ফন্ট সাইজ:
থিম:
দীঘির জলে কার ছায়া

২০+২১

লেখক: অবন্তিকা তৃপ্তি

#দীঘির_জলে_কার_ছায়া

#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২০
সদর দরজার সামনে পা রাখতেই সিঁড়িতে পা ভেজে আচমকাই নিধি পড়ে যেতে নিল। অরূপের গায়ের উপর পড়তেই অরূপ টাল সামলাতে, নিধিকে বাঁচাতে নিধির কোমর ছুয়ে আটকালো পড়ে যাওয়া থেকে। নিধি থরথর করে কেঁপে উঠে অরূপের বুকের কাছের শার্ট খাঁমচে ধরলো। অরূপ নিধির দিকে কেমন অন্যরকম দৃষ্টিতে এই প্রথম তাকাল, নিধির মুখের আদল আচমকাই অরূপের ভীষন ভালো লেগে গেলো। অরূপ তাকিয়ে ছিলো, নিধি লজ্জা-সঙ্কোচ নিয়ে উঠে দাড়াবে সোজা হয়ে- তার পূর্বেই সদর দরজাটা খুলে বড়বড় চোখে ওদের দুজনকে দেখে ফেলল আশা! নিধি আশাকে দেখে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, অরূপ বোকাবোকা চোখে দু বোনের দিকে চেয়ে হঠাৎই কেশে উঠল, নিচু স্বরে আশাকে বলল-‘উনাকে ভেতরে আনুন ভাবি।’
কথাটা বলে বিড়াল ছানার ন্যায় গুটিয়ে পালিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো অরূপ। আশা নিধির দিকে তাকাল, নিধি গলা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললো-‘শরীর ব্লেলেন্স করতে পারিনাই। তাই ওভাবে-‘
আশা সঙ্গেসঙ্গে নিধিকে এসে জড়িয়ে ধরল, আবেগে আপ্লুত হয়ে বললো-‘আপা, আসতে কষ্ট হয়নি তো?’
নিধি হালকা হাসল, আশার পিঠে হাত বুলিয়ে বললো-‘তোর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আসলেই অদ্ভুত ভীষণ।তুইও তাদের কাছে থেকে নিজেও অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছিস।’
আশা হেসে ফেলল, আবেগমাখা গলায় আরও কটা কথা বলবে, তার আগেই পেছন থেকে ওয়াহিদা বললেন-‘ওকে নিয়ে ভেতরে আসছো না কেন, আশা? গরমে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখলে, আক্কেল নেই?’
আশা ওয়াহিদার কথা শুনে জিহ্বা কাটল দাঁত দিয়ে, নিধিকে ধরে ধরে ভেতরে ঢুকলো। আশা এমনভাবে নিধিকে ধরে রাখছে, যেন আসলেই নিধি ভীষন অসুস্থ, হাঁটতেই অক্ষম। নিধি বোনের এমন পাগলামি দেখে হেসে উঠে মনেমনে।আশা নিধিকে সোফায় বসাল, ওয়াহিদাও মুখোমুখি সোফায় বসলেন। আশাকে বললেন-‘যাও শরবত বানিয়ে আনো আশা।’
আশা শরবত বানাতে চলে গেলো। ওয়াহিদা আর যাই হোক, বাড়ির মেহমানদের সঙ্গে কড়া আচরণ করেন না সাধারণত। তাই হাসিহাসি মুখে বললেন-‘কেমন আছো নিধি? অনি বলল, তোমার শরীর নাকি ভীষণ অসুস্থ।’
নিধি হালকা হাসার চেষ্টা করে বললো-‘তেমন নয় আন্টি। ওই একটু-‘
আশা শরবত নিয়ে এসেছে। নিধি শরবত খেতে খেতে উপরের সিঁড়ির দিকে এমনি তাকালো, অবাক হল নিধি। অরূপ নিধি তাকানোর সঙ্গেসঙ্গে মুখ চোরের মতো লুকিয়ে আবার ঘরে চলে যাচ্ছে দ্রুত। নিধি আশ্চর্য হলো ভীষন! ছেলেটা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? 
আশা নিধিকে ওয়াহিদার কথায় একটা ঘর দেখিয়ে দিল। আশ্চর্যজনক ভাবে ঘরটা অরূপের পাশের গেস্টরুম। নিধি ঘরে ঢুকেই ফ্রেশ হতে গেলো। আশা নিধির ঘরের বিছানায় বসে থাকলো। নিধি বাথরুম থেকে বের হলে আসা হাসিহাসি মুখে বললো-‘আব্বা তোমাকে কী কিছু বলেছেন আপা?’
নিধি তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে বললো-‘কী বলবে?’
আশা কিছুটা দোনামোনা করে বললো-‘তোমার বিয়ের কথা। পাত্র নাকি সদ্য স্ত্রী হারিয়েছে। ওদের তোমাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। আব্বা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে। ওদের সঙ্গে কথা আগাবে কী না।’
নিধি হাসলো, বললো-‘ভালো মানুষকেই দায়িত্ব দিয়েছে আব্বা। তোকে এত পাকনামি করতে হবে না।আমি এখন বিয়ে করছি না। লোকটা কয়েকদিন হল না বৌ হারাল, এক্ষুনি বিয়ের জন্যে লাফাচ্ছে। ভালো নাকি লোকটা?’
‘তাহলে তুমি কী কোনোদিন বিয়েই করবে না আপা?- আশা গোমরা মুখে বলল।
নিধি আশার পাশে বসলো। হালকা হেসে বললো-‘করব না কেন? সারাজীবন আব্বার ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকব নাকি? তবে এবার ভেবেচিন্তে। আগের ভুলটা আমি আবার করতে চাইনা।’
_________________
আশা নিধিকে বসিয়ে রেখে রিসিপশনিস্টের কাছে এগিয়ে যায়-
‘এক্সকিউজ মি? আমি অনিরূপ শেখ জয়ের ওয়াইফ বলছি।’
আশা অনিরূপের শিখিয়ে দেওয়া কথাগুলো তোতাপাখির ন্যায় গড়গড় করে বলে ফেলে। ‘ওয়াইফ’ কথাটা বলার সময় আশা গলার স্বর অস্বাভাবিক ভাবে কেপেছিল। কিছুদিন আগেও এই কথাটা বলার সময় আশার রাগ হতো, ঘেন্নায় শরীর ঘিনঘিন করে উঠত। এখন সেটা আর হচ্ছে না, ঘেন্না না হলেও কোন একটা অস্বস্তির ফলা এসে বিধেছে বুকে। আশা কথাটা বলার সাথেসাথে রেসিপশনের মেয়েটা হন্তদন্ত হয়ে বলল-‘সিউর ম্যাম, স্যার আমাদের বলে রেখেছেন। আসুন আমার সঙ্গে।’
রিসিপশনের মেয়েটার এমন হম্বিতম্বি দেখে আশা কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বলল-‘এত তাড়াহুড়ো করবেন না, প্লিজ। আমরা অপেক্ষা করছি , আপনি কাজ শেষ করুন।’
মেয়েটা আশার দিকে কিছুটা অবাক হয়ে তাকায়! স্যার এত রাগী, বদমেজাজি একজন, অথচ উনার স্ত্রী! পানির ন্যায় শান্ত, গলার আওয়াজ কী মিষ্টি! মেয়েটা হালকা হাসল, বলল-‘জী, আসুন।’
আশা নিধিকে নিয়ে মেয়েটার পিছু পিছু এগিয়ে গেলো। অনিরূপ প্যাশেন্ট দেখছে। রিসিপশনের মেয়েটা দরজায় টোকা দিল-‘স্যার আসব?’
অনিরূপ বুঝল আশা এসেছে। ও প্যাশেন্ট দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে দিল। গরিব মানুষ এবার অনিরূপের হাতটা ধরে বলে উঠল-‘স্যার, ৫০০ টাকা কমায় রাখেন স্যার। অনেক কষ্টে আসছি আপনার কাছে। পিলিজ স্যার!’
অনিরূপ ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে হাত সরিয়ে ফেলে বললো-‘টাকা এটেন্ডেন্সের কাছে দিয়ে যান।’
রোগী বুঝে গেল, অনিরূপ টাকা কমাবে না। দুহাতে চোখের জল মুছে উনি উঠে দাড়ালেন। এটেন্ডেন্সের কাছে টাকা জমা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আশাকে দেখে। আশেপাশে কথা শুনে বুঝতে পারল, এটা স্যারের বউ! গরিব লোকটা আশার দিকে ঘৃণিত নজরে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ, আশা লোকটাকে দেখে ভ্রু কুঁচকায়। লোকটা আশাকে আগাগোড়া ঘৃণার নজরে দেখে মেয়েকে নিয়ে চলে গেলো। আশা তখনও ভ্রু কুচকে চেয়ে আছে লোকটার পিঠের দিকে। উনি এমন অদ্ভুত ভাবে আশাকে দেখছিল কেন? আশা বুঝে উঠে না। অনিরূপ ডাকছে। তাই আশা নিধিকে নিয়ে রুমে ঢুকে। 
ওদের দেখে অনিরূপ হালকা হেসে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল, হাত সিয়ে সামনের চেয়ার দুটো দেখিয়ে বললো-‘বসো, বসো নিধি।’
নিধি আড়ষ্টতায় জড়িয়ে বসল। আশা বললো-‘আপনার কথামতো টেস্ট করিয়েছে ওরা।’
অনিরূপ নিধির আগের রিপোর্টগুলো ঘাটাতে ঘটাতে বলল-‘কালকের মধ্যে রিপোর্ট দিয়ে দিবে।’
ওদের কোথার মধ্যে অনিরুপ কলিং বেল বাজাল, এটেন্ডেন্স দ্রুত রুমে ঢুকলো। অনিরূপ জিজ্ঞেস করল-‘অরূপ স্যারের প্যাশেন্ট দেখা শেষ?’
‘জি স্যার।’
‘ওকে আমার রুমে পাঠিয়ে দাও।’
মেয়েটা চলে গেলো। অনিরুপ আশাদের দিকে ফিরে বলল-‘চা না কফি? নিধি?’
নিধি সঙ্গেসঙ্গে বললো-‘লাগবে না, আমরা চা খেয়েই এসেছি।’
অনিরূপ আর জোড়াজোড়ি করলো না। অরূপ এসেছে। হাতে এপ্রোন ঝুলিয়ে, বুকের কাছের শার্টের দুটো বোতাম খোলা।লোমশ বুক দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। নিধিকে একবার দেখেই অরূপ আরেকটা চেয়ারে বসল।অনিরূপ আশাকে একবার আড়চোখে দেখে, ফ্রান্স ভাষায় অরূপকে কিছু বললো। অরূপ অনিরুপের কথা শুনে আশার দিকে চেয়ে আবার অনিরুপের দিকে চাইল। অনিরুপ চোখের ইশারায় অনুরোধ করল অরূপকে। অরূপ হেসে ফেলল, বললো-‘ওকে।’
অরূপ তারপর আশার দিকে তাকাল। আশা-নিধি ওদের দুজনের দিকে 
ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছে। আশা বললো-‘এটা কী কোন কোড ল্যাংগুয়েজ?’
অনিরূপ কিছু না বললো, শুধু দাঁত বের করে হাসলো। অরূপ উত্তর করল-‘এটাকে ব্রো কোড বলে ভাবী। তুমি বুঝবে না।’
আশা এখনও গোল গোল চোখে ওদের কথা বোঝার চেষ্টা করছে। অনিরূপ উঠে দাঁড়াল। এপ্রোন খুলে হাতে ঝুলিয়ে আশার দিকে চেয়ে বললো-‘চলো, বেরোই আমরা। নিধির কিছু ওষুধ নিতে হবে। নিধি অরূপের সাথে আসবে ওগুলো নিয়ে। কাম অন!’
আশা হতভম্ব হয়ে বললো-‘আমি আপাকে নিয়ে এলাম, এখন আপার সাথে যাবো না?’
অনিরূপ বললো-‘না, কারণ তুমি এখন তোমার হাসবেন্ডের সাথে ডেটে যাবে। মা কে বলা আছে।’
আশা বিরক্ত হলো ভীষণ, বললো—‘পাগল আপনি? বেহুদা কথা বলছেন কেন?’
নিধি এবার নিজেই খুশি হয়ে বললো-‘আশা? যা, ঘুরে আয়। আমি যেতে পারব।’
আশা নিধির দিকে চেয়ে বললো-‘আপা, তুমিও এই লোকের পাগলামিকে সায় দিচ্ছো। উফ!’
নিধি হালকা হেসে বললো-‘কারণ এই পাগলামি গুলো একজন মেয়ের স্বপ্ন থাকে। তুই পাচ্ছিস দেখে আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। যা ঘুরে আয়।’
আশা আর কিছু বলবো, তার আগেই অনিরূপ বলে উঠে-‘বেরোবে? নাকি…’
নিধি এবার নিজেই আশাকে জোর করে চেয়ার থেকে উঠিয়ে অনিরূপের দিকে ঠেলে দিল। অনিরূপও হেসে আশার কাঁধ আগলে নিলো। তারপর আশাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যেতে লাগল সামনে। 
ওরা যেতেই, নিধি কেমন আবেগপ্রবন হয়ে গেলো। হালকা হেসে চোখের কোনার জল লুকিয়ে ফেলল। বোনকে দেখে নিধির আফসোস হচ্ছে! এমন একটা পাগলাটে সংসার তো ওরও হতে পারতো! 
অরূপ নিধিকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখে, একটু পর বলে উঠে- ‘বাসায় যাবেন না? চলুন।’
নিধি মৃদু হেসে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিলো। অরূপ বাইরে এসে বাইকের চাবি বের করল, নিধি বাইক দেখে সঙ্গেসঙ্গে বললো-‘বাইক?’
অরুপ চাবি দিয়ে বাইক চালু করছিল, নিধির কথা শুনে ওর দিকে তাকিয়ে বললো-‘কেন? সমস্যা ভাই গাড়ি নিয়ে গেছে।’’
নিধি এদিক ওদিক তাকিয়ে অশ্বস্তি ঢাকবার চেষ্টা করে বললো-‘আপনাদের বাসার ঠিকানা দিন, আমি পৌঁছে যেতে পারবো।’
অরু নিধিকে একবার দেখে আবার নিজের বাইকের দিকে তাকাল। পরপর কিছু এইটা মনে পরে ‘শীট!’ বলে বাইক থেকে নেমে গেল। নিধির দিকে চেয়ে বললো-‘চলুন, সিএনজি দেখি। সিএনজিতে তো আপত্তি নেই?’
নিধি এবার বিড়ম্বনায় পরে গেলো। বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা এত ভোগান্তি পোহাচ্ছে ওকে নিয়ে। লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে নিধি। নিধি তাই বললো-‘আপনি যান।আমি যেতে পারব। প্লিজ ঠিকানাটা দিয়ে দিন।’
অরূপ হাসল। মেয়েটা লজ্জায়ই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই ও এবার নিধিকে কিছু আর জিজ্ঞেস করল না, এগিয়ে গিয়ে সিএনজি দেখল। সিএনজি একটা পেয়ে হগিয়ে নিধিকে হাত বাড়িয়ে ডাকল। নিধি আবারও বললো-‘খামোকা কষ্ট করছেন আপনারা।’
অরূপ কিছুটা থমকলো। সত্যি তো! মেয়েটার জন্যে অরূপ এতো কেন বেগ পোহাচ্ছে? কীসের এত টান! মেয়েটাকে ভালো রাখার, উনাকে অস্বস্তিতে না ফেলার? অরূপ নিজের উপরই আশ্চর্য হচ্ছে। 
অরূপ নিজের ভাবনা গুলো এখনকার মতো ঝেড়ে ফেলে নিধিকে জোরপূর্বক সিএনজি তে উঠে বসলো। নিজে ড্রাইভারের পাশে বসল। নাহলে দেখা যাবে, মেয়েটার পাশে বসলে এখানেও মেয়েটা অস্বস্তিতে শেষ হয়ে যাচ্ছে।হাসে অরূপ! অস্বস্তি রানীটা! 
#চলবে
-----
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২১
সুন্দর, শুনশান একটি রাত! শহরে অনেক নিয়ন বাতির ঝলমলানি দেখা যাচ্ছে। গাড়িতে একটা সফ্ট মিউজিক বাজছে। আশা এখনও মুখটা ফুলিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। অনিরূপ বার কয়েক চেষ্টা করছে আশার সঙ্গে কথা এগুনোর। অথচ জেদি মেয়েটা মুখই খুলছে না। অসম্ভব একটা মেয়ে! অনিরূপ বিড়বিড় করে বলে বসে-‘শরীরে ২০ কেজির মাংস নেই, অথচ জেদ শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, উফ!’
আশা এখনও জানালার দিকে চেয়ে আছে। অনিরূপ এবার মিনমিন করে কথা বলার ট্রাই করে-‘আশা, শুনো আশা! ‘
আশা তাকাল না। অনিরূপ আবারো গলা কেশে বলে-‘আল্লাহর ওয়াস্তে কথা তো বলো, আশা। ঘুরতে এসে মুখটা বেজার করে রেখেছ, আর আমার মুডটাও খারাপ করছো!’
আশা এবার অনিরুপের দিলে তাকাল। কিছুটা রেগেই বললো-‘আপাকে এভাবে ফেলে এলাম এটা কী ঠিক হয়েছে? অরূপকে বারবার ভোগান্তি দিচ্ছেন আপনি।’
অনিরূপ কিছু একটা ভেবে তির্যক হেসে বললো-‘হয়তো অরূপের জন্যে এটা ভোগান্তি নয়, হয়তো তার থেকেও বেশি কিছু।’
আশা অনিরূপের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এই লোক শুধরানোর নয়। সারাক্ষণ নিজের মর্জি মতো চলা লোক জীবনেও কী আশাকে শুনবে? উহু! 
আশা আবারও চুপ হয়ে যায়। অনিরূপ বললো-‘কোথায় যাবে এখন বলো? চাইনিজ রেস্টুরেন্ট? নাকি আমার পছন্দের ইতালিয়ান খাবে?’
আশা আশেপাশে চায়। আজকের রাতটা ভীষণ শীতল, আরামদায়ক! শীতল বাতাস বইছে চারদিকে। বাতাসে আশার খোপা করা চুলও এলোমেলো হচ্ছে। আশা মুখটা ভরে শ্বাস টানল! তারপর চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে আপনা আপনি অস্ফুট স্বরে বলে বসলো-‘কোন কৃতিমতা নেই, এমন জায়গায় যাব।’
অনিরূপ রাস্তায় ফোকাস করে ছিল। আশার কথা শুনে বলে উঠল-‘হোয়াট?’
আশা এবার সরাসরি তাকায় অনিরূপের দিকে। সুন্দর করে হেসে আবদার করে বসে- ‘গাড়িটা ঘুরিয়ে একটা নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে যান না।’
অনিরূপ ভ্রু কুঁচকে আশার দিকে তাকিয়ে বললো-‘আর ইউ ম্যাড? এত রাতে নিরিবিলি জায়গা মানে বুঝো? রিস্ক আছে।’
আশা অবুঝের মতো বলে বসে-‘কীসের রিস্ক?’
অনিরূপ এবার ক্রূর হাসে। আশার চুলের খোপাটা আচমকা খুলে দিয়ে ঝরঝরে হেসে বলল-‘ সুন্দরীদের রাক্ষসরা কেড়ে নিতে চায় একা পেলে, জানো না?’
আশা ভ্রূ বাঁকায়, বলে-‘তাতে কী? স্ত্রী রক্ষার দায়িত্ব নিবেন!’
অনিরূপ কিছু না বলে শুধু হাসে। অথচ মনেমনে সে বলে একের পর এক কথা-‘তোমার জীবনে সত্যিকারের রাক্ষস তো আমি, সুন্দরী আশা! আমি এলাম, তোমাকে কেড়ে নিলাম, আর এখন? তোমার মন কাড়ার জন্যে আমার জান হাজির করে দিলাম।আমার সুন্দরীটা আসলে, বড্ড পোউর!! আহা!’
অনিরূপ নিয়ে যাবে না দেখে আশা আর কথা বাড়ায় না। চুপ করে বসে থাকে বাকীটাসময়। কিন্তু একটাপর্যায়ে দেখে অনিরূপ সত্যি সত্যি আশাকে নিয়ে যায় একটা নদীর পাড়ে। নদীর পাড়ে রাত নটায়ও একটা-দুটো কাপল দেখা যাচ্ছে, ওরা নিজেদের মতো করে সময়টা উপভোগ করছে। 
অনিরূপ ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আশার দিকের দরজা খুলে হাত বাড়িয়ে দিল, পারফেক্ট ম্যানলি ভঙ্গিতে বললো-‘ইওর হ্যান্ড, হানি?’
আশা অনিরূপের নাটক দেখে হেসে ফেলল কেন যেন। ‘বড্ড নাটক করছেন’ বলে হাসতে হাসতে হাত দিল অনিরূপের হাতে! 
প্রথমবারের মতো অনিরূপের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া আশার হাতটা অনিরূপ বেশ সফ্টলি আগলে চেপে ধরলো। আশা নামল গাড়ি থেকে। অনিরূপ আশা কে নিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। আশা হাঁটতে হাঁটতে চারিদিক দেখে বললো-‘ভেবেছিলাম অন্ধকার থাকবে সব। এখন তো দেখছি আলো আর আলো।’
অনিরূপ আশার হাতটা এখনো ধরে আছে। অনিরূপ ওদের দুজনের ধরে রাখা হাতটা এখনো অদ্ভুত ভাবে দেখেই যাচ্ছে। বিষয়টা ভালো লাগছে দেখতে ওর। আবেগে, আবেশে অনিরূপ হঠাৎ আশার হাতটা চেপে ধরলো শক্ত করে, আশা অনিরূপের দিকে তাকাল তখন। অনিরূপও তাকাল। দুজনের চোখে চোখ পড়ল। আশা নিজের হাতের দিকে তাকাল, তারপর আস্তে করে হাতটা নিয়ে নিলো অনিরূপের হাত থেকে। অনিরূপ এখন আর হাতে গরম কিছু অনুভব করছে না, হাতে আরাম লাগছে না একদম আর। হাতটা কেন যেন বড্ড অসম্পূর্ণ দেখাচ্ছে। অনিরূপ ব্যর্থ ভঙ্গিতে আশার দিকে তাকাল।
আশা ইতি-ওতি চেয়ে সঙ্কোচ নিয়ে বললো-‘জায়গাটা ঘুরে দেখি?’
অনিরূপ আশার দিকে তাকাল, মাথা নেড়ে অস্ফুট স্বরে বললো-‘হু-হ্যাঁ, চলো।’
আশা হাঁটছে। অনিরূপ পাশে পাহ হাঁটছে ওর। পাশেই একটা ছোটখাটো ধাবা দেখা যাচ্ছে। অনিরূপ সেটা দেখে বললো-‘ক্ষুধা পেয়েছে তোমার? ধাবা আছে এখানে একটা।’
আশা উচ্ছল ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে বললো-‘না, আরেকটু পরে খাই?’
অনিরূপও আর জোর করলো না। ওরা হাঁটতে হাঁটতে বেশ দূর এসে গেছে। এবার অনিরুপ একটা গান ছাড়ল ওর ফোনে। আশা হঠাৎ গান শুনে বললো-‘আপনি গানও শুনেন?’
অনিরূপ মাথার পেছন চুলকে হাসার চেষ্টা করে বললো-‘ওই মাঝেসাঝে।’
আশা হেসে বললো-‘আপনি দেখায়; আচার আচরণে খারুস পুরুষমানুষ হলেও আপনার মধ্যে এখনও একটা দুরন্তপনা আছে। কিন্ত আমার মনে হয়, আপনি আপনার এই দিকটা লুকিয়ে রাখতেই বেশি পছমদ করেন! আই গট ইট!’
অনিরূপ ভ্রু বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে-‘এমন মনে হওয়ার কারণ?’
আশা জবাব দিলো-‘কারণ আপনি ভয় পান, না জানি আপনার মেইল ইগো ছোট হয়ে যায় মানুষের সামনে।’
অনিরূপ হেসে ফেলল। ভ্রূ নাচিয়ে বললো-‘ আমার উপর আজকাল পিএইচডি করছো নাকি?’
আশা বললো-‘এমন নয়। আপনার সঙ্গে এতটা মাস থাকতে থাকতে কিছুটা হলেও আপনাকে বুঝে ফেলেছি।’
অনিরূপ কিছু বললো না। অনিরূপকে জানতে চাইলে, জানুক! সে আশাকে ততটাই জানতে দিবে, যতটা সে চায়!
আশা হাঁটতে হাঁটতে বললো-‘গানটা ভালো মানিয়েছে এখনের আবহাওয়া আর সিনারিও এর সঙ্গ।’
‘আর আমাদের জুটির সঙ্গেও-‘ -অনিরূপ কথার উপরে বলে ফেলল। 
আশা চমকে অনিরুপের দিকে তাকাল, পরপরই লজ্জা অথবা সঙ্কোচে আবারও গুটিয়ে গেল।আশা আগে আগে আরো কয়েক কদম এগোতেই, অনিরূপ এবার পেছন থেকে ডেকে উঠল-‘
‘এই যে সুন্দরীতমা স্ত্রী আমার!’
আশা এত জোরে ডাক শুনে চমকে পেছনে তাকাল। অনিরূপ আশার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। হাত পাতিয়ে আশার দিকে চেয়ে বড্ড রোমান্টিক ভঙ্গিতে চেয়ে আছে আশার দিকে। আশার চোখে বিস্ময়. চমক! 
অনিরূপ হাতটা ওভাবেই বাড়িয়ে রেখে রোমান্টিক ভঙ্গিতে অনুমতি চাইল-‘উইল ইউ ওয়ানা ড্যান্স উইদ মি, মিসেস অনিরূপ শেখ জয়?’
আশা আশেপাশে চায়। সব কাপলরাই এই নিরিবিলি মোমেন্ট উপভোগ করছে। আশা আবারো অনিরূপের দিকে চায়।ফিসফিস করে শাসায়-‘পাগল? এখানে ড্যান্স করবেন আপনি?’
অনিরুপ আবারও বলল-‘কেন নয়? পাশে এমন সুন্দরী স্ত্রী থাকলে স্বামীরা একটু আকটু ডান্স করতেই চায়। সো মে আই?’
এমন কথার ধরনে, আশা কেন যেন ঠোঁট টিপে হেসে উঠল। পরপরও আবারও মুখটা স্বাভাবিক করে ফেলল। অনিরূপের দিকে চেয়ে রেগে কিছু বলতে গিয়েও কেন যেন বলতে পারল না। হয়তো চারদিকের পরিবেশটাই এমন রোমান্টিক, আবেগে ভেসে বেড়ানোর মতো।
তাই কোমলমতি আশা স্বামীর আবদারে গলে, আবেগে গা ভাসিয়েই দিল। হাত বাড়িয়ে ছুলো অনিরূপের হাতখানা। অনিরূপ আলতো করে ওই হাতটা ছুলো। মাথা নিচু করও একটু হেসে আবারও আশার দিকে তাকাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে আশার কোমরে হাত রাখল। আশা অনিরূপের কাঁধে হাত রেখে লজ্জা নিয়ে বললো-‘আমি ডান্স পারি না।’
অনিরূপ আশার হাতটা একটু উঁচু করে হেসে বলল-‘আপনার স্বামী আপনাকে শিখিয়ে দিতে চাইছে, মিসেস অনিরূপ! শিখতে চাইবেন তার কাছে?’
আশা অনিরূপের এমন নাটক দেখে হেসে ফেলল! অনিরূপের ফোনে গান বাজছে-
Ladies and gentlemen, will you please stand?
With every guitar string scar on my hand
I take this magnetic force of a man to be my lover
My heart's been borrowed and yours has been blue
All's well that ends well to end up with you
Swear to be overdramatic and true to my lover
And you'll save all your dirtiest jokes for me
And at every table, I'll save you a seat, lover
অনিরূপ আশাকে ঘুরিয়ে গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলালো,আশা যতটুকু পারছে অনিরূপের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা করছে।গ্রামের মেয়ে, টিভি দেখে যতটুকু শিখেছি আরকী! 
গানের একপর্যায়ে অনিরূপ বিড়বিড় করে আশার কানের কাছে এনে শেষেরটুকু বলল-‘লাভারর’
আশার স্যুরসূরি লাগলো ভীষণ! ও হেসে উঠে ও কান সরিয়ে কাঁধ সংকুচিত করে ফেলল। অনিরুপ আশার কোমর ধরে একটার পর একটা স্টেপ দিতে দিতে গান গাইলো-
Can I go where you go?
Can we always be this close forever and ever?
And ah, take me out, and take me home (forever and ever)
You're my, my, my, my
Oh, you're my, my, my, my
Darling, you're my, my, my, my
Lover
তারপর আবারও আশার ওপর কানে বিড়বিড় করল আগের মতো-‘লাভারর!’
আশা এবার অতিরিক্ত সুড়সুড়িতে হেসেই ফেলল! অনিরূপের কাঁধে থাকা হাতটা অনিরূপের পরনের নেভি ব্লু শার্টটা খামচে ধরে হাসতে হাসতে বলে উঠল-‘সুড়সুড়ি লাগে, এমন করবেন না প্লিজ!’
অনিরূপ বোকা বোকা চোখে আশার দিকে চেয়ে বলে উঠল-‘এটা একটা রোমান্টিক স্টেপ, আশা!’
আশা থমকে গেলো! সঙ্গেসঙ্গে লজ্জায় অনিরূপের কাঁধ ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। অনিরূপও আশার কোমর ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
আশা অনেকক্ষণ হলো এভাবেই দাঁড়িয়ে আছে! আশা কাঁপছে, ওর নরম হৃদয়টা আজকাল বড্ড অচেনা ঠেকে ওর কাছে। অনিরূপের বদলে যাওয়া শুরুতে খটকা লাগলেও, এখন আশার ভালোবাসা লোভী মনটা ক্ষয়ে গেছে স্বামীর প্রেমে। হ্যাঁ, স্বীকার করে আশা এখন সেটা! কিন্তু সেটা মনেমনে। মুখে আশা মরে গেলেও বলবে না অনিরূপকে ভালোবাসে, অসভ্য স্বামীর প্রেমে আশা শেষ অব্দি পিছলালোই! 
স্বীকার করতে যে আশার বড্ড ভয়! যদি অনিরূপ বদলে যায়, ধোঁকার ব্যথাটা আবার পেতে হয়? স্বামীর কাছে নিজের অনুভূতি নিয়ে অপমানিত হলে আশা যে মরে যাবে লজ্জায়! প্রবল আত্মসম্মান খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে আশা! বড্ড ভয় আশার কোমল মনে!
অনিরূপ এখনও সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে আশার পাশে।অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর একটা সময় আশা টলমল চোখে চেয়ে- অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করে বসে-
‘আপনি কী সত্যি বদলে গেছেন? সত্যিই?’
অনিরূপ আশার দিকে মাথা তুলে চায়! তার চোখে কিছু একটা আজকে দেখা যাচ্ছে! আজকে অনিরুপের বুকে অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে! আশার টলমলে কণ্ঠের প্রতুত্তরে মিথ্যা বলতে কেন যেন আজ অনিরূপের একটুও মন চাইল না! অনিরূপ বুকের ঢিপঢিপ শব্দকে এড়িয়ে, শুধু এটুকু বললো-‘ধাবা বন্ধ হয়ে যাবে, ডিনারটা এখুনি করে ফেলবে?’
#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২০+২১ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন