#তুমি_আমার_নীল_নেশা [পর্ব সংখ্যা - ২২]
#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল
“আজ চেরির মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী... তাহলে তো চেরিরও আজকে জন্মদিন। তাই না?”
“হুম।”
“চেরি কি এটা জানে?”
পিহু চোখ দুটি বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল। সামির এবার মাথা নাড়ল।
“না, ও জানে না।”
“আপনি কি চেরিকে কখনো ওর মায়ের কাছে... মানে ওনার কবরের কাছে নিয়া যান নাই?”
“উহুম।”
“আচ্ছা... চেরির মা দেখতে কেমন ছিল?”
পিহুর গলায় এবার হালকা একটা কম্পন স্পষ্ট ধরা পড়ল। সামির এক দণ্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর সেই কৌতূহলী আর মায়াবী মুখপানের দিকে। এই মেয়েটা কত কত প্রশ্ন করতে পারে একনাগাড়ে! কত গভীর আগ্রহ তার চেরির মায়ের সম্পর্কে জানার জন্য। সামিরের মনে হলো, এসব কি শুধুই একটা অচেনা মানুষের প্রতি কৌতূহল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছ কোনো চাপা ৃঈর্ষা আর অধিকারবোধের লড়াই? সামির ওর মনের অবস্থাটা আঁচ করতে ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। গম্ভীর স্বরে বলল,
“চেরি একদম ওর মায়ের কার্বন কপি! ওমন ঘোলাটে চোখ, ওমন খাড়া নাক, গোলাপের পাঁপড়ির মতো ঠোঁট, আর টমেটোর মতো গাল... এমনকি লালচে চুল, এর সবই ওর মায়ের মতো পেয়েছে! যদিও চেরির মায়ের চুল তোমার মতো ওত লম্বা ছিল না। তবুও একদম ছোটও ছিল না। কাঁধ অব্দি ছিল। চমৎকার মানিয়ে যেত!”
সামির ইচ্ছে করেই এতটা বিবরণ দিয়ে চেরির মায়ের রূপের প্রশংসা করল। সে আসলে দেখতে চায়, দস্যি মেয়েটা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। সে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, পিহু নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরে একদৃষ্টে ওর দিকেই চেয়ে আছে। ফর্সা মুখটা যেন অভিমানে একটু লালচে হয়ে উঠেছে। সামির এবার ডান ভ্রুটা কিঞ্চিৎ উঁচুতে তুলে বেশ মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
“এভাবে তাকিয়ে কী দেখছ?”
পিহু নিজের ভেতরের অস্থিরতা আর চেপে রাখতে পারল না। সে এক বুক ভারী নিশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি... আপনি চেরির মাকে মেলা ভালোবাসতেন, তাই না?”
সামির ওর প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর দিল না। সে পিহুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর আলমারি থেকে নিজের তোয়ালেটা বের করে কাঁধে ঝুলিয়ে, কোনো কথা না বলে সোজা বাথরুমের দিকে চলে গেল। সে চলে যেতেই পিহু ধীরপায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এই প্রথম সে নিজেকে এত খুঁটিয়ে আর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। চেরির মায়ের যে রূপের বর্ণনা সামির একটু আগে দিল, তার সাথে মিলিয়ে দেখল পিহুর নিজের তার কোনোটাই নাই! না আছে চেরির মায়ের মতো ওমন মায়াবী ঘোলাটে চোখ, না আছে ওমন খাড়া নাক, আর না আছে গোলাপের পাঁপড়ির মতো ওমন সুন্দর ঠোঁট। যা আছে, তা হলো লম্বা কালো চুল। অথচ এই লম্বা চুল পিহুর মোটেও পছন্দ না! সে যে কতবার এই চুল কেটে শহরের মডার্ন মেয়েদের মতো ছোট করতে চেয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। শুধু মায়ের কড়া শাসনের কারণে সে চুল কাটার সাহস পায়নি। এত লম্বা চুল সামলাতে সামলাতে মাঝেমধ্যে পিহু নিজেই হিমশিম খেয়ে যায়।
তবে এখন এই চুলের দৈর্ঘ্য নিয়ে ভাববার মতো মানসিক অবস্থা পিহুর নেই। ওর মাথার ভেতর এখন যে মূল বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে; তা হলো, সে তো চেরির মায়ের মতো ওমন বিশ্বসুন্দরী না! তবে কি চেরির ওমন সুদর্শন বাপটা কোনোদিন তার প্রেমে পড়বে?
“মাম্মা, মাম্মা দেকু! আমি তোমাকে আর পাপাকে এঁকেছি! দেকু না মাম্মা!”
চেরির এই আচমকা ডাকে পিহুর ঘোর ভেঙে গেল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে, ছোট্ট চেরি একটা ড্রয়িং পেপারে মেলে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চেরি আজ লাল আর সাদা চেক চেকের মধ্যে একটা চমৎকার ফ্রক পরেছে। ওর চোখের মনিতে একরাশ উচ্ছ্বাস আর আনন্দের ঢেউ। পিহু এক পলক চেরির দিকে তাকিয়ে ভাবল, কী পুতুলের মতো নিষ্পাপ আর সুন্দর এই মেয়েটা! এর মানে, চেরির মা যে নিঃসন্দেহে একজন অসম্ভব রূপবতী নারী ছিলেন, তা চেরির এই মুখ দেখেই শতভাগ প্রমাণ পাওয়া যায়।
“মাম্মা দেকু না! আমি একটা হ্যাপি ফ্যামিলি এঁকেছি, দেকু না প্লিজ!”
চেরি এবার পিহুর জামা ধরে টানতে লাগল। পিহু ভাবনা ছেড়ে এক চিলতে মিষ্টি হেসে নিচু হয়ে চেরির তুলতুলে গাল দুটো আলতো করে টেনে দিয়ে বলল,
“আরে বাহ! এটা তো খুব সুন্দর হয়েছে চেরি সোনা!”
“সুত্যি?” চেরি খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠল।
“হ্যাঁ না, অনেক সুন্দর হয়েছে। আচ্ছা চলো, আমরা দুজনে মিলে এটাকে ওই দেয়ালে সুন্দর করে টানাই।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ চলু !”
এই বলে দুজনে মিলে ধিনতানা ধিনতানা করে ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল। রান্নাঘর থেকে জোসনা খালা ততক্ষণে দুপুরের খাবার ডাইনিং টেবিলে এনে সাজিয়ে রাখতে শুরু করেছেন। ওদিকে পিহু আর চেরি মিলে ছবিটাকে কীভাবে দেয়ালে টানানো যায়, তা নিয়ে মস্ত বড় এক গবেষণায় মত্ত হয়ে উঠেছে!
★
দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, আর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সামির সারা দিন বাড়িতেই কাটিয়েছে। চেরি যে 'হ্যাপি ফ্যামিলি' ড্রয়িংটা করেছিল, সেটাকে একটা মাঝারি সাইজের ফ্রেমে সুন্দর করে বাঁধিয়ে ড্রয়িংরুমের মেইন দেয়ালে টানিয়ে দিয়েছে। এটা দেখে চেরির খুশির আর কোনো সীমা রইল না! ও অনবরত হাততালি দিয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে পুরো ঘরজুড়ে গোল গোল হয়ে ঘুরতে লাগল। কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও পিহু চুপচাপ বসে রইল। সামির হাতের যন্ত্রপাতিগুলো টেবিলের ওপর রেখে কেবলই পিহুর পাশে গিয়ে ঁ বসেছে। তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠল। জোসনা খালা রান্নাঘর থেকে তাড়াহুড়ো করে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখল নিহান! সে দুই হাত প্রসারিত করে চিৎকার করে উঠল,
“সারপ্রাইজ!”
সামির পিহুর থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে সরে বসল। চেরি ঝড়ের গতিতে দৌড়ে গিয়ে এক লাফে ঝাপিয়ে পড়ল নিহানের কোলো।
“চাচ্চুউউ!”
নিহানের দুই হাতে তখন অনেকগুলো শপিং ব্যাগ ছিল। সে দ্রুত ব্যাগগুলো মেঝেতে নামিয়ে রেখে বেশ দক্ষতার সাথে চেরিকে কোলে তুলে নিল। ওকে কাতুকুতু দিতে দিতে বলল,
“আমার গুলুমুলু, লুল্লুবুল্লু, বুলবুলি চেরি সোনা কেমন আছে, হুম?”
“ভালু, কিন্তু চেরি সোনা তোমার উপর খুব রাগ করিচি, খুব, খুউউব!”
“তাই নাকি?” নিহান ওর নাক টেনে দিয়ে বলল, "কিন্তু আমি যদি আমার লুল্লুবুল্লুকে পিংক কালারের বড় একটা টেডি বিয়ার দেই, তাহলেও কি সে আমার ওপর রাগ করে থাকবে?”
“টেডি? অনেক বড় টেডি?”
“হ্যাঁ, একদম তোমার থেকেও বড়।”
চেরির চোখ দুটো বিস্ময়ে আরও বড় বড় হয়ে গেল,
“সুত্যি?”
“হ্যাঁ, চোখ বন্ধ করো। আমি এখনি ম্যাজিক করে নিয়ে আসছি।”
চেরি চোখ বন্ধ করতেই নিহান এবার দরজার বাইরে লুকিয়ে রাখা সেই টেডিবিয়ারটা ওর সামনে এনে বলল,
“এবার চোখ খোল!”
চোখ খুলে নিজের পছন্দের টেডিবিয়ার দেখে চেরি খুশিতে সোফায় লাফিয়ে উঠল।
“মাই ফেভারিট টেডিবিয়ার! পাপা দেকু, চাচ্চু আমার ফেভারিট টেডি এনেছে, ইয়ে!”
নিহান এবার চেরির হাতে আরও কতগুলো প্যাকেট ধরিয়ে দিল। সেখানে চেরির পছন্দের সব বিদেশী চকলেট, ওর নতুন ড্রয়িংবুক, কালার প্যাড সহ অনেক রকমের খেলনা রয়েছে। চেরি তো ওসব পেয়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে লাফাচ্ছে। সামির সোফা থেকে উঠে চেরির কাছে গিয়ে বলল,
“আস্তে মা, আস্তে লাফাও! পড়ে যাবে তো!”
নিহান এসে ধপ করে পিহুর ঠিক পাশের ফাকা জায়গাটাতে বসে পড়ল। সে পিহুর বাহুতে হালকা একটা বন্ধুসুলভ ধাক্কা দিয়ে বলল,
“কী হলো পার্টনার? কেমন আছো?”
পিহু ওর দিকে তাকিয়ে একগাল কৃত্রিম হেসে বলল,
“ভালো! আপনি কেমন আছেন?”
“আমি তো বিন্দাস আছি! কিন্তু তুমি এমন চুপচাপ বসে আছ যে? মন খারাপ নাকি? না সামির কিছু বলেছে?”
“উহুম!” পিহু মাথা নাড়ল।
এইটুকু বলেই সে আড়চোখে একবার সামিরের দিকে চাইল। ওর সেই চাউনির অনুসরণ করে নিহানও এবার তাকাল সামিরের দিকে। দুজনের হাবভাব দেখে আন্দাজ করতে পারল যে এদের মাঝে কিছু তো একটা গণ্ডগোল হয়েছে। নয়তো পিহুর মতো মেয়ে মোটেও এভাবে মুখ বুজে থাকার পাত্রী না। নিহান আবারো পিহুকে কনুই দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিল।
“হুসসস! কী হয়েছে বলো তো? মনে মনে কী ভাবছ? আমাকে বলো। আমি না তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তোমার ক্রাইম পার্টনার! আমাকে বলবে না?”
পিহু কিছুক্ষণ মনে মনে কী যেন ভাবল। তারপর সোফার ওপর পা দুটো তুলে হাটু ভাঁজ করে পুরোপুরি নিহানের দিকে ঘুরে বসল। ওর পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা লম্বা কালো চুলগুলো হাত দিয়ে পেঁচিয়ে খোঁপা করে বেশ কৌতূহল নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা নিহান ভাই... আপনি কি চেরির মা-কে সরাসরি কখনো দেখেছেন?”
নিহান নিজের কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেশ সহজ গলায় বলল,
“এটা কোনো প্রশ্ন হলো? অফকোর্স দেখেছি!”
“চেরির মা কি আসলেই মেলা সুন্দরী ছিল?”
“হ্যাঁ... ছিইইল।” একটু টেনে বলল নিহান।
“আমার থেকেও বেশি সুন্দর ছিল?”
পিহুর কণ্ঠে তীব্র জানার আকুলতা। নিহান এবার চোখ দুটো ছোট ছোট করে পিহুর মুখের দিকে চাইল। পিহু ওর ওমন চাউনি দেখে ওর পেটে একটা গুতো দিয়ে বলল,
“এমন হাঁ কইরা আমার দিকে কী দেখতেছেন? দেখেন নিহান ভাই, যা বলবেন একদম সত্যি সত্যি বলবেন, আপনারে শিরিন আপার চুমার কসম!”
নিহানখক খক করে কাসতে লাগল। সামির ওর দিকে তাকাতেই ও বৃদ্ধাঙ্গুলি তুলে ইশারায় বোঝাল ঠিক আছে। পিহু নিহানকে আবার কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে তাগাদা দিল,
“কী হইল! বলেন না ক্যান? সে কি আমার থেকেও মেলা বেশি সুন্দর আছিল?”
নিহান এবার ইশারায় ওকে আরও একটু কাছে আসার জন্য ডাকল। পিহু কৌতুহলী হয়ে এগিয়ে এসে কান পাততেই নিহান ফিসফিস করে বলল,
“কী ব্যাপার পার্টনার, তুমি কি জেলাস ফিল করছো?”
পিহু এক ঝটকায় নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে সাথে সাথে অস্বীকার করে বলল,
“ন.. না! মোটেও না! আ.. আমি ক্যান জেলাস হইতে যাব, হেহ! আমার কি দুনিয়ায় আর খায়া-দায়া কোনো কাম নাই? চেরির মা সুন্দরী হইলেই বা আমার কী আর না হইলেই বা আমার কী! আমি তো এমনি এমনি জানতে চাইলাম। আমি মোটেও জেলাস না, বলে দিলাম!”
“আসলেই জেলাস নও?” নিহান হাসল, “কিন্তু তোমার নাকের ডগাটা ওমন লাল হয়ে গেছে কেন? এটা কিসের লক্ষণ, শুনি? আই থিংক তোমার জ্বর-টর আসছে। দেখি তো হাতটা!”
“আমার কিচ্ছু হয় নাই। আমি যেটা জিজ্ঞেস করছি, আপনি খালি আমার প্রশ্নের সোজা উত্তর দেন।”
“কী যেন জিজ্ঞেস করছিলা তুমি?”
নিহান একটু মজা করার ভান করল। পিহু ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরে রাগী রাগী চোখে তাকাতেই, নিহান চওড়া হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ওহ হো, মনে পড়ছে! শোন পার্টনার, চিত্রা ভাবি আসলেই সুন্দর ছিল... এই সত্যিটা আমি কোনোদিন অস্বীকার করতে পারব না। আর তুমিও তার থেকে সৌন্দর্যে কোনো অংশে কম না। তবে... সৈকত ভাই চিত্রা ভাবির প্রেমে..”
“মাম্মা.. মাম্মা আমি আইসক্রিম খাবু, চলু না!”
চেরির অতর্কিত ডাকে নিহানের কথা মাঝপথেই থেমে গেল। চেরি পিহুকে টেনেটুনে নিয়ে গেল ফ্রিজের দিকে। সামির এবার নিহানের পাশে বসল। ওখান থেকেই পিহুর চঞ্চল অবয়বের দিকে গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিচু স্বরে বলল,
“পিহু এখনো সবটা জানে না, নিহান।”
“এই জন্যই... এই জন্যই ও আমার কাছে এতক্ষণ ধরে এই ব্যাপারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইছিল।”
“কোন ব্যাপারে?” সামির জানতে চাইল।
“তোকে কেন বলব, শুনি? এটা তো আমার আর আমার পার্টনারের সিক্রেট!”
সামির মাথা নাড়ল। নিহান যেমন পিহুও একই পার্সোনালিটির। এজন্য দুজনের ভালোই মিলেছে। সামির প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
“আগামীকাল চেরিকে নিয়ে ওই বাড়িতে নিয়ে যাব, নিহান। সবাইকে চেরির আসল পরিচয় বলে দিব। এভাবে সবার থেকে লুকিয়ে এই চার দেয়ালের মাঝে একা একা রেখে চেরির বেশি ক্ষতি হচ্ছে, নিহান!”
নিহান বিষম খাওয়ার মতো ভীষণ চমকে উঠল!
“তুই কি শিওর সামির? ভুলে গেছিস এর আগে কি হইছিল?”
“আমি কিছুই ভুলি নাই নিহান! ভুলি নাই।” সামিরের কণ্ঠস্বর এবার পাথরের মতো কঠিন শোনাল, “কিন্তু এই মুহূর্তে আমার চেরিকে বাঁচানোটাই মূল টার্গেট! ডাক্তার বলেছে ওকে সবসময় মেন্টালি হ্যাপি রাখতে হবে। ওকে বাঁচানোর জন্য যতটুকু আমার পক্ষে সম্ভব, আমি তার শেষ অব্দি করব। তুই তো চেরির বিষয়ে সব কিছুই ভালো করে জানিস। ও মানুষ পেলে বেশি খুশি হয়। এখন দেখ, পিহুকে পেয়ে কত খুশি। তোকে পেয়ে কত খুশি। এখন অন্য চিন্তা করতে গেলে ওর ক্ষতি হবে। আমি সেটা চাই না।”
“আর সৈকত ভাই? সৈকত ভাই এই ব্যাপারে কী বলে?”
“সেই একই পুরোনো কথা! চেরি নাকি ওর কেউ না। শুধু চিত্রা ভাবির খুনি।” সামির চোখ বন্ধ করে বলল।
“এরপরও তুই ওকে ওই বাড়িতে নিবি?”
সামিরের চোখ দুটো কেমন যেন শূন্য দেখাল। নিহান ডান ভ্রু কপালে তুলে জিজ্ঞেস করল,
“কী ভাবছিস?”
“ভাবছি চেরিকে কি বলব, কীভাবে পরিচয় করাব সবার সাথে। ও তো জানত ওর আমি ছাড়া কেউ নাই। তাছাড়া.. গতকাল কাকিমা অসুস্থ হয়ে পরেছে। যদি জানে চেরি সৈকত ভাইয়ের মেয়ে, তাহলে কেমন রিয়েক্ট করবে? বুঝতে পারছি না।”
এই বলে সে কপাল চেপে ধরে তাকাল চেরি আর পিহুর দিকে। দুজনে বসে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। পিহুর নাকে আইসক্রিম লেগে আছে। দেখতে আদুরে বিড়ালের মতো লাগছে। চেরিরও একই অবস্থা। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে! সামির এক ধ্যানে তাকিয়ে রইল। এই দস্যিমেয়েটা ওর জীবনে আসার পর থেকে সবকিছু কেমন ভালো হতে শুরু করেছে। চেরি প্রাণ খুলে হাসতে শিখেছে, আর সে ভালোবাসতে শিখেছ!
★
কুহুর জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। গতকাল আসিফের অমানবিক অত্যাচার তার এই দুর্বল শরীরটা একদমই সইতে পারেনি। নেশায় চুর হয়ে কুহুর ওপর একপ্রকার হিং'স্র প'শু'র মতো হামলে পড়েছিল সে। কুহু তখন লোকলজ্জা আর আত্মসম্মানের ভয়ে সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছিল ঠিকই, তবে সময়ের ্সাথে সাথে তার শরীর ধীরে ধীরে ভেতর থেকে নেতিয়ে পড়েছে। সকাল থেকেই শরীরটা কোনোভাবেই সায় দিচ্ছিল না। তবুও মনের জোরে দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের সব কাজ করেছে।এখন রাতের খাবার টেবিলে সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে সে। আসিফ খেয়াল করেছে সবই, তবুও একবারের জন্যও জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করল না। সে গোগ্রাসে নিজের খাওয়ায় ব্যস্ত। কারণ এখনই নাকে-মুখে কয়টা গুঁজে দিয়ে আবার বাইরে আড্ডায় চলে যাবে। আসিফের বাবা আসলাম মিয়া খেয়াল করলেন কুহুর চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। মুখটা একদম শুকিয়ে কাঠ। তিনি আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে বউমা? তোমার কি শরীল খারাপ লাগতাছে?”
কুহু ওনার প্লেটে আলু-পটলের তরকারি তুলে দিতে দিতে নিজের শুকনো ঠোঁট জোড়া জিব দিয়ে একটু ভিজিয়ে নিল। চারপাশটা কেমন যেন রিনিঝিনি দুলছে। বহু কষ্টে গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রেখে বলল,
“না বাবা... এই তো! ঠিকই আছি। আপনাকে আরেকটু তরকারি দেব?”
“না না। আমার কিছু লাগব না। তোমারে আমার ঠিক লাগতাছে না বউমা। তোমার খারাপ লাগলে তুমি বও! আমরা নিজেরা নিয়া খামু!”
“যতসব আদ্যিকখেতা!”
শাহিনুর বেগম তাচ্ছিল্যের সুরে পাশ থেকে বলে উঠলেন। আসলাম মিয়া নিজের অর্ধাঙ্গিনীর এই নিষ্ঠুর আচরণে লজ্জিত হয়ে বললেন,
“তুমি এগুলা কী কও আসিফের মা! দেহো না মাইয়াডার মুখটা কেমন হুগায়া গেছে। মনে হয় গায় মেলা জ্বর আছে।”
“কিছু হয় নাই। এসব নাটক। নাটকবাজে সেরা পুরস্কার পাইব তোমার আদরের বউ!”
শাহিনুর বেগম মুখ বাঁকালেন। আসলাম মিয়া অত্যন্ত অসহায় হয়ে তাকালেন কুহুর দিকে। তিনি পুত্রবধূকে মনে মনে পছন্দই করেন, কিন্তু স্ত্রীর উগ্র মেজাজের কারণে মুখ ফুটে কিছু বলার ক্ষমতা নেই। আসিফ এর মধ্যেই খাবারের প্লেটে হাত ধুয়ে ধপ করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। কুহু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হলো, না খেয়েই উঠে পড়লে যে?”
আসিফ ওর দিকে এক পলক চেয়ে তাচ্ছিল্যভরে বলল,
“তোর এই ঢং দেইখা পেট ভইরা গেছে। রুচি নাই আর খাওনের।”
এই বলেই সে ওয়ারড্রবের ওপর থেকে নিজের হেলমেট আর বাইকের চাবিটা নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শাহিনুর বেগম এবার আরও ক্ষিপ্ত হলেন। ফুসঁতে ফুঁসতে বললেন,
“শান্তি? এহন কলিজা ঠাণ্ডা হইছে তোমার? নাকি আমার পোলাডার কলিজা না খাইয়া অব্দি শান্তি নাই কোনোডা?”
কুহুর কপাল বেয়ে তরতর করে ঘাম ঝরতে শুরু করল। ভেতর থেকে গলাটা শুকিয়ে আসছে। কোনো রকম ফ্যাসফ্যাস করে ভাঙা গলায় বলল,
“আপনি এসব কী বলতেছেন মা? আমি কি আপনার পোলারে কিছু বলছি? কথা নাই বার্তা নাই সে হুট করে খাবার রেখে উঠে গেল, এখানে আমি কী বলব!”
“উঠব না তো কী করব! এত নাটক কার শইলে সহ্য হয়? সর্বক্ষণ ঘরের মইধ্যে যত রঙ-ঢং কইরা বেড়ায়। মা হওয়ার মুরদ নাই, তার নাটক দেখলে বাঁচি না। সিনেমার পর্দায় গেলে মেডেল পাইত, মেডেল!”
কুহু চোখ ছলছল করে শুধু ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। আসলাম মিয়া মুখে আর খাবার তুলতে পারলেন না। মেয়েটার জন্য ওনার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তিনি এবার স্ত্রীকে অনুনয়ের সুরে বললেন,
“তুমি এসব কী কইতাছো আসিফের মা! মুখে একটু লাগাম টাইন্না কথা কও!”
শাহিনুর আরও ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন,
“আপনের লুতুপুতু করা লাগব না। আমি হক কথা কই তো, এই জন্য কারো ভালা লাগে না।”
কুহু ক্লান্তিতে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। শরীরটা যে আর এক বিন্দুও সায় দিচ্ছে না, তা সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। কিন্তু এসব মানুষকে নিজের দুর্বলতা বুঝতে দেওয়া যাবে না; তাহলে বলবে এটাও ওর নতুন কোনো নাটক। সে নিজেকে কোনোমতে সামলে পা বাড়াল রান্নাঘরের দিকে। ঠিক তখনই দরজায় সজোরে করা নাড়ার শব্দ হলো। এই অসময়ে আবার কে আসতে পারে? আসিফ তো ভোররাত ছাড়া সাধারণত ফেরে না। কুহু ঘুরে গিয়ে ধীরপায়ে দরজা খুলে দিল। দরজার ওপাশে আরিফ দাঁড়িয়ে আছে। কুহু এই মুহূর্তে আরিফের মুখটাও কেমন যেন ঝাপসা দেখছে। আরিফ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকে ইতস্তত করে বলল,
“আব্বা আছে? আব্বার সাথে একটু কথা ছিল!”
কুহু কোনো উত্তর না দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছে আকাশ-পাতাল সব এক নিমেষে দুলছে। আসলাম মিয়া ভেতর থেকে উঠে এলেন,
“কে, আরিফ?”
"জি আব্বা! আপনার সাথে জরুরি কথা ছিল। একটু বাইরে আসবেন?”
আরিফ ঘরের ভেতরে ঢুকতে একদমই ইচ্ছুক নয়, আর না নিজের জন্মদাত্রীর মুখোমুখি হওয়ার কোনো ইচ্ছে আছে। কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা কুহুকে দেখে ওর খটকা লাগল। সে এক ধাপ এগিয়ে এসে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কুহু, আপনার কী হয়েছে? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? আপনার... আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে?”
ততক্ষণে আসলাম মিয়াও দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। কুহু শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়েও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধপাস করে মেঝের ওপর পড়ে গেল। আরিফ এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে রইল। সে নিজের মনেই নিজেকে ধিক্কার দিল, সে কেন আর এক সেকেন্ড আগে হাত বাড়িয়ে কুহুকে ধরে ফেলল না? কিসের এত লোকলজ্জা আর সংকোচ ওর মনে? সে তো... সে তো কুহুকে... না, এখন এসব ভাবার একদম সময় নেই!
আসলাম মিয়া কুহুর মাথার কাছে বসে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগলেন,
“বউমা, ও বউমা... কী হইল তোমার?”
কুহুর গায়ে হাত দিতেই তিনি চমকে উঠলেন। প্রচণ্ড জ্বরে কুহুর শরীর যেন পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তিনি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আরিফকে বললেন,
“আরিফ, বউমার তো জ্বরে গা পুইড়া যাইতাছে। কিছু কর বাবা! আমি তহনই বুঝছিলাম কিছু একটা হইছে। তোর মা... তোর মা হুদাই মাইয়াডারে কত কথা হুনাইল!”
আরিফ এক তীব্র ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে নিজের মায়ের দিকে তাকাল। অতঃপর ঘরের ভেতরে পা রেখে দ্রুত এক গ্লাস পানি নিয়ে এসে ওর মুখে ছিটাল, কিছুটা মাথায় দিল। এরপর ক্রমাগত ডাকতে লাগল,
“কুহু, কুহু উঠুন! আপনি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন? কুহু... কুহুউউউ উঠুন, চোখ খুলুন! তাকান আমার দিকে। আপনার কিচ্ছু হয়নি, দেখুন আমার দিকে।”
আসলাম মিয়া প্রচণ্ড অস্থির হয়ে উঠলেন,
“কী হইল মাইয়াডার, ইয়া আল্লাহ! আরিফ, আমার মনে হয় ওরে এখনই হাসপাতাল নিয়া যাইতে হইব। তুই তোর গাড়ি আনছোস না? ওরে এখনই হাসপাতালে নিয়া চল বাপ। আসিফ তো আর এই রাইতে আসব না।”
আরিফ বাবার কথা শোনামাত্রই কোনো দ্বিধা না করে কুহুকে নিজের দুই বাহুতে তুলে নিল। শাহিনুর বেগম তখনও ডাইনিং টেবিলের একই জায়গায় বসে আছেন। এমনভাবে নির্বিকার চিত্তে খেয়ে যাচ্ছেন, যেন কোনো কিছুই ঘটেনি। আরিফ ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক আগে ওনার দিকে ফিরে অত্যন্ত ঘৃণার সাথে বলল,
“আপনাকে আমার নতুন করে কিছুই বলার নাই। শুধু এটুকু বলব, আল্লাহ যেন আপনাকে হেদায়েত দান করেন। আর আমি আমার সর্বশেষ চেষ্টা করব, যাতে জীবনে কোনোদিন আর কুহুর মুখ আপনাদের দেখতে না হয়। শান্তিতে এবার অন্ন মুখে তোলেন!”
এই কথাগুলো বলেই সে কুহুকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে বাইরে বেরিয়ে গেল। আসলাম মিয়াও নিজের স্ত্রীর দিকে একনজর চরম ঘৃণাভাজন দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ওদের পেছনে পেছনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
চলবে....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
আহাদ রাজা ও রিদি রানির কিছু মিষ্টি মূহুর্ত পড়তে এখনই কিনুন রোম্যান্টিক ই-বুক "আমার প্রেয়সী"
ই-বুক লিংক,
https://link.boitoi.com.bd/ihVXl
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻