ফন্ট সাইজ:
থিম:
জানে মন তুই জীবন

৫ম পর্ব

লেখক: ফারজানা ইয়াসমিন

#জানে_মন_তুই_জীবন

#লেখনিতে_ফারজানা_ইয়াসমিন
#পর্ব_৫
কেটে গেল আরও ৮ টা মাস সময় কই দিয়ে যায় বোঝা যায় না।মহুয়া ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট।আজকে ওর ৭ মাসের অনুষ্ঠান।মহুয়া তো নিজেই বাচ্চা টাইপের।রাগী তা মানি বাট বাচ্চামো টা এখনও ছাড়েনি।
আজ পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে রঙিন ফুল, বেলুন আর লাইট দিয়ে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব—সবাই একে একে চলে এসেছে। মহুয়ার সাত মাসের সাধ উপলক্ষে পুরো বাড়িতেই যেন উৎসবের আমেজ।
কিন্তু অনুষ্ঠানের নায়িকা মহুয়ার মুখটাই গোমড়া।বিছানায় হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে সে। ঠোঁট ফুলিয়ে একদম বাচ্চাদের মতো অভিমান করে আছে।লিয়ন রুমে ঢুকেই ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আরে! আমার জান পাখি টার মুখটা এমন টমেটোর মতো ফুলে আছে কেন?
মহুয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
— তোমার সঙ্গে কথা বলব না।
— আবার কী করলাম আমি?
— কিছুই করো নি।
— তাহলে রাগ?
— কারণ তুমি খারাপ।
— ওহ! আমি খারাপ? এবার অপরাধটা জানতে পারি?
মহুয়া এবার রাগী গলায় বলল,
— সবাই কেক খাচ্ছে, পেস্ট্রি খাচ্ছে, আইসক্রিম খাচ্ছে। আর আমাকে বলছেন, "ডাক্তার বেশি মিষ্টি খেতে মানা করেছে।"
— এটা কি কোনো কথা?
লিয়ন হেসে ফেলল।
— এই জন্য এত রাগ?
— হ্যাঁ! আর আমি এখনই চকলেট চাই।
— এখনই?
—হ্যাঁ ,এখনই!
— না দিলে?
মহুয়া দুহাত বুকের কাছে ভাঁজ করে বলল,
— তাহলে আমি অনুষ্ঠানেই যাব না।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা অনিমা আর অয়ন সব শুনে হেসে ফেলল।অনিমা বলল,
— দেখেছেন ভাইয়া?মহুয়া এখনও একদম আগের মতোই আছে।
অয়ন মুচকি হেসে যোগ করল,
— আমার মনে হয় বাসায় একটা বাচ্চা আসার আগে থেকেই একটা বাচ্চা আছে।
মহুয়া সঙ্গে সঙ্গে বালিশ ছুড়ে মারল অয়নের দিকে।অয়ন বালিশটা ধরে হেসে বলল,
— দেখেছেন? প্রমাণও দিয়ে দিল।
রুমের সবাই হো হো করে হেসে উঠল।লিয়ন আলতো করে মহুয়ার গাল টিপে বলল,
— আচ্ছা, আমার বাচ্চা বউটা যদি ভালো মেয়ে হয়ে অনুষ্ঠানটা শেষ করে, তাহলে আমি নিজে হাতে তোর প্রিয় ডার্ক চকলেট আইসক্রিম খাওয়াব। তবে ডাক্তার যতটুকু অনুমতি দিয়েছেন, ততটুকুই।
মহুয়ার চোখ দুটো চকচক করে উঠল।
— সত্যি?
— একদম সত্যি।
মহুয়া লিয়ন কে জড়িয়ে ধরে খুশিতে হেসে ফেলল।তার সেই হাসিটা দেখে লিয়ন মনে মনে বলল,
"আর কয়েক মাস পর আমাদের ঘরে আরেকটা ছোট্ট মানুষ আসবে। কিন্তু আমার কাছে এই মেয়েটাও সারাজীবন এমন বাচ্চাই থেকে যাবে।"
তারপর লিয়ন আলতো করে মহুয়ার হাত ধরে বিছানা থেকে উঠাল।
— চল, এবার নিচে যেতে হবে। সবাই শুধু তোকে দেখার জন্যই অপেক্ষা করছে।
মহুয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— আমি যাব না।
— কেন?
— আমি মোটা হয়ে গেছি। সবাই আমাকে দেখে হাসবে।
লিয়ন মুচকি হেসে দু'হাতে মহুয়ার মুখটা ধরে বলল,
— কে বলেছে তুমি মোটা হয়েছিস? আমার কাছে তোমাকে আগের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর লাগছে।
মহুয়া সন্দেহের চোখে তাকিয়ে বলল,
— মিথ্যা বলছো।
— আল্লাহর কসম, একদম না। তুমি এখন শুধু আমার স্ত্রী না, আমাদের ছোট্ট রাজকুমার বা রাজকুমারীর আম্মু। এই সময়টায় তুমি সবচেয়ে সুন্দর।
কথাটা শুনে মহুয়ার গাল লাল হয়ে গেল।ঠিক তখনই বাইরে থেকে অনিমার গলা ভেসে এলো—
— মহুয়া।আর কতক্ষণ? সবাই অপেক্ষা করছে।
মহুয়া দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আসছি।
লিয়ন ধীরে ধীরে মহুয়াকে নিয়ে নিচে নামল।নিচে নামতেই সবাই একসাথে বলে উঠল,
— মাশাআল্লাহ!
আজ মহুয়াকে অপূর্ব লাগছে। হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি, মাথাভর্তি গাঁদা আর গোলাপের ফুলের গয়না, হাতে কাঁচের চুড়ি, মুখে লাজুক হাসি।লিয়নের চোখ যেন মহুয়ার ওপর থেকেই সরছে না।
রিয়াদ পাশ থেকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
— ভাই, একটু চোখের পলকও ফেলো। সবাই বুঝে ফেলবে ভাবির প্রেমে এখনও নতুন করে পড়ে আছো।
লিয়ন গর্বের সঙ্গে বলল,
— নিজের বউকে দেখছি। সমস্যা কোথায়?
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।মহুয়াকে সুন্দর করে সাজানো চেয়ারে বসানো হলো। একজন একজন করে সবাই এসে আশীর্বাদ করতে লাগল।মহুয়ার মা মনিরা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
— আল্লাহ তোকে আর আমার নাতি-নাতনিকে সুস্থ রাখুক।
লিয়নের মা চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
— আমার মেয়েটা আজ মা হতে চলেছে। আলহামদুলিল্লাহ।
মহুয়ার চোখও ভিজে উঠল।লিয়ন আস্তে করে তার পাশে বসে হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
— কাঁদছো কেন?
— জানি না... খুব ভালো লাগছে।
— আর কয়েকটা মাস। তারপর আমাদের ছোট্ট মানুষটা আমাদের কোলে থাকবে।
মহুয়া নিজের পেটের ওপর হাত রেখে মৃদু হেসে বলল,
— জানো? ও কিন্তু সারাদিন খুব দুষ্টুমি করে।
— তাই নাকি?
— হুম। তোমার গলা শুনলেই নড়াচড়া শুরু করে।
লিয়নের চোখে বিস্ময় আর আনন্দ একসাথে ফুটে উঠল।সে আস্তে করে হাঁটু গেড়ে মহুয়ার পেটের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— বাবু, আমি তোমার আব্বু। আম্মুকে বেশি কষ্ট দিও না, ঠিক আছে? আর তাড়াতাড়ি আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা দুজনেই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
কথাটা শেষ হতেই মহুয়া হঠাৎ হেসে উঠল।
— লিয়ন!
— কী হলো?
— বাবু আবার লাথি দিল।
লিয়ন উচ্ছ্বসিত হয়ে আলতো করে মহুয়ার পেটের ওপর হাত রাখল। কয়েক সেকেন্ড পর সে ছোট্ট একটা নড়াচড়া অনুভব করতেই তার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
— সত্যিই...!
আনন্দে সে মহুয়ার কপালে আলতো করে চুমু এঁকে দিল। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবারের সবাই সেই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে হাসল। মুহূর্তটা যেন ভালোবাসা, অপেক্ষা আর নতুন জীবনের আগমনের আনন্দে ভরে উঠল।
মহুয়া সামান্য রাগের ভান করে বলল,
— হয়েছে, হয়েছে। তোমার বাবু খুব দুষ্টু। সারাক্ষণ গুঁতাগুঁতি করে। আমাকে একদম শান্তিতে থাকতে দেয় না।
লিয়ন ভান করে অবাক হলো।
— আমার বাবু? একা আমার কেন? তোমার না?
মহুয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
— না! এখন থেকে পুরোপুরি তোমার। সারাদিন আমাকে লাথি মেরে, গুঁতাগুঁতি করে শুধু জ্বালায়।
লিয়ন হেসে মহুয়ার পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল।
— এই যে ছোট্ট দুষ্টু, আম্মুকে এত বিরক্ত করছ কেন?
মহুয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— দেখেছ? আবার নড়ল! ইসস... একদম তোমার মতো।
— আমার মতো মানে? আমি কি এত দুষ্টু?
পাশ থেকে অয়ন হেসে বলে উঠল,
— ভাইয়া, তুমি ছোটবেলায় যে কী ছিলেন, সেটা তো আম্মুর কাছেই শুনেছি। আলমারির ওপর উঠে লুকিয়ে থাকতেন, আর সবাইকে পাগল বানিয়ে দিতেন!
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।লিয়ন কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল,
— এই ছেলে, সব পুরোনো ইতিহাস এখনই বলতে হবে?
রিয়াদ দুষ্টু হেসে বলল,
— সত্য কথা লুকিয়ে লাভ কী! আপনার দুষ্টুমির জিনই তো এখন বাবুর মধ্যে চলে গেছে।
মহুয়া খিলখিল করে হেসে উঠল।
— আমি তো আগেই বলেছি। বাবু একদম তার আব্বুর কপি হবে।
লিয়ন নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
— না, না। আমার মেয়ে হলে সে হবে একদম আম্মুর মতো শান্ত, ভদ্র আর মিষ্টি।
মহুয়া ভ্রু তুলে বলল,
— আমি শান্ত? তুমি সিউর?
— বিয়ের আগে ছিলে... তারপর আমার সঙ্গে থেকে একটু... উমম... আপগ্রেড হয়েছ।
— কী বললে?
— কিছু না! কিছু না!
বলেই লিয়ন দৌড় দেওয়ার ভান করতেই মহুয়া হাতে থাকা ছোট্ট ফুলের তোড়াটা তার দিকে ছুড়ে মারল।লিয়ন সেটা ধরে হেসে বলল,
— আহা! দেখেছেন সবাই?
এবার মহুয়াও হাসি চেপে রাখতে পারল না।হাসতে হাসতেই বলল,
— শুনে রাখো, বাবু জন্মানোর পর তোমার সব দুষ্টুমির বিচার আমি ওকে দিয়ে করাব।
লিয়ন চোখ টিপে উত্তর দিল,
— করিও। আমি আর আমার বাবু এক টিম, আর তুমি একা। দেখি কে জেতে!
মহুয়া হেসে মাথা নাড়ল।
— তোমরা বাবা-ছেলে বা বাবা-মেয়ে দুজন মিলে আমাকে একদিন পাগল বানাবে।
লিয়ন আলতো করে মহুয়ার কপালে চুমু এঁকে মৃদু স্বরে বলল,
— না, আমরা দুজন মিলে তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ বানাব, ইনশাআল্লাহ।
মহুয়া মুগ্ধ চোখে লিয়নের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখে ছোট্ট হাসি, চোখে একরাশ ভালোবাসা—মুহূর্তটা যেন পুরো পরিবারের জন্যই আনন্দ আর ভালোবাসায় ভরে উঠল।
---
লিয়ন মহুয়া কে এই ৭ মাস খুব যত্নে রেখেছে।তাকে বিছানা ছেড়ে কোথাও যেতে দেয় না।
মহুয়া বিছানায় বসে আছে আর লিয়ন ল্যাবটবে কাজ করছে।মহুয়ার কিছু একটা মনে পড়তেই লিয়ন কে প্রশ্ন করল,
__ শুক্রবারে রিয়াদ ভাইয়ের বিয়ে তাই না?
__ হুম।
__ তাহলে তো কালকে গায়ে হলুদ।
__ হুম।
__ আমাকে কবে নিবে?
__ তুমি শুক্রবারে যেও।সকাল সকাল গাড়ি পাঠিয়ে দেবো।
__ কেন?তুমি আমাকে নিয়ে যাবে না?
__ রিয়াদের বিয়ে আমার ওইখানে থাকতে হবে তাই।
__ ওহ্।
__ ডিনার করেছ?
__ না।
__ কেন?নিজের প্রতি যত্ন নাই থাকতে পারে আমার সন্তানের প্রতি খেয়াল টা তো রাখো।আমি আগেই বারণ করেছিলাম যে কনসিভ না করতে।কিন্তু তাও তুমি তো না শোনার বান্দা।
__ বাবা।বেবি কে নিয়ে এত চিন্তা?তবে আমার জন্য কি আছে?
__ কথা ঘোরাবে না।আমি তোমার জন্য খাবার নিয়ে আসছি।
__ আচ্ছা ধরো আমার যদি কিছু হয়ে যায়!তখন তুমি আমার সন্তান কে আগলে রাখবে তো?কখনও অবহেলা করো না।
__ এসব ফালতু কথা রাখো।তোমার কিছু হবে না।এসব ইমোশনাল ফালতু কথা গুলো কই থেকে শিখছো।এসব আমার একদম পছন্দ না।
বলে লিয়ন চলে গেল।
---
আজ শুক্রবার।রিয়াদের বিয়ে।লিয়ন রিয়াদের ওইখানে কাজ করছে।মহুয়া রেডি হচ্ছে ওইখানে যাওয়ার জন্য।তখনই লিয়নের ফোন আসে।
__ গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।তুমি রেডি তো!
__ আমাকে নিতে আসতে আজকে না একা যেতে ভয় করছে।
__ মহু ফুল,চিন্তা করো না।আমি মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে কথা বলবো।আজকের মত আসো।রিয়াদ আমাকে যেতে দিচ্ছে না।
__ আচ্ছা!আমি গাড়িতে আসছি।
মহুয়া আস্তে আস্তে নিচে নেমে এলো।এসে দেখলো গাড়ি চলে এসেছে।সে ভালোমতো গাড়িতে বসলো।
গাড়ি ছুটছে নিজ গতিতে।লিয়ন ফোনে মহুয়ার সাথে কথা বলছে আর কাজ করছে।এখনও মহুয়ার সাথে কথা বলছে।
__ কত দূর আছো পাখি।
__ রিয়াদ ভাইদের বাসা থেকে ২০ মিনিট দূরে আছি।
__ তুমি ঠিক আছো তো?
__ হুম।
হঠাৎ একটা ট্রাক এসে গাড়িতে ধাক্কা দিল।মহুয়া চিৎকার করে উঠলো, 'আহহহহহ।'
লিয়ন ভয়ার্ত কন্ঠে বলল,
__ মহুয়া কি হয়েছে?কথা বলছো না কেন?
লিয়ন আর দেরি না করে জলদি বের হয়ে যায় বিয়ে বাড়ি থেকে।তার ভয় করছে।মহুয়ার কিছু হয় নি তো।
অ্যাক্সিডেন্ট স্পর্টে অনেক ভিড়।গাড়ির নিচে চাপা পড়ে আছে মহুয়া।রক্তে মাঝামাঝি পুরো শরীর।লিয়ন এখানে এসে মহুয়ার এই অবস্থা দেখে থমকে যায়।দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়।তার ভয়ে হাত পা কাঁপছে।সব দোষ তার।সে কেন মহুয়া কে একা আসতে দিল।কেন নিজে গিয়ে নিয়ে আসলো না।
ডক্টর বলেছেন মহুয়ার অবস্থা ক্রিটিক্যাল।বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম।লিয়নের পুরো পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছে।তার বাগানের ফুল ঝরে গিয়েছে এমন অবস্থা।
বাড়ির অনেকে এসেছেন।রিয়াদও নিজের বিয়ে রেখে এখানে এসেছে।মারিয়া আর মনিরা কেঁদে ভাসাচ্ছে।ডক্টর বলেছেন অপরেশন করতে হবে কিন্তু এতে বাঁচার চান্স খুব কম।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর...
অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।সবাই একসাথে উঠে দাঁড়াল।লিয়ন দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল।
— ডক্টর... আমার স্ত্রী কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?
ডাক্তার ক্লান্ত গলায় বললেন,
— আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। উনি অনেক রক্ত হারিয়েছেন। আগামী কয়েক ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
লিয়নের বুকটা ধক করে উঠল।
— আর... আমাদের বাচ্চা?
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।তারপর ধীরে বললেন,
— আমরা বাচ্চাটিকেও বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মায়ের জীবন।
কথাটা শুনে লিয়নের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।ডাক্তার আবার ভিতরে ঢুকে পড়লেন।
ডাক্তারের মুখ থেকে "অবস্থা খুবই সংকটজনক" কথাটা শুনেই লিয়নের বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।সে টলতে টলতে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তারপর ধীরে ধীরে মেঝেতে বসে পড়ল।
তার দু'চোখ বেয়ে অনবরত পানি ঝরছে।কাঁপা কণ্ঠে সে বলল,
— না... না... এটা হতে পারে না। আমার মহুয়ার কিছু হতে পারে না...
হঠাৎ করেই সে দু'হাতে নিজের মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
— আল্লাহ... আমার সব দোষ। আমি কেন ওকে একা আসতে দিলাম? কেন নিজে গিয়ে নিয়ে এলাম না? যদি আমি ওর সঙ্গে থাকতাম, আজ এমনটা হতো না...
সে নিজের মাথায় বারবার হাত মারতে লাগল।রিয়াদ দ্রুত এসে তাকে ধরে ফেলল।
— ভাই, নিজেকে সামলা।
লিয়ন চোখভরা জল নিয়ে রিয়াদের দিকে তাকাল।
— কীভাবে সামলাব? আমার মহুয়া ভেতরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমি কিছুই করতে পারছি না... কিছুই না!
সে অপারেশন থিয়েটারের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।দরজায় কাঁপা হাতে স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলল,
— মহুয়া... তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে, কোনোদিন ছেড়ে যাবে না। আজ কথা ভেঙো না, প্লিজ। একবার ফিরে এসো।
তার গলা ভেঙে যাচ্ছিল।
— হে আল্লাহ... আমার সন্তানকে আপনি যেভাবে ভালো মনে করেন সেভাবেই ফয়সালা করুন। কিন্তু আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে দিন। আমি সন্তান ছাড়াও বাঁচতে পারব, কিন্তু মহুয়াকে ছাড়া এক মুহূর্তও পারব না। ও-ই আমার পৃথিবী, ও-ই আমার ঘর, ও-ই আমার সবকিছু।
সে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।
— আমার আয়ু যদি বাকি থাকে, সেটা মহুয়াকে দিয়ে দিন। আমার সুখ, আমার হাসি, সব নিয়ে নিন। শুধু ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। আমি আর কিছু চাই না। আমি শুধু আমার মহুয়াকে চাই...
হাসপাতালের করিডোরে উপস্থিত সবার চোখ ভিজে উঠলো
লিয়নের মা কাঁদতে কাঁদতে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
— আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ, বাবা।
লিয়ন চোখ মুছেও থামাতে পারল না কান্না।
— আম্মু... আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। বিয়ের দিন আমি ওর হাত ধরে বলেছিলাম, "যতদিন বাঁচব, তোমার হাত ছাড়ব না।" আজ যদি ও চলে যায়... আমি সেই কথা রাখতে পারব না, আম্মু... আমি পারব না...
করিডোরজুড়ে তখন শুধু নিঃশব্দ কান্না, অপেক্ষা আর প্রার্থনা। অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা এখনও জ্বলছে, আর প্রতিটি সেকেন্ড লিয়নের কাছে যেন এক একটি অনন্তকাল।
সময় যেন থেমে গেছে।এক মিনিট... পাঁচ মিনিট... আধাঘণ্টা... তারপর এক ঘণ্টা...
লিয়নের কাছে প্রতিটি মুহূর্তই এক একটা বছরের মতো লাগছে।হঠাৎ অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল।দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে  ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।লিয়ন প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল।
কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— ডক্টর... আমার মহুয়া? ও এখন কেমন আছে? প্লিজ বলুন, ও ঠিক আছে তো?
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— অপারেশন শেষ হয়েছে। কিন্তু...
'কিন্তু' শব্দটা শুনেই লিয়নের বুক ধক করে উঠল।
— কিন্তু কী, ডক্টর? প্লিজ, কিছু লুকাবেন না।
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,
— উনি এখনও সংকটমুক্ত নন। আমরা অনেক কষ্টে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করেছি। তবে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে উনার জ্ঞান ফিরতে হবে।নয়তো!আর কখনো না।
লিয়নের চোখ আবার ভিজে উঠল।
— আমি... আমি কি একবার ওকে দেখতে পারি?
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড ভেবে মাথা নাড়লেন।
— দুই মিনিটের জন্য। তবে কোনো রকম উত্তেজিত করা যাবে না।
লিয়ন দ্রুত আইসিইউর সামনে গেল।কাঁচের ওপাশে সাদা বিছানায় নিথর হয়ে শুয়ে আছে মহুয়া।মুখে অক্সিজেন মাস্ক।হাতে স্যালাইন।শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ডেজ।
মনিটরের বিপ... বিপ... শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই।লিয়নের বুকটা হুহু করে উঠল।সে ধীরে ধীরে মহুয়ার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।হাতটা একদম ঠান্ডা।চোখের জল আর আটকে রাখতে পারল না।
— মহুয়া... শুনতে পাচ্ছো? আমি এসেছি। দেখো, আমি তোমার পাশেই আছি।
কোনো উত্তর নেই।লিয়ন কাঁপা হাতে মহুয়ার কপালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
— তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে... কোনোদিন ছেড়ে যাবে না। আমি এখনও সেই কথাটাই বিশ্বাস করি। তাই প্লিজ... ফিরে এসো।
তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।
— আমাদের ছোট ছোট ঝগড়াগুলো এখনও শেষ হয়নি। তুমি তো বলেছিলে, বাবু জন্মালে আমাকে ওর কাছে নালিশ করবে। এখন যদি তুমিই না থাকো, আমি কার কাছে হার মানব?
তার চোখের জল মহুয়ার হাতের ওপর টুপটুপ করে পড়তে লাগল।ঠিক তখনই...মনিটরের শব্দটা একটু বদলে গেল।
বিপ... বিপ...
লিয়ন চমকে উঠে মহুয়ার মুখের দিকে তাকাল।মহুয়ার ডান হাতের আঙুল যেন খুব সামান্য নড়ে উঠল।লিয়ন নিঃশ্বাস আটকে ফিসফিস করে বলল,
— মহুয়া...? তুমি কি শুনতে পাচ্ছো আমাকে...?
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে নার্সের কণ্ঠ ভেসে এলো—
— স্যার, দয়া করে বাইরে আসুন। রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
লিয়ন শেষবারের মতো মহুয়ার হাতটা আলতো করে চেপে ধরে বাইরে বেরিয়ে এল।
তার মনে একটাই আশা—মহুয়া লড়ছে। আর যতক্ষণ সে লড়ছে, ততক্ষণ লিয়নও আশা ছাড়বে না।
ডাক্তার এসে দেখলেন।
— মিস্টার লিয়ন... আমরা আপনার স্ত্রীকে আপাতত বিপদমুক্ত করতে পেরেছি। কিন্তু উনি এখনও সংকটমুক্ত নন। আগামী ৭২ ঘণ্টা আমাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
কথাটা শুনেই লিয়নের চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।সে আলহামদুলিল্লাহ বলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল।বারবার বলতে লাগল,
— আলহামদুলিল্লাহ... আমার মহুয়াকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শুকরিয়া, আলহামদুলিল্লাহ...
ডাক্তার আবার ডাকলেন,
— মিস্টার লিয়ন... আরেকটা কথা আছে।
লিয়ন চোখ মুছে ডাক্তারের দিকে তাকাল।ডাক্তারের কণ্ঠটা ভারী হয়ে উঠল।
— আমরা আপনার সন্তানকে বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুর্ঘটনায় ওর অনেক বেশি ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল। আমরা... আমরা ওকে আর ফিরিয়ে আনতে পারিনি। আমি খুবই দুঃখিত।
মুহূর্তেই লিয়নের মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল।সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হচ্ছে না।
কয়েক মুহূর্ত পর সে আস্তে করে বলল,
— আমার সন্তান... আল্লাহর কাছে আমানত ছিল... আল্লাহ আবার নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তারপর দু'হাত মুখে চাপা দিয়ে কেঁদে উঠল।
— বাবু... আমাকে একবারও আব্বু বলে ডাকতে পারলে না...
চারপাশে উপস্থিত সবাই চোখের জল মুছছিল।রিয়াদ এগিয়ে এসে লিয়নকে জড়িয়ে ধরল।অনেকক্ষণ পর লিয়ন নিজেকে সামলে নিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ডক্টর... একটা অনুরোধ।
— জি, বলুন।
— আমার স্ত্রীকে এই কথাটা এখনই বলবেন না। ও যখন পুরোপুরি সুস্থ হবে... তখন আমি নিজেই ওকে সব বলব। এই অবস্থায় ও যেন আর কোনো ধাক্কা না পায়।
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন,
— আমরাও সেটাই মনে করি। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো উনার সুস্থ হয়ে ওঠা।
মহুয়া নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে।সে তার হাতে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
— শোনো জান... আমাদের ছোট্ট পরিটা বা রাজপুত্রটা আল্লাহর কাছে চলে গেছে। কিন্তু তুমি আছো... তোমাকে আমি কখনো হারাতে চাই না। তুমি শুধু ফিরে এসো। আমরা একসাথে ওর জন্য দোয়া করব... আর বাকি জীবন একে অপরকে আগলে রাখব।
লিয়নের চোখ থেকে আবারও নীরব অশ্রু ঝরে পড়ল। হাসপাতালের করিডোরে তখন গভীর নীরবতা—একদিকে প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি, অন্যদিকে সন্তানকে হারানোর অপূরণীয় শোক।
চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন