#নীলাক্ষত্র
প্রিয়ন্তিকা প্রিয়ন্তী
পর্ব:১০
সোফায় পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসে আছে আরভ বসু, ওরফে আমাদের স্যান্ডি। নাম আরভ বসু হলেও সে নিজের পরিচয়ে "স্যান্ডি" নামটাই ব্যবহার করে।
ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবের ছেলে "চৌধুরী" টাইটেলটি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করে না ঠিক নক্ষত্রের মতো। নক্ষত্র যেমন এই টাইটেল টি নামের সাথে দেয় না, তেমনি স্যান্ডি ও তার নামের সাথে এটি কখনোই ব্যবহার করে না।
জন্মদাতা পিতার মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই পারমিতা পুনরায় বিয়ে করে এই বাড়িতে ওঠেন। তখন স্যান্ডি খুব ছোট। ছোট বোনকে নিয়ে এক বসন্ত বিকেলে, প্রথমবার এই বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছিল সে।
শৈশব থেকেই মায়ের প্রতি তার এক অদম্য ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। আর নক্ষত্রকে তো সে দু’চোখে সহ্যই করতে পারে না,একেবারেই না।
স্যান্ডি একের পর এক পান মুখে পুরে পিচকিরির মতো লাল থুথু ফ্লোরে ফেলছে। সামনে সালোয়ার-কামিজ পরা এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। স্যান্ডি তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে ঠোঁট কামড়ে বলে,
"হেই বিউটিফুল লেডি?"
এমনিতেই মেয়েটি প্রচন্ড ভীতু তাই কিছুক্ষণ নিজেকে ধাতস্থ রেখে নরম কন্ঠে বলে,
" দে..খুন গতকাল ও এসেছিলাম। তবে রুমের মধ্যে মেয়েদের সাথে আপনার অ'শ্লী'ল কার্যক্রমে দেখেই চলে গেছি। আমার কাজটা খুব প্রয়োজন, দয়া করে আমার এবং আপনার সময় বরবাদ করবেন না।"
স্যান্ডি পানের পিচকিরি ফেলে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো।মেয়েটির ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে বলে,
" উফফ! কী সুগন্ধি মাইরি।"
মেয়েটি আতঙ্কে সঙ্গে সঙ্গে দূরে সরে গেলো। এইবার স্যান্ডি সিরিয়াস মুডে এসে আবারো সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসলো।
" ঠিক আছে এইবার আসল কথায় আসা যাক। ভোট প্রচারণা করতে পারবে তো?"
মেয়েটি চোখের চশমা ঠেলে আমতা আমতা করে বলে, " হ্যাঁ পারবো।"
স্যান্ডি তার চোখ সরু করে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে,
" ইউ নো হোয়াট? মেয়েরা আমার জন্য শুধু মাত্র চাহিদা বস্তু। তবে আমার ভোট প্রচারণায় মেয়েদের প্রয়োজন, তাদের নরম কথায় সবকিছু গলে যায়, সব কিছু। তাই তোমাকে আমার প্রয়োজন মিস তাঁরা।"
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নীলাদ্রিতা নিচে নেমে আসছে। গতকালের ঘটনার স্মৃতি এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। জীবনে প্রথমবার নিজের চোখের সামনে কাউকে গুলি খেতে দেখেছে সে। আতঙ্কে তার শরীর জ্বরে কাঁপছে রীতিমতো।
কিন্তু চোখ তুলে তাকাতেই তাঁরা’কে দেখে সে বিস্মিত হয়ে যায়। তাঁরা ও তাকে দেখে বেশ খানিকটা আশ্চর্য হয়। নীলাদ্রিতা দৌড়ে এসে তাকে জিজ্ঞাস করে,
" তাঁরা, তুমি এখানে?"
তাঁরাও কিছুটা অবাক হয়ে একই প্রশ্ন করে উঠে,
" তুমি এখানে কী করছো নীলাদ্রিতা? তোমাকে তো ওরা তুলে নিয়ে গিয়েছিলো
না?।"
নীলাদ্রিতা নজর ঘুরিয়ে স্যান্ডির দিকে তাকালো। ছেলেটা তার একদম পছন্দ নয়,মেয়েবাজ ছেলে একটা । নীলাদ্রিতা হতাশার শ্বাস ফেলে বলে,
" এইটা আমার শ্বশুর বাড়ি। আর গতকালকের লোকগুলো আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে নি।"
তাঁরা কথার উল্টো পিঠে জিজ্ঞাসা করে,
" তোমার হাসব্যান্ড কে?"
নক্ষত্রের নাম মুখে নিতে না চাইলেও নীলাদ্রিতার বাধ্য হয়ে নিলো,
" ন..ক্ষত্র রাবনীথ।"
‘নক্ষত্র’ নামটা শুনতেই তাঁরার চোখ মুখ পাল্টে গেলো। চেহারায় ফুটে উঠলো ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। তবে সে কিছুটা ইতস্তত বোধ করে এদিক ওদিক নজর ঘুরিয়ে নেয়। এইদিকে নীলাদ্রিতা তাকে আবারো প্রশ্ন করে উঠে,
" তুমি এখানে যে?"
তাঁরা এক বুক হতাশা নিয়ে বলে, " আমার ভীষণ কাজের প্রয়োজন। তাই এখানে কাজ করতে এসেছি।"
নীলাদ্রিতা একবার স্যান্ডির দিকে তাকায়। ছেলেটার নজর ভালো না দেখে সে ভয় পেয়ে যায়। মনে মনে ভেবে উঠলো নানা অসঙ্গতি মুলক চিন্তা ধারা। তাহলে কী তাঁরা ও আজ রাতের জন্য স্যান্ডির সাথে ছিঃ ছিঃ। নিজেকে নিজেই ধিক্কার জানিয়ে সে বললো, " কী কাজ?"
স্যান্ডি এতক্ষণ এদের কথোপকথন এ বেশ বিরক্ত হচ্ছিলো। তাই সে আড়মোড়া ভেঙে পান চিবোতে চিবোতে নীলাদ্রিতাকে বললো,
" এই যে মিসেস রাবনীত, উপস সরি সরি আফটার অল বৌদি জি। মুখটা একটু বন্ধ রাখুন। ও এখন থেকে আমার পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট। "
কথাটা শুনে নীলাদ্রিতা রেগে গেলো। এই লম্পট ছেলের সাথে মেয়েরা কাজ করা মানে নিজের ই'জ্জ'ত হাতে ধরে বিলিয়ে দেওয়া। যেটা মোটেও সে হতে দিবে না। সে তীক্ষ্ণ কন্ঠে স্যান্ডি কে ডেকে উঠে,
" এই যে মি. স্যান্ডেল।"
স্যান্ডি নিজের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে বলে, " কী! স্যান্ডেল?"
নীলাদ্রিতা মুচকি হেসে ঠাট্টা স্বরে বললো,
" উপস সরি সরি স্যান্ডি জি। আপনার হাড্ডি ঘুড্ডি ভাঙ্গতে কিন্তু আমার বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। তাঁরাকে এইসবে জড়াবেন না,ওর থেকে দূরেই থাকুন।"
তাঁরা নীলাদ্রিতার হাত টেনে ধরে এক পাশে নিয়ে আসে। এরপর অনুনয় করে বলে,
" প্লিজ নীলাদ্রিতা আমার কাজটা খুব প্রয়োজন। তুমি গ্ৰামের চঞ্চল মেয়ে, শহরের বেড়ে ওঠা হয় নি তোমার। তুমি এই শহরের কিছুই জানো না। আমার টাকার খুব প্রয়োজন ।"
নীলাদ্রিতা নিজেকে দমিয়ে রাখলো। মেয়েটা বুঝেই না কেনো? স্যান্ডি ভালো ছেলে নয়।
" তাঁরা তুমি জানো না স্যান্ডি কতোটা খারাপ ছেলে। এই বাড়ির কেউ ভালো মানুষ নয়। তুমি এখান থেকে চলে যাওও।"
দু'জনের কথার মাঝে স্যান্ডি আবারো কাবাবের হাড্ডি হয়ে দাঁড়ায়।
" এই যে নীলাদ্রিতা না ফিলাদ্রিতা তোমার এখানে নাক না গলানোই বেটার। তুমি তোমার কাজ করো,যাওও"
নীলাদ্রিতা দাঁত কিড়মিড় করে বলে, "আমাদের কথার মাঝে বায়ে হাত ঢোকানো বন্ধ করুন,যান এখান থেকে।"
স্যান্ডি এইবার কিছুটা রেগে উঠলো,
" বেশি বলে ফেলছো তুমি এইবার। খুব খারাপ হবে কিন্তু।"
নীলাদ্রিতা গা ছাড়া ভাব নিয়ে শুধায়,
" নীলাদ্রিতার খারাপ টারাপে কিছু যায় আসে না।"
ওদের কথার মাঝে শিলা আর গোলাপী চলে আসে। নীলাদ্রিতা আর স্যান্ডিকে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে দেখে তারা এগিয়ে আসলো। শিলা স্যান্ডি কে অন্য পাশে নিয়ে যাই তো গোলাপি নীলাদ্রিতাকে নিয়ে অন্য পাশে নিয়ে গেলো।
শিলা স্যান্ডি কে শাসনের স্বরে বলে,
" স্যান্ডি এই মেয়ের দিকে চোখ দিস না। মায়ের হাতের অবস্থা দেখেছিস? নক্ষত্র কিন্তু ছেড়ে দিবে না মোটেও।"
স্যান্ডি শিলার হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিয়ে বললো,
" আমি কারো বা'ল টারে ও ভয় পাই না। ওই মেয়েটাকে বল আমার কাজে নাক না গলানোর জন্য। "
এইদিকে গোলাপি নীলাদ্রিতাকে বুঝাচ্ছে স্যান্ডির থেকে দূরে থাকতে। কিন্তু নীলাদ্রিতা স্যান্ডির কথা শুনে চিৎকার করে উঠলো,
" শুনেন স্যান্ডেল, তাঁরার থেকে দূরে থাকুন।"
স্যান্ডেল শুনে স্যান্ডি ক্ষেপে গিয়ে নীলাদ্রিতার দিকে এগিয়ে আসলো,
" এই কে স্যান্ডেল হ্যাঁ? গাঁয়ের অশিক্ষিত মহিলা।"
নীলাদ্রিতা এ কথা শুনে কিছু বলতে যাবে তখনি তাঁরা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এবং মিনতি করে বলে,
" প্লিজ নীলাদ্রিতা সিনক্রিয়েট করো না। আমি এই কাজটা করবো, প্লিজ, থেমে দাও।"
নীলাদ্রিতার আর কিছু বলার ছিলো না। তাই সে গোমড়া মুখ করে চুপ করে থাকে। আর ঠিক সেই সময় উপর থেকে নক্ষত্রের ডাক পড়লো খুব ভয়ঙ্কর ভাবে।
ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও তার রুমের দিকে যেতে হচ্ছিলো কারণ নক্ষত্র নামক ষাঁড় টা বেশি চিৎকার করেই যাচ্ছে। কিন্তু তার দুষ্টু মনে এখনো স্যান্ডিকে শায়েস্তা করার জন্য ফন্দি আটছে।
সে সিঁড়ি দিকে উঠেই যাচ্ছিলো তখনি দেখলো রান্না ঘর থেকে কলা ভাই, কলা খেতে খেতে আসছিলো। তিনি কলার খোসা টা ছাড়িয়ে কোথাও ফেলবে আরকি,
কিন্তু নীলাদ্রিতা কো থেকে যেনো তুফানের মতো করে এসে। ছো মেরে কলা ভাই এর হাত থেকে খোসা টা কেড়ে নিয়ে নেয়।
অপরদিকে শিলা আর গোলাপী তাদের কাজে চলে যাচ্ছিলো। স্যান্ডি আর তাঁরা এরাও তাদের কাজে যাওয়ার জন্য এগোয়।
এইদিকে নীলাদ্রিতা দুষ্টু হেসে খোসা টা ছুড়ে মারে স্যান্ডির সামনের দিকে। তবে আর কি ব্যস, স্যান্ডি খোসার মধ্যে পা দিতেই চিৎ পটাৎ হয়ে ফ্লোরেই লুটিয়ে পড়ে।
সবাই স্যান্ডির চিৎকার শুনে সেখানেই দাঁড়িয়ে যায়। স্যান্ডি কোমড়ে হাত দিয়ে আহত চোখে নীলাদ্রিতা দেখে। কিন্তু এই কাজটা সে করেছে বুঝতে পেরেই দাঁতে দাঁত চাপলো। শিলা ভাইয়ের কাছে তাড়াতাড়ি এসে তাকে সামলে নেয়।
" কী করে হলো? বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?
স্যান্ডি দাঁত কিড়মিড় করতে করতে শিলা কে বলে,
" এই রাক্ষুসিকে বাড়ি থেকে বের করতে বল শিলা।"
ততক্ষনে নীলাদ্রিতা সিঁড়ি বেয়ে উপরে রুমে চলে গেলো। কলা ভাই শুধু হা করে তাকিয়ে আছে,তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
এমনিতেই সাথী চৌধুরী গতকালকের ঘটনায় অনেক বকুনি দিয়েছে। এখন আবার মাথার উপর একটা ঘূর্ণিঝড় ঘুরছে বুঝতেই পারছে।
স্যান্ডি শিলার উপর ভর করে উঠে দাঁড়ায়। চোখের সামনে কলা ভাইকে দেখে সে পায়ের জুতো খুলে তার মুখের দিকে ছুঁড়ে মারে,
" শা'লা, সারাদিন কলা আর কলা খাস। তোকে যদি আর কলা খেতে দেখেছি না, তাহলে ন্যাং'টা করে উল্টো ঝুলিয়ে রাখবো। যা ভাগ এখান থেকে।"
কলা ভাই মুখটা বাংলার পাঁচ এর মতো বানিয়ে, শেষ কলা টুকু মুখে পুরে দেয়। এবং সদর দরজার দিকে চলে যেতে যেতে বিরবির করে,
" বাহ রে, আমার দোষ কী এখানে?দূর!শান্তিতে একটা কলা খেয়েও শান্তি নেই।"
--
--
" নীলললল।"
শব্দ করে দরজা খুলে নীলাদ্রিতা রুমে ঢুকলো।এক রাশ বিরক্ত নিয়ে সে নক্ষত্রকে জিজ্ঞাসা করে,
" ষাঁড়ের মতো চিৎকার করচ্ছেন কেনো?"
নক্ষত্র উল্টো ঘুরে দাঁতে দাঁত চাপলো।রাগী ভরা কন্ঠে বলে,
" আমার লাইটার কোথায়?"
না জানার ভান করে নীলাদ্রিতা উত্তরে বললো,
" আমি কী করে জানবো?"
নক্ষত্র এক ঝটকায় নীলাদ্রিতার বেনী টা হাতের মুঠোয় ভরে নিয়ে বলে,
"বোইন, মাথা এমনিতেই গরম আছে আর খারাপ করিস না। লাইটার টা দিয়ে দে।"
নীলাদ্রিতা চোখ মুখ কুঁচকে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠে,
" সবসময় চুল ধরে কেনো টানেন? "
নক্ষত্র আরো শক্ত করে বেনীটা টেনে ধরে নীলাদ্রিতার কানের কাছে গিয়ে বিরবির করে,
" তো?অন্য কিছু ধরে টানবো নাকী? লাইটার কোথায় রেখেছো বলো?"
" বলবো না কী করবেন? এমনিতেই ওইটা আমি ভেঙ্গে ফেলেছি একদম টুকরো টুকরো করে দিয়েছি।"
নক্ষত্র এইবার প্রচন্ড রেগে যাচ্ছে বোঝাই গেলো। তার নকল লেন্সের আবরণে থাকা চোখের গুলো ধীরে ধীরে লাল হতে শুরু করে। কিছুক্ষণ আগের নক্ষত্র দেখতে দেখতে দেখতে ভিন্ন এক নক্ষত্রে পরিণত হচ্ছে।
সে নীলাদ্রিতার বেণী ছেঁড়ে দিয়ে এইবার গলা চেপে ধরে দেয়ালে ঠেসে ধরলো,
" ভেঙ্গে ফেলেছিস মানে? আমার লাইটার কোথায় নীল?"
নীলাদ্রিতা জোরে জোরে কাঁশতে কাঁশতে হাত ছোড়া-ছুড়ি করছে। দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো তার।
" ভে...ঙ্গে ফেলেছি।"
এই কথা শুনা মাত্রই নক্ষত্র আরো জোরে গলাটা চেপে ধরলো। নীলাদ্রিতার শ্বাস নিতে এইবার বেশ কষ্ট হচ্ছে বিধায় সে অস্ফুট স্বরে বলে,
" বলছি,বলছি ছাড়ুন।"
রাগটা কিছুটা কমে এলে নক্ষত্র তাকে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে নীলাদ্রিতা সোজা রুমের বেলকনিতে গিয়ে ছোট্ট ছোট্ট টবের ভেতর থেকে লাইটারটা নিয়ে আসে।
" এই নিন।"
লাইটার টা ছো মেরে তার হাত থেকে নিয়ে নক্ষত্র রাগে ফুঁসছে রীতিমতো ,
" তুই আমার লাইটার নিলি কেনো? বলেছি না আমার থেকে দূরে থাকতে।"
" আপনাকে যতোদিন না চারদেয়ালের কারাগারে নিতে না পারছি, ততোদিন দূরে যেতে পারবো না। আপনার সব অপরাধের হিসাব আমি গুনে গুনে রাখছি কিন্তু।"
এমন কথা শুনে নক্ষত্র গা দুলিয়ে হেসে উঠলো।
" ও হো তাই নাকী? আমার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে আমি তোকে ছুঁড়ে ফেলো নীল। জাস্ট ছুঁড়ে ফেলো দিবো।"
নীলাদ্রিতা নক্ষত্রের চোখে চোখ রেখে বলে,
" আমি ও আপনাকে শাস্তি দিয়েই ছাড়বো। আপনার জন্য আমার শৈশব শেষ হয়ে গিয়েছে। আপনার জন্য আমি অনাথ। আগে জানতে পারলেই কখনোই আপনাকে বিয়ে করতাম না।"
নক্ষত্র আর নীলাদ্রিতা দুজনেই রাগী দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নীলাদ্রিতা ওই চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না কেনো জানি। কিছু একটা আছে যার কারণে চোখ গুলোতে সে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারে না।
তখনি নক্ষত্রের ফোন শব্দ করে বেজে উঠলো। ওপাশ থেকে শুনা গেলো ড্যানিয়েল এর কন্ঠ ,
" নক্ষত্র? ছেলেটাকে পেয়েছি,তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো।"
" ঠিক আছে আমি আসছি।"
-
-
শিলা একটি গ্ৰসারি শপের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ কারো সাথে আকস্মিক ধাক্কা লাগায় তার ফোনটি রাস্তায় পড়ে যাই। সে রাগী চোখে সামনের ছেলেটির দিকে তাকায়। ছেলেটি ঘাবড়ে গিয়ে ফোনটি রাস্তা থেকে তুলে দিয়ে মাথা নত করে বলে,
" সরি মিস। আসলে আমি দেখতে পাই নি,সরি।"
কিন্তু শিলা ছেলেটির শাটের কলার ধরে তাকে সবার সামনেই গালে থাপ্পড় বসিয়ে দেয়,
" সরি দিয়ে কী আমি পানি খাবো ইডিয়েট? জানো এই মোবাইলের দাম কতো?"
ছেলেটি লজ্জায় গালে হাত দিয়ে চারিদিকে নজর বুলায়। সবাই তাদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ছেলেটিকে দেখে ভেতরে ভেতরে হাসছে।
ছেলেটি কিছুটা অপমান বোধ করে বললো,
" গায়ে হাত তুললেন কোন সাহসে?"
" দেখবে কীভাবে?" কথাটি বলেই শিলা আরেকটি থাপ্পড় দেওয়া জন্য উদ্যত হতেই তার হাতটি ছেলেটা খপ করে ধরে ফেলে
,
" আপনি কিন্তু লিমিট ক্রস করে ফেলেছেন।"
শিলা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে চলে গেলো। এমন লোকের সাথে কথা বলাই বেকার।
ছেলেটি তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে ভাবে মেয়েটাকে সে আগেও কোথাও দেখেছে কিন্তু কিছু মনে করতে পারছে না। কিন্তু মেয়েটা যে প্রচুর অভদ্র তা হারে হারে বুঝে গেছে।
-
চৌধুরী নিবাসের সামনে একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। গায়ের পোশাক খুব নোংরা, চেহারা কালো রঙের কালির প্রলেপ।
দেখেও ভিক্ষুক বা চোর মনে হচ্ছে না।
লোকটাকে বেশ অনেকক্ষন ধরে নীলাদ্রিতা আর গোলাপী পর্যবেক্ষণ করে।
লোকটি গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে জলভরা চোখে এক ধ্যানে চেয়ে আছে বাড়িটির দিকে। কিছুক্ষণ পর আপনা আপনি সেখান থেকে আবার চলেও গেলো।
মূলত নীলাদ্রিতা আর গোলাপী বাইরে এসেছে পাশের বাড়ির মহিলাটাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। মহিলাটা আবারো সাথী চৌধুরী কাছে নীলাদ্রিতার নামে অভিযোগ দিয়েছে তাও ভুয়া একটা অভিযোগ। যেটা নীলাদ্রিতা কখনোই করে নি।
এইজন্য নীলাদ্রিতা মহিলাটিকে বিনা দোষে তার উপর অভিযোগ তোলার জন্য শায়েস্তা করতে এসেছে।
সঙ্গে লালটু ও ছিলো।
তাঁরা তিনজন মহিলাটির বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। গোলাপির হাতে একটা গ্লাস ও লালটুর হাতে একটি গ্র্যান্ড ক্র্যাকার ফটকা বাজি রয়েছে।
নীলাদ্রিতা চুপিসারে মহিলাটির বাড়ির কলিং বেল বাজাতে থাকে আর অপরদিকে লালটু ফটকাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সেটা গ্লাসের মধ্যে রেখে। মহিলাটি আসছে শুনতে পেয়ে তারা তিনজনই দৌড়ে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে।
এইদিকে বিরক্ত ভঙ্গিতে এসে দরজা খুললো মহিলাটি । এবং কাউকে দেখতে পায় না ঠিকই কিন্তু গ্লাসটা দেখতে পায়।
তাই দু পা হেঁটে এসে গ্লাসের দিকে ঝুঁকলো। ভ্রু কুঁচকে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে যেই না গ্লাসটা তুলে নিলো।
ওমনি বড় শব্দ করে গ্র্যান্ড ক্র্যাকার ফটকা ফেটে উঠে। মহিলাটি সঙ্গে সঙ্গেই ভয় পেয়েই সেখানেই লুটিয়ে পড়ে।
তা দেখে নীলাদ্রিতা আর বাকীরা মুখে হাত চেপে মুচকি মুচকি হাসছে। মহিলাটির অবস্থা খুবই খারাপ, দেখে বুঝা যাচ্ছে বেশ ভয় পেয়েছে। হাত পা মৃগী রোগীর মতো কাঁপছে।
মহিলাটি সেখান থেকে উঠেই বাড়ির দিকে যেতে গেলেই কলার খোসাই আবারো পা স্লিপ করে পড়ে গেলো। কলার খোসা টাও লালটু ছুঁড়ে মেরেছিলো। মহিলাটি অবস্থা এইবার একদম খুবই বাজে হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপছে বারবার।
তখনি নীলাদ্রিতা মহিলাটির সামনে এসে হাসতে হাসতে বলে, " আর করবেন আমার নামে মিথ্যা নালিশ? "
মহিলাটি কোমড়ে হাত রেখেই কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,
" নাহহহ মা জননী ,এইবারের মতো ছেড়ে দাও আর করবো না।"
" ঠিক আছে এইবারের মতো ছেড়ে দিলাম। নেক্সট টাইম দিদার কাছে আমার নামে মিথ্যা নালিশ যেনো না শুনি। তাহলে কিন্তু এইবারের থেকে ওভার ডোজ দিবো আপনাকে।"
মহিলাটি মাথা নাড়িয়ে বহু কষ্টে কোমড় ধরে উঠে দাঁড়ায়। পায়ে ব্যথা পেয়েছে তাই খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির সাথে বেজে আবারো সেখানে ধপাস করে পড়ে যাই। আর সঙ্গে সঙ্গে মহিলাটির মুখ থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসে,
" আয় এম মাআআআআ।"
চলবে....