় ফিসফিসাল-‘আমি তোমাকে আমার শার্টে দেখতে চেয়েছিলাম। জেদ করেছিলে-জেদের ফলও পেলে।’
#চলবে
------
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_১৫
অনিরূপের মুখ আশার মুখের সঙ্গে ছুঁইছুঁই! আশার দুহাত অনিরূপের শক্ত হাতে বন্দি। না পারছে নড়তে, না পারছে বাঁধা দিতে। আশার তেজ আবারো হারিয়ে যাচ্ছে। টলটলে হয়ে গেছে চোখ দু খানা। অনিরুপ শেষবারের ন্যায় ফিসফিসাল-‘আমি তোমাকে আমার শার্টে দেখতে চেয়েছিলাম। জেদ করেছিলে-জেদের ফলও পেলে।’
আশা শান্ত হয়ে গেলো। ভাসা ভাসা চোখ দুটো দীঘির জলের মতো শান্ত-স্বচ্ছ! অনিরূপের ঠোঁট এগুচ্ছে আশার ঠোঁটের দিকে। সদ্য গোসল করে আশার গায়ে মিষ্টি এক সুঘ্রাণ অনিরূপকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওর দিকে। আবেগে ভাসা অনিরূপের হাত শিথিল হয়ে আসে একসময়, যে হাত আশার হাতদুটো শক্ত করে দেয়ালে চেপে ধরেছিল, সেই হাতটাই এখন আশার কোমর ছুঁয়েছে, টেনে এনেছে নিজের দিকে।
আশা অশান্ত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে অনিরূপের এগিয়ে আসা দেখে শেষবারের ন্যায় চোখ-মুখ খিঁচে বললো-
‘থামুন, নাহলে-‘
অনিরূপ হাস্কি স্বরে মুখ বাড়াতে বাড়তে বলল-‘নাহলে কী?’
আশা তাকায় অনিরূপের দিকে, অনিরূপের চোখ আশার তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটের দিকে।নেশায় হারিয়ে মন উবে গেছে ওর। ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইছুঁই, আর এক ইঞ্চি বাড়লেই সব শেষ! আশা এবার আর সহ্য করতে পারেনা। সব শেষ হওয়ার আগেই হাত উঁচু করে আচমকা চোখ-মুখ খিঁচে শক্ত এক থা//প্পড় বসায় অনিরুপের গালে।
থাপ্পড় এর শব্দে পুরো ঘরটা কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। অনিরূপ থমকে গেলো একপ্রকার। গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে কিছুক্ষণ আশাকে দেখে। আশা ডুকরে কেঁদে উঠেছে ইতিমধ্যেই। কান্নারত আশাকে দেখে অনিরূপের একটুও খারাপ লাগলো না আজ। হয়তো লাগেও না কখনও। তবে আজকের চিত্র ভিন্ন। অনিরূপের ভয়ংকর রাগ ইতিমধ্যই ওর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে। অনিরূপ রাগ সামলাতে না পেরে দ্রুত কদমে আশার দিকে এগিয়ে যায়,কিন্তু আশাকে কান্নারত মুখ দেখে নিজরকে ঠান্ডা করে কিছুটা সরে আসে। আশা অনিরূপের দিকে চেয়ে দেখে,! আশা তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিজের জায়গায়।ভেবেছে হয়তো সেদিন রাতের মতো অনিরূপ কিছু করে বসে? সেদিনের ছোয়ায় কোথাও না কোথাও একটা যত্নের ছোয়া ছিল। কিন্তু আজ চাইলেই অনিরূপ আশাকে ক্ষ/তবিক্ষ/ত করে ফেলতে পারে একটা থা/প্পড়ের শাস্তি স্বরূপ।
অনিরূপ চোখ বন্ধ করে বিছানায় বসেছে। থা//প্পড় খেয়েছে ও, তাও নিজের বউয়ের কাছে, নিজের বানানো হাতের পুতুলের কাছে।হজম করতেই পারছে না ও পুরো ব্যাপারটা। দ্য গ্রেট অনিরূপের জন্যে ব্যাপারটা জানে মে/রে ফেলার ন্যায়।
অনিরূপ জোরেজোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো, তারপর আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো রুম ছেড়ে। যাবার আগে দরজাটা এত জোরে লাগালো যে, দরজার লক পুরোপুরি খুলে ঝনঝনিয়ে মাটিতে পরলো।আশা শুধু দেখলোই এসব।
আশা অনিরূপকে থা/প্পড় দেওয়া হাত চেপে ধরলো অপরহাতে। লোকটা শুধুমাত্র নিজের স্বার্থটাই বুঝলো। আশাকে বুঝলো না একবারও!
আশা বিয়েটা করেছে তো, করেছে না? মানিয়ে নিতে একটু তো সময় দিবে আশাকে। সবকিছু তো আশা মেনেই নিচ্ছিল। এটাও নিতো! সে তো আশাকে কখনো চায়ইনি।, শুধুমাত্র আশার শরীর পেলেই হয়তো তার চলে। কী সুন্দর নাম দিয়েছে ‘ফ্যাসিনেশনের বশে আশাকে তার চাই’
একবার যদি বলতো সে আশাকে ভালোবেসে ছুঁয়েছে। হয়তো সেটা শুনেও আশা মনটাকে সান্ত্বনা দিতে পারতো একটু।
স্বামী মানেই বোধহয় এমনটাই হয়। পদেপদে যার কাছে আশাকে লাঞ্ছি/ত হতে হচ্ছে, আশা চাইলেও তাকে নিজের স্বামী মানতে পারছে না। কেমন দ্বিধায় আটকে গেলো আশা। য/ন্ত্রণা-লা/ঞ্ছনা দুটোর মধ্য আশা ভে/ঙে গুড়িয়ে যাচ্ছে। আশা ডুকরে কেঁদে উঠে আবার। জীবন আশাকে কোথায় এনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। আশা ছিল উচ্ছল, শান্ত নদীর ন্যায়। সেই আশাই আজ চূড়ান্ত উ/গ্র হয়ে গেছে। কারও সঙ্গে ন্যূনতম উঁচু গলায় কথা না বলা আশা, আজ কাউকে থা//প্পড় বসিয়েছে। হয়তো সে সেটার প্রাপ্যই ছিল, আশাকে জোর করার শা//স্তি সে পেয়েছে। কিন্তু—-
________________
ওইদিন দুপুর থেকে অনিরূপের কোনো যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। রাত বাজে ১২ টা! অনিরূপ এখনো ফিরেনি। ওয়াহিদা অনিরুপের সমস্ত বন্ধু-বান্ধবের কাছে খোঁজ নিলেন। তাদের কাছেও যায়নি ও। আশা ওয়াহিদার পাশে বসে আছে। তার হাত এখনো কাপছে। নরম-ভদ্র আশার জন্যে এই থা/প্পড় একটু বেশিই হয়ে গেছে। সারাজীবন যে কাউকে কড়া করে কথা বললেই অপরাধবোধে ভুগে, তার জন্যে নিজের স্বামীকেই থা//প্পড় দেওয়া চূড়ান্ত রকমের একটা ব্যপার হয়ে গেছো।স্বামী- শব্দটা মাথায় আসতেই তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে আশা। স্বামীই তো! আশার শরীর লোভী স্বামী।
ওয়াহিদা মোবাইল রেখে আশার দিকে ফিরলেন। আশা ওয়াহিদার দিকে তাকাল, ওয়াহিদা কড়া গলায় প্রশ্ন করলেন-
‘অনি কোথায় যেতে পারে আশা? দুপুরেই তো আমার ছেলে ফুরফুরে মেজাজে ছিল। তুমি আবার কী ওর সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়েছো?’
আশা চুপ, উত্তর দিল না। পাশ থেকে কাজের মেয়ে আরেকটা বলে উঠলো-
‘ভাবির রুমের দরজার লক ছুইটা মাটিতে পইরা ছিলো আইজ।’
ওয়াহিদা যা বোঝার বুঝে গেলেন। চূড়ান্ত রেগে আশার দিকে চেয়ে বললেন-
‘আবার ঝগড়া করেছো? বিয়ের দিন থেকে সেই একই জিনিস চলে আসছে। ছেলেটার মধ্যে কী কমতি আছে আশা? বলো আমাকে? আমি তো জানি তোমাকে ও জোর করেনি বিয়েতে। নিজের ইচ্ছায় তুমি বিয়েটা করেছিলে। তাহলে এত কেন জ্বা//লাচ্ছো আমার ছেলেকে? কবে বুঝবে তুমি আশা? একটা বিয়ে এমন হয়না। আমার তো মনে হয়-তোমরা দুজন একটা অসুস্থ সম্পর্কে আছো। এটাকে স্বাভাবিক করতে তোমারই এগিয়ে যাওয়া দরকার ছিল।অথচ আমি দেখছি ইনিশিয়েটটা অনিই নিচ্ছে। তুমি এগিয়ে যেতে না পারো, ওকে সাহায্য করতে পারো, রাইট? না তুমি সেটাও করবে না? আচ্ছা বলো তো, অনির সঙ্গে বিয়ে না হলে তোমার আব্বা কী অনির চেয়ে ভালো বর তোমার জন্যে আদৌ পেতেন?’
ওয়াহিদার এতক্ষণের কথাগুলো আশা মুখ বুজে শুনলেও, শেষের কথাটায় ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আর চুপ থাকতে না পেরে শান্ত গলায় বলে বসলো-
‘হয়তো এত বড়লোক পেতেন না। কিন্তু আমার মন বুঝবে, এমন কেউ অবশ্যই পেতেন!’
কথাটা বলে আশা চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেলো। ওয়াহিদা আশার এভাবে চলে যাওয়া একটুও ভালো চোখে দেখলেন না। ওয়াহিদা অসহায় হয়ে সোফায় বসে পড়লেন। তার মনটা বড্ড অশান্ত! মায়ের মন তো, হয়তো আশার অনিরূপের জন্যে চিন্তা হচ্ছে না। কিন্ত ওয়াহিদার মনে আজব আজব ভাবনা আসছে শুধু। ছেলের চিন্তায় ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে উনার।
অনিরূপ ফিরে, সেদিনের দুদিন পর। তাও মাতাল অবস্থায়। রাত তখন ১টা বাজে। আশা ওয়াহিদা দুজনেই সোফায় বসে ছিলেন। ওয়াহিদার চোখে ঘুম নেই। কেয়ারটেকারকে আজ বারে পাঠিয়েছেন, অনিরূপকে ফিরিয়ে আনতে। বারের খোঁজটা অনিরূপেরই এক বন্ধুর থেকে পেয়েছেন। ওয়াহিদা বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছেন, আর একবার আশার দিকে তাকাচ্ছেন। আশা কী করবে? ওয়াহিদার কথামতো চুপচাপ বসে আছে ওয়াহিদার পাশে।
কেয়ারটেকার নিয়ে আসল অনিরূপকে। অনিরূপ মাতাল, প্রায় অজ্ঞান বলা চলে। দুজন পুরুষ শক্ত করে ধরে রেখেছে ওকে। ওয়াহিদা ছলছল চোখে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে মুখটা ছুয়ে বারবার বিড়বিড় করতে লাগলেন-
‘আমার বাচ্চা, আমার ছেলে।’
আশা দূরের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে এখনো। ওয়াহিদা ছেলেকে ছেড়ে আশার দিকে চেয়ে বললেন-‘ওকে রুমে নিয়ে যাও। আর আশা? লেবু শরবত করে ছেলেটাকে খাইয়ে দাও। খবরদার আজ যদি তুমি আমার ছেলের সঙ্গে ন্যূনতম খারাপ বিহেইভ করেছো, তাহলে আমি ভুলে যাব তুমি অনির বৌ।’
আশা ভ্রূ কুঁচকে ওয়াহিদার দিকে চায়। কেয়ারটেকার বড্ড কষ্টে অনিরূপকে নিয়ে শুইয়ে দিল ওর নিজের বিছানায়। আশা লেবু শরবত করে এনেছে। কেয়ার টেকার আশাকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলো। আশা দরজা হালকা ভিড়িয়ে দিয়ে অনিরুপের পাশে বসে লেবু শরবত খাওয়াল। অনিরূপ ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই যতটুকু পারে আশা খাওয়াল।
তার একটু পরেই অনিরূপ বমি করবে বলে মুখ বাড়াল, আশা সঙ্গেসঙ্গে একটা মগ এনে দিল অনিরূপের মুখের সামনে। অনিরূপ বমি করে আবার ক্লান্ত শুয়ে শুয়ে পড়ে। আশা সবকিছু ধুয়ে আবার বিছানায় এসে বসে। তাকায় অনিরূপের দিকে।
ঘুমন্ত অবস্থায় কী শান্ত দেখাচ্ছে, নিষ্পাপ একজ্ঞ পুরুষ! অথচ এই পুরুষটাই জেগে থাকলে কাপুরুষের মতো ব্যবহার করে। আশা চায় মানিয়ে নিতে , কিন্তু দিনশেষে একটা খারাপ ঘটনা ঘটায় অনিরূপ, আশার আবারও ঘেন্না ধরে যায় ওর প্রতি। এভাবেই চলছে ওদের অসুস্থ বিয়ের সম্পর্ক!
অনিরূপ বিড়বিড় করছে কিছু ঘুমের মধ্যে। আশা কান পাতে অনিরূপের মুখের সামনে, অনিরূপ বিড়বিড় করে বলছে-
‘আই উ ইল কি ল ইওয়ু আ শা।’
আশা চমকে সরে গেলো সঙ্গেসঙ্গে। বুকে হাত রেখে ভয়ার্ত চোখে অনিরূপের দিকে চায়। মে//রে ফেলতে চায় আশাকে? ও আল্লাহ!
আশা অনিরুপের গালের দিকে চায়। লাল নেই এখন আর জায়গাটা। কিন্তু সেদিন অনিরুপের ফরসা গালে আশার হাতের চার আঙুলের দাগ পড়েছিল।
ইগোস্টিক অনিরূপ হয়তো ঘরের বাইরেও এটা নিয়ে লজ্জা পেয়েছে ভীষণ। এইজন্যেই আশার উপর তার এত রাগ, এত ক্ষোভ।আশাকে মে/রেও ফেলতে চায়।
সেদিন রাতে অনিরূপ ঘুমিয়ে গেলেও, আশা বেশ দেরি করেই ঘুমায়। শেষ রাতের দিকে অনিরুপের পাশে গুটিসুটি মেরে এক কোণায় শুয়ে পরে।
অনিরূপের যখন ঘুম ভাঙে, তখন সবে ভোর হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে, নিজেকে ঘরের বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে অনিরূপ চোখ মুখ খিঁচে দু-আঙুল চোখের উপর চেপে ধরে। কখন এলো সে বাসায়? মনে পড়ছে না। পাশে একবার চোখ গেলো, আশা শুয়ে আছে। শাড়ি এলোমেলো ওর। অনিরূপ সঙ্গেসঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো। রাগে মাথাটা আবার ধপধপ করছে। অনিরূপ উঠে বসল বিছানায়। তারপর কিছুক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ করে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।ফ্রেশ হয়ে জগিংয়ের জামা কাপড় পরে বেরিয়ে গেলো।
আশার যখন ঘুম ভাঙে; তখন অনিরূপ মাত্র জগিং থেকে ফিরেছে। ও গোসল করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঝাড়ছে। আশা চোখ ডলে উঠে বসল। তাকালো অনিরূপের দিকে। অনিরূপ এদিকে একবারও চায়নি।অন্যদিন হলে আয়নায় আশার দিকেই চেয়ে থাকে। আশা হয়তো ভেবেছিল, অনিরূপ কিছু বলবে; বা রাগ ঝাড়বে। তেমন কিছুই ওকে করতে না দেখে আশা হাঁপ ছাড়ল। স্বস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে চলে গেলো বাথরুমে ফ্রেশ হতে।
ফ্রেশ হয়ে দেখে অনিরূপ ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। পরনে হোয়াইট টিশার্ট, আর কালো ট্রাউজার। আশা এগিয়ে গেলো, বললো-
‘নিচে খেতে আসুন।’
অনিরূপ শুনল না। সে আনমনে ল্যাপটপে কাজ করছে। পুরোপুরি ইগনোর করল আশাকে। আশা আবারও বললো। অনিরূপ শুনে না। নীচ থেকে ইতিমধ্যেই দুবার খবর এসেছে, ওয়াহিদা ডাকছেন।
তাই শেষবার আশা অনিরূপের ল্যাপটপটা হাত থেকে সরিয়ে কড়া গলায় বললো-
‘‘আপনার মা ডাকছেন নিচে থেকে, খেতে আসুন।’
ব্যাস, অনিরূপের রাগ এবার ছিটকে বেরিয়ে এলো বাইরে। ও উঠে দাঁড়িয়ে আশার দিকে আঙুল তুলে হিসহিসিয়ে বললো-
‘ফর গড শেক, ক্যান ইউ প্লিজ শাট অ্যাপ এন্ড গো আউট ফ্রম মাই রুম? ইউ আর ইরিটেটিং মি অ্যান্ড আমি আমার ঘরে কারো ইরেটেশন সহ্য করতে পারছি না।সো- জাস্ট গেট আউট।’
অনিরূপ আঙুল দিয়ে ইশারা করে ঘরের দরজা দেখিয়ে দিল।আশা অবাক হয়ে চায়। এতটা অ/পমান আশাকে কেউ কখনও করেনি। যে অনিরূপ আশার পেছনে বেহায়ার ন্যায় এতদিন পরে ছিল, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো অপমানটা তার কাছ থেকেই পেলো আশা। অনিরূপ এতটাই বদলে গেলো?
#চলবে