#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২২
নিধির রিপোর্ট এসেছে! হাসপাতাল থেকে এসে, অনিরূপ আশাকে রুমে আসতে বলে- রিপোর্টটা নিয়ে সোজা উপরে চলে গেলো।অনিরূপকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। আশা অনিরূপের পিছু পিছু উপরে এলো। অনিরূপ রিপোর্টটা বিছানায় রাখল! আশা রুমে ঢুকে একবার রিপোর্টটার দিকে তাকাল, তারপর অনিরূপের দিকে চোখ ফেরাল। অনিরূপ এপ্রোন খুলে বিছানায় রেখেছে। আশা অনিরূপের বাসার টিশার্ট-ট্রাউজার এগিয়ে দিল। অনিরূপ ফ্রেশ হতে গেলো। আশা মুখিয়ে আছে, অনিরূপ ফ্রেশ হয়ে এলেই, শুনবে রিপোর্টে কী এসেছে। অনিরূপের আচার-আচরণ দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না- রিপোর্ট ভালো! আশার বুকটা কাঁপছে, অশান্ত বোধ করছে ভীষণ!
অনিরূপ ফ্রেশ হয়ে এলো। আশার অস্থির জিজ্ঞাসু দৃষ্টির দিকে একবার চেয়েই সোজা গিয়ে দরজা লক করে ফিরে এলো। আশাকে জোর করে বিছানায় বসে নিজে আশার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আশার কোলের উপর রাখা দুহাত আলতো করে ধরলো। আশা অবাক হয়ে দুজনের হাতের দিকে একবার তাকালো, তারপর আগ্রহী দৃষ্টিতে অনিরূপের দিকে তাকাল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। অনিরূপ এত অস্থির কেন?
তাই আশা নিজেই জিজ্ঞেস করল-‘আপনি এমন করছেন কেন, বলুন তো?রিপোর্ট ভালো না?’’
অনিরূপ থামল, অসহায় চোখে আশার দিকে চেয়ে, হাতটা শক্ত কর ধরলো-‘আশা?’
‘বলুন।’ -আশা ভ্রু উঁচু করে আছে, অপেক্ষা করছে অনিরূপের বলার।
‘তুমি একজন স্ট্রং মেয়ে, রাইট?’- অনিরূপ ভারী গলায় বলল।
আশা কিছু বললো না। শুধু চুপ করে তাকিয়ে থাকল! অনিরূপ আশার হাত ছেড়ে, ডান গালে একহাত রেখে ভরসাপূর্ণ গলায় বললো-‘নিধির রিপোর্ট এসেছে। আমি যা বলবো, এতে প্লিজ নিজেকে শক্ত রাখবে। আমরা সবাই শক্ত থাকলে নিধি এই অবস্থা থেকে ফিরে আশা সম্ভব, হু? এটাকে লেভেলিং না করে আমরা একসঙ্গে ফাইট করব? ওকে?’
আশা এবার এগুলো কথা শুনে আরও বেশি অস্থির হয়ে গেল। অনিরূপকে তাড়া দেখিয়ে বললো-‘আরে বলুন তো, আপার হয়েছে কী?’
অনিরূপ মাথা নিচু করে একটা ঢোক গিলে আবার আশার দিকে তাকাল। একপর্যায়ে গলা ছেড়ে হতাশ গলায় বলে ফেলল-‘শি হ্যাজ ক্যান্সার, ব্লাড ক্যান্সার!’
‘কী?’ - আশার চমকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
অনিরূপ সঙ্গেসঙ্গে আশাকে আগলে ধরে বললো-‘ওকে, ওকে! রিলাক্স! এটা কিউর করা পসিবল। এখনও টাইম আছে আশা। আমাদের চিকিৎসা শুরু করা উচিত, যত দ্রুত সম্ভব!’
আশার দু চোখে অবিশ্বাস! ও থমকে থেকে বললো-‘এটা কিভাবে সম্ভব? আপা এত বড় রোগ বাধাল কিভাবে? রিপোর্ট কী ভুল আসতে পারে না?’
অনিরূপ আশার দিকে চেয়ে বললো-‘আমি কয়েকবার চেক করেছি রিপোর্ট! রিপোর্টে ভুল নেই।’
আশা দু কদম পিছিয়ে থমকে অনিরূপের দিকে চেয়ে থাকল! আপনা আপনি আশার ডান চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়াল! সঙ্গেসঙ্গে দুহাতে নিজের চোখ মুছে বললো-‘বা-বাঁচার চান্স কত প-পারসেন্ট?’
অনিরূপ ধিমে গলায়, মিনমিন করে বললো-‘ফিফটি-ফিফটি।’
কথাটা বলে অনিরূপের নিজেরই কেমন বিস্বাদ লাগছে! আশার মনের অবস্থা অনিরূপ বুঝে, মেয়েটার পুরো দুনিয়া ওর বোন! কিভাবে নিবে ব্যাপারটা, আল্লাহ ভালো জানেন!
আশা নিজেকে শান্ত রাখার অনেক চেষ্টা চালাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আর আটকাতে পারল না। চোখের জল ছেড়েই দিল। থমকে গিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে, অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকল আয়নার দিকে। অনিরূপ আশার পাশে বসে আশাকে দেখে! শক্ত-এই কঠোর মেয়ে মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে। আশা ভাঙা ভাঙা গলায় বিড়বিড় করে-‘আ-আপা! আপ-আপা! আপা চলে গেলে আমদের ক-কী হবে?কই যাব, কার কাছে যাব আমরা?
আশা নিজের মনেই নিজে বিড়বিড় করছে শুধু! অনিরুপ আশাকে পাগলের মতো করতে দেখে জোর করে নিজের দিকে ফেরাল। আশা তখনো একা একা বিড়বিড় করছে। অনিরূপ ওর মুখটা দুহাতে আগলে ধরলো, ‘আশা, আশা শাট অ্যাপ!’
আশা অনিরূপের ধমকে চুপ হয়ে গেল! টলমলে চোখে তাকাল অনিরূপের মুখের দিকে।
অনিরূপ আশার এলোমেলো চুল গোছাতে গোছাতে বলতে লাগলো- -‘দেখো আশা, ভেঙে পড়ো না প্লিজ! নিধির কিছু হবে না। আমরা বেস্ট ডক্টর দিয়ে ওর চিকিৎসা করাব। আমি আজকেই অ্যাপোইনমেন্ট নিচ্ছি ডক্টরের। তুমি প্লিজ নিজেকে নিধির সামনে শক্ত রেখো। ওকে এক্ষুনি অসুখের কথা জানানোর দরকার নেই।সময়মত জানানো যাবে। তুমি প্লিজ শক্ত রাখো নিজেকে।’
আশাকে অনেক কষ্টে অনিরূপ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাখলো। আশা শুধু শুনে গেল অনিরূপের একেকটা ইন্সট্রাকশন! ও যেন আজ রীতিমত রবোট হয়ে গেছে একদম। নিজের মধ্যেই নেই আর। অনিরূপ যা বলছে, যন্ত্র মানবীর মতো শুধু শুনছেই। অনিরূপ নিজেও আশাকে যেভাবে পারে সামলানোর চেষ্টা করছে।
___________
সন্ধ্যার দিকে অনিরূপ অরূপের ঘরে গিয়ে বিছানায় বসল। অরূপ তখন কম্পিউটারে কিছু একটা করছে। অনিরূপকে দেখে কিবোর্ডে টাইপিং করতে করতে জিজ্ঞেস করল-‘‘কিছু বলবে, ভাইয়া?’
অনিরূপ কোনো ভনিতা ছাড়াই বলে দিলো-‘নিধির রিপোর্ট দিয়েছে আজ।’
অরূপ এবার কিছুটা নরম হয়ে এলো। তার হাতের টাইপিং বন্ধ হয়ে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে অনিরূপের দিকে চেয়ে ছোট্ট করে বললো-‘কী এসেছে রিপোর্টে?’
‘ক্যান্সার, ব্লাড ক্যান্সার!’ -অনিরূপের ভারী গলার উত্তর!
অরূপ সঙ্গেসঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ফেলল! বিশ্বাস হলো না যেমন! বললো-‘রিপোর্ট কোথায়?’
অনিরূপ হাত থেকে রিপোর্ট এগিয়ে দিল অরূপের দিকে, বললো-‘আমি কয়েকবার চেক করেছি। রিপোর্টে ভুল হবার চান্স নেই।’
অরূপ তবুও অনিরূপের কথা না শুনে নিজে পুরো রিপোর্ট চেক করল। রিপোর্টের শেষ অংশটা পড়ে ওর আচমকাই বুক কেঁপে উঠল। গলার স্বর এলোমেলো হয়ে গেলো একদম। এমনটা কেন হলো ও জানে না। জীবনে অনেক ক্যানসার রোগী দেখেছে ও। সবার বেলায়,সর্বোচ্চ খারাপ লাগা অনুভব করেছে শুধু। কিন্তু আজকেও মনে হচ্ছে বুকটা একদম খালি হয়ে গেছে। অদ্ভুত এক জ্বালা হচ্ছে বুকের ভেতর। অরূপ নিজেকে সামলালো! ডাক্তরদের এত আবেগ খাটে না। অরূপ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো-‘ভাবী জানে?’
অনিরূপ উত্তর দিল-‘বলেছি। ভীষণ ভেঙে পড়েছে শুনে।’
অরূপ রিপোর্টে আরেকবার চোখ বুলিয়ে বললো-‘ট্রিটমেন্ট শুরু করা উচিত। কাল থেকে হলে ভালো হবে।’
অরূপের বড্ড তাড়া দেখছে অনিরূপ। অরূপ কিছুটা উদ্ভিগ্ন হয়ে বললো-‘আমি আমাদের মেডিকেল উত্তর কুমারকে কল দিচ্ছি। অ্যাই থিঙ্ক হি উইল বি দ্য বেস্ট! ! কী বলো?’’
‘ভালো হবে।’- অনিরূপের ছোট্ট উত্তর!
‘অ্যামি অ্যাপোইনমেন্ট নিয়ে রাখছি।ভাবিকে জানিয়ে রেখো।’
‘ঠিকাছে।’-অনিরূপ তখনো অরূপের দিকে চেয়ে আছে। অরুপের মধ্যে নিধি কে নিয়ে চিন্তার মাত্রাটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি দেখতে পারছে ও। এটা কী শুধুই ভাবির বোন বলে? নাকি অরূপও…
_____________
অনিরূপ রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসেছে!আশা নয়টার সময় একটু খেয়ে যে রুমে এসেছে, আর খবর নেই। রুমে এসেও, আশাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। অনিরূপ ডাকে-‘আশা? আশা?’
ডাকতে ডাকতে অনিরূপ বারান্দায় যায়! ঠিক ধরেছে ও, আশা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে! সুতির মেরুন রঙের আঁচল দুলছে শীতল বাতাসে, চুল খোপা করা। পরিচ্ছন্ন আশার খোপাটাও আজ বড্ড এলোমেলো! অনিরূপ মলিন হেসে এগিয়ে যায়। আশার পাশে দাড়িয়ে আশার মতো করেই অনেকক্ষণ চাঁদটা দেখে। একপর্যায়ে চাঁদের দিকে চেয়ে বলে-‘মন খারাপ করো না আশা! তুমি যে ভয় পাচ্ছো, ওটা সত্যি হবে না কোনোদিন।’
আশা কথা বলে না। শুধু চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের জল! অনিরুপ চাঁদের থেকে চোখ সরিয়ে পাশে ক্রন্দনরত আশার দিকে চায়। শাড়ি পড়া বউ, আকাশের চাঁদ দেখতে দেখতে কাঁদছে! অবশ্যই মারাত্মক একটা দৃশ্য! অনিরূপ বুকে হাত ভাজ করে হালকা হেসে অনেকক্ষণ এভাবেই চেয়ে থাকল আশার দিকে
একটু পর আশার ফোপানোর শব্দ কানে জেনে, ধ্যান আসে ওর! আরেকবার পূর্ণ দৃষ্টিতে ওকে দেখে এগিয়ে গেলো দু কদম! তারপর, আশার কাঁধ ধরে নিজের দিকে ওকে টেনে এনে চোখের জল মুছিয়ে দিলো যত্নবান স্বামীর মতো। আলতো গলায় বললো-‘তোমার চোখটা খুব সুন্দর, আশা প্লিজ ওতে পানি এনো না। আই জাস্ট হেইট ইট!’
অনিরূপ কথাটা বলে চোখ-মূখ বিকৃত করার চেষ্টা করল। আশা টলমলে চোখে অনিরূপের দিকে চায়! কান্নায়, অনিরূপের আদুরে কথায় রীতিমত ঠোঁট ভেঙে আসতে চাইছে ওর!অনিরূপ আশার বাচ্চামো দেখে হালকা হেসে আশার কপালে বহুদিন পর চুমু বসায়। অবাক করা ব্যাপার, আশা এবার আটকায় না ওকে। বরং অনিরূপের পিঠের দিকের শার্ট খামছে ধরে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দিয়ে…আচমকাই শব্দ করে কেঁদে ফেলে! অনিরূপ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় একদম। আশা শক্ত করে ধরে রেখেছে ওকে, মেয়েলি কণ্ঠে কাঁদছে! অনিরুপ নিজেকে সামলায়! ভেঙে পড়া আশার পিঠে আলতো করে হাত রেখে চাপড় দিয়ে নরম গলায় বোঝায়-‘এত কাঁদছ কেন, পাগল! ঠিক হয়ে যাবে নিধি।ডোন্ট ক্রাই,স্টপ স্টপ!’
আশা শোনে না! কাঁদতে কাঁদতে অনিরূপের কাঁধে মুখ গুঁজে বলে উঠে-‘আপা ছোটবেলা থেকে এত কষ্ট পেল কেন ডাক্তার? কেন আল্লাহ আপার কপালে সুখ রাখলেন না। অল্প বয়সে বিধবা, লোকের ধিক্কার এখন আবার যখন আপা নিজেকে সামলে নিচ্ছিল তখন মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে এই ক্যান্সার! আপা এসব সহ্য করবে কিভাবে?আপাকে আমি কোন মুখে জানাব এই বিশ্রী রোগের কথা! ডাক্তার, আমার আপা বাইরে নিজেকে শক্ত দেখালেও অত শক্ত না। আর কেউ সেটা না জানুক, আমি জানি! আমার আপা বড্ড ভীতু ডাক্তার। খুব ভীতু! ও এসব ডিজার্ভ করে না,মোটেও করে না। আপা একটা ভালো লাইফ, একটা সুন্দর লাইফ ডিজার্ভ করে। বলুন, ডিজার্ভ করে না?’
অনিরূপ আশাকে কী বলবে বুঝতে পারছে না। একবার ভাবে, মেয়েটা কাদুক! কাঁদলে শান্তি পাবে। পরপর মনে হয়, ওর অন্তর তো বৌয়ের কান্নার আওয়াজ জ্বলে যাচ্ছে। অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে! রাবিশ অন্তর অনিরূপের! অনিরুপ থামলো না আশাকে। বরং আলগোছে পাঁজকোলে তুলে নিলো। আশা অনিরূপের কাঁধে এখনও মুখটা গুঁজে রেখে ফোপাচ্ছে! কান্না একটু থেমেছে!
অনিরূপ আশাকে বারান্দা থেকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিল।নিজে আশার উপর আধশোয়া হয়ে ওর হাতটা নিজের গলা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো-‘স্টপ নাও! অনেক হয়েছে, আর না। লেটস স্লিপ নাও!’
আশা শুনে না। তার এখন বুক ফেটে কান্না আসছে, কী করবে ও? অনিরূপ বুঝে, আশা মানার পাত্রী নয়! ও তাই আশার পাশে শুয়ে আশাকে আলগোছে বুকে টেনে নিলো। আশা অনিরূপের দিকে চেয়ে আবারও ফোপাতে ফোপাতে বললো-‘আপা সত্যি ঠিক হয়ে যাবে না, ডাক্তার?’
অনিরূপ আশার ঠোঁটে আঙুল চাপে, শাসানোর স্বরে বললো-‘হ্যাঁ হয়ে যাবে কিন্তু এখন তুমি না ঘুমালে তুমি নিজে বিছানায় পরে যাবে, ফর শিউর। শুসস…নো মোর ক্রাইং! চোখ বন্ধ!’
অনিরূপ কথাটা বলে সুইচ টিপে বাতিটা বন্ধ করে দিল। তারপর আশার মাথায় আলতো করে বিলি কেটে দিতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে আশার মাথাটা প্রচণ্ড ধরেছিল। অনিরূপের এমন আরামদায়ক বিলি কাটাতে, একটাসময় আশার চোখ লেগে আসে!
আজ- বহু মাস পর, দুজন স্বামী-স্ত্রী একে অন্যের সান্নিধ্যে আসলো, জড়িয়ে ঘুমাল! অন্যথায়, এক বিছানায় থাকা সত্ত্বেও, দুজনের মধ্যে থাকত যোজন-যোজন দুরত্ব! দুরুত্বটা একাধারে, শারীরিক ও মানসিক!
#চলবে
---
#দীঘির_জলে_কার_ছায়া
#অবন্তিকা_তৃপ্তি
#পর্ব_২৩ (১৮+ এলার্ট)
কটা দিন পর…
অনিরূপ চেম্বারে বসে আছে। লাগাতার প্যাসেন্ট দেখে ও যারপরনাই বিরক্ত-ক্লান্ত! শেষ প্যাশেন্ট দেখা শেষ হলে এটেন্ডেন্স এসে এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে যায়।অনিরূপ চেয়ার থেকে উঠে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে কফি খেতে খেতে ঘরই দেখে। বেশ রাত হয়েছে! অনিরূপ ফোন চেক করে। আশার কল এসেছিল আধা ঘণ্টা আগে, প্যাসেন্ট থাকায় রিসিভ করতে পারেনি। শেষ অব্দি মেসেজ এসেছে আশার-
‘Apnar ki late hobe?sobai wait korche, ekshonge khabe.’
আশা মেসেজটা দিয়েছে দশ মিনিট আগে। অনিরুপ ক্রূর হাসে মেসেজ পড়ে। তার বউটা ধীরে ধীরে সংসারকে বুঝতে শিখেছে, আগলাতে শিখে গেছে। বাহ, দারুণ! অনিরূপ পাল্টা রিপ্লে করে-
‘Ar bibi saheba?she wait korche na? ‘
কিছুসময় পর আশা রিপ্লে করে-‘hu, sheo korche. Druto ashun!’
অনিরুপ মৃদু হেসে উঠে, আঙুল চালিয়ে রিপ্লে করে-
‘I’m on the way!’
অনিরূপ বেরোবে, তখন এটেন্ডেস দরজা খুলে ঢুকে-‘স্যার, অমিত স্যার আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।’
‘অমিত’ নামটা শুনে অনিরূপের ভুরু কুচকে যায়! কলেজ লাইফের শত্রু, এখন প্রফেশনাল লাইফের শত্রুও হয়ে গেছে! মুখ দিয়ে বিশ্রী গালিও বের হল কয়েকটা। অনিরূপ ঘড়ি দেখে,শালা পারফেক্ট টাইমিং নিয়ে এসেছ। অনিরূপ আবারও চেয়ারে বসে হেলান দিল। পায়ের উপর পা তুলে বললো-‘ফাইন, পাঠাও ওকে।’
অমিত রুমে ঢুকে! বড্ড ফুরফুরে মেজাজে রুমে ঢুকলেও, চোখের সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকা অনিরূপের ঠোঁটে বক্র হাসি দেখে অমিতের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। ও থমথমে মুখে অনিরূপের সামনের চেয়ারে বসে। অনিরূপ এবার সোজা হয়ে বসে, অমিতের মুখের দিকে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে-‘কী চাই?’
অমিত এবার হাসে! মুখটা ওর ক্ষুদে শয়তানি বুদ্ধিতে ঝলমলিয়ে উঠে বলে-‘এই তো, এইজন্যে তুই এতটা ফেভ্রেট আমার জয়! ওকে! লেটস ফেইস! এর আগেও আমি এসেছি, আজও এসেছি! আমার এই হসপিটালের ফোরটি পারসেন্ট শেয়ার চাই!’
অনিরূপ ভ্রূ উঁচু করো, তারপর ফিক করে হেসে বলে উঠে-‘মামা বাড়ির আবদার হচ্ছে নাকি এখানে?’
অমিত টেবিলে হাত রেখে কিছুটা ঝুঁকে এসে বললো-‘ওহ জয়! এবার আমি একদম ছক কেটেই মাঠে নেমেছি। তুই দিবি, ৫১ কেন? আমি চাইলে তুই পুরোটাই দিবি। কেন জানিস?’
অনিরূপ চেয়ে দেখে অমিতকে। ওর ঠোঁটে এখনও উপহাসের হাসি! অমিত সেই হাসি দেখে এবার এক বিন্দুও ভরকে না। কারণ ও জানে! অনিরূপ শত্রুপক্ষকে এমন উপহাসের ব্যবহার দিয়ে, মনোবল ভাঙতে পছন্দ করে! অমিত হালকা হেসে, পকেট থেকে ফোন বের করল! এগিয়ে দিল ফোনটা অনিরূপের দিকে-‘দেখ তো এই পুলিশ অফসারকে চিনিস কী না?’
অনিরূপ একবার অমিতের দিকে চেয়ে, পরপর ফোনের দিকে চায়! ইমাদ! ওই গ্রামের পুলিশ ইমাদ! যাকে অনিরূপ আশাকে বাজে মন্তব্য করায় চড় মরেছিল। ইমাদ জবানবন্দি দিচ্ছে- অনিরূপ কিভাবে আশার বাবাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ওকে বিয়ে করেছে, সেটুকুর বর্ণনা প্রমাণ সহ একের পর এক বলে যাচ্ছে ইমাদ! অনিরূপ এবার রক্তলাল চোখে অমিতের দিকে চেয়ে অসম্ভব শান্ত স্বরে বলে-‘শত্রুতাকে পারসোনাল নেওয়ার ভুল করবি না অমিত! আমার বউ, আমার ফ্যামিলি! ওগুলো আমার নিজস্ব! তোর নিংরা হাত ওতে দিবি না।’
‘নিজস্ব?’ -কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠে অমিত। অনিরূপ এখনও ভয়াবহ রাগ নিয়ে দেখছে অমিতকে। অমিত হাসি থামিয়ে বললো-‘‘তোর বউ জানে? জানে যে তুই কত বড় পাক্কা খেলোয়াড়! বউকে পেতে শালা তোর এত খেলা লাগল, কীসের এত বড়াই রে তোর?’
অনিরূপ বুঝে, অমিত ইচ্ছে করে অনিরূপের দুর্বল জায়গায় হাত দিতে চাচ্ছে। কিন্তু অনিরূপও পাক্কা খেলোয়াড়! ও এসব হতে দিবে কেন? অনিরূপ রাগ কমাল, তারপর আচমকা শব্দ করে হেসে উটলো। অমিত ভ্রু কুচকে ফেলল! ভিডিওটার পর অনিরুপের কাছে এমন হাসি ওকে মানাল না!
অনিরুপ হাসতে হাসতে বললো-‘বারবার বারবার বলেছি আমাকে ক্ষেপাস না, তুই ক্ষেপিয়েই যাচ্ছিস! যা করার কর, তবে বাইচা থাক আগে!’
অনিরুপ এবার চেয়ার থেকে উঠে অমিতের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়!অমিত চোখ তুলে অনিরুপের দিকে তাকাল! অনিরূপ হিসহিসিয়ে জিহ্বা নাড়িয়ে বলে উঠে- ‘গু-ড লা-ক!’
_____________
অমিতকে এভাবে শাসিয়ে আসার পরও অনিরুপ শান্তি পাচ্ছে না। ওর বারবার, বারবার ওই বাস্টার্ডকে খুন করে ফেলার ভূত চেপে গেছে। অনিরূপ আর আটকাতে পারল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কল করে বসল-‘মিশন ৫, ডু ইট! এন এন্ড অ্যা হ্যাভ সাপ্লাইড!’
‘এসব কী অদ্ভুত কথা বলছেন?’- আশা বারান্দায় ঢুকতে ঢুকতে প্রশ্ন করল! অনিরূপ আশাকে দেখে সঙ্গেসঙ্গে ফোন কেটে দিল। আশা অনিরূপের অদ্ভুত ব্যবহার দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেলল! সন্দেহের চোখে একবার অনিরূপের হাতের ফোন, তো আরেকবার অনিরুপের দিকে চেয়ে বললো-‘আপনি কিছু লুকাচ্ছেন?সত্যি করে বলুন তো।’
অনিরূপ কিছু বললো না, শুধু থমথমে মুখে আশার দিকে চেয়ে রইল। আশা বুঝতে পারলো, অনিরূপের মন খারাপ। তাই ও চিন্তিত হয়ে এগিয়ে আসলো, অনিরূপের খোঁচা খোঁচা গালে হাত বুলিয়ে আলতো গলায় জিজ্ঞেস করল-‘মন খারাপ? হাসপাতালে কিছু হয়েছে?’
অনিরূপ চোখ বন্ধ করে ফেলল! আবার তাকাল, তারপর আশার কোমরে আচমকাই হাত দিয়ে ওকে নিজের দিকে টেনে আনল! অনিরূপর বুকের সঙ্গে মিশে চমকে উঠল আশা! দুহাত অনিরূপের বুকের উপর রেখে অবাক চোখে দেখতে লাগল ওর অস্থির স্বামীকে!
অনিরূপ আশার মুখের দিকে চেয়ে বড্ড অস্থির-অধৈর্য্য ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল-‘আশা! আশা! তুমি কী এখনো আমাকে ভালোবাসোনি? আমাকে মেনে নিতে পারো নি? অন্য কেউ তোমাকে আমার নামে ফুসলালে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? সে, সে সামথিং।’
আশা বড়বড় চোখে অনিরূপকে দেখল! অনিরুপ উত্তরের জন্যে মুখিয়ে আছে! আশা থামল, ছোট্ট করে নিশ্বাস ফেলে ডান হাতটা তুলে অনিরূপের গালে রাখল। গাল ছুয়ে দিতে দিতে বললো—‘মানি, আমি মানি আপনকে স্বামী হিসেবে! অন্য কেউ আমাকে ফুসলাতে পারবে না, আমি এমন নই-আপনি জানেন।’
অনিরূপ যেন হাফ ছাড়ল! মনেমনে অমিতকে কতগুলো বিশ্রী গালি দিয়ে আশার কোমরে হাতটা চেপে আরও টেনে আনল ওকে নিজের দিকে! আশার মুখের দিকে মুখটা এগিয়ে এনে বললো-‘প্রুভ দাও তবে।’
আশা বড়বড় শ্বাস ফেলতে ফেলতে অনিরূপের ঠোঁটের দিকে চায়! অনিরুপের ঠোঁটে হালকা হাসি লেগে আছে! ওটা বোধহয় তৃপ্তির হাসি! আশা অনিরূপের ঠোঁটের দিকে চোখ ফেরায়, বাসর রাতে এই ঠোঁটটা আশার সর্বাঙ্গে ছুয়েছিল। তখন আশার বিষাক্ত লাগছিল সব. কিন্তু আজ! আজকের চিত্র ভিন্ন! স্বামীর স্পর্শ পাওয়ার জন্যে মরিয়া আশা জানে, ওষ্ঠের আসক্তি! আশার বুক কাঁপছে! ও মুখ ফিরিয়ে নিলো লজ্জায়!
অনিরূপের গালে আশার চুল স্পর্শ করল। অনিরূপ আশার লজ্জা পাওয়া দেখে নিঃশব্দে হাসল! আশার বুক বারবার শ্বাসে উঠানামা করছে ভীষণ। অনিরুপ বুঝল সবকিছুই।সে এ ঘাটালো না, ধৈর্য্য ধরলো এবারেও! আশার চুলে চুমু খেয়ে উস্কি গলায় শোধালও-‘অপেক্ষা করবো আশা, একটা দীর্ঘ চুমুর, যেটা তুমি নিজে থেকে দিবে আমাকে! নিরস করো না আমাকে প্লিজ।-‘
আশা লজ্জায় আর তাকাতেই পারল না অনিরূপের দিকে! অনিরূপের কল এসেছে! অনিরুপ কল করা মানুষের নাম দেখে ভ্রূ কুঁচকে ফেলল! ও আশাকে ছেড়ে দিয়ে কল রিসিভ করে রুমে গেলো-
‘কাজ শেষ?’
‘স্যার, গাড়ি এখন ম্যানহোলে পরে আছে। খুব বাজে ভাবে এক্সিডেন্ট করেছে। কোমায় যাইতে পড়ে, চান্স আছে।’
‘সেন্ড দ্য পিকচার।’
‘ওকে স্যার।’
অনিরূপের ফোনে ছবি এলো একটা। অমিতের রক্ত লাল ছবি, বিশ্রীভাবে আঘাতে মুখটা থেঁতলে গেছে একদম! অনিরূপ ছবিটা খুঁটিতে খুঁটিতে দেখতে থাকে, ‘শালা, আমারে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছিল। কলিজা দেখো শু*** বাচ্চার।’
‘আল্লাহ, এটা কার ছবি?’- আশা হাতে ভাঁজ করা শাড়ি, ও চোখ মুখ কুঁচকে ছবিটার দিকে চেয়ে আছে।!
অনিরূপ ফোনটা বন্ধ করে ফেলল সঙ্গেসঙ্গে।আশার দিকে চেয়ে বলল-‘ভয় পেও না! পেশেন্ট, অ্যাকসিডেন্ট করেছে। সেটার ছবি।’
আশা আফসোস করে বললো-‘খুব বাজে ভাবে এক্সিডেন্ট করেছে। বাঁচবে তো?’
‘চেষ্টা করবে ডাক্তাররা। তুমি কোথায় যাচ্ছো?’
‘গোসল করবো। গরম লাগছে ভীষণ।’
অনিরূপ এবার দুষ্ট হেসে বলে-‘আমিও আসি?’
আশা ভ্রূ বাকিয়ে বললো-‘তার প্রয়োজন নেই। আমি একাই পারি।’
আশা কথাটা বলে মুখ ঝাঁমটি দিয়ে চলে গেলো বাথরুমে।
____________
রাতের দিকে…নিধি বোতলে পানি ভরতে, অরূপের রুমের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। অরুপের রুমের দরজা হালকা খোলা!নিধি স্পষ্ট শুনতে পেল, ঘর থেকে ওর নাম শোনা যাচ্ছ। নিধি আটকে যায়, নিজের অনিচ্ছায়!
নিধি শুনতে পেল- অরূপ কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলছে-
‘রিয়াদ, আমি দোটানায় ভুগছি! উনাকে আমার ফিলিংস কনফেস করা পসিবল না, ইনফ্যাক্ট এমন একটা সিচুয়েশনে!’
ডিভোর্সি, ক্যান্সার! আই নো! আমার এতে বিন্দুমাত্র প্রবলেম নেই। ক্যান্সার ভালো হয়ে যাবে, আশা রাখছি। ডাক্তারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ট্রিটমেট আরও কয়েকমাস নিতে হবে! ফার্স্ট স্টেজ ক্যানসার!!
আর ডিভোর্স্, ভাই আমি সবকিছু ভেবেছি! আটকাতে পারিনি। ফিলিংস আসার, এসে গেছে। এখন ভাবী জানলে হয়তো উল্টাপাল্টা চিন্তা করতে পারে।ও আমি ম্যানেজ করে ফেলব। বাট ভাইয়া সাপোর্ট করবে আশা করি।’
‘———-‘
‘সেটাই তো প্রবলেম। নিধি বোধহয় আমাকে মানবেন না।উনি একদম ঘাড়ত্যারা! আর এত্ত ইন্ট্রোভার্ট! মুখ ফুটে কিছু বলতেও চাননা। তুই ভাই আমাকে আইডিয়া দে আমাকে, প্লিজ।’
‘————‘
‘মেয়ে পটানো অনেক কষ্টের ভাই! আজকে আমি তোদের কষ্টটা বুঝতে পারছি।’
অরূপ অসহায় ভঙ্গিতে কথাটা বলে উঠে! ওপাশ থেকে হাসির আওয়াজ শোনা যায়! অরূপ একপর্যায়ে ভীষণ সিরিয়াস হয়ে বললো-
‘উনি আমকের ফিরিয়ে দিলে আমি কী করবো আমি নিজেও জানি না।আচ্ছা ডাইরেক্ট প্রপোজ না করে, ওদের বাড়িতে ভাবীকে দিয়ে প্রস্তাব পাঠাল কেমন হয়? সে!’
নিধি আর এক মুহূর্ত থাকল না। দৌড়ে রুমে চলে আসে! এসব কী হয়ে গেল! ওর ক্যান্সার? ওর এসব চিকিৎসা নেওয়া হচ্ছে ক্যানসারের জন্যে? কিন্তু আশা যে বলল, ওর শরীরে ইমিউনিটি কম, এইজন্যে এসব হচ্ছে? নিধি দুহাতে মাথার চুল খামছে বিছানায় বসল। লজ্জায় শেষ হয়ে যাচ্ছে নিধি। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াল। অরূপ! অরূপ এসব ভাবতে পারল কিভাবে? ও কী কোনভাবে অরূপকে কোনো পজিটিভ ইঙ্গিত দিয়েছিল কখনও? না, না! নিধি এসব কিছুই করেনি।
তবুও? নিধি ভেবে নিলো নিজের সিদ্ধান্ত! বোনের সংসারে অশান্তি আনবে না ও! ওর নিজের সংসার নেই তো কী হয়েছে? বোনটা সুখী আছে, থাকুক! ও কালকেই চলে যাবে ওর বাড়িতে! মরে গেলে যাবে, বাড়ি থেকেই চিকিৎসা চালাবে! কিন্তু এ জীবনেও আর শেখ মহলে পা দিবে না! ও কারও জীববে দয়া হবে না, কারও জীবনের করুণা হবে না।
________
অনিরূপ লাইব্রেরিতে! আজকের রাতটা একটু পড়াশোনা করবে ও! মূলত পড়াশোনা তো একটা বাহানা! আজ রাতে একটা প্ল্যান কষবে ও! আশাকে ও নিজের করে পেয়ে গেছে ও! কিন্তু এখন ওদের এই সুখী সংসারের পেছনে লোক লেগে গেছে। ওদের আলাদা করার জন্যে প্রমাণ নিয়ে হাজির হচ্ছে একেকটা বাস্টার্ড! তাই ও আজ সবকিছু প্ল্যান করবে। কিভাবে শত্রুপক্ষের মোকাবেলা করা যায়! একজনকে তো পগার পা করে দিয়েছে। বাকি আর কজন আছে কে জানে!
আশা গোসল করে বাথরুমে শাড়ি খুঁজছে! ভুলক্রমে সে শাড়ি বাইরেই রেখে চলে এসেছে। আশা কী করবে ভাবতে, ভাবতে হ্যাঙ্গারে অনিরূপের সাদা শার্ট ঝুলানো দেখতে পেল! আশা শার্টটা দেখে! একটু এগিয়ে শার্টটা হাতে নিলো, নেড়ে দেখল! কল্পনায় ভাসল সেদিনের দৃশ্য! অনিরুপ চায়, আশা ওর সামনে ওর শার্ট পরে আসুক! আশা লাজুক হাসলো! তারপর প্রথমবারের মতো নিজের ইচ্ছেতেই ভেজা গায়ে শুধু অনিরূপের সাদা শার্ট পরে নিলো! বাথরুমের দরজা খুলে উকি দিয়ে রুমটা দেখল। অনিরূপ রুমে নেই! আশা হাফ ছেড়ে বের হলো বাথরুম থেকে।
কোমরে হাত দিয়ে পুরো রুমটা ভ্রু কুঁচকে একবার দেখল।কিছু একটা করা উচিত! ওদের মধ্যে তো এখন সব ঠিক! অনিরূপ একা একা সম্পর্কটা কত টানবে? আশার এখন এগিয়ে আসা উচিত! দুজন দুজনকে পূর্ণ করা উচিত এবার! আশা হাসল একটু! তারপর রুমটা সাজাতে লেগে গেল! মোমবাতি দিয়ে রুমটা সাজালো! বারান্দা থেকে কয়েকটা গোলাপ ছিঁড়ে এনে পাপড়িগুলো মেলে দিল বিছানার উপর! রুমে রোজ এয়ারফ্রেশনার স্প্রে করল। নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, চুল থেকে টাওয়াল খুলে ভিজে চুল এলোমেলো করে মেলে দিল পিঠে-সামনে। ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের লিপটিন্ট লাগালো। পারফিউম স্প্রে করল গায়ের উপর। ব্যাস, ও ফিটফাট! বিছানায় বসে অপেক্ষা করতে লাগল স্বামীর আসার।
আধা ঘণ্টা পর অনিরূপ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। রুমটা কৃতিম বাতি নেই, পুরো রুমটা মোমবাতির আলোয় ঝলমল করছে! অনিরূপ মুগ্ধ হয়ে পুরো রুমটা একবার চোখ বুলাল! বুকটা ধকধক করছে ওর! বিছানায় চোখ গেলো,গোলাপ দিয়ে সাজানো বিছানা।! উফ, এসব করেছেটা কী আশা? ঝড় তুলে দিয়েছে অনিরূপের বুকের মধ্যে! অনিরূপ ডাকে-‘আশা?’
বারান্দা থেকে অনিরূপের সাদা শার্ট গায়ে শা মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসে! অনিরূপের চোখ একদম ছানাবড়া হয়ে যায়। ও আশাকে পা থেকে মাথা অব্দি আপাদমস্তক দেখে, আশা হেঁটে অনিরুপের সামনে আসে! ওর হাতে একটা গোলাপ!
অনিরূপ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আশার দিকে! আশা নত মুখে, লজ্জিত ভঙ্গিতে গোলাপটা অনিরূপের দিকে এগিয়ে দিলো, কিন্ত মুখে কিছুই বললো না। অনিরূপ হতবম্ব হয়ে গোলাপটা নিল! আশা লজ্জায় মাথাই তুলতে পারছে না। ভেজা চুলে, সজ্জিত বধূকে দেখে অনিরুপের মনটাই ভালো হয়ে গেলো। ও আশার দেওয়া গোলাপ আশার কানের গুঁজে দিয়ে ধিমে স্বরে বললো-‘গোলাপের গায়ে গোলাপই মানায়।’
আশা মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হেসে উঠে। অনিরূপ রুমটায় একবার চোখ বুলিয়ে দেখে বললো-‘এসব কী আমাদের জন্যে?’
আশা নিচু স্বরে উত্তর দিল-‘হু।’
অনিরূপ তৃপ্তির হাসি হাসে!তারপর আশাকে পাঁজকোলে তুলে নিলো, আশা একহাতে অনিরুপের গলা জড়িয়ে ধরে অপর হাতে গায়ের শার্ট হাঁটুর কাছে চেপে ধরে।অনিরূপ আশাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর আশার উপর আধশোয়া হয়ে আশার মুখের দিকে চেয়ে রইলো! আশার ঠোঁট কাঁপছে ভীষণ! অনিরুপ আশার ভিজে চুল বিছানায় মেলে দিয়ে আবার ওর স্নিগ্ধ মুখের দিকে চেয়ে রইল!
একপর্যায়ে নিজের এতদিনের, অভিনয় ভেঙে! সত্যি সত্যি নিজের অনুভূতি মেলে ধরল আশার সামনে-‘ভালোবাসি, আমার জেদি বউটা!’
আশা অনিরূপের দিকে তাকাল! চোখে জল জমেছে ওর! অনিরূপ ওর চোখের জল খুব যত্ন নিয়ে মুছে দিল! জিজ্ঞেস করল-‘তুমিও বলো কিছু!’
‘কী বলব-‘ - আশার লাজুক স্বর!
‘অনুভূতি আছে আমার জন্যে?’
আশা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানায়! অনিরূপ বলে-
‘উহু, মুখে বলো।’
আশা অনিরূপের দিকে চায়! অনিরূপের নেশালো নীলাভ চোখের দিকে চেয়ে বেশ সময় নিয়ে লাজুক গলায় বলে-‘ভালোবাসি!’
অনিরূপ হেসে ফেলল! হালকা হেসে আশার কপালে চুমু খেল। আশা আবেশে অনিরূপের টিশার্ট খামছে ধরল। অনিরূপ আশার শার্টের দিকে চেয়ে বললো-‘শার্টের বোতাম খুলবো? পরে আবার রাগ করবে না তো?’’
আশা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। অনিরূপ বললো-‘এত ফরফর করে কথা বলো সবসময়, আর এখন কথাই বলা ভুলে গেছো। এতো লজ্জা কেন পাচ্ছো?’
আশা লাজুক হাসলো! অনিরূপ শার্টের বোতামে হাত রাখলো! একটা বোতাম খুলতেই, আশা লজ্জায় মরিমরি অবস্থা। দুহাতে অনিরূপকে জরিয়ে ধরলো! এ মুখ আর অনিরূপকে দেখাতে পারবে না ও! অনিরূপও হালকা হেসে জড়িয়ে ধরে ফিসফিয় করে বললো-‘যদিও কিছুই দেখা যাচ্ছে না মোমবাতির আলোয়! তবুও তুমি বললে মোমবাতিটাও নিভিয়ে দিয়ে আসি?’
আশা উত্তর দিল না। অনিরূপ মজা নিচ্ছে সুযোগ পেয়ে। খুব অসভ্য! অনিরূপ হালকা হেসে আশার হাতটা গলা থেকে ছাড়িয়ে আবার বিছানায় শোয়ালো! আশা চেয়ে থাকল অনিরূপের নীলাভ চোখের দিকে! অনিরূপ হালকা হাসলো! মুখটা এগিয়ে এনে আশার ঠোঁটে ঠোঁট বসালো! আশা ভেসে গেলো!
একপর্যায়ে মোমবাতির আলো ক্ষয়ে গেলো! কিন্তু ভিলেন অনিরুপ যে অভিনয় করতে করতে একটু একটু করে তার বউয়ের প্রেমে পড়ে গেছে, সেটুকু সুখে ভাসা আশা একটুও বুঝল না। তার আবেগী, কিশোরী মনের প্রেম পুরোটাই ঢেলে দিল স্বামীর তরে!
#চলবে