#এক_বনে_দুই_বাঘ
নক্ষত্রদের মৃত্যু নেই’
১১.
®রোজা রহমান নাঈমা
‘
শশী সিনহা, বাবা মায়ের যেমন আদরের, তেমনই দুই ভাইয়ের একটি মাত্রই বোন। বড় ভাই সৌরজ সিনহা আর ছোট ভাই মিহির সিনহা। শশী মেয়েটি ভীষণ আদুরে। বয়সটা অল্প হলেও, শশীর জানার কৌতূহল আর বোঝার পরিধি বিস্ময়কর রকম বিস্তৃত। অনেক সময় মনে হয়, বয়সটা তার মনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। বাচ্চসুলভ মুখশ্রীর আড়ালে আছে অদ্ভুত তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি আর বুদ্ধিদীপ্ততা। চঞ্চল স্বভাব, ক্ষুরধার উপস্থিতবুদ্ধি আর পাকনা পাকনা ও দুষ্টু কথাবার্তায় সে মুহূর্তেই মানুষের মন জিতে নিতে পারে।
শুক্রবারে বাবার সাথে এসে বড় খালার বাড়ি থেকে আর ফেরেনি সে। বাবার কাছে জিদ ধরে খালার বাড়িতে থেকে গেছে। কিছুদিন থাকবেও। কারণ তার পড়াশোনার চাপ কম। সবে অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। আর এত পড়ে হবে কী? সে তো তার স্বপ্ন নিয়ে বেশি সক্রিয়। যে স্বপ্ন নিজের মাঝে লালন করে, সেই স্বপ্নের শিখরে পৌঁছানো তার একমাত্র উদ্দেশ্য। স্বপ্ন তাকে একদিন বিশ্বমানের আর্টিস্টদের তালিকায় নিয়ে যাবে। তার নামের আগে যুক্ত হবে— ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট।
সকালের আলো ফুটেছে ঘণ্টাখানি আগে। আজ কুয়াশার ভিড় কম। দ্রুত সূর্য উঠবে বোধহয়। শশীর অভ্যাস সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা। বেশ কিছুক্ষণ পূর্বে ঘুম ছেড়ে সে ফ্রেশ হয়েছে। এরপর মালিথা ভিলার ছাদ মুখো হয়েছে। সকাল সকাল প্রকৃতির স্বাদ নিতে বেরিয়েছে। সকালের মন মাতানো মৃদু আলো-বাতাস না খেলে তার শরীর ও মন চনমনে হয়না৷ শহুরে শীতের সকাল তার দেখতে মন্দ লাগে না। এছাড়া চোখজোড়া সামান্য কুয়াশা ঘেরা সকাল ও প্রকৃতি বিলাস পেলে ফুরফুরে হয়ে যাবে। এতে তার ছবি আঁকার প্রতি মন আরো বেশি করে টানবে। অসম্পূর্ণ চিত্রকর্মটিকে সম্পূর্ণ রূপ দেওয়া বাকি আছে। তার পূর্বে একটু হাঁটাহাঁটির প্রয়োজন।
মালিথা ভিলার ছাদে উঠলে শশীর চোখজোড়া এমনিতেই জুড়িয়ে যায়। শিশির ভাইদের বাড়ির ছাদটা ভীষণ সুন্দর। দেখলেই মনে হয় রোজই যত্ন করা হয়। আয়তনে প্রায় একটি ছোট মাঠের সমান বিস্তৃত ছাদটি পরিপাটি করে ভাগ করা। এক পাশে কাঠের নকশা করা পিঠ বাঁধানো বেঞ্চ, আরামদায়ক চেয়ার রেখে সুন্দর সাজসজ্জায় সিটিং এরিয়া। অন্য পাশে বিস্তৃত গার্ডেন এরিয়া। সারি সারি টবে শীতকালীন ফুলগুলো আপন সৌন্দর্যে ফুটে আছে— গাঁদা, ডালিয়া, নয়নতারা, চন্দ্রমল্লিকা, রঙিন পপি ইত্যাদি। গাছের শিশিরভেজা পাপড়িগুলো সকালের আলোয় কাঁচের টুকরোর মতো ঝিলমিল করছে। মৃদু হাওয়ায় ফুলের গন্ধ এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
শশী এ কয় দিনই হলো নিয়ম করে ছাদে ঘুরতে আসে। তাদের বাড়ির ছাদে সে এতটাও আনন্দ পায় না, যতটা এখানে পেয়েছে৷ তাদের বাড়ির ছাদটাতো যত্ন নেবার মতো মানুষই নেই! অযত্নেই বেশি থাকে। কোনো কোনো সময় সে নিলেও, তার বড় ভাই দুটো কোনোদিনও তাকিয়ে দেখে না। অথচ এ বাড়ির ছাদটা কত পরিপাটি! মালিকে দিয়ে নিয়মিত যত্ন করানো হয়৷ এমন অপূর্ব সুন্দর পরিপাটি ছাদ তাদের থাকলে, সে সারাদিন-রাত ছাদেই কাটিয়ে দিত। বিশেষ করে তার আঁকাআঁকির জন্য।
শশী এ বাড়ির সদস্যদের মাঝে ছাদে আসার অভ্যাসটা বিশেষ ভাবে খুঁজে পায়নি। সবাই ফ্রন্টইয়ার্ডের বাগানে বেশি বসে বলে মনে হয়েছে। কী আশ্চর্য! এত সুন্দর ছাদের ওরা নিয়মিত কেন আসে না? শশী ভাবনার মাঝে ছাদে পা চালাচ্ছে। হাঁটা-হাঁটির মাঝে বাগান পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো শিশির ভেজা ফুলগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে। ফুলের সুঘ্রাণে মাতাল মাতাল লাগছে। এমন প্রকৃতির স্বাদ পেয়ে কিশোরী মনটা পাখির ডানার মতো ঝাপটাতে ইচ্ছে করছে। সে যদি ভোরের পাখি হতো? কেমন হতো? ওই যে পুবাকাশে উদিত হওয়া কমলাটে বর্ণ ধারণ করা কুসুমের মতো সূর্যটার ওপর দিয়ে যদি ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দিয়ে আকাশ ছুঁতে পারত? কেমন হতো তবে?
শশীর মনে হলো এখানে বসে, এখানের শহুরে প্রকৃতির একটা ছবি তার ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে তুলে নেওয়া উচিত৷ এমন সুন্দর সকাল সে আগে দেখেনি বলে মনে হচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে শহুরে পাখিগুলো কিচিরমিচির কলরবে ডানা মেলেছে। আশেপাশের অট্টালিকা ছাড়িয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছের পাতায় কিছু ভোরের কাক ডেকে লাফালাফি করছে। কুয়াশারা যেভাবে ঘিরে রেখেছিল, তারা ক্রমেই সরে যাচ্ছে বলে দূরের গাছগুলোও স্পষ্ট হচ্ছে। কী সুন্দর লাগছে! শশী এতদিন জানতো গ্রামের শীতের সকাল সবচেয়ে বেশি মনোরম ও মুগ্ধকর হয়, কিন্তু শহরের শীতের সকালও যে এতটা সুন্দর হয়— শশীর জানা ছিল না।
শশী আঁকবে। তার তুলির আঁচড়ে এতসুন্দর দৃশ্যটাকে বন্দি করতে না পারলে হবেই না! নিজের কক্ষের দেয়ালে টাঙিয়ে রাখা যাবে। ভেবেই শশী রেলিঙ ছেড়ে দিয়ে নিচের উদ্দেশ্যে দ্রুত পায়ে যেতে গিয়ে ডাক পেল,
“ শশী?”
শশী থমকে গেল। কেউ কি নেশা করে তাকে ডাকল? এমন শোনাল কেন? নাকি ভ্রম তার? কণ্ঠটা তো নীহার ভাইয়ের মনে হলো৷ কিন্তু নীহার ভাই কি নেশা করে? সকাল সকাল নেশা করতে ছাদে এসেছে নাকি? শশী এতক্ষণ এলো, অথচ বিষয়টা দেখল না কেন! শশী বুঝে উঠতে না পেরে যখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আশেপাশে নজর ঘোরাতে থাকল, তখন পুনরায় শুনতে পেল,
“ শুধু প্রকৃতির দৃশ্য আঁকলে হবে? আমাকে কবে আঁকছ?”
শশীর ভ্রম ছাড়ে। এটা সত্যি নীহার ভাই! তবে কথা বলছে কোথায়! শশী চিলেকোঠার ওপর পাশে এগিয়ে গেল। চিলেকোঠার এ পাশটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। বসার ব্যবস্থাও নেই। তবে সারি সারি ছাদের রেলিং ঘেঁষে কয়েকটা টব সাজানো। তাতে পাতাবাহার গাছ লাগানো। আর এ পাশটা হলো দক্ষিণ পাশ। দখিনা হাওয়া এসে শশীকে ছুঁয়ে দিল কিনা বোঝা গেল না, তবে শশীকে যা ছুঁয়ে দিল তা সে আমরণও ভুলতে পারবে কিনা বলাটা মুশকিল!
এত লজ্জা শশী কোথায় রাখবে? এত লজ্জা এসে শশীকে কেন ছুঁলো? শশী এমনিতেই নীহার ভাইকে দেখলে লজ্জায় মরে যায়। তারওপর আজ যা দেখল, তাতে শশীর তো মুখ দেখানোই দুষ্কর হয়ে গেল! শশী লজ্জাতে চোখ খিঁচিয়ে নিল। চরম লজ্জাজনক অবস্থায় রয়েছে নীহার ভাই। ইশ! শশী কেন এলো এদিকে! সব নীহার ভাইয়ের দোষ। পুরুষটা তাকে না আটকালে সে তো আসত না!
শশী পুনরায় ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। নীহার জিম করছে৷ শরীরে জিমের সময় নীহার ট্যাঙ্ক টপ পরেছে। যেটাতে বগলের অনেক নিচ অবধি দেখা যাচ্ছে। আর পরনে আছে জিম শর্টস। কিন্তু শশী জিমের ওই দুই বিশেষ পোশাককে ধরে নিল, স্যান্ডো গেঞ্জি আর আন্ডারওয়্যার। যা শশীর কাছে অশ্লীল পোশাক বলে বিবেচিত হলো। ফলস্বরূপ শশী নীহারকে ওই অবস্থায় দেখে লজ্জায় মরে যাচ্ছে৷
নীহার ছাদে একটি শক্ত বেঞ্চের ওপর চিত হয়ে পিঠ ফেলে শুয়ে বারবেল দিয়ে বেঞ্চ প্রেস করছে। বুক থেকে সোজাসুজি উপর তুলছে আবার নিচে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে তার দুই বাহুর পেশি ফুলেফেঁপে উঠছে, রগগুলো স্পষ্টভাবে ফুলে ফুলে দৃশ্যমান হচ্ছে। চওড়া বুকটাও দু’হাত ও বাহুর সাথে তাল মিলিয়ে ওঠানামা করছে৷ ভীষণ শক্তি সঞ্চয় করছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শশী তো শীতে শাল মুড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ নীহার ভাইয়ের শরীরে ঘামের বিন্দু জমে ভিজে উঠেছে। চোয়ালদ্বয়ও শক্ত হয়ে আছে।
শশীর তা দেখে মনে হলো, এই অবস্থায় কথা বলেনি নীহার ভাই। তার সাথে কথা বলেই বারবেল প্রেস শুরু করেছে। এবং শশী পাক্কা এক মিনিট ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে পার করে দিল তবুও নীহার কথা বলল না। শশীও হা করে দাঁড়িয়ে থেকে নীহারের শারীরিক কসরত করা দেখছে। হঠাৎ শশীর চোখ গেল বারবেল প্লেটে খোদাই করে লেখা ওজন সংখ্যার দিকে। একটি স্টিল বারের সাথে দুইপাশে প্লেট সেট করা। শশী দুই পাশের প্লেট গুলোর ওজন সংখ্যা হিসাব করে পেল ১৫+১৫= ৩০ কেজি এবং বারের ওজন ২০কেজি, অর্থাৎ ৩০+২০= ৫০কেজি! শশীর চোখ হলো চড়কগাছ। সর্বনাশ! নীহার ভাই পঞ্চাশ কেজি ওজন ওভাবে নিয়ে তোলা-নামা করছে!
নীহার এক মিনিট সময় নিয়ে দশবার বেঞ্চ প্রেস করে বিশ্রামে এলো কিছুক্ষণের জন্য। বারবেলটা পেছনে একটি লোহার রডের তৈরি বারবেল র্যাকে রেখেছে। সে সময়টুকুতে শশীর উপস্থিতির দিকে দৃষ্টি ফেলল। দেখল শশী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। নীহার তখন কথা বলল,
“ ওভাবে আছ কেন, শশী? অদ্ভুত লাগছে তোমাকে।”
নীহার জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস চালাচ্ছে। শশীর সংবিৎ ফেরে সে কথায়। তখন সে লজ্জায় পাশ ফিরে দূরে তাকায়৷ গালজোড়া তার আপনেই লালাভ হয়ে এলো মনে হলো। লজ্জারই একটা প্রলেপ তার মুখে লেপ্টে গেছে। শশীকে ওমন লজ্জা পেতে দেখে ফেলল মনে হয় নীহার। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“ হঠাৎ লজ্জায় রঙিন হলে যে? লজ্জা পাবার মতো কথা বললাম?”
শশী সে কথার কোনো উত্তরই দিতে পারল না। নীহার ভাইকে ওমন পোশাকে দেখা দুষ্কর হয়ে গেছে তার। উরু থেকে সম্পূর্ণ দুই পায়ের কালো লোম দেখা যাচ্ছে। ঘামে লেপ্টে আছে ফর্সা পায়ের সাথে। উরু পড়ে আছে বেঞ্চের বাইরে। কারণ বেঞ্চটা বেশি লম্বা না। শুধু দেহটা আটবে এমন মাপের। ফলে দুই পা ফাঁকা হয়ে বাইরে আছে৷ বড় অদ্ভুত লাগছে দেখতে। তাই নীহারের দিকে চোখ না ঘুরিয়েই শশী বলল,
“ নীহার ভাই, আপনি ওই পঞ্চাশ কেজি ওভাবে তোলা-নামা করলেন!”
নীহার পুনরায় বেঞ্চ প্রেস করা শুরু করেছে। শশী উত্তর না পেয়ে পুনরায় ঘুরে তাকাল। সেই একইভাবে দশবার বেঞ্চ প্রেস করে নীহার পুনরায় থামল। আবারও শশীর দিকে তাকাল। শশী সঙ্গে সঙ্গে চোখ ঘুরিয়ে দূরে তাকাল। নীহারের চোখে তাকানো চরম দুষ্কর তার জন্য। শশীর অদ্ভুত আচরণ ধরতে পারল না নীহার। নীহার এবার বারবেল রেখে দিল র্যাকে। নিজের কায়দায় বারবেল রেখে উঠে বসল সে। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালিয়ে বেঞ্চ থেকে ঝুঁকে দুই হাতে তুলে নিল ১০+১০=২০ কেজি ওজনের ডাম্বেল। দুইহাতে ডাম্বেল ধরে শশীর কথার উত্তর করল,
“ ৬০ কেজি পর্যন্ত পারি, শশী।”
শশীর চোখ বড় বড় হলো শুনে। পাকনা শশীর কী মনে হলো কে জানে! সে হঠাৎই নিজের শরীরের দিকে তাকাল। সে চিকন৷ সবাইই বলে। তবে রোগা নয়৷ শশীর ওজন মাপা আছে। লম্বা হিসাবে ৩৮ কেজি ওজন তার। শশী কেন যেন নিজের দিকে তাকিয়ে নীহারের দিকে ঘুরে তাকাল। হতভম্ব চেহারা নিয়ে আবার অদ্ভুত এক ভাবনাও ভেবে বসল। নীহার ভাই তো তাকে এক হাতেই তুলে নিতে পারবে! শশী ঢোক গিলল।
ততক্ষণে নীহার নিজের দুই বাহুর দিকে চোখ রেখেই ডাম্বেল তুলছে। হাত দুটো কাঁধ বরাবর উঠতেই বাহুর পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুলে উঠছে। ঘামের বিন্দুগুলো বাহু বেয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে। নিয়মিত কয়েক মাসের অনুশীলনে পেশিগুলো দৃঢ় ও সুগঠিত হয়ে উঠেছে। বাইসেপসও যথেষ্ট পরিণত হয়েছে। তার সুঠাম দেহগঠনের সঙ্গে সেগুলো অনায়াসে মিশে আকর্ষণীয় সৌন্দর্য তৈরি করেছে। বয়সের সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য, পেশির গঠন আর বাইসেপসের সামঞ্জস্য বেশ চোখে পড়ার মতো।
শশী খেয়াল করল এখানে বেশ কিছু জিমের সরঞ্জাম রয়েছে। সবগুলোর নাম শশীর জানা নেই। তবে যেটার কাজ করছে সেটার নাম ডাম্বেল শশী জানে। জিমের পরিচিত একটি সরঞ্জাম। ছাদের এপাশটাকে নীহার ভাই জিমনেশিয়াম বানিয়ে নিয়েছে। নীহার যখন মনোযোগ দিয়ে বাইসেপ কার্ল করছে, তখন শশী নীহারকে নিবিষ্টে পর্যবেক্ষণ করছে। পর্যবেক্ষণ করতে করতে শশীর দম আটকে আসছে।
নীহারই আবার কথা বলল,
“ কী ভাবছ দাঁড়িয়ে, শশী?”
“ আপনি না জিমনেশিয়ামে যেতেন?”
“ আজ যাইনি।”
কাজ চালিয়ে যেতে যেতে শশীর দিকে মুখ তুলে বলল,
“ মাঝারি কসরত বাড়িতেই করার চেষ্টা করছি। এগুলো তুষার ভাইয়ের। ছিলোই, ভাবলাম কাজে লাগাই।”
শশীর দিকে যখনই নীহার মুখ তুলে তাকিয়েছে, তখনই নীহারের দু’চোখে আঁটকে গেছে শশী। কী অদ্ভুত জ্বলজ্বলে চোখ পুরুষটির! শশীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এতটাই বেশি যে, সে নীহারের চোখ নিয়ে তৎক্ষণাৎ গবেষণা করে ফেলল।
শশীর মনে হলো পুরুষটির চোখের মনি জ্বলজ্বলে বাদামী রঙের৷ যেটাকে মধু রঙের বলা যায়৷ পূর্বের আকাশে সূর্য মিঠা রোদ ছড়িয়েছে। সেই রোদ এসে নীহারের ওপর পড়েছে। সকালের ওমন সুন্দর রোদ পুরুষটার চোখেও ছড়িয়েছে। চোখে রোদ পড়ায় ওই মধুর মতো বাদামী রঙা চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কাঁচের মার্বেল চকচক করছে নাকি? আর কী তীক্ষ্ণ সেই চোখজোড়া! শক্ত চোয়ালের সাথে তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার সামঞ্জস্যতা এবং মোটা কালো দুই ভ্রুর সৌন্দর্যে শশীর মনে হলো, ওই চোখজোড়া শুধুই চোখ নয়। ওগুলো বিশেষ কোনো উপমা পাবার চোখ। তীক্ষ্ণ, গভীর এবং শিকারি নজর৷ শশীর নেশায় বুদ হয়ে গেল। নেশায় বুদ হয়ে শশী একটি নাম দিল,
“ বাজপাখি।”
ওই চোখজোড়া বাজপাখির সমতূল্য। শশী সে চোখে তাকিয়ে থাকলেও ওই চোখজোড়া তার দিকে তাকিয়ে নেই। নীহার নিজের কাজ করতে করতে বলল,
“ পায়ের নূপুরগুলো সুন্দর তোমার৷ শব্দ ভালো দেয়।”
শশী লজ্জায় রাঙা হলো পুনরায়। তার পায়ের নূপুরের শব্দেই বুঝি নীহার ভাই তার উপস্থিতি বুঝেছে! এর অর্থ নীহার ভাই তাকে পর্যবেক্ষণ করে! শশী নীহারের দিকে তাকিয়েই বলল,
“ আপনি কখন এসেছেন?”
“ তোমার আসার কিছুক্ষণ আগে।”
নীহার ডাম্বেল রাখল। হাতজোরা কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সামনে থেকে পানির ফ্লাস্ক তুকে নিল। সময় নিয়ে পানি পান করল সে। শশী নিবিষ্টে চেয়ে আছে। নীহারের পানি পান করার একটা বিশেষত শশী খেয়াল করছে। নীহার ঢকঢক করে পানি পান করছে না৷ প্রথমে মুখে পানি নিচ্ছে, এরপর তা মুখের ভেতর নাড়াচাড়া করে চিবানোর মতো করে পান করছে। এটার কোনো উপকারীতা আছে কিনা শশীর জানা নেই। তবে বিষয়টা শশীর ভালো লাগছে দেখতে৷ নীহার শেষ ঢোকের পানি মুখে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। তখনই উরুতে পরে থাকা শর্টসে নীহারকে দেখতে আবার লজ্জা পেল। কী অদ্ভুত পরিচ্ছদ! শশী লজ্জা পাচ্ছে তো! শশী পাশ ফিরে অন্যদিকে এলোমেলো ভাবে তাকাল।
নীহার যেন ঠিক তখনই শশীর লজ্জা পাবার কারণটা ধরতে পারল। মাথা নামিয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে শশীর অবস্থা বু্ঝে কেন যেন ভীষণ হাসি পেল। হাসিটাকে সে সংবরণ করল ঠোঁট চেপে। পানি গিলে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“ শশী তুমি আমার উপর লজ্জা পাচ্ছ?”
শুরু হলো বোধহয় বেফাঁস কথা৷ এরা যে কী পরিমাণ বেফাঁস কথা বলতে পারে শশী জানে। তার শিশির ভাই আর নীহার ভাই যখন একসাথে হয় তখনের মুহূর্তে শশীর জানা আছে৷ শশী এবার পেছন ঘুরে তাকাল। চোখমুখ খিঁচিয়ে তাকিয়ে লজ্জার হাসি ফোটাল। শশীর কাণ্ডে নীহার বেশ মজা পেল। শিশিরের খালাতো বোন মানে তারও খালাতো বোন। আর সেই খালোতো বোনের সূত্র ধরে নীহার বহুত ইয়ারকি মারে শশীর সাথে৷ সেই ইয়ারকির সম্পর্ক চালিয়ে নিতে নীহার বলল,
“ লজ্জা পেও না, শশী। আমি ফুলি নেইকিড্ নই।”
শশীর কান গরম হয়ে গেল। সে প্রতিবাদ করে বলল,
“ মোটেও আমি এমনটা ভাবছি না, নীহার ভাই!”
“ ওকে, ফাইন। তবে তুমি ঘুরে তাকাতে পারো।”
নীহার পেছন ফিরে আবার নিজের জায়গায় এগিয়ে গেল কথাটা বলে। শশী নীহারের অবস্থান সরে গেছে বুঝে পেছন ফিরে তাকাল। দক্ষিণের রেলিঙয়ের দিকে এগিয়ে গেল৷ লজ্জা পেলেও নীহার ভাইয়ের সঙ্গে তার কখনোই খারাপ লাগেনা। তাই শশী নিচে গেল না। নীহার পানির বোতল রেখে ঝুঁকে হাতে ১০ কেজি ওজনের কেটলবেল তুলে নিল। দুইপা কিছুটা ফাঁকা করে দাঁড়াল। এরপর কেটলবেল সঠিক পজিশন অনুযায়ী প্রশস্ত বুকের কাছে ধরে স্কোয়াট করা শুরু করল। এটা নীহার পায়ের পেশী ও কোর শক্তিশালী এবং কার্ডিওভাসকুলার ফিটনেস উন্নত করার জন্য অনুশীলন করছে৷
শশী রেলিঙে হেলান দিয়ে নীহারের শারীরিক কসরত করা মনোযোগ দিয়ে দেখছে৷ তার মন্দ লাগছে না৷ সে শুধু ভেবে কুল পাচ্ছে না, একটা পুরুষ নিজের শরীরের ওপর ঠিক কতটা কসরত করতে সক্ষম হয়! এই অবধি নীহারকে যত রকম শারীরিক কসরত করতে দেখল, তাতেই শশীর নিঃশ্বাস আপনাআপনিই আটকে আসছে যেন। শশী জানে, নীহার নেভিতে যাবে। অফিসার ক্যাডেট হতে চলেছে। একজন অফিসার ক্যাডেটকে নাকি কঠিন থেকে কঠিনতম শারীরিক কসরতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাহলে এগুলো কি তার তুলনায় খুবই সামান্য? নাকি কেবল প্রাথমিক ধাপ? এর চেয়েও কি আরও কঠোর, আরও দুরূহ শারীরিক কসরতের মুখোমুখি হতে হবে তাকে?
নীহারের শরীর ঘেমে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। একমিনিট সময় নিয়ে নীহার স্কোয়াট করে ছাদের মেঝেতে কেটলবেল রেখে সোজা দাঁড়িয়ে গেল। দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস চালাল দাঁড়িয়ে থেকে। শশী শুধু অবাক হয়ে নীহারকে দেখছে। কতটা পরিবর্তন ঠেকছে যখনই সে শারীরিক কসরতে মনোযোগী হচ্ছে। নিজের কাজ কি সে এতটাই গুরুত্ব দিয়ে করে? দায়িত্ববান! শশীর জানার পরিধি থেকে নেভি অফিসার সম্পর্কে যতটুকু জানে, তাতেই শশীর মনে হলো— এই পুরুষ নিজের স্বপ্ন বৃথা যেতে দেবে না। জিতেই আসবে। শশী তার সামনে একজন ভবিষ্যত নেভি অফিসারকে দেখছে। যে দেশের একজন দায়িত্ববান নৌ যোদ্ধা হবে৷
শশী হঠাৎ বলল,
“ আপনাকে আরো কঠিন কঠিন কসরত করতে হতে পারে, নীহার ভাই?”
নীহার দাঁড়িয়ে শরীর নিয়ন্ত্রণ করছিল। শশীর প্রশ্ন পেয়ে নিজের কাজ করতে করতেই বলল,
“ তুমি অনুমানও করতে পারো না তা, শশী।”
নীহারের কথাটাতে কিছু ছিল। যা শুনে মনে হলো, নীহার সেসব সব পেরিয়ে জিতে আসতেও প্রস্তুত। শশী তখন বলল,
“ তবুও আপনি পারবেন, নীহার ভাই।”
নীহার থেমে গেল। শশীর দিকে সোজাসুজি ভাবে তাকাল। মেয়েটা ছোট হলেও কথাগুলো বলে বড়দের মতো। শশীর এমন সাহস দেওয়া কথা শুনে নীহারের ভালোই লাগল। সে ঠোঁটে কোণে একটু হাসি এনে বলল,
“ আমার কথা ছাড়ো। তোমার বলো। শুনেছি, তোমার স্বপ্ন নাকি ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট হওয়া?”
শশী চট করে চঞ্চল হয়ে উঠল। তার স্বপ্ন নিয়ে কেউ কথা বললে সে ভীষণ আনন্দিত হয়৷ ছটফটে ভঙ্গিতে বলল,
“ হ্যাঁ, একদিন আমার নামের আগে আমি এটা বসতে দেখতে চাই। অন্যরা আমার নামের আগে ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট এড করবে৷”
নীহার শুনল। মাথা উপর-নিচ হালকাভাবে নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। পুনরায় ঝুঁকে কেটলবেল তুলে নিল হাতে। মুখে বলল,
“ তোমাকে ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট শশী সিনহা বলে সম্বোধন করার জন্য আমি অপেক্ষা করব, শশী।”
নীহার কথাটা বলে কেটলবেল তুলে ওভারহেড প্রেস করতে শুরু করল। এদিকে শশী থমকে রইল। নীহারের কথাটা শশীর শরীরের ভেতর কেমন শিরশিরে অনুভূতি দিল। কথাটার মাঝে কী ছিল জানে না শশী, শুধু শশীর মনে হলো তার স্বপ্ন শিখরে পৌঁছানোর মনোবাসনা আরো দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেল৷ নীহার ভাইয়ের মুখে এমন সম্বোধন শোনার জন্য হলেও শশী নিজের স্বপ্নকে এখন আরো বেশি করে যত্ন করবে৷
নীহার নিজের কাজ করতে করতে শশীর চঞ্চলতা দেখল। শশীর পাকা পাকা কথাতে মনে হয় সে একটি ইঁচড়েপাকা মেয়ে। আবার যখন চঞ্চল হয়ে ওঠে, তখন মনে হয় সে একটি পাখির ছানা৷ এই এখন যেমন ভীষণ আদুরে লাগছে শশীকে দেখতে৷ বাচ্চা একটা মেয়ে৷ শশীর দিকে তাকিয়ে থেকে নীহার ওভারহেড প্রেস করল এক মিনিট। থেমে কেটলবেল রেখে শরীর নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল। একটু হেঁটে এগিয়ে এসে শশীকে উদ্দেশ্য করে ডান হাতটা তুলে তর্জনী আঙুলের নির্দেশে দেখিয়ে বলল,
“ ওইদিকের নারকেল গাছটির দিকে দেখো, শশী।”
শশী প্রথমে নীহারের চোখের দিকে তাকাল। এরপর হাতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকাল৷ শশী তাকালে নীহার বলল,
“ কী দেখছ?”
শশী তাকিয়ে নারকেল গাছটা পর্যবেক্ষণ করল। অতিরিক্ত দূরেও নয় আবার কাছেও নয়৷ ছাদ থেকে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। ঝাকড়া একটি নারকেল গাছের পাতার সাথে ঝুলে ঝুলে আছে বাবুইপাখির বাসা৷ বেশ অনেকগুলো৷ কী সুন্দর যে দেখতে লাগছে বাসাগুলো নারকেল গাছের সবুজ পাতার সাথে অসম্ভব প্রাকৃতিক কায়দায় ঝুলে থাকতে দেখতে! শহরের বড় বড় অট্টালিকা ছেড়ে ওই গাছের পাতার নিচে আশ্রয়স্থল বানানো বাবুইপাখি শশীর ভীষণ প্রিয়৷ শশী লাফিয়ে উঠল। নীহার ওর পেছনে দাঁড়িয়ে। তবে দূরত্ব আছে। শশী বলে উঠল,
“ বাবুইপাখির বাসা, নীহার ভাই!”
শশী কথাটা বলে পেছন ঘুরে নীহারের দিকে তাকাল। নীহারের ঠোঁটের কোণে হাসি। শশী পুনরায় বলল,
“ বাবুইপাখি ভীষণ সুন্দর, আমার ভীষণ প্রিয়, নীহার ভাই।”
“ তুমিও একটি বাবুইপাখি, শশী।”
নীহারের কথায় শশীর লাফানো থেমে গেল তৎক্ষণাৎ৷ শশীর বুকের ভেতর কেউ যেন ড্রাম বাজাচ্ছে। দ্রিম দ্রিম শব্দ হচ্ছে সেখানে। নীহার ভাই কী বলল ওটা! কী বলল! শশী বাক হারিয়ে থমকে আছে। যেন সে একটি জড়বস্তু। তার দেহে প্রাণ নেই। শশী নিষ্পলক নীহারের চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনোরকমই পলক পড়তে দেখছে না নীহার। ভ্রু কুঁচকে নীহার শশীর কপালের ওপর বাঁ-হাতের তর্জনী আঙুল দিয়ে টোকা দিয়ে ঠেলে দিল। তাতে শশীর মাথাটা পেছনে সরল কিঞ্চিৎ। শশীর সংবিৎ ফিরল। নীহার বলল,
“ হোয়াট হ্যাপেন্ড? জড়বস্তু হয়ে গেলে কেন?”
শশী ঠিক কেমন রিয়াকশন দেবে বুঝে উঠছে না। ওর কী বলা উচিত আর করা উচিত কিছুই বুঝছে না। নীহার ভাই তাকে বাবুইপাখির সাথে তুলনা দিল! অর্থাৎ সেও বাবুইপাখির মতো! শশী আজ না নিঃশ্বাস আটকে মারা যায়৷ শশীর কোনো কথাই আসল না শুধু এক প্রশ্ন করার করার মতো শব্দ ছাড়া। আশ্চর্যান্বিতে বলল,
“বাবুইপাখি?”
“ হ্যাঁ, তুমি।”
নীহার শশীর পেছন থেকে পুনরায় সরে এলো। নিজের জায়গায় ফিরে নীহার এবার শরীর থেকে টান দিয়ে ঘামে ভেজা গেঞ্জিটা খুলে ফেলল৷ এতে নীহারের বুকের লোম সম্পূর্ণ দৃশ্যমান হলো। দৃশ্যমান হলো প্রশস্ত ও কঠিন বুক, কিঞ্চিত ভাজ হয়ে ওঠা পেট। মেদহীন ফর্সা শরীরের দিকে চোখ পড়তেই শশী লজ্জায় থমকে গেল। নীহারের নজর যেন শশীতে নেই। সে তার অনুশীলনে ভীষণ মনোযোগী৷ নীহার গেঞ্জি খুলে ছাদের মেঝেতে ঝুঁকে দুইহাত রেখে পুস-আপ করার পজিশন নিল। দুই পা তুলে দিয়েছে বেঞ্চের ওপর।
নীহার যখন ধীরে ধীরে পুস-আপ করছে শশীর তা দেখতে দেখতে শরীরে ঘাম এসে গেল। সূর্যটা রোদ ছড়িয়েছে৷ সেই রোদে ওই পুরুষের হলুদেটে ফর্সা গায়ের ঘামগুলো চিকচিক করছে৷ চুলগুলো কপালে এসে দাপাদাপি করতে গিয়ে ঘামের সাথে আটকে গেছে৷ হাত, পা, বুক, পিঠ, পেট সবকিছু পুস-আপ করার তালে তাল মিলিয়ে ফুলেফেঁপে উঠছে। মোটা মোটা শিরাগুলো ফুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পরনে শুধু একটুকরো কাপড়।
শশী নীহারকে ওই অবস্থায় আর দেখতে পারল না৷ ওর হাঁসফাঁস হতে লাগল৷ এই পুরুষকে এভাবে দেখা ঘোর অপরাধ। তার জন্য সর্বনাশ৷ শশী নিজের সর্বনাশ নিজেই করে ফেলেছে৷ সেই সর্বনাশের পর শশী বহু কষ্টে মুখে একটু শব্দ বের করল— যা ছিল,
“ আপনি সামান্য একটুকরো পোশাক পরে জিম করবেন না আর, নীহার ভাই। আমি রোজ ছাদে আসব।”
শশী বলতে পারল কী পারল না, তার পা চলল নিচের উদ্দেশ্যে। আর সেই কথা কানে যেতেই নীহার মুখ থুবড়ে পড়তে গিয়েও পড়ল না। নিজেকে দুইহাতে বাঁচিয়ে নিয়ে সে হতভম্ব হয়ে শশীর দৌড়ে ছাদ ছাড়া দেখল শুধু। সে এখনও পুস-আপ করা পজিশনে। শুধু মুখটা হতবাক হয়ে চেয়ে আছে সে পথে। এক টুকরো পোশাক!
নীহার বেঞ্চে পা রেখে দিয়েই নিজেকে ঘুরিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। শুধু মাথাটা তুলে তার একটুকরো পোশাকের দিকে তাকাল। তারপর শশীর বলাটাকে পুনরায় খেয়াল করল। এরপর যা করল— তা হলো নীহার দুইহাত নিজের দুইচোখের ওপর রেখে শব্দ করে হেসে উঠল৷ শরীর কাঁপিয়ে হো হো করে। হাসতে হাসতে শুধু শশীর কথাটাই মনে পড়ছে। আরো দ্বিগুণ হাসি পাচ্ছে তখন৷
.
সকালের চা নাস্তা খেতে খেতে জাকির মালিথার পত্রিকা পড়া নিত্যদিনের অভ্যাস। আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি। নিজে পত্রিকার মাঝে ডুবে আছেন৷ লিভিংয়ের সোফায় বসে তিনি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ছাপা সংবাদ পড়ছেন। আজ চারবছর ধরে সেগুলো নতুন না লাগলেও, বিস্মিত বোধ হওয়া কম হয়না। জাকির মালিথা শুধু বিস্মিত হয়ে থমকে থাকেন৷ অনেক কিছু মনে হয়, যা তিনি মুখে প্রকাশ করেন না। আর তিনি প্রকাশ করতে না পারাটাকেই মনে করেন সুস্থ আছেন। নয়তো তার সুস্থতার মা-বাপকে অবধি লাশ হয়ে যেতে হবে। এমনটাই ধারণা করেন তিনি। সেদিন তুহিনের সাথে পত্রিকা পড়তে পড়তে তিনি ঠিক এমন একটি কথা বলেছিলেন,
“ চুপ থাকো, জিন্দা থাকবে। মুখ খুললে, জ্যান্ত-লাশ হবে।”
পত্রিকার পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে জামায়াতে ইসলামীর আব্দুল কাদের মোল্লা, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, আবুল কালাম আযাদ (বাচ্চু মোল্লা) এবং মুহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামিকে ঘিরে বিচার, রায়, আপিল, মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে নাকি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হচ্ছে এসবের খবর। বিগত বছর ধরেই চলছে এসব। রাজনৈতিক পরিস্থিতি শুধু চোখে দেখার মতো, মুখে বলার মতো নয়৷ শুধু সামনে কী হচ্ছে সেটুকুই দেখতে হচ্ছে। জাকির মালিথা দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে পত্রিকা পড়া অব্যাহত রাখলেন। তখন তুহিন এসে বড় চাচুর পাশে বসল। বড় চাচু কোন শিরোনামের পত্রিকা পড়ছেন তা একবার উঁকি দিয়ে দেখে নিল। জানে বড় চাচু শুধু চুপচাপ পড়বেন। কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া জানাবেন না৷
তুহিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সেন্টার টেবিল থেকে অন্য একটি পত্রিকা তুলে নিল। কিছুক্ষণ পত্রিকা পড়তে পড়তে হঠাৎই একটা জায়গায় আটকে গেল। সেখানে কয়েক সেকেন্ড চোখ আটকে রেখে তাকিয়ে রইল। এরপর বড় চাচুর দিকে একবার তাকাল। পরক্ষণে পত্রিকার কাগজ নিয়ে সে উপরে নিজের কক্ষের উদ্দেশ্যে উঠে গেল। জাকির মালিথা খেয়াল করেও যেন করলেন না এমনই ভঙ্গিমা নিয়ে পত্রিকায় মনোযোগী হয়ে রইলেন৷
.
শশী তখন নিচে এসেই ছবি আঁকতে বসেছিল। তার মনে হয়েছিল ওই অশান্ত মনকে শান্ত করতে তুলির আঁচড়ই তার একমাত্র ঔষধি। তার কিশোরী মনটা এতটাই এলোমেলো হয়েছে যে নিজের অবস্থায় নিজেই হতবাক। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজের কাজে ডুবে আছে। এক পর্যায়ে শশী নিজের আঁকা শেষ করল। নিজে এঁকে নিজেই কতক্ষণ সময় ধরে দেখল ক্যানভাসটি। একটি পুরুষ ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে তার নাকের অর্ধেক অবধি কফির কাপে ডুবে আছে। দৃশ্যমান শুধু তীক্ষ্ণ জ্বলজ্বলে বাদামী চোখজোড়া, সকালের এলোমেলো চুল আর কালো ঘন ভ্রুযুগল। হাতের আঙুলের ফাঁকে বিশেষ কায়দায় কফির কাপটা ধরে রেখেছে। ব্যস এটুকুই ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে। পুরুষটির মাথার চুল থেকে কফির কাপ ধরে রেখে চুমুক দেয়ার দৃশ্যটি যে এতটা সুন্দরভাবে উঠে এসেছে শশীর তুলির আঁচড়ে, তা যদি পুরুষটি দেখত!
নিজেরই হাতে এঁকে সম্পূর্ণ করা শিল্পকর্মটির পুরুষালি চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে শশী নেশায় পড়ে গেল। নেশা নেশা বাজপাখির সমতূল্য তীক্ষ্ণ চোখজোড়ার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকে শশী গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল,
“দৃষ্টিতে যেন সে রাসপুতিন,
খুন হয়ে যাই আমি প্রতিদিন!
নামধাম জানি না, তার কিছু,
তবুও নিলাম আমি, তার পিছু!
কালো সানগ্লাসটাই কেন এতো সুখ
হেই যুবক....!”
|চলবে|