#নীলাক্ষত্র
#প্রিয়ন্তিকা_প্রিয়ন্তী
পর্ব:০৫
নক্ষত্র ভ্রু কুঁচকে নীলাদ্রিতাকে চোখের ইশারায় রেজিস্ট্রি পেপারে সই করতে নির্দেশ দিচ্ছিল। কিন্তু সেই দৃষ্টির ভাষা নীলাদ্রিতা বুঝবে কী করে? যেখানে তার চোখদুটোই এলোমেলো চুলে ঢাকা। ফলে নক্ষত্রের ইশারা ধরতে না পেরে নীলাদ্রিতা তখনো মুখে হাত চাপা দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসেই চলেছে। কিন্তু সে কি জানে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কতটা রগচটা?
ব্যস, আর সহ্য হলো না। নক্ষত্র হঠাৎ শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে পড়লো। অথচ নীলাদ্রিতা তখনো উকিল সাহেবের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে তো হাসছে। এ দৃশ্য দেখে নক্ষত্র ঘাড়ে হাত ঢলতে ঢলতে গম্ভীর স্বরে শুধায়, " সাইন করো।"
ওই গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে যেতেই নীলাদ্রিতার হাসি নিমেষেই উবে গেল। তবু সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না, নির্বিকার ভঙ্গিতে চুপচাপ বসেই থাকে।
কিছুক্ষণ নক্ষত্র স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নীলাদ্রিতার দিকে। কিন্তু না, মেয়েটা এতটাই অবাধ্য যে কথায় কোনোভাবেই শুনছে না। আর রগচটা মানুষের ধৈর্যের বাঁধ আর কতক্ষণই বা টেকে বলুন?
নক্ষত্রের ধৈর্যের শেষটুকুও ভেঙে পড়লো।
সে হঠাৎ খপ করে নীলাদ্রিতার হাত টেনে তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়। এমন শক্ত করে হাতটা চেপে ধরেছে যে নীলাদ্রিতার কাছে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি হাড়গুলো মটমট করে ভেঙে যাবে।
হাতের তীব্র ব্যথা অনুভব করতেই নীলাদ্রিতা হাত ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে জোরজবরদস্তি করতে থাকে। কিন্তু একজন পুরুষের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে একজন নারীর শক্তি যেনো নিতান্তই ক্ষীণ।তা মুহূর্তেই প্রমাণিত হলো নীলাদ্রিতার আপোষ দেখে।
নক্ষত্র দাঁতে দাঁত চেপে গিজগিজ করতে করতে নীলাদ্রিতার হাত রেজিস্ট্রি পেপারের ওপর চেপে ধরল। তারপর অন্য হাতে কলম তুলে নিয়ে হুমকির সুরে বলল,
"তুই সাইন করবি, না কি এই কলমটা তোর হাতে গেঁথে দেবো?"
নীলাদ্রিতাও রাগে গিজগিজ করে জবাব দিল,"করবো না।"
" করবি না তো ঠিক আছে, তাহলে কলম গেঁথে দিচ্ছি।"
কথাটা বলেই নক্ষত্র যেই না নীলাদ্রিতার হাতে কলম গেঁথে দিতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই হুড়মুড় করে সাথী চৌধুরী, গোলাপি, লালটু আর কলা ভাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো। পাশাপাশি নীলাদ্রিতাও চোখ বন্ধ করে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল,
"নাহহহ!"
নক্ষত্রের হাত থেমে যায়, ভাগ্যিস আর একটু হলে সত্যি সত্যি নক্ষত্র কলমটি গেঁথে দিতো। নীলাদ্রিতা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বলল, " কর..ছি তো।"
অতঃপর হুড়মুড়িয়ে রেজিস্ট্রে পেপারে সই করে দেয়। নক্ষত্র তপ্ত শ্বাস ফেলে কলমটি উকিলের দিকে ছুঁড়ে মেরে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
" সোজা আঙ্গুলে ঘি ঠিক এইভাবেই উঠাতে হয়।"
-
নীলাদ্রিতা এখনো পালানোর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না, তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারিদিকে নজর বুলিয়ে নখ কামড়াতে থাকে। এইটা দেখে নক্ষত্র সেখানে চলে যেতে গেলেই কো থেকে যেনো একজন ৭/৮ বছরের বাচ্চা দৌড়ে এসে নক্ষত্রের পা জড়িয়ে ধরে।
" ভাইয়া..."
নীলাদ্রিতার বাচ্চাটিকে দেখা মাএই মনে মনে ভাবলো, ' একি জল্লাদ শাশুড়ি টা এই বয়সে এসেও বাচ্চা ডাউনলোড করতে ভুলে নি। ছিঃ তাই বলে এই বয়সে এসেও?'
নক্ষত্র বাচ্চাটিকে নির্দয় ভঙ্গিতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেল। বাচ্চাটি ছলছল চোখে শুধু নক্ষত্রের চলে যাওয়া দিকে তাকিয়ে রয়।
কিন্তু পরক্ষণেই নীলাদ্রিতাকে দেখে তার কাছে গিয়ে আদুরে গলায় বলল, " হেই সুইটি।"
সকাল থেকে জমে থাকা মনখারাপটা যেন ওই একটুখানি আদুরে ডাকে মুহূর্তেই গলে গেল। নীলাদ্রিতা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ছেলেটার সামনে। মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"তোমার নাম কী?"
বাচ্চা ছেলেটা হাসিমুখে উত্তর দিল,
" লিও আর্য চৌধুরী। সবাই আমাকে লিও বলে। তুমিও আমাকে লিও বলেই ডাকবে, কিন্তু।"
নীলাদ্রিতা মুচকি হেসে মাথা নাড়ে। তখনি তাদের কাছে সাথী চৌধুরী এসে জানায় লিও তার জেটি শাশুড়ির ছেলে।
দিদা কে দেখার সাথে সাথে লিও এক দৌড়ে সাথী চৌধুরী কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, " দিদা.... ভাইয়া আমার সঙ্গে সাথে কথা বলে না কেনো?"
সাথী চৌধুরী লিও'র মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,"তোমার নক্ষত্র ভাইয়া এখন প্রচুর রেগে আছে, তাই কথা বলছে না। যাও, মাম্মার কাছে যাও।"
ঠিক তখনি নীলাদ্রিতার চোখ পড়ে সদর দরজার দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো। সে কি সতি্যি দেখছে নাকি ভ্রম! হাত দিয়ে চোখ কচলে আবারো তাকায় সদর দরজার পানে। নাহ, সত্যি সত্যি তারা এসেছে। নীলিদ্রিতা ভারী গ্ৰাউনটি দুহাতে আগলিয়ে ছুট লাগায় দরজার পানে।
হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সুজন শর্মা অথাৎ তার প্রাণ প্রিয় মামাকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু সুজন শর্মা যেনো স্তব্ধ! কেনো এই স্তব্ধতা কেনো? তিনি দূর থেকে সাথী চৌধুরী দিকে এক পানে তাকিয়ে যেনো বাকরুদ্ধ। নীলাদ্রিতা যে সেই কখন থেকে তাকে ধরে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে সেই খেয়াল নেই। তিনি তো জল ভরা চোখে সাথী চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছেন।
এইদিকে নীলাদ্রিতা কাঁদতে কাঁদতে বলে, " মামু আমি আর এখানে থাকবো না। মামি আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে, তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো।"
এতক্ষণে বোধহয় সুজন শর্মার হুঁশ ফিরেছে। তিনি নীলাদ্রিতা দিকে না বরং সুজাতা শর্মার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। নীলাদ্রিতা মামার পাশে তাকালে দেখতে পায় তার অভিক ভাইকে। যে ভাই তাকে একটু একটু করে বড় করে তুলেছে। তার এই পৃথিবীতে কেউ না সেবাই এরা ছাড়া। নীলাদ্রিতা অভিক এর বুকেও ঝাপিয়ে পড়লো, " ভাইয়া.. আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো না।"
কিন্তু অভিক এর কাছে ও যেনো নীলাদ্রিতার একটা শব্দ ও কানে পৌঁছাছে না।
তখনি সাথী চৌধুরী তাদের সামনে একটু একটু করে এগিয়ে আসলেন। এবং হুমকি স্বরুপ তাদের বলে উঠলো,
" মি. আপনার নামটা ঠিক আমার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। বাই দা ওয়ে, ভুলে যাবেন না যে আপনাদের ভাগ্নী এখন এই বাড়ির পুএবধু। তাই ওকে নিয়ে যাওয়ার কথা ভুলেও ভাববেন না, অন্যথায় এর ফল কিন্তু আপনাদের'ই ভুগতে হবে। কথাটা মনে থাকে যেনো।"
শান্ত পরিবেশ টিতে যেনো কেউ গরম গরম পানি ঢেলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। নীলাদ্রিতা বুঝতে পারছে না তার মামাকে এই মহিলা কী করে চেনে? ওরা কী আগের পরিচিত নাকী?
সে কিছু বলতেই যাবে তখনি সুজন শর্মা তার হাত টেনে নিয়ে বাইরে যেতে থাকে। পেছন পেছন অভিক আর সুজাতা ও এগিয়ে আসছে। খোলা বাগানের কাছে নিয়ে এসে তারা সটান হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু সুজন শর্মা যে হঠাৎ এমন একটি কাজ করে বসে থাকবে তা কারো ধারণা ছিলো না। তিনি সুজাতার গালে শব্দ করে চড় বসিয়ে দেয়।
একটি নয়, দুটি নয়, পরপর চারটি চড় বসিয়ে দিয়েই তিনি ক্ষ্যান্ত হন।
এইদিকে নীলাদ্রিতা সেই কখন থেকে কী হচ্ছে এইসব কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
" মামু তুমি মামিকে মারছো কেনো এভাবে?"
সুজন শর্মা রাগান্বিত হয়ে চিৎকার করে উঠে, " কেনো মারবো না ওকে আমি,কেনো? ইচ্ছে তো করছে এখানে মেরে পুঁতে দেই। "
তিনি আবারো সুজাতার চুলের মুঠি চেপে ধরে বলতে থাকে,
" তোর এতোই যখন টাকার প্রয়োজন ছিলো আমাকে বলতি বা অভিক কে বলতি। কেনো? কেনো তুই জেনে বুঝে নীলাদ্রির জীবনটা শেষ করেছিস কেনো? তুই কি জানিস না এই বাড়ির সাথে আমাদের কী সম্পর্ক, জানতিস না তুই?"
সুজাতা নির্লজ্জের মতো এতগুলো চড় খেয়ে মনে মনে হাসতে থাকে। কি জন্য হাসছে সে ছাড়া আর কেউ জানে না বোধহয় কোনো পরিকল্পনা ছিলো বিদায় এই কাজটি করেছে। নীলাদ্রিতা চঞ্চল মেয়ে এবং উড়নচণ্ডী মেয়ে। তার চঞ্চল মন তো বুঝে গেছে তার মামা তার মামিকে শিক্ষা দিচ্ছে তাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছে বলে । সে যাক গে সে মনে মনে খুশি হয়েছে যে এইবার সে এখান থেকে চলে যেতে পারবে। তাই তো খুশি মনে বলতে থাকে ,
" উফফ মামু আর বকা দিও না মামিকে চলো আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।চলোওও "
সে যখন অভিক এর হাত ধরে চলতে থাকে তখনি পেছন থেকে সুজন শর্মা বলে উঠে
" থাম, নীলাদ্রি। "
নীলাদ্রিতার পা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায় সে পেছন ঘুরে উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। তাকে মামা কেনো আবার আটকালো।
" উফফ মামু আবার কী হলো?"
" তুই এখন কোথাও যেতে পারবি না, মা।"
নীলাদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে অভিক এর হাতটি ছেড়ে দেয় এবং অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
" কেনো?"
সুজন শর্মা নীলাদ্রিতার গালে আলতো করে হাত রেখে বলল,
" তুই তো জানিস নীলাদ্রি,তোকে আমি নিজের মেয়ে মনে করি। তোর কোনো কষ্ট আমার সহ্য হয় না। জানিস আমি যখন জানতে পেরেছি তোর মামি তোকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে বিশ্বাস কর আমি পারলে পাখিদের মতো ছুটে আসতাম, কিন্তু পারি নি আমি। "
সুজন শর্মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারো বললেন, " আমি কিছু বললে তুই বিশ্বাস করবি মা?"
নীলাদ্রিতা মাথা এদিক ওদিক দোলায়। তখনি সুজন শর্মা রাগে গিজগিজ করতে করতে বললো, " তোর মা-বাবার মৃত্যুর জন্য এই বাড়ি দায়ী। তাদের বাড়ির ছেলের জন্য তোর বাবা-মায়ের এক্সিডেন্ট হয়েছিলো।"
নীলাদ্রিতা যেনো এক মুহূর্তের জন্য কিংকতব্যবিমুখ হয়ে গেলো। সে বড় বড় চোখে সুজন শর্মা দিকে তাকিয়ে আছে।
" এই বাড়ির ছেলের জন্য? কে সে?"
অভিক পাশ থেকে দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারণ করলো," নক্ষত্র রাবনীথ চৌধুরী।"
ব্যস নীলাদ্রিতা যেনো আরো ভেঙ্গে গেলো। কিন্তু এইদিকে অভিক তাকে সবটা খুলে বলছে। নক্ষত্রের গাড়ির নিচে কীভাবে কিভাবে তার বাবা-মা চাঁপা পড়ে মারা গেলো। এরপর তারা পুলিশ কেস করেও কোনো আইনি বিচার পায় নি। একমাত্র টাকার কাছে তারা কীভাবে হেরে গেলো। ন্যায় দিতে পারলো না। কীভাবে টাকার বিনিময়ে পুরো কেসটি বন্ধ করে দিয়েছে এই চোধুরী পরিবার যাতে নক্ষত্র এই কেস থেকে বেঁচে যায়।
অভিক একাধারে কথা গুলো বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর উল্টো ঘুরে নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
" আমরা এখন তোকে নিয়ে যেতে পারবো না নীলাদ্রি।"
নীলাদ্রিতা বাচ্চাদের মতো বায়না করে বললো, " না , না, না! আমি এখানে থাকতে চাই না ভাইয়া। আমাকে নিয়ে চলো। আমি একজন খু'নির সাথে সংসার করতে পারবো না।"
অভিক নীলাদ্রিতার গালে হাত রাখলো , তার চোখে ছিলো তীব্র আগুন। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
" একটু অপেক্ষা করিস বোন, তোকে এখান থেকে আমি ঠিক নিয়ে যাবো। শুধু এই ভাইটার জন্য একটু অপেক্ষা করিস।"
অতঃপর অভিক আর কোনো দিকে না তাকিয়ে গটগট পায়ে সামনে দিকে চলে যায়। সুজন শর্মা ও চলে যেতে গেলে নীলাদ্রিতা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।
" মামু..."
" নীলাদ্রি একটা কথা সবসময় মনে রাখবি পাপ এবং পাপী কে কখনো প্রশয় দিবি না। পাপ কে যেমন ভালোবাসা যায় না, তেমন পাপী কেও ভালোবাসা যায় না।
আর রইলো বিয়ে? সে তো বিধাতার হাতে সমর্পিত। "
কথাটি বলে সুজন শর্মা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মেয়েটিকে সচারাচর কাঁদতে কখনোই দেখে নি। সে কাঁদেই না কারো সামনে, ভেতরে ভেতরে কষ্ট লুকিয়ে রাখলেও কখনো মুখ ফুটে তা প্রকাশ করে না। সুজন শর্মা ঠের জানেন, অভিক আর তিনি বাড়ি থেকে শহরে চলে আসলে সুজাতা তাকে খুব অত্যাচার করে। তবুও মেয়েটি একটু টু শব্দ ও পর্যন্ত করতো না। আজ সেই মেয়েটির ভাগ্যে এখানে এসে দাঁড় করাবে তা কখনোই তিনি ভাবেন নি।
কিন্তু বুকের পাথর চেপে হলেও তিনি পা বাড়িয়ে হাঁটতে থাকেন। একজন মেয়ের সিঁথিতে সিঁদুর উঠার সাথে সাথে তার আর কোনো পরিচয় থাকে না। সেই মেয়ে যদি স্বামী ছাড়া থাকে তাকে সমাজ বোঝা মনে করে। তিনি জানেন এখন যদি নীলাদ্রিতা কে গ্ৰামে নিয়ে যায় তাহলে মেয়েটাকে সমাজের লোক গুলো নানা কথায় কটুক্তি করবে।
তার দিকে আঙ্গুল তুলতেও দুইবার ভাববে না। তিনি ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে দিলেন। এইসব ভাবতে ভাবতে তিনি চোখের জল মুছে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
নীলাদ্রিতা জল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে তখনই সুজাতা নীলাদ্রিতার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে,
" ভুলেও ওই বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করবি না ,তোর মরা বাপ-মায়ের দিব্বি দিলাম কিন্তু।"
নীলাদ্রিতা নিথর চোখে তাকালো সুজাতার দিকে,
" বাবা-মায়ের দিব্বি দিয়েই তো জোর করে বিয়েটা করিয়েছো মামি। আমার জীবন নষ্ট করে কী পেলে তুমি? তুমি আমাকে একটি প্রতিবন্ধী বা অন্ধের সাথে বিয়ে দিলেই আমি আমার মন কে বুঝাতে পারতাম। কিন্তু আমার বাবা-মায়ের খুনির সাথে বিয়ে দিলা তুমি? আমার সাথে এতটা অন্যায় কী করে করেছো মামি,কী করে?"
সুজাতা কিছু না বলে মুখ বেঁকিয়ে সামনে হাঁটতে থাকে। সে তো কিছু বিশেষ উদ্দেশ্যে নীলাদ্রিতাকে এই বাড়িতে বিয়ে দিয়েছে। এইসব ভাবতে ভাবতে তিনি গেইটের সামনে আসলো আর তখনি একটি লোকের সাথে ধাক্কা খেয়ে দেয়। সুজাতা শর্মা বেশ রেগে গিয়ে চিৎকার করে,
" অন্ধ নাকী?"
যখনি সামনে তাকায় তখনি তার মুখে ফুটে উঠে রহস্যময় হাসি। লোকটি ও যখন সুজাতার দিকে তাকায় তখনি বিস্ময়ে বলে,
" তুমি?"
সুজাতা শর্মা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উত্তর দেয়, " ওহ্,তোমাকেই তো এতক্ষন ধরে খুঁজছি।"
লোকটি আর কেউ নয় সাথী চৌধুরী ছোট ছেলে অরুপ চৌধুরী।
" তুমি এখানে কী করছো ? "
সুজাতা শর্মা ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
" নীলাদ্রিতার মামি আমি।"
অরুপ চৌধুরী বড় বড় চোখে করে বললো, " হোয়াট? শেষ মেষ কিনা তোমার মতো ছিঃ ছিঃ।"
" ছিঃ ছিঃ করবে না একদম প্রাক্তন,প্রাক্তন এর মতো থাকো। তোমার মতো বেইমান ছেলে আমি আর দুটোও দেখি নাই। এইবার তোমাদের জীবন তেজপাতা করার জন্য নীলাদ্রিতাই যথেষ্ট।"
কথাটি বলে সুজাতা চৌধুরী চলে যেতে থাকে। আর এইদিকে অরুপ চৌধুরী শুধু রাগে ফুঁসতে থাকলো এবং চিৎকার করে বললো,
" তুমি ও কোন ক্ষেতের মুলা তুমি ও আমার সাথে বেইমানি করেছো।"
সুজাতা শর্মা পেছনে ঘুরে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, "বাহ্ এখন আমার দোষ হয়ে গেলো। ঠিক আছে দেখে নিবো তোমাকে আমি।"
" যাও যাও আমিও তোমাকে দেখে নিবো।"
———
———
সময় গড়াতে গড়াতে গভীর রাত নেমে এসেছে। অথচ নীলাদ্রিতা এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ আর স্থবির হয়ে। তার চোখে শূন্যতা, বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা যেন উপচে পড়তে চাইছে। আজ তার অসহনীয় কষ্ট হচ্ছে। কাকে বলবে সে এই ব্যথার কথা? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অগণিত মানুষ থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার অন্যায় গুলো শুধু তার ভাগ্যেই এসে জোটে?
বাবা- মায়ের খুনির সাথে সাত পাকে জড়িয়ে গেলো সে। নীলাদ্রিতা হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
" হে ঈশ্বর, এইটা তুমি আমার সাথে কী করেছো? কেনো , কেনো আমার মা-বাবার খুনি'র সাথে আমাকে জড়ালে,কেনো? এতো বড়ো শাস্তি আমাকে কেনো দিয়েছো?"
নীলাদ্রিতা কাঁদতে কাঁদতে খেয়াল'ই করলো না যে তার পেছনে সাথী চৌধুরী আর গোলাপী সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। তারা নিঃশব্দে নীলাদ্রিতার আহাজারি দেখছে। যখনি গোলাপি তার কাছে আসতে গেলে সাথী চৌধুরী থামিয়ে দিলো এবং চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দেয়।
নীলাদ্রিতা হাঁটুতে মুখ গুঁজে একাধারে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে। তার কান্নার চোটে শরীর টা ক্ষনে ক্ষনে কেঁপে উঠে। ভাগ্যিস বাইরে ল্যাম্প লাইট গুলো ছিলো নাহলে রাতের অন্ধকারে ভয়ে সেখানেই সে মরে যেতো। নীলাদ্রিতা কান্না অবস্থায় তার মুখ ফসকে বেরিয়ে আসছে,
" মা, ও মা আমাকে ছেড়ে কেনো গেলো? বাবা! আমাকে নিয়ে যাও তোমাদের সাথে।"
নীলাদ্রিতা এইভাবেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে পড়ে রয় তাকে কেউ একটিবারের জন্য দেখতে আসে নাই। কিন্তু আকস্মিক কো থেকে যেনো রাউডি এসে নীলাদ্রিতার গ্ৰাউন ধরে টানতে থাকে।
টান টান অনুভব বুঝতে পেরে নীলাদ্রিতা মুখ তুলে তাকালো। কিন্তু যখনি রাউডি কে দেখলো সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে সে পিছু হটে যায়। কিন্তু যত পিছু হটছে ততো রাউডি তার দিকে ধেয়ে আসছে।
" চলে যাও।"
কিন্তু নাহ রাউডি এগিয়ে আসছে। সে দৌড়ে পালাতেও পারছে না, কেননা তার গ্ৰাউন এ কুকুর টি ভর দিয়ে দাড়িয়ে রয়েছে। নীলাদ্রিতা ভয়ে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে রয়েছে।এই বুঝি কুকুর টা তার উপর হামলে পড়বে। কিন্তু নাহ, রাউডি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অনেকক্ষন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন দেখলো কুকুরটি কিছু করছে না তখন নীলাদ্রিতা পিট পিট করে খুলে তাকায়।
কুকুরটি বোধহয় তাকে কিছু বলতে চাইছে যেটা নীলাদ্রিতা তার ভয়ের চোটে বলতে পারছে না। আর ঠিক তখনি রাউডি তার গ্ৰাউন টানতে টানতে তাকে দৌড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে। নীলাদ্রিতা শুধু কুকুর টি যেইদিকে নিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে ছুটছে আর ছুটছে।
রাউডি দৌড়িয়ে আসতে আসতে তারা একটি জায়গায় থামলো। চৌধুরী নিবাস থেকে এই জায়গা টি বেশি না শুধু একটু খানি দূর হবে বোধহয়। চৌধুরী নিবাস এর ছাদ থেকে এই রাস্তা দেখা যায়।
নীলাদ্রিতা পল্লব মেলে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। হ্যাঁ সে জানালা থেকে এই সুরঙ্গ দেখেছিলো আবছা আবছা। গোলাপি কে জিজ্ঞাসা করেছিলো একবার কিন্তু গোলাপী তাকে কড়া ভাবে নিষেধ করেছে এখানে ধারে কাছে না আসার জন্য। বড় বড় লতাপাতা ঢাকা আর সেই লতা গুলো সরিয়ে এর মধ্যে ঢুকতেই নীলাদ্রিতার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।
সামনে যে দেখতে পাচ্ছে প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য । বিশাল বড় বটগাছের মধ্যে একটি ঘর। নীলাদ্রিতা শুধু অবাক নয়নে তাকিয়ে আছে। লোক মুখে কতো শুনেছিলো গাছের মধ্যে ও নাকী গড় তৈরি করা হয়। কিন্তু আজ সে নিজ চোখে এইসব পর্যবেক্ষণ করছে। রাউডি তাকে সেই বট গাছটির কাছে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে। যত সামনে এগোচ্ছে ততো বটগাছের মধ্যে তৈরি করা বাড়িটি স্পষ্ট হচ্ছে।
ছোট্ট ছোট্ট কাটের সিঁড়ি তার উপর দুতালা বিশিষ্ট ঘড়টি। যা তৈরি হয়েছে কাট দিয়ে। বাড়িটির চারিপাশে সবুজ পাতার ছড়াছড়ি। কাটের সিঁড়ি গুলো কিছুটা ছোট্ট। নীলাদ্রিতা একটা একটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। উঠতে উঠতে তারা একটি দরজা সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। ভয়ে ভয়ে সে চোখ রাখে রাউডির দিকে।
কুকুরটি তার একটা হাত দরজায় রাখতে ফস করে দরজা খুলে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে সেও চিৎকার করে ঘেউ ঘেউ করছে। যেনো নীলাদ্রিতাকে কিছু বুঝানোর চেষ্টায় প্রাণ পণ ঢেলে দিচ্ছে। নীলাদ্রিতা চাতক দৃষ্টির বাড়ির ভেতরে তাকিয়ে দেখলো চারিদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার। অন্ধকার দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য পা পিছিয়ে নেয়। কিন্তু কুকুর টি তার জামা টান দিয়ে তাকে নিয়ে বাড়িটির ভেতর দৌড়াতে থাকে।
" থামো, আমার অন্ধকার ভয় লাগে।"
কিন্তু কুকুরটি কী নীলাদ্রিতার কথা আদৌও বুঝবে। সে নীলাদ্রিতাকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে আসলো। তখনি নীলাদ্রিতার চোখে উচ্ছ্বাসিত হলো একটি আলোর ঝলক। নীলাদ্রিতা চোখ কুঁচকে সেদিকে তাকাতেই যেনো তার শরীরে তড়িৎ গতিতে কম্পন সৃষ্টি হলো।
একটি বাল্বের আলোর নিচে নক্ষত্র মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাচ্ছে। গাঢ় দৃষ্টিতে পরখ করে দেখতেই বুঝতে পারলো নক্ষত্র ঘাড় ছুঁই ছুঁই বাবরি চুল গুলো দু হাতে মুঠো করে ধরে মেঝেতে লুটিয়ে আছে। আর ক্ষনে ক্ষনে চিৎকার দিয়ে পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে তুলছে।
রাউডি নক্ষত্রের দিকে নীলাদ্রিতা কে আরো ধেয়ে নিয়ে আসছে। সে ঘেউ ঘেউ করে বিচ্ছিরি চিৎকার শুরু করলো নীলাদ্রিতার দিকে। কিন্তু নীলাদ্রিতা! তার তো এখন মাথা রক্ত চড়ে বসেছে। সে তো দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নক্ষত্রের দিকে।
ইচ্ছে করছে এই ছেলেটাকে এখুনি খু'ন করে ফেলতে, ঘৃণায় তার পুরো শরীর ঘিন ঘিন করছে। কিন্তু তখনি তার হুঁশ ভাঙ্গে যখন নক্ষত্র মেঝেতে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে চিৎকার দিচ্ছে। তার শরীরের রগ গুলো বেসামাল ভাবে ফুটে উঠলো, ফ্লোরে এপাশ-ওপাশ খুব বাজেভাবে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
এক দিকে নক্ষত্র তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে তো অন্যদিকে রাউডি ঘেউ ঘেউ করে নীলাদ্রিতাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। এইটা দেখে কোথাও না কোথাও নীলাদ্রিতার মন গলে গেলো। সে তীব্র সংকোচে একটু একটু করে নক্ষত্রের দিকে এগিয়ে গেলো। হাঁটু মুড়ে বসে হাতটা বাড়িয়ে একটু ছুঁয়ে দেওয়ার সাথে সাথে নক্ষত্র তীব্র গর্জনে নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে থাকে।
নীলাদ্রিতা এক ঝটকায় দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে গেলো। একি! দেখছে সে, এইটা আদৌ সম্ভব? নক্ষত্রের চোখের রঙ ভিন্ন কেনো?। বাম চোখের মনি হালকা সবুজ রঙের আর ডান চোখের মনি বাদামী আর সোনালী রঙের মিশ্রনে বোধহয়।
নীলাদ্রিতা এমন এক জোড়া চোখ দেখে ভয়ে গুটিয়ে উঠে।
সে এমন চোখ আগে কখনো দেখে নি?সে মনে মনে বিরবিরাতে থাকে নক্ষত্র কী তাহলে মানুষ না? সে কী অন্য গ্ৰহের প্রাণী? এলিয়েন নয় তো?
এইসব ভাবতে ভাবতে সে আরো গুটিয়ে গেলো। তখনি নক্ষত্র ফ্লোর থেকে ধীরে ধীরে উঠে ঘাড় কাত করে নীলাদ্রিতার দিকে এগিয়ে গেলো। নীলাদ্রিতা সেই আগের মতোই তার গলা চেপে ধরে কাতরাতে থাকে। কিন্তু বেশিক্ষণ গরা চেপে ধরে রাখতে পারে নি। নক্ষত্র মাথা যন্ত্রনার ব্যাথায় আবারো মাটিতে হাটু গেঁড়ে বসে পড়ে।
দুই হাত দ্বারা কানে চেপে রেখে গজরাতে থাকে। নীলাদ্রিতা এখনো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছে আজ তার সাথে অনেক কিছু হয়ে গেছে, অনেকে। এইটাই কী তার কপালে লেখা ছিলো বুঝি?
কিন্তু নক্ষত্রের আর্তনাদ তাকে আবার ভেঙ্গে গুরিয়ে দিচ্ছে, ঘৃণা আর যন্ত্রনায় সব অনুভূতি যেনো একাকার হয়ে গেলো।
রাউডি নীলাদ্রিতা জামা কামড়ে একাধারে ঘেউ ঘেউ করে চলেছে। এইবার বুঝলো মেয়েটা কেনো রাউডি এমন করছে।
কিন্তু নীলাদ্রিতার মন আর মস্তিষ্ক এখন দুই কথা বলছে। মস্তিষ্ক বলছে পেতে থাকুক এমন শাস্তি তার প্রাপ্য এইটা কিন্তু কোমল হৃদয় বলছে প্ ওকে একটু ছুঁয়ে দেখো। ছেলেটা যন্ত্রণায় ভীষণ কাতরাচ্ছে।
নীলাদ্রিতা তো মস্তিষ্কের কথাটায় শুনলো সে উঠে চলে যেতে গেলেই রাউডি তাকে যেতে দিচ্ছে না সে ঘেউ ঘেউ করে আটকে রাখার চেষ্টা করছে। রাউডি যদি মানুষ হতো তাহলে বোধহয় এতক্ষণে নীলাদ্রিতাকে চারটি খানি কথা শুনিয়ে দিতো।
ওই অবুঝ প্রাণীটির দিকে তাকিয়ে হলেও চঞ্চল নীলাদ্রিতা আবারো নক্ষত্রের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে। কম্পিত হাত জোড়া বাড়িয়ে দেয় নক্ষত্রের গালে। সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্র আবারো ক্ষেপে গিয়ে তেড়ে আসতেই এইবার নীলাদ্রিতা আর ভয় পেলো না। সে গালে স্নেহের হাত রেখে বলতে থাকে,
" শান্ত হোন।"
নক্ষত্র এখনো যন্ত্রণায় ছটফট করছে কিন্তু যখন থেকে নীলাদ্রিতা তার গালে হাত রাখলো কিছুটা হলেও বোধহয় স্বস্তি মিললো।
তখনই রাউডি মুখে করেন একটি ইনজেকশন সিরিজ নিয়ে এসে নীলাদ্রিতার হাতে ধরিয়ে দেয়। নীলাদ্রিতা প্রথমে কিছুটা অবাক হলেও নক্ষত্রকে শান্ত করার জন্য সিরিজ টি নক্ষত্রের ঘাড়ে পুশ করে দেয়।
ব্যস এক নিমিষেই নক্ষত্র মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আর এতে করে নীলাদ্রিতা ও যেনো তপ্ত শ্বাস ফেলে মাটিতে বসে পড়ে। এ কয়েকদিনে তার জীবনটা এতো জটিল হলো কবে থেকে?
কিছু মুহূর্তের অবসানের পর নক্ষত্র ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়। নীলাদ্রিতা কে দেখতেই সে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
" তুমি? তুমি এখানে কী করছো।"
নীলাদ্রিতা কিছু বলে না চুপচাপ নক্ষত্রের দিকে বিরল চোখে তাকিয়ে আছে। নক্ষত্র ভ্র কুঁচকে তাকে আপাদমস্তক পরখ করে। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল গুলো সারা শরীরে ছিটিয়ে রয়েছে। নীল রঙের গ্ৰাউটাতে কাঁদা মাটি,ধুলো বালিতে ভরে উঠেছে। আর নীলাদ্রিতার মুখটা একদম ফ্যাকাসে।
সে দেখলো নীলাদ্রিতা তার চোখের দিকে তাকায় আছে, পশ্চাতে সে ঘাড় ঘুরিয়ে আয়নায় তার চোখ গুলো দেখে ভড়কে যায়। ফটাফট ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে এক জোড়া কালো রঙের লেন্স নিয়ে চোখে পড়ে নিলো।
অতঃপর পিছনে ঘুরে আবারো নীলাদ্রিতার দিকে ঘুরতেই নীলাদ্রিতা হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে উঠে,
" আপনি আদৌ মানুষ নাকী কোনো জন্তু-জানোয়ার।"
এমন প্রশ্ন শুনে নক্ষত্রের কপালে গুনে গুনে তিনটা ভাঁজ পড়লো। নীলাদ্রিতা আবারো জিজ্ঞাসা করে, " আপনার চোখ গুলো এমন কেনো? এইরকম চোখের মনি তো মানুষের হয় না। নির্ঘাত আপনি কোনো জানোয়ার তাই না?"
জানোয়ার শব্দটি বারবার শুনতেই নক্ষত্র হাঁটু গেঁড়ে নীলাদ্রিতার সামনে বসে পড়লো,
" লিসেন প্রথমে তো আমি কোনো জন্তু বা জানোয়ার নয় আর রইলো চোখের কথা। ধরতে পারো এইটা অভিশাপ আমি জীবনে বহন করছি। "
নক্ষত্রের কাছে তখন রাউডি এসে আহ্লাদি হতে থাকে। রাউডি কে দেখা মাএই বুঝে যায় নীলাদ্রিতা কে এখানে কে নিয়ে এসেছে। একজন পশুর উপর মানুষ এতোটা আহ্লাদি হতে পারলে মানুষের উপর নয় কেনো? এইটা ভাবতেই নীলাদ্রিতার কষ্ট হচ্ছে তার স্বামী'ই তার মা-বাবার খু'নি।
নীলাদ্রিতা আবারো ফুঁপিয়ে উঠলো,
" কেনো আমার জীবনটা নরকে ঠেলে দিলেন কেনো?"
নক্ষত্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়েটার চোখের পানি তার কাছে অসহ্য লাগছে।
" শুনো মেয়ে তোমাকে আমি বিয়ে করতে কখনোই চাই নি। কোনো না কোনো বাধ্যবাধকতা কারণে তোমাকে বিয়ে করতে হয়েছে। "
নীলাদ্রিতার চোখ থেকে অজরো চোখের পানি পড়ছে সে নক্ষত্রের শাটের কলার ঝাঁকিয়ে উঠে বললো,
" কেনো করলেন এমনটা কেনো? প্রথমে আমার বাবা-মায়ের জীবন শেষ করে দিলেন আর এখন আমার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। কী দোষ করেছি আমরা?"
নক্ষত্র ঘোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে বোঝার চেষ্টা করছে মেয়েটা কী বলতে চাইছে কাদের মৃত্যুর কথা বলছে।
" আপনি খু'নি, খু'নি,খু'নি। আমার বাবা-মায়ের খু'নি।"
নক্ষত্র এ কথা শোনার সাথে সাথে ফিচেল হেসে ফেললো, " ওহ্ তাই বুঝি? তাহলে এখন আমি তোমার ও খু'নি। "
" হ্যাঁ আপনি খু'নি, আপনাকে আমি ঘৃণা করি, ঘৃণা।"
নক্ষত্র নীলাদ্রিতার জলে টুই-টুম্বুর চোখে হারিয়ে গিয়ে শুধায়,
" করো ঘৃণা, আরো করো। ঘৃণা শুরু করলে এখনই থেকে শুরু করো, পরে যদি সেই সুযোগ না হয়।"
নীলাদ্রিতা কিছু না বলে দূরে সরে গিয়ে কাঠের দেয়ালে হেলান দিয়ে হাঁটুতে মুখ গুঁজে কান্না করছে। নক্ষত্র সেদিকে না তাকিয়েই ভেপ মুখে চেপেই ধোঁয়া উড়াতে থাকে। কিন্তু সেই ধোঁয়া নীলাদ্রিতার নাকে যেতেই সে জোরে কাঁশতে কাঁশতে থাকে।
নক্ষত্র একটি পানির বোতল এগিয়ে দিতেই তার হাত ছোঁয়াতেই সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে, " ছুঁবেন না আমাকে।"
এইবার একটু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র সেই কখন থেকে এই মেয়ের কান্ড কারখানা সহ্য করে যাচ্ছে। পেয়েছে টা কী তাকে?
তার মুখের সামনে ধোঁয়া উড়িয়ে দাঁত চেপে ধরে বলে,
" তোকে ছুঁয়ার আমার কোন শখ নেই। খাবি না তো পানি ঠিক আছে খাস না।"
কিন্তু রুমের চারিদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে যাবার বলে নীলাদ্রিতা শ্বাস নিতে পারছে না। সে কাঁশতে কাঁশতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে।
" ফেলে দিন ওটা আমি শ্বাস নিতে পারছি না।"
" পারবো না।"
" ফেলে দিন বলছি, না হলে আমি আপনার মাথা ফাটিয়ে দিবো বলে রাখলাম।"
নক্ষত্র তার কোনো কথা না শুনে মনের আনন্দে রাউডি কোলে নিয়ে ভেপ টানতে থাকে। কিন্তু এদিকে ধোঁয়ায় নীলাদ্রিতা শ্বাস নিতে পারছে না। মেয়েটাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখে রাউডি চিৎকার করে উঠলো, " রাউডি চুপ কর।"
কিন্তু রাউডি চিৎকার করেই যাচ্ছে। এক প্রকার বিরক্ত হয়ে ভেপ ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সরিয়ে ফেলে।
-
নীলাদ্রিতার কাছে গিয়ে দেখলো মেয়েটি শ্বাস নিতে না পেরে ছটফট করছে। তার গালে হাত রেখে ডাকতে যাই কিন্তু এই মুহূর্তে নামটি কিছুতেই মাথায় আসছে না। নামটা কী যে ছিলো মেয়েটার। যাক গে সে আবারো এক বোতল পানি এগিয়ে দেয়,
" নীল, ভেপ রেখে আসছি। এই নাও পানি খাও।"
নীলাদ্রিতা পানির বোতলটি নিয়ে এক নিমিষেই ঢগঢগ করে সম্পূর্ণ পানি খেয়ে ফেলে। বড় বড় শ্বাস নিয়ে হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট মুছলো, এরপর রাগী চোখে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ক্ষোভে বলে উঠলো,
" আপনার মতো নির্দয় লোক আর একটা ও দেখে নি। আমি আপনাকে খু'ন করে ফেলবো।"
নক্ষত্র এক ঝটকায় নীলাদ্রিতার কোমড় ধরে তাকে হেঁচকা টানে বুকে ফেলে দেয়।
" কোঁকড়ালি তুমি আমাকে খু'ন করবে?"
নীলাদ্রিতা নাকের ডগা ফুলিয়ে বলল,
" আমি কোঁকড়ালি নয়, নীলাদ্রিতা আমার নাম।"
" ওওও নীল।"
" নাহহহ, নীল নয় আমার নাম নীলাদ্রিতা।"
নীলাদ্রিতা এতোটা জোড়ে তার নামটা বলেছে যে নক্ষত্র কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে চোখ খিচে ফেলে,
" ইসস! নীল আর নীলাদ্রিইইই.... হোয়াট এভার একটা ডাকলেই হলো। আমার এতো বড়ো নাম মনে থাকে না।"
নীলাদ্রিতা নক্ষত্রের বুক থেকে সরে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে।
" ছাড়ুন আমাকে, আমার গা ঘৃণায় ঘিন ঘিন করছে।"
নক্ষত্র তখন গা দুলিয়ে খিক খিক করে হেসে উঠলো,
" ঘৃণা! অবশেষে একটা মানুষ পেলাম যে আমাকে ঘৃণা করে। শুনে রাখো মেয়ে এই ঘৃনা বাঁচিয়ে রাখো ভবিষ্যতে তুমি আমাকে আরো ঘৃণা করতে বাধ্য হবে। "
নীলাদ্রিতার মস্তিষ্ক স্মৃতির পাতায় সজাগ হলো কিছু স্মৃতি। পরিক্ষা দিয়ে এসেই সে তার বাবা-মায়ের নিথর দেহ দেখেছিলো। সেই রাত কতো কেঁদেছে তবুও তার বাবা-মা আর ফিরে আসলো না। এইসব ভেবেই নীলাদ্রিতা রাগে গজগজ করতে করতে উচ্চারণ করে
" আমি আপানাকে খুন করবো নক্ষত্র। আমার হাতেই আপনাকে আমি ধ্বংস করবো।"
নক্ষত্র এইবার নীলাদ্রিতার চোয়াল চেপে ধরে ভরাট গলায় বললো,
" হুম? তুই আমাকে খু'ন করবি আর আমি চেয়ে চেয়ে দেখবো, চুলের মুঠি ধইরা ভবঘুরে ঘুরায় আনবো শাকচুন্নী।"
চলবে~