আদ্রের হৃদয়ের প্রেয়সী
লেখক: তাসনিয়া ফাইজা
সারারাত টেবিলে মাথা গুঁজে পড়াশোনা শেষ করে যখন ভোরের আলো ফুটছিল, ঠিক তখন—সকাল পাঁচটায় বিছানায় পিঠ ঠেকালো প্রেয়সী। চোখের পাতায় তখন রাজ্যের ক্লান্তি। বিছানায় পড়তেই সে একদম বেঘোরে তলিয়ে গেল। সকালবেলা কলেজে যাওয়ার জন্য তানিয়া এসে কত ডাকল, ধাক্কা দিল, চিল্লাপাল্লা করল—কিন্তু প্রেয়সীর কোনো হুঁশই নেই! সে যেন কুম্ভকর্ণের ঘুমে মগ্ন। শেষমেষ তানিয়া বিরক্ত হয়ে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একাই হেঁটে কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বেলা তখন ১১টা বেজে ৫ মিনিট। প্রেয়সী বিছানায় একটু নড়েচড়ে উঠে আড়মোড়া ভাঙল। আলসেমি করে বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার মাথার ওপর যেন আস্ত সিলিং ফ্যানটা ভেঙে পড়ল! ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল সে। এত বেলা হয়ে গেছে! কলেজ তো এতক্ষণে শেষের পথে, ছুটির সময় হয়ে এসেছে। পাশে তাকিয়ে দেখল তানিয়ার কোনো চিহ্ন নেই।
প্রেয়সী আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বিছানা থেকে পা নামালো। গায়ের ওপর সুতির ওড়নাটা কোনোমতে জড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এলো। রান্নাঘরে গিয়ে সালাম বেগমকে দেখে অপরাধীর গলায় বলল, "আম্মু! তুমি আমাকে কলেজে যাওয়ার জন্য ডাকলে না কেন?"
সালাম বেগম হাতের কাজ রুখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, "ডাকব না কেন? তুই তো উঠেওছিলি। তানিয়া মেয়েটা তোকে ডাকতে ডাকতে নিজের গলা ফাটিয়ে ফেলল, কিন্তু তোর তো ওঠার কোনো নামই ছিল না! কয়টায় ঘুমাতে গিয়েছিলি রাতে, হ্যাঁ? সকালে যে উঠতে পারিসনি!"
ঠিক তখনই তানিয়ার মা, রুণা আক্তার পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বললেন, "আরে বলিস না প্রেয়সী, তানিয়া তোকে ডাকতে ডাকতে একদম কাহিল হয়ে গেছে। শেষে একাই গজগজ করতে করতে চলে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেছে—আজকে বাড়ি ফিরুক, তারপর তোর খবর আছে!"
প্রেয়সী নিজের জিভের ডগায় কামড় দিল। ফজর আর ভোরের ওই ঠান্ডা হাওয়াটার কারণেই ঘুমটা এত বেশি গভীর হয়ে গিয়েছিল। সে একটা বোকা বোকা হাসি দিয়ে সবার পাশ কেটে গুটিগুটি পায়ে আবার ওপরে নিজের রুমে চলে এলো। কলেজ তো মিস হলোই, কিন্তু কোচিং তো আর মিস করা যাবে না!
বাথরুম থেকে তোয়ালেটা নিতে গিয়েই প্রেয়সীর চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়। সেখানে একটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্টিকি নোট লাগানো। তানিয়ার হাতের লেখা স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে:
"আজকে তোর খবর আছে! তোর জন্য আমাকে একা একা কলেজে হেঁটে যেতে হইছে। কোচিংয়ে যদি ঠিক সময়ে না আসিস, বাসায় আইসা তোরে এক্কেবারে দাফন করে দিব!"
নোটটা হাতে নিয়ে প্রেয়সীর ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটা পারেও বটে! এরকম অদ্ভুত হুমকি আর কে দিতে পারে? সে আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গোসলটা সেরে নিল। প্রতিদিন সকালে ফ্রেশ হয়ে গোসল করাটা তার বহুদিনের অভ্যাস। গোসল শেষে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে সামান্য নাস্তা মুখে গুঁজে, কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল।
কোচিংয়ের রাস্তায় মাঝপথে আসতেই আচমকা প্রেয়সীর সামনে এসে দাঁড়াল তার এক দূর সম্পর্কের ফুফাতো ভাই, আরমান। ছেলেটাকে প্রেয়সী একদম দুচোখে দেখতে পারে না। সুযোগ পেলেই নানারকম ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলে, এর আগে কয়েকবার প্রপোজও করেছে। কিন্তু প্রেয়সী যেহেতু সরাসরি কখনো রূঢ় কিছু বলেনি, তাই সবসময় তাকে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে।
আরমান হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল, "কিরে প্রেয়সী! কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোকে, শুনছিস না কেন?"
প্রেয়সী না থামার ভান করে হাঁটার গতি বজায় রেখেই বলল, "না, শুনিনি। শুনলে কি আর এভাবে হাঁটতে থাকতাম?"
আরমান পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলল, "আজকে কলেজে যাসনি কেন? তানিয়ার মুড তো দেখলাম একদম ভালো ছিল না!"
— "তাই? ওকে।" প্রেয়সী সংক্ষেপে জবাব দিল।
আরমান একটু অবাক হয়ে বলল, "শুধু 'ওকে'? তোর জিজ্ঞেস করা উচিত না যে ওর মুড কেন খারাপ?"
প্রেয়সী বিরক্ত হয়ে বলল, "সেটা না হয় আমি ওর থেকে পরেই জিজ্ঞেস করে নেব। আমার তাড়া আছে, আরমান।"
আরমান একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, "তুই কি আমার ওপর রেগে আছিস?"
— "না, আমি কেন তোর ওপর রাগ করতে যাব? আমি এমনিই। আচ্ছা, আজকে কি বায়োলজি প্র্যাক্টিকালে কিছু দিয়েছিল?" প্রেয়সী প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বলল।
আরমান একটু আহ্লাদ মাখানো গলায় বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন দেবে না? অবশ্যই দিয়েছে। গালের কোষ দিয়ে প্র্যাক্টিকাল করিয়েছে। তোর কি খাতাটা লাগবে? আমি এনে দেব?"
প্রেয়সী ঠান্ডা গলায় বলল, "না, থ্যাংকস। তানিয়ার থেকে নিয়ে নেব।"
প্রেয়সী চাইছিল কোনোমতে আরমানের কাছ থেকে নিজের পিছু ছুটাতে, কিন্তু আরমান যেন আঠার মতো লেগে রইল। সে কোনোভাবেই প্রেয়সীর পাশ থেকে সরছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিলাসবহুল কালো মার্সিডিজ গাড়ির ভেতরে আবহাওয়া একদম বদলে গেল। গাড়ির ভেতরের কালো গ্লাসের ওপাশ থেকে একজন মানুষের দুই জোড়া চোখ ভীষণ বিরক্তি আর রাগে ছোট হয়ে এলো। শাহরিয়ার আদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। মাঝরাস্তায় একটা ছেলের সাথে একটা মেয়ের এত হাসিমুখে কথা বলার কী আছে? সে আর গাড়ির ভেতরে বসে থাকতে পারল না। কে কী মনে করবে, বা তার আভিজাত্যে লাগবে—এইসব কোনো কিছুর পরোয়া না করে সে এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
প্রেয়সী আরমানের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে হাঁটছিল, তাই সামনে কে আসছে সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না। হুট করেই তার মাথাটা গিয়ে ধাক্কা খেল একটা চওড়া, শক্ত পুরুষালি বুকের সাথে। ধাক্কার চোটে প্রেয়সী কপাল চেপে ধরে চোখ তুলে তাকাতেই তার কলিজা শুকিয়ে গেল। সামনে স্বয়ং আদ্র শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে!
ভয়ে প্রেয়সী এক ঝটকায় চার কদম পিছিয়ে গেল। আদ্র তার দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে, বরফশীতল চোখে তাকিয়ে আছে। সে সরু চোখে প্রেয়সীকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই আরমান মাঝখানে এসে নাক গলালো। আদ্র বিরক্ত হয়ে আরমানের দিকে তাকিয়ে খুব ঠান্ডা কিন্তু ধারালো গলায় বলল, "আমাদের দুজনের মাঝখানে কি তোমার কোনো দরকার আছে বলে তুমি মনে করো?"
আরমান একটু ঘাবড়ে গিয়ে বোকা বোকা হেসে বলল, "আমি ওর..."
আদ্র তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হাত তুলে থামিয়ে দিল, "তুমি ওর কে—সেটা তো আমি জানতে চাইনি, ওকে? সো, তুমি নিজের কাজে যেতে পারো।"
আরমান এই এলাকায় আদ্র শাহরিয়ারের দাপট আর ক্ষমতার কথা খুব ভালো করেই জানে। সে এও জানে যে এই লোকের সাথে পাঙ্গা নেওয়া মানে নিজের ধ্বংস ডেকে আনা। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, জান বাঁচাতে সে দ্রুত সেখান থেকে কেটে পড়ল।
আরমান চলে যেতেই প্রেয়সীও মাথা নিচু করে ওখান থেকে সটকে পড়ার চেষ্টা করল। সে যেই না আদ্রর পাশ কেটে চলে যাবে, অমনি আদ্রর শক্ত হাতটা এসে খপ করে প্রেয়সীর কব্জি চেপে ধরল। আদ্রর হাতের সেই জোরালো বাঁধনে প্রেয়সী থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। সে পেছন ফিরে তাকাল।
আদ্র তার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় শুধাল, "তোকে কি আমি যেতে বলেছি?"
হঠাৎ করেই এই 'তোকে' বা 'তুই' সম্বোধনটা প্রেয়সীর কানে বড্ড অদ্ভুত শোনাল। একটা অচেনা-অর্ধচেনা মানুষ তাকে এভাবে 'তুই' করে বলছে! বিষয়টাই তার একদম পছন্দ হলো না। প্রেয়সী শুকনো ঢোক গিলে নিজের হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, "না... মানে..."
— "কী মানে?" আদ্র আরও একটু কাছে এগিয়ে এলো।
— "মানে..." প্রেয়সী আমতা আমতা করল।
— "কী, বল?" আদ্রর কণ্ঠস্বর এখন আরও গম্ভীর।
প্রেয়সী এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেলল, "আপনি আমাকে এভাবে 'তুই তুই' করছেন কেন?"
আদ্রর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিপজ্জনক, অন্ধকার হাসি ফুটে উঠল। সে প্রেয়সীর কব্জির বাঁধনটা আর একটু শক্ত করে ধরে তার মুখের দিকে ঝুঁকে এলো। ফিসফিস করে, প্রায় হিৎসিত গলায় বলল, "তুই-তোকারি ছাড়াও তোর সাথে আমি আরও অনেক কিছু করতে পারি, মিস স্টুডেন্ট। লাইক... না, এখন বলব না। এই 'তুই' শব্দটার প্রয়োগ তোর ওপর তখনই হবে, সময় যখন হবে তোকে আজকের এই দিনের প্রতিটা মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেবে।"
আদ্রর সেই রহস্যময় আর বিষাক্ত কথার অর্থ প্রেয়সী কিছুই বুঝতে পারল না, কিন্তু তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ভয়ের শীতল স্রোত নেমে গেল।
------
মায়া কি বড় অদ্ভুত! মায়া আসলেই অদ্ভুত। ছোট্ট একটা শব্দ, অথচ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কতটা গভীর, তা কেবল যার ওপর পড়ে সেই বুঝতে পারে। কারো জীবনে এই মায়াই পরিবর্তন এনে তাকে সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষে রূপান্তর করে দেয়। তখন তার জীবনটা হয়ে ওঠে এক টুকরো সুখের বাগান, যেখানে সুবাস ছড়াতে সামান্য যত্নের পরশটুকুই যথেষ্ট। আর এই মায়াই আবার কখনো কাউকে টেনে নিয়ে যায় ধ্বংসের শেষ দ্বারে, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ থাকে না।
রাস্তায় তখন দু-একজন পথচারী ছাড়া তেমন কোনো মানুষ নেই। আদ্র প্রেয়সীর কব্জিটা ঝটকা দিয়ে ছেড়ে দিয়ে ধীর পায়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। গাড়ির দরজা খুলে সে ভেতরে বসতেই কালো কাঁচের মার্সিডিজটা ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে দৃষ্টিসীমানা পেরিয়ে গেল। প্রেয়সী একদৃষ্টে সেই চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। কী অদ্ভুত খামখেয়ালী এই মানুষটা! ঝড়ের মতো আসে, আবার ধুলোবালি উড়িয়ে নিমেষেই বহুদূরে চলে যায়। কীভাবে পারে একটা মানুষ এমন করতে?
কোচিংয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রেয়সীর বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখল তানিয়া অন্য একটা মেয়ের সাথে বেঞ্চে বসে আছে। প্রেয়সী ওর পাশে গিয়ে বসতে চাইলেই তানিয়া ব্যাগটা টেনে জায়গাটা আটকে দিল, ওকে বসতেই দিল না। মুখটা ফুলিয়ে চরম রাগ আর অভিমান নিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল সে। প্রেয়সী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার তানিয়ার এই মহারাগ আর অভিমান ভাঙানোর কঠিন মিশন শুরু করতে হবে।
আসলে অভিমান, রাগ কিংবা ভালোবাসা আগলে রাখার অধিকার তো তারাই খাটায়, যারা খুব কাছের মানুষ হয়, যারা নিজের হয়। এই ‘নিজের’ শব্দটার মধ্যেই এক আলাদা অনুভূতির মায়া লুকিয়ে থাকে।
কোচিং শেষ হওয়া থেকে শুরু করে সারাটা রাস্তা তানিয়া মুখ থেকে একটা ‘টু’ শব্দও করল না। প্রেয়সী শত চেষ্টা করেও ওর মুখ থেকে কথা বের করতে পারল না। একদম গজগজ করতে করতে বাসায় এসে ঢুকল তানিয়া। ঘরে ঢোকা মাত্রই প্রেয়সী আর সুযোগ নষ্ট না করে তানিয়ার হাতটা খপ করে টেনে ধরল।
— "জান আমার! আর কত রাগ করে থাকবি বল তো? এবার অন্তত একটা কথা বল!" প্রেয়সী একদম অনুনয়ের সুরে বলল।
তানিয়া এক ঝটকায় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রেগে বলল, "হাত ছাড় আমার! একদম ছুঁবি না আমায়!"
— "আরে রাগ করছিস কেন? লক্ষ্মী বোন আমার, রাগ করিস না। তুই রাগ করলে কি চলে বল?"
তানিয়া ভ্রু কুঁচকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, "তাহলে বলছিস রাগ না করতে?"
প্রেয়সী তখনো নিজের ভুলের ঘোরে। সে অবচেতনভাবেই দুই দিকে মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ।"
তানিয়া আর সহ্য করতে না পেরে প্রেয়সীর মাথায় ঠাস করে একটা গাট্টা মারল, "আই অ্যাম সরি টু সে দ্যাট—তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না! মুখে বলছিস 'হ্যাঁ', আর মাথা দুই দিকে নাড়িয়ে বলছিস 'না'! এটা কীভাবে হয় রে গাঁধী?"
প্রেয়সী মাথায় হাত বুলিয়ে বোকাসোকা হেসে বলল, "আরে, ওসব অতশত আমি জানি না! এখন দয়া করে তোর এই মেলোড্রামা আর নাটক বন্ধ করবি?"
— "করব না নাটক, আমার নাটক করতে ভালো লাগে!" তানিয়া সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে বলল, "আর শুনে রাখ, আজকে থেকে ওই আরমানের হাত থেকে তোকে আর আমি বাঁচাতে যাব না। একদম নিজের রাস্তায় চলবি!"
তানিয়ার মুখে আরমানের নাম শুনে প্রেয়সী পুরো হকচকিয়ে গেল। কারণ একমাত্র তানিয়াই জানে, আরমানকে প্রেয়সী কতটা অপছন্দ করে। ছেলেটার স্বভাব-চরিত্র যে বিন্দুমাত্র সুবিধার নয়, তা দুই বোনই বোঝে। এতকাল তানিয়াই ঢাল হয়ে আরমানের নানারকম ফালতু প্রপোজাল আর পিছু নেওয়া থেকে প্রেয়সীকে বাঁচিয়ে এসেছে। এখন তানিয়াই যদি ম্যাম রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তো তার বড় বিপদ!
প্রেয়সী একদম আঁতকে উঠে তানিয়ার হাত জড়িয়ে ধরল, "ওরে বাবারে! এমন কথা ভুলেও বলিস না বোন! আজকেই তো আসার সময় মাঝরাস্তায় ওই আরমানের সাথে দেখা হয়েছিল।"
তানিয়ার ভেতরের গোয়েন্দা মনটা এবার চট করে জেগে উঠল। সে চোখ বড় বড় করে বলল, "তার পর? কী হলো?"
— "আগে বল তুই আর রাগ করে থাকবি না?" প্রেয়সী সুযোগ বুঝে দরাদরি করতে চাইল।
— "অতশত জানি না! আমার রাগ আমি বুঝব। তুই আগে আরমানের ওইখানকার কথা বল, কী হইছে?"
— "উঁহু, আগে প্রমিস কর তুই রাগ করবি না!" প্রেয়সীও নাছোড়বান্দা।
তানিয়া একটা বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে শেষমেষ হার মেনে বলল, "আচ্ছা বাবা আচ্ছা, রাগ করব না। এবার বল তো কী হইছে ওখানে?"
প্রেয়সী এবার একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় গুছিয়ে বসল। কিন্তু আরমানের কথা বলতে গিয়ে তার মনে পড়ে গেল সেই শক্ত চওড়া বুক, কালো মার্সিডিজ আর আদ্রর সেই বিষাক্ত ‘তুই’ সম্বোধনের কথা। তানিয়াকে পুরোটা বললে যে সে আবার আদ্রর নাম শুনে খেপে উঠবে, সেটা ভেবে প্রেয়সী মনে মনে একটু কুঁকড়ে গেল।
প্রেয়সীর মুখে সব কথা শুনে তানিয়ার চোখ তো একেবারে চড়কগাছ! আদ্র শাহরিয়ারের মতো মানুষ মাঝরাস্তায় এসে এভাবে আরমানকে ধমকে তাড়িয়ে দেবে, আর প্রেয়সীকে অমন বিষাক্ত হুমকি দেবে—এটা যেন তানিয়ার কল্পনারও বাইরে। আদ্রর অনুপস্থিতিতেই পরিস্থিতি এত দূর গড়িয়ে গেল, জেনেশুনেও তানিয়ার বুকটা কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল। লোকটা আসলেও বড় অদ্ভুত, বড় ভয়ঙ্কর। সারাদিন মুখটা কেমন বাংলা পাঁচের মতো করে রাখে, যেন দুনিয়ার সব রাগ তার একার। আদ্রর সেই গম্ভীর, ধারালো চেহারার কথা মনে পড়তেই তানিয়ার বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
তানিয়া একটু ধাতস্থ হয়ে প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে বলল, "শোন প্রেয়সী, তুই যে সেদিন মাঝরাস্তায় অত বড় সিন ক্রিয়েট করসিলি, তার ওপর কলেজের সামনে ওইরকম উল্টাপাল্টা কথা বললি, আবার হুট করে গায়ের ওপর গিয়ে পড়লি—লোকটা মনে হয় ওইসবের শোধ নিচ্ছে! তুই যদি প্রথম দিন ওইসব পাগলামি না করতি, তাহলে আজকে এত দূর আসতই না।"
প্রেয়সী দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে সোফায় বসে পড়ল। কপাল বটে তার! কী এক মহা মুসিবতে যে সে ফেঁসেছে! ওই ভয়ঙ্কর মানুষটার নজর এখন সরাসরি তার ওপর। সে এখন যখনই উঠবে তখন কথা শুনবে, আবার যখন বসবে তখনও নিস্তার নেই। আদ্র শাহরিয়ার যেন এক মূর্ত আতঙ্ক হয়ে তার শান্ত জীবনে ভর করেছে।
রাত তখন গভীর। ঘড়ির কাঁটায় একটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। সদ্যই একটা লম্বা আর ক্লান্তিকর বিজনেস মিটিং শেষ করে আদ্র তার প্রিয় ব্ল্যাক মার্সিডিজে এসে বসল। কালো রঙের প্রতি তার এক অদ্ভুত দুর্বলতা আছে, তাই তার জীবনের বেশিরভাগ জিনিসই এই কুচকুচে কালো রঙের। যেমন আজকের পুরো আউটফিটটাই ছিল আদ্যোপান্ত কালো। ব্ল্যাক ফরমাল প্যান্টের সাথে ব্ল্যাক শার্ট ইন করা, সাথে ম্যাচিং কালো টাই। গায়ের কালো ব্লেজারটা খুলে পেছনের সিটে অবহেলায় ছুড়ে ফেলেছে সে। টাইয়ের নটটা একটু লুজ করে, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলতেই তার চওড়া ফর্সা বুকটা আংশিক উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। এই পোশাকে তাকে যেমন রাজকীয় লাগছে, তেমনই এক ধরনের বুনো আকর্ষণ ছড়িয়ে পড়ছে তার অবয়ব থেকে।
গাড়ির এসি অন থাকলেও আদ্রর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সারা শরীরে তীব্র ক্লান্তি। সে গাড়ির সিটে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে গা এলিয়ে বসল। উইন্ডশিল্ডের ওপাশে রাতের মেঘমুক্ত আকাশে ধবধবে সাদা চাঁদটা জ্বলজ্বল করছে। কী অসম্ভব সুন্দর আর স্নিগ্ধ সেই চাঁদ!
কিন্তু গাড়ির ভেতরের মানুষটার মনে তখন অন্য ঝড়। শাহরিয়ার আদ্রর মতো একরোখা, পাথরহৃদয় মানুষ যে কারো মোহে এভাবে তলিয়ে যেতে পারে, তা কি এই দুনিয়ার কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে? জাতি কি তা মেনে নেবে? যে মানুষের একটা কথা শোনার জন্য শত শত ব্যবসায়ী, কোটিপতি লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে, যার ইশারা আর একটা শব্দে লাখ লাখ মানুষ ওঠা-বসা করে—সেই প্রতাপশালী আদ্র শাহরিয়ার নাকি এক কাজল-হরিণী নয়নী রমণীর মোহে অন্ধ!
আর যাই হোক, ওই রমণীকে তার লাগবেই। যার মোহে সে আজকাল দিন-রাত যাপন করছে, তাকে নিজের করে না পাওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই। এই মোহের সমুদ্র থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় নেই, পালানোর সব পথ আদ্র নিজেই এক এক করে বন্ধ করে দিয়েছে। তবে তাই হোক, শেষমেষ যদি এই মোহের সাগরে ডুবে মরেও যেতে হয়, সে মরে যাবে। তাতে খারাপ কী? ভালো-মন্দের হিসাব সে করতে চায় না, শুধু জানে—প্রেয়সীকে তার চাই।
কী অদ্ভুত! ভালোবাসা আসলে কী জিনিস, তা আদ্র নামক এই মানুষটা কখনো শেখেনি, জানেও না। জানবেই বা কীভাবে? ছোটবেলা থেকে বাবাকে পাশে পেলেও, বাবা তো বাবাই—সবসময় ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। আর মা? তিনি নিজের ক্যারিয়ার, নিজের কর্পোরেট লাইফ আর ব্যস্ততা নিয়েই মত্ত ছিলেন। লোকে বলে, সন্তানের জন্য নাকি মায়ের ভালোবাসা সীমাহীন হয়, অনেক থাকে। কিন্তু আদ্র তো তার জীবনে সেই ভালোবাসার ছোঁয়া পায়নি। এটা ঠিক যে, ছোটবেলা থেকে আদ্র যখন যা চেয়েছে, তার মা সবার আগে এনে তার হাতের সামনে হাজির করেছেন। কিন্তু কখনো পরম যত্নে কাছে টেনে বুঝিয়ে বলেননি—কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। সম্পর্ক কী জিনিস, কীভাবে মায়া দিয়ে একটা মানুষকে ধরে রাখতে হয়—সেই শিক্ষা তো ওই ভদ্রমহিলা নিজের সন্তানকে কখনো দেননি। তাহলে কীভাবে বলা যায় যে তিনি আদ্রকে ভালোবেসেছিলেন? আসলে বাসেননি। তা না হলে কোনো মা কি তার সন্তানকে এভাবে একা ফেলে ফাঁকি দিতে পারে?
আদ্রর ছায়াতলে থেকে তার ছোট ভাই-বোন রেহান আর সারা বড় হয়েছে। যদিও তারা আদ্রর মতো এত গম্ভীর বা পাথুরে স্বভাবের হয়নি। তারা বাবা-মায়ের জন্য পাগল, আর সেই কারণেই তারা এখন লাক্সেমবার্গে পড়াশোনা আর জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পৃথিবীর সব মানুষ সব কিছু পায় না। আদ্রও পায়নি। নিজের বুঝ বয়স হওয়ার পর থেকে সে মা আর বাবার কাছে আর কিচ্ছুটি চায়নি। যখন নিজের পায়ে দাঁড়াল, তখন নিজের পরিশ্রমে সব কিছু একা গড়ে তুলেছে। কিন্তু মায়ের ওই অভাবটা... ভালোবাসা কি আসলেই এতটাই খারাপ হয়? আদ্রর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল, যা পরক্ষণেই গাড়ির অন্ধকারের মাঝে মিলিয়ে গেল।
এদিকে রাতের গভীরতা যখন কেটে ভোরের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে, ঠিক তখন প্রেয়সী নিজের পড়ার টেবিলের বইয়ের ওপর মাথা রেখেই ঘুমে ঢলে পড়ল। চোখের পাতা এতটাই ভারী হয়ে এসেছে যে সে আর চোখ খুলে রাখতে পারছে না। তানিয়া অনেক আগেই হাত-পা ছড়িয়ে আরামের ঘুমে মগ্ন হয়েছে।
হুট করেই ভোরের শান্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে মসজিদের মাইক থেকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি ভেসে এলো। আজানের শব্দ কানে আসতেই প্রেয়সী ধড়ফড় করে চোখ মেলল। বিছানা ছেড়ে উঠে চোখে-মুখে পানি দিয়ে অজু করে এসে সে জায়নামাজে বসে পড়ল।
জায়নামাজ আসলেই এক বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে এসে দাঁড়ালেই মনের সব ক্লান্তি, সব ভয় আর অস্থিরতা নিমেষেই কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। এক পরম শান্তি এসে ভর করে পুরো হৃদয়ে। যেখানে নিজের অজান্তেই, নীরবে সব দুঃখ আর জমানো কথা মহান আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়া যায়। এই নামাজের জায়গাটা আসলেই বড় সুন্দর। দুনিয়ার বুকে তুমি যত নিঃস্ব আর একা হও না কেন, আল্লাহর সামনে হাত পাতলে তিনি কখনো খালি হাতে ফেরান না; ভেতরের সব কষ্টকে এক নিমেষেই কমিয়ে দেন। প্রেয়সী চোখ বন্ধ করে মোনাজাত ধরল, তার অবাধ্য মনটা যেন এক অজানা আশঙ্কায় বারবার কাঁপছিল।
সকাল সাতটা। সদ্যই ভোরের আলো ফুটেছে ঢাকা শহরে। চিরচেনা সেই চঞ্চলতা আর ব্যস্ততা নিয়ে জেগে উঠেছে তিলোত্তমা নগরী। জীবিকার তাগিদে, জীবনকে স্বাভাবিক ছন্দে চালাতে মানুষ যে যার কাজে বা চাকুরিস্থলে ছুটছে। বিনা পরিশ্রমে তো আর কপালে অন্ন জোটে না!
এদিকে ঘুম থেকে উঠে ঝটপট তৈরি হয়ে নিল দুই বোন। ঘর থেকে বের হতে হতে ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় আটটা বাজে। তড়িঘড়ি করে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালো তারা, কিন্তু একী! পুরো রাস্তায় কোনো রিকশার দেখা নেই। রাস্তাঘাট যে একদম ফাঁকা তা নয়, প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউই রিকশা পাচ্ছে না। আজকে কোনো হরতাল বা ধর্মঘট আছে কি না, তাও তাদের জানা নেই। আর ঠিক যেদিন কলেজে যাওয়ার তাড়া থাকে, সেদিনই যেন দুনিয়ার সব সংকট এসে হাজির হয়! কোনো উপায় না দেখে তানিয়া আর প্রেয়সী হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
পা চালিয়ে কিছুটা এগোতেই সামনের বড় মাঠটার কাছে মানুষের ভিড় আরও ঘন হতে দেখল তারা। সবাই ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে, দুই বোন প্রথমে তা আঁচ করতে পারল না। ঠিক তখনই পেছন থেকে চেনা গলার ডাক এলো— "তানিয়া! প্রেয়সী না?"
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখা গেল সিয়ামের বন্ধু মাহিরকে। ছেলেটা দেখতে মোটামুটি সুশ্রী। সম্পর্কে সিনিয়র ভাই হওয়ায় দুই বোনই দাঁড়িয়ে ভদ্রতার খাতিরে কুশল বিনিময় করল। মাহির হেসে জিজ্ঞেস করল, "এই গরমে কোথায় যাচ্ছ তোমরা?"
প্রেয়সী স্বভাবসুলভ কোনো উত্তর দিল না। পরিচিত বা বাইরের কোনো পুরুষের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলা তার ধাতে নেই। তানিয়া একটু হেসে বলল, "এই তো ভাইয়া, কলেজে যাচ্ছিলাম। কোনো রিকশা পেলাম না, তাই দুই বোন হেঁটেই রওনা দিলাম।"
মাহির প্রেয়সীর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে একটু আলগা পিরিত দেখিয়ে বলল, "তাই নাকি? চলো, আমিও তোমাদের সাথেই যাই।"
মাহিরের তাকানোর ভঙ্গিটা প্রেয়সীর মোটেও ভালো লাগল না। অসভ্যতার একটা সীমা থাকা উচিত! গায়ে পড়া স্বভাবের মানুষকে সে তীব্র অপছন্দ করে। কোচিংয়ে পড়ার সময় এই মাহিরই নানারকম ইনিয়ে-বিনিয়ে তাকে প্রপোজ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সিয়াম ভাইয়ের বন্ধু বলে প্রেয়সী তখন বড় কোনো ঝামেলা করেনি বা ভাইকে কিছু জানায়নি। ভেবেছিল বেশি বাড়াবাড়ি করলে সিয়াম ভাইকে বলবে, কিন্তু মাহির এরপর আর তেমন কিছু করার সাহস পায়নি।
কলেজে পৌঁছাতে অলরেডি বেশ দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে তানিয়া আর মাহিরকে বারণ করল না। অযথা কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করার চেয়ে পথ চলাটাই শ্রেয় মনে হলো। তিনজন একসাথে হাঁটতে শুরু করল। মাহির বারবার প্রেয়সীর সাথে কথা জমানোর চেষ্টা করলেও প্রেয়সী কেবল 'হ্যাঁ' আর 'না' বলে ছোট জবাবে তাকে এড়িয়ে যেতে লাগল।
হঠাৎ মাঠের কাছাকাছি আসতেই তাদের চোখে পড়ল এক বিশাল স্টেজ। বোঝাই যাচ্ছে, কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীর জনসভার আয়োজন চলছে সেখানে। আর সেই স্টেজের দিকে তাকাতেই প্রেয়সীর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল।
স্টেজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং আদ্র শাহরিয়ার! পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, সুঠাম দেহের সেই পুরুষ সিংহটি অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চারপাশটা দেখছিল। আদ্রর চোখের সাথে প্রেয়সীর চোখজোড়া মেলানো মাত্রই প্রেয়সীর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে তানিয়ার পিঠের পেছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু আদ্রর সেই বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ আর শীতল দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচানো কি এতই সহজ?
আদ্রর কপালে সাথে সাথে গভীর ভাঁজ পড়ল। তার চোখ এখন কেবল প্রেয়সী আর তার পাশে থাকা মাহিরের ওপর স্থির। এদিকে জনসভার ভিড়ের কারণে সামনের রাস্তা একদম ব্লক হয়ে গেছে। প্রেয়সী তানিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে মনে মনে কাঁপতে কাঁপতে ভাবল— ইয়া আল্লাহ! একী মুসিবত! সামনেও যেতে পারছি না, পেছনে ফেরারও পথ নেই। আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং আজরাইল! এই ভিড়ের ঠ্যালায় যদি আবার কারো গায়ের ওপর গিয়ে পড়ি, তবে এই জল্লাদ আজ আমাকে আস্ত চিবিয়ে খাবে!
প্রেয়সী তানিয়ার কাঁধের ওপর দিয়ে একটু উঁকি দিতেই দেখল, আদ্র এখনো ঠিক আগের মতোই তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। ঠিক তখন আদ্রর পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রবীণ এক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে একটু আগে মাইকে ভাষণ দিতে দেখা গিয়েছিল। মানুষটার চেহারা মনে করতেই প্রেয়সীর মনে পড়ল—ইনি নিখিল শাহরিয়ার, আদ্রর বাবা।
মাহির চারদিকের ভিড় দেখে তানিয়াকে বলল, "রাস্তা তো পুরো বন্ধ দেখছি। আমাদের মনে হয় ঘুরে অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে হবে।"
তানিয়া চিন্তিত গলায় বলে উঠল, "কিন্তু ভাইয়া, আমাদের তো অলরেডি অনেক দেরি হয়ে গেছে। আবার ঘুরে যেতে গেলে তো আর ক্লাস পাব না। কোনো রিকশাও তো পাচ্ছি না!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রাতার মতো তাদের সামনে এসে হাজির হলো শুভ। মাহির রাজনীতিতে একটু-আধটু যুক্ত থাকায় এবং এই এলাকার ছেলে হওয়ায় শুভকে চিনতে তার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে খুব ভালো করেই জানে যে শুভ হলো আদ্র শাহরিয়ারের ডান হাত।
মাহির মুখে বড় একটা হাসি এনে শুভকে লম্বা একটা সালাম ঠুকল। শুভ সালামের জবাব নিয়ে বেশ অমায়িক গলায় বলল, "মাহির, তোমরা আমার সাথে এসো। আমি তোমাদের কলেজ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। কোনো সমস্যা নেই, এসো।"
প্রেয়সী তো পুরো বোকা বনে গেল! এই লোক কীভাবে জানল যে তারা কলেজে যাচ্ছে? পরক্ষণেই নিজের মাথায় একটা গাট্টা মারতে ইচ্ছে করল তার। ধুর! সে এত বোকা কেন? নিজেদের গায়ে কলেজের ইউনিফর্ম বা ড্রেস চকচক করছে, যে কেউ দেখলেই তো বুঝবে তারা স্টুডেন্ট এবং কলেজে যাচ্ছে!
তানিয়া আর মাহির শুভর কথামতো সামনের দিকে পা বাড়াল। প্রেয়সী তখনো এক জায়গায় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল দেখে তানিয়া তার হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিল, "কিরে, চল!"
প্রেয়সী বাধ্য হয়ে পা চালাল। কিন্তু অবাধ্য মনটা কি আর শান্ত থাকে? আদ্র এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে কি না—সেটা দেখার জন্য সে যেই না ঘাড় ঘুরিয়ে আড়চোখে স্টেজের দিকে তাকাতে গেল, অমনি সামনের ভিড়ের এক পথচারীর সাথে সজোরে ধাক্কা খেল সে!
"উফ!"—ধাক্কাটা বেশ জোরেই লেগেছিল। কপালে বেশ ভালোই চোট পেল সে। কিন্তু শারীরিক ব্যথার চেয়েও বড় এক মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক তার বুকটা মোচড় দিয়ে ধরল। আদ্রর সেই শেষ কথাগুলো তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— 'যদি আর কখনো তোমাকে এভাবে রাস্তায় কারো ওপর পড়ে থাকতে দেখি, তবে আমার গুলির নিশানা হবে তোমার মাথার ঠিক মাঝখানে...'
প্রেয়সী মাথা ডলতে ডলতে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আবার স্টেজের দিকে তাকাল। দেখল আদ্র তার সেই গম্ভীর, অদ্ভুত আর স্থির চোখে এখনো তার প্রতিটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে। আদ্রর সেই চাহনি দেখে প্রেয়সী আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। মুখে 'আল্লাহ আল্লাহ' জপ করতে করতে সে মাহির আর তানিয়াকে ছাড়িয়ে এক দৌড়ে সামনের দিকে চলে গেল। স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভয়ংকর মানুষটার গম্ভীর মুখের দিকে তাকানোর কোনো ইচ্ছাই তার আর অবশিষ্ট রইল না।
শুভর সাহায্যে তারা খুব সহজেই ভিড় এড়িয়ে কলেজের গেটের ভেতরে ঢুকে পড়ল। যাওয়ার আগে তানিয়া শুভকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাল। আর যাই হোক, লোকটা আজ তাদের অনেক বড় উপকার করেছে। সে না থাকলে আজ আর তাদের ক্লাস করতে হতো না; সোজা বাড়ি ফিরে বাবা-মায়ের কাছে কড়া বকুনি খেতে হতো। কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে প্রেয়সী নিজের হাঁপাতে থাকা বুকটা চেপে ধরল, কিন্তু আদ্রর সেই সাদা পাঞ্জাবি পরা গম্ভীর রূপ আর তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন কিছুতেই তার মন থেকে সরছিল না।
কলেজ ছুটি হয়ে গেল। গ্রীষ্মকাল হওয়ায় রোদের তীব্রতা আকাশছোঁয়া, মাঠের তপ্ত বালু আর পিচ থেকে যেন আগুনের হল্কা বেরোচ্ছে। দুপুর বারোটার বেশি বাজে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে কোনোমতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো প্রেয়সী, তানিয়া, নিধি, রাইসা আর আলো। মূলত এই নতুন কলেজে আসার পর থেকেই এদের সাথে প্রেয়সী আর তানিয়ার খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে, যদিও এদের মধ্যে কয়েকজন তাদের স্কুলেও একসাথে ছিল।
মাঠের সামনে আসতেই সবাই একসঙ্গে দাঁড়াল। একটু পরেই তাদের কোচিং শুরু হবে, হাতে বড়জোর আধঘণ্টার মতো সময় আছে। এখান থেকে কোচিংয়ে যেতে বড়জোর পাঁচ মিনিট লাগবে, তাই আগেভাগে গিয়েও কোনো লাভ নেই। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েই তারা গল্প করার সিদ্ধান্ত নিল।
হঠাৎ প্রেয়সীর চোখ গেল মাঠের অপর প্রান্তে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আদ্র শাহরিয়ার। তার ঠিক পাশেই সুটাম দেহের এক প্রবীণ ব্যক্তি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে—প্রেয়সী তাকে চেনে, নিখিল শাহরিয়ার। নামের পদবি দেখেই সে বুঝেছে ইনি আদ্রর বাবা হবেন। সকালের ওই ঘটনার পর রাইসা যখন তাকে সব বলছিল, তখন নিখিল শাহরিয়ারের ব্যাপারে জানতে পেরেছিল সে। তাঁদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রর অ্যাসিস্ট্যান্ট শুভ এবং আরও কয়েকজন বডিগার্ড। একজন বডিগার্ড নিখিল শাহরিয়ারের মাথার ওপর কালো ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর বাকিরা চারপাশে কড়া সুরক্ষার বলয় তৈরি করে রেখেছে।
আদ্র তার বাবার প্রতিটি কথা ভীষণ গম্ভীর আর শান্তভাবে শুনছে। ছোটবেলা থেকেই লোকটা এরকম—ভীষণ গম্ভীর, শান্ত আর মিতভাষী। সে খুব বেশি কথা বলে না; সবার সব কথা শোনার পর ঠান্ডা মাথায় একটা মাত্র কথা বলবে, আর সেটাই হবে শেষ কথা। যেমন এখন নিজের বাবার রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক কথাগুলো একদম নিস্পৃহভাবে শুনছে, মুখে কোনো প্রতিক্রিয়ার ছাপ নেই।
সাদা পাঞ্জাবিতে আদ্রকে দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল, কিন্তু গত কয়েকদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর ধমকের কথা ভেবে প্রেয়সী মুখ বাঁকিয়ে মনে মনে একটা ভেংচি কাটল।
প্রেয়সীর চোখ ওই দিকে যেতে না যেতেই বাকি মেয়েদের নজরও আদ্র আর নিখিল শাহরিয়ারের দিকে চলে গেল।
রাইসা আদ্রর দিকে তাকিয়ে এক হাত গালে দিয়ে মজে যাওয়ার মতো গলায় বলল, "ভাইরে ভাই! এই আমাদের এলাকার নেতা? একটা ছেলে কীভাবে এত হট হতে পারে ভাই! ওর দিকে তাকাইলেই আমার ভেতরে এক্কেবারে জোস চলে আসে। আর ওর বডি দেখছিস? বাপটাকেও দেখ, বুড়ো বয়সেও কম যায় না! বাপ-ছেলে একদম সেইরকম জিনিস! ভাই, আমি ধন্য যে এই এলাকায় থাকি!"
রাইসার এই শেষ কথাটা প্রেয়সীর মোটেও পছন্দ হলো না। সে মনে মনে ভাবল, 'আমি তো এই এলাকায় থেকে বিন্দুমাত্র ধন্য নই!' প্রকৃতপক্ষে প্রেয়সীদের বাসা এই এলাকা থেকে বেশ কিছুটা দূরে, আদ্র শাহরিয়ার এই এলাকায় পড়ে বা থাকে কি না তা প্রেয়সীর জানা নেই, তাই সে ধরেই নিল এই উটকো লোকটা এখানকার কেউ না। কেবল ভালো কলেজের টানেই প্রেয়সীকে প্রতিদিন এত দূর যাতায়াত করতে হয়।
রাইসার কথা শুনে নিধি চোখ-মুখ কুঁচকে কড়া গলায় বলে উঠল, "ছি ভাই রাইসা! তোর রুচি দেখে তো আমি স্তব্ধ! ছেলের দিকে নজর দিছিস বুঝলাম, তা বলে বরের বয়সি বাপের দিকেও তাকাবি? তুই বাপের বৈবাহিক জীবনেও নজর দিচ্ছিস? শালী, তুই তো আস্ত একটা চরিত্রহীন! ছি ছি ছি, তোকে আমার বন্ধু বলতে লজ্জা লাগছে!"
নিধির এই নাটকীয় ডায়লগ আর বলার ভঙ্গি শুনে পুরো মেয়েদের গ্রুপটা একসাথে খিলখিল করে জোরে হেসে উঠল। তাদের হাসির তোড়ে প্রেয়সীও নিজের মুখ চেপে হাসতে বাধ্য হলো।
এতগুলো মেয়ের একসাথে জোরে হাসার শব্দে মাঠের ওপাশে থাকা আদ্রর মনোযোগে বিঘ্ন ঘটল। হঠাৎ করে শান্ত পরিবেশে এই হাসির শব্দে আদ্রর দুই ভ্রুর মাঝখানে একটা গভীর ভাঁজ পড়ল। শব্দের উৎস খুঁজতে সে ধীর পায়ে মাথাটা ঘোরাতেই তার চোখ গেল মাঠের ডান দিকে। সেখানে একঝাঁক মেয়ে দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করছে। আদ্রর চোখ জোড়া নিঁখুত নিশায় গিয়ে স্থির হলো প্রেয়সীর মুখের ওপর।
ঠিক তখনই প্রেয়সীর চোখও আদ্রর দিকে চলে গেল এবং মুহূর্তের মধ্যে দুই জোড়া চোখ এক হয়ে গেল। আদ্রর সেই তীব্র, জ্বলন্ত আর কর্কশ চাহনি দেখেই প্রেয়সীর ভেতরের সব হাসি এক নিমেষে উবে গেল। সে ভয়ে এক্কেবারে গুটিয়ে গেল। 'এই লোকের চেহারা রে ভাই! সবসময় এত গম্ভীর কেন থাকে?'—মনে মনে এটা ভেবেই সে আতঙ্কে তানিয়ার পিঠের পেছনে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
প্রেয়সীকে ওভাবে তানিয়ার পেছনে লুকোতে দেখে নিধি কনুই দিয়ে খোঁচা মেরে ফিসফিস করে বলল, "কিরে প্রেয়সী? তুই ওই ড্যাশিং নেতার দিকে তাকিয়ে লজ্জা পাচ্ছিস নাকি? ওমা! আমাদের প্রেয়সী সোনা দেখি লজ্জা পাচ্ছে! হঠাৎ কী হলো রে তোর? ভিমরতি রোগ ধরল নাকি? আয়হায়, তাহলে তো তোকে এখনই কোনো ভালো হার্টের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে!"
নিধির এই ফালতু রসিকতায় প্রেয়সী এবার আর হাসল না, বরং তার ভীষণ রাগ হয়ে গেল। সে তানিয়ার আড়াল থেকে একটু মাথা উঁচিয়ে আবার আদ্রর দিকে তাকাতেই তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। লোকটা এখনো ঠিক একইভাবে, চোখ সরু করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে!
প্রেয়সীর মাথার ভেতর এখন হাজারটা কু-চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল— 'এই লোক কি এখন স্টেজের ওপর থেকে নেমে এসে সবার সামনে আমাকে দুইটা থাপ্পড় মেরে বলবে—"আমি বারণ করার পরও তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে হাসছিস কেন? এক্ষুনি আমার কলেজ থেকে বের হ!"'
আদ্র এই কলেজের গভর্নিং কমিটির সম্মানিত সদস্য এবং এই কলেজের ফাউন্ডেশনের প্রধান ব্যক্তি। সে চাইলে এক তুড়িতে প্রেয়সীকে কলেজ থেকে টিসি দিয়ে বের করে দিতে পারে। এই মারাত্মক ভয়ের মাঝেই প্রেয়সীর মনে পড়ে গেল আজ সকালের সেই ধাক্কা লাগার ঘটনাটা। আদ্র তো তাকে সাফ বলে দিয়েছিল রাস্তায় যেন আর কখনো কাউকে ধাক্কা না দেয় বা পড়ে না যায়। প্রেয়সী কপাল ডলতে ডলতে মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে লাগল— 'আল্লাহ গো! সকালের ওই ধাক্কা লাগার অপরাধে এই রাক্ষসটা যদি এখন এসে থাপ্পড় মারে, তবে তো আমার মান-সম্মান সব শেষ!' আদ্রর সেই তীক্ষ্ণ চোখের চাবুক যেন দূর থেকেই প্রেয়সীর পিঠে এসে লাগছিল।
আদ্র শাহরিয়ারের সেই বজ্রকঠিন, জলন্ত দৃষ্টি যখন পুরো মেয়েদের গ্রুপটার ওপর আছড়ে পড়ল, তখন মাঠের ওই কোণে দাঁড়িয়ে থাকা নিধি, রাইসা, আলোর হাসির ফোয়ারা এক সেকেন্ডে শুকিয়ে থমকে গেল। লোকটার চোখের মণি যেন জীবন্ত কোনো ব্ল্যাকহোল, যা চারপাশের সমস্ত আনন্দ আর শব্দকে এক নিমেষে শুষে নিতে পারে। আদ্রর সেই চাবুকের মতো চাউনি দেখে এতক্ষণের সাহসী মেয়েগুলোও কেমন যেন মিইয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো পুরো মাঠের বাতাস জমাট বেঁধে বরফ হয়ে গেছে। আর এক সেকেন্ড ওখানে দাঁড়ালে নির্ঘাত কোনো বড়সড় কেলেঙ্কারী ঘটবে—এই আশঙ্কায় নিধি আর রাইসা একে অপরের হাত খামচে ধরে হড়মুড় করে কলেজের মেইন গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তাদের দেখাদেখি তানিয়া আর প্রেয়সীও প্রায় দৌড়ানোর গতিতে কলেজের সীমানা পার হয়ে বড় রাস্তায় এসে হাঁফ ছাড়ল।
রাস্তার মোড়ে এসে নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছাতেই নিধি বুক ধড়ফড়ানি থামানোর জন্য নিজের বুকে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, "বহা-রে ভাই! কী সাংঘাতিক লোক রে ওটা! মনে হচ্ছিল নিজের চোখ দুটো দিয়ে আমাদের কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে! আমি তো ভাবছি, এই জাঁদরেল বেটার বউ কীভাবে এর লগে সংসার করবে? ওরে বাবা! বাসর রাতে যদি বউয়ের দিকে ওই চিল-শকুন মার্কা চোখে তাকায়, তবে তো ওই মেয়ের বাসর করা আর লাগবে না! বউ বেচারী ওই রাতেই ব্যালকনি থেকে নিচে ঝাঁপ দিয়ে বলবে—'স্বামী গো! তোমার ওই আঁখির তীব্র ঝলক দেখে আমি আর সহ্য করতে পারছি না, আমি আজই মর্তে যাচ্ছি গোওও!'"
নিধির এই চরম নাটুকে সংলাপ আর মুখভঙ্গি দেখে এতক্ষণের ভয়ের মেঘ কেটে বাকি সবার পেটে খিল ধরার দশা হলো। ফুটপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে রাইসা আর আলো হাসতে হাসতে প্রায় নুয়ে পড়ল। এতক্ষণ ধরে আদ্রর ভয়ে কুঁকড়ে থাকা প্রেয়সী এবার যেন নিজের মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দেওয়ার দারুণ একটা সুযোগ পেয়ে গেল। সে নিধির কাঁধে সজোরে একটা চাপড় মেরে, চোখ-মুখ কুঁচকে সায় দিয়ে বলল, "তোর মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক নিধি! তুই এতদিনে একদম আমার মনের খাঁটি কথাটাই বলেছিস! লোকটা একটা আস্ত জল্লাদ। যেখানে-সেখানে যখন-তখন শুধু মানুষের দিকে ওইরকম করে চোখ দেখায়! সারাক্ষণ চেহারাটা এমন তিতা করে রাখে, মনে হয় যেন দুনিয়ায় চোখ রাঙানো ছাড়া আর কোনো কাজই নেই তার! একটা চরম বেহায়া লোক!"
প্রেয়সীর এই চরম বিরক্তিভরা মন্তব্য শুনে তানিয়া ফিসফিস করে হেসে উঠল। পুরো মেয়েদের দলটা আবার এই খুনসুটি আর হাসাহাসির মাঝেই পা চালাল কোচিং সেন্টারের দিকে। দুপুরের সেই কড়া রোদ, পড়াশোনার ক্লান্তি আর আদ্র শাহরিয়ারের দেওয়া অহেতুক ভয়ের আবহাওয়াটা যেন এই বান্ধবীদের আড্ডার জোরে উধাও হয়ে গেল।
কোচিংয়ে ঢোকার পর অবশ্য আর হাসাহাসির সুযোগ থাকল না। পরীক্ষার পর নতুন ক্লাস শুরু হওয়ায় পড়ালেখার চাপটাও একটু বেশিই ছিল। টানা দুই ঘণ্টা শিক্ষকের লেকচার, নোট নেওয়া আর পড়া বোঝার পর যখন ঘড়িতে বিকেলের ম্লান আলো উঁকি দিচ্ছে, তখন শেষমেশ কোচিংয়ের ক্লাস শেষ হলো। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বের হতেই চারপাশের চেনা কোলাহল কানে এলো।
কোচিং সেন্টারের গেটের সামনে এসে নিধি, রাইসা আর আলো তাদের নিজেদের বাড়ির রাস্তার দিকে যাওয়ার জন্য বিদায় নিল। এবার অবশ্য ভাগ্য ভালো ছিল, দুপুরের মতো রিকশার আকাল ছিল না। রাস্তার মোড়েই একটা খালি রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তানিয়া আর প্রেয়সী আর দেরি করল না। দুজনে ধপ করে হুড তোলা রিকশাটায় উঠে বসল। রিকশাচালক মামা প্যাডেলে চাপ দিতেই মৃদু হাওয়া এসে প্রেয়সীর কপালে ঝুলে থাকা চুলগুলোকে ছুঁয়ে গেল। সারাদিনের এত ধকল, ভয় আর উত্তেজনার পর অবশেষে দুই বোন নিজেদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো, যদিও প্রেয়সীর অবচেতন মনের কোথাও না কোথাও ওই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরা গম্ভীর মানুষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা তখনো একটা স্থায়ী ছায়া ফেলে রেখেছিল।
চলবে.....