#পাগল_তোর_জন্যে_রে
#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী [২]
রাতের বেলা নরম বিছানায় জাঁকিয়ে গোল হয়ে বসে গল্পে মেতে আছে তরী আর নীলা। নিচ থেকে বেশ কয়েকবার খাওয়ার জন্য ডাকা হলেও তরী সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সবাই খাওয়া শেষ করার পর সে খেতে নামবে। একসঙ্গে এত মানুষের ভিড়ে বসে তার নাকি খেতে ভালো লাগে না। এদিকে একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড একা একা খাবে আর সে একা আরাম করে খাবে তা তো হতেই পারে না! তাই নীলাও নিচে গিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সেও তরীর সাথেই পরে একসঙ্গে খাবে।ওদিকে নিচে ডাইনিং টেবিলে তখন পিনপতন নীরবতা। চারপাশ জুড়ে কেবল চামচের নিঝুম টংটং শব্দ। ডাইনিং টেবিলে একসঙ্গে বসেছেন কাশিফ মির্জা, নওশাদ মির্জা, তাঁদের স্ত্রীরা, সঙ্গে ফুয়াদ, ঋত্বিক, শর্মিষ্ঠা আর নাবিহা। সবাই একদম চুপচাপ নিজের মতো খাবার খেয়ে যাচ্ছেন। টেবিলে বসা নাবিহার চোখ বারবার লুকিয়ে চলে যাচ্ছে ঋত্বিকের দিকে। কত বছর পর সে তার নিজের প্রিয় মানুষটাকে সামনাসামনি দেখছে! এখনো যেন তার বিশ্বাসই হতে চায় না যে তার কল্পনার সেই মানুষটা আজ সত্যি সত্যি তার চোখের সামনে বসে আছে। নাবিহার বুকটা থরথর করে কেঁপে ওঠে। ইশ! কবে যে ঋত্বিকের সাথে তার বিয়ে হবে? কবে সে নামের পাশে ‘মিসেস ঋত্বিক’ পদবিটা যোগ করতে পারবে? এসব মিষ্টি কল্পনায় নাবিহার মনটা লজ্জায় আর সুখে ভরে ওঠে। অথচ বিপরীত দিকে বসে থাকা ঋত্বিক একদম নির্বাক ও উদাসীন। চারপাশে কী হচ্ছে, কে তার দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছে এসবের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই তার। সে নিজের মতো চুইয়ে চুইয়ে খাবার শেষ করে চলেছে।
ধীরে ধীরে সবার খাওয়া শেষ হয়। ডাইনিং টেবিল ছেড়ে একে একে সবাই গিয়ে বসেন বসার ঘরের আরামদায়ক সোফায়। ঋত্বিকও খাওয়া শেষ করে চুপচাপ সিটির দিকে পা বাড়িয়ে ওপরের সিঁড়ির সিঁধ কাটবে, ঠিক তখনই গম্ভীর গলায় ডেকে ওঠেন কাশিফ মির্জা,
---- ঋত্বিক, দাঁড়া।
কাশিফ মির্জার ডাক শুনে এক পা বাড়িয়েও থেমে যায় ঋত্বিক। একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে ঠিক কাশিফ মির্জার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর মার্জিত গলায় বলে,
---- বলো বাবা।
কাশিফ মির্জা পাশের একটা সিঙ্গেল সোফার দিকে হাত দিয়ে বসার ইশারা করে বলেন,
---- এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, বস। এতদিন পর দেশে এসেছিস, কাজের ব্যস্ততার কারণে তোর সাথে ঠিকমতো একটু কথাও হয়নি।
বাবার কথায় আর কোনো দ্বিরুক্তি না করে সোফায় গিয়ে বসল ঋত্বিক। তবে বসার এক সেকেন্ডের মধ্যেই সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে আঙুল চালাতে শুরু করে। ঠিক তখনই সন্তর্পণে হেঁটে এসে কাশিফ মির্জার ঠিক পেছনে দাঁড়াল নাবিহা। নাবিহার উপস্থিতি টের পেয়েও না পাওয়ার ভান করে কাশিফ মির্জা এবার সরাসরি ঋত্বিকের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
---- তোর সেটেলমেন্টটা নিয়ে কী ভাবছিস? আমি তো চেয়েছিলাম তুই আমাদের বিজনেসেই জয়েন করিস। কিন্তু তুই তো একাই বিদেশে নিজের বিজনেস সেটআপ করে ফেললি। যাকগে, আমি তো তোর বাবা তোর নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য যেটা সঠিক মনে হবে, তুই সেটাই করবি। আমার কোনো বাধা নেই।
ফোন স্ক্রল করা থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য চোখ তুলে শান্ত গলায় ঋত্বিক জবাব দেয়,
---- হুম।
কাশিফ মির্জা এবার একটু নড়েচড়ে বসে আবার প্রশ্ন করেন,
---- তো কী ভাবছিস? দেশে কি থাকবি, নাকি আবার চলে যাবি?
ঋত্বিক আগের মতোই নির্বিকার ও উদাসীন কণ্ঠে জবাব দেয়,
---- ভাইয়ের বিয়ের পর চলে যাব।
মুহূর্তের মধ্যে নাবিহার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। বুক চিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসে তার মুখটা যেন আষাঢ় মাসের জমা মেঘের মতো কালো হয়ে যায়। ঋত্বিক তবে সত্যি সত্যিই আবার ওই দূর পরবাসে ফিরে যাবে? এত কাছে থেকেও তাকে ধরে রাখতে না পারার যন্ত্রণাটা তার গলায় দলা পাকিয়ে ওঠে।ওদিকে কাশিফ মির্জা গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করেন,
---- তো, বিয়ে কবে করছিস?
ফোন থেকে চোখ সরিয়ে ঋত্বিক এক পলক বাবার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা ও নির্বিকার গলায় জবাব দেয়,
---- এখনই বিয়ে নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই আমার।
কাশিফ মির্জা ঠোঁটে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলেন,
---- কিন্তু তোর বাবা হিসেবে আমি তো সব ভেবেই রেখেছি।
ঋত্বিক ভ্রু কুঁচকে বিরক্তিকর সুরে জানতে চায়,
---- মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?
কাশিফ মির্জা আর কালবিলম্ব না করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাবিহাকে ইশারায় ডেকে নিজের পাশেই সোফায় বসান। পুরো ঘরটায় তখন পিনপতন নীরবতা। উপস্থিত প্রায় সবাই আন্দাজ করতে পেরেছে কাশিফ মির্জা ঠিক কী ঘোষণা দিতে চলেছেন। দূরে বসে থাকা উর্মি মির্জার বুকটা তখন ধুকপুক করছে ভয়ে। ঋত্বিকের জেদি আর রাগী স্বভাবটা তো তিনি ভালো করেই চেনেন, এই হঠকারী সিদ্ধান্তে ছেলেটা যদি মাথার পিত্তি চড়ে বশে যায়, তবে তাকে সামলানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।কাশিফ মির্জা স্নেহের সাথে নাবিহার মাথায় হাত বুলিয়ে ঋত্বিকের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অটুট কণ্ঠে বললেন,
---- এই মেয়েটাকে দেখছিস? ছোটবেলায় আমার কাছে ছুটে এসে প্রতিদিন বায়না ধরত ‘চাচ্চু, আমি বড় হয়ে ঋত্বিক ভাইয়ের বউ হব!’ সারাক্ষণ এই একটা কথাই তার মুখে লেগে থাকত। তুই তো নিজেও এটা খুব ভালো করে জানিস। ছোটবেলায় যখন ও তোকে গিয়ে বলত তুই তার বর হবি, তখন তুই রেগে গিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে থাকতি। ছোট মানুষ ছিলি, রাগ করাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একবার তাকিয়ে দেখ, সময়ের সাথে কিচ্ছু বদলায়নি! সেই ছোট্ট মেয়েটা আজও তোর বউ হওয়ার স্বপ্নটাই বুকের ভেতর লালন করে আসছে। যদিও এখন আর ও আগের মতো মুখে অতটা প্রকাশ করে না, তবুও তার এই নীরবতা, তার এই অপেক্ষা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় মেয়েটার হৃদয়ে তুই ঠিক কতটা জুড়ে আছিস। যাক, কথা আর দীর্ঘ করব না, যা বলার একদম সোজাসোজিই বলছি।
কাশিফ মির্জা একটু থেমে গলাটা খাকারি দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। তারপর চত্বরে পাথর ফেলার মতো স্পষ্ট গলায় চূড়ান্ত ঘোষণাটা দিলেন,
---- আমি চাই ফুয়াদের বিয়ের ঠিক পরপরই তোর আর নাবিহার বিয়ে দিতে। তুই তো বিদেশে তোর সবকিছু গুছিয়েই নিয়েছিস, তাই বিয়ের পর নাবিহাকে সাথে করেই সোজা বিদেশে নিয়ে চলে যাবি।
ঋত্বিকের মনে হলো তার মাথায় যেন কেউ এক ফোঁটা বিষাক্ত বিষ ঢেলে দিয়েছে। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। দুই হাত দিয়ে সোফার কভারটা খামচে ধরে,দাঁতে দাঁত ঘষে কিড়মিড় করতে থাকে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতির চাপে নাবিহা লজ্জায় আর সংকোচে লাল হয়ে দ্রুত সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।কাশিফ মির্জা নওশাদ মির্জার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলেন,
---- তোর কোনো আপত্তি আছে এই বিয়েতে?
নওশাদ মির্জা মৃদু হেসে বলেন,
---- তুমি কী যে বলো না ভাইয়া। তোমার কোনো সিদ্ধান্তের ওপর কি আমি কখনো কথা বলেছি? যদিও নাবিহা আমার নিজের মেয়ে, তবুও বড় ভাই হিসেবে তোমার ওপর আমার পুরো ভরসা আছে। তুমি যা করবে, আমার মেয়ের ভালোর জন্যই করবে।
কাশিফ মির্জা আশ্বস্ত হয়ে বলেন,
---- তাহলে এটাই ফাইনাল। ফুয়াদের বিয়ের পর পরই ওদের দুজনের বিয়েটা আমরা সেরে ফেলব।
আর একটুকুও নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না ঋত্বিক। রাগে বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়, বড় বড় দীর্ঘশ্বাসে রাগে কাঁপতে কাঁপতে গর্জে ওঠে,
---- স্টপ।
সবাই এক নিমেষে পাথরের মতো জমে যায়। উর্মি মির্জার বুকটা কেঁপে ওঠে থরথর করে তিনি যা এতক্ষণ মনে মনে ভয় পাচ্ছিলেন, ঠিক সেটাই ঘটে গেল। কিন্তু কাশিফ মির্জার মুখাবয়ব বিন্দুমাত্র বদলায় না তিনি এমনভাবে বসে থাকেন, যেন এই বিস্ফোরণটা তাঁর আগে থেকেই জানা ছিল।রাগে চোয়াল শক্ত করে, দাঁতে দাঁত ঘষে সরাসরি বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ঋত্বিক গর্জে ওঠে,
---- আমি কি একটা বারও বলেছি যে আমি নাবিহাকে বিয়ে করব?
কাশিফ মির্জা নির্বিকার গলায় জবাব দেন,
---- বলিসনি। তো?
বুক ফেটে বের হওয়া প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে ঋত্বিকের রাগের মাত্রা আরও চড়তে থাকে। আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেয়,
---- আমি এই বিয়ে করব না।
কাশিফ মির্জা এবার একটুও নরম না হয়ে কঠিন গলায় বলে ওঠেন,
---- তুই যতই রাগ দেখিয়ে ঘরের মাথা মাথায় করিস না কেন, এই বিয়ে তোকে করতেই হবে। দ্যাটস ফাইনাল।
বাবার এই শেষ কথাটায় ঋত্বিকের ধৈর্যের বাঁধ একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তার দুই হাতের মুঠি এমনভাবে শক্ত হয়ে ওঠে যে কনকনে ঠান্ডাতেও তার কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়তে থাকে। চোখের পলকে সে ঘরের দেওয়ালের দিকে এগিয়ে যায়। বিশাল আকৃতির থ্রি-ডি ডিসপ্লে ওয়ালা দামি টিভিটাকে এক ঝটকায় ব্র্যাকেটসহ দেয়াল থেকে ছিঁড়ে সোজা আছড়ে ফেলে নিচে মার্বেলের মেঝেতে।
---- আই সেইড নো। আমি বিয়ে করব না।
কান ফাটানো এক বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে টিভিটা। মুহূর্তের মধ্যে কাচের হাজারো টুকরো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আকস্মিক তাণ্ডবে ঘরের সবাই শিউরে উঠে কানে হাত দিয়ে কুঁকড়ে যায়।ঠিক সেই মুহূর্তেই শব্দ পেয়ে তরী আর নীলা রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে। ওপরের বারান্দার রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে নিচে তাকাতেই নীলার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। তরীর সরাসরি দৃষ্টি গিয়ে পড়ে ঋত্বিকের ওপর। লোকটার সারা শরীর তখন চরম রাগে থরথর করে কাঁপছে, বড় বড় শ্বাস পড়ছে বুক চিরে। মুখের দিকে তাকালে মনে হয় সামনে যাকে পাবে, তাকেই সে আস্ত গিলে খাবে। এরপর তরীর চোখ পড়ে গড়ায় ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা দলা পাকানো ইলেকট্রনিক্স হাড়গোড়ের ওপর। বিশাল এক ধাক্কা খায় সে। চোখের পলকে এত দামি একটা টিভি কেউ এভাবে ভেঙে ফেলতে পারে।বিন্দুমাত্র হাত কাঁপল না লোকটার? বুক চিরে দীর্ঘ একটা শ্বাস বেরিয়ে আসে তরীর। পলকহীন সেই ভাঙা টিভির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ফুঁপিয়ে ওঠে,
---- আসলেই বড়লোক মানুষেরা জিনিসের আসল মূল্য দিতে জানে না। কত সহজে চোখের পলকে এত দামি একটা টিভি গুঁড়িয়ে দিল। অথচ আমাদের এই মধ্যবিত্ত ঘরের সাদামাটা টিভিটা যদি কোনোভাবে হাত থেকে পড়ে ভেঙে যেত, তবে মা আমাকে আস্ত চিবিয়ে খেত, ঝাড়ু পেটা করে বাড়ি থেকে বের করে দিতে এক সেকেন্ডও ভাবত না।
ফুয়াদ দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে আসে। চিন্তিত গলায় বলে,
---- নাবিহাকে বিয়ে করতে তোর সমস্যাটা কোথায় বল তো? নাকি মনে মনে অন্য কাউকে পছন্দ করে রেখেছিস?
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঋত্বিক তীক্ষ্ণ গলায় জবাব দেয়,
---- আজ পর্যন্ত কোনো মেয়েকেই আমার ভালো লাগেনি, আর না কেউ আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো আমার কোনো মেয়েকেই সহ্য হয় না।
ফুয়াদ ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত হয়ে বলে,
---- এ কেমন ফালতু কথা বলিস তুই? শোন, মৃত্যু যেমন অবধারিত, বিয়েও তেমনি জীবনের একটা অংশ। নারী বা পুরুষ সবাইকেই তো কোনো না কোনোভাবে থিতু হতে হয়, বিয়ে ছাড়া তো জীবন চলে না।
ঋত্বিক আরও শক্ত গলায় বলে ওঠে,
---- আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে তোমার মাথা ঘামাতে হবে না ভাইয়া। আমার জীবন আমি নিজেই বুঝে নেব।
ছেলের এই অবাধ্য আচরণ আর জেদ দেখে কাশিফ মির্জা আর চুপ থাকতে পারেন না। তিনি গম্ভীর গলায় বলে ওঠেন,
---- তুই যদি জেদি হস, তবে শুনে রাখ আমিও তোর বাবা। তোকে নাবিহাকেই বিয়ে করতে হবে, আর সেই বিয়ে আমি জোর করে হলেও দেব।
বাবার এই একরোখা কথা শুনে রাগে ঋত্বিকের নিজের ঠোঁট কামড়ে রক্ত বের হয়ে আসে। মাথাটা তার আক্ষরিক অর্থেই গরম হয়ে গেছে। সামনে সোফার ওপর থাকা একটা দামী ফুলদানি এক টানে তুলে সজোরে দূরে ছুড়ে মারে। এবং পৈশাচিক আক্রোশে গর্জে ওঠে,
---- আঃ।ফা'ক।আমি এই দেশেই থাকব না।এই বা'লের বাড়িতে এসেও একটু শান্তি নাই।
বলেই রাগের চোটে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে যায়, ঠিক তখনই বজ্রকঠিন গলায় কাশিফ মির্জা হুমকি দিয়ে ওঠেন,
---- ভালোয় ভালোয় বলছি, কান খুলে শুনে রাখ। আজ এই বাড়ি থেকে যদি তুই এক পাও বের হোস, তবে সেটা আমার লাশের ওপর দিয়ে বের হবি।
বাবার মুখে এই চরম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের কথা শুনে ঋত্বিকের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। জন্মদাতা বাবার মুখে এমন কথা শোনার পর এক পা এগোতেও গিয়েও থমকে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। রাগে, অভিমানে আর ক্ষোভে এখন তার নিজেরই মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এরা কি কোনো পরিবার, নাকি শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর কেউ।ছেলের এমন উন্মত্ত অবস্থা দেখে উর্মি মির্জা আর স্থির থাকতে পারেন না। তিনি বুক কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে এসে মিনতির সুরে বলেন।
---- বাবা ঋত্বিক, তুই একটু শান্ত হ।নিজের মাথাটা ঠান্ডা কর, প্লিজ।
কিন্তু মায়ের সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো কথাই যেন মাথায় ঢোকে না ঋত্বিকের। পাথরের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, রাগে কী করবে আর ভেবে পায় না। হঠাৎ সব রাগ গিয়ে পড়ে পাশের সিঁড়ির ওপর। সজোরে একটা ঘুসি বসিয়ে দেয় সিঁড়ির শক্ত লোহার রেলিংয়ে, গলা ফাটিয়ে আর্তনাদের মতো চিৎকার করে ওঠে,
---- আই হেট মাই ফ্যামিলি রাইট নাও।
বলেই আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে সে বড় বড় পা ফেলে হুড়মুড় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে। নিজের রুমে ঢুকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ধাস করে শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো করিডোর।দোতলার বারান্দার এক কোণে আড়ালে দাঁড়িয়ে এই পুরো তাণ্ডবটা স্তম্ভিত হয়ে দেখছিল নাবিহা। নিজের স্বপ্নের মানুষটা তাকে জীবনসঙ্গী করার কথা শোনার পর এমন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে, সে ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি। কত শত আশা, কত দিনের জমানো বুকভরা আকুতি নিয়ে সে চাতক পাখির মতো পথ চেয়ে বসে ছিল অথচ আজ মনে হচ্ছে, তার জীবনের সমস্ত স্বপ্ন, সব অপেক্ষা পলকে ছাই হয়ে গেছে। বুকফাটা কান্নায় গলা জড়িয়ে আসে নাবিহার। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। দ্রুত পায়ে নিজের রুমে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে এবং বালিশে মুখ গুঁজে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
---- কেন ভালোবাসেন না আমাকে, ঋত্বিক? আপনি কি একটুও বোঝেন না আমি কতটা ভালোবাসি আপনাকে? আপনাকে ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার বেঁচে থাকা এক মুহূর্তের জন্যও সম্ভব না, আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে তো শুধু আপনিই আছেন।
ওদিকে ওপরের বারান্দা থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখে তরী যেন একেবারে বরফের মূর্তির মতো জমে গেছে। ঋত্বিকের অমন ভয়ংকর রাগ আর ভাঙচুরের বহর দেখে তার নিজের শরীরটাই থরথর করে কাঁপছে। লোকটার ভেতরটা আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি? আজ সকালে সে যখন কোনো নক না করে সরাসরি ওই লোকটার রুমে ঢুকে পড়েছিল, তখন আসলে মৃত্যুর মুখ থেকেই ফিরে এসেছিল সে। যদি তখন লোকটা তাকে গলা টিপে মেরে ফেলত? এই কথা ভাবতেই তরীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। এক বুক শুকনো ঢোক গিলে ভয়ে শিউরে ওঠে।
--------
রাত গভীর হতে হতে পুরো মির্জা বাড়িটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতার চাদরে মুড়ে যায়। চারপাশের পিনপতন নীরবতা ভেদ করে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই, সবাই গভীর ঘুমে বিভোর। তরী আর নীলাও রাতের খাবার সেরে কখন যে নিজেদের বিছানায় এসে এলিয়ে পড়েছিল, টেরই পায়নি। নীলা পাশে কাত হয়ে দিব্যি অঘোরে ঘুমোচ্ছে, কিন্তু তরীর দুচোখের পাতায় এক ফোঁটাও ঘুম নেই। বারবার কেন যেন তার মাথার ভেতর ওই ঋত্বিক লোকটার জ্বলন্ত চোখ আর রাগের বিস্ফোরণটা ঘুরপাক খাচ্ছে। তরী কিছুতেই নিজের মনকে বোঝাতে পারছে না, অচেনা একটা পুরুষটার কথা বারবার তার এমনভাবে মাথা কেন চাড়া দিয়ে উঠছে?
তরীর মাথার ভেতর এই এলোমেলো ভাবনার জট যখন ঠিক পাকিয়ে উঠছে, ঠিক তখনই তার পাশে রাখা ফোনটা সজোরে বেজে ওঠে। ঝটপট হাত বাড়িয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তরীর চোখ দুটো বিস্ময়ে গোল হয়ে যায়। লন্ডন থেকে রিদান ফোন করেছে।পুরো নাম তাহমিদ অর্ণব রিদান, বর্তমানে সে লন্ডনেই থাকে। এই রিদান হলো তরীর বড় ভাই নীহারের একেবারে জিগর দোস্ত ও ক্লোজ ফ্রেন্ড। শুধু তাই নয়, তরীর সাথে রিদানের বিয়ের কথাবার্তা অনেক আগেই পাকা হয়ে আছে। রিদান লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসার পরই তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা। নিয়মমতো প্রতি রাতেই একবার করে তরীকে কল দেয় রিদান, তরীও বাধ্য মেয়ের মতো রিসিভ করে কথা বলে। এবারও সে আর দেরি না করে চুপচাপ ফোনটা রিসিভ করে কানের সাথে ধরেই শান্ত গলায় বলে,
---- আসসালামু আলাইকুম।
ওপাশ থেকে ভেসে আসে রিদানের চেনা, মায়াবী আর আদুরে কণ্ঠস্বর,
---- ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছো, তরী?
ফোনটা শক্ত করে ধরে তরী মৃদু স্বরে জবাব দেয়,
---- আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
ওপাশ থেকে রিদান মৃদু হেসে এক চিলতে আদুরে কণ্ঠে বলে,
---- তুমি তো ভালো করেই জানো, তোমার এই পাগল মানুষটা সারা দিন কাজের শত ব্যস্ততায় ডুবে থাকলেও তোমার সাথে একটু কথা বললেই সব ক্লান্তি দূর হয়ে চনমনে হয়ে ওঠে। আচ্ছা, নীহারের কাছে শুনলাম তুমি নাকি এখন নীলাদের বাসায় গিয়েছ?
ফোনটা কানে গুঁজে বিছানায় শুয়ে শুয়েই তরী আস্তে করে উত্তর দেয়,
---- হুম। আসলে ফুয়াদ ভাইয়ের বিয়ে তো, নীলা ভীষণ জেদ ধরেছিল। তাই বাবাকে অনেক বুঝিয় নিয়ে এসেছে।
রিদান একটু থেমে অধিকার ফলাবার সুরে বলে,
---- ঠিক আছে। তবে ওই বাড়ির বিয়েতে কতশত মানুষের ভিড় জমবে, অনেক ছেলেও তো আসবে। সাবধান, কোনো ছেলের দিকে কিন্তু ভুলেও তাকাবে না তুমি । মনে রাখবে, তুমি শুধু আমার। যদি কখনো শুনি যে তুমি অন্য কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছ, তাহলে কিন্তু আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না বলে দিলাম।
রিদান এটুকু বলতেই তরী কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই হঠাৎ তার গলায় কেমন যেন এক অদ্ভুত ঝাঁঝ ধরে যায়। খকখক করে তীব্র কাশিতে কেঁপে ওঠে তার পুরো শরীর। কাশি যেন থামতেই চাইছে না, দম আটকে আসার উপক্রম হয়।ওপাশ থেকে তরীর কাশির শব্দ শুনে রিদান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠে,
---- আরে কী হলো। এই তরী, জলদি এক গ্লাস পানি খাও তো।
কাশি সামলাতে না পেরে তরী বাধ্য হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ফোনের স্পিকার অন করে টেবিলের ওপর থাকা ল্যাম্পপোস্টের সুইচটা টিপে রুমটা আলোকিত করে ফেলে । দ্রুত পায়ে টেবিলের কাছে গিয়ে জলের জগের দিকে তাকাতে গিয়ে চোখ কপালে ওঠে। গ্লাসে বা জগে কোথাও এক ফোঁটা পানিও নেই। এদিকে গলা বুক চিড়ে কাশি আরও বেড়ে চলেছে।উপায়ন্তর না দেখে তরী আর এক মুহূর্তও নষ্ট করে না। ফোনটা হাতে নিয়েই সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে এবং সাবধানে পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে সোজা নিচে নেমে যায়। নিচতলার বিশাল হলরুমে পা রেখে দেয়ালের সুইচবোর্ড টিপে মূল লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়। তারপর দ্রুত পায়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে পৌঁছে একটা গ্লাসে জগ থেকে পানি ঢেলে এক নিঃশ্বাসে তা পান করে নিজেকে শান্ত করে।গ্লাসটা টেবিলে রাখল তরী। হাতের ফোনের স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই সে চমকে উঠল। রিদান এখনো কল কেটে দেয়নি, লাইনেই আছে। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রুমে ফেরার জন্য পা বাড়াল, ঠিক তখনই রাতের সমস্ত নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে সজোরে বেজে উঠল বাড়ির মূল সদর দরজার কলিং বেল।
দরজায় শব্দটা বাজতেই তরীর দুই পা থমকে গেল। এই গভীর রাতে কে হতে পারে? বাইরে থেকে কেউ যেন চরম বেপরোয়া হয়ে একটানা চাপ দিয়েই চলেছে কলিং বেলটা। বাড়ির সবাই এতক্ষণে গভীর ঘুমে অচেতন, কাজের লোকগুলোও সারাদিনের ধকল সয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন। উপায় না পেয়ে তরী নিজেই বুক কাঁপাতে কাঁপাতে এগিয়ে গেল ভারী দরজার দিকে। বুকটা ঢিপঢিপ করছে।যদি কোনো বিপদ হয়।মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে জপতে হাত বাড়িয়ে খুলে দিল সদর দরজার কপাট।
দরজাটা খুলতেই তীব্র একটা ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে এসে লাগল। মদের উৎকট আর কড়া গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে। ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠে তরী দুচোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। কোনো শব্দ না পেয়ে সে ধীরে ধীরে চোখ মেলল, সামনে যা দেখল তাতে তার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হলো না।
দরজার কাঠামোয় দুই হাত এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে ঋত্বিক। লোকটার এই রূপ এর আগে কেউ দেখেনি। অতিরিক্ত মদের নেশায় তার হুঁশ প্রায় লোপ পেয়েছে। মাথার চুলগুলো সব অগোছালো হয়ে বিশৃঙ্খলভাবে কপাল ঢেকে আছে। চোখের চাউনি বিন্দুমাত্র স্থির নয় ধুসর রঙের চোখ দুটো কেমন যেন ঝাপসা, রক্তিম লালচে হয়ে আছে যেন ভেতরে তীব্র নেশার আগুন জ্বলছে। গায়ে জড়ানো কালো শার্টটার ওপরের দিকের দুটো বোতাম খোলা, যেখান থেকে তার প্রশস্ত বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল শরীর দিয়ে চুইয়ে পড়ার কারণে তার প্রতিটি নিশ্বাসে মৃত্যুর মতো ভারী গন্ধ। ঋত্বিকের পা দুটো ঠিকমতো নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, সামান্য ঝুঁকেই পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে বারবার।
তরীকে নিজের দিকে এভাবে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখে নেশার ঘোরে বিকৃত হাসল ঋত্বিক। টলতে টলতে আরও একটু এগিয়ে এসে একেবারে তরীর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ল। মাতাল কণ্ঠে, জিভ জড়িয়ে ফুঁ দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ফিসফিস করে উঠল,
---- Hi Sweetie...
ঋত্বিকের মুখ থেকে মাতাল ও অসংলগ্ন স্বরে 'সুইটি' ডাকটা শুনতেই তরীর পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তেই, তরীর হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে থাকা সচল ফোনটার স্পিকার দিয়ে ওপাশ থেকে রিদান সবটা স্পষ্ট শুনতে পেল। মুহূর্তের মধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে রিদানের উৎকণ্ঠিত, কাঁপাকাঁপা ও চরম ক্ষিপ্ত গলা গর্জে উঠল,
---- তরী৷ তুমি কার সাথে কথা বলছ? আমি স্পষ্ট একটা অচেনা পুরুষের কণ্ঠ শুনতে পেলাম।কে ওই লোকটা?
ফোনের স্পিকারে রিদানের চেনা গলাটা বেজে উঠতেই তরীর তন্দ্রা ছুটে যায়। দ্রুত চোখ তুলে সামনে তাকাতেই বুক কেঁপে ওঠে। মাতাল ঋত্বিক টলতে টলতে ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার চোখের চাউনিতে অদ্ভুত এক উন্মাদনা। সকালে বিনা অনুমতিতে তার ঘরে ঢুকে পড়ার সেই ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই তরীর মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। যদি লোকটা এখন তাকে মেরে ফেলে। এই মুহূর্তে এখানে এক সেকেন্ডও দাঁড়ানো যাবে না। পালানোর জন্য সে উল্টো ঘুরে রুমের দিকে পা বাড়াতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে ভেসে আসে ড্রাঙ্ক কন্ঠস্বর।
---- এই মেয়ে, শোনো।
ঋত্বিকের ডাকে তরীর পা দুটো যেন মাটির সাথে সেঁটে যায়। হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে লাফাচ্ছে। ভয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখে রিদান এখনো লাইনে ঝুলছে। হাত কাঁপা অবস্থায় তাড়াতাড়ি স্ক্রিনে আঙুল চেপে কল কেটে দিয়ে ফোনটা সুইচ অফ করে ফেলে ।পিঠের পেছনে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিক এবার আগের চেয়েও বেশি বেপরোয়া ভাবে বলে উঠে।
---- টার্ন অ্যারাউন্ড অ্যান্ড ফেস মি।
সারা শরীর কাঁপা-কাঁপি শুরু করে তরীর। মাথার মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা আজ সে বেঁচে ফিরবে না, লোকটা তাকে মেরেই ফেলবে। ভয়ে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে ফেলে। সামনের দিকে ঘুরে দাড়াতেই বুক ফেটে কান্না আসার উপক্রম হয়। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শিশুর মতো মিনতি করে ওঠে,
---- প্লিজ, আমাকে কিছু করবেন না। আমি আর কখনো আপনার রুমে নক না করে যাবো না। আপনার শরীর দেখেছি, এই কথা কাউকে বলিনি আর জীবনেও কাউকে বলব না।আমাকে মাফ করে দিন, আমি কালকেই আপনাদের বাড়ি থেকে চলে যাবো। তবুও আমাকে মেরে ফেলবেন না। আমার তো এখনো বিয়েই হয়নি, আমার জামাইটাকে বিয়ের আগেই এতিম বানিয়ে দেবেন না। সামনে আমার কত ভবিষ্যৎ, বাচ্চা-কাচ্চা জন্ম দিতে হবে, তাদের বড় করতে হবেএকটু দয়া করুন, আমাকে মারবেন না প্লিজ।
নেশায় ভারী ও ঝাপসা চোখে বিরক্ত দৃষ্টিতে তরীর দিকে তাকায় ঋত্বিক। কিছুই তো করেনি সে, তবে কেন এমন প্রলাপ বকছে মেয়েটা? চোখ না খুলে তরী আবার কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তক্ষনাৎ বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এসে তরীর গোলাপি ওষ্ঠে আঙুল চেপে ধরে ঋত্বিক। চোয়ালের পেশি শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে ওঠে,
---- চুপ করো, জাস্ট স্টপ ইট।
কোমল ঠোঁটে গরম পুরুষালি স্পর্শ পেতেই শিউরে ওঠে তরী। বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো সারা শরীরে বয়ে যায় এক অচেনা শিহরণ। ধীরে ধীরে পাতা মেলে তাকাতেই সামনে ভেসে ওঠে দুটি ধূসর, নেশায় আচ্ছন্ন পুরুষালি চোখ। হৃদয়ে যেন আচমকা বিশাল ধাক্কা লাগে। পরমুহূর্তেই তরীর ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে নেয় ঋত্বিক। দরজার কপালে এক হাত সজোরে ঠেস দিয়ে নিজের ভেঙে পড়া ভারসাম্য সামলে নিয়ে শীতল গলায় বলে,
---- গড, দিস ইজ সো অ্যানয়িং। এই জন্য মেয়েদের একদম দেখতে পারি না আমি, বোঝে কম, চিল্লায় বেশি।
গলার ভেতরে আটকে থাকা শুকনো থুতু গিলতে গিয়ে গলায় ব্যথা টের পায় তরী। এই মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত, মাথা কাজ করছে না তার। ঘোর কাটতে না কাটতেই শীতল আদেশে ফের মুখ খোলে ঋত্বিক,
---- আমাকে রুমে নিয়ে চলো।
কথাটা কানে আসতেই আতঙ্কে ছানাবড়া হয়ে যায় তরীর চোখ দুটো। সে নিজে এই মাতাল মানুষটাকে রুমে পৌঁছে দেবে মানে।বুক কাঁপানো ভয় আর চরম বিভ্রান্তি নিয়ে আমতা আমতা করে কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করে বলে।
---- আ- আমি রুমে নিয়ে যাবো মানে?
দরজার কাঠটাকে আরও শক্ত করে খামচে ধরে ঋত্বিক। নেশা আর অতিরিক্ত উত্তেজনায় নিজের শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছে তার। চোয়াল শক্ত করে নিজের ভেতরের সবটুকু রাগ চেপে ধরে প্রায় শাসানোর সুরে বলে,
---- ড্যাম ইট,কানে শুনতে পাও না। আমাকে রুমে নিয়ে চলো ফাস্ট।
বুঝতে পারছে না তরী। কী করবে এখন সে।এই অচেনা, মাতাল লোকটাকে সে কেন রুমে দিয়ে আসবে? নিজের কি পা নেই।এসব কথা ভাবতে ভাবতে প্রতিবাদ করে ওঠে,
---- আমি কেন আপনাকে রুমে দিয়ে আসবো, আপনার পা নেই?
কথাটা শেষ হতে না হতেই নিজের নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে ঋত্বিক। রাগে তার ঘাড়ের রগগুলো দপদপ করে ফুলে উঠছে। মেয়েটার এই মুখের ওপর তর্ক করা একদম পছন্দ হচ্ছে না তার। ইচ্ছে করছে হাতটা উঁচিয়ে ঠাস করে গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিতে। কিন্তু এই মুহুর্তে অতিরিক্ত ড্রাগসের প্রভাবে সেই শক্তিটুকুও তার শরীরে নেই। একটু পা বাড়াতেই টলে উঠছে। মনে হচ্ছে এখনই পড়ে যাবে।হঠাৎ কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে এক চিলতি কুটিল হাসি ফুটিয়ে তোলে ঋত্বিক। বাঁ হাতটা ধীরে ধীরে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বের করে আনে একটা কালো রঙের চকচকে রিভলবার। হাতে ধরা ভারী গানটা তরীর চোখের সামনে তুলে ধরে জড়ানো গলায় বলে,
---- স্টুপিট, এইটা চেনো?
সরাসরি চোখের সামনে বন্দুকের নল দেখে আতঙ্কে আত্মাটা ফালা ফালা হয়ে যায় তরীর। ভয়ে এক লাফে দুই পা পিছিয়ে যায়, মাথাটা কেমন যেন ঘুরে ওঠে। মুখের ওপর বন্দুক তাক করে ঘুমঘুম গলায় বলে ওঠে ঋত্বিক,
---- আমি ড্রাগসের জন্য হাঁটতে পারছি না। চুপচাপ আমাকে আমার রুমে নিয়ে চলো, নয়তো এখান থেকে একটা ভালোবাসার উপহার তোমার কলিজায় ঢুকিয়ে দেব,মাইন্ড ইট।
মুহূর্তেই সব হিসেব পাল্টে যায় তরীর। সে বুঝতে পারল, অতিরিক্ত নেশায় লোকটা আস্ত একটা পাগল হয়ে গেছে এবং নিজের হুশ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। এখন আর কোনো যুক্তি কাজ করবে না। এই মুহূর্তে কথা না শুনলে লোকটা সত্যিই গুলি করে দিতে পারে। এখনই সে মরতে চায় না, চোখের সামনে কত সুন্দর ভবিষ্যৎ আর হাজারও স্বপ্ন পড়ে আছে তার।এসব কথা ভেবে নিজেকে কোনোমতে শক্ত করে তরী। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বিগলিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
---- আ-আচ্ছা আচ্ছা। আপনি ওটা প্লিজ লুকান, আমি নিয়ে যাচ্ছি। প্লিজ ওটা লুকান, আমার খুব ভয় করছে।
বিজয়ীর বাঁকা হাসি খেলে যায় ঋত্বিকের ঠোঁটে। পকেটে রিভলবারটা ঢুকিয়ে নিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বেসুরেলা গলায় ডেকে ওঠে,
---- কাম টু মি।
ভয়ে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে আসে তরী।কোনো দ্বিধা না করে তার ঘাড়ের ওপর নিজের ভারী হাতটা সজোরে রেখে শরীরের ভারসাম্য সামলে নেয় ঋত্বিক। তার উন্মুক্ত হাতের উষ্ণ স্পর্শ পাওয়া মাত্রই মাথা থেকে পা পর্যন্ত তীব্র বিদ্যুৎঝটকায় কেঁপে ওঠে তরীর শরীর। ঋত্বিকের গা থেকে ভেসে আসা ঝাঁঝালো মদের তীব্র ঘ্রাণে তার পেট গুলিয়ে বমি আসার উপক্রম হয়।কোনোমতে নিজেকে শক্ত করে সামনের দিকে পা বাড়ায় তরী। পাশে ঝুলে থাকা ঋত্বিক শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে বারবার টলে পড়ে যাচ্ছে। তরী স্পষ্ট বুঝতে পারছে, লোকটা চরম মাত্রার নেশায় আচ্ছন্ন। এই মানুষটার দিকে তাকাতেই মনের কোণে ভেসে ওঠে এক নির্মম উপলব্ধি। কী অদ্ভুত, দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর আর আকর্ষণীয় ছেলেরাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি নেশা করে। মুখখানা দেখতে বাইরে থেকে চাঁদের মতো সুন্দর হলেও, ভেতরটা আসলে ততোধিক কুৎসিত।
অফুরন্ত ধকল সয়ে, সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ যেন এক একটা যুদ্ধ জয় করে ঋত্বিককে শেষপর্যন্ত তার রুমে টেনে নিয়ে আসে তরী। ঘরের ভেতরে পা রাখতেই নিজের শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এক ঝটকায় শরীর থেকে শার্টটা টেনে খুলে সোজা ছুড়ে মারে ঋত্বিক। বাতাসে উড়ে এসে শার্টটা সজোরে আছড়ে পড়ে তরীর মুখের ওপর। সুতি কাপড়ের ভাঁজ থেকে ভেসে আসা চড়া মদের তীব্র মাদকতা আর তামাকের গন্ধ মুহূর্তেই তার নাকের ভেতরটা আচ্ছন্ন করে ফেলে। চারপাশের বাতাসে তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়ে পুরুষালি উষ্ণতার ঘ্রাণ।চোখের সামনে পৃথিবীটা ঘুরছে ঋত্বিকের। কোনোমতে টলতে টলতে তরীর শূন্য দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে।
---- গেট আউট অব মাই রুম নাউ।
বলেই পায়ের জুতো দুটো খোলার বিন্দুমাত্র ধৈর্য বা হুঁশ রইল না তার। ধাস করে সোজা বিছানায় উল্টে পড়ে গেল ঋত্বিক। পরমুহূর্তেই তার চোখ জোড়া গাঢ় ঘুৃমে নেশায় খিচে বন্ধ হয়ে গেল, বুক চিরে বেরিয়ে আসতে লাগল ভারী, দীর্ঘ নিঃশ্বাস।ওদিকে দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে তড়িঘড়ি করে মুখের ওপর থেকে শার্টটা সরিয়ে ফেলল তরী। তীব্র রাগে হাত দুটো কাঁপছে ।দেরি না করে শার্টটা তুলে সজোরে ছুঁড়ে মারল ওই মাতাল মানুষটার খালি পিঠের ওপর। থরথর করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে ক্ষোভ উগরে দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
---- আপনার রুমে আসতে আমার বয়েই গেছে,উফ এই হাতির মতো শরীরটা ধরে ধরে নিয়ে আসতে আমার সব শক্তি চলে গেল। বাবা মা যা খাইয়ে শক্তি করেছিলো সব এক নিমিষে শেষ হয়ে গেল।
চলবে...!