ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার নীল নেশা

২৩তম পর্ব

লেখক: ফাতেমা ফারিয়াল

#তুমি_আমার_নীল_নেশা [পর্ব সংখ্যা - ২৩]

#লেখনিতে_ফাতেমা_ফারিয়াল
রাত অনেকটা গড়িয়েছে। চারদিকে সুনসান নীরবতা।সামির ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে একটা ইম্পর্টেন্ট প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছিল। কীভাবে যে এতটা সময় গড়িয়ে গেছে, তা সে টেরই পায়নি। ল্যাপটপটা বন্ধ করে একটা লম্বা হাই তুলতে তুলতে চিকন ফ্রেমের চশমাটা খুলে ল্যাপটপের ওপর রাখল। কী যেন একটা ভেবে নিজের শয়নকক্ষের দিকে তাকাল। পিহু আর চেরি সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। জোসনা খালাও ঘণ্টাখানেক আগে ওকে এক কাপ কফি দিয়ে নিজের রুমে চলে গেছেন। কিন্তু কাজের চাপে সামিরের সেই কফি ছোঁয়াও হয়নি। এখন তা ঠাণ্ডা বরফ হয়ে গেছে। সে উঠে কফির কাপটা রান্নাঘরের সিঙ্কে রেখে ​ধীরপায়ে নিজের রুমে গেল। 
আজকেও চেরি ঘুমানোর সময় পিহুর গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। সামির গিয়ে চেরির মাথায় কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে ওর কপালে একটা উষ্ণের ছোঁয়া দিল। তারপর আলতো করে কাথাটা টেনে চেরির গায়ে ঠিক করে দিল। ​এরপর ওর চোখ গেল পিহুর দিকে। পিহু একটু বেকায়দায় শুয়ে আছে। সামির ওর মাথাটা বালিশে তুলে দেওয়ার জন্য সামান্য ঝুঁকতেই পিহু নড়েচড়ে চোখ খুলল। ​এক দণ্ড দুজন দুজনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। সামির প্রথমে ভেবেছিল হয়তো পিহু ঘুমের ঘোরে আছে। কিন্তু না, পিহু আজ ঘুমায়ইনি! কেবলই চোখ দুটো বুজে এসেছিল আর তখনই সামিরের উপস্থিতি টের পেয়ে চট করে চোখ মেলেছে।
​সামিরকে একদম নিজের ওপরে এত কাছে দেখে পিহু ভীষণ ভড়কে গেল। ওর মুখ থেকে একটা তীব্র চিৎকার বের হতে নিলেই সামির দ্রুত ওর মুখটা শক্ত করে চেপে ধরল।
“​হুসস! আস্তে, চেরি ঘুমাচ্ছে তো!”
সামির ফিসফিস করে ওর কানের কাছে বলল। ​পিহু আড়চোখে পাশে ঘুমিয়ে থাকা চেরির দিকে চাইল। অতঃপর চোখের ইশারায় সামিরকে মুখ থেকে হাতটা সরাতে বলল। সামির হাত সরাতেই পিহু রাগি স্বরে বলে উঠল, 
“আপনি আমার এত কাছে কী করতেছেন? আমার এত কাছে আসছেন ক্যান, শুনি?”
​সামির ওর মুখচ্ছবি দেখে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আরও একটু ঝুঁকে রসিকতা করে বলল, 
“আমি তো ভেবেছি তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ! তাই ভাবলাম, এই সুযোগে একটু ফষ্টি-নষ্টি করি!”
​পিহু রাগে নাকের ডগা ফুলিয়ে ফোঁসফাস করে বলল, “আপনি কিন্তু এই পিহুরে এখনো চেনেন না! আর একবার যদি আমার সাথে এসব কিছু করার চেষ্টা করছেন, তাইলে আমি আপনার ওই সুন্দর নাকটা সত্যি সত্যি এক ঘু'ষি'তে ফাটায়া দিমু কইলাম!”
​সামির দুই ভ্রু উঁচুতে তুলে বলল, 
“স্ট্রেঞ্জ! যদি এসব নাই করতে দেবে, তাহলে জোর করে বিয়েটা করলে কেন? জোর করে যখন বিয়েটা আমায় করেছ, এখন আমি জোর করে ফষ্টি-নষ্টি করব। দ্যাটস ইট!”
​পিহু রেগে এক্কেবারে বাঘিনীর মতো ফুঁসতে ফুঁসতে ওর দিকে তাকাল। সামির বিপদ সংকেত টের পেয়ে হাত তুলে বলল, 
“আরে কুল, কুল... ঠাণ্ডা হও! আমি তো জাস্ট তোমার সাথে একটু মজা করছিলাম। তোমার মাথাটা বালিশে ঠিক করে দিতে চেয়েছিলাম শুধু, আর কিচ্ছু না।”
​এই বলে সামির দ্রুত সরে গেল ওর ওপর থেকে। পিহু সোজা হয়ে উঠে বসে জামা ঠিক করে নিল। সামির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 
“রাত তো অনেক হলো! তুমি এখনো ঘুমাওনি যে?”
​পিহু এবার বেশ বিষণ্ন গলায় বলল, 
“আমার আম্মার কথা খুব মনে পড়তেছে। আপার কথাও মনে পড়তেছে। আম্মা আর আপা কেমন আছে একটু জানতে পারলে ভালো হইত। মনটা কেমন কেমন জানি করে। আম্মার সাথে একটু কথা বলায়া দিতে পারবেন?”
​সামির এই প্রথম দস্যি মেয়েকে ওমন মন খারাপ দেখল। সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, 
“এখন রাত আড়াইটা বাজে। এত রাতে কল দেব? সবাই তো এখন গভীর ঘুমে। সকালে না হয় ফোন করে কথা বলিয়ে দেব।”
“​কিন্তু আমার তো কথা না বলা পর্যন্ত ঘুম আসবে না!”
​সামির কিছু একটা ভেবে জানালার ভারী পর্দাটা সরিয়ে বাইরে তাকাল। আকাশের মেঘ সরে গিয়ে প্রকাণ্ড গোল চাঁদটা রূপালী আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। সে পিহুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, 
“ছাদে যাবে?”
“​ছাদে? এত রাতে?” পিহু অবাক হলো।
“​হুম। আজকের আকাশটা খুব সুন্দর। চলো ঘুরে আসি।”
​সে পিহুকে আর কোনো সুযোগ দিল না। রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পিহুও বাধ্য মেয়ের মতো ওর পিছু পিছু গেল। সামির রান্নাঘরে ঢুকে খুটুরখাটুর শব্দে দুই কাপ কফি বানাল। একটা ব্ল্যাক কফি আর একটা দুধ- চিনি দেওয়া কফি। পিহু যে ব্ল্যাক কফি খেতে পারে না, সেটা সামির ইতিমধ্যে জেনে গেছে। ​ছাদে এসে দুজনে পাশাপাশি বসল একটা বেতের সোফায়। পিহু এই বাড়িতে আসার পর এই প্রথম ছাদে এসেছে। সে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল, পুরো ছাদটা ফুল গাছে ভর্তি! ছোট, বড়, মাঝারি সব ধরনের টব সুন্দর কর্ সাজানো আছে। কম -বেশি সব রকমর ফুল ধরে আছে গাছগুলোতে। ​পিহু কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইল, 
“এতগুলা গাছ! কে লাগিয়েছে এগুলা? আপনি?”
​সামির মাথা নাড়ল, “উহুম। চিত্রা ভাবি।”
“​চিত্রা ভাবি?”
পিহু অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল সামিরের দিকে। ​সামির মৃদু হেসে নিজের কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিল। অতঃপর বলল, 
“হুম, চিত্রা ভাবি। জানো, চিত্রা ভাবির ফুল গাছ খুব পছন্দ ছিল। এই জন্য সৈকত ভাই একটু একটু করে এই ছাদটাকে একটা ছোট্ট ফুলের বাগানে পরিণত করেছিল। তখন এই গাছগুলো সব ছোট চারা ছিল। চিত্রা ভাবি প্রতিদিন এগুলোর যত্ন করত। পানি দিত আর অধীর আগ্রহ নিয়ে বলত, এই গাছগুলো কবে বড় হবে? কবে ফুল ফুটবে? অথচ দেখ মানুষের ভাগ্য কী অদ্ভুত! আজ গাছগুলোতে থোকায় থোকায় ফুল ফুটেছে। গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে, কিন্তু চিত্রা ভাবি এই ফুলের মাদকতা দেখে যেতে পারল না। ফুলের ঘ্রাণ নিতে পারছে না। তার এত ভালোবাসার গাছগুলোকে একটু ছুঁয়ে ও দেখতে পারছে না।”
​পিহু এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সামিরের মুখপানের দিকে। চাঁদের মায়াবী আলোয় সামিরের চোখের কোণে অশ্রুকণা চিকচিক করে উঠেছে। পিহুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে মোচড় দিয়ে উঠল। এই প্রথম ওর মনের ভেতরে সামিরের জন্য গভীর সহানুভূতি জন্ম নিল। সে কাঁপানো স্বরে জিজ্ঞেস করল, 
“সৈকত ভাই... এর মানে চে-চেরি আপনার মেয়ে না! সৈকত ভাইয়ের মেয়ে?”
​সামির চোখের কোণ আলতো করে মুছে নিয়ে বলল, 
“না, চেরি আমার মেয়ে, শুধুই আমার।”
“​আপনার কথা আমি একটুও বুঝি নাই! এইমাত্রই না আপনি কইলেন, চিত্রা ভাবি। এর মানে তো সে সৈকত ভাইয়ের বউ, তাই না? তাহলে চেরি তো সৈকত ভাইয়েরই মেয়ে হবে!” পিহু যুক্তি দাঁড় করাল।
“​জন্ম দিলেই তো আর সে জন্মদাতা হয়ে যায় না, পিহু!” সামির একটু থামল, তারপর ভারাক্রান্ত গলায় বলল,  
“​চেরি আমারই মেয়ে। ওর জন্মের ঠিক সাত মিনিট পর চিত্রা ভাবি পৃথিবীর মায়া, নিজের সন্তানের মায়া ত্যাগ করে চলে যান। ডাক্তার যখন সেই ছোট্ট পুতুলটাকে সৈকত ভাইয়ের সামনে ধরল, সৈকত ভাই অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিল! সে একবারের জন্যও ওই ছোট্ট পুতুলটার মুখের দিকে তাকায়নি। আমি... এই আমি তখন ওকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম। রাত-দিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে নিজের বুকে আগলে ধরে বড় করেছি! চেরি আমার মেয়ে পিহু, আমার মেয়ে। ও সৈকত ভাইয়ের কেউ... কেউ হয় না! সৈকত ভাই ওকে চায়না।”
​সামিরের কন্ঠ বাষ্পে ঢেকে গেল। সে বাচ্চাদের মতো হাত দিয়ে চোখ মুছে নিল। পিহু একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের করতে পারল না। বোকার মতো শুধু চেয়ে রইল। তার মনের ভেতরে চিত্রাকে নিয়ে জমে থাকা এতদিনকার হাজার প্রশ্ন, ক্ষোভ আর বিষাক্ত ঈর্ষা; সব এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল! সে এতদিন মনে মনে কী ভেবে এসেছে আর এখন কী শুনছে! সৈকত ভাই যে নিজের ভেতরের এত বড় ঁযন্ত্রণার পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছে তা তো পিহু কুণাক্ষরেও টের পায়নি। আর চেরি? চেরির মতো এত সুন্দর একটা নিষ্পাপ বাচ্চার দিক থেকে সৈকত ভাই কীভাবে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে? এটা কি আদৌ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব?
​সামির এবার নিজেকে একটু সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল, 
“আমি তোমাকে আরও আগেই সত্যিটা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি নিজে থেকেই ভেবে নিয়েছ যে আমি বিবাহিত! তাই আমিও আর নতুন করে এক্সপ্লেন করতে চাইনি।”
​পিহু নিজের অপরাধী মুখটা নিচু করে বলল, 
“আপনিই তো আমারে বলছিলেন চেরি আপনার মেয়ে। তাইলে আমি কী বুঝব?”
“​আমি তো এটাও বলেছিলাম যে আমি বিয়ে করিনি! বাট তুমি তো আমার কোনো কথাই মানতে নারাজ ছিলে। ভেবেছিলে আমি দাদুর ভয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলছি। এখন তুমিই বলো, আমি তোমাকে কীভাবে প্রুফ করতাম যে, আমি এখনো পিওর ভার্জিন!”
​পিহু ভ্রু তুলে তাকাল, “ভার্জিন মানে কী?”
​সামির চরম অবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে চাইল, 
“ভার্জিন মানে তুমি জানো না?”
​পিহু মাথা নাড়ল। সে আসলেই জানে না। সামির মনে মনে বিদ্রূপ করে একটু হাসল। যেই মেয়েটা সারাক্ষণ বিয়ে, সংসার আর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ফটফাট মুখ চালায়, সে যে এই শব্দটার সহজ অর্থ জানে না তা বিশ্বাস করা কঠিন! ​পিহু পুনরায় জিজ্ঞেস করল, 
“কী হইল? বলেন না, আপনি ভার্জিন মানে কী?”
​সামির নিজের কফির কাপটা পাশের টেবিলে রেখে সোজা পিহুর দিকে তাকাল। ভাবল, এই দস্যি মেয়েটার সাথে একটু দুষ্টুমি করা যাক! সে একটি সিরিয়াস হওয়ার ভান করে বলল, 
“আআআ... ভার্জিন মানে হলো ভীষণ সুদর্শন! আমি যে সুন্দর, সুদর্শন। এটা তো আলাদা করে বলার কিছু নাই, রাইট?”
“​সুদর্শন? সুদর্শন মানে ভার্জিন? এটা আবার।কোন দেশের ভাষা? আমি তো আগে এমন কথা শুনি নাই!” পিহু চোখ কুঁচকাল।
“​এটা ইতালিয়ান ভাষা!” 
“​কিন্তু আমি তো আর ইতালির না! আমি এক্কেবারে খাঁটি বাঙালী মেয়ে, তাই আমার সাথে ওসব বিদঘুটে ভাষা কইবেন না। যা বলবেন সোজা বাংলায় বলবেন, যেমনে আমি বলি। আর যদি না পারেন, তাইলে বলেন। আমি আপনারে শিখাই দিতে পারব!”
​সামির নিজের ঠোঁট উল্টে বলল, 
“ওকে! তাহলে শিখাও দেখি!”
​পিহু উৎসাহ পেয়ে বলতে শুরু করল, 
“প্রথমে কী শিখবেন বলেন? আমি কিন্তু সুন্দর কইরা বাংলা শিখাইতে পারি। অ, আ থেকে শুরু করে ক, খ সব আমার মুখস্থ! আমাদের গ্রামে বেশিরভাগ পোলাপানরে তো আমিই হাতেখড়ি দিয়া শিখাইছি! ওরা সবাই আমার কাছে পড়ার জন্য লাইন ধরত, লাইন! বিশাল লম্বা লাইন ছিল তাগো। আপনি তো বিদেশে থাইকা বাংলা একদম ভুলে গেছেন। কথায় কথায় খালি ইংরেজি ছাড়েন। এখন যদি ঠিকমতো বাংলা না জানেন, তাইলে তো আপনার ভবিষ্যৎ এক্কেবারে অন্ধকার! আর আমি তো চাই না আপনার কোনো ক্ষতি হোক। আপনি যেইখান থেকে শুরু করতে চাইবেন, আমি সেখান থেকেই শিখামু। আপনি খালি মুখ ফুটে বলেন আগে কী শিখবেন, বাকিটা আমি আমার মতো করে...”
​সামির হুট করে হ্যাঁচকা একটা টানে পিহুকে নিজের একদম কাছে টেনে নিয়ে এল! পিহুর অনবরত চলতে থাকা বাকবিতণ্ডা নিমিষেই থেমে গেল। সে চোখ গোল গোল করে থতমত খেয়ে বলল, 
“আরে... কী করতেছেন আপনি!?”
​সামির ওসব কথার কোনো তোয়াক্কা করল না। সে খুব আলতো হাতে সপ্তদশীর কানের পাশে থাকা আলগোছা লম্বা চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে হিসহিস করে নিচু স্বরে বলল, 
“এত দূর বসে শেখালে তো আমি কিচ্ছু বুঝব না। তাই একটু কাছে টেনে নিলাম। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু খুব অবাধ্য একটা স্টুডেন্ট তোমার! পড়তে বসে তোমায় ভীষণ বিরক্ত করব। হ্যান্ডেল করতে পারবে তো আমাকে?”
​পিহু একবারে থতমত খেয়ে গেল! নিজের পাতানো জালে নিজেই বিশ্রিভাবে ফেঁসে গেছে। কী দরকার ছিল এত বড় বড় ডায়ালগ মারার? সামির ওর দিকে আরও এক ইঞ্চি ঝুঁকতেই তার নিঃশ্বাসের উষ্ণ বাতাস পিহুর মুখে এসে পড়ল। শিউরে উঠল পিহু। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল সামিরের সুদর্শন মুখের দিকে। চাঁদের আলোয় সামিরের মায়াবী মুখটা আরো আকর্ষণীয় লাগছে।
​সামির মৃদু হাসল। এরপর পেছনে সরে এসে কফির কাপে চুমুক দিয়ে পিহুর হাবভাব দেখতে লাগল। মেয়েটা কেমন ঘাবড়ে গেছে আল্লাহ! একদম লাল হয়ে গেছে! সামির মনে মনে হাসল, সে কি এতটাই বোকা যে এভাবে যেখানে-সেখানে রোম্যান্স শুরু করে দেবে? ​পিহুকে ওভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল, 
“এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? আমি কি কোনো অপরাধ করেছি?”
​পিহু মনে মনে বলল, 
“আমার ১২টা বাজায়া দিয়া এখন নিষ্পাপ মাসুম সাজা হচ্ছে! ইচ্ছে করতেছে ঘু'ষি মাইরা ওই সুদর্শন মুখটা বাঁকা কইরা দেই! কিন্তু তাতে তো আমারই লস।”
​তবে মুখে তা প্রকাশ করল না। দ্রুত নিজের নজর সরিয়ে নিল। ঢোক গিলে থতমত খেয়ে বলল, 
“আপনি... আমি এখন নিচে যাব। আমার মেলা ঘুম আসছে। আমারে নিচে নিয়ে চলেন।”
​সামির ভ্রু তুলল, 
“তুমি তো একটু আগেই বললে, তোমার আজ রাতে আর ঘুমই আসবে না! তাই তো ছাদে এলাম!”
“​এখন ঘুম আসতেছে, আমি কী করমু!”  
“​ওকে, চলো।”
​সামিরও আর কোনো দ্বিমত করল না। কারণ কাল সকালে চেরির স্কুলের প্রথম দিন। ওকে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। আবার অফিসেও একটা প্রজেক্টের জরুরি মিটিং আছে, সেখানেও যেতে হবে। তাই কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া খুব প্রয়োজন। ​নিচে এসে পিহু গিয়ে চেরির পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল।এমন ভান করল যেন ওর ঘুমে চোখ ভেঙে আসছে। কিন্তু সামির ঠিকই বুঝল, এসবই ওর নাটক! এই দস্যি মেয়েটা নিজের দুর্বলতা সামিরের কাছে ধরা পড়ার ভয়ে এসব ঘুমের ভান করছে।
​সামির সোফায় শুয়ে একদৃষ্টে পিহুর পানে তাকিয়ে রইল। পিহু পিটপিট করে চোখ খুলে আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, সামির এখনো ওর দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে! সে চট করে আবার চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নিল। ​সামির ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসির রেখা টেনে মনে মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল, 
“এত নাটক করে কোনো লাভ নেই। আজ না হোক কাল তোমাকে আমার কাছে ধরা দিতেই হবে দস্যিমেয়ে! আমি শুধু দেখতে চাই, তোমার এই দস্যিপনার দৌড় আর কত দূর পর্যন্ত যায়!”
★
রাতের শেষ প্রহর। তখন হাসপাতালের দীর্ঘ করিডোরগুলো থমথমে নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। চারপাশে শুধু হাসপাতালের চেনা অ্যান্টিসেপ্টিকের তীব্র গন্ধ আর এক নিঃশব্দ হাহাকার। কয়েকজন নার্স আর রোগীদের সাথে আসা ক্লান্ত আত্মীয়-স্বজন করিডোরের বেঞ্চে বসে ঝিমুচ্ছে। ​আরিফও তখন কুহুর কেবিনের বাইরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কুহুকে এখানে আনার সাথে সাথেই ক্যানোলা পরানো হয়েছে। প্রচণ্ড জ্বরের দাপট কমাতে তৎক্ষণাৎ সাপোজিটরি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া টাইফয়েড আর ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য এক নার্স এসে কুহুর র'ক্ত নিয়ে গেছে। সকালে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এখন স্যালাইন চলছে।
​আসলাম মিয়া কিছুটা ক্লান্ত পায়ে কেবিন তেকে বের হতেই আরিফ সোজা হয়ে দাঁড়াল। আসলাম মিয়া কপালটা এক হাতে চেপে ধরে ব্যথিত স্বরে বললেন, 
“আমি আসিফেরে কয়বার কল দিছিলাম রে আরিফ। ওয় তো ফোনই ধরল না। বউমার বাপের বাড়িতে একটা কল দিমু? বেয়াই-বেয়াইনরা আইলে ভালা হইত না? তোর মা তো জীবনেও এহানে আইব না।”
​আরিফ নিজের কপালে হাত দিয়ে একটু নিস্তব্ধতার মাঝে ডুবে রইল। তারপর ভারী গলায় বলল, 
“না আব্বা। এত রাতে ওনাদের কল করে জানানোর দরকার নাই। খামোখা টেনশন করবে। সকালে ধীরেসুড়ে কল দিয়েন। আর আপনি এখন একটু বিশ্রাম নেন, আব্বা। আপনার শরীর ভালো না।”
“​আমি কেমনে বিশ্রাম নিমু রে বাপ? আমি ঘুমাইলে, বউমারে কে দেখব!”
“​আমি আছি তো আব্বা! আমি দেখছি। কোনো প্রয়োজন হলে আমি নার্সদের ডেকে নেব। আপনি একটু ঘুমান। নয়তো শরীর খারাপ করবে।”
আরিফ বাবাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। ​আসলাম মিয়া আরিফের কথায় কিছুটা ভরসা পেয়ে করিডোরের একটা খালি বেঞ্চে গিয়ে শুয়ে পড়লেন। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসল। আরিফ কিছুক্ষণ বিষণ্ন চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর আস্তে করে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে মৃদু আলো জ্বলছে। কুহু বেডে বিভোর হয়ে শুয়ে আছে। পূর্ণ চেতনা এখনো ফিরেনি। আরিফ ধীরপায়ে বেডের পাশে রাখা চেয়ারটা একটু টেনে কুহুর একদম মাথার কাছে এনে বসল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কুহুর সেই নিস্তেজ ও বিবর্ণ মুখটার দিকে। আরিফের বুকটা এক সূক্ষ্ম, তীব্র যন্ত্রণায় কাতরে উঠছে। তার চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে অশ্রুর ভারে। সে বুঝতে পারছে না কোথা থেকে নিজের এই জমানো হাহাকার শুরু করবে।
​সে পরম যত্নে কুহুর গায়ের চাদরটা টেনে ঠিক করে দিল। একটু আগেই নার্স তাকে কড়া কথা শুনিয়ে গেছে। কুহুর পুরো শরীরে নাকি অস্বাভাবিক নীলচে নীলচে আঘাতের দাগ রয়েছে। নার্সদের সেই কটু কথা আরিফ নীরব দর্শকের মতো সহ্য করে নিয়েছে। সে নার্সদের শুধু এটুকুই বলেছিল, সে নাকি এ ব্যাপারে কিছুই জানে না! মিথ্যা বলেছিল সে। এত বড় একজন আইনজীবী হয়েও নিজের ভালোবাসার মর্যাদা বাঁচাতে বানিয়ে চরম মিথ্যা বলেছিল। কিন্তু সে তো খুব ভালো করেই জানত, এসব নিষ্ঠুর দাগ তার নিজের পাষাণ ভাইয়েরই বিকৃত কর্ম!
​আরিফ সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে কুহুর বাম হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোর তুলে নিল। কুহুর নিস্তেজ হাতের তালুতে নিজের মুখটা কিছুক্ষণ শক্ত করে চেপে ধরে রাখল সে। এরপর কুহুর অচেতন মুখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে, বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“​আপনি আমার কেন হলেন না, কুহু? কেন হলেন না! একবার অন্তত আমার হয়েই দেখতেন! আমি দুঃখ নামের শব্দটাকে আপনার ত্রি-সীমানায় আসতে দিতাম না। কেন এভাবে চুপ করে আছেন? কেন সব জেনেবুঝে নিজেকে ধংশের পথে ঠেলে দিচ্ছেন? এবার আমার হয়ে যান, কুহু! আল্লাহর দোহাই লাগে আপনি এবার আমার হয়ে যান। আমি আপনার জন্য, আপনার হয়ে পুরো দুনিয়ার সাথে লড়ব! আমাকে শুধু সেই অধিকারটুকু করে দিন।”
​আরিফের চোখের কোণ থেকে কখন যে উত্তপ্ত অশ্লু গড়িয়ে কুহুর হাতের তালুতে পড়তে শুরু করেছে, তা সে নিজেও টের পায়নি। সে কুহুর হাত দিয়েই নিজের ভিজতে থাকা চোখ দুটো মুছে নিল। হালকা নাক টেনে, অবরুদ্ধ গলায় বলে চলল,
“​আপনি তো জানেন... আপনি তো সবই জানেন! তবুও কেন এভাবে আমাকে পর করে দূরে ঠেলে দিলেন? একবার একটু করুণা করে আমার হয়ে দেখতেন! আমি নিজের জীবন দিয়ে হলেও আপনাকে সুখি রাখতাম। আপনার শরীরে একটা আঁচও পড়তে দিতাম না, কুহু। আপনাকে এখানে এভাবে দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে! বড্ড জেদি আপনি! কেন এমন আত্মঘাতী আচরণ করছেন? আমার কথা শুনলে কী এমন হতো আপনার? আমি কি ভালোবাসতাম না আপনাকে? বাসতাম, ভীষণ ভালোবাসতাম! নিজের সবটুকু উজার করে দিয়ে ভালোবাসতাম। এখনো বাসি কুহু, খুব ভালোবাসি আপনাকে... আমার এই ভালোবাসাটা আর না দেখার ভান করে থাকবেন না, দোহাই লাগে আপনার!”
​আরিফ শুকনো ঢোক গিলে ভেতরের জমে থাকা বছরের পর বছরের অভিমানী বার্তাগুলো একের পর এক কুহুর কাছে উগড়ে দিতে লাগল। অথচ এসব আকুলতা নিস্পন্দ কুহুর কানে পৌঁছালই না। ​ঠিক তখনই চারপাশের মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসতে লাগল,
“আসসালাতু খাইরুম মিনান-নাউম! আসসালাতু খাইরুম মিনান-নাউম!”
আরিফ তখনও একইভাবে কুহুর হাত নিজের উষ্ণ হাতের মুঠোয় পুরে বসে আছে। কুহুর স্যালাইনের শেষ হয়ে গেছে। আরিফ আর আলাদা করে নার্সকে ডাকার প্রয়োজন বোধ করল না। সে নিজেই উঠে গিয়ে স্যালাইন বন্ধ করে দিল।
​কুহুর শরীরে আগুনের মতো তাণ্ডব চালানো জ্বরটা এখন কিছুটা কমে এসেছে। তবে সকাল হতে হতে সে কতটা সুস্থ হয়ে উঠবে, তা বলা সত্যিই মুশকিল!
চলবে....
(কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ 🚫, চাইলে লিংক শেয়ার করতে পারেন।)
হ্যাপি রিডিং 🫶🏻

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন