ফন্ট সাইজ:
থিম:
আদ্রের হৃদয়ের প্রেয়সী

৫ম পর্ব

লেখক: তাসনিয়া ফাইজা
আদ্রের হৃদয়ের প্রেয়সী
লেখক: তাসনিয়া ফাইজা

হঠাৎ করেই রাতের বেলা তানিয়া ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। তীব্র জ্বরে মেয়েটার শরীর যেন পুড়ছে। বিকেলে বাসায় আসার সময় প্রেয়সী কত বারণ করেছিল—এই ভ্যাপসা গরমে একসাথে দুটো আইসক্রিম না খেতে! কিন্তু তানিয়া কার কথা শোনে? অবাধ্যতার চরম মাশুল দিয়ে মেয়েটা এখন বিছানায় কাতরাচ্ছে, আর প্রেয়সী পড়েছে মহা বিপাকে।

​তানিয়ার এই তীব্র জ্বরের কারণে আজ আর সে কলেজে যেতে পারল না। অগত্যা প্রেয়সীকে আজ একাই কলেজের উদ্দেশ্যে বের হতে হলো। তাদের বাড়ির সামনে সকাল সকাল তেমন রিকশা পাওয়া যায় না। তাই কিছুটা পথ হেঁটে গিয়ে সে একটা খালি রিকশা পেয়ে উঠে বসল। কোলের ওপর বই-খাতার ব্যাগটা চেপে ধরে, দুই হাত তার ওপর রেখে প্রেয়সী শূন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। চারপাশ জুড়ে সকালের চেনা ব্যস্ততা—সবাই হন্যে হয়ে অফিসে ছুটছে।
​ব্যস্ত মানুষগুলোকে দেখে আচমকা প্রেয়সীর নিজের বাবার জন্য খুব মায়া হলো। ফারহান চৌধুরীও নিশ্চয়ই প্রতিদিন তার জন্য এভাবেই হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন, কত কষ্ট করেন! তানিয়ার সাথে একা একা কলেজে আসা-যাওয়া শুরু করার পর থেকেই প্রেয়সী বুঝতে পেরেছে, বাবার ছায়ায় থাকা আর একা চলার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। বাবা পাশে থাকলে নিজের সব কষ্ট, সব আবদার অনায়াসে তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায়, আর সেই মানুষটাও নিঃসংকোচে সব কষ্ট হাসিমুখে বুকে টেনে নেন।
​কিন্তু কলেজে ওঠার পর থেকে ফারহান চৌধুরী ব্যবসার কাজে বড্ড বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কলেজে যাওয়ার আগের দিন রাতে তিনি প্রেয়সীর দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেছিলেন, "আমি তোকে স্বাধীনতা দিচ্ছি মা, আমার বিশ্বাস তুই তার মর্যাদা ধরে রাখবি। তোর জন্মের পর আমি দ্বিতীয় কোনো সন্তান নিইনি, কারণ তুই-ই আমার সব আশা, সব ভরসা। দিনশেষে তুই-ই আমার সব। আমার কোনো ছেলের দরকার নেই, আমার মেয়েই আমার সব। বুঝতে পেরেছিস? জানি তুই কম বুঝিস না, কম বুঝলে কি আর সবসময় স্কুলে প্রথম স্থানটা তোর দখলে থাকত! বিয়ের দীর্ঘ ১০ বছর পর যখন তোর মা সালমার কোলে তুই এলি, তখন আমাদের চেয়ে খুশি এই পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না। তুই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, প্রেয়সী।"
​বাবার সেই আবেগঘন কথাগুলো মনে পড়তেই প্রেয়সীর নরম মনটা হু হু করে উঠল, চোখ দুটো কানায় কানায় নোনা জলে ভরে গেল।
​অফিস টাইম হওয়ায় রাস্তায় তখন প্রচুর জ্যাম। রিকশাটা জ্যামে আটকে থাকাকালীন প্রেয়সী একটু ঘাড় ঘোরাতেই তার কলিজা শুকিয়ে গেল! পাশের লেনে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রর সেই চেনা ব্ল্যাক মার্সিডিজ। আদ্র গাড়ি থেকে নামছে। প্রেয়সী ঝটপট রিকশার হুডটা টেনে ওপরে তুলে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করল। সে নিজেকে লুকাতে পারল কি না জানে না, তবে ভয়ে দুই হাত দিয়ে নাক থেকে থুতনি পর্যন্ত পুরো মুখটা চেপে ধরে রইল। জ্যাম একটু কমতেই সে তড়িঘড়ি করে রিকশা ভাড়া মিটিয়ে ফুটপাত ধরে দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করল।
​কিন্তু বিধি বাম! পেছন থেকে সেই গম্ভীর, অতি পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল— "আরে! দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছ যে? নাটক করছ, নাকি চোখ দুটো অন্ধ তোমার? অন্ধ হলে বলো, আমার মতো মানুষকে দেখার জন্য আলোর ব্যবস্থা করে দিই!"
​প্রেয়সী না শোনার ভান করে হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই আদ্র এক দীর্ঘ পদক্ষেপে এসে খপ করে প্রেয়সীর স্কুল ব্যাগের ফিতেটা টেনে ধরল। প্রেয়সীর পুরো শরীর ভয়ে থমকে গেল। সে পেছনে না তাকিয়েই আরষ্ট গলায় বলল, "ছাড়ুন! আমাকে ছাড়ুন!"
​আদ্র ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল, "আরে, আমি তো এখনো ধরিইনি! ধরার আগেই 'ছাড়ুন ছাড়ুন' বলাটা ঠিক হজম হচ্ছে না, ম্যাডাম। আগে ভালো করে ধরি, তারপর না হয় এই ডায়লগটা মারবেন। তারপর ভেবে দেখব ছাড়ব কি না।"
​আদ্রর এমন লাগামহীন, দ্ব্যর্থবোধক কথায় প্রেয়সী লজ্জায় ও অপমানে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে গেল। একটা লোক প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে এত বেফাঁস কথা কীভাবে বলতে পারে! সে নিজের ব্যাগটা ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে করতে ঝাঁঝালো গলায় বলল, "অসভ্য লোক একটা! নেতা হয়েছেন বলে এখন রাস্তায় মেয়েদের হাত-ব্যাগ ধরে টানাটানি করবেন?"
​আদ্রর ভ্রু দুটো কুঁচকে একাকার হলো। সে হেয়ালি কণ্ঠে বলল, "ব্যাগ কেন? দরকার হলে সব ধরে টানব। যদি ছাড়িয়ে নেওয়ার সাধ্য থাকে, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারো!" পরক্ষণেই তার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো, "আমার এলাকায় থেকে আমারই পিছে বদনাম করছিস তুই? তোর সাহস তো কম না!"
​প্রেয়সী রাগের মাথায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "একশ বার বলব! দেখি আপনি কী করেন! রাস্তা কি আপনার একার নাকি যে আমি কিছু বলতে পারব না? আর আমার ব্যাগ ছাড়ুন, হাতও ছাড়ুন। এগুলো তো আর আপনার বাপের সম্পত্তি না, বেহায়া লোক কোথাকার! সব কি আপনার নাকি?"
​'বেহায়া লোক' আর 'বাপের সম্পত্তি'—এই দুটো কথা শোনা মাত্রই আদ্র শাহরিয়ারের ভেতরের হিংস্র জানোয়ারটা জেগে উঠল। সে নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। এক ঝটকায় প্রেয়সীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সজোরে তার ডান গালে একটা কড়া থাপ্পড় বসিয়ে দিল! 'ঠাস!'
​প্রেয়সী কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আদ্র দ্বিতীয় থাপ্পড়টা মারল একই গালে।
​প্রেয়সী দুই হাত দিয়ে নিজের গাল চেপে ধরে ফুটপাতে হো হো করে কেঁদে উঠল। এতক্ষণ ধরে যে ভয়টা তার মনের ভেতর ছিল, আজ সেটাই সত্যি হলো। কেন সে এই জল্লাদের সাথে মুখ লাগাতে গেল? এখন সবার সামনে তাকে এভাবে অপমানিত হতে হলো!
​আদ্রর চোখ দুটো তখন রাগে কাঁপছে। সে গম্ভীর গলায় গাড়ির দিকে তাকিয়ে ডাকল, "শুভ! আমার গানটা নিয়ে আয় তো। এই মেয়ে বড্ড বেশি কথা বলে। আমার প্রতিটা কাজে বাধা দেয়, আমাকে অমান্য করে। আমার সাম্রাজ্যে অমান্যকারী মানুষ আমি একদম পছন্দ করি না। এদের বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো।"
​শুভ এতক্ষণ গাড়িতে বসেই সব দেখছিল। আদ্রর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সে ড্যাশবোর্ড থেকে পিস্তলটা বের করে হন্তদন্ত হয়ে আদ্রর কাছে ছুটে এলো। আদ্র এক ঝটকায় শুভর হাত থেকে চকচকে কালো পিস্তলটা নিজের হাতে নিল।
​পরমুহূর্তেই পিস্তলের ঠান্ডা ট্রিগার পয়েন্টটা সরাসরি গিয়ে ঠেকল প্রেয়সীর কপালে। কপালে অস্ত্রের স্পর্শ পেতেই প্রেয়সী আতঙ্কে আরও জোরে কেঁদে উঠল। মেয়েটার কান্না দেখে মনে হচ্ছিল সে যেন চোখ দিয়ে বালতি বালতি পানি জমিয়ে রাখে, যা দেখলেই ঝরঝর করে ঝরে পড়ে।
​আদ্র দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে ধমকে উঠল, "এই চুপ! একদম চুপ! আর একটা আওয়াজ যদি মুখ থেকে বের হয়, তবে এই ট্রিগারে একটা চাপ দেব। কপালের মাঝখানটা এক্কেবারে ফুটো হয়ে ওপাশ দিয়ে গুলি বেরিয়ে যাবে। চাস তুই তেমনটা? যদি না চাস, তবে মুখে তালা দে!"
​প্রেয়সী ভয়ে নিজের মুখটা শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, কিন্তু অবাধ্য চোখ বেয়ে নোনা জল তখনো গড়াতে লাগল। দৃশ্যটা দেখে শুভর মনে কিছুটা মায়া লাগলেও সে মুখ খোলার সাহস পেল না। কারণ সে জানে, এখন আদ্রকে থামাতে গেলে আদ্র তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেবে। তাই সে নিস্তব্ধ দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
​আদ্র পিস্তলটা প্রেয়সীর কপালে চেপে ধরেই শান্ত কিন্তু বিষাক্ত গলায় বলল, "তুই তো জিজ্ঞেস করলি না যে তোকে থাপ্পড়গুলো কেন দিলাম? তোর ভাগ্য ভালো যে জিজ্ঞেস করিসনি। করলে কালকের অপরাধের সুদে-আসলে আরও দুটা থাপ্পড় গালে জুটত।"
​সে প্রেয়সীর কপালে পিস্তলটা আরও একটু জোরে চেপে ধরে বলল, "প্রথম থাপ্পড়টা দিয়েছি কারণ তুই কালকে জনসমাবেশের মাঝে মানুষের গায়ের ওপর পড়ছিলি। তোকে বারণ করার পরও তুই নিয়ম ভেঙেছিস। আর দ্বিতীয় থাপ্পড়টা দিয়েছি কারণ তুই আমার এলাকায় দাঁড়িয়ে আমাকেই 'মন্দ' আর 'বেহায়া' বলেছিস।"
​অসহায় প্রেয়সী ঠোঁট উল্টে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার ইচ্ছে করছিল মাটিতে বসে পা ছড়িয়ে কাঁদতে, কিন্তু কপালে তখনো মৃত্যুর ঠান্ডা পরশ লেগে আছে। এই লোকটা একটা আস্ত শয়তান! সব কিছু ডায়েরির পাতার মতো মনে রেখে, হিসাব কষে কষে মারল। এইরকম একটা জানোয়ারকে মানুষ কীভাবে নেতা বানায়?
​আদ্র প্রেয়সীর চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আর কখনো এমন হবে?"
​প্রেয়সী ভয়ে দ্রুত দুই দিকে মাথা নেড়ে 'না' বোঝাল।
​আদ্র আবার চোখ রাঙিয়ে ধমক দিল, "মুখে বল! কাজের সময় মুখ দিয়ে বুলি ফোটে না?"
​প্রেয়সী কেঁপে উঠে তোতলামো গলায় বলল, "না... না... আর করব না।"
​"ভেরি গুড গার্ল!" আদ্র পিস্তলটা কিছুটা নামিয়ে এনে ঠোঁটের কোণে উপহাসের হাসি ফুটিয়ে বলল, "এখন দেখি, সুন্দর করে আমার নামে একটু প্রশংসা কর তো।"
​প্রেয়সী কোনোদিন মিথ্যা প্রশংসা করতে শেখেনি। আর যদি পারেও, তবে এই জল্লাদের প্রশংসা সে কোন সুখে করবে? যে তাকে বারবার এভাবে অপমান করে, গায়ে হাত তোলে! কিন্তু নিজের জীবন বাঁচাতে সে শুকনো ঢোক গিলে কাঁপাকাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, "আ... আপনি অনেক ভালো। অনেক ভালো মানুষ আপনি। আপনার মতো গুণধর নেতা যেন দেশের প্রতিটা এলাকায়, জেলায় জেলায়, দেশে দেশে জন্ম নেয়। আমি ধন্য যে আপনার এলাকায় থাকি। আপনার মতো মহৎ আর ভালো মানুষ আমি জন্মের পর দ্বিতীয়টি দেখিনি।"
​কথাগুলো বলে প্রেয়সী ভয়ার্ত চোখে আদ্রর দিকে তাকাল। লোকটার মন গলল কি না, সে বুঝতে পারল না। আদ্র শুভকে ডেকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, "এই শুভ, তোর কাছে কি এর কথাগুলো সত্যি মনে হলো, নাকি বানানো?"
​শুভ প্রথমে আমতা আমতা করে বলল, "হ্যাঁ স্যার..."
​আদ্র সাথে সাথে শুভর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল। শুভ চট করে পাল্টি খেয়ে বলল, "না... না ভাইয়া! এক্কেবারে বানানো লাগছিল।"
​আদ্র শুভর দিকে তাকিয়ে বলল, "হয়েছে, এবার তুই যা। তোকে আর লাগবে না।" শুভ মনে মনে জান বাঁচিয়ে আস্থার নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত গাড়ির দিকে কেটে পড়ল।
​আদ্র এবার প্রেয়সীর দিকে ঝুঁকে বলল, "দেখলি? তোর কথাগুলো যে কত বড় মিথ্যা, তা শুভও ধরে ফেলেছে।" প্রেয়সী মাথা নিচু করে রইল, তার আর কিছু বলার ভাষা ছিল না। আদ্র তার চিবুকটা পিস্তলের নল দিয়ে আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল, "আমার এলাকায় থাকলে আমি যেভাবে বলব, তোকে সেভাবেই থাকতে হবে। আমি যেমনটা চাইব, তেমনটাই হবে। আমার নজর সারাক্ষণ তোর ওপর থাকবে। আজ থেকে যারা আমার নিয়ম অমান্য করবে, তাদের আমার এলাকায় কোনো জায়গা নেই। আর তোকে তো আমি সেই তালিকার একদম প্রথমে রেখেছি। তোর ওপর আমার পুরো নজর আছে।"
​প্রেয়সীর মুখে তখন কোনো শব্দ নেই, সে শুধু এক দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। আদ্র পিস্তলটা নিজের কোমরে গুঁজে ঠান্ডা গলায় বলল, "যা, এবার কলেজে যা।"
​প্রেয়সী আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। যেন খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া কোনো হরিণী! সে এক দৌড়ে রাস্তার ওপারে চলে গেল। ডানে-বামে কোনো দিকে না তাকিয়ে, মাথা একদম নিচু করে, পুরো মনোযোগ দিয়ে সোজা ফুটপাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার পুরো শরীর তখনো কাঁপছিল। কী ভয়ানক আর মারাত্মক একটা মানুষের মুখোমুখি হয়েছিল সে! ভাবতেই তার বুকটা আবার দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল।
দিন পেরিয়ে রাত হচ্ছে, রাত পেরিয়ে দিন। সময় কারো জন্য থেমে নেই। সবাই যার যার জায়গায় চলমান। কে বলে একজন মানুষ আরেকজনের জন্য থেমে থাকে? আদৌ কি তা সম্ভব? প্রকৃতি নিজেই তো কারো জন্য থামে না, নিজের রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে সবসময় অনন্তকাল চলছে আর চলতে থাকবে।
​দেখতে দেখতে একটা মাস কেটে গেল। এই এক মাসে প্রেয়সীর সাথে আদ্রর আর কোনো দেখা হয়নি। আদ্র নিজের কাজে নিউ ইয়র্কে (New York) আছে। যদিও প্রেয়সী আদ্রকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, তবে সে জানে না আদ্র দেশে নেই—আর জানলেই বা কী আর না জানলেই বা কী! তার জীবন তার মতো আর আদ্রর জীবন আদ্রর মতো।
​আসলে সময়ই বলে দেয় কার জীবনের সাথে কার জীবনের সম্পর্ক। আস্তে আস্তে সব অদৃশ্য সম্পর্কের সুতো দৃশ্যমান হয়। কেউ তা মেনে নেয়, আর কেউ তা মেনে নিতে পারে না।
​এপ্রিল মাস চলমান। কাঠফাটা রোদ আর তীব্র গরম। কলেজ থেকে তানিয়াকে সাথে নিয়ে বের হলো প্রেয়সী। গরমে প্রেয়সীর কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। তানিয়ার হাতে প্র্যাক্টিক্যাল খাতা। তানিয়া মেয়েটাও আজব! এই চৈত্র-বোশেখের গরমেও নাকি সে ফুচকা খাবে। সব করতে পারুক আর না পারুক, ফুচকা খাওয়া সে বাদ দিতে পারবে না—আস্ত একটা আজব মেয়ে!
​তানিয়া প্র্যাক্টিক্যাল খাতাগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, কাঁধে আবার ভারী কলেজের ব্যাগও আছে। তানিয়ার এই করুণ অবস্থা দেখে প্রেয়সী বলল, "তানিয়া, তুই এক কাজ কর। তুই সোজা কোচিংয়ে গিয়ে বস। আমি ফুচকা প্যাক করিয়ে নিয়ে আসছি। তুই যেভাবে খাতাগুলো ধরেছিস, রাস্তায় সব ফেলবি! তার চেয়ে ভালো আমার কষ্ট বিফলে যাওয়ার আগে তুই কোচিংয়ে যা।"
​বলার দেরি, কিন্তু তানিয়ার ছোটোছুটি করার দেরি হলো না! ওমনি তানিয়া লাফাতে লাফাতে কোচিংয়ের দিকে রওনা দিল। একটু আগে যে মেয়ে গরমে দাঁড়াতে পারছিল না, ফুচকার নাম শুনে আর প্রেয়সী প্যাক করে আনবে বলাতে ওমনি এক দৌড়ে চলে গেল! তানিয়ার এমন কাণ্ড দেখে প্রেয়সী কিঞ্চিৎ হেসে ফুচকার দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
​রাস্তায় বেশ ভিড়। ব্যাগ থেকে রুমাল বের করে কপালে জমে থাকা ঘামটা মুছে নিল সে। আজকেই এত ভিড় হতে হলো? আর কী মারাত্মক গরম!
​ঠিক তখনই প্রেয়সীর পেছন থেকে একটা গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো— "আমায় চিনতে পারছেন, আপু?"
​পেছন ফিরতেই প্রেয়সীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তবে ছেলেটাকে সে চেনে; সিয়াম ভাইয়ের সাথে দেখেছে আগে। হয়তো ভাইয়ের বন্ধু বলেই ডাকছে। ছেলেটা দেখতে খারাপ না, বেশ ভদ্র পরিবারের বলেই মনে হলো। তাই প্রেয়সী ভদ্রতার সাথে সালামের উত্তর দিয়ে বলল, "জি ভাইয়া, কিছু বলবেন?"
​মিরাজ নামের সেই ছেলেটি ভদ্রতার সাথে কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে বলল, "আপু, আপনি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? আপনার তো এখন কোচিংয়ে থাকার কথা। এটা দাঁড়িয়ে থাকার মতো ভালো জায়গা না, এখানে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকা আপনার জন্য ঠিক হবে না। আপনি বরং ভেতরে কোচিংয়ে গিয়ে বসুন, আমি ফুচকা পাঠিয়ে দিচ্ছি। কয় প্লেট লাগবে শুধু বলে দিন।"
​মিরাজের কথা শুনে প্রেয়সীর মাথার ওপর দিয়ে সব গেল! এই ছেলে এমন করে বলছে কেন? আর সে এখানে ফুচকার দোকানের সামনে দাঁড়ালে সমস্যাটাই বা কী? আজকাল সে কোথাও শান্তিতে দাঁড়াতেও পারে না! কোনো না কোনো ছেলে এসে তাকে দাঁড়াতে বারণ করে। মিরাজ অবশ্য বেশ ভদ্রতা করেই কথা বলছে, কিন্তু তা বলে তাদের এত মাথাব্যথা কেন? প্রেয়সী জানে এই ছেলেগুলো রাজনীতি করে, সিয়াম আর ওদের একসাথে প্রায়ই দেখা যায়। হয়তো সিয়াম ভাই-ই একে বলে রেখেছে, নাকি অন্য কিছু? প্রেয়সী আর বেশি মাথা ঘামাল না।
​ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতেই মিরাজ হাত নেড়ে বাধা দিয়ে বলল, "আপু, টাকা লাগবে না। ভাইয়া বলেছে আপনার যা লাগবে সব দিতে, আর টাকা যেন না নিই। আর ভাইয়া..." মিরাজ কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল, যেন কিছু একটা লুকাতে চাইল। তারপর বলল, "আচ্ছা, এই সব বাদ দিন। আপনি কয় প্লেট লাগবে বলুন।"
​ছেলেটা 'আর ভাইয়া...' বলতে বলতে কেন থেমে গেল? ও নিশ্চয়ই সিয়াম ভাইয়ের কথাই বলছিল, কারণ সিয়াম তো ওর বন্ধু। প্রেয়সী সুন্দর করে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে ভদ্রতার সাথে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে, দুই প্লেট দিন।"
​কথাটা বলেই প্রেয়সী আর দেরি না করে কোচিংয়ের দিকে চলে গেল। কোচিংয়ে ঢুকতেই প্রেয়সীকে খালি হাতে আসতে দেখে তানিয়া মুখ কালো করে বলল, "ফুচকা কই? তুই আনিসনি তো? আমি জানতাম তুই বেশিক্ষণ দাঁড়াবি না। আলসে মেয়ে একটা! নিজের জন্যও আনিসনি? এখন আর কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না, তুই মোটেও ভালো না!"
​প্রেয়সী তাড়াহুড়ো করে তানিয়ার পাশে বেঞ্চে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আরে ধুর, আগে আমার কথাটা তো শোন! ভাইয়া ফুচকা পাঠাচ্ছে। আমি তো দাঁড়িয়েই ছিলাম, পরে সিয়াম ভাইয়ের এক বন্ধু... উম্ম নামটা আসলে মিরাজ, হ্যাঁ! ওই মিরাজ ভাইয়া এসে বলল আমাকে ওখানে দাঁড়িয়ে না থাকতে। ভাইয়া নাকি বলেছে আমার যা লাগবে সব এনে দিতে আর টাকাও নিতে বারণ করেছে। অনেক জোরাজুরি করার পর আমি চলে আসছি, টাকা দিতে চাইলেও নেয়নি।"
​তানিয়ার দুঃখী মুখে এক নিমিষে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি বজায় রেখেই সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, "মিরাজ ভাইয়া তো সিয়াম ভাইয়ের বন্ধু, তাই না রে?"
​প্রেয়সী মাথা ওপর-নিচ নেড়ে সায় দিল।
​মিনিট কয়েকের ব্যবধানে ফুচকার দোকানের এক কর্মচারী এসে তাদের সামনে পার্সেল দিয়ে গেল। দুই প্লেট দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেই জায়গায় লোকটা বড় বড় পাঁচটা প্যাকেট সামনে রেখে গেল!
​প্রেয়সী অবাক হয়ে বলল, "আঙ্কেল, আমরা তো দুই প্যাকেট বলেছিলাম, পাঁচ প্যাকেট না!"
​দোকানের লোকটা রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলল, "আপু, এত কথা বলবেন না। আপনারা খুশি হলে ভাইয়া খুশি হবে, আর ভাইয়া খুশি মানে আমরা সবাই খুশি। আপনারা খেয়ে নিন।"
​হঠাৎ ফুচকাওয়ালার মুখের এমন অদ্ভুত কথা শুনে তানিয়া আর প্রেয়সী অবুঝের মতো একে অপরের দিকে তাকাল। লোকটা প্যাকেটগুলো রেখে চলে গেল। দুই বোন মনে মনে ভাবল—সিয়াম ভাইয়ার হঠাৎ এত ভালোবাসা উথলে উঠল কেন? যিনি নিজে বাইরের খাবার খেতে সবসময় বারণ করেন, তিনিই আজ এভাবে নিজে থেকে পাঁচ প্যাকেট ফুচকা পাঠাচ্ছেন, তাও আবার টাকা ছাড়া!
​তারা দুজনেই ধরে নিল এটা সিয়ামেরই কাজ, কিন্তু পেছনের আসল সুতোটা যে অন্য কারো হাতে, তা তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
বাসায় এসেই প্রেয়সী ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। হাত-পায়ের টানটান ক্লান্তি যেন এতক্ষণে ডানা মেলছে। ওদিকে তানিয়া তখন রুমের ভেতর কোমরে হাত দিয়ে গম্ভীর মুখে পায়চারি করছে। তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ। তানিয়াকে ওভাবে ছটফট করতে দেখে প্রেয়সী জামার হাতা গুটিয়ে বলল, "কী রে? এত কী ভাবছিস তুই? আমাকে বল তো বোন। ফুচকা খাওয়ার পর থেকে তোর মুখটা এমন তিতা হয়ে আছে কেন?"
​তানিয়া আচমকা থমকে দাঁড়াল। তারপর প্রেয়সীর দিকে তর্জনী আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল, "চুপ! এক্কেবারে চুপ থাক প্রেয়সী! বেশি কথা বললে আজ তোর হাড়গোড় ভেঙে ঘরে বসায় রাখব। তুই যতটা সোজা ভাবছিস, ব্যাপারটা অত সোজা না। এই 'ভাইয়া' নিশ্চয়ই সিয়াম ভাইয়া না, অন্য কোনো ভাইয়া হবে!"
​প্রেয়সী চোখ কপালে তুলে বলল, "মানে? অন্য ভাইয়া মানে কী?"
​"মানে তুই বুঝিস না?" তানিয়া তপ্ত একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "তুই ইদানীং রাস্তায় দাঁড়ালেই 'আপু আপু' বলে ছেলেদের লাইন লেগে যাচ্ছে! একজন এসে বলে সাবধানে যান, আরেকজন এসে টাকা ছাড়া পাঁচ প্যাকেট ফুচকা দিয়ে যায়! কিসব অদ্ভুত কথা—'ভাইয়া খুশি তো আমরা খুশি!' কোনো সাধারণ চেনা মানুষ এভাবে লোক দিয়ে ফুচকা পাঠায় না। কেউ যদি দূর থেকে এসব নোটিশ করে আর বাসায় গিয়ে আব্বু-আম্মুকে বলে, তবে কী কেলেঙ্কারিটা হবে তুই বুঝতে পারছিস?"
​প্রেয়সী তানিয়ার এমন অতি-চিন্তা দেখে একটু হেসে ফেলল। সে বিছানা থেকে উঠে আলনা থেকে চেঞ্জের কাপড় হাতে নিয়ে বলল, "তুই এত শিউর কীভাবে হচ্ছিস যে এটা সিয়াম ভাইয়া না? ওনারই তো বন্ধু মিরাজ। আমাদের কলেজ আর কোচিং বাসা থেকে বেশ দূরে, তাই হয়তো ভাইয়া তাঁর বন্ধুদের বলে রেখেছেন আমাদের একটু খেয়াল রাখতে। তুই নিজেও অহেতুক টেনশন নিচ্ছিস, আর আমাকেও দিচ্ছিস বোন। সিয়াম ভাই ছাড়া আর কে আমাদের এত খোঁজ রাখবে?"
​তানিয়া এবার দুই হাত বুকের ওপর বেঁধে মুখটা বাঁকিয়ে বলল, "তুই এত শিউরিটি দিয়ে কীভাবে বলছিস শুনি? সিয়াম ভাই কি তোকে নিজে ফোন করে বলেছে যে আমি ফুচকা পাঠিয়েছি?"
​প্রেয়সী বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে মুচকি হেসে বলল, "এত যখন সন্দেহ তোর মনে, তবে এক কাজ কর—ভাইয়াকে ফোন করে নিজেই জিজ্ঞেস কর। দুপুরের ফুচকার থ্যাংকসও দেওয়া হবে, আর তোর মনের খুতখুতানিও দূর হবে।"
প্রেয়সী বাথরুম থেকে চেঞ্জ করে বের হতেই তানিয়া তার হাত ধরে টেনে একপ্রকার জোর করেই রুম থেকে বের করল। দুই বোন পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। ড্রয়িং রুমে এই মুহূর্তে পুরুষ মানুষদের কেউ নেই। বাবা আর চাচারা সবাই সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় একদম নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে যান আর নির্দিষ্ট সময়েই বাসায় ফেরেন। এখনো তাঁদের ফেরার সময় হয়নি। ওদিকে রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আর সুঘ্রাণ ভেসে আসছে; মা আর চাচিরা সবাই মিলে রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত।
​ড্রয়িং রুমের সোফায় বেশ আরাম করে বসে টিভি দেখছিল সিয়াম। নিচে নেমেই তাকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে দুই বোনের বুকটা কেমন যেন ছলাৎ করে উঠল। তানিয়া চট করে প্রেয়সীর পিঠে একটা মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "যা! ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করে আয়!"
​প্রেয়সী চোখ বড় বড় করে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসানি গলায় আপত্তি জানাল, "আমি কেন একা যাব? তুইও চল আমার সাথে! এক সাথে দুইজনে গিয়ে জিজ্ঞেস করি চল।"
​তানিয়া মুখটা বাঁকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল, "ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করার আইডিয়াটা দিয়েছিল কে, শুনি?"
প্রেয়সী কোনো রকম দ্বিধা না করেই বলল, "কে আবার? আমি দিয়েছি!"
তানিয়া ওমনি বাঁকা হেসে বলল, "তাহলে জিজ্ঞেসটাও তুই-ই করবি! যা, আগে বাড়।"
প্রেয়সী আমতা আমতা করে বলল, "কিন্তু..."
​তার কথা মাঝপথেই কেড়ে নিয়ে তানিয়া আবার ধাক্কা মেরে বলল, "কোনো কিন্তু-টিনতু কিছু না! যা, ভাইয়াকে জিজ্ঞেস কর।"
​দুই বোনের এই ফিসফিসানি আর একে অপরকে ধাক্কাধাক্কি করার পর্ব যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই সিয়ামের চোখ গেল সিঁড়ির গোড়ার দিকে। সে দেখল তার দুই বোন চোরের মতো দাঁড়িয়ে একে অপরকে ঠেলছে। সিয়ামের কপালে কিঞ্চিৎ সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে টিভির রিমোট দিয়ে সাউন্ডটা কিছুটা কমিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখানো গলায় বলল, "কী হয়েছে তোদের? এনি প্রবলেম?"
​ভাইয়ার আওয়াজ পেয়ে তানিয়া শেষবারের মতো প্রেয়সীকে একটা মোক্ষম ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে দিল এবং চোখ দিয়ে ইশারা করল যেন এখনই ফুচকার কথাটা পাড়ে। প্রেয়সী এবার মনে মনে নিজেকে চরম একটা গালি দিল। কেন যে সে বাথরুমে যাওয়ার আগে তানিয়াকে ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করার বুদ্ধিটা দিতে গেল! না বললে আজ তানিয়া তাকে এভাবে ফাঁসাচ্ছো না।
​চাচাতো ভাই হলেও সিয়ামকে তারা বেশ সমীহ করে চলে। এখন তাকে ফুচকার কথা বলতে গিয়ে সে যদি উল্টাপাল্টা কিছু মনে করে? যদিও সিয়াম ভাইয়া তেমন মানুষ নয়, যথেষ্ট ভালো আর কেয়ারিং, তাও কেমন একটা দ্বিধা কাজ করছে প্রেয়সীর মনে। আর এই তানিয়া মেয়েটারও এত কিছু জানার কী দরকার! যে-ই ফুচকা পাঠাক আর প্রটেক্ট করুক, লাভ তো আলটিমেটলি তাদেরই হয়েছে—বিনা টাকায় পাঁচ প্লেট ফুচকা পেটে গেছে! এই মেয়েটা যে কেন লাভ-লস বোঝে না, কে জানে!
​প্রেয়সী কোনোমতে মুখের ওপর একটা কাঁচুমাচু হাসি ফুটিয়ে সোফার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে গেল। সিয়াম সোফায় সোজা হয়ে বসে বলল, "কী রে প্রেয়সী, কিছু বলবি? তানিয়া তোকে ওভাবে ঠেলছিল কেন?"
প্রেয়সী একটা বোকা বোকা হাসি দিয়ে সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল, "জি ভাইয়া, আসলে... তোমার ফ্রেন্ড একটা আছে না, মিরাজ?"
সিয়াম টিভির দিক থেকে চোখ না সরিয়েই মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ, মিরাজ। কেন, কী হয়েছে?"
প্রেয়সী আমতা আমতা করে আসল কথাটা পেড়ে ফেলল, "ভাইয়া, তুমি কি আমাদের জন্য ওনাকে বলেছ ফুচকা কিনে দিয়ে আসতে? আই মিন... আমাদের ফুচকার ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে বারণ করতে বা ফুচকা পাঠাতে বলেছ?"
​"ফুচকা?" সিয়াম এবার টিভি থেকে চোখ সরিয়ে পুরো ঘুরে বসল। তার দুই ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল। সে বেশ অবাক হয়ে বলল, "কই, না তো! আমি মিরাজকে তোদের ব্যাপারে কিছুই বলিনি। কী হয়েছে বল তো? কেউ কিছু বলেছে তোদের? খুলে বল, তোর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।"
​সিয়ামের এই পরিষ্কার 'না' শুনে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তানিয়ার পুরো শরীর বরফ হয়ে গেল। তার মনের ভেতর যে ভয়টা ছিল, সেটাই সত্যি হলো! সে আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। খপ করে এসে প্রেয়সীর হাতটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে জোর করে হাসার চেষ্টা করে সিয়ামকে বলল, "না... না ভাইয়া! কিছু হয়নি আসলে। আমাদের একটু পড়া আছে, আমরা যাই হ্যাঁ!"
​বলেই তানিয়া প্রেয়সীকে টেনে প্রায় হিড়হিড় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজেদের রুমের দিকে নিয়ে চলল। প্রেয়সী মনে মনে ভীষণ রেগে গেল। এতক্ষণ ধরে মেয়েটা তাকে ঠেলে ঠেলে সিয়াম ভাইয়ের সামনে পাঠাল কথা বলার জন্য, আর যখন আসল সত্যটা জানতে গেল, ওমনি মাঝপথে হাত ধরে টেনে হিড়হিড় করে ঘরে নিয়ে আসছে! আস্ত একটা আজব আর পাগল মেয়ে!
​রুমে ঢুকে দরজাটা সজোরে আটকে দিয়েই তানিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রেয়সীর মাথায় ঠাস করে একটা গাট্টা মারল। তারপর নিজের মুখটা চরম বিকৃত করে ভেংচি কাটার মতো করে বলল, "বলছিলি না—'এত টেনশন করিস না বোন, প্যারা নিস না, চিল! ভাইয়াই হবে!' এখন দেখলি তো? ভাইয়া তো পরিষ্কার বলল সে কিছুই জানে না। তাহলে মিরাজ কার কথায় এত আদিখ্যেতা দেখাতে এসেছে?"
​প্রেয়সী নিজের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, "আরে, আমি এত কিছু জানতাম নাকি? তুই আমাকে ওভাবে মারতে পারলি? নেহাত আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি বলেই তো ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে বললাম, তাই বলে এভাবে মারবি?"
​প্রেয়সী মুখ ফুলিয়ে বিছানার এক কোণে গিয়ে বসল। তার শুধু মনে হতে লাগল, একটা ফালতু কারণে তানিয়া তার ওপর এভাবে নির্যাতন করছে। সে কি আর জানত যে সিয়াম ভাই ছাড়া অন্য কেউ এটা করতে পারে? মিরাজ যেহেতু সিয়াম ভাইয়ের বন্ধু, তাই ওমনটা ভাবা তো খুবই স্বাভাবিক!
​তানিয়া দুই আঙুল দিয়ে নিজের কপাল ডলতে ডলতে প্রেয়সীর দিকে তাকাল। সে মনে মনে ভাবল—এই মেয়েটা এত বোকা কেন? শুধু পড়াশোনাতেই ফার্স্ট হতে জানে, দুনিয়াদারির কিচ্ছু বোঝে না!
​কয়েকদিন ধরে রাস্তায় বের হলেই যেভাবে ছেলেরা এসে 'আপু আপু' করে ডাকছে, রিকশা ডেকে দিচ্ছে, রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে ভাড়াও মিটিয়ে দিচ্ছে, তা তো আর এমনি এমনি হচ্ছে না! নেহাত বাড়ি থেকে কলেজ আর কোচিং অনেক দূরে, তাই রক্ষা। কিন্তু কোনো পরিচিত মানুষের সামনে যদি এই ছ্যামড়া ছেলেরা এসে ওমন আদিখ্যেতা দেখায়, তবে মানুষ কী ভাববে? মানুষ তো সত্য-মিথ্যা বিচার না করে যা দেখবে, সেটাই রসিয়ে রসিয়ে ১০ জনের কানে তুলবে! মানুষ কিছু বলার আগে তো ১০ বার ভাববে না যে যা বলছে তা আদৌ ঠিক কি না। কিন্তু হুট করে এই এক মাসে তাদের জীবনে এত আদিখ্যেতার কারণটা কী? কে এই অদৃশ্য ব্যক্তি, যার ইশারায় পুরো এলাকার ছেলেরা তাদের পাহারা দিয়ে বেড়াচ্ছে, ফুচকা খাওয়াচ্ছে?
​তানিয়া আর কথা বাড়াল না। এই বোকা মেয়েটাকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। এ শুধু পড়তে জানে, গিলতে জানে আর ঘুমাতে জানে! এর বাইরে এই মেয়ের ব্রেইনে আর কোনো কিছু ধরা দেয় না। একে এই গভীর বিষয়গুলো বোঝাতে যাওয়া আর একটা কলা গাছের সাথে কথা বলা একদম সমান কথা!
​তানিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল, আর প্রেয়সী গাল ফুলিয়ে বিছানায় বসে রইল। কিন্তু দুজনের মনেই এখন একটাই প্রশ্ন—সিয়াম ভাই যদি না হয়, তবে এই
 মিরাজ কার লোক?
চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন