ফন্ট সাইজ:
থিম:
নীলাক্ষত্র

৯

লেখক: প্রিয়ন্তিকা প্রিয়ন্তী

#নীলাক্ষত্র 

প্রিয়ন্তিকা_প্রিয়ন্তী
পর্ব:০৯ 
লালসারাই এর আশে পাশে অনেক দোকান পাট থাকলেও আকস্মিক এমন সংঘর্ষে সবাই ভয়ে পালাতে থাকে। এখন সেই জায়গাটা একটা শুনশান মর্মে পরিণত হয়েছে। লালসারাই এর ভেতর থেকে উচ্চ শব্দে ধ্বনিত হচ্ছে আধুনিক যুগের শালীন বিহীন গান গুলো।
 যার কারণে গু'লা গুলি'র শব্দ অন্য কোথাও তেমন শোনা যাবে না। 
নক্ষত্র নীলাদ্রিতাকে বুকের সাথে চেপে রেখেছে। এইদিকে নীলাদ্রিতার চোখে টাই বাঁধানোর কারণে সবকিছু অন্ধকার হয়ে উঠে। সে ভয়ে নক্ষত্রের শার্ট মুঠো করে চেপে ধরলো,
" এইটা খুলুন, আমার অন্ধকার ভয় লাগে। খুলে দিন না।"
কিন্তু নক্ষত্র তা শুনলে তো? তার কানের কাছে নীলাদ্রিতার আকুতি ভরা একটি শব্দ ও পৌছায় নি। সে হুডি পড়া লোকটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। 
লোকটি বারবার নীলাদ্রিতার হাত ধরার চেষ্টা করছে কিন্তু প্রতিবারই নক্ষত্রের কারণে লক্ষ্য পৌঁছাতে পারছে না। 
নক্ষত্র ট্রিগার ঘুরিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে বললো,
" যাহ্ মেয়েটা ভয় পাবে দেখে এইজন্য তোকে একটা সুযোগ দিলাম। ১০ সেকেন্ড এর মধ্যে যদি তুই এখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে না পারিস, তাহলে বাপ তোর কাহিনি এখানে খতম হয়ে যাবে।"
কথাটা বলে নক্ষত্র ভ্রু কুঁচকে লোকটাকে দেখলো, নাহ লোকটা এক বিন্দু ও নড়লো না।তখন নক্ষত্র রক্ত চক্ষু হয়ে জোরে চিৎকার করে উঠলো, " যাহহহহ।"
চিৎকারটা এতোটাই জোরে ছিলো নীলাদ্রিতা একদম তার বুকের সাথে মিশে গেলো। সাথে সাথে ড্যানিয়েল কানের মধ্যে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে চোখ খিচে ফেলে।
লোকটিও কিছুটা ভয় পেয়ে ঘাবড়ে যায়, তবে নিজেকে সাহসী প্রমাণ করতে সে বলে উঠলো,
" কী ভেবেছিস তু..তুই ভয় দেখাবি আর আমি চলে যাবো। লাখ টাকা দিয়ে কিনেছি মা'লটাকে এতো সহজে ছাড়বো না। হাত দিয়ে ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে দেখবো।"
এই কথাটা বোধহয় লোকটির একদমই বলা উচিত হয় নি। ওই যে লোকে বলে না নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা ঠিক একই অবস্থা হয়েছে লোকটি। আরে ভাই তোকে যেতে দিয়েছে প্রাণ নিয়ে দৌড়ে চলে যাবি তা না নিজের ক্ষমতা দেখাচ্ছে।
হলো তো এইবার নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলো। নক্ষত্র এই কথা শুনার সাথে সাথে যেনো তার দুই কান টগবগে লাল হয়ে উঠে। সে নীলাদ্রিতাকে বুক থেকে সরিয়ে লোকটির দিকে রুষানল হয়ে এগিয়ে গেলো। 
সোজা দুই কাঁধ ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। নক্ষত্র রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হঠাৎ সে ঘাড় কাত করে তাকায়,
" মা'ল? উঁহু! তোর এইটা বলা একদম উচিত হয় নি। জানিস তো আমি খুব নির্দয়,দয়া-মায়া আমার মধ্যে নেই।"
বলেই সে রিভলবার টি সোজা লোকটির কপালে চেপে ধরে ট্রিগার চাপলো। লোকটি ভয়ে ঢোক গিলে বলে,
" ভাই,ভাই আমাকে ছেড়ে দিন। মারবেন না আমাকে। আমার কিছু চাই না নিয়ে যান মেয়েটাকে,যান।"
নক্ষত্র ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে বললো, " ওকে, আই’ম গিভিং ইউ অ্যানাদার চান্স।"
কথাটি বলতে বলতে লোকটির কলার ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে। এইদিকে নীলাদ্রিতা সেই কখন থেকে টাই এর গিট্টু টা খুলতে পারছে না দেখে নক্ষত্রকে বকতে থাকে,
" আমার কিন্তু এখন খুব রাগ উঠছে, নক্ষত্র আমার চোখের বাঁধন খুলে দিন। নয়লে কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়বো না।"
এর কথায় ড্যানিয়েল আর রাউডি এক পাশে চলে গেলো। মেয়েটা সেই কখন থেকেই এক কথা বলে যাচ্ছে তবুও এদের কোনো হেলদোল নেই। ড্যানিয়েল একাই বাকী সব লোক গুলোকে মেরে দিয়েছে। 
নক্ষত্র ছটফট করতে থাকা নীলাদ্রিতার সামনে এসে একটানে চোখে বেঁধে রাখা টাই টা খুলে ফেললো। 
আলো দেখতে পেয়ে নীলাদ্রিতার ছটফটানি এইবার ধীরে ধীরে বন্ধ হয়। সে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে চোখ খুলে তাকায়। নক্ষত্র মুখটা বাংলার পাঁচ এর মতো বানিয়ে বিদ্রুপ করলো,
" শরীরের জোর নেই এক আনা । মুখের কথা আর তেজ আছে মেয়ের ষোলো আনা।"
নীলাদ্রিতা নাক ফুলিয়ে গরম চোখে তার দিকে তাকায়। কিন্তু নক্ষত্র সেটা অগ্রাহ্য করে লোকটিকে নীলাদ্রিতার পায়ের কাছে এনে ফেললো। নক্ষত্র কিছু বলার জন্য পেছনে ঘুরে গেলো। আর সেই সুযোগটাই লোকটি কাজে লাগিয়ে নীলাদ্রিতাকে বন্দি করে নিলো। 
নক্ষত্রের একটা বিশেষ গুন আছে সে মানুষের গতিবিধি ঠিক অনুমাণ করে ফেলতে পারে। এই যে লোকটি নিচ থেকে উঠে গেলো সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্র সেটা ঠিক বুঝে গিয়েছে। 
নীলাদ্রিতাকে একটু ও ক্ষতি করার আগেই নক্ষত্র সোজা রিভলবারের ট্রিগারে চাপ দিলো।শাই করে একটি বুলেট গতিতে এগিয়ে এসে লোকটির‌ কব্জিতে এসে লাগে।
নীলাদ্রিতাও দূরে সরে গেলে আর লোকটিও মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। তবে এইবার নক্ষত্রকে কেউ আটকাতে পারবে না। সে গতির সীমা ভেদ করে লোকটির বুকের উপর চেপে বসে। 
" এই হাত দিয়ে ছুঁইয়ে দিবি বলেছিলি না? নে এই হাতই আর রইলো না।"
বলেই পর পর অনেক গুলো বুলেট হাতের কব্জিতে ছুঁড়লো। লোকটির ব্যাথায় পুরো মুখ নীল হয়ে উঠে। সে আর কোনো সময় ব্যয় না করেই এইবার সোজা শুট করে দিলো মাথায়। 
ব্যস সবকিছু শান্ত একদম শান্ত। বড় বড় শ্বাস নিয়ে কোমড়ের পেছনে রিভলবারটি গুঁজে নেয়।
নীলাদ্রিতা সে তো স্থির, পাথরের ন্যায় জমে গেলো। শুধু চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। কেই বলবে যে লোকটি এতক্ষণ জীবিত ছিলো সে এখন মৃত। পুরোপুরি একটি লাশ-তার দেহ থেকে উড়াল দিলো আত্মাটা। 
মৃত্যু তো ধ্রুব সত্য সবার একদিন না একদিন মরত হবে। কিন্তু মানুষই কেনো মানুষের মরণদূত হয়ে আসবে কেনো? 
চোখের সামনে একটি তরতাজা প্রাণ চলে গেলো। নীলাদ্রিতার চারিপাশ কেমন ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা হয়ে উঠেছে। 
সে না কিছু শুনতে পারছে আর না কিছু বুঝতে পারছে। 
নক্ষত্র তার সামনে এসে দাঁড়ালো মেয়েটাকে পা থেকে মাথা অব্দি আপাদমস্তক পরখ করেছে। তার মাথায় আসছে নীলাদ্রিতা এখানে এলোই বা কী করে। সে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গেলেই নীলাদ্রিতা দূরে ছিটকে যায়। 
" ছুঁবেন না আমাকে। খু'ন করেছেন আপনি,খু'ন। খু'নী, আপনি খু'নি আমাকে ছুঁবেন না।"
সে এই কথাটা বিরবির করতে করতে অন্য দিকে চলে যেতে গেলেই। সেখানে বাকী গুলোর মরদেহ দেখে সেখানেই ধপাস করে পড়ে যায়।
নক্ষত্র মাথা চুলকিয়ে পা বাড়িয়ে তার সামনে আসতে থাকে। একদম সোজা হাঁটু গেঁড়ে বসে ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো।
" ডালিং ভয় পেয়েছো?"
নীলাদ্রিতার চোখ থেকে টপটপ করে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছে। গাল বেয়ে জল কনা গুলো পড়ার আগেই নক্ষত্র তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে কনা গুলো তুলে নিলো। 
" বাহ্ এদের জন্য চোখের পানিও পড়ছে দেখি।"
নীলাদ্রিতা রাগে , দুঃখে নক্ষত্রের কলার চেপে ধরলো,
" এমনটা না করলে হতো না? কেনো তরতাজা প্রাণ গুলো নিয়ে নিলেন?"
নক্ষত্র মাথা এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে বললো,
" হতো না ডালিং হতো না।"
" আপনার মারতে একটুও হাত কাঁপে নি? কী করে পারলেন এতো গুলো মানুষকে মেরে ফেলতে। "
নক্ষত্র নীলদ্রিতার এমন মূল্যহীন আবেগ দেখে বিরক্ত হয়ে উঠে। কী মেয়েরে বাবা যারা তার ক্ষতি করতে চাইলো তাদের জন্যেই চোখের পানি নষ্ট করছে। বাহ্ নারী জাতিকে বুঝা সত্যি পুরুষ জাতির কাম্য নয়।
নক্ষত্র বেশ বিরক্ত হয়ে নীলাদ্রিতা বেনি করা লম্বা বেনি টা নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে নিলো,
" নে তোর না আমাকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করে। এখন মেরে ফেল। "
নীলাদ্রিতা উদাস মুখে নক্ষত্রের দিকে তাকালো। মানুষটা বেশ আঘাত পেয়েছে। কপালে ঠোঁটে গালে বেশ অনেক জায়গায় ক্ষতের দাগ। 
" লোকটাকে না মারলে হতো না?"
" ওকে না মারলে তোকে মেরে দিতো।"
" দিলে দিক এখানে তো আপনার কোনো মাথাব্যথা নেই।"
নক্ষত্র রগচটা মেজাজে উঠে দাঁড়ালো। সাথে নীলাদ্রিতাকেও দাঁড় করালো,
" তোমাকে আমি প্রথমদিনই চলে যেতে বলেছিলাম। আফসোস! এখন আমার আর কিচ্ছু করার নেই। আমি খুব খারাপ যেটা তুমি হারে হারে বুঝতে পারবে কোঁকড়ালি।"
—
—
সাথী চৌধুরী বাড়ির এপাশ ওপাশ পায়চারি করছে। ঘড়িতে চোখ পড়লেই দেখতে পেলো রাত ৯ টা বেজেছে। সময় তার মতে টিকটিক করে এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু নীলাদ্রিতার খোঁজ এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। 
কলা ভাই সদর দরজা দিয়ে দৌড়ে আসলো। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বললো,
" পাচ্ছি না কোথাও মেয়েটাকে পাচ্ছি না। বহুত খুঁজেছি কোথাও নেই।"
সাথী চৌধুরী গমগমে আওয়াজ বলে,
" ওর মামার বাড়িতে খোঁজ নিয়েছিস?"
" হ্যাঁ নিয়েছি ও সেখানে নেয়।"
সাথী চৌধুরী কিছুক্ষণ ভাবলো। তাও ঠিক শহর থেকে গ্ৰাম অনেক দূর। আর তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটা কোনো রাস্তা ঘাট চিনে না। একা একা কোথাও যেতেও তো পারবে না তাহলে গেলো কোথায়?
কলা ভাইকে তখন সাথী চৌধুরী আদেশ দিলো স্যান্ডিকে ডেকে আনার জন্য। কলা ভাই এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে স্যান্ডিকে ঢেকে নিয়ে এলো।
স্যান্ডি আড়মোড়া ভেঙে ঘুমঘুম কন্ঠে বলে,
" সমস্যা কী আপনার এইভাবে ঘুম থেকে তুলে আনলেন কেনো?"
সাথী চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্যান্ডির দিকে তাকালো। ছেলেটা দিন দিন আরো বেয়াদপ হয়ে যাচ্ছে। সামনে যে তার নির্বাচন সেই খেয়াল নেয়। 
" নক্ষত্র কোথায়?"
নক্ষত্রের নাম শুনতেই স্যান্ডির হাবভাব বদলে গেলো। সে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে গেলো। সাথী চৌধুরী স্যান্ডি কে আবারো রুক্ষ কন্ঠে বলে,
" তোমার লালসারাই এ গিয়েছে তাই না?"
স্যান্ডি কোনো জবাব না দিয়ে বাইরে চলে গেলো। এসবে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। 
--
--
নীলাদ্রিতা একটা জায়গায় বসে আছে হাঁটুতে মুখ গুঁজে। আজ সরাসরি সে কাউকে খু'ন হতে দেখেছে। এখনো সেই দৃশ্য টা তার চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠছে। 
এইদিকে নক্ষত্র আর ড্যানিয়েল লা'শ গুলো গুম করে দিলো নিমেষেই। বেশিক্ষণ লা'শ গুলো রাখলে পুলিশ কেস ও হতে পারে। এমনিতেই নক্ষত্রের উপর দুইটা কেস রয়েছে। যেটা টাকার কারণে দমিয়ে রেখেছে সাথী চৌধুরী।
সব কাজ শেষে নক্ষত্র নীলাদ্রিতার সামনে ধপাস করেই বসে পড়ে। ড্যানিয়েল ইশারা করলো রাউডি কে নিয়ে কোথাও চলে যেতে। ড্যানিয়েল সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে যায়। 
এরপর নীলাদ্রিতার দিকে তাকিয়ে গমগমে আওয়াজ জিজ্ঞাসা করে,
" তা বলো তুমি এখানে কী করছো?"
নীলাদ্রিতা হাঁটু থেকে মুখ তুললো। তার সারা মুখ রাগে লাল হয়ে উঠেছে। সে নক্ষত্রের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে বসে,
" এখান মেয়েদের নিয়ে অশ্লীলতায় মেতে উঠে তাই না? পাচার ও হয়?"
নক্ষত্র সোজাসুজি উত্তর দিলো, " তোমার না জানলেও চলবে। তুমি এখানে কীভাবে এলে?"
নীলাদ্রিতা উত্তর দেয়, " ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছি কিন্তু ভাগ্য আমাকে এখানে নিয়ে এলো ভাবতেও আমার ঘেন্না লাগছে।"
নক্ষত্র ভ্রু কুঁচকালো, " পরিক্ষা?"
" হ্যাঁ এমবিএস এর ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছি কিন্তু ওই যে কলা ভাইকে কোথাও খুঁজে পেলাম না।"
ঘাড় এদিকে ওদিক করে নক্ষত্র ঠাট্টা স্বরে বললো , " ওহ্ এমবিবিএস! ডাক্তার হতে চাও নাকী?"
নীলাদ্রিতা দাঁড়িয়ে গেলো সে তীক্ষ্ণ গলায় নক্ষত্রকে উত্তর দেয়,
" হ্যাঁ এইটা আমার বাবার স্বপ্ন যেটা আমি পূরণ করেই ছাড়বো। মানুষের সেবা করায় আমার একমাত্র লক্ষ্য।"
এই কথা শুনে নক্ষত্র হো হো করে হেসে উঠলো।
 " কিন্তু তোমার স্বামী তো মানুষের হাড্ডি ঘুড্ডি ভাঙে। বউ ডাক্তার, স্বামী বক্সার। বাহ্ জোশ তো আমাদের কেমিস্ট্রি।"
নীলাদ্রিতা এক পলক নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে ঘুরে গিয়ে রাস্তার এপাশ ওপাশে কিছু খুঁজে চলেছে। নক্ষত্র তা দেখে চিৎকার করে উঠে,
" ওই ডাক্তার রাণী কী খুঁজেন ?"
নীলাদ্রিতা কিছু ঘাস পাতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
" আপনাকে মেরে ফেলার প্রক্রিয়া খুঁজি।"
কথাটি বলে সেই এগিয়ে আসলো। দুই হাতের তালুতে কিছু ঔষধীয় ভেসজ পাতা চিপে চিপে রস বের করলো। সেটা নক্ষত্রের কপালে, গালের ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দেয়। 
নক্ষত্র ব্যাথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেলেলেও নীলাদ্রিতা ওষুধীয় পাতা গুলো সরায় না। এক হাঁটু গেঁড়ে বসাতে নীলাদ্রিতার লম্বা বেনি করা চুল গুলো মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে।
আড়চোখে নক্ষত্র সেটা লক্ষ্য করে বেনিটা মাটি থেকে তুলে হাতের মুঠোয় তুলে নিলো। এবং ব্যাথাতুর কন্ঠে বলে,
" ডাক্তার রাণী ব্যাথা পায় তো!"
নীলাদ্রিতা আরো জোরে জোরে পাতা গুলো চেপে ধরে রেখে বিরবির করে,
" ঢং, ঢং দেখাচ্ছে আমাকে। হাজার লোককে মেরে ব্যাথা পায় ওনি।"
ঠোঁটের কোনো পাতা ছুঁয়াতে গেলে নক্ষত্র নীলাদ্রিতার হাত খপ করে ধরে ফেলে। তার ঠোঁটের কোনে জমে থাকা রক্ত গুলো বৃদ্ধা আঙ্গুলে নিয়ে সোজা নীলাদ্রিতার চিকন সিঁথিতে রক্তে ভরিয়ে দিলো।
" বিবাহিত তুমি, এইভাবে চলাফেরা করলে মধুর জন্য মৌমাছি মৌ মৌ'ই করবে।"
এদের কথার মাঝেই ড্যানিয়েল নক্ষত্রের বিএমডব্লিউ গাড়িটি নিয়ে আসে। এই গাড়িটিকে নক্ষত্র পঙ্খিরাজ বলে সম্বোধন করে। এইটা তার অনেক শখের গাড়ি।
-
নক্ষত্র নীলাদ্রিতার হাত শক্ত করে চেপে ধরে তাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যেতে থাকে। ড্যানিয়েল কে উদ্দেশ্য করে সে বললো,
" ব্রো প্রচুর আলসে লাগছে গাড়িটা তুমিই চালাও।"
বলেই নীলাদ্রিতা কে নিয়ে পেছনের সিটে বসে পড়ে। এইদিকে কাঁচ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে নীলাদ্রিতার গা গুলিয়ে উঠা শুরু করে। একে তো কাঁচ বন্ধ তার উপর এসি চলছে। এইজন্যেই নীলাদ্রিতার শরীর ভীষণ খারাপ হয়ে উঠে।
সে ঠোঁটে হাতে চেপে চোখ বন্ধ করে আছে। কিন্তু নাহ আর সামলানো যাচ্ছে না। হাত দিয়ে নক্ষত্রকে ইশারা করলো গাড়ি থামাতে।
নক্ষত্র একটু চোখ বুঁজে রয়েছিলো বলেই তার ইশারা বুঝতে পারে না। সে আবারো হাত দিয়ে তাকে ডাকতে থাকে।
" কী রে শাকচুন্নী সমস্যা কী তোর?"
নীলাদ্রিতা বড় বড় চোখ করে হাত দিয়ে ইশারা করছে কিন্তু নক্ষত্র সেটা বুঝতে পারে না।
" কী? এইভাবে এইভাবে হাত দিয়ে কী?"
নীলাদ্রিতার আর সহ্য হলো না সে ওয়াক করে বমি করে বসলো নক্ষত্রের গায়ে।
সঙ্গে সঙ্গে ড্যানিয়েল ও গাড়িটি থামিয়ে দিলো। পেছনে ফিরে সে আর রাউডি হাবাগোবার মতো তাকিয়ে আছে। 
আর নক্ষত্র! সে তো পুরো বরফের মতো জমে গেলো। এক পলক নিজের বেহাল দশা দেখে নীলাদ্রিতার দিকে রাগী চোখে তাকায়,
"এইটা কী হলো? বেডি তোর মাল্টি ভিটামিন এর প্রয়োজন।"
নীলাদ্রিতার আবার গা গুলিয়ে আসছে দেখে সে তাড়াতাড়ি গাড়ির দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে গেলো। রাস্তায় বসে পেটে যা আছে সব বমি করে ভাসিয়ে দেয়।
" ড্যানিয়েল! ড্যানিয়েল!"নক্ষত্র রাগে তাকে ডাকতে থাকে।
কিন্তু ড্যানিয়েল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
" ব্রো তুমি কাজ সেরে ফেলেছো? বাহ্ নারী বিদ্বেষী লোক অকাম টা করে ফেললে।"
নক্ষত্র দাঁতে দাঁত চেপে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে,
" হারাম*জাদা ব্লেজার টা খোল, বেশি কথা বললে মুখের মানচিত্র পাল্টে দিবো।"
ঘাবড়ে গিয়ে ড্যানিয়েল তড়িৎ গতিতে এসে নক্ষত্রের শরীর থেকে ব্লেজার টি খুলে ফেলে। কিন্তু এখনো নক্ষত্রের শরীর থেকে বমির গন্ধ ভেসে আসছে। 
তারাও গাড়ি থেকে নেমে গেলো। নীলাদ্রিতার অবস্থা দেখে নক্ষত্র নাক মুখ সিঁটকায়। এই গাড়ি করে আর যাওয়া যাবে না।
নীলাদ্রিতার দিকেই চোখ পড়তে সে একটু একটু করে তার কাছে গেলো। পিঠে হালকা মালিশ করে দেয় আড়ালে। 
নীলাদ্রিতা একদম নেতিয়ে পড়েছে এই অবস্থায় সে এই গাড়িতে আর যেতে পারবে না। 
" ড্যানিয়েল তুমি গাড়ি নিয়ে এগো আমি দেখছি কী করা যায়।"
ড্যানিয়েল তার কথা মতো রাউডি সহ গাড়ি নিয়ে চলে গেলো। এইদিকে নক্ষত্র চারিদিক তাকায় তারা প্রায় বাজারের দিকেই চলে আসলো। সামনেই গাড়ি পাওয়া যাবে। তাই নীলাদ্রিতার হাত ধরে সামনের দিকে হাটলো।
হাঁটতে হাঁটতে সিএনজির স্টেশনে গিয়ে নীলাদ্রিতাকে জিজ্ঞাসা করে,
" বাস নাকী সিএনজিতে কোনটাতে যাবা?"
নীলাদ্রিতা মুখ গোমড়া করে বলে, 
" সিএনজি।"
একটা সিএনজি ভাড়া করে তারা সেখানেই উঠে গেলো। গাড়ি এগোয় কিন্তু চারিদিকে এতো অন্ধকার তা দেখে নীলাদ্রিতা কিছু ঘাবড়ে যায়। আলগোছে নক্ষত্র নীলাদ্রিতাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো এবং বললো,
" ভাবছি তোমার জন্য একটা সিএনজি কিনে রাখতে হবে, গাঁয়ে মেয়ে বলে কথা।"
নীলাদ্রিতা তখনি চোখ মুখ শক্ত করে উত্তর দেয়, " গাঁয়ে মেয়ে কাকে বলছেন অসভ্য লোক।"
" তোকে বলছি বেডি, আমি আমার পঙ্খিরাজ ছাড়া কোথাও চলাফেরা করি না। আর তোর জন্য কিনা আমাকে এইভাবে যেতে হচ্ছে ছ্যাহ।"
বমি করে নীলাদ্রিতার অনেকে দুর্বল অনুভব হচ্ছে তাই সে নক্ষত্রের বুকে শরীর এলিয়ে দেয়। জানা অজানা অনেক কারণে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। 
এইভাবে সিএনজি করে যাতায়াত এর সময়ে তার মামা ঠিক এমন ভাবেই তাকে আগলে রাখতো। অথচ আজ সেই মামা থেকে আজ বহুদূরে। 
চলবে__

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন