#নীলাক্ষত্র
#প্রিয়ন্তিকা_প্রিয়ন্তী
পর্ব :০৮
নীলাদ্রিতা আর তাঁরা এসে পৌঁছালো লালসারাই নামের নিষিদ্ধ পল্লিতে। লালচে আলোয় ঝলমল করা বিশাল অক্ষরে লেখা
“লালসারাই”। দূর থেকে দেখলে জায়গাটাকে একটা অভিজাত রেস্টুরেন্ট বলেই মনে হয়, অথচ ভেতরে প্রবাহিত হচ্ছে নিষিদ্ধ আর অদৃশ্য এক জগতের অন্ধকার স্রোত।
তাঁরা মুচকি হেসে নীলাদ্রিতাকে ভেতরে ঢুকতে বললেই সে থম মেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়।
তার কী হলো কে জানে? চোখ পাকিয়ে জায়গাটাকে ভালো করে দেখছে। মনটা যে তার কু গাইছে। এমন কেনো মনে হচ্ছে এই জায়গায় টা তার জন্য নিরাপদ নয়, একদমই নয়।
কিন্তু তার কাছে আর কোনো রাস্তা ও খুলা নেই, একদিকে মন আরেকদিকে মতিষ্কের সাথে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। মন বলছে এক ছুটে কোথাও পালিয়ে যেতে কিন্তু মস্তিষ্ক !সে তো সবসময় মনের বিপরীত। সে চিৎকার করে বারবার বলছে
' নাহ! নীলাদ্রিতা এইটা হয় না, এভাবে পালিয়ে বেড়ানো যায় না। ঘুরে ফিরে ভাগ্যে তোমাকে একই জায়গায় টেনে হেঁচড়ে নিয়ে আসবে। '
তাঁরা যেতে যেতে হঠাৎ থেমে গিয়ে পিছু ফিরলো, " কী হলো নীলাদ্রিতা? ভেতরে আসবে না?"
তাঁরার ডাকে নীলাদ্রিতা সম্বিত ফিরে পেলো সে ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে।
অগত্যা সে পা বাড়িয়ে মনের সংকোচ নিয়ে লালসারাই এর দিকে এগোতে থাকে। গেইট দিয়ে দুজনে ঢুকলো,নাহ এখানে কোনো আপত্তিকর কিছুই নীলাদ্রিতার নজরে পড়লো না।
কিন্তু সবাই যেনো কেমন এক নজরে তাকে দেখছে। দেখবে নাই বা কেনো? রেস্টুরেন্টে আসা প্রত্যেকটি মেয়ে ওয়েস্টান জামা কাপড়ে সজ্জিত। কিন্তু সে তো শুধু মাত্র একটা সুতির সালোয়ার-কামিজ পড়ে আছে।
এই বৈপরীত্যই বোধহয় তাকে আলাদা করে তুলেছে। তা মানুষ একটু আকটু দেখবেই এইসবের তোয়াক্কা নীলাদ্রিতা কখনো করে না।
সবার নজর এড়িয়ে নীলাদ্রিতা আর তাঁরা এগিয়ে গেলো। নীলাদ্রিতা ভাবলো তাঁরা বোধহয় এই রেস্টুরেন্টেই কাজ করবে।
কিন্তু তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে গেলো যখনই তাঁরা রেস্টুরেন্ট পেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো।
নীলাদ্রিতা পুরোই হতভম্ব এখানে আরো একটি দরজা রয়েছে। যার ভেতর থেকে উচ্চ শব্দে গানের আওয়াজ আসছে। তাঁরা হাত বাড়িয়ে দরজা টা খুলতেই অতিরিক্ত লাইটের কারণে নীলাদ্রিতা চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করে,
"এখানে হচ্ছে টা কী? তুমি এখানে গিয়ে কী করবে?"
তাঁরা ঘাড় ফিরিয়ে বললো,
"আমার শিফট আজ এখানেই হয়েছে। আজকের জন্য আমি এখানে ওয়েটার এর পার্ট টাইম জব করবো।"
" তাহলে এই রেস্টুরেন্ট টা?"
" ওইটাতে সপ্তাহে ৫ দিন আর এটাতে সপ্তাহে ১ দিন নাইট শিফট।"
তাঁরা নীলাদ্রিতার হাতটা ধরে তাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। মদের গন্ধে পুরো জায়গাটায় এক দুর্গন্ধ যুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলেছে। নীলাদ্রিতা নাক চেপে ধরে ভেতরে ঢুকার সাথে সাথে তাকে দেখে কিছু মেয়ে হাসতে থাকে।
এইটা দেখে নীলাদ্রিতার মাথায় যেনো রাগ উঠতে থাকে। সে কী ভুত? নাকী কোনো বাইরের জগতের প্রাণী! এইভাবে হাসার কী আছে?
নিজেরা তো অশ্লীল পোশাক পড়ে ঢলাঢলি করছে সেটাতে লজ্জা লাগে না? তাঁরা হাত টেনে নিয়ে তাকে সেখান থেকে ভেতরে নিয়ে গেলো। ওয়াশ রুমের সামনে এসে তাঁরা তার হাতে একটি প্যাকেট ধরিয়ে দেয়,
" আমি বাইরে অপেক্ষা করছি তুমি চটপট এইটা পড়ে নাও।"
নীলাদ্রিতা পোশাকটি হাতে নিয়ে দেখলো। লম্বা একটা গোল জামা এবং একটি প্যান্ট। সচারাচর বাইরে সে থ্রি-পিস আর টু-পিস ছাড়া আর কিছুই পড়ে না। হ্যাঁ বাড়িতে থাকলে অভি ভাইয়ার টি-শাট পড়ে থাকতো গরমের কারণে। কিন্তু এইসব মর্ডান গোল জামা কখনো পড়ে দেখে নি।
গরীবরা শুধু এইগুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে পারে কেনার যোগ্যতা তো তাদের কখনো হয়ে উঠে না। সে আমতা আমতা করে বলে উঠলো,
" আমি এইসব পোশাক পড়ি না, তাঁরা।"
" প্লিজ পড়ে নাও না, এইটাতে খারাপ কোথায়? কোথাও তোমার বডি দেখা যাবে না। প্লিজ তাড়াতাড়ি করো তুমি আমাকে কাজে হেল্প করে দিও কিন্তু।"
এই কথা বলে তাঁরা ওয়ারুমের বাইরে চলে গেলো। নীলাদ্রিতার আর কী করার সে তপ্ত শ্বাস ফেলে পোশাকটি পড়ে নিলো।
এর কিছু মিনিট পর তাঁরা ওয়াশরুমে ঢুকে থম মেরে দাঁড়িয়ে রয়। কারণ সামনেই নীলাদ্রিতাকে দেখে সে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলো। সাধারণ এর মাঝেও নীলাদ্রিতাকে দেখতে অসাধারন লাগছিলো।
যেখানে তাঁরা মেয়ে হয়েও নজর সরাতে পারছে না সেখানে ছেলেরা কী করবে? গ্ৰামের মেয়ে এতো সুন্দর হয় নীলাদ্রিতাকে না দেখলে কেউ বুঝতো না।
তাঁরা এগিয়ে এসে নীলাদ্রিতার বেনি করে রাখা কোঁকড়া লম্বা চুল গুলো খুলে দিলো। ওমনি হুড় হুড় করে ঘন রাশির মতো কালো কুচকুচে কোঁকড়ানো চুল গুলো নীলাদ্রিতার সারা পিঠ ঢেকে নিয়েছে।
" নীলাদ্রিতা চুল গুলো এইভাবে খোলা রাখো, দেখতে আরো মিষ্টি লাগছে।"
নীলাদ্রিতা এই কথাতে বোধহয় তেমন স্বস্তি অনুভব করলো না। সে অতিষ্ঠের ন্যায় বললো,
" নাহ, আমি চুল খোলা রেখে চলাফেরা করতে পারি না। "
এই কথাখানা বলে সে আবারো চুল গুলো বেনি করে নিয়ে পৃষ্ঠদেশে ছেড়ে দেয়।
অতঃপর গায়ে ওড়নাটাও দিয়ে দিলো। এইটা দেখে তাঁরা নাক-মুখ কুঁচকে ফেলে।
" ইয়াক, এই ড্রেসের সাথে ওড়না যায় না নীলাদ্রিতা।"
নীলাদ্রিতা মুচকি হেসে ওড়ানা টা দিয়ে শরীর ঢেকে বললো,
" যায়, অতিরিক্ত সৌন্দর্যের জন্য আমি আমার সত্তা ভুলে যেতে পারবো না তাঁরা।"
" আচ্ছা ঠিক আছে চলো, আমাকে একটু হেল্প করো।"
তাঁরা আর নীলাদ্রিতা ওয়াশ রুমে বাইরে বেড়িয়ে আসে। তাঁরা তার হাতটি শক্ত করে টেনে ধরে একটা ছোটখাটো রুমের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। রুমটিতে নানা রকমের পানীয় রয়েছে। ওয়েটার এসে একটা একটা করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তাঁরা একটা ট্রে তুলে নিয়ে তাতে গ্লাস ভর্তি পানীয় ঢেলে নিয়ে নীলাদ্রিতার দিকে তাকায়,
" তুমি এখানে বসো, আমি ট্রে টা দিয়ে আসছি ।"
তাঁরা ট্রে নিয়ে চলে গেলো। আর এইদিকে নীলাদ্রিতা উঁকি ঝুঁকি মেরে রুমটা দেখছে। রুমে সব মদ, ভোদকা, ফলের রস,আরো নানা রকমের পানীয় রয়েছে যেটা নীলাদ্রিতার অজানা। সে সামনে এগিয়ে গিয়ে দরজার থেকে উঁকি মেরে দেখলো বাইরের পরিবেশ খুব উত্তাল।
হঠাৎ তার কী হলো কে জানে? সে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলো। পেছন থেকে লোকটাকে তার ভীষণ পরিচিত মনে হলো। নীলাদ্রিতার মাথায় শুধু একটি নাম ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু সে অতো পাত্তা দিলো না।
যাকে সে মনে প্রাণে ঘৃণা করতে শুরু করেছে তাকেই কেনো বারবার তার মতিষ্কে আসতে হয়?
এক জায়গায় সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে বসে রয়লো। আজ আবারো ভীষণ ভাবে বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। আজ তার বাবা-মা থাকলে এইসব দিন দেখতে হতো না। কতই না সুন্দর করে তার দিনটা কাটতো।
একটা সুন্দর সংসার চেয়েছিলো, ছোট্ট একটা মাটির ঘরে দুজন কপোত-কপোতী।
তার ধ্যান ভেঙ্গে তখন রুমে প্রবেশ করলো তাঁরা। নীলাদ্রিতাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে সেও পাশে বসে পড়লো।
" মন খারাপ?"
" উঁহু।"
" তাহলে?"
" ভাগ্যের নিয়তির কথা ভাবছি।"
কথাটায় তাঁরা চুপ করে রয়লো। উঁকি মেরে এক পলক দরজার বাইরে তাকিয়ে আবার নীলাদ্রিতার দিকে তাকায়।
" নিয়তি আমাদের হাতে থাকে না নীলাদ্রিতা। যা হবে তাই মেনে নিতে হয়।"
নীলাদ্রিতা কিছু বললো না আর। তা দেখে তাঁরা আবারো জিজ্ঞাসা করে,
" তা তুমি গ্ৰামের মেয়ে হলে এই শহরে কী করছো?"
নীলাদ্রিতা উত্তর দিতেই যাবে তখনি তাঁরার ডাক পড়লো। তাকে আবারো একটি অর্ডার নিয়ে যেতে হবে। সে উঠে অর্ডার কনফার্ম করতে চলে গেলো।
এর মধ্যেই ঘটে গেলো আর এক বিরল ঘটনা। আকস্মিক ভাবে কারেন্টটা চলে গেলো। চারিদিকে ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। নীলাদ্রিতা অন্ধকার দেখে একদম ভয়ে গুটিয়ে উঠলো।
আশ্চর্য ভাবে তার প্যানিক উঠা শুরু করেছে। এইবার সে তার চারপাশে শুনতে পেলে হাজারো মানুষের হাহাকার,তার বাবা-মায়ের চিৎকার। মামীর অন্ধকার ঘরে বন্দী করে রাখা সেই মুহূর্তে।
যেনো এক নিমিষেই সে সবকিছু স্পষ্ট তার চোঁখের সামনে ভাসছে। নীলাদ্রিতার প্রচন্ড রকমের হাত-পা কাঁপছে। সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে তাঁরা কে ঢেকে উঠে,
" তাঁ...রা কোথায় তুমি?"
কিন্তু নাহ কেউ এলো না। নীলাদ্রিতা হাতড়ে হাতড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তখনো তার সামনে ভেসে যাচ্ছে সেই দিনের স্মৃতি গুলো। তা বাবা-মায়ের বিভৎস চেহারা গুলো। মামীর অত্যচার গুলো ভেসে উঠছে।
দুই কানে হাত চেপে রেখে সে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে।
"কেউ আলো জ্বালাও।"
এখনো চারদিক অন্ধকার। সে হাতড়ে হাতড়ে বাইরে বেড়িয়ে আসে। নাহ এখানে মানুষ রাখলেও চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
নীলাদ্রিতা এইবার প্যানিক এ্যাটাক উঠে গেলো। কিন্তু ভাগ্য আজ তার সাথেই ছিলো বিধায় তখনি কারেন্ট চলে আসলো। সব অন্ধকার ঘুচে গিয়ে সে দেখতে পেলো উজ্জ্বল আলো।
তখনি সঙ্গে সঙ্গে তার নাসারন্ধ্রে ঢুকলো একটি পরিচিত ঘ্রাণ। যেই ঘ্রাণটি সে গত তিনদিন যাবৎ পেয়ে আসছে। ঘ্রানটিতে মিশে আসে সুগন্ধি এবং পুরুষালী গন্ধ।
কিন্তু এতকিছু নীলাদ্রিতার মাথায় এখন ঢুকছে না।সে বড় বড় শ্বাস নিয়ে সামনে তাকিয়ে আছে। তাঁরা তাকে এমন অবস্থা দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওর দিকে চলে আসলো।
" এই তোমার কী হয়েছে? ঠিক আছো তুমি?"
নীলাদ্রিতা হালকা ঢোগ গিলে আমতা আমতা করে বললো, " ঠি..ক আছি , আমাকে একটু পানি খাওয়াও।"
তাঁরা পানি আনতে চলে গেলো।
-
অন্যদিকে নক্ষত্র আর ড্যানিয়েল একের পর এক প্যাক শেষ করতে থাকে।তখনি কো থেকে যেনো রাউডি এসে নক্ষত্রের প্যান্ট ধরে টানতে থাকে। নক্ষত্র মাথা নিচু করে তার দিকে তাকিয়ে বিরক্তের স্বরে বলে,
" রাউডি বিরক্ত করিস না বাপ।"
কিন্তু রাউডি থামলো না সে টানতেই থাকে। এতে নক্ষত্র রক্ত চক্ষু হয়ে তার দিকে তাকাতেই রাউডি তাকে সামনের দিকে ইশারা করলো।
মুখে 'চ' শব্দ উচ্চারণ করে নক্ষত্র সেদিকে তাকাতেই নীলাদ্রিতাকে দেখে।
তাঁরা নীলাদ্রিতাকে পানি এনে খাইয়ে দেয়। কিন্তু এদের দুদন্ড শান্তি বোধহয় আজ মিলবে না বিশেষ করে নীলাদ্রিতার।
নীলাদ্রিতার অতিব সৌন্দর্য দেখে কিছু কিছু ছেলে তার দিকে ধেয়ে আসছে। কেউ কেউ তার পাশে বসে তাকে নানা বাজে কটুক্তি করছে।
পাশ থেকে এইসব নক্ষত্র আর ড্যানিয়েল দেখছে। ড্যানিয়েল এগিয়ে আসতে গেলেই নক্ষত্র হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলো,
" উঁহু, ডোন্ট মুভ।"
" কিন্তু ও তোমার...??" কথাটা শেষ করতে দিলো তাকে। কথার মাঝখানেই নক্ষত্র ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসে বললো,
" পাক্কা,ছেলেগুলোর এইবার হাড্ডি ঘুড্ডি ভাঙবে।"
নক্ষত্রের বলতে দেরি কিন্তু একটা ছেলের চিৎকার বেরিয়ে আসতে দেরি হলো না। নীলাদ্রিতার দিকে হাত বাড়াতেই গিয়েছিলো ওমনি নীলাদ্রিতা হাত চেপে ধরে দিলো একটা মোচড়।
সঙ্গে সঙ্গে বাকী সবাই কিছুটা দূরে সরে যায়। তাঁরা ড্যাব ড্যাব চোখে শুধু তার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলাদ্রিতার নাসারন্ধ্রে আবারো সেই পরিচিত ঘ্রাণটি আরো কাছ থেকে পেতেই সে মুখ তুলে সেদিকে তাকায়।
নক্ষত্র ঠোঁট কামড়ে ধরে ভ্রু নাচিয়ে বললো, " হাই কটকটি রাণী! হোয়াটস আপ?"
নীলাদ্রিতার বদনে বদনে যেনো কেউ নুনের ছিটা দিয়ে দিলো। নক্ষত্রের উপর রেগে সব রাগ যেনো ছেলেটির হাতের উপরে ঝেড়ে ফেলে।
সে ভাবলো এইবার বোধহয় সব ঝামেলা মিটেছে কিন্তু নাহ। উল্টো আরো একটি বড় ঝামেলা নীলাদ্রিতার দিকে ঘনিয়ে এলো। একটি বয়স্ক লোক ঠোঁটে সিগারেট চেপে ধরে নীলাদ্রিতার দিকে এগিয়ে আসলো,
" দাম কতো?"
নীলাদ্রিতা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
" বুইড়া বয়সে ভিমরতি যাইনি এখনো।"
লোকটি রেগে গিয়ে তার গার্ডদের ইশারা করলো মেয়েটিকে তুলে নিতে। তার কথামতো গার্ড গুলো নীলাদ্রিতাকে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বাইরে নিয়ে যেতে থাকে।
তাঁরা আটকাতে গেলে তাকে ভয় দেখিয়ে দূরে ছিটকে ফেলে।
নক্ষত্র নির্বিকারভাবে বসে বসে সব তামাশা দেখছে। মেয়েটা বাঁচুক বা মরুক তাতে তার কিছু যায় আসে না। সে নিশ্চিন্তে ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দেয়।
এইদিকে ড্যানিয়েল আর রাউডি ছটফট করছে রীতিমতো। একদিকে রাউডি নক্ষত্রের প্যান্ট ধরে টানতে থাকে তো আরেকদিকে ড্যানিয়েল দুশ্চিন্তায় বলছে,
" নক্ষত্র ওরা নীলাদ্রিতার সাথে ভুল কিছু করে বসবে। আমাদের যাওয়া উচিত। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড।"
নক্ষত্র গ্লাসের শেষ চুমুক দিয়ে শব্দ বের টেবিলে গ্লাসটি রাখলো। দুই হাতের আঙুলের শব্দে গাঁট ভাঙিয়ে ঘাড় ঢলতে শুরু করে।
তার ইচ্ছা নেই তবুও এই দুই পাগলের জন্য তাকে উঠতেই হবে। সে এইবার আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ালো।
-
লোকটি নীলাদ্রিতা কে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। আর নীলাদ্রিতা! সে তো লোকটি পাছায়, মাথায়,গায়ে সবজায়গাতেই হাত দিয়ে কিল ঘুষি যা আছে সব যেনো নিমেষেই মারতে থাকে। লোকটি রেগে গিয়ে এইবার মাঝ রাস্তায় তাকে ছুড়ে ফেলে।
নীলাদ্রিতা মুখ থুবড়ে সেখানে ধপাস করে পড়ে যাই। ঘাড় ঘুরিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নীলাদ্রিতা বলে,
"বুইড়ার ঘরের বুইড়া এভাবে ফেললি কেনো?"
লোকটি চোখের ইশারায় গার্ড গুলোকে নীলাদ্রিতাকে ধরতে বলে। নীলাদ্রিতা হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে থাকে। ততক্ষনে আরো একটি কালো গাড়ি এসে থামে তাদের সামনে।
গাড়িটি থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে হুডি পরা এক ব্যক্তি। তার চাল-চলা, চোখের বাঁকা দৃষ্টি, সমস্তকিছুই ভয়ংকর।
লোকটি সেই ব্যাক্তির কে জিজ্ঞাসা করে,
" টাকা কতো দিবেন?"
হুডি পড়া ব্যাক্তিটি বাঁকা চোখে নীলাদ্রিতাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে জিভ দিয়ে ঠোঁট স্লাইড করে বলে,
" যত চাই ততো নিয়ে নে।"
লোকটি নীলাদ্রিতাকে হুডি পড়া ব্যাক্তিটির হাতে তুলে দেয়।
" ছাড়ুন আমায়।" কিন্তু নীলাদ্রিতার কোনো কথা কেউ শুনলো না। এতক্ষণে সাহস থাকলেও এখন মনের ভেতর ভয় ঢুকতে থাকে।
স্পষ্ট সে দেখতে পাচ্ছে তাকে সরাসরি কিনে নেওয়া হচ্ছে । কেনো আসলো এখানে? এখন নিজের মাথায় নিজে চাপড় মারতে ইচ্ছে করছে।
নীলাদ্রিতা এক পল্লক পেছনে ঘুরে তাকায় হয়তো কারো অপেক্ষা করছে কিন্তু সে ঠের জানে লোকটি আসবে না তাকে বাঁচাতে।
হুডি পড়া লোকটি নীলাদ্রিতার হাত খপ করে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে। এইদিকে হাত মুছরা মুছরি করে বললো,
" হাত ছাড়ুন বলছি।"
" কিনে নিয়েছি ছাড়ার জন্য?"
নীলাদ্রিতা এদের শক্তির কাছে পারবে না তাকে এখন পালাতে হবে। কিন্তু এতো শক্ত পোক্ত হাত থেকে মুক্তি পাবে কী করে?
বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে শুধু একটি পরিচিত মুখ কে খুঁজছে, শুধু একটি পরিচিত মুখ।
যেই মুখটা দেখলেই নীলাদ্রিতার হঠাৎ ঘৃণায় মন বিষিয়ে যায়।খুন করতে ইচ্ছে করে তাকে কিন্তু এখন সেই মানুষটিকেই ভীষণ প্রয়োজন। কোথায় এখন সেই মানুষটি, কোথায়?
হুডি পড়া লোকটি এইবার নীলাদ্রিতাকে একটি গাড়ির মধ্যে ধাক্কা মারে।
" আমাকে ছেড়ে দিন।"
" পারবো না।"
" আমি কিন্তু বিবাহিত।"
" আই ডোন্ট কেয়ার, তোকে এক রাত ভো'গ করতে পারলেই হলো।"
নীলাদ্রিতা চারিদিকে তাকিয়ে দেখছে এতো লোক তবুও কেউ একটু সাহায্যের জন্য আসছে না। এ কেমন মানব জাতি? এটাই কী মানুষের মনুষ্যত্ব!!
" গাড়িতে উঠ চুপচাপ।"
তখনি পেছন থেকে একটি শব্দ ভেসে এলো,
" ও গাড়িতে উঠবে না। আমাকে তোল তোর গাড়িতে। "
হুডি পড়া লোকটি পিছু ফিরে তাকাতেই নক্ষত্রকে দেখতে পেলো। নীলাদ্রিতার নাসারন্ধ্রে সেই একিই পুরুষালি গন্ধটা প্রবেশ করে। ঘাড় কাত করে উঁকি মেরে দেখলো। সেই চিরচেনা ঠোঁটে ভেপ গুঁজে রেখেছে আর মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়াচ্ছে।
কোথাও না কোথাও নীলাদ্রিতা এইবার শান্তির শ্বাস ফেললো। নক্ষত্র ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে হাতের মুঠোয় রাউডির গলার বেল্ট রয়েছে। পাশেই ড্যানিয়েল ও আসছে।
হুডি পড়া লোকটি গমগমে আওয়াজে বলে,
" তুই কে?"
নক্ষত্র উত্তর না দিয়ে চুপচাপ লোকটির ঘাড়ে একটা জোড়ালো ঘুসি মেরে নীলাদ্রিতাকে তার থেকে ছিনিয়ে আনে।
এমন ভাবে লোকটির থেকে ছিনিয়ে আনলো একদম বুকের সাথে নীলাদ্রিতাকে মিশিয়ে নেয়। তারপর ফিসফিস করে বলে,
" ডালিং !!"
নীলাদ্রিতা কড়া চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে, " মুখ ভেঙ্গে দিবো, একদম এমন নামে ডাকবেন না।"
নক্ষত্র তখন গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললো,
" একটা লোকের ও হাত ভাঙ্গতে পারলে না, আবার আমার মুখ ভাঙ্গার স্বপ্ন দেখছো? ডালিং।"
হুডি পড়া লোকটি এতক্ষণ দুজনের কথোপকথন শুনছে কিন্তু তার নিয়ে আসা গার্ডেদের আদেশ দিতেই গার্ড গুলো এক এক করে এগিয়ে আসছে।
ড্যানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে তার রিভলবারটি হাতে তুলে নেয় এবং রাউডি ও ঝাঁপিয়ে পড়ে লোক গুলোর উপর।
এরা তো এইদিকে যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে আর ওই হুডি পড়া লোকটি আবারো নীলাদ্রিতার হাত টেনে ধরতেই নক্ষত্র কোমড়ে গুজে রাখা তার রিভলবারটি বের করে।
নীলাদ্রিতা কিছুটা ভয়ে নক্ষত্রের শার্ট আঁকড়ে ধরে,
" ককী করছেন? আপনার হাতে বন্দুক কেনো?"
বুক থেকে নীলাদ্রিতাকে সরিয়ে দিয়ে সে বললো, " রক্ত সহ্য করতে পারো?"
নীলাদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে বলে, " হ্যাঁ কিন্তু মাঝে মাঝে প্যানিক এ্যাটাক হয়, কেনো?।"
নক্ষত্র কোনো কথা না বলে চুপচাপ শার্ট থেকে কালো টাই খুলে নীলাদ্রিতার চোখে বেঁধে দেয়।
" আপনাকে তো আমি... কী করছেন কী?"
চলবে__