ফন্ট সাইজ:
থিম:
পাগল তোর জন্যে রে

৩য় পর্ব

লেখক: সুমি চৌধুরী

#পাগল_তোর_জন্যে_রে

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী 
   [০৩]
বালিশের পাশে রাখা নীহারের ফোনটা অবিরাম আর্তনাদ করে চলেছে, অথচ গভীর ঘুমে মগ্ন নীহারের কানে সেই শব্দ যেন পৌঁছাচ্ছেই না। ফোনটা কেটে যাচ্ছে, আবার পরমুহূর্তেই বেজে উঠছে। এভাবে একটানা বেজে যাওয়ার একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে নীহারের ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে বালিশের পাশেই ফোনটাকে বেজে উঠতে দেখে। স্ক্রিনে কলারের নামটা ভেসে উঠতেই নিমেষে তার মুখে চওড়া হাসি ফুটে ওঠে। তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে রিসিভ করে কানের কাছে ধরতেই ওপাশ থেকে রাগি সুর ভেসে আসে।
---- ওই হা'লার পুত কতবার কল দিয়েছি, বেঁচে আছিস নাকি মরে গেছিস?
রিদানের রাগী কণ্ঠস্বর শুনে ফিক করে হেসে ফেলে নীহার। নিজের মাথার চুলে হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বলে,
---- আরে রিলাক্স, এত রেগে আছিস কেন? কোনো সমস্যা?
ওপাশ থেকে রিদানের উত্তেজিত উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এল,
---- সমস্যা মানে।আমার মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে কিচ্ছু ঠিক নেই।
নীহার কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল,
---- কী হয়েছে তোর? সব কিছু খুলে বল তো।
রিদান তখন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
---- কাল রাতে আমি তরীর সাথে কথা বলছিলাম। তারপর হুট করেই তরীর কাশি ওঠে, পানি খাওয়ার সময় হঠাৎ ওর ফোনে কোনো এক ছেলের কণ্ঠ শুনতে পাই। এরপরই ফোনটা কেটে যায়। তারপর আমি যতবার কল দিই, ফোন বন্ধ পাই। কম করে হলেও একশো বার ফোন দিয়েছি, সকালে উঠেও আরও দশবার দিলাম তাও ফোন বন্ধ। আমার মাথা আর কাজ করছে না দোস্ত। তুই প্লিজ বাড়ি যা গিয়ে দেখ, আমার তরী ঠিক আছে কি না।
তক্ষণাৎ বিছানা ছেড়ে হুড়মুড়িয়ে সোজা হয়ে বসে পড়ে নীহার। কপালের মাঝখানে গভীর উদ্বেগের তিনটা ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিদানের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে বলে,
---- হোয়াট। কী বলছিস তুই এসব?
ওপাশ থেকে রিদান রীতিমতো আর্তনাদ করে ওঠে,
---- বিশ্বাস না হলে তুই নিজেই কল দিয়ে দেখ, ফোন বন্ধ পাবি। আমার কেন জানি পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে, বুকটা কেমন খালি খালি ঠেকছে। মনে হচ্ছে আমি আমি বুঝি চিরদিনের মতো আমার তরীকে হারিয়ে ফেলছি।গতকাল রাতেও একটা খুব বাজে স্বপ্ন দেখেছি, কে যেন জোর করে আমার তরীকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। যদিও জানি স্বপ্নের বাস্তব কোনো ভিত্তি থাকে না, তবুও ভেতরটা কু গাইছে। শোন ভাই, আমি হাতজোড় করে বলছি, তরীর যদি সামান্য কোনো ক্ষতি হয়, আমি বাঁচব না। তোর এই পাগল বন্ধুর জীবনটা বাঁচাতে চাস তো? জলদি নীলাদের বাড়ি যা, গিয়ে নিজ চোখে দেখে আয় আমার তরী ঠিক আছে কি না।
রিদানের গলার কাঁপন আর উন্মাদনা ছুঁয়ে যায় নীহারকেও। বুকভরে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বন্ধুকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে শক্ত গলায় বলে ওঠে,
---- তুই শান্ত হ, টেনশন করিস না। এই নীহার যতদিন বেঁচে আছে, আমার বোনের গায়ে হাত তোলার আগে যে কারো সাতবার জন্ম ভাবতে হবে। যে হাত ওর দিকে বাড়াবে, সেই হাত আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব। তুই কিচ্ছু ভাবিস না, আমি এখুনি নীলাদের বাড়িতে যাচ্ছি।
----------------------
সকাল থেকেই জমজমাট উৎসবের আমেজে সেজে উঠেছে আভিজাত্যের ছোঁয়া মাখা মির্জা বাড়ি। চারদিকে নানা রঙের ফুল, রঙিন আলো আর মানুষজনের ছুটোছুটিতে গমগম করছে পরিবেশ। আজ ফুয়াদের গায়েহলুদ পুরো বাড়িটা এখন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়স্বজনের পদচারণায় মুখরিত। অথচ এই হইচই, ঢাকঢোল আর আনন্দের জোয়ারের মাঝখানেও নাক ডেকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তরী। নীলা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার তোলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ফল হয়নি। গায়ে হাত দিয়ে একটু ঝাঁকুনি দিতেই তরী বিরক্তিতে চোখ না খুলেই আধো-বোজা চোখে রাগী গলায় ফুঁপিয়ে বলে উঠেছে,
---- ঘুমোতে দে শা'লীর মেয়ে। জ্বালাস না তো।
শেষমেষ তরীর এই ঘুমকাতুরে স্বভাবের ওপর চরম বিরক্ত হয়ে নীলা হাল ছেড়ে দিল, একাই নিচের তলার হুল্লোড়ে মিশে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।
এদিকে কোলাহল থেকে বহুদূরে, ছাদের খোলা ফ্লোরে অন্য এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ঋত্বিক। একটানা নির্দয় গতিতে পুশআপ দিয়ে চলেছে সে। কপাল ও নাক বেয়ে ঘামের ফোঁটাগুলো চুয়ে চুয়ে ড্রেনের মতো ফ্লোরে ঝরে পড়ছে। হাতের পেশিগুলো আর কনুইয়ের রগগুলো ফুলে ফেঁপে শক্ত পাথরের মতো হয়ে গেছে, তবুও তার বিরাম নেই। চোখের চাউনিগুলো এখনও টুকটুকে লাল হয়ে আছে। কাল রাতের সেই উন্মাদ নেশার ঘোর কেটে গেলেও মনের ভেতর জমে থাকা পারদের মতো রাগটা একচুলও কমেনি।
এভাবে একটানা বুকডাউন দিতে দিতে হঠাৎ করেই ট্রাউজারের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনটা তীব্র বেজে ওঠে। ভারী হয়ে আসা নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে থেমে যায় ঋত্বিক। ফ্লোরের ওপর একহাতে ভর দিয়ে বসে পকেট থেকে ফোনটা বের করে। স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই দেখে, সুদূর আমেরিকা থেকে তার অফিসের বিশ্বস্ত পার্টনার মারিব কল দিয়েছে।বলাই তো হয়নি, ঋত্বিক সাধারণ কোনো আটপৌরে ছেলে নয়৷ আমেরিকার বুকে সে এক সাক্ষাৎ সম্রাট। পুরো যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেট দুনিয়ায় যার এক একটা ইশারা মানেই হাজার কোটি ডলারের গেম চেঞ্জার।আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট সর্বত্র তার রাজত্ব। সেখানকার বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, টেক জায়ান্ট আর গ্যাবলিং সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে মিডিয়া হাউজ সবকিছুই তার হাতের ইশারায় চলে। আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ তাকে এক নামে চেনে, ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধায় তার নাম নেয়।
আমেরিকা তো বটেই, গ্লোবাল স্টক মার্কেটের পতন বা উত্থান কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাও বহুলাংশে নির্ভর করে ঋত্বিকের এক ফোঁটা ভ্রূকুটির ওপর। তার ইশারায় আমেরিকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক লবি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আন্ডারওয়ার্ল্ড পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক আর কোটি কোটি ডলারের অবৈধ অস্ত্র ও ড্রাগ কার্টেলের সিন্ডিকেটের অন্দরমহল পর্যন্ত তার অবাধ বিচরণ। আমেরিকার ফেডারেল এজেন্সিগুলোর খাতায় তার নাম সর্বোচ্চ গোপনীয় ও অস্পৃশ্য ফাইলের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। অথচ এত বিশাল ক্ষমতা, অঢেল বিত্ত আর আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যের এই একচ্ছত্র অধিপতি হওয়া সত্ত্বেও তার এই ভয়ংকর রূপ, এই গ্লোবাল পাওয়ার বা আমেরিকার ক্ষমতার বিস্তার আজও বাংলাদেশের এই সাধারণ মির্জা বাড়ির মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজানা এবং অচেনা এক রহস্য হয়েই রয়ে গেছে।
লম্বা একটা লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে কোনোমতে শান্ত করে ঋত্বিক। তারপর ফোনটা রিসিভ করে কানের সাথে লাগিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
---- হুম, বলো?
ওপাশ থেকে মারিবের জরুরি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
---- বস, আপনার একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ফিক্সড হয়েছে।
ঋত্বিক চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে শীতল গলায় জানতে চায়,
---- হোয়াট, ডেট অ্যান্ড হোয়্যার?"
ওপাশ থেকে মারিব গাণিতিক নিখুঁততায় জবাব দেয়,
---- আগামীকালই মিটিং, বস। লোকেশন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন এলাকার ওয়াল স্ট্রিটের বত ‘দ্যা গ্লাসহাউস’ কনফারেন্স রুম।
কথাটা কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই নিজের নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে কামড়ে ধরে ঋত্বিক। কাল তার নিজের ভাইয়ের বিয়ে চারদিকে কত আয়োজন, কিন্তু কাজের বেলায় সে বরাবরই পাথরের মতো অনমনীয় আর সিরিয়াস। অফিসের এই কাজের গুরুত্বটা ভালোভাবেই বুঝে চোয়াল শক্ত করে বলে,
---- ওকে ফাইন, আমি পৌঁছে যাব।
ফোনটা কানের কাছ থেকে নামিয়ে কেটে ফেলল ঋত্বিক। পকেটে সেটা ঢুকিয়ে দিয়ে এক ঝটকায় ফ্লোর থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ছাদের সিঁড়ির মুখের কাছ থেকে একটা চেনা মেয়েলি কণ্ঠে কেউ তাকে ডেকে ওঠে,
---- ঋত্বিক ভাই।
ডাকটা শোনা মাত্রই বিরতিতে চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ঋত্বিকের। বিরক্তিতে নাক কুঁচকে পেছন ফিরে তাকায়। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে নাবিহা। মেয়েটা চোখের সামনে পড়লেই তার মেজাজটা এমনিতেই তিরিক্ষি হয়ে যায়। পৃথিবীর কোনো মেয়েকেই তার সহ্য হয় না, ছায়ার মতো পাশে দেখলেই মনে হয় কেউ বুঝি মাথায় গরম তেল ঢেলে দিচ্ছে। তবুও নিজের ভেতরের হিংসেটাকে সাধ্যমতো নিয়ন্ত্রণ করে বরফশীতল গলায় জানতে চায়,
---- কিছু বলবি?
নাবিহার বুকটা ভয়ে ধড়ফড় করছে। ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, আঙুলগুলো নিজের ওড়নার কোণে মুচড়ে যায়। থরথরে গলায় ফিসফিস করে বলে,
---- আমি কি দেখতে এতই খারাপ? কেন আমাকে বিয়ে করতে চান না আপনি? মনে মনে কি অন্য কাউকে ভালোবাসেন? নাকি আমি আপনার অযোগ্য?
কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই দুই চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে ফুলে ওঠে ঋত্বিকের। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলায়। রূপকথার রাজ্যের এই ফালতু প্রেম বা আবোলতাবোল আবেগ নিয়ে মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র মানসিকতা ও ফুরসত তার নেই। অনেক কষ্টে নিজের গলার ভেতরের রাগটা গিলে ফেলে রূঢ় চূড়ান্ত ঘোষণায় বলে,
---- এই ধরনের সস্তা ফালতু প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। শুধু এইটুকু মাথার ঘিলুতে ঢুকিয়ে রাখ তোকে আমি কোনো দিন, কোনো জন্মেই বিয়ে করব না। 
কথাটা ছুড়ে দিয়েই নাবিহার মুখের ওপর পাথর চাপা দেওয়ার মতো নির্বিকার ভঙ্গি ধরে। নাবিহা চোখ ফেটে কান্নায় ভেঙে পড়ে, কাঁদতে কাঁদতে মিনতির সুরে আরও কিছু বলতে যেতেই মুখের কথা মুখেই আটকে যায়। তার জন্য এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায় ঋত্বিক।
ঋত্বিক চলে যেতেই পায়ের তলার মাটি যেন সরে যায় নাবিহার। ধরাস করে ছাদের শক্ত ফ্লোরের ওপর বসে পড়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট কান্নার স্রোত হয়ে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। দুহাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, ফোলা চোখ দুটো আকাশের পানে তুলে আর্তনাদ করে ওঠে,
----হে আল্লাহ। কেন ঋত্বিক আমাকে একটুও বুঝতে চায় না? তুমি তো ভালোই জানো, আমি ঋত্বিককে কতটা ভালোবাসি। প্লিজ, আমার ওপর একটু দয়া করো আল্লাহ আমি ওই মানুষটাকে ছাড়া বাঁচব না, ভীষণ ভালোবাসি আমি উনাকে।
------------
মির্জা বাড়ির অন্দরের চঞ্চল কোলাহল আর উৎসবের রেশ দেখতে দেখতে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়ায় নীলা। চারপাশটা যেন এক টুকরো মেলা। বড়রা সব কাজে ব্যস্ত, আর ছোট ছোট বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলায় মেতে আছে। চারপাশের এই প্রাণোচ্ছল আবহ দেখে নীলার মনটাও নিমেষে ভালো হয়ে যায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে সে চারপাশে তাকাতে থাকে।ঠিক তখনই মূল ফটক চিরে ভেসে আসে ভারী একটা বাইকের গর্জন। শব্দের উৎস লক্ষ্য করে তাকাতেই নীলার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে কপালে উঠে যায়। বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দনটা এক ঝটকায় 'ধক' করে থেমে যায়, শরীরের সমস্ত রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসে। এ সে কী দেখছে।নিজের চোখকে একবারের জন্যও বিশ্বাস করতে পারছে না নীলা।
গেট দিয়ে হুড়মুড় করে ভেতরে বাইক দিয়ে প্রবেশ করল নীহার। আগে কয়েকবার আসায় দারোয়ান তাকে ভালোভাবেই চেনে, তাই চোখের পলকে গেট খুলে দিয়েছে। বাইকের ওপর বসা নীহারের দিকে চোখ পড়তেই পলক পড়ে না নীলার। নীহারের পরনে ধবধবে সাদা কটন শার্ট, কনুই পর্যন্ত নিখুঁতভাবে গোটানো হাতা। চোখে গাঢ় কালো সানগ্লাস,চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। ফর্সা ও লোমশ বাম হাতের কবজিতে জড়ানো কালো ব্যান্ডের ঘড়ি।
পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল নীলা। মুহূর্তের জন্য তার শরীরের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। এটা কি কোনো ঘোর বা স্বপ্ন? নীহার কি সত্যি এসেছে তাদের বাড়িতে।
নীলার মাথার ভেতর যখন এই তোলপাড় চলছে, ততক্ষণে গর্জন তুলতে তুলতে নীহারের বাইকটা সোজা এসে থামল ঠিক তার নাকে ডগায়। অন্যমনস্ক নীলা তখন একেবারে রাস্তার মাঝখানে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখের এত কাছে বাইক এসে থেমেছে, সেই হুঁশটুকুও তার নেই।নীহারের কপালে বিরক্তির গভীর ভাঁজ ফুটে উঠল। বাইকের হ্যান্ডেল শক্ত করে চেপে নীলার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কর্কশ গলায় ধমকে উঠল,
---- মরার শখ হয়েছে?তাহলে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াও যাও।এখানে কেউ তোমায় এসে মেরে যাবে না যে এভাবে ফ্যালফ্যাল করে দাঁড়িয়ে আছো।
ধমকটা কানে বাজতেই নীলার আচ্ছন্ন ভাবটা এক ঝটকায় ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বুক কেঁপে উঠে ভয়ে। আমতা আমতা করে কোনোমতে তোতলাতে তোতলাতে বলে,
---- ভাই,ভাইয়া, আপনি।
ভ্রু কুঁচকে নীহার সাফ জানিয়ে দিল,
---- এসব ফালতু প্যাঁচাল বন্ধ করো। আর রাস্তা ছাড়ো, বাইক পার্ক করবো।
নীলার বুকটা থরথর করে কাঁপছে। সে ভালো করেই জানে, নীহার অতিরিক্ত কথা বা খামখেয়ালি প্রশ্ন একদম পছন্দ করে না। আর একটা সেকেন্ড কথা বাড়ালে নিশ্চিত কড়া বকা খেতে হবে। আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত রাস্তা থেকে একপাশে সরে দাঁড়ায় নীলা। নীহার গম্ভীর মুখে বাইকটা নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট পার্কিংয়ে রাখল, তারপর চাবিটা পকেটে গলিয়ে সোজা এসে দাঁড়াল নীলার সামনে। মুখে গম্ভীর্য বজায় রেখে, দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
---- তরী কোথায়, নীলা?
থরথরে কাঁপতে থাকা গলায় নীলা জবাব দিল,
---- ত-তরী তো এখনো ঘুম থেকেই ওঠেনি, আপনি বাড়ির ভেতরে...।
পুরো কথাটি মুখ থেকে শেষ হয়ে বের হওয়ার সুযোগটুকুও পেল না নীলা। তাকে পাত্তাই না দিয়ে এক ঝটকায় পাশ কাটিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল নীহার।ওদিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নীলা। রাগে, অভিমানে আর ক্ষোভে তার শরীরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। এই ছেলেটা কি আদ্যোপান্ত একটা পাথর? আজ পর্যন্ত নীহারের সাথে ঠিকমতো দুটো ভালোয়-মন্দয় কথা বলার সৌভাগ্যও তার হয়নি, অথচ কী আজব মায়ায় পড়ে সে কি না ওই অহংকারী মানুষটাকেই ভালোবেসে ফেলেছে। রাগে এখন নিজের চুল নিজে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তার। মনে হচ্ছে, যদি সামনে পেত, তবে নীহারের শার্টের কলারটা খামচে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে একেবারে শুনিয়ে দিত,
---- খুব দেমাক দেখাস, তাই না? তুই একটা আস্ত স্বার্থপর! তুই ভাবছিস নীলাকে দেমাক দেখিয়ে পার পেয়ে যাবি? তোর এই ফালতু দেমাক আর এটিটিউড এই নীলা সারাজীবন সহ্য করে যাবে?তবুও তোকে ছাড়বে না। 
রাগে ছটফট করতে করতে হঠাৎই নীলার নজর গিয়ে পড়ল বাড়ির কাজের লোক মামুন মিয়ার ওপর। মামুন মিয়া এক ঝুড়ি আলু কাঁধে নিয়ে তখন বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছেন। মুহূর্তের দেরি না করে ধপদপ পা ফেলে সোজা গিয়ে মামুন মিয়ার সামনে হাজির হলো নীলা। মামুন মিয়া কিছু একটা বলার আগেই তার কাঁধ থেকে আলুর ঝুরিটা হেঁচকা টানে নিজের দিকে নামিয়ে নিল সে। হকচকিয়ে গিয়ে মামুন মিয়া বলে উঠলেন,
---- আরে আরে মামুনি। করছ কী এটা? হাত থেকে পড়ে টরে গড়িয়ে গেলে তো...।
বুড়ো মানুষটার সেই কথা মুখের ভেতরই আটকে গেল। মামুন মিয়াকে একটা কথাও বলার সুযোগ না দিয়ে ঝুড়িটা উপুড় করে সজোরে মাটির ওপর আছড়ে ফেলল নীলা। ঠকাঠক শব্দে ঝুড়ি থেকে সমস্ত গোলআলুগুলো গড়িয়ে চারদিকে ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকা সেই আলুগুলোর দিকে তাকিয়ে বড় বড় চোখ করে, দাঁতে দাঁত চেপে রাগে গরগর করতে করতে নীলা বলে উঠল,
---- চাচা, মনে করেন আমি এগুলো আলু ফেলে দিইনি। আমি ওই অহংকার নীহারটাকে মাটি থেকে তুলে আছাড় মেরেছি। এগুলা একটাও আলু না, এগুলা হলো ওই বজ্জাত নীহার আর তার ভিতরের চৌদ্দগোষ্ঠী।ওর যত দেমাক, যত এটিটিউড, হিংসে আর অহংকার সব এই আলুর সাথে পিশে একদম ভর্তা বানিয়ে দিয়েছি।
চলবে...!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন